Wednesday, October 21, 2015

২৫ বছর পর মঙ্গলে বসবাস! মানবসভ্যতার দ্বিতীয় উপনিবেশ!





আর কয়েকটি দিন সবুর করুন, মঙ্গলই হয়ে উঠবে আমাদের ঘরবাড়ি! লাল গ্রহের জল-মাটি-মিথেন গ্যাস আর সাগরের জলের নুনই হয়ে উঠবে আমাদের এই নীল গ্রহের বাসিন্দাদের পরিচিত পরিবেশ। আমাদের বেঁচে থাকার জল-বায়ু। 'নেক্সট-জেন হিউম্যান সিভিলাইজেশন!' তার জন্য অনন্ত প্রতীক্ষারও দরকার নেই। আর কয়েকটা দশক। তারপর মঙ্গলেই গড়ে উঠবে মানবসভ্যতার 'দ্বিতীয় উপনিবেশ'!
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা নাসাই এ কথা জানিয়েছে। আর ১৫ বছরের মধ্যেই লাল গ্রহে মানুষ হাঁটবে বলে নাসার তরফে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার বলা হলো, ২৫ বছরের মধ্যে কিভাবে মানবসভ্যতার 'দ্বিতীয় উপনিবেশ'টা মঙ্গলে গড়ে তোলা যায়, তার যাবতীয় পরিকল্পনা, প্রযুক্তি-প্রকৌশল আর নকশাও তিরিশের দশকের মধ্যেই চূড়ান্ত করে ফেলা হবে।
খাতাকলমে নাসা সেই পরিকল্পনার 'ব্লু-প্রিন্ট' প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করেছে সদ্য প্রকাশিত একটি ডকুমেন্টে। যার নাম 'নাসা'স জার্নি টু মার্স-পাইওনিয়ারিং নেক্সট স্টেপস ইন স্পেস এক্সপ্লোরেশন'।
কোনো উল্লম্ফন নয়, নাসা চায়, ধাপে ধাপে এগোতে। অন্তত তিনটি পর্যায়ে। প্রথম ধাপটির নাম 'আর্থ রিলায়ান্ট'। মানে, লাল গ্রহে মানুষের 'দ্বিতীয় উপনিবেশ' গড়ে তোলার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা-প্রস্তুতির কিছুটা হবে পৃথিবীতেই, গবেষণাগারে। মহাকাশচারীদের 'প্রেনিং ক্যাপসুলে'। তবে বেশির ভাগই হবে পৃথিবীর ৩৭০ কিলোমিটার ওপরে, মহাকাশে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে।
দ্বিতীয় পর্যায়টির নাম 'প্রুভিং গ্রাউন্ড'। এর অর্থ বিভিন্ন সময়, দিনে বা রাতে অথবা বিভিন্ন পার্থিব 'ঋতু'তে সুগভীর মহাকাশে মহাকাশচারীদের পাঠিয়ে দেখা হবে, মঙ্গলের পরিবেশ, জল-বায়ু কখন, কতটা সহনীয় হচ্ছে মানুষের পক্ষে। এই পর্যায়টি এমনভাবে করা হবে যাতে মহাকাশচারীদের প্রয়োজনে খুব তাড়াতাড়ি এই গ্রহে ফিরিয়ে আনা যায়। এটা আদতে মঙ্গলে বসতি গড়ার আগে, 'প্র্যাকটিস পিরিয়ড'।
আর শেষ ধাপটিতে যাবতীয় পার্থিব নির্ভরতাকে 'গুড বাই' জানানো হবে। এই পর্যায়টির নাম 'আর্থ ইনডিপেনডেন্ট', যখন মানুষ গিয়ে কিছু দিন করে থাকতে শুরু করবে লাল গ্রহে। নাসা বলছে, মানুষ চাষবাসও করবে লাল গ্রহে গিয়ে। পানি শোধন করে তা পানযোগ্য করে তুলবে। আর নিয়মিত ও দ্রুত যোগাযোগ রাখার জন্য গড়ে তুলবে একেবারে সর্বাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। নাসা বলছে, আমাদের এই গ্রহের কারোর পাঠানো মেসেজের জবাব লাল গ্রহ থেকে পাওয়া যাবে। শুধু একটু সবুর করতে হবে। দূরত্বটা যে একটা 'ফ্যাক্টর'। মঙ্গলের মানুষের জবাব আমাদের কাছে পৌঁছতে সময় নেবে ২০ মিনিট।
তবে আমার আশঙ্কা মঙ্গল অভিযানের সকল চ্যালেঞ্জের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে মঙ্গলে গ্রহান্তরিত মানুষের সামাজিক মানবিক সহনশীলতা রক্ষা, পারস্পরিক মুল্যবোধ এবং চুড়ান্তভাবে মানবিক সম্প্রীতি রক্ষা করা যেটা আমরা পৃথিবীনামক এই নীল গ্রহটায় সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করতে পারিনি। নইলে এক মুহুর্তের সহিংসতায়, মুহুর্তের উচ্ছৃঙ্খলতা উগ্রতায় দাহ্য মিথেনপূর্ণ লালগ্রহটি মুহুর্তেই জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হতে পারে, যেটা কারোর জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবেনা। তাই মঙ্গলে দ্বিতীয় উপনিবেশ গড়ার আগে তাকে পার্থিব জাতীগত বা ধর্মীয় বা আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পারিবারিক ব্যক্তিক দ্বান্ধিক বিভেদ বিদ্বেষ ভুলে, একই মানবতার অভিন্ন আদর্শিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানব তোমার মঙ্গলযাত্রা এবং মঙ্গলবসতি শুভ হউক। মঙ্গল যেনো আমাদের পরিপূর্ণ অভিন্ন মানবতাবাদী আলোকিক সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার অবধারিত সেই প্রেরণাটুকু যোগাতে পারে, ২৫টি বছর খুব বেশী নয়, হয়তো দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যাবে। প্রজন্ম সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় এখনি কাউন্ট ডাউন করতে পারে।।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত।

ইসলাম ধর্মে মোজেস ( পর্ব ১,২,৩)


ইসলাম ধর্মে মোজেস ( পর্ব ১)

হযরত মূসা আঃ ইংরেজিতে Moses হিব্রু מֹשֶׁה ও আধুনিক Mošə তিবেরিয়ান Mפנeh এবং আরবি ভাষায় موسى Mūsa Geez Musse অথাৎ তিনি হলেন ইহুদি খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত অথবা প্রেরিত একজন রাসুল । তিনি মোজেস নামেও পরিচিত ছিলেন । কোরআনে মুসা আঃ এর নাম অন্য নবীদের তুলনায় বেশি উল্লেখ করা হয়েছে । ধারনা করা হয় যে মুসা আঃ ১২০ বছর পৃথিবীতে ছিলেন । হযরত মুসা আঃ এর সম্প্রদায়ের নাম ছিল বনী ইসরাঈল । তার মুজেযাসমূহ বিগত অন্যান্য নবী রসূলগণের তুলনায় যেমন সংখ্যায় বেশী তেমনিভাবে প্রকাশের বলিষ্ঠতার দিক দিয়েও অধিক । এমনিভাবে তার সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলের মূর্খতা এবং হঠকারিতাও বিগত উম্মত বা জাতিসমূহের তুলনায় বেশী কঠিন । তদুপরি এই কাহিনীর আলোচনা প্রসঙ্গে বহু জ্ঞাতব্য বিষয় এবং হুকুম আহকামের কথা এসেছে ।


হযরত মুসা আঃ এর সময় যে ফেরাউন ছিল তিনি ১৮তম রাজবংশের তার নাম কাবুস বলে উল্লেখ করা হয় । সে যুগে ফেরাউন হতো মিসরের সম্রাটের খেতাব । ফেরাউন যখন স্বপ্নে দেখলেন বনী ইসরাঈল বংশে জন্মগ্রহণকারী এক পুত্র সন্তানের কাছে তিনি বিতাড়িত হবেন । এবং তার রাজত্বের অবসান ঘটবে ও তার প্রবর্তিত দ্বীনের পরিবর্তন হবে । তখনই তিনি তার পারিষদবর্গকে এ বিষয় অবিহত করলেন এবং এ বিষয় জানতে চাইলেন । হামান ছিলেন ফেরাউনের মন্ত্রী । তাদের স্বপ্নের ব্যাখার তিত্তিতে ফেরাউন শাঙ্কিত হয় এবং তার প্রতিকার হিসেবে তিনি ফরমান জারি করেন যে বনী ইসরাঈলের কোন নবজাতক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই যেন তাকে মেরে ফেলে । প্রতিটি সন্তান সম্ভবা মায়ের প্রতি যেন কঠর নজরদারী দেওয়া হয় এবং যাতে তাদের ঘরে কোন পুত্র সন্তান জম্মালে তাকে সাথে হত্যা করা হয় । এভাবে কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর বনী ইসরাঈলের পুত্র সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে এবং এতে করে ফেরাউনের সম্প্রদায়ের লোকজন আশংকা প্রকাশ করে যে বনী ইসরাঈল বংশের বিলুপ্ত ঘটলে তাদের দাস এবং শ্রমিকের অভাব হবে এবং দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে । তারা এ আশংকার বিষয়টি ফেরাউনকে অবহিত করেন । অতঃপর তিনি নির্দেশ দেন যে বছর অন্তর অন্তর যেন পুত্র সন্তান হত্যা করা হয় তবে গোপনে গোপনে সার্বিক হত্যার ঘটনা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে । বর্ণিত আছে যে বছর হত্যার আদেশ রহিত ছিল সেই বছরই হযরত হারুন আঃ জন্মগ্রহণ করেন । আর হত্যার আদেশ যখন বলব এবং কার্যকরী ছিল সেই বছর হযরত মূসা আঃ তার মায়ের পেটে আসেন । বিষয়টি তার স্বীয় কন্যা মরিয়ম ব্যতীত আর কেউ জানত না । কাবেলা নামক এক কিবতী স্ত্রী মূসার মাতার প্রতি প্রহরী রূপে নিযুক্ত ছিলেন । ভূমিষ্ট কালীন সময়ে সে হাজির হয় সদ্যোজাত মূসার রূপ লাবণ্য দর্শনে কাবেলা মুগ্ধ হয়ে পড়ে এবং শিশুর প্রতি তার স্নেহ মায়া সৃষ্টি হয় । সে মূসার জননীকে অভয় দিয়ে বলে তুমি চিন্তা করো না আমি এই বিষয়ে বা তোমার বিষয় কিছু প্রকাশ করিব না । এভাবে মূসা জননী শিশু মূসাকে তিন চার মাস পর্যন্ত বুকের দুধা খাইয়ে গোপনে বড় করতে থাকেন । শিশু মূসার জন্মের পর থেকেই উম্মে মূসা বিচলিত হয়ে পড়েন এই ভেবে না জানি এই সংবাদ ফিরআউনের দরবারে কখন পৌছে যায় । নিষেধাজ্ঞার কালে গর্ভধারণ পুত্র সন্তান প্রশব এই সমগ্র বিষয়টি উম্মে মূসাকে সার্বক্ষণিকভাবে চিন্তাক্লিষ্ট এবং তটস্থ করে রাখতো। ভয় এবং শংকায় তার দিন অতিবাহিত হতে থাকে । কিভাবে শিশুটিকে বাচিয়ে রাখা যায় এই ভেবে তিনি সব সময় দুশ্চিন্তা থাকতেন । যখন আর মূসার উপস্থিতি গোপন রাখা সম্ভব ছিল না তখন তার মা তাকে আল্লাহুর হুকুমে শিশু মূসাকে স্থাপনপূর্বক চাদরে আবৃত করে একটি ঝুড়িতে রেখে নীল নদে ভাসিয়ে দেন । আল্লাহুতাআলা সূরা আল কাসাসের ৭ নং আয়াতে বলেনঃ
( আমি মূসা জননীকে আদেশ পাঠালাম যে তাকে স্তন্য দান করতে থাকো । অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা করো তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না দুঃখও করো না । আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করবো । )

ঝুড়িটি ভাসতে ভাসতে ফেরাউনের প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে থেমে থাকে । ফেরাউনের লোকজন এটিকে উঠিয়ে নেন এবং পরবর্তীতে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া তার নিকট নিয়ে এল । হযরত মূসা আঃ দেখতে ছিলেন অনেক সুন্দর । আর ফেরাউনেরও কোন পুত্র সন্তান ছিলো না । তার ছিলো শুধু একটি কন্যা সন্তান । পরবর্তীতে যে ফেরাউনের সিংহাসনের বসেন । শিশু দর্শনে সবার মন স্নেহসিক্ত হয়ে উঠে । বিশেষ করে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার কোমল অন্তর মাতৃস্নেহে বিগলিত হয় । বিষয়টি ফেরাউনকে অবহিত করা হলে তিনি শিশুটিকে মেরে ফেরার নির্দেশ দেন কিন্তু এতে স্ত্রী আসিয়া বাঁধা দেন । আল্লাহু তাআলা কোরআনের সূরা আল কাসাসের ৯ নং আয়াতে উল্লেখ করেনঃ
"( ফেরাউনের স্ত্রী বলল এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি তাকে হত্যা করো না । এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি । )"
সন্তানের থেকে বিচ্ছেদের ফলে মূসার মায়ের হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে ছিল । মূসার ভগিনীকে মরিয়ম বললেন তাকে অনুসরণ করার জন্য এবং সে তার কথামত অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে অনুসরণ করলো । ফেরাউনের স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এবার শিশু মূসা প্রতিপালিত হতে থাকে । এখানে একটি সমস্যা দেখা দেয় আর তা হল স্তনপান নিয়ে । শিশু মূসা কোন ধাত্রীরই স্তন তখন পান করতেছিলেন না । তখন বিষয়টি ফেরাউন স্ত্রী আসিয়াকে গভীরভাবে ভাবনায়ে ফেলে দেয় । অবশেষে মূসার ভগিনী যে গোপনে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল সে এসে আবেদন জানায় যে আমি এমন একজন মহিলার কথা জানি যার স্তন এই শিশু পান করতে পারে । তখন তাকে সেই মহিলাটিকে হাজির করতে আদেশ দেয়া হল । পরে সে নিজের মাতা অর্থাৎ মূসার জননীকে সবার সামনে উপস্থিত করেন । স্তন দেয়া হলপর মূসা নির্বিঘ্নে দুগ্ধ পান করেন । এই ঘটনায় সবাই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পরে । উম্মে মূসাকে রাজপরিবারের অবস্থান করার অনুমতি প্রদান করা হল । কিন্তু তিনি সেখানে থাকতে অস্বীকার করেন এবং বলেন যে তার স্বীয় স্বামী পুত্র কন্যা পরিবার রয়েছে । অবশেষে কিছু শর্তসাপেক্ষে তাকে শিশুসহ নিজ গৃহে অবস্থান করার অনুমোদন দেয়া হয় । উম্মে মূসা অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে স্বীয় পুত্র শিশু মূসাকে নিয়ে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করে । আল্লাহু তাআলা সূরা আল কাসাসের ১৩ নম্বর আয়াতে বলেনঃ
"( অতঃপর আমি তাকে তার জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে আল্লাহর ওয়াদা সত্য কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না । )"



একদিন মূসা যখন নগরীতে প্রবেশ করলো সম্ভবত তা ছিল মধ্যাহ্ন সময় যখন মিশরের ব্যবসা বাণিজ্য কিছুহ্মণের জন্য বন্ধ থাকে । বা সময় কালটি হয়ত রাত্রিকাল ছিল । যখন শহরের আধিবাসীরা সুপ্তির কোলে আশ্রয় গ্রহণ করেন । সূরা আল কাসাসের ১৮ নং আয়াতের বর্ণনা অনুসারে শেষের বর্ণনাটিই অধিক প্রযোজ্য মনে হয় । নগরীতে প্রবেশ করে তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াই করতে দেখলেন । এদের একজন ছিল তাঁর নিজ ইহুদি দলের এবং অন্য জন তার শত্রু মিশরবাসী দলের । মূসার উদ্দেশ্য ছিল মিশরবাসীকে আঘাত করে ইহুদীকে মুক্ত করার । কিন্তু ঘটনা চক্রে মিশরবাসীটি মূসার এক ঘুষিতেই মৃত্যুবরণ করে । এতে তিনি অনেক দুঃখ পান এবং অনুতপ্ত হয়ে পড়েন এবং আল্লাহ্‌র নিকট হ্মমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন । তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি ভবিষ্যতে কখনও অপরাধীদের সাহায্য করবেন না । পরের দিন মূসা যখন ভীত শংকিত অবস্থায় সে নগরীতে প্রবেশ করেন । সূরা আল কাসাসের ১৮ নং আয়াতে উল্লেখ করেনঃ
"( অতঃপর তিনি প্রভাতে উঠলেন সে শহরে ভীত শংকিত অবস্থায় । হঠাৎ তিনি দেখলেন গতকল্য যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল সে চিৎকার করে তার সাহায্য প্রার্থনা করছে । মূসা তাকে বললেন তুমি তো একজন প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট ব্যক্তি । )"

তিনি দেখতে পারলেন যে গতকাল যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল সে চিৎকার করে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছে । কিন্তু মূসা তাকে সাহায্যের জন্য আগ্রহ বোধ করলেন না কারণ তিনি আল্লাহুর নিকট প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি ভবিষ্যতে কখনও অপরাধীদের সাহায্য করবেন না । মূসা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ বোধ করেন । তিনি আবার ধারণা করলেন যে মিশরবাসীটিই অন্যায়ভাবে ইহুদিটিকে মারধর করছে তিনি ব্যাপারটিতে হস্তহ্মেপ করতে পুণরায় মনস্ত করলেন । উভয়ের শত্রু অর্থাৎ মূসা এবং ইহুদিটির শত্রু মিশরবাসীটি । মিশরবাসীটি পূর্বের সম্পূর্ণ ঘটনাটি অবগত ছিল । তখন সে বলল গতকাল তুমি যেভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে সে রকম আমাকেও কি হত্যা করতে চাও ? তুমি তো একজন স্বেচ্ছাচারী আর কিছু না । আর তুমি সর্বদা ন্যায়ের এবং শামিতর কথা বল । যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে পৃথিবীতে শামিত স্থাপন করবে । মিশরবাসীকে হত্যার গুজব চর্তুদ্দিকে রটনা হয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত রাজপ্রাসাদেও পৌছে যায় । সেখানে ফেরাউনের সভাসদেশ্যবর্গের সভাতে মূসার জন্য মৃত্যুদন্ডের আদেশ ধার্য করা হয় । মূসা উপলব্ধি করতে পারলেন যে রাজপ্রাসাদ বা নগরী এমনকি ফেরাউনের রাজত্বের সীমানার মধ্যে তার জীবন নিরাপদ নয় । সুতরাং তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনের মনস্ত করলেন । কিন্তু কোথায় যাবেন জানেন না । প্রচন্ড মানসিক উদ্বেগ এবং উত্তেজনা তাকে অস্থির করে তোলে । তিনি একান্তভাবে সেই পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করেন যার ফলে তিনি শামিত লাভ করেন এবং উদ্বেগ থেকে মুক্ত হন । অতঃপর তিনি মাদইয়ান দিকে যাত্রা শুরু করেন এবং যাত্রার পূর্বে আল্লাহুর নিকট অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন । তফসীরকারগণ বর্ণনা করেন যে এই সফরে মূসা আঃ এর সাথে খাদ্য ছিল বৃহ্মপত্র । হযরত ইবনে আব্বাস বলেন এটা ছিল মূসা আঃ এর সর্বপ্রথম পরীক্ষা । তার পরীক্ষাসমহের বিবরণ কোরআনের ২০ নং সূরা আত ত্বোয়া হা তে বর্ণিত রয়েছে বা আছে ।
★তথ্য শেষে দেওয়া হবে ।

ইসলাম ধর্মে মোজেস ( পর্ব ২)


প্রাচীন কালে যারা মরুভূমি অতিক্রম করতেন তারা তদের যাত্রাপথে একমাত্র উদ্দেশ্য থাকতে নির্দিষ্ট লহ্ম্যে পৌছানোর জন্য পথের মরুদ্যান বা কূপের নিকট পৌছানো । কারণ তা হলে গাছের ছায়াতে সূর্যের প্রচন্ড তাপ থেকে শরীরকে সুশীতল করা কূপের পানি প্রচন্ড তৃষ্ণা কে নিবারণ করা যায় । সর্বোপারি মরুভূমির জনশূন্যতা থেকে রহ্মা পেয়ে মানুষের সঙ্গ লাভ করা যায় । মূসা শেষ পর্যন্ত মাদইয়ানের একটি মরুদ্যানে পৌছাতে সহ্মম হলেন কিন্তু তিনি ছিলেন পথশ্রমে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্থ সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তিনি পানি পান করার জন্য আগ্রহী ছিলেন । কিন্তু কুপে তখন একদল রাখাল তাদের জন্তুদের পানি পান করাচ্ছিলেন । সে সময়ে তিনি লহ্ম্য করেন যে দুজন রমণীদ্বয় তাদের পশুপালকে আগলিয়ে রেখেছেন তাদের পশুদের পানি পান করানোর জন্য । তখন মূসা আঃ রমণীদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলো তোমাদের কি ব্যাপার ? তোমরা তোমাদের পশুপালকে আগলিয়ে দাড়িয়ে আছ কেন ? অন্যদের ন্যায় কূপের কাছে এনে পানি পান করাও না কেন ? তারা জওয়াব দিল আমাদের অভ্যাস এই যে আমরা পুরুষের সাথে মেলামেশা থেকে আত্মরহ্মার জন্য পশুপালগুলোকে পানি পান করাই না যে পর্যন্ত তারা কূপের কাছে থাকেন । তারা চলে গেলে আমরা পশুপালগুলোকে পানি পান করাই । রমণীদ্বয় এটাও বলল যে আমাদের পিতা অতিশয় বৃদ্ধ ।

তিনি একাজ করতে পারেন না । তাই আমরা একাজ করতে বাধ্য হয়েছি । অতঃপর মূসা আঃ রমণীদ্বয়ের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কূপ থেকে পানি তুলে তাদের পশুপালগুলোকে পান করিয়েছিলেন । কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে রাখালদের অভ্যাস ছিল তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর পরে একটি ভারী পাথর দ্বারা কূপের মুখ বন্ধ করে দিতেন । ফলে রমণীদ্বয় তাদের উচ্ছিত পানি পান করাত । এই ভারী পাথরটি দশ জনে মিলে স্থানান্তরিত করতো । কিন্তু মূসা আঃ একাকী পাথরটি সরিয়ে দেন এবং কূপ থেকে পানি উত্তোলন করেন । আর এ কারণেই রমণীদ্বয়ের একজন মূসা আঃ সম্পর্কে সে রমনীদ্বয়ের পিতার কাছে বলেছিলেন যে সে অনেক শক্তিশালী । মূসা আঃ সাত দিন ধরে কোনকিছু আহার করেন নাই । তখন এক বৃহ্মের ছায়ায় এসে আল্লাহু তাআলার সামনে নিজের অবস্থা এবং অভাব পেশ করলেন । এটা দোয়া করার একটা সূহ্ম পদ্ধতি । রমণীদ্বয় নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বাড়ী পৌছে গেলে বৃদ্ধ পিতা এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন । কন্যাদ্বয় ঘটনা খুলে বললেন । পিতা দেখলেন লোকটি অনুগ্রহ করেছেন তাকে এর প্রতিদান দেয়া উচিত ।

তাই তিনি কন্যাদ্বয়ের একজনকে তাকে ডেকে আনার জন্যে পাঠালেন । মূসা তখন সবেমাত্র বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ঠিক সে সময় মেয়েটি লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে সেখানে পৌঁছালো । প্রয়োজনবশত সেখানে পৌছে মেয়েটি লজ্জা সহকারে কথা বলেছে । বালিকাটি বিণীতভাবে বললেন মুসা আঃ কে যে আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন তার জন্য আমার পিতা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ । তাই তিনি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য এবং পারিশ্রমিক দেবার জন্য ডেকেছেন । তাফসীরে আরোও বলা হয়েছে যে মূসা আঃ তার সাথে পথ চলার সময় বললেন তুমি আমার পশ্চাতে চল এবং রাস্তা বলে দাও । বলাবাহুল্য মেয়েটি প্রতি দৃষ্টিপাত থেকে বেঁচে থাকাই ছিল এর লহ্ম্য। সম্ভবত এই কারণেই মেয়েটি তার সম্পর্কে পিতার কাছে বিশ্বস্ততার সাহ্ম্য দিয়েছিলেন । এই মেয়েটির পিতা কে ছিলেন এ সম্পর্কে তফসীরকারকগণ মতভেদ করেছেন । কিন্তু কোরআনের আয়াতসমূহ থেকে বাহ্যত এ কথাই বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন হযরত শোয়ায়ব আঃ ।


বৃদ্ধ পিতা এবং মূসার আঃ দেখা হওয়া মাত্রই তাদের মাঝে বন্ধুতে পরিণত হয়ে যায় । মূসা তাকে তার জীবন কাহিনী সব খুলে বলেন । তিনি কে ছিলেন কিভাবে তিনি কোথায় থেকে এখানে এলেন কি পরিপ্রেহ্মিতে তিনি জন্মভূমি মিশর ত্যাগে বাধ্য হলেন । তার সকল ঘটনা পূর্ণ বিবরণ তিনি রমণীদ্বয়ের বৃদ্ধ পিতার কাছে বর্ণনা করলেন । সম্ভবত তাদের সাথে রমণীদ্বয়রাও এই কাহিনী শুনার জন্য সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন । রমণীদ্বয়ের এক জন্য তার বাবার কাছে যে বলতে লাগল এই যে গৃহের কাজের জন্য আপনার একজন চাকরের প্রয়োজন । আপনি চাইলে তাকেই নিযুক্ত করতে পারেন । মেয়েটির পিতা হযরত শোয়ায়ব আঃ নিজেই নিজের পহ্ম থেকে কন্যাকে হযরত মূসার আঃ এর সাথে বিবাহে দেওয়ার কথা ও ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন । তার প্রস্তাব ছিল মূসা তার যে কোন একটি কন্যাকে বিবাহ করতে পারে বিনিময়ে তাকে কমপহ্মে আট বছর তার পশুচারণের কাজ করতে হবে । অবশ্য তুমি ইচ্ছা করলে দশ বছরও থাকতে পার । সূরা আল কাসাসের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহু তাআলা উল্লেখ করেন
( মূসা বললেন আমার ও আপনার মধ্যে এই চুক্তি স্থির হল । দুটি মেয়াদের মধ্য থেকে যে কোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না । আমরা যা বলছি তাতে আল্লাহর উপর ভরসা । )

যখন হযরত মূসা আঃ দশ বছর পূর্ণ করলেন যখন তখন হযরত শোয়ায়ব আঃ এর কাছে প্রস্তাব করলেন এখন আমি জননী এবং ভগ্নির সাথে সাহ্মাতের উদ্দেশে মিসর যেতে চাই । ফেরাউনের সিপাহীরা তাকে গ্রেফতার এবং হত্যার জন্যে খোজ করছিল । এ আশঙ্কার কারণেই তিনি মিসর ত্যাগ করেছিলেন । দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে এখন সে আশঙ্কা অবশিষ্ট নেই । শোয়ায়ব আঃ তাঁকে স্ত্রী অর্থাৎ নিজের কন্যাসহ কিছু অর্থকড়ি এবং আসবাবপত্র দিয়ে বিদায় দিলেন । পথিমধ্যে শাম অঞ্চলের শাসকদের পহ্ম থেকে বিপদাশঙ্কা ছিল তাই তিনি পরিচিত পথ ছেড়ে অখ্যাত পথ অবলম্বন করলেন । তখন ছিল শীতকাল । স্ত্রী ছিলেন অস্তসত্তা এবং তার প্রসবকাল ছিল নিকটবর্তী । সকালে বা বিকাল যে কোন সময় প্রসবের সম্ভাবনা ছিল । রাস্তা ছিল অপরিচিত । তাই তিনি মরু অঞ্চলে পথ হারিয়ে তূর পর্বতের পশ্চিমে এবং ডান দিকে চলে গেলেন । গভীর অন্ধকার ছিল । কনকনে শীতও ছিল । মাটি ছিল বরফসিক্ত । সে দুর্যোগ ময় মুহুর্তে স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায় । মূসা আঃ শীতের কবল থেকে আত্মরহ্মার্থে আগুন জ্বালাতে চাইলেন । কিন্তু তিনি আগুন জ্বালাতে ব্যর্থ হলেন । হঠাৎ তিনি দেখলেন তূর পর্বতে আগুলে দেখতে পেলেন । সেটা ছিল প্রকৃতপহ্মে নূর । তিনি পরিবারবর্গকে বললেন তোমরা এখানেই অবস্থান কর । আমি আগুন দেখেছি । সম্ভবত আগুনের কাছে কোন পথপ্রদর্শক ব্যক্তিও পেয়ে যেতে পারি যার কাছ থেকে আমরা পথের সন্ধান জানতে পারবো । পরিবারবর্গের মধ্যে স্ত্রী যে ছিলেন তা তো সুনিশ্চিত । কোন কোন রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে কোন খাদেমও সাথে ছিল । তাকে উদ্দেশ করেও সম্বোধন করা হয়েছে । আবার কোন কোন রেওয়াতে আছে যে কিছুসংখ্যক লোক সফর সঙ্গীও ছিল । কিন্তু পথ ভুলে তিনি তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন ।

ইসলাম ধর্মে মোজেস ( পর্ব ৩)


মূসা (আঃ) এর নবুওয়ত লাভ

মূসা (আঃ) পাহাড়ের পাদদেশে এই ঘটনার সম্মুখীন হলেন । পাহাড়টি ছিল তার ডানদিকটায় । এই উপত্যকার নাম ছিল তুয়া । যখন তিনি আগুনের কাছে পৌঁছান মুসনাদে আহমদে ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ্‌ বর্ণনা করন যে মূসা (আঃ) আগুনের কাছে পৌছে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য দখতে পান । আর তিনি দেখলেন যে এটি একটি বিরাট আগুন যা একটি সতেজ এবং সবুজ বৃহ্মের উপর দাউ দাউ করে জ্বলছে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে এর কারণে বৃহ্মের কোন ডাল অথবা পাতা পুড়ছে না এক কথায় বৃক্ষের কোন ক্ষতি হচ্ছে না বরং আগুনের কারণে বৃহ্মের সৌন্দর্য সজীবতা এবং উজ্জ্বল্য আরও দ্বিগুন বেড়ে গেছে । মূসা (আঃ) এই বিস্ময়কর দৃশ্য কিছুহ্মণ পর্যন্ত দেখেন এবং অপেহ্মা করেন যে আগুনের কোন স্ফুলিঙ্গ মাটিতে পড়লে তিনি তা তুলে নেবেন । অনেকহ্মণ অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন এমন হল না তখন তিনি কিছু ঘাস এবং খড়কুটা একত্রিত করে আগুনের কাছে ধরেন । তিনি ভেবে দেখলেন এতে আগুন লেগে গেলে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে । কিন্তু এগুলো আগুনের কাছে নিতেই আগুন পেছনে সরে গেল । কোন কোন ইসলাম বিশেষজ্ঞদের মতে আগুন তার দিকে অগ্রসর হয় । এবং তা দেখে তিনি অস্থির হয়ে পেছনে সরে গেলেন । মোটকথা তার আগুন লাভ করার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না । তিনি এই অত্যাশ্চর্য আগুনের প্রভাবে বিস্ময়াভিভূত ছিলেন । ইতিমধ্যে একটি গায়বী আওয়াজ হল ।
বাহরে মুহীত রূহুল মা আনী ইত্যাদি গ্রন্থে আছে যে হযরত মূসা (আঃ) এই গায়বী আওয়াজ চতুর্দিক থেকে সমভাবে শ্রবণ করেন । আর আওয়াজটি কোনদিক থেকে আসছিল তার কোন দিক নির্দিষ্ট ছিল না । শুনেছেনও অপরূপ ভঙ্গিতে শুধু কানে নয় সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা শুনেছেন । এটা ছিল একটা মু জেযার মত । আওয়াজের এই রকম ছিলঃ যে বস্তুকে তুমি আগুন মনে করছ তা আগুন নয় তা হল আল্লাহ তাআলার জ্যোতি । এতে আরো বলা হয় আমিই তোমার পালনকর্তা । রূহুল মা আনী মুসনাদে বরাতে ওয়াহাবের রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে যে মূসা (আঃ) কে যখন ইয়া মূসা শব্দ প্রয়োগে আওয়াজ দেওয়া হয় তখন তিনি লাব্বায়েক অর্থাৎ (হাজির আছি) বলে জওয়াব দেন এবং বলেন যে আমি আওয়াজ শুনছি । কিন্তু কোথা থেকে আওয়াজ দিচ্ছেন তা জানি না । এবং মূসার একটি প্রশ্ন করেন বা বলেন আপনি কোথায় আছেন ? উত্তরে বলা হয় আমি তোমার উপরে সামনে পশ্চাতে এবং তোমার সাথেই আছি । তারপর মূসা (আঃ) আরয করলেন আমি স্বয়ং আপনার কালাম শুনেছি, না আপনার প্রেরিত কোন ফেরেশতার কথা শুনেছি ? জওয়াবে বলা হয় আমি নিজেই তোমার সাথে কথা বলছি । সূরা আত ত্বোয়া-হা -এর ১২ নং আয়াতে আল্লাহু তাআলা উল্লেখ করেছেন
“ আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় রয়েছ । ”
জুতা খোলার নির্দেশ দেওয়ার এক কারণ এই যে, স্থানটি ছিল সম্ভ্রম প্রদর্শনের এবং জুতা খুলে ফেলা তার অন্যতম আদব । দ্বিতীয় কারণ এই যে, কোন কোন তথ্য থেকে জানা যায়, মূসা (আঃ) এর পাদুকাদ্বয় ছিল মৃত জন্তুর চর্মনির্মিত । হযরত আলি, হাসান বসরী এবং ইবনে জুরায়জ থেকে প্রথমোক্ত কারণই বর্ণিত আছে । তাদের মতে মূসা (আঃ) এর পদদ্বয় এই পবিত্র উপত্যকার মাটি স্পর্শ করে বরকত হাসিল করুক এটাই ছিল জুতা খুলে রাখার উপকারিতা ।


এবং হাদীসে আছে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বশীর ইবনে খাসাসিয়াকে কবরস্থানে জুতা পায়ে হাটতে দেখে বলেছিলেন
“ তুমি যখন এ জাতীয় সম্মানযোগ্য স্থানে অতিক্রম কর তখন জুতা খুলে ফেল । ”
সূরা আত ত্বোয়া-হা -এর ১৪ থেকে ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহু তাআলা হযরত মূসা (আঃ) কে ধর্মের সমুদয় মূলনীতি শিহ্মা দেওয়া হয়েছে আর্থাৎ তাওহিদ, রেসালাত ও পরকাল এবং তিনি বলেছেন
“ আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই । অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর। কেয়ামত অবশ্যই আসবে আর আমি তা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেকেই তার কর্মানুযায়ী ফল লাভ করেন । সুতরাং যে ব্যক্তি কেয়ামতে বিশ্বাস রাখে না এবং নিজ খাহেশের অনুসরণ করেন সে যেন তোমাকে তা থেকে নিবৃত্ত না করেন । নিবৃত্ত হলে তুমি ধবংস হয়ে যাবে । ”
এখানে নামাযের নির্দেশে করা হয়েছে । কিন্তু নামাযকে পৃথকভবে উল্লেখ করার কারণ হল এই যে নামায সমস্ত এবাদতের সেরা এবাদত । এবং হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী নামায ধর্মের সমস্ত ঈমানের নূর এবং নাময বর্জন করা মানে কাফেরদের আলামত । কেয়ামতের ব্যাপারটি আল্লাহ্‌ তাআলা সব সৃষ্টজীবের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন এমনকি পয়গম্বর ও ফেরেশ্তাতাদের কাছ থেকেও । হযরত মূসা (আঃ) কে লহ্ম্য করে সতর্ক করা হয়েছে যে, তুমি কাফের এবং বেঈমানদের কথায় কেয়ামত সম্পর্কে অসাবধানতার পথ বেছে নিয়ো না তাহলে তা তোমার ধ্বংসের কারণ হয়ে যাবে ।

অতঃপর আল্লাহ্‌ তাআলা বললেন তোমার ডান হাতে ওটা কি ? মূসা (আঃ) বললেন এটা আমার লাঠি । আমি এর উপর ভর দেই । এর দ্বারা আঘাত করে আমার ছাগপালের জন্যে বৃহ্মপত্র ঝেড়ে ফেলি এবং এর দ্বারা আমার অন্যান্য কাজও উদ্ধার হয় । আল্লাহু তাআলা বললেন একে মাটিতে নিহ্মেপ কর । মূসা (আঃ) আল্লাহু তাআলা নির্দেশে তা মাটিতে নিহ্মেপ করার পর তা সাপে পরিনত হলো এবং নড়াচড়া করতে লাগলো । এই সাপ সম্পর্কে কোরআন পাকের এক জায়গায় ছোট ও সরু সাপ বলা হয়েছে । অন্য জায়গায় একে অজগর এবং বৃহৎ মোটা সাপ বলা হয়েছে । সম্ভবত এটি যেখানে যে রূপ আকৃতি ধারণের প্রয়োজন হতো সে রূপ ধারণের আকৃতি ধারণ করতে সহ্মম ছিল । ইমাম কুরতুবীর বর্ণনা অনুযায়ী এটি চিকন সাপের ন্যায় দ্রুতগতি সম্পন্ন ছিল বলে জান্নুন বলা হতো । লোকেরা দেখে ভীষণভাবে ভীত হতো বলে ছওবানুন বলা হতো । অতঃপর আল্লাহু তাআলা বললেন এখন তোমার লাঠিটি হাতে নেও আর তুমি একে ভয় করনো না । আমি একে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেব । হযরত মূসা (আঃ)কে দেওয়া আল্লাহু তাআলার দ্বিতীয় মু জেযা হল তার উজ্জ্বল হাত । ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে আল্লাহ্‌ তাআলা বললেন তোমার হাত বগলের নীচ রেখে যখন বের করবে তখন তা সূর্যের ন্যায় ঝলমল করতে থাকবে । স্বীয় রসূলকে দুটি বিরাট মুজেযার অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত করার পর আদেশ করা হয়েছে যে এখন উদ্ধত ফেরাউনকে ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্যে চলে যাও ।

তথ্য ইন্টারনেট থেকে গুটিয়ে গুটিয়ে খুঁজে বের করলাম ।





আপনার প্রেম ছিল শুদ্ধ


 আপনার সময় গুলো হয়ত ভালোই কাটছিল। হাতে বাদামের ঠোঙা আর এক চিমটে লবণ দিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রাতের বাক্যালাপ শেষ হতে না হতেই মিষ্টি সকাল উঁকি দিতো আপনার ব্যল্কনিতে বা ছোট্ট জানালায়। আপনার প্রেম ছিল শুদ্ধ।
হঠাৎ ভবিষ্যতের কিঞ্চিৎ পরিকল্পনা বা চিন্তা আপনার মাথায় এলো কিংবা আপনার স্বার্থে ডট পরিমাণ আঁচর লাগলো কিংবা যেকোনো পক্ষ থেকে আপনার উপর এলো প্রবল চাপ। আপনি দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন। ভবিষ্যৎ-পরিবার নিয়ে দিনরাত হাজারো চিন্তা করেও কোন কিনারা খুঁজে পেলেন না। বিচ্ছেদ ব্যতিত অন্য কোন সমাধান আপনার প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত নিউরণে ভর করল না। এবং আপনি তাই করলেন। আপনার প্রেম ছিল শুদ্ধ।
মেয়েটি অনেক চেষ্টা করল সবকিছু আগের মতো করে সাজাতে। কিন্তু পারল না। এভাবে চলল দু তিন মাস। আপনারও যে তার কথা মনে পড়ে না, তা না। কিন্তু আপনার প্রকোষ্ঠ যেন দড়ি দিয়ে বাধা, বাস্তবতার কুয়া'য় আপনি সাঁতার কাটছেন। এখন আপনিও তাকে চাইতে লাগলেন, অনুভব করতে লাগলেন আগের থেকে আরও বেশি মাত্রায়। তাকে ছাড়া আপনার দুনিয়াও এলোমেলো। এরকম ঝুলন্ত অবস্থায় চলল এক দের বছর। মেয়েটি সুন্দরী বলে তার কাছে প্রেমের প্রস্তাব আসা অব্যাহত থাকল বরাবরের মতই। তারও আপনার চুম্বকত্ব থেকে বেরিয়ে আসা দরকার বলে সে মনে করল। তাই শেষ পর্যন্ত সে একটি সম্পর্ক করেই ফেলল।
আর আপনি তাকে কোন এক সময় পাবার আশায় বা সকল সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় কোনমতে গড়িয়ে গড়িয়ে দিন কাটাতে লাগলেন। নতুন কোন সম্পর্কে আপনি জড়াতে পারলেন না কিংবা জড়ালেও পূর্ববর্তী জনের মুখায়ব আপনার চোখে ভেসে ওঠে সবসময়। আপনার প্রেম ছিল শুদ্ধ।
আপনি এখন মেয়েটাকে দোষারোপ করতে লাগলেন। আপনার ধারণা ছিল সেও হয়ত আপনার মতো প্রতি রাতে পুরনো স্মৃতি নিয়ে কবিতা লেখে। কিন্তু এখন আপনি বছর দুয়েক পর যখন জানতে পারলেন যে সে এখন অন্য কারও, তখন তাকে পতিতা বলতেও আপনি দ্বিধা বোধ করলেন না অথবা আপনার মুখে বিন্দু পরিমাণ আটকালো না। আপনি তাকে ঘৃণা করার চেষ্টা করতে লাগলেন। আপনার প্রেম ছিল শুদ্ধ।
এই ছিল আপনার প্রেম কাহিনী......

(এরকম, এভাবেই অসংখ্য প্রেমের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যায় একজনের একটি ভুল সিদ্ধান্তে। দুটি প্রকোষ্ঠই ঠিক থাকে। দুজনের প্রেমেই থাকে শুদ্ধতা। চলতে থাকে সব ঠিক ঠাক মতই। ছেলেটিরও ওই পর্যায়ে কোন দোষ থাকে না। তবুও কারও দোষ ধরতে গেলে বা দুজনের একজনকে দায়ী করতে গেলে সব দোষ ছেলের উপরই বর্তায়। স্বাভাবিক ব্যাপার।
তাই এরকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। ছেলেটি তা বুঝতে পারলেও অনেক দেরী হয়ে যায় তখন। ছেলেটির প্রেম শুদ্ধ থাকলেও সে ওই সময় বাস্তবতার কষাঘাতে কিচ্ছু করতে পারে না। কিচ্ছু না। ভবিষ্যতেও পারে না। যেটা পারে সেটা এখন শুধু ঘৃণা করার চেষ্টা। ঘৃণা করে বেঁচে থাকার চেষ্টা)

একটা ব্যবসার আইডিয়া বলি---


  একটি ব্যবসার আইডিয়া বলি। বিষয়টার সাথে "আর নিতে পারতেছি না" এমন একটা কষ্ট জড়িত। একটু ভনিতা করে ঘটনাটা বলি।

প্রায় আড়াইশো বছর আগে জেমস ওয়াট জলীয় বাষ্প দেখলেন। তিনি বুঝলেন, বাপরে বাষ্প'র এত ক্ষমতা! তিনি বাষ্প ইঞ্জিন বানায়ে ফেল্লেন। যার কল্যাণে শুরু হয়ে গেলো রেল গাড়ী সহ আরো হাজার রকমের মেশিনারিজ।
--- আর আমরা আড়াইশো বছর পর, ইঞ্জিন থেকে বাষ্প বের হইলে দার্শনিকের মত ভাবতে থাকি, বাষ্পটা বের হইতেছে কোন দিক দিয়া!

প্রায় দেড়শো বছর আগে লিংকন ভাবলেন, মানুষ কিভাবে মানুষের দাস হয়! তিনি আমেরিকায় দাস প্রথা বাতিল ঘোষণা করলেন।
--- আর আমরা দেড়শো বছর পর, বাসার জন্য কাজের লোক পাওয়া না গেলে ভাবি - সবাই এখন জমিদারের বাচ্চা হইয়া গেছে, বাসায় একটা কাজের লোক পাওয়া যায় না।

-০-

আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটার তার বাসার কাজের বাচ্চা মেয়েটাকে দাসী'র মত অত্যাচার করলেন। তিনি আমাদের জাতি'কে রিপ্রেজেন্ট ভালো ভাবেই করেছেন!

কয়দিন আগে দেখলাম, বাসার বড় মেয়ে গুড়া দুধ খেয়ে, দোষ দিলো বাসার বাচ্চা কাজের মেয়েটার। আর এই অমার্জণীয় অপরাধের কারনে ঐ পরিচিত সেই শাস্তিটা তাকে দেওয়া হইলো। খুন্তি গরম করে পিঠে ছেকা দেওয়া। বাড়ীওয়ালীর মনে হইলো, নাহ শাস্তিটা মন মত হয় নাই। বুদ্ধি করে তিনি ঐ কাজের শিশুটার হাতও ভেঙ্গে দিলেন।

ঘটনা আর বাড়ানোর দরকার নাই। এই ঘটনাগুলো আমাদের দৈনিক পত্রিকায় অনেকটা কমন ষ্ট্রাকচারে ছাপা হয়। এবার ব্যবসার আইডিয়াটা বলি।

বহু বছর আগে হুমায়ূন আহমেদের একটা নাটক ছিলো। কাজের বুয়া সাপ্লাই করার একটা কোম্পানী নিয়ে গল্প। বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজের বুয়া নেয়া হয়। তাদেরকে ট্রেনিং দেয়া হয়। বিষয়টা হাস্যকর ভাবেই তিনি বলেছিলেন নাটকে।

কিন্তু এত বছর পর, ঐ হাসির নাটকটিই আসলে এখন একটি ব্যবসা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এই ব্যবসায় শুধু যে টাকা ইনকাম হবে তা না। আরো যা যা হবে তা হইলো
- টাকা থাকলেও অনেক সময় কাজের বুয়া পাওয়া যায় না। এই সমস্যার সহজ সমাধান হবে।
- অথেনটিক একটা সোর্স থেকে মানুষজন কাজের বুয়া পাবে। চুরি করে ভেগে যাওয়া টাইপ কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকবে না।
- কাজের লোক দাসী না। তারা আপনার আমার মতই চাকরী করেন। এই সম্মানটা তারা পাবেন।
- কাজের লোকের উপর কোন অত্যাচার কেউ করার সাহস পাবে না। কারন তারা একটা কোম্পানীর এনলিষ্টেট এমপ্লয়ী থাকবেন। তার ভালো মন্দ সব কোম্পানী দেখবে।
- কাজের লোকেরা সপ্তাহে একদিন বা দুই দিন ছুটি পাবেন। ঐ দিনটা তিনি তার পরিবারকে দিতে পারবেন।

সিজোফ্রেনিয়াঃ একটি মানসিক ব্যাধি


মীরা এখন প্রায় প্রতি রাতেই ঘুমায়না। রাত তিনটার দিকে একটু ঝিমুনির মত আসে, কিন্তু ঘুম আসতে চায়না। গত্কাল রাতের কথা ভাবতেই, মীরার গাঁ কাঁটা দিলো। গত রাতে একটু ঝিমুনি আসছিলো, হঠাৎ দেখে সামনের চেয়ারটায় রফিক মামা বসে আছে, পায়ের কাছে পক করে পানের পিক ফেললো। ভালো করে চোখ খুলতেই রফিক মামা নেই। মীরা আর ঘুমাতেই পারেনি। সারা রাত বাতি জ্বেলে বসে ছিল।
রফিক মামা মীরার আপন মামা না মীরার মা রিনির লতা-পাতা সম্পর্কিত ভাই। উনি চার বছর আগে মারা যান। মীরার মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদের পর এই লোকের আনাগনা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। মায়ের সাথে রফিক মামার সম্পর্ক একটু বেশি তরল মনে হতে থাকে ওর। মীরাকে খুব স্নেহ করতেন “মা মনি” বলে ডাকতেন। তারপরেও লোকটাকে কেন যেন ওর সহ্য হতো না। পারিবারিকভাবে মীরার মা বিশাল সম্পত্তির অধিকারী হওয়ায় তাদের কখনও টাকার চিন্তা করতে হয়নি। তাই রিনির দিন কাল কাটতো সমাজ সেবা, সভা, সেমিনার-পার্টি নিয়ে। মাঝে মাঝে মীরার মনে হয় ওর বেকার বাপ নিরুদ্দেশ হয়ে বেঁচে গেছে।
রফিক মামা যেদিন মারা যান, মীরা একটুও কাঁদেনি। কারণ ঐ লোকটা যেদিন ওকে বাসায় একা পেয়ে বিছানার সাথে চেপে ধরেছিল, ওকে মাকড়শার মতো শুষে নিয়েছিল, ১২ বছরের মীরা কাউকে কিছু বলতে পারেনি।

এক মাস পর
রফিক মামা এখন খুব ঘন ঘন দেখা দিচ্ছেন। মীরা এখন প্রায়ই রফিক মামার কড়া জর্দার গন্ধ পায়। ওর এখন ঘুম আসেনা।

দুই মাস পরঃ
রিনার সময়ই হয়না মেয়ের সাথে দেখা করার। আজকে একটা বিশেষ দিন, আজ মীরার জন্মদিন, আজকের পুরো দিনটি সে মেয়ের সাথে কাটাবে। রিনা দরজায় নক করলো, ঠক ঠক ঠক, নাহ! কোনও সাড়া শব্দ নেই।দরজা একটু জোরে চাপ দিতেই খুলে গেলো।দরজার দিকে পিছন ফিরে মীরা বিছানায় বসা, চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে আছে। মায়ের ডাক শুনে মীরা ঘুরে তাকালো, মীরার ঠোঁটের কষ বেয়ে রক্ত ঝরছে। হাতে একটা মরা টিকটিকি।
রিনা আর কিছু দেখার মতো অবস্তায় থাকলেননা।

এত গেলো একজন মীরার কাহিনী, আমাদের আসে পাশে এরকম হাজারো মীরা আছে যাদের কাহিনী আমরা কখনই জানবোনা।

মীরা একটি মানসিক রোগের শিকার, এটিই সিজোফ্রেনিয়া। এটি কোন জীনে ধরা বা ভুতে পাওয়া না। আসুন জেনে নেই সিজোফ্রেনিয়া কি?

সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক ব্যাধি যা সাধারণত কৈশোর বা তরুণ বয়সে বেশি হয়, তবে এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া রোগীর হিস্ট্রি নিলে দেখা যায়, তাদের জীবনে এমন কোন ঘটনা আছে যা তাদের ক্রমাগত মানসিক যন্ত্রণা দেয় যা অন্যের সাথে শেয়ার করা যায় না।
যেসব বিষয় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। সেগুলি হচ্ছে,
১। মা-বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ।
২। একাকী বড় হয়ে উঠা।
৩। অল্প বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া।
৪। মাদকাশক্তি
৫।পরিবার কারো এই রোগ থাকা।
৬।অসামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠা।
৭। ছেলেবেলা থেকে ভুত, জীন সম্পর্কিত অস্বাভাবিক কাহিনী পরিবারের সদস্য দ্বারা শুনানো।

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ সমূহঃ
১। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী নিজের মধ্যে ভ্রান্ত বিশ্বাস লালন করে, অনেক সময় নিজেকে অস্বাভাবিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে।
২। কোন মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা বা দেখা যাদের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই, তাদের সাথে কথা বলা।
৩। অন্য কারো স্বরে কথা বলা, অনেকে মনে করেন তাদের মাথায় কেউ ঢুকে বসে আছে।(মাল্টিপল পারসোনালিটি)
৪। ঘর অন্ধকার করে থাকা, কারো সাথে না মিশা।
৫। ছন্ন ছাড়া কথাবার্তা।
৬। নিজেকে অন্য কেউ মনে করা।
৭। কারণ ছাড়া রেগে যাওয়া।
৮। নিজে্কে অন্য কোনো প্রাণী মনে করা ইত্যাদি।

সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মস্তিস্ক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন তাদের মস্তিস্কের গঠন সাধারণ মানুষ থেকে একটু আলাদা। মস্তিস্কের কুঠুরি গুলো সাধারণ মানুষের তুলনায় বড় এবং এতে কেমিক্যাল ইমব্যাল্যান্স দেখা যায়।

শুধু আমাদের দেশ না উন্নত বিশ্বের অনেক দেশই দুষ্ট আত্মা ছাড়ানোর নাম করে এসব রোগীদের ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।এরকম একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে “এক্সসরসিজম”। এতে অনেক সময় ভিকটিম মারা যায়। অবশ্য অনেক দেশেই এটি নিশিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশে এদের বলা হয় পাগল,জীনে ধরা। শিকল দিয়ে বেধে এদের চিকিৎসা করা হয়।

এধরনের মানসিক রোগে যারা আক্রান্ত তাদের সবথেকে বেশি প্রয়োজন পরিবারের ভালোবাসা। সঠিক চিকিৎসা ও কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে সিজোফ্রেনিয়া রোগী সুস্থ জীবন জাপন করতে পারেন।পীর-ফকির কবিরাজ না। একজন ডাক্তার, একজন ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট পারেন এসব রোগীকে সুস্থ-সুন্দর জীবন ফিরিয়ে দিতে।
জীনে ধরা বা ভুতে ধরা বলে কিছু নেই, প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসার আর প্রিয়জনের ভালোবাসার।

ইসরাঈলী জনগনের হাতে ইসরাঈলী খুন! অতঃপর...


 গত কয়েকদিন ধরেই ফিলিস্তিনী মুক্তিকামী জনতা এবং অবৈধ দখলদার ইসরাঈলীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে!আর এতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৬ জন ফিলিস্তিনি শাহাদত বরন করেছেন।
চলতি সপ্তাতে, দক্ষিন ইসরাঈলের ইরিত্রিয়ান এক ইহুদী যুবককে ভুল বশত, ফিলিস্তিনি মনে করে হত্যা করেছে ইসরাঈলীরা!এই যুবকের নাম হাফটম জারহুম।ইসরাঈলী জনগন তাকে ফিলিস্তিনী যোদ্ধা মনে করে,গনপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে।(আলহামদুলিল্লাহ)

একটি ঘটনা মনে পড়ে যায়!৬০ দশক এর সময়কার ঘটনা।তখন মিশরে উস্তাদ সাইয়্যেদ কুতুবকে ফাঁসি দিয়ে শহীদ করা হয়েছে।আর তার ছোট ভাই মুহাম্মাদ কুতুব এবং ছোট বোন হামিদা কুতুবকে মিশরের একটি কারাগারে বন্দি রাখা হয়।

মিশরের ইসলামপন্থিদেরকে মানষিকভাবে দুর্বল করতে, তৎকালীন মিশরীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শারাওয়ী জুমা নতুন একটি আইন করেন।ইসলামপন্থিরা কেউ কারো সঙ্গে দেখা করতে পারবে না।আর বাহির থেকে কোন ধরনের খাবার অথবা ফলমূল গ্রহন করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

এর কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ কুতুব জেল কতৃপক্ষের কাছে,বোনের সঙ্গে দেখা করবার অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত লিখেন।তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শারাওয়ী জুমা জবাবে বলেন,“জীবিত অথবা মৃত,কোন অবস্থাতেই তোমার বোনেক দেখতে পারবে না”।

এক বছর পর,হঠাৎ করে মিশরের সরকার পরিবর্তন হয়।আর সরকার পরিবর্তনের ফলে,মুহাম্মাদ কুতুব এবং বোন হামিদা কুতুব নিজেদেরকে কয়েদ মুক্ত রূপে আবিষ্কার করেন।আর পূর্ববর্তি সরকারের সকলকে জেলে বন্দি করা হয়।

জেলে বন্দি থাকাবস্থায় একদিন শারাওয়ী জুমা এর স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন।প্রহরী জুমার স্ত্রীকে তল্লাশী করে এবং তার কাছে কিছু ফল ও খাবার পায়।প্রহরী তাকে প্রশ্ন করে, এগুলো কার জন্য নিয়েছেন?তখন জুমার স্ত্রী বলেন,আমার স্বামী শারাওয়ী জুমার জন্য এই সামান্য ফল এবং খাবার এনেছি।তখন প্রহরী মুচকি হেসে বলেন,কয়েদিদের জন্য যেকোন ধরনের খাবার অথবা ফল দেয়া নিষিদ্ধ!

পরের জন্য গর্ত খঁড়লে সেগর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।আর জালিমকে নিজের জুলুমের আগুনেই জ্বলে মরতে হবে।আর আল্লাহপাক সে কথা কুরআনে ষ্পষ্ট করে বলেছেন এবং ইহুদীসহ জালেমদের সাবধান হতে বলেছেন।

“অতঃপর তোমারই পরষ্পর খুনাখনি করছ এবং তোমাদের একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করছ।তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে আক্রমন করছ।আর যদি তারাই কারো বন্দি হয়ে তোমাদের কাছে আসে,তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ।অথচ তাদের বহিষ্কার করাও তোমাদের জন্য অবৈধ।তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দাংশ বিশ্বাস কর আর কিয়দাংশ অবিশ্বাস কর?যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোন পথ নেই।কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে।আল্লাহ তোমাদের কাজ কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন”।[সূরা বাকারা-৮৫]

জুলুমকারীরা কখনো বিজয়ী হতে পারেনি,কখনো পারবেও না।সবশেষে মুক্তিকামী ফিলিস্তিনীদেরই জয় হবে, ইনশা আল্লাহ।

"মুসলিম বিশ্বে শিয়াদের অপতৎপরতা ও শিয়াদের রাজনৈতিক ভণ্ডামি।


 আসলে ঐতিহাসিক সত্য হলো, শিয়াদের কাছে নবী নন আলী (রা) বড়; মুসলমান নয় শিয়ারা বড়; মসজিদ নয় মাজার বড়! মানবতা নয় রাজনীতি বড়!

বুদ্ধিবয়স থেকেই দেখছি ইরান ইসরাইল ও পাশ্চাত্যকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ৷ দেখছি বরাবর ইরান সৌদির
সমালোচনা করছে ইসরাইলের সঙ্গে চোখ বুজে যুদ্ধে না নামায়৷ শুধু এ ভূমিকার জন্যও বহু মুসলিম না বুঝে
ইরানকে মুসলিমবিশ্বের মডেল ভাবেন৷অথচ ইসলামী ইতিহাস ও আকিদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রত্যেকেই জানেন এ তাদের ঐতিহাসিক কপটতাপূর্ণ কৌশলের অংশ মাত্র৷ পশ্চিমের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ কোনোদিনই হবে না৷ বুশ ইরান ও দক্ষিণ
কোরিয়াকে শয়তানের অক্ষশক্তি বলেছিলেন৷ তিনি দুই দফায় পূর্ণ মেয়াদ যুক্তরাষ্ট্র শাসনকালে খোঁড়া
অজুহাতে হামলা করেছেন আফগান ও ইরাকে৷ অশান্তির আগুনের পুড়িয়েছেন বহু মুসলিম দেশ৷ অথচ ইরানকে বহু হুমকি
দিলেও আক্রমণ করেননি৷ লোক দেখানো অর্থনৈতিক অবরোধেও ইরান দিব্যি এগিয়ে গেছে৷ ওবামাযুগে যুদ্ধখেলা বন্ধ৷ অতিসম্প্রতি
আমেরিকার সঙ্গে ইরানি ইশকে মৃদুমন্দ বাতাসও বইতে শুরু করেছে৷ সিয়িয়ায় সৌদির মিত্র হিসেবে আমেরিকার অবস্থান অসংখ্য মুসলিম হত্যাকারী শিয়া বাশারের বিপক্ষে৷ কিন্তু ইরানের প্রাণের মিত্র রাশিয়া দামেস্কে যখন যুদ্ধে জড়ালো সুন্নিদের
বিপক্ষে, তখন রসুনের কোয়াগুলো যথানিয়মেই এক হয়ে গেল৷ বাশার- ইরান-রাশিয়া সৌদি-সুন্নিদের মোকাবেলায় এক৷ সৌদির মিত্র
মার্কিন সেনারাও এদের দ্বারা আক্রান্ত হবার কথা৷ কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন, যুদ্ধক্ষেত্রে এরা মার্কিনিদের আক্রমণ করছে না! করবে না বলে
জানিয়েও দিয়েছে৷ এমনকি পরশু ওবামা স্বীকারই করেছেন বাশারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হয়নি!ইরান কখনো মুসলমানের ব্যথায় দুঃখিত হয়নি৷ দুখ পেয়েছে কেবল কোথাও
শিয়ারা আক্রান্ত হলে৷ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের ইয়ামানে হুথি শিয়াগোষ্ঠী বৈধ সুন্নি প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করল ইরানের মদদে৷ এতে কোনো দোষ খুঁজে পায়নি ইরান৷ অপরাধ দেখল কেবল অসহায় সুন্নিদের সাহায্যে সৌদির এগিয়ে আসায়৷ রেডিও তেহরান বাংলা ওয়েবে গিয়ে দেখুন ইয়ামানে সৌদিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে (?) তারা কত সোচ্চার৷ সৌদির চারপাশে শিয়া কর্তৃক সুন্নি নিধন চলছে৷ সিরিয়া,
লেবানন, ইয়ামানসহ সবখানে একই চিত্র৷
সাদ্দামের বিদায়ের পর ইরাকে চলছে নীরব সুন্নিনিধন৷ শিয়াদের ইরাকে এখন সুন্নিদের জীবন মরুভূমির বালুর চেয়েও
সস্তা৷ ঠিক ইরানের মতো৷ যেখানে সুন্নিদের ঠাঁই নেই৷ কিছু থাকলেও তারা বাধ্য শিয়া হতে নয়তো ঈমান
লুকিয়ে রাখতে৷ ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসের ইরাকে যেখানে যাকেই তারা পাচ্ছে উমর নামে,
নির্বিচারে হত্যা করছে৷ মা আয়েশা (রা)কে তাদের কথা মত গালি না দিলেও হত্যা-নির্যাতন করছে৷
শিয়াদের ঈমানের অংশ ইসলামের প্রথম দুই খলিফা, রাসূল (সা) এর দুই
শ্বশুর, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ দুই মহামানব আবু বকর ও উমর (রা)কে গালি দেয়া৷ তাঁদেরকে এবং তাদের হাতে
বায়াতকারী সকল সাহাবীকে কাফের (নাউযুবিল্লাহ) মনে করা৷ চলতি অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে জারজ রাষ্ট্র ইসরাইল নতুন করে
ফিলিস্তিনে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে৷ বরাবরের মতোই ওদের অজুহাত ঠুনকো,অসহায় ফিলিস্তিনিদের অস্ত্রও ইট-
পাথরের টুকরো এবং নীরব আন্তর্জাতিকবিশ্ব৷ প্রায় শতাব্দীকালের পীড়নে ফিলিস্তিনি নারী-শিশুরাও আর লুকিয়ে থাকতে
পারছে না৷ নিশ্চিত মৃত্যুকেও উপেক্ষা করে বুক সটান করে দাঁড়াচ্ছে অভিশপ্ত বর্বর ইহুদি সেনাদের বন্দুকের সামনে৷
বোরকা-হিজাব পরা বিদূষী ফিলিস্তিনি তরুণীরা যখন আধুনিক মারণাস্ত্রের মোকাবেলায় নামছে পাথর হাতে৷ মনে করিয়ে দিচ্ছে যখন
সারা পৃথিবীর সব মুসলিম পুরুষকে তাদের চুরি পরে ঘরে থাকার কথা, তখন সমরশক্তিতে আত্মগর্বী ইরান একটা
রুটি কি রাইফেলও এগিয়ে দিচ্ছে কুদুসবাসীর দিকে? যে ইরান অস্ত্র সরবরাহ করছে সিরিয়া, ইয়ামান,
লেবানন, ইরাকসহ তাবৎবিশ্বের শিয়ামিলিশিয়াদের তারা তো সামান্য অস্ত্রও সরবরাহ করছে না
ফিলিস্তিনিদের!

আসলে ঐতিহাসিক সত্য হলো,
শিয়াদের কাছে নবী নন আলী (রা) বড়;
মুসলমান নয়  শিয়ারা বড়; মসজিদ নয় মাজার বড়! মানবতা নয় রাজনীতি বড়!

মুল লেখকঃ- তরুণ তুর্কি, গবেষক আলেম, তারুণ্যের প্রতিক, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের সাব এডিটর মুহতারাম আলী হাসান তৈয়্যব সাহেব ।

ভালোবাসার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ ভালোবাসা বলতে কিছু নেই, সবই হরমোনের খেলা---


 একটি অনুভূতির কথা বলি, যে অনুভূতি সবাইকে প্রায় সমান ভাসবই নাড়া দেয়। এড়িয়ে যাবার উপায় নেই কারও। নাম তার ভালোবাসা। কেউ বৃক্ষ ভালোবাসে,কেউ জীব-জন্তু,কেউবা প্রকৃতি। জাগতিক সব ভালোবাসার উর্দ্ধে মা বাবার প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসার ব্যাপ্তি এতই বিশাল যে সারা জীবন ব্যয় করেও এর সীমা পরিসীমা নির্ধারণ করা কঠিন। তাই আমার লেখাতে মানব- মানবীর ভালবাসাকেই প্রাধন্য দিলাম।
ভালোবাসার সংজ্ঞা কি?এটা এক একজনের কাছে এক এক রকম। কেউবা এটাকে একজনের সাথে অন্য জনের মনের মিল বা টান বা অনুভূতি তেই সীমাবদ্ধ করেছে, কেউবা আবার এটাকে এক কাপ চায়ের সাথে তুলনা করেছে। কেউবা এটাকে গিভ অর টেকেন হিসাবে নিয়েছে। কেউবা এটাকে আত্মার টান বলে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ভালোবাসার চিরন্তন সংজ্ঞা দাড় করাতে পারেননি। কিন্তু বিজ্ঞান ? না বিজ্ঞানও ভালোবাসার কনো সংজ্ঞা দাড় করাতে পারেনি, কিন্তু দেখিয়েছে আসলে এটা একটা হরমোনের খেলা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইন্সিটিউট অফ হার্টম্যাথ টানা ২০ বছর ধরে গবেষণা করে দেখিয়েছে যে মানুষের হৃদয় থেকে একধরনের ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড নিগৃত হয়। কখনো কখনো মানুষের শরীরের চতুর্দিকে কয়েক ফুট পর্যন্ত এই তড়িৎ চিহ্নের রেশ পাওয়া যায়। এর সীমানা নির্ভর করে আবেগের ধরনের উপর। স্বাভাবিক ভাবে দেখা যায় যে প্রেমে পড়লে মানুষের গাল লাল হয়ে যায়,হাতের তালু ঘামতে থাকে,হৃদ পন্দনের গতি বেড়ে যায় এইসব দৃশ্যমান লক্ষণ।কিন্তু বিজ্ঞানীদের নজর আরও গভীরে। তাতে দেখা গেছে এমন অবস্তাতে মানুষের শরীরের গভীরে বেশ কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন আসে । আর এতে কলকাঠি নাড়ে কয়েক ধরনের হরমোন।
প্রেমের প্রথম ধাপ হচ্ছে লালসা । প্রেমে পড়ার সাথে সাথে টেক্সঅরেন আর অক্সসফরেন নামের দুইটি হরমোন সামনা সামনি চলে আসে।আর এই দুইটি হরমোন মানুষকে এমন ভাবে তাড়িত করে যাকে এক কথায় লালসা বলা যায়। এর প্রভাবে মানুষ মরিয়া আচারন করতে পারে। এটা মহানুভাবিতা হতে পারে আবার হিংস্রতাও হতে পারে।
প্রেমের দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে আকর্ষণ। এ পর্যায়ে সামনে চলে আসে মনোমায়িন নামের একগুচ্ছ স্নায়ু কোষ। এর একটি ডপামিয়ন। অবাক ব্যাপার হলো কোকেন বা নিকোটিন নিলে এই হরমোন যেমন সাড়া দেয় তেমন প্রেমে পরলেও একই ভাবে সাড়া দেয়। এরপর বলায় যেতে পারে যে প্রেমে পড়াটা একধরণের নেশায় আসক্ত হয়ে যাবার মতো। এডরানালিনেরও ভূমিকা আছে তবে সেরটারিনেরও কথা বলতে হবে। এই হরমোনের প্রভাবে মানুষ সাময়িক ভাবে প্রকৃত অর্থে পাগলও হয়ে যেতে পারে।
প্রেমের তৃতীয় ধাপ সম্পৃক্ততা। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে,মানুষ কখনো আকর্ষণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না । এই ধাপে এসে মানুষ বিয়ে থেকে সংসার পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে। তবে এই স্বপ্নের স্থায়িত্ব হবার জন্য দুটি হরমোনের কৃতিত্ব দিতেই হয়। এর একটা হপক্সিডিন আর অন্যটি অক্সডিটিন। যার ফলে মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক বা বাঁধন তৈরি হয়। প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষ জীন ধারাও প্রভাবিত হয় । তবে একটা কথা না বললেই নয় ,এক গবেষণায় দেখা গেছে যে অসুস্থতায় মানুষের ব্রেন যেমন কাজ করে,প্রেমে পড়ার ফলে মানুষের ব্রেন একই ভাবে কাজ করে।
বিজ্ঞান উৎকর্ষতার এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে জীনের তথ্য বিশ্লেষণ করে নাকি বলা যায় করোর সাথে কারোর সম্পর্ক স্থায়ী হবে কি হবে না। প্রেমের ফলে ট্রয় নগরী ধ্বংস থেকে শুরু করে মানব সভ্যতা সৃষ্টির নিদর্শনও কম নয়। পরিশেষে বলতে চাই হরমোনের এই খেলায় বোধ করি মানুষের আনন্দটুকুও কম নয়। তাই বেঁচে থাক প্রেম বেঁচে থাক ভালোবাসা।

Tuesday, October 20, 2015

মুসলমানরা ব্রিটিশ কলোনিয়াল প্রিয়ডকে অপছন্দ করতো!


কয়েকদিন আগে মীর জাফরকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম
এটা ঠিক মুসলমানদের মধ্যে সবাই মীর জাফর নামক ব্যক্তিকে পছন্দ করে না
তাই বাংলাদেশ-ভারতের মুসলমানরা কখনই এই নামে তার সন্তানের নাম রাখে না।
এ বিষয় থেকে এটাও প্রমাণিত হয় এ অঞ্চলের মুসলমানরা ব্রিটিশ কলোনিয়াল প্রিয়ডকে অপছন্দ করতো এবং যারা সেই সময় মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশ দালালি করেছে তাদেরও তারা অপছন্দ করতো এবং এখনও করে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কখন সেটা করতে দেখিনি। তারা যেন ব্রিটিশদেরকেই জানে প্রাণে ভালোবেসে ফেলেছে। যেমন ধরুন, দূর্গা পূজার ক্ষেত্রে। শারদীয় দূর্গা পূজার চালু করেছিলো ‘নবকৃষ্ণ’ নামক এক ব্রিটিশ দালাল, যে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা অস্ত যাওয়ার খুশিতে ব্রিটিশদের সংবর্ধনা দিতে শরৎ মাসে দূর্গা পূজা শুরু করে (https://goo.gl/2lXIPV)।
বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন,
মুসলিমরা যেখানে মীর জাফর নামটা পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতার কারণে রাখে না, সেখানে হিন্দুরা বিশ্বাসঘাতকের অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় রীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে !!!
সত্যিই অবাক !!
আসলে এখানে একটা গোপন সত্য লুকিয়ে আছে। মূলতঃ এ উপমহাদেশে হিন্দু নামে কোন ধর্মের অস্তিত্ব কখনই ছিলো না, ছিলো হিন্দু নামে একট সভ্যতাহীন পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের বসবাস। যদি হিন্দু নামে কোন নির্দ্দিষ্ট ধর্ম থাকতো, তবে সবাই একজনের পুজা করতো, একেক এলাকায় একেক দেব-দেবীর পূজা করতো না।
ব্রিটিশরা যখন এ এলাকায় আসলো তখন তারা দেখলো, মুসলিমরা হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাসনব্যবস্থায় এক উন্নত জাতি এবং হিন্দুরা হচ্ছে তার সম্পূর্ণ উল্টো। ব্রিটিশরা তাই প্র্রথমে চাইলো মুসলমানদের থেকে প্রশাসন চালানোর শিক্ষাটা শিখে নিতে। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন- মুসলমানদের প্রশাসন চালানোর যোগ্যতা সেই শুরু থেকেই ছিলো অত্যাধুনিক। এ শিক্ষাটিতে মুসলমানদের ধারে কাছেও কখন কোন জাতি সেই সময় যেতে পারেনি। বর্তমানে আধুনিক শহর, ভূমি ও প্রশাসন চালানোর সিস্টেমের পুরোটাই মুসলিমদের দান (বিস্তারিত পড়তে- http://goo.gl/JrLyY3)। অন্য সম্প্রদায় মুসলিমদের থেকে ঐ শিক্ষাটা গ্রহনের জন্য সব সময় উদগ্রিব হয়ে থাকতো।
এজন্য ব্রিটিশরা ভেবেছিলো তারা মুসলিমদের থেকে প্রশাসন চালানো প্রথমে শিখে নিবে এবং পরে কাজে লাগাবে, অন্যদিকে হিন্দু নামক অনুন্নত সম্প্রদায়টিকে কৌশলে কনর্ভাট করে তাদের ধর্মভূক্ত করে নিবে। এজন্য তারা কৌশলে সৃষ্টি করলো ব্রাহ্ম সমাজ(http://goo.gl/D4vY76) । এই সমাজের অন্তর্ভূক্তরা উপর দিয়ে হিন্দু হতো, কিন্তু ভেতর দিয়ে ১০০ ভাগ খ্রিস্টান হয়ে যেতো।
কিন্তু কালক্রমে ব্রিটিশরা একটা জিনিস অনুধাবন করতে পারলো, এ অঞ্চলে মুসলিমদের অবস্থান খর্ব করা তাদের মত বিদেশীদের পক্ষে কখণই সম্ভব নয়, এটা সম্ভব কেবল এ অঞ্চলে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষেই, কারণ তাদের পথঘাট ও সংস্কৃতি সবাই জানা। তাই হিন্দু নামক সম্প্রদায়টিকে যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া যায়, তবে মুসলিমদের দমানো সম্ভব। কিন্তু হিন্দু তো কোন ধর্ম ছিলো না, ছিলো সম্প্রদায়। তাই ব্রিটিশরা ‘হিন্দু’ নামক বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়টিকে এক করে ‘হিন্দু’ নামক ধর্মের জন্ম দিতে চাইলো। এজন্য তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে শ্লোক একত্র করে হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করলো, ফলে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলো ঐ গ্রন্থঅনুসারে একত্র হয়ে জন্ম হলো ‘হিন্দু’ নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর।
---------------------------------------------------------------------------------
১) ১৭৭৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দ্বারা ‘গীতা’ নামক গ্রন্থটির জন্ম হয়। (http://goo.gl/aczMVg, https://goo.gl/HFyk7I)
২) ঋগ্বেদ (বেদ চার প্রকার তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হচ্ছে ঋগবেদ)
বর্তমান রূপ লাভ করেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারের দ্বারা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ম্যাক্স মুলার ৪০ বছরের অধিক সময় নিয়েছিল ঋগ্বেদ প্রকাশের জন্য। (https://goo.gl/6YhQV5)
-----------------------------------------------------------------------------------
শুধু ধর্ম নয়, হিন্দুদের রক্তের মধ্যেও রয়েছে ব্রিটিশ অবদান। আইন বলছে, হিন্দু দুই প্রকার-
১) হিন্দু বাবা-মা’র ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান
২) খ্রিষ্টান বাবার ঔরসে, এবং হিন্দু মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান, যে মায়ের কাছে প্রতিপালিত হয়েছে। (হিন্দু আইন দেখতে পিডিএফ - https://goo.gl/8Y0cYJ)
দ্বিতীয় আইনটি ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ ভারতে পাশ হয়। এ আইনের রহস্য ঐ সময় হিন্দু নারীদের গর্ভে বিপুল পরিমানে ব্রিটিশ সৈন্যদের জারজ জন্ম নিতো। এ সংখ্যাটা এতটাই বেশি যে, সে বিপুল সংখ্যক শিশুদের ব্যবস্থা করা ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলো না। ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে এই আইনটি পাশ করে, যেন জারজ সন্তানগুলোতে ব্রিটেনে না নিয়ে যেতো হয়, তারা যেন ভারতেই থাকে।
তাই স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, বর্তমান হিন্দুদের মধ্যে একটি বড় অংশ হচ্ছে ব্রির্টিশদের থেকে আগত তথা ব্রিটিশদের জারজ।
সত্যিই বলতে বর্তমান হিন্দু সমাজ অনেক দিক থেকেই ব্রিটিশদের কাছে কৃতজ্ঞ। এবং সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থেই ব্রিটিশদের দানগুলো (যেমন দূর্গা পূজা) খুশি মনে গ্রহণ করে থাকে হিন্দু সম্প্রদায়, যা অস্বীকার করার কোনই উপায় নেই।

আপনি আস্তিকঃ-


আপনি আস্তিক, আপনি আপনার চিন্তা ধারণা কে সঠিক মনে করেন।আপনি আপনার মতবাদ রাষ্ট্র বেবস্তায় আনতে চান। আপনি ইশ্বরের করুনার জন্য মানুষ মারতে চান। আপনি সমাজ বেবস্তায় আপনার মতবাদ চালু করতে চান ।
কিন্তু আপনি যে নিজের চিন্তা ধারণা কে সঠিক মনে করছেন তার জন্য কি আপনি পর্যাপ্ত পরিমান পড়াশুনা করেছেন? আমরা জানি যে যে যত বেশি পড়বে তার নির্ভুলতার পরিমান তত বাড়বে।
আপনি দর্শনের ঈশ্বর সম্পর্কিত সমসসা পড়েছেন? আপনি কি সমাজবিজ্ঞানের ধর্মের উত্পত্তি সম্পর্কিত মতবাদ গুলো পড়েছেন? আপনি কি জীববিজ্ঞানের বিবর্তন পড়েছেন? আপনি কি পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্রিং তত্ত্ব, কোয়ান্টাম পদার্থ বিজ্ঞান, বিগ্বাং, inflation theory, m- theory ইত্যাদি পড়েছেন?
আপনি যদি মনে করেন যে ওগুলো নাস্তিকদের বই তাই ওগুলো ভুল, এগুলো পরার দরকার নাই, তাহলে কি আপনি সঠিক কথা বললেন? ওগুলো যদি ভুল হয় তাহলে তো আপনার জন্য ইশ্বরের করুণা পাওয়ার একটা বিরাট সুযুগ - যে করুণা পাবার জন্য আপনি হাজার হাজার মানুষ নির্দিদায় মারতে পারেন। আপনি ওগুলো পড়ে ওগুলো ভুল ধরে যদি প্রচার করেন তাহলে তো দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ আপনার লেখা পড়ে ধার্মিক হবে। উপরিউক্ত বিষয় গুলোর কথাও ঈশ্বর কে পাওয়া যায় নাই। আপনি যদি ভুল ধরে ঈশ্বর কে প্রমান করেন তাহলে কোটি কোটি মানুষ মুহুর্তের মধ্যে ধার্মিক হয়ে যাবে। এই বিরাট সুযুগ আপনি হারাবেন কেন? আর আপনি তো মানুষ কে ধার্মিক বানাইয়া মানুষের উপরকার করতে চান। তা করার জন্য ও আপনার ওগুলো পড়ার দরকার ও তাদের ভুল গুলো প্রচার করার দরকার।
আবার আপনি যদি মনে করেন যে আপনি ওগুলো জানেন ভালো কথা। কিন্তু আপনি জানেন বলিয়া যদি বলেন যে "বিবর্তন একটা তত্ত্ব" বা "বানর থেকে মানুষ হয়েছে" বা "বানর থেকে মানুষ হলে কেন আমরা একটা বানর থেকে মানুষ হতে দেখিনা" তাহলে কি তার মানে হবে যে আপনি ওগুলো জানেন? এগুলো তো প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশ্ন যা একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চাকে বিবর্তন নিয়া বললে প্রথম যে প্রশ্ন গুলো সে করবে এগুলো সেই প্রশ্ন। আপনি কোনো বেপারে জানার পর নিশ্চয় প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশ্ন করতেন না।
আমাদের বাস্তব জীবনে যখনি আমরা কোনো কিছু নিয়া চিন্তা করি বা পরি তখনি নতুন কিছু জানি যা আগে আমরা জানতাম না। অতচ না জানার আগে আমরা মনে করি যে আমরা সবকিছু বুজি। ইটা সাভাবিক। আপনি যদি ওই বিষয়গুলো পরেন দেখবেন আপনি এমন কিছু জানবেন বা বুজবেন যা আগে চিন্তাও করেন নাই। পরার পর যদি মনে করেন যে ওগুলো ভুল আপনি ভুল ধরে প্রচার করুন।
কোয়ান্টাম এর একটা ঘটনা উল্লেখ করি, দেখেন আপনি যদি কোয়ান্টাম না পরে থাকেন তাহলে ইটা কি আপনার কল্পনাকে ও হার মানে না? যা আপনি না পড়লে জানতেন না।
আপনি স্কুল থেকে বাড়ি যেতে পারেন দুইটা রাস্তা দিয়া। আপনি কি একই সময়ে দুইটা রাস্তা বেবহার করে বাড়ি যেতে পারবেন? সাধারণ বিজ্ঞান অনুসারে সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু কোয়ান্টাম এ একটা ইলেক্ট্রন একই সাথে অনেকগুলো পথ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে পারে।
আপনি মনে করেন আপনি নাস্তিকের চাইতে বেশি জানেন। জানার জন্য দরকার পরা।যে যত বেশি পড়বে সে তত বেশি জানবে - এটাই সাভাবিক। একজন নাস্তিক ধর্ম ও বিজ্ঞান পড়ে নাস্তিক হয়। আর আপনি যদি শুধু ধর্ম পরে (বেশিরভাগ আস্তিক কিন্তু ধর্ম ও পরে না) মনে করেন আপনি বেশি জানেন সেটা কিভাবে সম্ভব হবে?

Saturday, October 17, 2015

আত্মহত্যা নামক বিষবৃক্ষ এবং প্রতিকার-প্রতিরোধে করণীয়


(১)
সময় যতই গড়াচ্ছে, সভ্যতা ততই এগোচ্ছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রার এই মাহেন্দ্রক্ষণেও এমন কিছু অসংগতি, ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে যায় প্রতিনিয়ত, যা সভ্যতার উৎকর্ষতাকে পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশেই ম্লান করে দেয়; ভূকম্পনের মতো নিমেষেই আমাদের মানবিক ভিতটিকে কাঁপিয়ে দেয়। আর সেগুলোর মধ্যকার আত্মহত্যা নামক অশুভ অভিশাপটি অন্যতম, যা আমাদের সামাজিক বিপর্যয়কে শক্তভাবে তোলে ধরে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বর্তমান সময়টাতে আত্মহত্যা ক্যান্সারের চেয়েও মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। ক্যান্সারে মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক ও পীড়াদায়ক হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেটাকে মেনে নিতে পারা যায়, কিন্তু আত্মহনন নামক বিষাক্ত নাগিণীর ছোবলে অকালে ফুরিয়ে যাওয়া প্রাণগুলোর ক্ষেত্রে কোনোভাবেই মানতে পারা যায় না। এটা নিছক কোনো দুর্ঘটনা কিংবা অপমৃত্যু নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে অসংখ্য কারণ ও মোটিভ।

বাংলাদেশে প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপান করে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে। আর প্রতিদিন করছে প্রায় ২৮ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৪ সালের প্রথম সাতমাসে ৬ হাজার ৪৯২ জন, ২০১৩ সালে ১০ হাজার ১২৬ জন, ২০১২ সালে ১০ হাজার ১০৫ জন, ২০১১ সালে ৯ হাজার ৬৩২ জন লোক ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপানে আত্মহত্যা করেছে অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সালের প্রথম সাত মাস পর্যন্ত ৩০ হাজার ১৪৮ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, যাদের বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং সিংহভাগই নারী।

চলতি বছরেও আত্মহত্যার পরিমাণ পূর্বেকার বিপৎজনক মাত্রা-ই রয়েছে এবং ৬৫ লাখ মানুষ বর্তমানে আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাথে আরেকটি দুঃসংবাদও যুক্ত হয়েছে তাতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার(ডব্লিউএইচও) জরিপে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০তম যা ২০১২ সালে ৩৪তম অবস্থানে ছিল। শুধু তাই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার(ডব্লিউএইচও) আরও একটি গবেষণা অনুসারে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবে এবং আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবে এরও ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ। (তথ্যসূত্রঃদৈনিক সমকাল)

উল্লেখ্য, সারা বিশ্বব্যাপি বছরে যতগুলো লোক আত্মহননকে বেছে নিচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছে ২.০৬% ।

কতোটা ভয়াবহ ও সাংঘাতিক!সংবাদটি মোটেই শুধু আমাদের জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্যই সুখকর নয়। আমরা প্রতিনিয়ত বাঁচার জন্য সংগ্রাম করি, জীবনসীমাকে একটি মিনিট বর্ধিত করবার জন্য কতো চেষ্টা, তদবির, আকাঙ্ক্ষাই না করি ! কিন্তু আমাদের মাঝে এমন অসংখ্য লোক রয়েছে, যারা জীবনটাকে বিরক্তিকর, তুচ্ছ জ্ঞান করে স্বইচ্ছায় পাড়ি জমায় অনন্তলোকে। তাদের ধরণীমাতার রূপ, রস, গন্ধ, স্নেহ, মোহ কোনোটাই আকৃষ্ট করতে পারে না। তারা অবলীলায় চলে যায় নীরবে-নিভৃতে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে সীমাহীন অসীম গন্তব্যে।

কিন্তু কেনো?

গবেষণায় উঠে এসেছে, আত্মহত্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—-হতাশা, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, প্রতারণা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দাম্পত্যকলহ, নারীর অপ্রত্যাশিত গর্ভবতী হওয়া, দারিদ্র ও বেকারত্ব, প্রেম ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, মানসিক অসুস্থতা, জটিল শারীরিক রোগ- যন্ত্রণা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা।

(২)
বাংলাদেশে যে হারে আত্মহত্যার পরিমাণ ও প্রবণতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বিষয়টিকে মোটেই অগ্রাহ্য কিংবা হালকাভাবে নেয়ার কোনো অবকাশ নেই। চোখের সামনে নিভৃতে ঝরে যাওয়া সদ্য ফোটা প্রাণগুলো ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকাও উচিত নয়। নির্মম, পীড়াদায়ক আত্মহত্যার ভয়াল থাবা হতে শুভ্র প্রাণগুলোকে রক্ষা করার দায়িত্ব গোটা সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমগ্র জাতিকেই নিতে হবে। কেননা একটি আত্মহত্যা শুধু একটি জীবনকেই নষ্ট করে না, বরং প্রতিটি আত্মহত্যার বিরূপ প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় গোটা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং কি পুরো রাষ্ট্রকেই। কারণ রাষ্টের মূল সম্পদ জনসমষ্টি।আর এক একটি জীবন অকালে ঝরে যাওয়া মানে, এক একটি অমূল্য সম্ভাবনা ঝরে যাওয়া। বিষয়টিকে মাথায় রেখেই অভিশপ্ত এই পথ থেকে দেশের নারী-পুরুষকে বিচ্যুত করার সমাধান এখনি খুঁজতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুভার্গ্যের বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত আত্মহত্যা নামক প্রেতাত্মার প্রভাবে লাশের মিছিল ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও আমাদেন যেনো টনক মোটেই নড়ছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রও এক্ষেত্রে পুরোপুরি উদাসীন। গতকালও(৭ই অক্টোবর) রাজধানীতে বউকে না পেয়ে শ্বশুড়ের প্ররোচনায় মুরাদ চৌধুরী নামে এক কলেজ ছাত্র ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। তাছাড়া বখাটেদের উৎপাতে নিষ্পাপ তরুণীরা যখন আত্মহননকে আলিঙ্গন করে, তখন ক’জন দোষীর শাস্তি হয় অভাগা এই দেশে ! ক’জন এমপি, মন্ত্রী, রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব শোকাহত হন এতে? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কী শোকাহত হন কখনো? আমাদের ঔদাসীন্য আর দায়িত্বহীনতার কারণে আত্মহত্যার পথ কেউ বেছে নিলে, আমরা কেউ-ই তার দায় এড়াতে পারি না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও সেটা পারেন না, এমন কি সমগ্র বিশ্বের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থমস্তিস্ক সম্পন্ন জীবিত মানুষই তা পারে না। আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যতো হ্রাস পাবে, প্ররোচনাকারীদের উৎসাহ ততো বৃদ্ধি পাবে। আমরা ক’জন নির্যাতনকারীকে, ক’জন প্ররোচনাকারীকে উপযুক্ত দন্ড দান করতে পেরেছি? স্পষ্ট ভাষায় জোর গলায় বলা যায়, একটিও না। কিন্তু কেনো? আমরা কী তাহলে ঔ সমস্ত পিশাচদের হয়ে দালালি করি, যারা নিষ্পাপ মানুষদের হত্যার জন্য দায়ী? বিষয়টি এখনি ভাবা উচিত। তা না হলে হয়তো একসময় গোটা সমাজব্যবস্থাই ধসে যাবে।

(৩)
আত্মহত্যার প্রধান কারণগুলোর বিপরীতে জোরালো সমাধান খোঁজা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশের দেয়া তথ্যানুসারে, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যকার ৬০ শতাংশই নারী, যাদের আত্মহত্যার মূল কারণ হচ্ছে নির্যাতন, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, ইভটিজিং, অপ্রত্যাশিত গর্ভবতী হওয়া, দাম্পত্যকলহ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি।বাংলাদেশে নারীদের উপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন এক রকম ঐতিহ্য বা প্রথায় রূপ নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে নারীরা আশংকাজনকহারে আত্মহননকে বেছে নিচ্ছে। পাশা-পাশি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাও এক্ষেত্রে এনজাইমের মতো কাজ করছে। নারীদের আত্মহত্যার ভয়াল গ্রাস হতে রক্ষা করতে হলে সমস্ত রকমের নির্যাতন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে নির্যাতনকারীদের বা উত্ত্যক্তকারীদের কঠোরতম শাস্তি সুনিশ্চিত করা, নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে আত্মহননকে অনেকাংশে রুখে দেয়া সম্ভব। পাশা-পাশি নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অত্যন্ত জোরদার করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মকান্ডগুলোকে বিস্তৃত করা উচিত। পুরুষদের আত্মহননের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—হতাশা, বেকারত্ব, প্রেম ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা। এক্ষেত্রে বেকার যুবকদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান প্রদান, মানসিক ট্রিটমেন্ট ও সচেতনতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিতে হবে। মনোরোগবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহননকারীদের মধ্যকার ৯৫ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের জেলা অথবা উপজেলা পর্যায়ে মানসিক রোগের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। আরো দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সরকারি হিসেবে দেশে মাত্র ২০০ জন মানসিক রোগের চিকিৎসক রয়েছে। মাত্র ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা করা হয়। (তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সমকাল)

বিষয়টি একই সাথে দুর্ভাগ্যের ও লজ্জারই বটে! আত্মহননকে রুখে দিতে হলে জেলা, উপজেলা এমন কি ইউনিয়ন পর্যায়ে মানসিক রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজেও এ সুব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং পর্যাপ্ত মানসিক রোগের চিকিৎসক নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বিশ্বে সম্ভাব্য আত্মহননকারীকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ঘৃণ্য এ পথ হতে বিচ্যুত করা হয়। কারণ আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করা হলে তাকে বাঁচানো সম্ভব। আমাদের দেশেও যদি কাউন্সেলিং কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়, তবে আত্মহননকে অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশা-পাশি আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতাও রোধ করতে হবে। ধর্মীয় দিক থেকেও আত্মহত্যাকে মহাপাপ বা কবিরা গুনাহ্ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে, এ বিষয়টিও সবার মাঝে ছড়িতে দিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ হওয়ায় এটি অসাধারণভাবে কাজ করবে। মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় বক্তাগণ এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। সেইসাথে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টাকারীকে সর্বোচ্চ এক বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড দেবার যে বিধান রয়েছে, সেটিকেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। আর সরকারকেও হতে হবে এ ব্যাপারে পুরোপুরি আন্তরিক।

নোবেল পুরস্কার এবং আমার অনিয়ত ভাবনা



এবারের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। একটি হল পদার্থ বিজ্ঞানে, নীল এলইডি (LED) বাতি আবিষ্কারের জন্য নাগয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসামু আকাসাকি, হিরোশি আমানো এবং বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারা ক্যাম্পাসের অধ্যাপক শুজি নাকামুরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যেই পত্রপত্রিকা থেকে নীল এলইডি বাতির প্রয়োগের ব্যাপারটা জেনে গেছেন।
এর মধ্যে যদি না জেনে থাকেন, তবে আমি বলব রাগিবের খুব সহজ সরল কিন্তু কাজের একটি লেখা থেকে জানুন। প্রিয় লেখক রাগিব হাসান চমৎকার একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফেসবুকে। তার কথা উদ্ধৃত করেই বলি:
‘‘খুব কাছ থেকে দেখা এমন একজন বিজ্ঞানী ছিলেন আমার পিএইচ-ডি’র সময়কার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এট আরবানা শ্যাম্পেইনের নিক হলোনিয়াক। তিনি ছিলেন লাইট এমিটিং ডায়োড (LED) এর আবিষ্কর্তা। নোবেল বাদে সব পুরস্কার পেয়েছেন, এটাই খালি বাকি। তাই অক্টোবর এলেই ধরা হয় উনি পাবেন হয়তো। কিন্তু এখনও এবারেও তার ভাগ্যে সেটা জুটল না। কিন্তু জুটেছে নীল রঙের এলইডি বাতির আবিষ্কারক তিনজনের কপালে।
এলইডি বাল্বের নানা সুবিধা আছে, খুব ছোট, অনেক কম বিদ্যুৎ খরচ, আর আলো অনেক বেশি। কিন্তু নব্বইএর দশক পর্যন্ত ত্রিশ বছর ধরে গবেষণা করেও কেউ নীল এলইডি বানাতে পারেননি, কেবল লাল-সবুজই হত। ফলে বাসায় ব্যবহার করার মতো সাদা আলোর জন্য এলইডি বানাতে পারেননি কেউ। অনেকে তো এটাকে রীতিমতো অসম্ভব বলে রায় দিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু জাপানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন বিজ্ঞানী নব্বইএর দশকের শুরুতে অনেক খেটেখুটে নীল এলইডি বাতি বানাবার কৌশল বের করলেন। তবে সেটা ঠিক সস্তায় সহজে বানানো যায় না। এগিয়ে এলেন এক ছোট্ট ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির একজন প্রকৌশলী। বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা ‘এইটা করা সম্ভব নয়’ বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার তোয়াক্কা না করে তিনি বানিয়ে ফেললেন খুব সস্তায় নীল এলিইডি বাতি। সবগুলা প্রাথমিক রঙ দিয়ে সাদা আলোর বাল্ব বানাতে আর বাধা রইল না।
সেই নীল এলইডি বাতির জয়জয়কার তখন থেকেই, সেটা নীল লেজার বানাতে, ব্লু রে ডিভিডি বানাতে, কিংবা অন্য নানা কাজে। আজকের এলইডি টিভি থেকে শুরু করে এলইডি বাল্ব, সেগুলার কোনোটাই সম্ভব হত না, যদি এই দুইজন বিজ্ঞানী আর এক প্রকৌশলী তাদের স্বপ্ন থেকে যেতেন পিছিয়ে, ‘বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞ’দের কথা বিশ্বাস করে এই কাজ করা অসম্ভব, তা ভেবে বসতেন।
অসম্ভবকে সম্ভব করাই, আপনার, আমার, মানুষের কাজ।”
LED টিভি থেকে শুরু করে LED বাল্ব, কোনোটাই সম্ভব হত না, যদি দুই বিজ্ঞানী আর এক প্রকৌশলী স্বপ্ন থেকে যেতেন পিছিয়ে।


পদার্থ বিজ্ঞানের এই খবরের বাইরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংবাদ হল, এবার মেডিকেলে নোবেল পেয়েছেন তিনজন নিউরোসায়েন্টিস্ট– জন ও’কিফ, মে-ব্রিট মোসার ও অ্যাডভার্ড আই মোসার। এদের দুইজন নরওয়েজীয় বিজ্ঞানী (মে-ব্রিট ও অ্যাডভার্ড আই মোসার আসলে দম্পতি) এবং অন্যজন (জন ওকিফ) ইংল্যান্ডে কর্মরত আমেরিকান বিজ্ঞানী।
সিএনএনএর রিপোর্ট থেকে জানলাম, তিন বিজ্ঞানী মস্তিষ্কে কিছু কোষ শনাক্ত করেছেন, সেগুলির মাধ্যমেই নাকি আমাদের ‘ইনার জিপিএস’ গঠিত হয়। অর্থাৎ, আমরা কোথায় আছি, কী করছি, কোথায় চলেছি– আবিষ্কৃত এই কোষগুলির কাজের মাধ্যমেই নাকি তা নির্ধারিত হয়। এর ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্ল্যানিংএ সুবিধা হয়। আমার মাথায় এই কোষগুলো একটু কম আছে বলে আমার স্ত্রীর ধারণা। অবশ্য আমার প্ল্যানিংএর যে ছিরি তা দেখে এই সিদ্ধান্তে আসতে কারও আইনস্টাইন হওয়া লাগে না।
যা হোক, নোবেল পাওয়া এই তিনজন বিজ্ঞানীর কাছ থেকে আলঝেইমার্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাজকর্মও বোঝা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। এখানে বলে রাখি, আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায় ক্ষেত্রেই কোথায় আছেন বা কী করছেন তা যে বুঝতে পারেন না হয়তো তার কারণ, তাঁদের মস্তিষ্কের এই জায়গাগুলোই বিনষ্ট হয় আগে। কে জানে!
এটি সত্য হলে এই তিন গবেষকের আবিষ্কার এবং কাজ হয়তো ভবিষ্যতে আলঝেইমার্সের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

এবারে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন ফরাসি লেখক প্যাট্রিক মোদিয়ানো। আমি ভদ্রলোকের কোনো বই পড়িনি, পুরস্কার পাওয়ার আগে তাঁর নামও শুনিনি। আমি সাহিত্যের মানুষ নই, বিজ্ঞান এবং দর্শনের জগতেই আমার পদচারণা বেশি। তাই আমার সাহিত্যের জ্ঞানশূন্যতার বিষয়টি পাঠকেরা ক্ষমা-ঘেন্না করে ছেড়ে দেবেন বলে আশা করছি। আমি এ বিষয়ে কিছু লিখব না আগেই ঠিক করেছি।
তবে সাহিত্যের ব্যাপারটা ছেড়ে দিলেও, এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখতেই হচ্ছে। বিশেষত আমার সাম্প্রতিক ফেসবুকের ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতা আমাকে বাধ্য করছে এ নিয়ে দু’কলম লিখতে।
‘সারাদিন নর্দমা ঘাটা যার স্বভাব, ফুলের গন্ধ তার নাকে যায় না’– গান্ধী কি বলেছিলেন কথাগুলো? যে-ই বলুন, মালালা প্রসঙ্গে বাঙালির ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবিতার নমুনা দেখে আমার নিরেট মাথায় কেন যেন এ কথাগুলোই বার বার ঘুরেফিরে উঠে আসছে।


মালালা ইউসুফজাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ের খবর পত্রিকায় আসার পর থেকেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে নিরন্তর বাণী প্রক্ষেপণের মহড়া। এর মধ্যে আবার কেউ কেউ মালালা সম্বন্ধে একবিন্দু না জেনে তার কাজ কিংবা অবদান সম্বন্ধে জ্ঞান না রেখে গালির তুবড়ি ছোটাচ্ছেন অহর্নিশি– “একটা গুলি খায়াই নোবেল পায়া গেল?” কেউ বা বলছেন, “মালালা একটা গুলি কেয়ে নোবেল পাইল, আমারে কামান মার।” কেউ আবার বলছে, “একটা গুলি খাওয়া ছাড়া মালালার শান্তিতে কী অবদান আছে কইবেন কেউ?”
বেচারি মালালা! মাত্র সতের বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী হয়েও গালি খাচ্ছেন তালিবানদের, ইসলামিস্টদের, মৌলবাদীদের। পাশাপাশি, দেশপ্রেমিক বাঙালিদের, জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশিদের, সেক্যুলারিস্টদের, কমিউনিস্টদের। সবার!
তালিবানি ইসলামিস্ট ঘরানার লোকজন মালালার উপর কেন খ্যাপা তা বোধহয় বিশ্লেষণ না করলেও চলবে। কিন্তু অন্যরা? অন্যদের ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং!
‘পাইক্কা-বিরোধী’ দেশপ্রেমিক বাঙালিরা, জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশিরা, সেক্যুলারিস্টদের কিছু অংশ খ্যাপা; কারণ পাকিস্তানের সবকিছুই তাদের কাছে হারাম, এমনকি তাদের কেউ ‘যদি ফুল নিয়ে আসে তবুও’। তাদের বাঙালিপনা এমনই যে উর্দু-ফার্সি শব্দ, মায় ভাষাও জঘন্য– যদিও তাদের অনেক কথাতেই উর্দু শব্দের আধিক্য চোখে পড়বে, রুনা লায়লার ‘দমাদম মাসকালান্দার’ তো বটেই, বলিউডি সিনেমার কিছু চোস্ত উর্দু ডায়ালগও তাদের ঠোঁটস্থ। তাতে কী? ‘পাইক্কার সঙ্গে সম্পৃক্ত’ যে কোনো কিছুতেই ‘গাইল’ দিতে হবে না? এদের কাছে তালিবান যা– আসমা জাহাঙ্গীর, পারভেজ হুদোভয়ও তা– ব্যতিক্রম নয় মালালাও।

সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী হয়েও মালালা গালি খাচ্ছেন তালিবানদের, ইসলামিস্টদের, মৌলবাদীদের, দেশপ্রেমিক বাঙালি, জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশিদের, সেক্যুলারিস্টদের, কমিউনিস্টদের-- সবার
কমিউনিস্ট আর বাম ঘরানার লোকজনের কাছে মালালার পুরস্কার কেবলই ‘পশ্চিমা পুঁজিবাদী চাল’ । এদের অনেকে নিশ্চিত, মালালাকে ‘খাড়া’ করা হয়েছে ইসলাম আর আইসিসের বিপরীতে ‘প্রোপাগাণ্ডা মেশিন’ হিসেবে। এদের মধ্যে একজন দেখলাম গ্রামসীয় হেজিমনি কায়দায় তত্ত্ব দিয়েছেন– ‘‘আইসিস আর ইসলামোফোবিয়ার দ্বন্দ্বে এবারের নোবেল পিস প্রাইজ হিসেবে মালালার নির্বাচন তাৎপর্যময়।’’
এবারে যারা মনে করেন গুলি খাওয়া ছাড়া মালালার কোনো অবদান নেই, তারা বোধহয় জানেনও না যে, গুলি খাওয়ার তিন বছর আগে, মাত্র এগার বছর বয়সে বিবিসির সাইটে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং তালিবানদের প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্লগিং শুরু করেছিলেন মালালা। এত কম বয়সে ব্লগিং শুনে হয়তো অনেকে ‘অসম্ভব’ ভেবে নাক কুঁচকাতে পারেন, যেমনটি অনেকে কুঁচকেছেন আমার এ সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে দেবার পর। কিন্তু আমার অভিমত হল, এগার বছরের মেয়ে অবশ্যই ব্লগিং করতে পারেন। আর উদ্যোগটা যেহেতু বিবিসির, তাই তাকে ব্লগিং করতে সাহায্য করার লোক ছিল বিবিসি থেকে। বিবিসির উর্দুসহ ছাব্বিশটি ভাষার সার্ভিস আছে জানেন তো?
বলাবাহুল্য, মালালাকে কেউ গবেষণা-প্রবন্ধ লিখতে বলেনি; মালালা যা লিখছিলেন তা একটা ডায়েরির মতো। Gul Makai (পশতুন লোকগীতির এক বীর নারী) ছিল তার ‘পেন নেইম’। সেটা করা একেবারে অসম্ভব কিছু ছিল না মালালার জন্য। কারণ তিনি তার স্কুলের শীর্ষস্থানীয় ছাত্রী ছিলেন, প্রায় প্রতি বছরই প্রক্টর হিসেবে নির্বাচিত হতেন। যখন এ লেখাটা লিখছি তখন আমার হাতে এ বছর প্রকাশিত I am Malala বইটা ধরা। সেখানে স্কুলের অগণিত ট্রফি হাতে মালালার ছবিও আছে। ওর বাবা ছিলেন শিক্ষক, একসময় ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। তাই মালালার পক্ষে ইংরেজিটা রপ্ত করা সহজ হয়েছিল।
অবশ্য ব্লগিং যে মালালা করবেনই তা তিনি আগে থেকেই ঠিক করে রাখেননি। এই সময়টা এক বিশাল ক্রান্তিলগ্ন। সোয়াতের মতো পশতুন এলাকাগুলো আফগানি তালিবানরা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছিল। মেয়েদের স্কুল জোর করে বন্ধ করে দিচ্ছিল। তালিবানরা জায়গাগুলো দখল করে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো নিষিদ্ধ করতে থাকে; তাদের বাধ্যতামূলকভাবে নিকাব, বোরকা প্রভৃতি পরার জন্য চাপ দিতে থাকে। ঠিক এই সময়টাতেই বিবিসির পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে ব্লগিংএর। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীদের কেউ রাজি না হওয়াতে অনেকটা বাধ্য হয়েই মালালাকে এ দায়িত্ব নিতে হয়।
মালালা অবশ্য শুরু থেকেই ছিলেন কিছুটা বিদ্রোহী; মুখঢাকা, বোরকা-পরার বিরুদ্ধে সোচ্চার। I am Malala বইটি থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি–

I told my parents that no matter what other girls did, I would never cover my face like that. My face was my identity. My mother who is quite devout and traditional, was shocked. Our relatives thought I was very bold (some said rude). But my father said, I could do as I wished. “Malala will live as free bird” he told everyone.
মালালা তার প্রথম ব্লগটি লিখেন ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে, I am afraid শিরোনামে। তালিবানদের বিরুদ্ধে ব্লগিং যখন শুরু করলেন, মৃত্যু-হুমকি পেয়েছিলেন অজস্র। তার লেখায় এমনই আক্রান্ত বোধ করেছিল তালিবানি জঙ্গিরা যে, যে বাসে করে মালালা স্কুল থেকে ফিরত সেখানে তারা হামলা করে বসে। দু’জন তালিবানি যুবক বাসে উঠে রাইফেল তাক করে তার সহপাঠীদের দিকে। তাদের বাধ্য করা হয় বাসের মধ্যে মালালা কোন জন সেটা চিনিয়ে দিতে। সহপাঠীদের একজন ভয় পেয়ে মালালাকে চিনিয়ে দিলে তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে ওরা।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিন দিন মালালা সংজ্ঞাহীন ছিলেন। জ্ঞান ফিরেছিল ইংল্যান্ডে নেওয়ার পর। সেখানে সার্জারি করে তার গলার কাছ থেকে বুলেট অপসারণ করা হয়। তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ থামাতে খুলির কিছু অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছিল।
যারা মালালাকে আজ উঠতে-বসতে গাল দিচ্ছেন, তাদের কেউ কি অনুধাবন করতে পারছেন যে, যে সময়টা হেসে-খেলে বেড়াবার বয়স, সেই কৈশোরেই কী রকম ‘চাইল্ডহুড ট্রমা’র মধ্য দিয়ে মেয়েটাকে যেতে হয়েছিল!শুধু এই কারণেই তো মালালা শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা পেতে পারেন আমাদের কাছ থেকে। তার আগের কিংবা পরের কাজ ও পুরস্কারগুলো– যেমন, নারীশিক্ষার জন্য মালালা ফান্ড গঠন, মৌলবাদ বিরোধিতা, ২০১৩ সালে ইউএনএ তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা, ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজের জন্য ডেসমন্ড টুটুর নমিনেশন, শাখারভ পুরস্কার, টাইম ম্যাগাজিনের চোখে ২০১৩ সালের ‘অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি’ নির্বাচিত হওয়া-– সেগুলো না হয় বাদ দিলাম।

যাহোক, অনেক হাবিজাবি স্ট্যাটাসের ভিড়ে শিবরাজ চৌধুরীর এই স্ট্যাটাসটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, এটি পড়তে অনুরোধ করি–
‘একটা গুলি খায়াই নোবেল পায়া গেল’, পাবলিকের কথায় মনে হয় গুলি খাওয়াটা মনে হয় খুব ইজি, যে কেউ খাইতে পারে। অক্টোবর ২০১২ তে মালালা গুলি খাইছিল। কেন খাইছিল সেইটা কি কেউ জানে? এইটুক একটু জানাই।
পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় যখন তালিবানি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হল, তালেবান কী করল? এরা খালি গোলাগুলি ছাড়া সবকিছুই ব্যান করতে পারে। মেয়েদের স্কুলের কথা তো বলাই বাহুল্য। এইসব যখন শুরু হইছে, তখন বিবিসি উর্দু চিন্তা করল যে ওইখানের আম আদমিরা কী ভাবতেছে সেইটা ফোকাসে আনা উচিত, এনোনিমাসলি। মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন সাহেব একটা স্কুল চালান। তাঁর সাথে পরিচয় ছিল বিবিসি উর্দুর স্থানীয় প্রতিনিধির। তাকে বলার পর এই ব্যাপারে স্টেপ নেওয়া হল। কিন্তু তালেবানের ভয়ে কেউ রাজি হচ্ছিল না। আয়েশা নামের একটা মেয়ে, যে কিনা মালালার চেয়ে বয়সে বড় ছিল, সে প্রথমে রাজি হয়েছিল। পরে তার অভিভাবকরা পারমিট করে নাই। পরে জিয়া সাহেব রিস্ক নিয়ে নিজের মেয়েকেই এই দায়িত্ব দেন। মালালাকে তিনি ওই অস্থিতিশীল অঞ্চলেই নিজে পড়াতেন, অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন মালালার সাথে। মালালা ইংলিশ, উর্দু এবং পশতুতে ফ্লুয়েন্ট। যারা সমালোচনা করল, তারা ভুলে যাচ্ছে যে, সোয়াত উপত্যকা ছেড়ে উনি পরিবার নিয়ে করাচি, পিন্ডি চলে যেতে পারতেন। যান নাই কেন? জিয়া সাহেব নিজেও একজন এডুকেশন একটিভিস্ট।
যাই হোক, মালালা তখন ব্লগ লেখা শুরু করল। লিংক–
http://news.bbc.co.uk/2/hi/south_asia/7834402.stm
‘ডায়েরি অব আ পাকিস্তানি গার্ল’। মালালা মাত্র এগার বছর বয়সে করাচি প্রেসক্লাবে তালিবান শাসন নিয়ে বলেছিল। উইকিপিডিয়া থেকে তুলে দিলাম। ওখানে লিংক দেওয়া আছে।
‘‘How dare the Taliban take away my basic right to education?” Yousafzai asked her audience in a speech covered by newspapers and television channels throughout the region.


বিবিসির ব্লগ সূত্রে ওকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস একটা ডকুমেন্টারি বানাবে বলে ঠিক করল। যাই হোক, এইভাবে তালিবান মালালারে চিনল। এরপরে টার্গেট করল। দা রেস্ট ইজ হিস্ট্রি।
সুতরাং, মালালা খালি গুলি খায়াই নোবেল পায় নাই। সোয়াতের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে থেকে যে এতটুকু সাহস নিয়ে এগিয়ে এল তালেবানের বিরুদ্ধে, এত অনিরাপদ জীবন নিয়েও যে তারা ওই জায়গা থেকে নিরাপদ জায়গায় চলে যাবার কথা ভাবে নাই, এইসব নিয়ে দেখি কারও মাথাব্যথা নাই।
যাই হোক, এই বেলায় আরেকটু তথ্য দিই। মালালা গুলি খাবার আগেই সে চিলড্রেন রাইটস একটিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটু (আমি নিশ্চিত, জাতি টুটুরেও চিনে না) ২০১১ সালে মালালাকে ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজের জন্যে নমিনেট করেছিলেন। পুরষ্কার আরেকজন পেয়েছিল সেবার। তবে মালালার ব্যাপারে বলা হয়েছিল,
Malala dared to stand up for herself and other girls and used national and international media to let the world know girls should also have the right to go to school.
সুতরাং, আবালামি করার আগে একটু জাইনা নিলে ভালো হয়।’’
কৈশোরেই যে ‘চাইল্ডহুড ট্রমা’র মধ্য দিয়ে মেয়েটাকে যেতে হয়েছিল, শুধু এই কারণেই তো সে শ্রদ্ধা সহমর্মিতা পেতে পারে
হ্যাঁ, আবলামি করার আগে জেনে নিলে ভালো হয়, এমন উপদেশ শিবরাজ চৌধুরী দিচ্ছেন বটে, কিন্তু যাদের দিচ্ছেন তাদের কাছে এটা উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর মতোই। এরা জানার চেয়ে আমার আপনার চোদ্দগুষ্টি নিয়ে ‘গাইল’ দিতে ওস্তাদ। এত জানার সময় কোথায় এদের?
গত বছর টিভিতে জন স্টুয়ার্টের ‘ডেইলি শো’ দেখছিলাম বলে মনে আছে। সেখানে একটি পর্বে মালালাকে আনা হয়েছিল। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল– ‘‘তোমাকে যারা গুলি করেছিল, আবার যদি তাদের কারও সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়, তবে তুমি কী বলবে?’’
উত্তরে মালালা বলেছিলেন-–
‘‘আমি বলব, মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তোমার মেয়ের শিক্ষার জন্যও আমি লড়ব।’’
আমরা বুড়ো হাবড়ারা যখন এ-ওর পেছনে লাগতে ব্যস্ত, ব্যস্ত কথার তুবড়ি ছোটাতে আর কিছু না পড়ে না জেনে ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবিতা জাহির করতে– তখন এই ষোল-সতের বছরের মেয়েটা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে কাজ করতে হয়।
আমি আমার স্ট্যাটাসটা ফেসবুকে দেওয়ার পর অবধারিতভাবে সেই স্পর্শকাতর বিষয়টিও উঠে এসেছে যে, যে পাকিস্তান, তার মিলিটারি ত্রিশ লক্ষ বাঙালির হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তার সবকিছু অস্বীকার করাটা দোষের কোথায়? এমনটি লিখেছেন এক ফেসবুক বন্ধু স্ট্যাটাসের মন্তব্যে। আমি বলব, কেউ কিন্তু অস্বীকার করছে না যে, পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। আমরা তার প্রতিবাদ করছি, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিও চাচ্ছি।

ঘৃণিত পাকসেনাদের বিচার দাাব করছি, দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও।


আমি নিজেও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। বড় হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিমণ্ডলেই। তাই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ জিনিসটা এত সংকীর্ণ হবার কথা নয় যে, একটি সাহসী মেয়ে তালিবানদের বিরুদ্ধে একা যুদ্ধ করছে, নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করছে, অথচ তাকে সাধুবাদ দিতে পারব না, প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হব! এটা করলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই অপমান করা হয়। আসুন বিশ্বমানব হতে শিখি। বাঙালিত্বের অপর নাম যে বিশ্বমানব হবার শিক্ষা– তা ভুলে যাই কেন?
আর যে সব বাম ঘরানার লোকজন মালালার পুরস্কারের পেছনে যথারীতি, ‘পশ্চিমা চক্রান্ত’-এর গন্ধ পাচ্ছেন, হেজিমনির ‘হেঁজেল’ গোঁফে তা দিয়ে ভাবছেন হঠাৎ করেই আইসিস ঠেকাতে এ বছর মালালাকে নির্বাচন করা হয়েছে নোবেলের জন্য, তারা জানেনও না যে, মালালার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল গত বছরই। সে সময় অনেক বিখ্যাত জন পিটিশন করেছিলেন মালালার পক্ষে। ২,৫৯,০০০ সাক্ষর জমা হয়েছিল সপ্তাহখানেকের মধ্যেই; এমনকি রিচার্ড ডকিন্সের মতো বিজ্ঞানীর পক্ষ থেকেও ক্যাম্পেইন করা হয়েছিল। ২৫৯ টি নমিনেশন পেছনে ফেলে মালালা এগিয়েও ছিলেন; কিন্তু তবু সেবার তিনি নোবেল কমিটির বিবেচনায় উত্তীর্ণ হননি।
তবে সবাই বুঝেছিল মালালার নোবেলপ্রাপ্তি কেবল সময়ের ব্যাপার। তাই এ বছর তিনি নোবেল পেলে সেটা ভুঁইফোড় হিসেবে অথবা ‘আইসিস ও ইসলামোফোবিয়া’ ট্যাকলের জন্য হবে কেন, তা আমার বোধগম্য হল না কোনোভাবেই।
অবশ্য এর মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাইছি না যে, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক নেই। অবশ্যই আছে। ওবামা, রুজভেল্ট, হেনরি কিসিঞ্জারের মতো লোকজন এই পুরস্কার পেয়েছেন, যা অবশ্যই বিতর্কিত। কিন্তু এ পুরস্কার তো মার্টিন লুথার কিং, শাখারভ, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলাও পেয়েছেন, সেটা ভুলে গেলে চলবে কেন? মালালা এ পুরস্কার পেলেন বলে পুরস্কারটা ‘ঘৃণিত’ হয়ে যাবে? নোবেল পিস প্রাইজের ‘কবর’ রচনা হবে তাতে? মালালার পুরস্কারে খুশি হতে না পারি, ঘৃণা করার মতো কিছু তো ঘটেনি।
আরেকটি ব্যাপার। মালালার এ পুরস্কারের প্রচার ও আর বিতর্কে কৈলাস সত্যার্থীর পুরস্কারপ্রাপ্তির ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে গেছে। তার “বাঁচপান বাঁচাও” আন্দোলন ভারতের শিশুদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখনও ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অধিকারবঞ্চিত দিন কাটাচ্ছে। সেখানে যে কৈলাস সত্যার্থীর মতো লোকজন এ জন্য কাজ করে চলেছেন সেটাই আশার কথা।
তার চেয়েও বড় কথা, উপমহাদেশের দুই চিরশত্রু অন্তত একটি ব্যাপারে এক হয়ে পুরস্কার ভাগ করে নিতে যাচ্ছে– এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।







Friday, October 16, 2015

ধর্মানুভূতি, মিডিয়া ও অবাঞ্চিত নাস্তিক্য চিন্তা – ১, ২ বা শেষঃ



ধর্মানুভূতি, মিডিয়া ও অবাঞ্চিত নাস্তিক্য চিন্তা – ১

গত ১৪ আগস্ট সকাল সাড়ে দশটায় ’৭১ টিভিতে ব্লগার এবং তাদের নিরাপত্তা বিষয়ে যে সংলাপটা হয়েছে, তাতে সুস্পষ্টভাবে নাস্তিক্য চিন্তার প্রতি এক ধরণের বৈমা্ত্রিয় আচরণ দুই বিশেষ বক্তার বক্তব্য এবং আলাপে উঠে এসেছে। যদিও র‍্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ মুক্ত চিন্তার একটা ব্যাখ্যা তুলে ধরতে চেয়েছেন, কিন্তু তার চেয়ে বেশি মুক্ত চিন্তার নামে হাতে গোনা গুটিকয় ব্লগারের ধর্মকে নিয়ে ক্যারিকেচারটাকে রঙ মাখিয়ে শ্রোতা-দর্শকের সামনে যেভাবে তুলে আনা হয়েছে, মুক্তচিন্তার ব্লগার হিসেবে তা আমাকে দারুণভাবে আহত করেছে।

আমি এতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, ব্লগিং সমাজ এবং ব্লগার শুধু এতে হেয় হয়নি, সে সাথে দেশে ধর্মীয় অশান্তি সৃষ্টি এবং উগ্র মৌলবাদীদের হাতে ব্লগারদের মারা যাওয়ার ঘটনাগুলোতে প্রকারান্তরে ব্লগারদেরই দোষী করা হয়েছে। অথচ সমস্যার ভেতরটা যে কত গভীর তারা তা জেনেও জানেন না। অথবা দোষটা এমন একটা শ্রেনীর প্রতি চাপিয়ে দিলে নিজেদেরকে দায়ভাগ থেকে নিরাপদ রাখা যাবে বলে মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ব্লগাররাই সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ব্লগারদের এখন যে উভয় সংকট সেটা তারা স্পষ্ট করেন তাদের জোরালো বক্তব্য এবং আলোচনায়। হিংস্র ধর্মীয় উগ্রবাদীদের টার্গেট যেমন মুক্তমনা ব্লগাররা, আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্লগার এবং সরকারের টার্গেটও যখন মুক্তবুদ্ধির ব্লগাররা, তখন মুক্তমনাদের উভয় সংকট না বলে উপায় কি? ধর্ম নিয়ে রাজনীতির লেবাসটা এত উগ্রভাবে চোখে পড়ছে যে, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে সবাই উদগ্রীব। অথচ মুক্তবুদ্ধির চর্চা থমকে গেলে, সভ্যতার এগুনো তো দূরে থাক, কোন দেশই প্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে না।

ইউরোপ বা পশ্চিমা বিশ্ব অনেক আগেই ধর্মকে রাষ্ট্র এবং রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে অগ্রগতি এবং মুক্তচিন্তার বিকাশের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশ, তার সরকার এবং রাজনীতি যেভাবে দিনকে দিন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতির খেলায় মেতে উঠছে, তাতে খুব করে আফগানিস্থানে তালিবানি পশ্চাৎপদ সময়ের কথাটাই মনে পড়ছে। সভ্যতার চাকাকে বেঁধে দিতে হলে, আপনাকে একটা আবদ্ধতার লেবাস লাগাতেই হবে, আর সে লেবাসে মুক্তবুদ্ধির চর্চাটা অবশ্যই নির্বাসিত।

মুক্তবুদ্ধির হতে হলে কোন পূর্ব বিশ্বাস বা মতবাদ মাথায় রেখে সম্ভব নয়। আর সে কারণেই মুক্তবুদ্ধির মানুষরা যুগে যুগে প্রচলিত বিশ্বাস বা মতবাদের লোকদের কাছে নিরন্তর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষদের সমস্যার জায়গাটা হলো, তাদেরকে কোন রাখ-ঢাক না রেখে, কোন গোষ্ঠীর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির দিকে না চেয়ে, কোন রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষের চাপে না থেকে সত্যটাকে অকপটে উচ্চারণ করতে হয়। কেননা ঐসব বিষয়-আশয় গুলো তাদের মাথায় একদম থাকে না। তাতে ঝামেলাটা বেধে যায় গতানুগতিকতা (status quo)-র সাথে।

ব্রুনো, গ্যালিলিও-রা কেমন তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন অবলীলায় তাদের লব্ধ সত্যকে প্রকাশ করতে যেয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি আপনার জানাকে অবরুদ্ধ রাখবেন কি না কোন ধরণের চাপ, রাজনীতি বা হুমকির বশবর্তী হয়ে? অথবা আপনার মাঝে ভিন্ন চিন্তার উদয় হলে প্রচলিত ধ্যাণ, ধারণা বা বিশ্বাসকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবেন কি না? তাদের স্থায়ীত্ব সম্পর্কে সন্দেহবাদীতা প্রকাশ করবেন কি না? যদি প্রচলিত ধ্যাণ-ধারণা বা বিশ্বাস যথেষ্ট উদারতা পোষণ করে, তবে তারা আপনার এই প্রশ্নবাণ বা সন্দেহবাদীতাকে উষ্কানি না বলে সহিষ্ণুতার পরিচয় দেবে এবং আপনার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর দেবার চেষ্টা করবে। তারা একটা সমাধানে বা নিদেনপক্ষে শান্তিপূর্ণ বোঝা-পড়ায় আসার চেষ্টা করবে সুস্থ বক্তব্য এবং আলোচনার মাধ্যমে।


পক্ষান্তরে, যারা গতানুগতিকতাকে জিইয়ে রাখতে চায়, তারা তাতে যৎসামান্য সংস্কার দিয়েই শুরু করবে, যতটুকুই তাদের প্রয়োজন। তাদের হারাবার ভয়টা খুব বেশি। সৃজনশীলতা্র স্পর্শ টানতে তাদের বাধবে। গতানুগতিকতায় চালিত এই লোকগুলোরও প্রয়োজন আছে, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কৌশলগত জগতে তাদের কিছু সমর্থক শ্রেণী তৈরি করা। এই সমর্থকরা আবার মুক্তবুদ্ধি চর্চার জগতের মানুষের মত সাত-পাঁচ না ভেবে কাজ করে না। তারা যথেষ্ট কৌশলী স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এবং সে অনুযায়ী বন্ধু-বিভেদ এবং গ্রহণ-বর্জনের সংজ্ঞা তৈরি করে দেয়।

’৭১ টিভি-কেও দেখা গেছে ঠিক সেভাবেই তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দিয়ে তাদের সংলাপ সাজাতে। মান্যবর আইনমন্ত্রী, র‍্যাব প্রধান এবং বাংলা ব্লগ জগতের প্রতিনিধি হিসেবে ব্লগার অমি রহমান পিয়াল। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিলো, যেখানে তারা ব্লগার এবং ব্লগারদের নিরাপত্তা বিষয়ক কথা বলছেন, সেখানে যে ব্লগের তিনজন ব্লগার এই পর্যন্ত চরমপন্থী ধর্মীয় জঙ্গীদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সে ব্লগ থেকে কাউকে তাদের আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত করা হলো না।

পরিসংখ্যান তুলে ধরে যদি বলি, তবে দেখা যাচ্ছে অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাস, এবং নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল) ‘মুক্তমনা’ ব্লগের সাথে জড়িত ছিলেন, যদিও নীল ইস্টিশন ব্লগেরও ব্লগার। আমরা আরো জানি, এই ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিই রয়েছে চরমপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রচন্ড আক্রোশ এবং ’৭১ টিভির সেই অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যারা প্রকৃতই মুক্তমনা বলে দাবীদার এবং সে কারণে প্রাণ-বিসর্জনও দিয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় কাউকে পেলাম না কেন?

অভিজিৎ রায় তার স্টেটাসে সুস্পষ্ট ঘোষনাই দিয়েছেন: “যারা ভাবে বিনা রক্তে বিজয় অর্জিত হয়ে যাবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের মত জিনিস নিয়ে যখন থেকে আমরা লেখা শুরু করেছি, জেনেছি জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি করছি। জামাত শিবির, রাজাকারেরা নির্বিষ ঢোরা সাপ না, তা একাত্তরেই আমরা জনেছিলাম। আশি নব্বইয়ের দশকে শিবিরের রগ কাটার বিবরণ আমি কম পড়িনি। আমার কাছের বন্ধুবান্ধবেরাই কম আহত হয় নাই।

থাবা বাবার মর্মান্তিক খবরে আমি ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, উন্মত্ত, কিন্তু বিশ্বাস করুন, এক ফোঁটা বিচলিত নই। জামাত শিবির আর সাইদী মাইদী কদু বদু যদু মোল্লাদের সময় যে শেষ এ থেকে খুব ভাল করেই আমি বুঝতে পারছি। এরা সব সময়ই মরার আগে শেষ কামড় দিতে চেষ্টা করে। ৭১ এ বিজয় দিবসের দুই দিন আগে কারা আর কেন বুদ্ধিজীবী হত্যায় মেতে উঠেছিল শকুনের দল, মনে আছে? মনে আছে স্বৈরাচারের পতনের ঠিক আগে কি ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল ডাক্তার মিলনকে? এগুলো আলামত। তাদের অন্তিম সময় সমাগত। পিপিলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে!
বিজয় আমাদের অবশ্যাম্ভাবী।”

উপরের কথাগুলো যিনি বলে ফেলেন, তিনি নিশ্চয়ই গভীর এক সত্যকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলে এই রকম বলতে পারেন। আর এই গভীর সত্যকে অনুধাবন করাটা যে একেবারেই আমাদের এবং বিশ্ব ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে উঠে এসেছে সেটা পরিষ্কার। কিন্তু সেই সত্যকে অনুধাবন করার মত যথেষ্ট দূরদর্শিতা ’৭১ টিভির আলোচকদের কাছ থেকে আসেনি, এমনকি যার কাছ থেকে আসা উচিৎ ছিল নিদেনপক্ষে, সে অমি রহমান পিয়াল বিষয়টাকে সুস্পষ্টতা না দিয়ে বরং ‘মুক্তমনা’ শব্দটাকে সম্ভবতঃ অচ্ছুৎ কিছু একটা বোঝাতে চেয়েছেন।


একদিকে ওনারা বলছেন, কিছু ব্লগার ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বা উস্কানীমূলক বক্তব্য দিচ্ছে বলে, সে সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মান্ধ মৌলবাদ এখন মুক্তিযুদ্ধ বা গণজাগরণ মঞ্চের স্বপক্ষের ব্লগারদের নাস্তিক বলে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। চমৎকার। এখন তাদের এই বক্তব্যটা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে এগুলে কেমন হয়?

যে দু’জন আক্রান্ত ব্লগারের লেখাতে ধর্ম নিয়ে ক্যারিকেচার করা হয়েছে, তারা হলেন, আসিফ মহিউদ্দিন এবং রাজীব হায়দার। তাদের কারণে নাস্তিকের কার্ডটা ব্যবহার করে ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা আস্তিক-নাস্তিকের বিভেদ তুলে ধরে ইসলামকে ব্যবহার করে এক বিকৃত খেলায় মেতে উঠে। এই খেলা থেকে দু’টো বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এক. নাস্তিকের ট্যাগ ব্যবহার করে কোন ব্লগারকে হত্যা করলে এই ধর্মভীরু দেশে মৃত ব্লগারের প্রতি জনসমর্থন বা জন-সহানুভূতির আক্রা দেখা দেবেই।

দুই. ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের মত সরকারও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে চায় নাস্তিক্যবাদের কোন স্থান বাংলাদেশে নেই। অর্থাৎ নাস্তিকরা এক পাপী শ্রেনীর, তাদের কোন স্বীকৃতি নেই। তাদের কোনরকমের স্বাধীনতা দেয়া উচিৎ নয়, বাক স্বাধীনতা তো নয়ই। বরং নাস্তিকদের প্রতি রোষানল নেমে আসাটা অন্যায়ের কিছু নয়, তা অবধারিতই। এমন একটা ম্যাসেজ সরকার খুব সহজে মিডিয়া ব্যবহার করে জনগণকে জানিয়ে দিচ্ছে। এটা যে সরকারের তরফ থেকে কত বড় অপমান, তা নাস্তিকরা ভালভাবে বুঝে। এটাও বুঝে বাংলাদেশে তাদের কোন স্থান নেই।

কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে বোঝা যায়, ধর্মকে নিয়ে ক্যারিকেচারের কারণ ধর্ম, এবং বিশেষ করে ধর্ম ব্যবসায়ী, ধর্মান্ধ ধর্মগুরুদের কারণেই। আমি আগে এক লেখায় বলেছি, “মনে রাখতে হবে, একজন অন্য ধর্মাবলম্বী বা নাস্তিক (নিরীশ্বরবাদী) বা সন্দেহবাদী মানুষের কাছে, নবী-রাসূলরা শ্রেফ একজন মানুষই, তাদের মাধ্যমে আসা ধর্মগ্রন্থ শ্রেফ একটা গ্রন্থ। যেমন, মুসলমানদের কাছে হিন্দু ধর্মের দেব-দেবী, রাম-শ্রীকৃষ্ণ যেমন, তেমনি হিন্দুদের কাছে মুসলমানদের নবী-রসূল আল্লাহ তেমন।” নাস্তিকদের নিয়েও তো কম ক্যারিকেচার করা হয় না। তখন কোন সমস্যা নেই। দুর্দান্ত বাজে মন্তব্যে জর্জরিত হয়ে নাস্তিকরা যদি তাদের সহনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারে, তবে ধর্মবাদীরা তা পারে না কেন?

এক ধরণের অবজ্ঞা এবং বিদ্রুপ এই হরে-কৃষ্ণ গোষ্ঠিদেরকেও ক্যানাডাতে করতে দেখেছি। সুতরাং এখন একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বা নাস্তিক ব্লগারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যদি মনে হয়, ধর্মের কোন বাণী বা ধর্মীয় গুরুদেবদের কোন আচরণ হাস্যরসের উদ্রেক করছে, তবে সেটাকে নিয়ে সে ক্যারিকেচার করতেই পারে। সে তার দৃষ্টিভঙ্গিগত স্বাধীনতা।


আবার কোন ব্লগার যুক্তি-বুদ্ধি দিয়েই যখন অনুধাবন করতে পারে যে, খুব গুরুত্ব এবং ভারিক্কি বজায় রেখে ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রচার এবং প্রসার, আমাদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে অবস্থিত ধার্মিক জনগোষ্ঠীর সুস্থ চিন্তা-ভাবনাকে মন্দভাবে প্রভাবিত করছে, সেক্ষেত্রে সে ব্লগারের ক্যারিকেচারের আশ্রয় নেয়াটা জনগণকে বিষয়টির অন্তঃসারশূণ্যতার প্রতি দিকপাত করার একটা প্রয়াস বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এটা যেন ছোট বাচ্চার রাজা ন্যাংটা বলার মতই।

তবে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা তা উল্লেখ না করলেই নয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগণের তথাকথিত ধর্মীয় গুরুদের বীভৎস আচরণ বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সাথে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের জনগণের জন্য মোটেই সুখকর নয় – চরম লজ্জার, কষ্ট-বেদনার নিষ্ঠুরতার। ’৭১-এ প্রায় সব ইসলাম ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো কী অবলীলায় পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে বাঙ্গালির মুক্তিকে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিলো, সেটা যে কোন সংবেদনশীল তরুণকে ধর্মের প্রতি অনীহা তৈরি করাতেই যথেষ্ট। ইসলামের এই ধর্মগুরুরা গণিমতের মাল বলে নিজ দেশের মা-বোন-কন্যাদের জীবনকে দুর্বিসহ করেছে, এখনও সে শক্তি সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিধর হয়ে আছে, এতে করে কি ধর্মকে নিয়ে তরুণ প্রজন্মের কোন অংশ যুক্তিসংগতভাবে নিন্দা ছুঁড়ে দিতে পারে না? ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে একের পর এক গণহত্যা রাগী তরুণ সমাজকে, ধর্মকে নিয়ে ক্যারিকেচারে ঠেলে দিলে তার দায়-দায়িত্ব মূলতঃ ধর্মগুরুদেরই নিতে হবে। আওয়ামী সোনার সন্তানেরা দোষ করলে সেটা আওয়ামীলীগের উপরেই পড়ে।

অথচ আমাদের ধর্মগুরুরা তাদের সন্তান সমতূল্য, ক্ষেত্রবিশেষ নাতি সমতূল্যদের ধর্মকে অবমাননার নামে ফাঁসী চান। কাফের হত্যাকে যায়েজ বলে ফতোয়া দেন। অথচ ব্লগারদের সাথে নিদেনপক্ষে আলাপ-আলোচনায় বসতে রাজী হন না। রাষ্ট্রও থাকে নীরব যেন তার এক প্রছন্ন সমর্থন – ধর্মগুরু এবং ধর্মবাদীদের আনুকূল্যে ও আশীর্বাদে ক্ষমতাকে নির্বিঘ্নে শক্তকরণ এবং সে সাথে কৌশলে আগাম ভোট ব্যাংক তৈরিকরণ।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র “লালসালু”-তেও মোল্লাতন্ত্রের নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণের ভেতরেও সূক্ষ্ম প্রতিবাদের প্রকাশ থাকে, তা যত ক্ষীণই হোক। অতএব মানবতার জাগরণ প্রয়াসে এক ধরণের শ্বাসরুদ্ধকর সৃজনশীলতাহীন, সৃষ্টিহীন বাস্তবতা্র নিরিখে, ধর্মকে আঘাত দিয়ে যদি কোন তরুণ তার ক্রোধের নালিশ জানিয়ে দেয়, তাকে নাস্তিকের ট্যাগে আক্রান্ত করা গেলে, ক্ষমতাসীন এবং ধর্মগুরুদের অন্যায় অসত্যকে ঢাকা দেবার একটা সুপরিকল্পিত ফন্দি তৈরি হয়ে যায়।


কবি নজরুলও ধর্মকে আঘাত দিয়ে জাগাতে চেয়েছেন, বেগম রোকেয়া আরো একধাপ এগিয়ে কথা বলেছেন, [“যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপে অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমরা প্রথমত যাহা মানি নাই, তাহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষ-গণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষোচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে।” – “আমাদের অবনতি” প্রবন্ধ হতে]। আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলেছেন, রামের বিপরীতে রাবণকে নায়ক করে রাবণায়ণ (মেঘনাধ বধ কাব্য) সৃষ্টি করেছেন।

সরকারের ভূমিকায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে, যা অভিজিৎ রায়ের বাবা অজয় রায়কেও অবলীলায় বলে ফেলতে হয়েছে, “… ব্লগার হত্যায় সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।” [৪ জুলাই ২০১৫, বিডিনিউজ২৪ডটকম, http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article992145.bdnews]। নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়ের হত্যাকান্ডের পর সরকারের উপর ভেতর-বাহিরের চাপ পড়েছে, সেখানে সরকারের প্রমাণের প্রয়োজন হয়ে উঠেছে যে, তারা ধর্মান্ধ ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখার (appease) কাজে ব্যাপৃত নয়। সরকার এমন এক পরিস্থিতি নিজের জন্য তৈরি করেছে, যেখানে তাকে ধর্মান্ধ উগ্র ইসলামী মৌলবাদকে মেনে নিতে হচ্ছে (যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আওয়ামী ওলামা লীগ), আর অন্যদিকে প্রগতিশীল মুক্তমনা বুদ্ধিবৃত্তিক যে একটা ক্ষীণধারার সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ক্ষুরধার লেখনীই যেন সরকারের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর ধর্মান্ধ মৌলবাদ মুক্তবুদ্ধি বৃত্তিক এই ক্ষীণধারাকে যথেষ্ট জোরালো মনে করে এর বিরুদ্ধে চাপাতিহস্ত হওয়াটা তাদের রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের মোক্ষম সুযোগ বলে ধরে নিয়ে এগুচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রধানতঃ তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ভয়ংকর নাজুক অবস্থায় উপনীত করায়, এখন নাস্তিক-আস্তিক স্নায়ু যুদ্ধ-টা মোকাবিলায় কলমে পেরে না উঠে চাপাতিহস্ত হওয়া ছাড়া বিকৃত ঘৃণ্য মৌলবাদের আর কোন বিকল্পই খোলা নেই। বাংলাদেশে তাদের এই কোণঠাসা অবস্থা থেকে শৌর্য-বীর্যে উত্তরণ ঘটার অন্য কোন পন্থা এই মূহুর্তে আছে বলে আমার জানা নেই।


এটা ঠিকই অনুমেয়, মুক্তবুদ্ধির ব্লগারদের ধারালো যুক্তি-তর্কের কাছে পরাস্থ ধর্মীয় মৌলবাদ, তাদের জন্য অংশনি সংকেত বলে বুঝে নিলেও সরকারের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত তা মোটেও অস্বস্থিকর ছিল না, যতক্ষণ না ধর্মান্ধ মৌলবাদ চাপাতিহস্ত হয়ে কতলে নেমে পড়ে। হেফাজতের জঙ্গী কর্মকান্ড এবং আচরণ থেকে সরকার ভালভাবে উপলব্ধি করেছে, এদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন হতে হলে বা ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে হলে ধর্মীয় মৌলবাদের (সে যেমন ধরণেরই হোক না কেন) প্রতি বিনম্র থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আর তাই, একদিকে ব্লগারদের সীমা অতিক্রম না করার ছবক দিচ্ছেন, অন্যদিকে ব্লগার হত্যা নিয়ে সরকার তাদের তদন্ত কার্যতঃ খুব জোরালোভাবে চলছে বলে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি সরকারের এই নীতির পক্ষে জোরালো প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখতে তার বশংবদ শ্রেণীর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

’৭১ টিভির অনুষ্ঠানটা সেদিকটাকে লক্ষ্য করে পুরোপরি সাজানো বলে মনে হয়েছে। আর নির্ধারিত আলোচক তিনজনও যেন তাদের বক্তব্যকে ঠিক সেভাবে সাজিয়েছেন। মান্যবর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তো সরাসরি সরকারী ভাষ্য তুলে ধরে বললেন, তাদেরকে জনগণের সাথে থাকতে হবে, জনগণের সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর র‍্যাব প্রধান তার চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চার উপর একটা ছোটখাট বক্তব্য দিয়ে শেষমেশ ব্লগারদের বিদেশ যাবার জন্য ইসলাম ধর্মকে নিয়ে গালাগালি এবং ক্যারিকেচার করার কারণ উল্লেখ করেছেন। তার অতীত কর্মকান্ডে সরকারী দলের স্বার্থ রক্ষা নিলর্জ্জভাবে উঠে এসেছিল, বর্তমানও যে তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়, সেটা বোধগম্য। যিনি এত বড় বড় কথা বলেন, তার তো বোঝার অগম্য নয় যে, তিনি যেভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, সেভাবে উন্নত বিশ্বের উর্ধ্বতন পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা করে না। ব্লগারদের কর্মকান্ডকে যিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তিনিই বা কতদূর সরকারী দলের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করছেন, সেটাই বিবেচ্য।

সবচেয়ে আপত্তিকর এবং বিব্রতকর ঠেকেছে, যখন ব্লগারদের প্রতিনিধি হয়ে আসা অমি রহমান পিয়ালও সরকারের সেই একই সুরকে গলায় তুলে প্রতিবাদী যুক্তিবাদী মুক্তমনা ব্লগারদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে পরিচয় করিয়ে দেন ৯ বছরের অধিককাল মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধ নিয়ে লেখা একজন ব্লগার হিসেবে। যখন র‍্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ বলেন, তার দৃষ্টিতে ব্লগাররা শুধু ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করে লিখেন, তখন অমি পিয়ালের কাছে তথ্য এবং বক্তব্য থাকে না যে, চাপাতিতে নিশ্চিহ্ন হওয়া প্রাণ, অভিজিৎ রায়, নিলয় নীল শুধু ইসলামকে নয়, হিন্দুধর্মসহ অন্যান্য ধর্মগুলোকেও সমালোচনার মুখে ফেলেছেন, চ্যালেজ্ঞ ছুঁড়ে দিয়েছেন। অনন্ত বিজয় দাসও যুক্তি-তর্ককে মূখ্য করে বিজ্ঞানমনস্ক লেখালেখি করেছেন।





র‍্যাব প্রধানকে মনে হয়েছে, তিনি একটা এজেন্ডা নিয়ে এসেছেন, আর তাহলো ব্লগারদের বাজে-ভাবে ইসলাম বিরোধী হিসেবে দাঁড় করাতে পারলে, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীদের তদন্তে অগ্রগতির ব্যর্থতাকে ঢেকে দেয়া এবং সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে হাসিল করার প্রচেষ্টাকে সহযোগিতা করা। হেফাজতে ইসলামীর মতিঝিল জমায়েতের ঘটনার পর, সরকার ইসলামী মৌলবাদী শক্তির সাথে যে আপোষরফা এবং সন্তুষ্টি বিধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তাতে অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুকে একটা প্রচ্ছন্ন উত্তাপহীন আবরণে জড়িয়ে রাখলে সাপেও মরে, লাঠিও থাকে অভঙ্গুর।

এই মৌলবাদী শক্তির বর্তমান প্রাণপুরুষ আল্লামা শফী হুজুর কাফের/নাস্তিক হত্যা যায়েজ বলে ফতোয়া দিয়ে আইনকে হাতে তুলে নেবার মত বর্বরতার প্রচারণা করলে সরকার চুপ থাকে, ততদূরই চুপ যতদূর ব্লগার হত্যা সরকারের কাছে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। তবে দেশি-বিদেশী চাপ এলে তা মোকাবিলা করতে জনগণ এবং বিদেশী শক্তির চোখ-পরিষ্কার (eye-wash)-এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

আর তাও যদি যথেষ্ট না হয়, তবে সাথে থাকা উচিৎ সরকারী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মীগণ। নাট্য সংস্থাগুলোরও প্রয়োজন হয়ে পড়ে আবার শহীদ মিনার সমাবেশে, যে শহীদ মিনারকে আমরা জেনে এসেছি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তবুদ্ধির স্বপক্ষে চারণভূমি। সেখানে ব্লগারদের কাছে সরকারী মতামতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘোষণা আসে, বাক-স্বাধীনতা যেন ‘ধর্মানুভূতি’-কে আঘাত না করে। এখন ধর্মানুভূতিটা কি এবং এটার ব্যাখ্যাটা কিভাবে করি? মানুষের সামান্যতম বাঁচার অনুভূতি বা সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মর্যাদার অনুভূতি পদে পদে নিষ্পিষ্ট হলেও ধর্মানুভূতিটা যে করেই হোক অটুট রাখতে হবে। সব দেখে-শুনে আমার মনে হচ্ছে, যে জাতি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, নৈতিকতায় যত অনুন্নত তাদের ধর্মানুভূতির ভণ্ডামিটা তত শির উচ্চ। লেখক হুমায়ুন আজাদ বা বাংলাদেশী ক্যানেইডিয়ান গণিতজ্ঞ লেখক মীজান রহমানও যথেষ্ট বলেছেন, সেখানে আমার নতুন কিছু বলার নেই।

আমি সাদা-মাটা যা বুঝি, সেটা হলো, একটা শিশু যখন মুক্তভাবে বেড়ে উঠে ব্যক্তি, সমাজ এবং পারিবারিক প্রভাবমুক্ত হয়ে, তখন তার মাঝে একটা স্বতঃস্ফূর্ত মানসিকতার সৃষ্টি হয়। আর তাহলো, সে তার পারিপার্শ্বিক সব কিছু সম্পর্কে নির্দোষ প্রশ্ন রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিবিধ কারণে, বিবিধ চাপের মুখে পড়ে শিশুকে তার মত করে বাড়তে দেয়া হয় খুব কম। বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা-ব্যবস্থা সেক্ষেত্রে আরো অনেক দূর বিস্তৃত শিশুর স্বাতন্ত্র্য জিজ্ঞাসাগুলোর যুক্তিনির্ভর উত্তর দেবার ব্যাপারে। ধর্ম এমনভাবে আমাদের উপর চেপে বসেছে, এই নিয়ে আদৌ প্রশ্ন করা সম্ভব যদি না হয়, তবে সেটা মানুষের বিকাশ এবং সভ্যতার অগ্রগতিতে বড় এক বাধা এবং সমস্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফেসবুকে কাজী রায়হান রাহীর সাথে বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত ফারাবী শফিউর রহমানের সাথে একখন্ড কথোকপথনের ঘটনার কথা আমরা জানি। নবীজির মৃত্যুর পর তার অল্পবয়সী স্ত্রী-রা পুনরায় বিবাহ করেছে কীনা এমন ধরণের প্রশ্ন রাহী রেখেছিলো। কিন্তু এই প্রশ্ন করায় নবীজির স্ত্রীদের সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্য করা হয়েছে বলে রাহী-কে দায়ী করা হয়েছিলো। বাংলাদেশ সরকারও এই ধর্মান্ধ মুসলিম মৌলবাদীদের সন্তুষ্ট করতে রাহী-র মত অল্পবয়সী তরুণকে সেইসময় গ্রেফতার করে এবং জামিন না দিয়ে নিজেদের রাজনীতিকে উগ্র মৌলবাদ বান্ধব করে তোলার প্রয়াস পাচ্ছে। আর সেই সরকারের মাননীয় মন্ত্রী যখন জনগণের সাথে থেকে তাদের ধর্মানুভূতি রক্ষার কথা বলেন, তখন সেটা একধরণের অন্ধত্ববাদিতার পদলেহন করে তাকে জিইয়ে রাখার করুণ-ভব্যতা বহির্ভূত অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।






ধর্মানুভূতি, মিডিয়া ও অবাঞ্চিত নাস্তিক্য চিন্তা – ২

যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞান ছাড়া এই মানব সভ্যতা এগুতে পারে কি? সেটা যদি নাই হয়ে থাকে, তবে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ দিয়েই রোগ-বালাই দূর করার চেষ্টা চালানো যেতে পারে। নিউটনের আপেল মাথায় না পড়ে উড়ে গেলো না কেন, এমন চিন্তাটাই মুক্তমনা হওয়ার প্রধান লক্ষণ। প্রচলিত ধ্যাণ-ধারণা এবং বদ্ধতার বাইরে ভাবেন বলে, আমরা পদার্থবিদ্যার জগতে আইনস্টাইনকে পাই, আর জীববিদ্যার জগতে ডারউইনকে। বলা হচ্ছে যে, জীববিজ্ঞান ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত – এর স্বপক্ষে রয়েছে হাজারো উদাহরণ। ক্যানাডার টোরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় বর্ষে পড়ুয়া আমার বোনঝিও যখন বলে, “Life science is based on evolution theory”, বাংলা ব্লগের কোন এক মহারথী বিবর্তনবাদকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে উঠে পড়ে লাগেন, তখন তার জ্ঞানের দৌরাত্ম কতটুকু, তা নিয়ে আর প্রশ্নের অবকাশ থাকে না।

রিচার্ড ডকিন্স মূলতঃ একজন জীববিজ্ঞানী। তিনি তার জ্ঞানের আলোকে ধর্মকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, এবং সবই দিয়েছেন নিজের পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে। সুতরাং তার রেফারেন্স টেনে কথা বলাটা তাকে নবী-র স্তরে উন্নীত না করে বলা যেতে পারে, বিজ্ঞানসম্মত তার বিশ্লেষণকে উদ্ধৃত করা। মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানের যতদূর অগ্রগতি হয়েছে, এখন পর্যন্ত কেউই কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোন ধর্ম বা ধর্মীয় গ্রন্থের কোন বিষয়-আশয়কে রেফারেন্স হিসেবে উপস্থিত করতে পারেন নি। এইখানে ধর্ম সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আর সম্ভবতঃ এই কারণেই এমেরিকার সংবিধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা পুরোপরি নিষিদ্ধ। আমরা বিবর্তনবাদ নিয়ে পড়াশুনা করবো (যদিও বাংলাদেশে বিবর্তনবাদ নিয়ে যে পড়াশুনা হয়, তাকে আধা-খ্যাঁচড়া বললে অত্যুক্তি হবে না), আবার বিপরীত দিকে বিবর্তন মনস্ক চিন্তাধারাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবো, তাতো হতে পারে না! তবে কি বিবর্তনবাদ মিথ্যা বা বিবর্তনবাদের মত এমন একটা বিদ্‌ঘুটে তত্ত্ব এই জগতে প্রচলিত আছে, সেটা জানার জন্য আধা-খ্যাঁচড়াভাবে বিবর্তনবাদ পড়ছি? অদ্ভূত তো! পড়ারই বা দরকার কি?

আপনি দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ চাইবেন, আবার বিপরীতে যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারার বিরুদ্ধে চাপাতিহস্ত হবেন, অথবা চাপাতিহস্তদের ফাঁদে পা দিয়ে তথাকথিত আস্তিক-নাস্তিকের বিভেদের ফর্মূলায় উঠতে-
বসতে নাস্তিকদের মুন্ডুপাত করবেন, এ কেমন কথা! নাস্তিক হওয়াটা ইসলাম ধর্মে অন্যায় হতে পারে, ইসলামধর্ম ত্যাগীরাও ধর্মের চোখে অত্যন্ত পাপী হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র! সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি কি এমনি এমনি অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলো এই কালে? একটা কথা আমি বারে বারে বলি, এখনও বলছি, এই পৃথিবীতে মানুষের স্থায়ীত্ব যত দীর্ঘ হবে, মানুষ যতই সম্মুখ পানে ধাবিত হবে, স্বভাবতঃই মানুষ তার আশ-পাশের সবকিছুকে নিয়ে প্রশ্ন করবে, কষ্টিপাথরে যাচাই করবে এবং চ্যালেজ্ঞ করবে। বিজ্ঞান তাই করছে। এতে নির্দয়-নিষ্ঠুরভাব ধর্মগ্রন্থগুলোও বাছ-বিচারের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ধর্মগ্রন্থের প্রতিটি বাণী, বাক্য, শব্দ, বর্ণ মানুষের পরীক্ষণ-নিরীক্ষণের কবলে পড়বে। মানুষের সীমা সীমিত, সেই সীমিত সীমায় সে অসীমের শক্তিকে বুঝবে কীভাবে, এধরণের গাল-গল্পে মানুষের মন ভরছে না, ভরেনি কখনো বলেই সবকিছুতেই প্রশ্ন রেখে উত্তর খোঁজা হচ্ছে, সে ধারাবাহিকতায় বিশ্বসভ্যতা এগুচ্ছে। এখানে অন্ধত্বের কানাকড়ি মূল্য নেই।

এই সত্যটা ব্লগার, ব্লগ জগতের একটা অংশ অনুধাবন করতে পারছে বলেই তারা মুক্তবুদ্ধি চর্চার জয়গান করছেন, সাহস দেখাচ্ছেন তাদের মতামত প্রকাশে। কিন্তু আরেকটা অংশ বিবিধ কারণে ধর্মের প্রসংগ এলেই, নিজেদের বাক্‌ স্বাধীনতাকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। ধর্ম নিয়ে কোন প্রশ্ন বা চ্যালেজ্ঞ চোখে পড়লে তারা তার থেকে শত হাত দূরত্বে থাকার নীতি অবলম্বন করছেন। পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধির চর্চার সেসব ব্লগারকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। আর নাস্তিক্যবাদের ছিঁটে-ফোঁটা দেখলে তো কথাই নেই, গালি-গালাজ, নিন্দায় চরমে উঠছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে নাস্তিক্যবাদ অলিখিতভাবে এক অপরাধমূলক আইন বলে সংশোধনী হিসেবে যুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। আপনি নাস্তিক হলে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিবিধ নৃ-গোষ্ঠীর চেয়েও নিম্নমানের নাগরিক অধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে পরিগণিত হবেন। এ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীদের কাছে ইহুদীরা যেমন। আপনার নাগরিক অধিকার আদৌ আছে কী না সেটাই এখন বিবেচ্য। না, আপনি এখানে অচ্ছুৎ, কোনভাবেই আপনাকে বাংলাদেশের নাগরিক বলা যাবে না। বাংলাদেশে আপনার আদৌ স্থান নেই। এইজন্যই আপনার নিরাপত্তা না দিয়ে, আপনাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পুলিশ মহোদয় উপদেশ দিচ্ছেন, সরকার জেনে-শুনেও আপনার নিরাপত্তা দেবেন কোন দুঃখে। তাকে তো অন্ধ ধর্মীয় মৌলবাদকে পাশে নিয়ে চলতে হয়। নতুবা সরকারের পায়ের তলায় মাটি থাকে না। এমনই একটা ধর্মীয় গোঁড়ামীর জালে বাংলাদেশ আবদ্ধ যে, এ থেকে নিস্তার পেতে হলে ‘জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি’ করতে হয় বৈকি!

অচলায়তন ভাঙ্গার সময় হয়েছে বলেই অভিজিৎ, অনন্ত, নিলয়-কে জীবন বিসর্জন দিতে হয়। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে লেখালেখি করি বলে ব্লগ জগতের মহারথী ’৭১ টিভি মিডিয়ায় নিজের গৌরব প্রকাশের দম্ভ দেখান, অথচ মুক্তিবুদ্ধি প্রচারের স্বাধীনতা রুদ্ধ হওয়াটা তিনি চোখ মেলে দেখেও দেখেন না। ৪৪ বছর আগের বাস্তবতা নিয়ে তিনি তার কলমে ঘাম ঝরান, কিন্তু বর্তমানের সংকটকে দেখেও সযত্নে, স্বার্থবাদিতায় জড়িয়ে যান। হয়ে উঠেন সরকারের বশংবদ।

’৭১-এর ধারবাহিকতায় সমাজ, মানুষ এবং সভ্যতার অগ্রগতির জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করে এ পর্যন্ত যারা শহীদ হয়েছেন বর্তমান সময়ে অভিজিৎ, অনন্ত, নিলয় অগ্রগণ্য হয়ে থাকবেন। তারা বাংলাদেশের জনগণের দেখায়, শোনায় এবং চিন্তায় নতুন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার প্রয়াস পেয়েছেন। জনগণের চোখ-কান এবং মননে যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতে ছিলেন সজাগ সৈনিক। ’৭১-এ স্বাধীনতাই আমরা অর্জন করেছি, কিন্তু আমাদের মুক্তবুদ্ধির বিকাশে যে বন্ধ্যাত্ব চলছিল, তাতে তারা নাড়া দিয়েছেন বলেই হুমায়ুন আজাদ-এর মতই মৌলবাদের ক্রোধান্ধের বলি হলেন।

বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডে সব ধরণের অনুভূতি নিষ্পিষ্ট, জর্জরিত হলেও শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভূতিটা বড় বেশি অটুট রাখাটা জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম পূর্বে কখনো এমন ধরণের কোন সংকটে নিপতিত হয় নি। ’৭১-এর আগে ও পরে বাম-রাজনীতির কমিউনিস্টরা ধর্মকে অস্বীকার করলেও ইসলাম বা অন্য কোন ধর্ম তখনও এমন সংকটে পড়েনি। এখন দু’চারজন ব্লগার তাদের লেখনীতে ইসলাম ধর্মের জন্য এমন সংকটের সৃষ্টি করেছে যে, একে ইনকিউবেটর বা ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে)-এ রাখা ছাড়া উপায় নেই। বাংলাদেশের মুসলিম জনগণের ধর্মানুভূতি এখন দারুণভাবে বিপর্যস্ত। পাইক-পেয়াদা দিয়ে তাকে সংরক্ষণ করতে হবে। পাইক-পেয়াদা ও তাদের হর্তাকর্তা সরকার বেশ উদাসীন ছিলেন বলে চাপাতি-প্রাণ কিছু মুমিন মুসলিম নাস্তিক-কাফের ব্লগারদের উপর ধর্মীয় আক্রোশে চাপাতিহস্ত হয়েছেন এবং কাপুরুষের মত জান-কবচ করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জানি না, আজরাইলের অংশগ্রহণ কতটুকু ছিলো সে জান-কবচে, আমার জানার খুবই ইচ্ছে। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এই ধর্মানুভূতিতে আঘাত নিয়ে ভীষণ চিন্তিত।


ডারউইন ধর্ম পালন করতেন কী না জানি না। কিন্তু তার বিবর্তনতত্ত্ব ভীষণভাবে ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেছে, ধর্মগুলো সম্পূর্ণভাবে চ্যালেজ্ঞের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোন বক্তব্য আছে কী না, জানা নেই। বিগত ১৫০ বছরে ডারউইনের সেই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ধর্মের প্রতি সেই চ্যালেজ্ঞ এমন এক পর্যায়ে উন্নীত যে, “১৯৯৫সালে আমেরিকার বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের মধ্যে চালানো জরীপে (Gallup poll, 1995) দেখা যায় এদের মধ্যে মাত্র ৫% সৃষ্টিবাদী, বাকি সবারই আস্থা আছে বিবর্তন তত্ত্বে। আর যারা জীববিজ্ঞান এবং প্রাণের উৎস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের মধ্যে তো ইদানিংকালে সৃষ্টিবাদীদের খুঁজে পাওয়াই ভার। ৪,৮০,০০০ জন জীববিজ্ঞানীদের উপর চালানো জরিপে মাত্র ৭০০ জন সৃষ্টিতাত্ত্বিক পাওয়া গেছে, শতকরা হিসেবে যা ০.১৫ এরও কম। কিন্তু এদের মধ্যে আবার অনেকেই প্রাণের প্রাথমিক সৃষ্টি কোন এক সৃষ্টিকর্তার মাধ্যমে হয়েছে মনে করলেও তারপর যে প্রাণের বিবর্তন ঘটছে প্রাকৃতিক নিয়মেই তা মেনে নেন। এ জরিপের ফল শুধু আমেরিকার ভেতর থেকেই উঠে এসেছে, যে দেশটি আক্ষরিক অর্থেই ‘সৃষ্টিবাদীদের আখড়া’ হিসেবে পরিচিত এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে অনেক বেশী রক্ষণশীল। এদিক দিয়ে অনেক বেশী প্রগতিশীল থাকা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন সৃষ্টিবাদী বিজ্ঞানী নেই বললেই চলে।

বহু বৈজ্ঞানিক সংগঠন বিবর্তনের স্বপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণকে এতই জোরালো বলে মনে করেন যে, বিবর্তনের সমর্থনে তারা নিজস্ব statement পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত National Academy of Science এর মত প্রথিতযশাঃ সংগঠন ১৯৯৯ সালে বিবর্তনের স্বপক্ষে লিখিত বক্তব্য দিয়ে একটি ওয়েবসাইট পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। ১৯৮৬ সালে লুজিয়ানা ট্রায়ালে বাহাত্তর জন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী সুপ্রিম কোর্টে বিবর্তনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন প্রদান করেছিলেন।

জীববিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ববিজ্ঞান, জেনেটিক্স, জিনোমিক্স বা আণবিক জীববিদ্যার কোন শাখাই বিবর্তনের কোন সাক্ষ্যের বিরোধিতা করছে না; … ডারউইনের পরে গত দেড়শো বছরে … বিবর্তন তত্ত্ব পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত হয়েছে। জেনেটিক্সের বিভিন্ন শাখার গবেষণা যে গতিতে এগিয়ে চলেছে তাতে আশা করা যায় আমরা অচিরেই আরও অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পেতে সক্ষম হব। আর বিজ্ঞানীরা সে লক্ষ্যেই নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।” [বিবর্তনের পথ ধরে (পরিশিষ্ট), পৃষ্ঠা ২২-২৩, বন্যা আহমেদ]।

সৃষ্টিবাদী তাদেরই বলে, যারা মনে করে, বিশ্বের এই তাবৎ প্রাণীকূল কোন এক সৃষ্টিকর্তার দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। উপরের উদ্ধৃতি থেকে ভালভাবেই প্রতীয়মান যে, বাংলাদেশ এবং তার জনগণ বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে এখনো যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করার মত মানসিকতায় উপনীত হয়নি। আর এ কারণেই ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের নগ্ন ফ্যাসিবাদী আচরণ এই ভূ-খন্ডে নির্মম হয়ে উঠেছে। দু’টি বিরুদ্ধ মত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকার যে দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হবার প্রয়োজন, সেই সংস্কৃতি থেকে আমরা অনেক দূরবর্তী। আমাদের ইসলাম ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, এই উদ্যত-উগ্র মনোভাব ভিন্নমতের বিকাশের পেছনে বড় অন্তরায়।

সে সাথে যারা প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান এবং দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সভ্যতাকে হৃদ্য করছে, তাদের বেড়ে ওঠার, বেঁচে থাকার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এই উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ। রাষ্ট্র নিজেকে এতই দুর্বল করে তুলেছে যে, সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে বেরিয়ে এসে এই নষ্ট ধর্মীয় মৌলবাদীতার সাথে আপোষকামী হয়ে উঠেছে। অথচ আমাদের ‘৭১-এর স্বাধীনতার মূলনীতি থেকে সেটা অনেক দূরে সরে আসা। এর জন্য দায়ী কে? সেটা হবে ভিন্ন এক আলোচনা। রাষ্ট্রকে এতটুকু সতর্ক থাকা উচিত যে, হিটলারেরও জার্মানীতে বিপুল জনসমর্থন ছিল। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও সে সময় সেভাবে দানা বাঁধতে পারেনি। বর্তমান সরকার যদি এই অন্ধ মৌলবাদী জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার ছক আঁকে, তবে তা সেরকম রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় পরিবেশের দিকে আমাদের ঠেলে দেবে, যার ফলাফল হিটলারের জার্মানীর মত ভয়াবহ না হলেও তালেবানী আফগানিস্থানের মতই হবে ভয়াবহ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে ধর্মবাদী ধার্মিক এবং যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনারা সহ-অবস্থানের নীতিতেই চলছে সব ধরণের সংঘাত এড়িয়ে। বাংলাদেশে তা সম্ভব না হওয়ার জন্য দায়ী অন্ধ মৌলবাদী জনগণ এবং তাদের সরকার। আর তাই এই জনগণের সেন্টিমেন্ট বুঝে চলার নীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশের সরকার, মিডিয়ায় মন্ত্রী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বক্তব্য তারই প্রমাণ দিচ্ছে অনায়াসে।


বিজ্ঞান যুক্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর এসব কিছুই মুক্তমন এবং মুক্তবুদ্ধিতেই করতে হয়। যে কোন পূর্বতর সংস্কার এবং আবদ্ধ বিশ্বাস আমাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির লাগাম টেনে ধরাটাই খুব স্বাভাবিক। সৃষ্টিশীল এবং সৃজনশীলতার বিকাশে পরিপূর্ণ স্বাধীন চিন্তা ভীষণ অপরিহার্য। সুতরাং নবীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাবনায়, পুরাতন সব কিছুই চ্যালেজ্ঞের মুখোমুখি হবেই। এতে আপনার জন্ম থেকে প্রাপ্য লালিত বিশ্বাসীয় অনুভূতি আঘাত প্রাপ্ত হয়, দায় আপনারাই। এ নতুন কালের বাস্তবতায় আপনাকেই আপনার অনুভূতি্র রাশ টেনে ধরতে হবে। আপনার প্রাচীন এই অনুভূতিকেই যুগের বাস্তবতায় তাবৎ প্রশ্ন এবং চ্যালেজ্ঞের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। অন্যের চিন্তার রাশ টানার অধিকার আপনাকে সংবিধানে দেয়া হয় নি। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত বিশ্বে, স্বাধীন মত প্রকাশকে অনেক আগেই যায়েজ করা হয়েছে।

একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, স্বনামধন্য জহির রায়হানও এই ইসলামী মৌলবাদীদের চরিত্র নিরূপণ করেছিলেন, তার ছাত্রাবস্থায়, “ … আজকের যুগে জন্মগ্রহণ করেও এ যুগের সাথে তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। বিজ্ঞানকে তারা অবজ্ঞা করছে। দর্শনকে করছে অস্বীকার। যুক্তিতর্ক মানতে তারা কোন সময়েই প্রস্তুত নয়। অন্ধ ভক্তির দর্শনে সকল যুক্তিকে নস্যাৎ করার জন্যে এরা সব সময় খড়গ হস্ত। বৈজ্ঞানিক ও সুচিন্তিত যুক্তিতর্ক নিয়ে যদি কেউ এদের সম্মুখীন হয় – তাহলে ভয়ে এদের বাকরুদ্ধ হয়, বুক দুরু দুরু করে, নাভিশ্বাস উঠে। তখন দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এরা চিৎকার করে বলে উঠে, ‘আমরা যা বলছি তা বিনা যুক্তিতেই বিশ্বাস করো। কেননা বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।” এরপরেও যদি কেউ যুক্তি যুদ্ধ চালাতে তৎপর হন, তাহলে আঃর রক্ষে নেই। এরা এদের অন্ধভক্তদের আপনার পিছনে লেলিয়ে দেবে। আঃর তারা আপনাকে শুধুমাত্র জাহান্নামে যাও বলে ক্ষ্যান্ত থাকবে না। আপনার ধড় থেকে প্রাণটাকে বিচ্ছিন্ন করে তবে তৃপ্ত হবে।” [জহির রায়হানের ১৯৫৬ সালের ডায়েরী থেকে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।]

সুতরাং দ্বন্দ্বটা হচ্ছে, নতুন জ্ঞান আহরণের দিকে ধাবিত হওয়ার সাথে প্রাচীন বিশ্বাস এবং মূল্যবোধে আজীবন আকঁড়ে থাকার।

সম্প্রতি ভারতে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র মাঝি (MANJHI)-র কেন্দ্রীয় চরিত্র দশরথ মাঝিকে চলচ্চিত্রের শেষের দিকে জিজ্ঞেস করা হয় এক সাংবাদিকের ভাষ্যে, আপনি তো একজন সুপারম্যান, অসম্ভবকে সম্ভব করার পর আপনি কিছু একটা বলুন! তখন মাঝি উত্তর দিয়েছিলেন, ভগবানের উপর খুব বেশি নির্ভর করো না। সম্ভবতঃ ভগবানই আমাদের উপর নির্ভর করে আছে। তারপর তিনি হে হে করে যেভাবে হাসতে থাকেন, মনে হলো, আমাদের পুরো সমাজ বাস্তবতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অগাধ সত্যই যেন উচ্চারিত হলো, এক উপভোগ্য পরিহাসে। কবি নজরুলের কথার (মানুষ এনেছে ধর্ম, ধর্ম আনেনি মানুষ কোন) অন্য এক অনুরণন খুঁজে পাই মাঝির বক্তব্যে। বাংলা সাহিত্য দেব-নির্ভরতা বা দেব-বন্দনা থেকে বেরিয়ে এসেছে সেই মধুসূদনের আধুনিক কালের সূচনার ঠিক আগে আগেই, গেয়ে গেছে মানুষের অবারিত উন্মোচনের গান, তার অজেয় শক্তি ও অনুভূতির সুনিপুণ চিত্রাঙ্কন।

কিন্তু এখন আমাদের ভেতরের আদিম-প্রাচীন গুহায় নিত্য নতুন আলোর ঝলকানি আঁধারের মানুষদের ভীত করে তুলেছে। তারা ‘৭১-এ যেমন ইসলাম ধর্মের নামে মানবতার বিরুদ্ধে গণ-ঘাতক হয়ে উঠেছিলো, মানুষ হত্যা, লুটতরাজ, মা-বোন-কন্যাদের ধর্ষণের বস্তু বানিয়েছিলো, হিন্দু-মুসলিম অমানবিক এক ভেদাভেদ টেনে জাতিসত্ত্বাকে বিধ্বস্ত করেছিলো, এখনও সে ধারাবাহিকতায় আস্তিক-নাস্তিক ইস্যু তুলে দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের প্রান্তে তুলে দিতে অতি তৎপর। আর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীরাই তাই তাদের গোঁদের উপর বিষফোঁড়া বলে তাদেরকে নিধন করাটা অতীব জরুরী হয়ে উঠেছে।

রাজনীতির সংস্পর্শে কোন কিছুকেই শুদ্ধ রাখা সহজ নয় বলে রাজনৈতিক ইসলামের এক ভয়াবহতা (যা থেকে রাষ্ট্র ‘৭১-এ বেরিয়ে আসতে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করেছিলো) রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দিয়ে ধর্মান্ধ ইসলামী মৌলবাদ তাদের দায়িত্বের শেষ এবং শুরুকে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে উত্তরণে ব্লগারদের যথাযথ ভূমিকাই পালন অত্যাবশ্যক। প্রচলিত সরকার বা রাজনীতির তল্পি বহনকারী হিসেবে ব্লগারদের নিজেদের পরিচয় উন্মোচন করলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। সেই গুরু দায়িত্ব থেকেই ব্লগারদের সত্য উচ্চারণের কন্ঠকে আরো উচ্চকিত করতে হবে। এই অনলাইনের যুগে মুক্তমত প্রকাশে সরকার এবং মৌলবাদের স্বার্থে, কোন রকমের মুখা (MUZZLE ME NOT) পরিয়ে দেবার মত ছলচাতুরীকে দারুণভাবে উপেক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাতির বিবেককে এ সময়ে ধারণ করতে পারে, একমাত্র ব্লগাররাই, তাদের চিন্তাশীল এবং মেধাবী লেখনীতে।