Saturday, May 14, 2016

একাত্তরে তুরস্কের সাথে যুদ্ধ হলে শহীদের সংখ্যা হতো ৯৭ লক্ষ…

একাত্তরে তুরস্কের সাথে যুদ্ধ হলে শহীদের সংখ্যা হতো ৯৭ লক্ষ…

arm1915
প্রত্যেক ঘটনার দুটো দিক থাকে। নিজামীর ফাঁসির পর তুরস্কের মন্তব্য সামনে নিয়ে আসছে তুরস্কের গনহত্যার কথা। যেই গনহত্যা ছাড়িয়ে যায় ১৯৭১ সালে পাক আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চালানো গনহত্যাকেও।
remember1915
১৯১৫ সালে তুরস্ক আর্মেনিয়ানদের ওপর যে গনহত্যা পরিচালনা করা হয়েছিলো তার ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে গত বছর। আর্মেনিয়ানরা এখনো স্বীকৃতি পায়নি ঘাতক তুর্কিদের কাছ থেকে, আমরাও স্বীকৃতি পাইনি পাকিস্তানের কাছে। এখনো আর্মেনিয়ানরা লড়ছে তাদের কাঙ্ক্ষিত গনহত্যার স্বীকৃতির জন্য। তুরস্কই সম্ভবত পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসে এক মাত্র জাতি যারা লাগাতার ১০০ বছর একটা জাতির আর্মেনিয়ার ওপর চালানো নির্মম গণহত্যাকে অস্বীকার করে আসছে। আর্মেনিয়ানর মানুষও লাগাতার বিগত ১০০ বছর ধরে ১৯১৫ সালে তাদের ওপর চালানো গনহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে আসছে তুরস্কের কাছে।
armnia100birdwhit
সে হিসেবে পাকিস্তান তো নবীন।
পাকিস্তান তো মাত্র ৪৫ বছর ধরে অস্বীকার করছে নিজেদের অপরাধ…
deadhead
তুরস্ক আর পাকিস্তান একই কোম্পানির একই প্রোডাক্ট, খালি মোড়কটা আলাদা- এই যা। নিপীড়ক তুরস্কের কাছ থেকে কিছু শেখার না থাকলেও আমাদের নিপীড়িত বন্ধু আর্মেনিয়ার কাছে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। অন্তত দুইটা জিনিস আর্জেন্ট শেখা দরকার আমাদেরঃ
১) আর্মেনিয়া আমাদের মত স্বজাতির গনহত্যা লুকায় না।
২) আর্মেনিয়ায় জেনোসাইড ডিনায়াল’ল আছে।
hargor
পৃথিবীর যে কোন মানুষ যদি গনহত্যা নিয়ে একাডেমিক পড়ালেখা করতে চায়, যদি তারা গনহত্যা পরিচালনাকারী প্রথম পাঁচটা দেশের নাম খোঁজ করে পড়ালেখা করে তাহলে তাদের পাকিস্তানের আগে তুরস্কের নাম পড়তে হয়। দুটো দেশই গনহত্যার ভয়াবহতায় লিস্টের প্রথম দিকে স্থান করে নিয়েছে।
আর্মেনিয়া জর্জিয়া ও আজারবাইজানের সাথে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের স্থলযোজকের উপর অবস্থিত। ইয়েরেভান আর্মেনিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের “হায়” বলে থাকে। আর্মেনিয়ার ৯০% লোক এই “হায়ঃ জাতির লোক। দেশটি ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কিরা আর্মেনিয়াদের ওপর নির্বিচারে গনহত্যা চালায়।
vaskorjo
একটি রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ধরে নিলে তাদের ওপর গনহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হয়। ১৯১৫ সালের আর্মেনিয় গনহত্যা তারই উজ্জ্বল প্রমান। ষাটের দশকে আমারাও ছিলাম পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠীর চোখে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সামরিক রাষ্ট্র অটোমানদের সঙ্গে পাকিস্থানের অনেক অনেক মিল। তিন বছরে ধরে চলমান এই গনহত্যায় সেই দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ মারা যায়। সে সময় সেই গণহত্যায় আর্মেনিয়ার প্রায় ৪৩% থেকে ৫৮% জনগোষ্ঠী নিঃশেষে হয়ে যায় মাত্র তিন বছরে।
armenia1.5
একটু লক্ষ্য করলে আমরা দেখি একটা দিক দিয়ে কিন্তু আর্মেনিয়ানরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। সেটা হচ্ছে তারা অন্তত তাদের নিজের দেশের ওপর চলা গনহত্যাকে অস্বীকার করে না, আমরা করি। তারা পনেরো লাখ শহীদ কে দেড় লাখ বলে না যেমন আমরা অনেকে ১৯৭১ সালের শহীদের সংখ্যা তিরিশ লাখ থেকে তিন লাখে নামিয়ে আনতে কুণ্ঠা বোধ করি না।
মূলত আর্মেনিয়ার গনহত্যার নিয়ে তিনটা বয়ান শোনা যায়- ৮ লাখ, ১৫ লাখ, ২০ লাখ।
তবে সবাই মিলে সংখ্যাটা ১৫ লক্ষ বলে মেনে নিয়েছে।
এটা সেখানে একটা আইকনিক ফিগার।
এই ১৫ লাখ শহীদদের নিয়ে অসংখ্য সাহিত্য রচনা করা হয়েছে।
কেউ এটা নিয়ে বিতর্ক করে না।
armgenoblk
গণহত্যা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য আর্মেনিয়ার গনহত্যা থেকে একটা শিক্ষাও নেয়ার আছে।
এই গনহত্যায় তাদের জনসংখ্যার ৪৩%-৫৮%কে হত্যা করেছিলো।
১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখে শুরু হয়ে চলতে থাকে ১১ নভেম্বর ১৯১৮
অর্থাৎ প্রথম বিশ্ব-যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই গনহত্যা চলতে থাকে।
অর্থাৎ এই গণহত্যা চলেছে ৪০ মাস ১৮ দিন ধরে।
58prc
আসুন হিসেব করে দেখা যাক যদি ৪০ মাসে যদি আর্মেনিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৪৩%-৫৮% কে মেরে ফেলতে পারে তুর্কিরা,
তাহলে একই অনুপাতে তারা ৯ মাসে কত বাঙালীকে হত্যা করতে পারতো?
হিসাব করে দেখা যায় সংখ্যাটা ১৩% এর উপরে।
পাকিস্তানীরা নয় মাসে হত্যা করেছিলো আমাদের জনগোষ্ঠীর ৪%।
অর্থাৎ আর্মেনিয়ার গনহত্যা আমাদের তুলনায় ৩ গুণের বেশি ভয়াবহ ছিলো।
অথচ এই ৪%- অর্থাৎ তিরিশ লক্ষ শহীদকে মেনে নিতেই আমাদের এত সমস্যা এত প্রশ্ন!!!
এই হিসাবে চিন্তা করলে ১৯৭১ সালে যদি তুরস্ক বাংলাদেশে আক্রমণ করতো তাহলে শহীদের সংখ্যা হত ৯৭ লক্ষ ৫০ হাজার কিংবা তার চেয়েও বেশি। দেখা যাচ্ছে তুরস্কের নিজামীর ফাঁসি নিয়ে বাড়াবাড়ি আমাদের একটা উপকার করেছে- মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতাকে নিয়ে যারা সন্দেহ করে তাদের ধরে ধরে দেখানো যাচ্ছে বিশ্বময় গনহত্যার খতিয়ান।
remember1915

বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্বে ও পরে অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ।

বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্বে ও পরে অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ---

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
-জীবনানন্দ
৯০ সালের আগে ও নব্বই দশকে ভারতের বাবরি মসজিদের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অমুসলিমদের উপর বয়ে যায় সাম্প্রদায়িক ঝড়। সেই ঝড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়, কেউবা রাতের আধারে সাম্প্রদায়িক আমলার শিকার হোন,কেউবা হোন-পুলিশের উপস্থিতিতে নির্যাতিত। মিডিয়ার কল্যাণে এতো বছর পরও বাবরি মসজিদের ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের মন থেকে বিস্মৃতি হয় নি। কিন্তু মুছে গেছে বাবরি মসজিদ ভাঙার সাথে বাংলাদেশের সেই সব মানুষগুলোর কথা,যারা কোনভাবে এই ভাঙার সাথে যুক্ত না হয়েও বাবরি মসজিদ ভাঙার খেসারত দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি পুরোপুরি চেপে যায়। এই ইন্টারনেটের যুগেও আপনি গুগল করে দেখলে আশ্চর্য হবেন যে,বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশে কী হয়েছিল তার কোন বিশদ উল্লেখ নেই। যদি উল্লেখ থাকেও তাও এক দুই লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বলা যায়, এই বিষয়ে লেখা-লেখি কিংবা জানতে চাওয়াও বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এক ধরণের অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ১৯৮৮ সালে এরশাদ যখন রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করল, এর সাথে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক হামলা। বাবরি মসজিদে ভাঙ্গার আগেও অনেক ভাবে বাবরি মসজিদভাষার বিষয়ে গুজব রটিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করা হয়। এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার আগে সারা দেশে হিন্দুদের উপর কয়েক দফা হামলা শুরু হয়। বাংলাদেশে তিনটি সম্প্রদায়ের উপর নিয়মিত নির্যাতন চলে আসছে।–হিন্দু সম্প্রদায়, আদিবাসী সম্প্রদায় (যারা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, আহমদিয়া সম্প্রদায় (যারা কয়েক লাখ থেকে কয়েক হাজারে নেমে এসেছে, ধর্ম পালন করতে হয় গোপনে)।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোন সীমারেখা নেই। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মানুষ মঙ্গল গ্রহে বসবাস করার সাহস দেখাচ্ছে। হয়তো একদিন মানুষ সেখানে মানব বসতিও গড়বে। ধারণা করি, সেখানে কোন সাম্প্রদায়িক ঘটনা হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে! ভারতে কংগ্রেসের ব্যর্থতায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ধর্মীয় ফ্যাসিজম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানকার অনেক মানুষ এর প্রতিবাদ করছে। যেমন-লেখকরা জাতীয় পুরষ্কার বর্জন করছেন, পরিচালকরা পুরষ্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে আমরা কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের উপর সাধারণ মানুষের চাপ প্রয়োগ তা দেখতে পাই। অথচ একই বিষয় বাংলাদেশে হলেও এখানে রাষ্ট্রে ভিন্ন-সম্প্রদায়ের উপর হামলার কথা স্বীকার করছে না, সংসদে এই নিয়ে কোন আলোচনাও করছে না, লেখক-বুদ্ধিজীবী সবাই বালুতে মাখা গুজে বসে আছেন। কবির পংক্তি বলতে হয়-
“আজ ধর্ষণের দিন, কৃষ্ণ গেছে দূর পরবাসে।
ইতিহাস মাথা গোঁজে মৌলবাদী শিশ্নসমাবেশে।”
বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার শুরু বাবরি মসজিদ থেকে নয় বরং স্বাধীনতার পরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে হামলা হয়ে আসছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এসে দেখল তাদের বাড়ি দখল করে পেরেছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। এছাড়াও পাকিস্তান আমল থেকে শত্রুর সম্পত্তি নামক একটি কালো আইন বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলে সহায়তা করছে। বাংলাদেশের ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের সম্পত্তি কতোটুকু নিরাপদে রাখতে পারছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঢাকার জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কিছু জমি এখনও দখল হয়ে আছে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে যেখানে জাতীয় মন্দিরের জমি দখল হয়ে যায় সেখানে সামগ্রিক পরিস্থিতি কতোটা নাজুক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (নিউজ লিংক-এখানে)
১৯৭৩ সালে সাভারে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানদার কাগজ দিয়ে বিড়ি বানাচ্ছিলেন। সেই কাগজের ভিড়ে আরবি লেখা কাগজও ছিল। কে বা করা এলাকায় রটিয়ে দিলে যে, এই দোকানে কোরানের পাতা ছিঁড়ে বিড়ি বানানো হচ্ছে। মুহূর্তে শতশত লোক ঐ দোকানে হামলা করে দোকানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে দোকানদার আগেই পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর বড় হামলা শুরু হয় ৯০ দশক থেকে। বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ মানুষকে দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়। এর পর বড় হামলা আসে ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা আসার পর। সেই সময় পূর্ণিমা নামের একটি বাচ্চা মেয়েকে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে। মেয়ের জীবন বাঁচাতে অসহায় মা ধর্ষকদের পা’চেয়ে ধরে বলেছিল; আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে যাও! ২০০১-এর পর ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিচার একমাত্র পূর্ণিমা পেয়েছে তাও ১০ বছর পর ৪ মে ২০১১ তে! এরকম হাজারো পূর্ণিমা নির্যাতিত হয়েছেন, নীরবে দেশ ত্যাগ করেছেন। বাবরি মসজিদের সময় বাংলাদেশের পত্রিকা ও সরকার যেহেতু ধামা-চাপা দিয়ে দিয়েছে সেহেতু সেই সময়টা বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে ২০০১ সালের ঘটনাগুলি। ২০০১ সালের পর কী হয়েছিল নিম্মে ছবির মাধ্যমে তার ক্ষুদ্র একটি অংশ তুলে ধরা হলা।
Purnima
ঈ
রা
c
2001
20000
20001
200001
Ramshil
chott
এরপর বাংলাদেশে বড় হামলা হয় কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ১ অক্টোবর। ফেসবুকের কথিত একটি ছবিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শত বছরের পুরাতন রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষগুলোর উপর হামলা চালানো হয়। সেই হামলায় অংশ নেয়-মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে স্থানীয় মুসলমানরা। যারা সবাই ছিল আওয়ামী,বিএনপি,জামাত থেকে শুরু করে সকল দলের নেতাকর্মী! তৎকালীন রামু থানার ওসি বলে-পুলিশের পোশাক পরা না থাকলে আমি নিজেও হামলায় অংশ নিতাম। এই ঘটনায় যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে যায়। এবং সেই জামিনের ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। বাবরি মসজিদে হামলার ২০ বছর ২৫ বছর স্মরণে বাংলাদেশের পেপার পত্রিকায় বিভিন্ন সম্পাদকীয় লেখা হলেও বাবরি মসজিদের কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর উপর কী দিয়ে বয়ে গেছে তা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ তারা করে না। ফলে বাবরি মসজিদের ঘটনার পর বাংলাদেশে যে নির্যাতন হয়েছে তা আমাদের মিডিয়া ও সরকার সফল ভাবে চেপে যেতে সক্ষম হয়েছে।
কক্সবাজারের রামু
কক্সবাজারের রামু
জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও এরশাদের হাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের খৎনা হয়ে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সংবিধানে যুক্ত করে অঘোষিতভাবে অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরশাদ সংবিধানের সংশোধনী করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ তাদের ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালের সরকার আমলে তা বাতিল না করে আজ পর্যন্ত বহাল রেখেছে! এছাড়া ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানি আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ বাতিল না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার নাম রেখেছিল ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। এসবই হচ্ছে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। বর্তমান সরকার যেহেতু মদিনা সনদে দেশ চালাচ্ছে সেহেতু এটি স্পষ্টত যে ১৯৭২ এর সংবিধানে আওয়ামীলীগ নিজেও ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলা হয় ৯০ সালে,এরশাদের উস্কানিতে। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। এছাড়াও পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। ১৯৭১ সালে মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল হিন্দু, ১৯৮১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১২.১ শতাংশে,১৯৯১ সালে ১১ ও ২০০১ সালে ৯ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশে এসে ঠেকেছে। তারপরও রাষ্ট্র বিবৃতি দিচ্ছে দেশে অমুসলিমরা নিরাপদে আছে!
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘গণ-তদন্ত কমিশন’ ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সাত দফা সুপারিশ পেশ করেছে।
দফাগুলো হচ্ছে :
১. বাংলাদেশ একটি বহু-ধর্মীয় ও একাধিক জাতিসত্তা-ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সে কারণেই ধর্মনিরপেক্ষতা হলো জনসাধারণের সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নতির পূর্বশর্ত_এ বিশ্বাসে সরকারকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং জনগণের মধ্যে তার এই নৈতিক অবস্থান ও তার কার্যকারণ স্পষ্টাকারে তুলে ধরতে ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে প্রশাসনিক, নিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সব রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমঅধিকার-নীতির প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘু নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা নিরোধকল্পে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে জনপ্রশাসনে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীতে পুলিশ, বিডিআর, আনসার, সেনাবাহিনী ইত্যাদিতে ক্রমবর্ধমান হারে নিয়োগ করে এ উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে।
২. সংবিধানে পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি-কোন থেকে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী যেসব বাতিল করে সংবিধানকে ১৯৭২ সালের আদিরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সরকারকে।
৩. রাষ্ট্র-দর্শনে ধর্ম সম্পর্কে কোন একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটানো ও তদনুযায়ী প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করা যাবে না। কারণ, রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিতে সব ধর্ম সমান।
৪. (ক) সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও উপজাতিসহ সব ধর্মীয়, ভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে জাতির মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন-কারী ও বৈষম্যমূলক যেসব আইন বা সরকারি বিধিনিষেধ প্রণীত হয়েছে, যা তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে সংকুচিত করেছে (যেমন অর্পিত সম্পত্তি আইন, উত্তরাধিকার আইন) সেগুলো বাতিল করতে হবে।
(খ) ১৯৯৭ সালে স্বীকৃত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’র সব প্রস্তাব যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে দৃঢ় ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সেখানকার পার্বত্য সংখ্যালঘুদের মনে আস্থা ও শান্তি ফিরে আসে এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
(গ) দেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোন নাগরিকের দেশের যে কোন অঞ্চলে বাস করার অধিকার স্বীকৃত হলেও, সরকার এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না, যাতে কোন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আদিবাসী-অধ্যুষিত জেলাগুলোয়, সিলেটে মনিপুরী ও খাসিয়া জন-অধ্যুষিত অঞ্চলে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো এলাকায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় জন-তাত্ত্বিক অনুপাতে দৃশ্যমান বৈষম্যের সৃষ্টি না হয় এবং স্থানীয় ও বহিরাগত সংকট দেখা না দেয়।
(ঘ) ১৯৯২ সালে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত (৪৭/১৩৫ নং প্রস্তাবনা) ‘জাতিগত অথবা নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় অথবা ভাষা-গত সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের অধিকারের ঘোষণায়’ তাদের অধিকার রক্ষায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যেসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ১-৮), বাংলাদেশ সরকারকে সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গৃহীত ব্যবস্থাদি সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।
(ঙ) সংখ্যালঘুদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহাসিক, পারিবারিক ও উত্তরাধিকার নিয়ম-কানুন গুলোর স্বীকৃতিকে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত করে এই জনগোষ্ঠীভুক্ত জনমানুষের জাতীয় মূল স্রোতের অঙ্গীভূত করা, নিজেদের স্বকীয়তাকে বিসর্জন না দিয়ে_এই লক্ষ্যে সরকারকে নিশ্চিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
(চ) জাতিসংঘ মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণা কোন রাষ্ট্রের জাতিধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকের যেসব অধিকার (বিশেষ করে ধারা-৩ থেকে ৭, ১২, ১৬, ২০, ২১খ ধারায় বর্ণিত অধিকারগুলো) নিশ্চিত করা হয়েছে, তা রক্ষা করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
৫. (ক) সংখ্যালঘু জনগণের ওপর যে আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে, প্রকাশ্যে তার নিন্দা জ্ঞাপন করতে হবে।
(খ) অবিলম্বে সব শ্রেণীর সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোন ধরনের নির্যাতন বন্ধ করা ও উপদ্রুত এলাকার নির্যাতনকারীদের, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নির্বিশেষে উপযুক্ত বিচারের সম্মুখীন করাতে হবে।
(গ) সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন রোধ ও নিরাপত্তা-দানের জন্য পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে দৃঢ় ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করাতে হবে।
(ঘ) সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা-দানে ব্যর্থ হয়েছে, তার বা তাদের বিরুদ্ধে কর্তব্য-চ্যুতির দায়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা।
(ঙ) ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ-দান সুনিশ্চিত করা।
৬. (ক) দেশের অভ্যন্তরে বাস্তু-চ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
(খ) দেশত্যাগীদের সুষ্ঠু পরিবেশে দেশে প্রত্যাগমন করিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৭. অনতিবিলম্বে বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠন সম্পূর্ণ-করণ। এ কমিশনের অবশ্যই ‘সংখ্যালঘু, নারী, শিশু-বিষয়ক’ পরিচ্ছেদগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে এবং সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে।
তবে এসব দফা কাগজে কলমেই থেকে যায়। কোন সরকার এসব দফা কার্যকর করতে উৎসাহী নয়। আশি ও নব্বরই দশকের বাবরি মসজিদের ঘটনার আগেও পরে বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের উপর সাম্প্রদায়িক ঝড় বয়ে গেলে এর উপর ‘গ্লানি (Glani)’ নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করা হয় হিন্দু-বৌদ্ধ-ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে। বইটি নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সরকার এবং বইয়ের সাথে যারা জড়িত তাদের নাম কালো তালিকায় অর্ন্তুভুক্ত করে। অদ্ভুত বিষয় হল এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা উঠলে সবাই বলতে চেষ্টা করে যেহেতু ঘটনাগুলো এরশাদ ও বিএনপির আমলে ঘটেছে সেহেতু দায়টা তাদের। কিন্তু কেউ একটি বার প্রশ্ন করে না, হামলা থামানোর জন্যে কিংবা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগ কী তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নিয়েছে? ইংরেজ শাসন আমলে আমরা দেখেছি; হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা থামানোর জন্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। গান্ধী নোয়াখালী’তে ভয়াবহ দাঙা থামানোর জন্যে এবং দাঙা পরিস্থিতি দেখার জন্য নোয়াখালীতে এসে হাজির হোন। আবুল কালাম আজাদ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখন যদি প্রশ্ন করি; সেই সময় কোন কোন নেতা-নেত্রী দাঙ্গা থামানোর জন্য মাঠে নেমেছেন কিংবা কর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন তাহলে কী অন্যায় হবে? উল্টো আমরা বিভিন্ন সময় আমরা দেখতে পাই এসব হামলার সরকারী-বিরোধী দল সবাই মিলে-মিশেই হামলায় অংশ নেয়। কেউবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্যে হামলার তীব্রতার বাড়ানোর জন্যে নেতা-কর্মীদের হুকুম দেন। এসব হামলার করার মূল লক্ষ্য হল ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সুযোগ। কয়েক বছর আগে প্রথম আলো পত্রিকা খবর প্রকাশ করে। সেখানে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে; ‘সিলেটে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাদের জমিতে মসজিদ তুলে দেওয়া।’ মসজিদ বানান হলে কেউ আর মসজিদ স্থানান্তরিত করার সাহস পায় না। ফলে প্রথমে মসজিদ, তারপর মাদ্রাসা এভাবেই ধীরে ধীরে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রর চরিত্র সবসময় পাকিস্তান-মুখী ছিল। দ্বি-জাতী তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের আরেকটি অংশ হিসেবে পাকিস্তানের অধীনে স্বাধীন হয় বর্তমান বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে সালে পাকিস্তানের থেকে মুক্ত করে নিজেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এই তিন দেশের মধ্যে ভারত-বাদে দুই দেশের ক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক শাসক গোষ্ঠী। পাকিস্তান আমলে ‘আহমদিয়া সমস্যা’ নামে মওদুদী একটি বই লেখেন। পাকিস্তান সরকার বইটি নিষিদ্ধ করার আগেই ১৮ দিনে বইটির ৬০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবে মওদুদী আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে লাহোরে হামলা শুরু করলেন। এর ফলে কয়েক হাজার আহমদিয়া হত্যার শিকার হয়। এর জন্য মওদুদীকে গ্রেফতার করে বিচার হোল এবং ফাঁসির আদেশ দেয়া হোল। পরে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপে তার ফাঁসি রদ করা হয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল; ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একজন আহমদিয়ার করব দেওয়াকে কেন্দ্র করে আহমদিয়াদের উপর অত্যাচারের সূত্রপাত হয় এবং আহমদিয়াদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে লুটপাটের মতো ভয়াবহ রূপ লাভ করলে ৪ মার্চ পাকিস্তানে প্রথম আঞ্চলিক মার্শাল ল জারি হয়। মূলত এই দাঙ্গার কারণেই পাকিস্তানের সেনা বাহিনী প্রথম দেশ শাসনের স্বাদ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে সামরিক শাসকরা ক্ষমতার স্বাদ পায় ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত ১৫ অগাস্টের পর। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে ডানপন্থীদের বড় আকারে আবার আগমন ঘটে। ১৫ অগাস্টের পর থেকে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন উপায়ে রাষ্ট্রের ঘাড়ে সেনা বাহিনী ভর করতে শুরু করে। সাবেক সেনা বাহিনীর প্রধান এরশাদের স্বৈরাচারী জমানায়ও সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা পাহাড়ে আদিবাসীদের উপর হামলা থেমে থাকে নি।
বাবরি মসজিদের ভাঙার গুজবে এবং বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ঠিক কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, খুন হয়েছেন কিংবা কতো নারী নির্যাতিত হয়েছেন তার হিসেব বলা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে সারা বাংলাদেশে কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এর কোন পরিসংখ্যান বের করা হয় নি। ফলে এখনে যা হাজির করব তা সামগ্রিক হামলার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ভারতের ডানপন্থী গ্রুপ আর.এস.এস-এর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বারবি মসজিদ ধ্বংস আগেও বাংলাদেশে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার গুজব রটিয়ে অ-মুসলিমদের উপর হামলা করা হয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর সারা দেশে বড় আকারে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ হিন্দু নারী-পুরুষ খুন হয়, ২৬০০ উপর নারী ধর্ষিতা হয়, ১০ হাজার মানুষ আহত হয়, ২ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়, ৩৬০০ অধিক মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ৪০ হাজার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও দখল করা হয় এবং দশ হাজারের উপর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু ১০ দিনের চিত্র। এর মানে এই নয় যে দশ দিন পর সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে কিংবা আর কোন সাম্প্রদায়িক হামলার হয় নি। পরবর্তীতে হামলা হয়েছে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নভাবে। ঢাকা শহরে বড় আকারে হামলা হয় ৬ ডিসেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর। ডানপন্থী ইনকিলাব পত্রিকা একটি নিউজ করে; ‘বাবরি মসজিদ ঘটনায় ঢাকার হিন্দুদের মিষ্টি বিতরণ!’ পরের দিন ভুল সংবাদের জন্য তারা ক্ষমা চায় কিন্তু যা হওয়ার এবং যে উদ্দেশ্যে এই সংবাদ করা হয়েছিল তা ঐ রাতেই সফল হয়। রাতের মধ্যে সকল হিন্দু পল্লীগুলো’তে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভুল সংবাদের জন্য ইনকিলাব পত্রিকার কোন বিচার কিংবা সরকার থেকে কোন মামলা কোনটাই হয়নি। বাংলাদেশে মিরসরাই, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, মানিকগঞ্জ, চিটাগাং, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় বড় হামলার ঘটনা ঘটে। অদ্ভুত বিষয় হল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টিভি’তে ভাষণ দেওয়ার সময় ভারতের বাবরি মসজিদ পুনরায় তৈরি করার আহবান জানালেও নিজ রাষ্ট্রের মানুষগুলোর অত্যাচারের কথা ও নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা চেপে যান। বরং ভাষণে পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে; এসব হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে গ্রেফতার কিংবা মামলা হবে না। তাই পরবর্তীতে অমুসলিমদের উপর হামলার তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়েও বাঙালি সেল্টারা হামলা শুরু করে। সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী না থাকলেও তারা বৌদ্ধদের উপর হামলা করে। যেমনটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনা বাহিনী সাঁওতালদের হিন্দু বিবেচনা করে গণহত্যা চালিয়েছিল সেই সম্প্রদায়ের উপর। সাম্প্রদায়িক হামলার গুজব রটিয়ে ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে পাহাড়ে বাঙালি মুসলিমদের হামলায় ৬০০ আদিবাসী মারা পড়ে, ৪৫০০০ বৌদ্ধ আদিবাসী চট্টগ্রাম পাহাড় ছেড়ে ভারতের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। মজার বিষয় হলে মুসলিম সম্প্রদায় থেকে হামলার ঘটনায় আবার রাষ্ট্র-পক্ষ আসামী হিসেবে অমুসলিমদেরই গ্রেফতার করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি চেপে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ হয় নি।
২০০৭ সালের ভারতের গুজরাট হামলার ঘটনা আমরা জানি। সেই গুজরাট মতন হামলা ও হামলার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলেও মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে বাবরি মসজিদ, গুজরাট ইস্যু প্রতিবছর স্মরণ করা হলেও সাধারণ মানুষকে জানতে দেওয়া হয় নি কী হয়েছি বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস।! রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে অনেক সময় ইতিহাস জানতেও দেওয়া হয় না। তারপরও ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠায় সামান্য কিছু দলিল সংগহ করতে পেরেছি। সংগ্রহ করা ক্ষুদ্র অংশটি’র কিছু ছবি সবার সাথে শেয়ার করছি। ভবিষ্যতে যদি আরও কিছু দলিল পত্র পাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে পোস্টটি আপডেট করা হবে।
১৯৮৮ সালে পাহাড়িতে নিয়ে  রির্পোট। ২৮৭০ মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে মারা যায়।
১৯৮৮ সালে পাহাড়িতে নিয়ে রির্পোট। ২৮৭০ মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে মারা যায়।
 রিফিউজি সমস্যা। ৪৫ হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
রিফিউজি সমস্যা। ৪৫ হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
এক বছরে ২.৫ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
এক বছরে ২.৫ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
চট্টগ্রামে হামলা
চট্টগ্রামে হামলা
মিরসরাইতে হামলা।
মিরসরাইতে হামলা।
সরকারী চাকুরীতে কী পরিমাণ ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তার রির্পোট
সরকারী চাকুরীতে কী পরিমাণ ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তার রির্পোট
সিলেটে ধ্বংস হওয়া একটি মন্দির।
সিলেটে ধ্বংস হওয়া একটি মন্দির।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৯২ সালে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৯২ সালে।
পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ি। ভোলা ১৯৯২।
পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ি। ভোলা ১৯৯২।
সিলেটে অমুসলিমদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি।
সিলেটে অমুসলিমদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি।
খুলনা ইমাম পরিষদ থেকে খুলনায় মন্দির আক্রমণের ছবি।
খুলনা ইমাম পরিষদ থেকে খুলনায় মন্দির আক্রমণের ছবি।
৪০ হাজার বাড়ির একটি যা সাম্প্রদায়িক হামলার আগুনে পুড়ে যায়।
৪০ হাজার বাড়ির একটি যা সাম্প্রদায়িক হামলার আগুনে পুড়ে যায়।
গান্ধী আশ্রয়। কুমিল্লা ১৯৯২।
গান্ধী আশ্রয়। কুমিল্লা ১৯৯২।
BM14
ঢাকার একটি ধ্বংস হওয়া  মন্দির।
ঢাকার একটি ধ্বংস হওয়া মন্দির।
ধ্বংস হওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দির। নভেম্বর ১৯৯০।
ধ্বংস হওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দির। নভেম্বর ১৯৯০।
তথ্যসহায়তায়-
সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আমাদের করণীয়
-বিধ্বস্ত মানবতা (বইটি ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা নিয়ে)

Thursday, May 12, 2016

যৌক্তিকতা কি ?



বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আলহামদুলিল্লাহ! সাতচল্লিশের দ্বিজাতি তত্ত্বকে অনেকেই মনে হয় দায়মুক্তি দিয়ে ফেলেছেনঅবশ্য এমনিতেই এতো এতো ঝামেলা, তার মধ্যে পুরনো কাসুন্দি টেনে এনে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করার কোনো মানেই হয়নাতাইতো 'জয় বাংলা বলে আগে বাড়ো' অবশ্য অচিরেই এটার নয়া ভার্সন 'নারায়ে তাক্ববির জপতে জপতে আগে বাড়ো' চলে আসার ব্যাপারে আমরা মাশাল্লাহ আশাবাদী
বর্তমান ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ ১৯৩৮ সালে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়পূর্ব পাকিস্তানের জবানপ্রবন্ধে উল্লেখ করেন,
"বাঙলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাঙলা হবে কি উর্দু হবে এ তর্ক খুব জোরেশোরেই একবার উঠেছিলোমুসলিম বাঙলার শক্তিশালী নেতাদের বেশিরভাগ উর্দুর দিকে নজর দিয়েছিলেন নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আবদুর রহিম, মোঃ ফজলুল হক, ডাঃ আবদুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, মৌলভী আবদুল কাশেম মরহুম প্রমুখ প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেনকিন্তু মুসলিম বাঙলার সৌভাগ্য এই যে, উর্দুর প্রতি যাদের বেশি সমর্থন থাকার কথা, সেই আলেম সমাজই এই অপচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেনবাঙলার আলেম সমাজের মাথার মণি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহেল বাকি, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী উর্দু-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেনএঁদের প্রয়াসে শক্তি যুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেবসেই লড়াইয়ে এঁরাই জয়লাভ করেছিলেনবাঙলার উপর উর্দু চাপাবার সে চেষ্টা তখনকার মত ব্যর্থ হয়কিন্তু নির্মূল হয় নিবাঙলার বিভিন্ন শহরে, বিশেষতঃ কোলকাতায় মাঝে মাঝে উর্দুওয়ালারা নিজেদের আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিলেনসম্প্রতি পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ তাদের আদর্শের বুনিয়াদে পরিণত হওয়ায় উর্দুওয়ালারা আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেনসম্প্রতি মর্নিং নিউজস্টার অব ইন্ডিয়াএই ব্যাপারে কলম ধরেছেনজনকতক প্রবন্ধ লেখকও তাতে জুটেছেনএরা বলেছেনঃ পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা স্বভাবতই উর্দু হবে
“ "চট্টগ্রামের জে এম সেন স্কুলের আরবী-ফারসীর শিক্ষক মাওলানা জুলফিকার আলী ভারতবর্ষ ভাগের পূর্ব থেকেই আরবী হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ গ্রহন করেনএই প্রয়াসের অংশ হিসেবে তিনি কয়েকটি বই লেখা , 'হরূফুল কোরআন' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ ও 'হরূফুল কোরআন' সমিতি গঠন করেনতারই উদ্যোগে ১৯৩৯ সালের ২৯-৩১ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত 'All India Muslim Educational Conference' -এ আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব গৃহীত হয়।" (এ প্যারাটুকুর জন্য কৃতজ্ঞতা মাহমুদুল হক মুন্সি)
আমার বুঝে আসেনা এমন বড় বড় মাপের নেতাদের চাওয়া কী করে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারেরা জলাঞ্জলি দিলোঅন্তত অারবি হরফে বাংলা লেখা প্রকাশ করবার নীতিটা বেশ ভালো ছিলোকে জানে ঝান্নাতি হরফ আরবিতে লেখার কারণে আমাদের জজবা আরো বেড়ে যেতো সৌদি আরব তথা আল্লাহর কাছেআমাদের মিসকিন বাঙাল বলার আগে দুইবার ভাবতো তারা পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় আমাদের চাইতে কম হলেও তাদের কিন্তু মিসকিন পাকি বলা হয় না তবে যাই হোক না কেনো, আমরা ভাষাশহীদদের রক্তের মূল্য চুকাবো ইনশাল্লাহকারো সাথে দেখা হলে সালাম-মুসাফাহ, কথার শেষে পরম করুনাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ কিংবা মাশাল্লাহ বলতে কসুর করবো না
এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, সেই দশকের আলেম সমাজের নিকট পেট্রোডলারে মোড়ানো "আসল ইসলাম" এর দাওয়াত পৌঁছোয়নি বিধায় এহেন কামেল কাজে তারা বাধা দিয়েছিলোকিন্তু মাশাল্লাহ বিগত দুই সামরিক শাসক আল্লামা মরহুম শহীদ জিয়া ও তার যোগ্য উত্তরসূরী পীরে কামেল ও ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী এরশাদ ছাহেবের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে এতো বেশি পরিমাণ পেট্রোডলারসমৃদ্ধ "আসল ইসলাম" এদেশে প্রবেশ করেছে যে এখানকার চল্লিশ লাখেরও বেশি ক্বাতাবুল ইলম উর্দুভাষায় লিখিত কিতাব অধ্যয়ন করছেএ সংখ্যাটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে আমরা ভাষাশহীদদের রক্তের মূল্য চুকাবো ইনশাল্লাহ
মাতৃ ভাষা অধিকারের প্রথম রক্ত ও জীবন দাতা আমরা এই আমরাই দৈনন্দিন জীবনে সালাম, ইনশাল্লাহ, সুভানাল্লাহ, আলহামদুলিলাহ সহ নানান ধরনের আরবি বা উর্দু শব্দ ব্যবহার করছি যার প্রতিবাদ করলেই আবার উস্কানী দেওয়া বা অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার মত অপরাধ হয়ে যায় যারা ভালবাসা দিবস, মা দিবস ইত্যাদি নিয়ে চুলকানী আছে তারাও কি আজ এই দিনে মাতৃ ভাষা দিবস হিসাবে পালন করতেও কুন্ঠিত হবেন ( যেহেতু তারা সারা জীবন মাতৃ ভাষাতেই কথা বলেন ) ? তাইলে খামাখা লোক দেখানো এই মাতৃভাষা দিবস না শহীদ দিবস পালনের যৌক্তিকতা কি ? খোদা হাফেজ (নাউজুবিল্লাহ), আল্লাহ হাফেজ

অশ্লীলতা কি ও কোথায় থাকে !

অশ্লীলতা কি ও কোথায় থাকে !!



অশ্লীলতা আমাদের দেশে অন্যতম চর্চিত শব্দ । আমার মতো মূর্খ চাষার পক্ষে আসলে এতো কঠিন শব্দ বোধগম্য করা কঠিন। তাই দ্বারস্থ হলাম বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের। সেখানে পেলাম অশ্লীলতা হলো অশ্লীল বিশেষণ পদটির বিশেষ্য রূপ। অশ্লীল শব্দটির তিনটি আলাদা আলাদা অর্থ দেয়া আছে।
১. কুৎসিত; জঘন্য ২. অশালীন; অশিষ্ট ৩. কুরুচিপূর্ণ; কদর্যরুচি আবার প্যাঁচ লাগলো অশালীন শব্দ নিয়ে। আরেকটু ঘাঁটতেই দেখলাম "শালীন" শব্দের অর্থ- সলজ্জ; লজ্জাশীল; নম্র; ভদ্র; রুচিকর; বিনয়ী; সুন্দর; শোভন। তার মানে মুটামুটি বুঝতে পারলাম লজ্জাহীনতা, রুচিহীনতা, অসুন্দর, অশোভন- এসবের সামষ্টিক রূপই হলো অশ্লীলতা। আসুন তাহলে দেখি আমাদের দেশে এই অশ্লীলতা কোথায় কোথায় থাকে/ থাকেনা ।
* ঘুস খাওয়াতে অশ্লীলতা নাই ।
* মিথ্যা বলাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* একাধিক বিয়া করাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* খাদ্যে, শিক্ষায় ও ঔষধে সাধ্যমত ভেজাল দেওয়ার মধ্যেও কোন অশ্লীলতা নাই ।
* ক্ষমতার অহংকারে যা খুশি বলা ও করাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* ক্ষমতাবানকে নির্লজ্জের মত তেল দেওয়ার মধ্যেও অশ্লীলতা নাই ।
* পাওনাদারকে চরকির মতো ঘোরানোর মধ্যে তো অশ্লীলতা নাইই, এমনকি এই ঘুরাঘুরির জন্য উল্টো ঝারি মারার মধ্যেও অশ্লীলতা অনুপস্থিত ।
* ঈমানদার তথা বিশ্বাসী তকমা সেঁটে কথায় ও কাজে নিরন্তর বিশ্বাস ভাঙার মধ্যেও অশ্লীলতা নাই ।
* ধর্ষণে তো অশ্লীলতা নাইই উপরন্তু বিশেষ ধর্মে বিধর্মী ধর্ষণে পুরষ্কার পাওয়ার গ্যারান্টি আছে; সেটা শিশু হলেও সমস্যা নাই ।
* কারো ধন সম্পত্তি ছলে বলে কৌশলে কিংবা শক্তির জোরে ভোগ দখল করাতেও অশ্লীলতা নাই; এমনকি বিশেষ একটি ধর্মের উত্থান ঘটেছেই বিধর্মীদের ধন-সম্পত্তি জবরদখল করার মাধ্যমে ।
* ধর্ম প্রচারের নামে শব্দ দুষণেও অশ্লীলতা নাই ।
* কুলুফের নামে লুংগীর মধ্যে হাত ঢূকিয়ে প্রকাশ্য লোকালয়ে লাফালাফি করার মধ্যেও কোন অশ্লিলতা খুজে পেলাম না ।
* শিশু ধর্ষনেও অশ্লিলতা নাই ।
* নিজের বাচ্চাদের পথ শিশু বানাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* আল্লাহু আকবর বলে ভিন্ন মতের কারো কল্লা কাটার মধ্যেও কোনো অশ্লীলতা নাই ।
* সংঘবদ্ধ হয়ে ধর্ষণের মধ্যেও অশ্লীলতা পাইলাম না ।
হায় ! হায় !! অশ্লীলতা তাইলে আছে কোথায়, যা দেখে আমাদের সূর্য সন্তানরা লজ্জা পায় ? অশ্লীলতা তুমি কোথায় ? আমার মতো আপনারাও কি হতাশ হইছেন ? পাইছি !! পাইছি !! হতাশ হইয়েন না । অশ্লীলতা আছে শুধু মেয়েদের বোরকাহীন শরীরে ও শ্রেষ্ঠ মহা মানবের শ্রেষ্ঠ আইন ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব হওয়ার ইতিহাস প্রকাশে । হে অশ্লীলতা! সত্যিই তুমিই আমাদেরকে করেছো মহান ! তোমার জন্যই আজ আমরা সভ্য ও উন্নত জাতি !! অশ্লীলতা জিন্দাবাদ ।

বই রিভিউ লিখার পদ্ধতি

বই রিভিউ লিখার পদ্ধতি

এটা কাউকে শেখানোর জন্য লিখি নি। শুধুমাত্র
ব্যক্তিগত ধারণা শেয়ার করেছি।

বই রিভিউ লেখার জন্য প্রকৃতপক্ষে কোন
ব্যাকরণ নেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে লিখলে
রিভিউটা সকলের জন্য পড়া ও বোঝা সহজ হয় এবং
সাজানো- গোছানো হয়।
শুরুতে বইয়ের একটা ছবি দিতে পারেন। এরপর শুরু
করতে পারেন আপনার পছন্দমত উক্তি বা বই
সম্পর্কে কোন তথ্য দিয়ে।এটা ঠিক কোন
অনুষ্ঠান শুরু করার আগে সম্ভাষণ বা বইয়ের ভুমিকার
সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তারপর প্রথমে
বইয়ের ও লেখকের নাম দিতে হবে

বইয়ের নামঃ

লেখকের নামঃ

এরপর সেটি কোন ঘরানার(Genre) তা উল্লেখ করা
জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে পাঠকরা বুঝতে পারে তারা
যেই লেখকের বই সম্পর্কে রিভিউ পড়তে
যাচ্ছেন সেটি রহস্য, নাকি রোম্যান্টিক নাকি ফ্যান্টাসি
নাকি শিশুতোষ নাকি কথাসাহিত্য । তার মানে বইয়ের ও
লেখকের নামের পর আসবে,

ঘরানারঃ
এরপর যেটা দেওয়া যায় সেটি হল রেটিং । রেটিং এর
নাম্বার দেখে পাঠকরা সহজেই বুঝতে পারবেন
বইটা কতটা জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে পাঠকদের মনে
বই সম্পর্কে সুন্দরভাবে আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।
বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে বই রেটিং এর কোন
ওয়েবসাইট নেই। তবে ইংরেজি বইয়ের গুডরিডস্
নামে একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইট রয়েছে। তাই
ইংরেজি বইয়ের ক্ষেত্রে সেখান থেকে রেটিং
লিঙ্ক সহ দেওয়া যেতে পারে। বাংলা বইয়ের
ক্ষেত্রে নিজস্ব রেটিং ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নাই।
ইংরেজি বইয়ের ক্ষেত্রেও নিজস্ব রেটিং দেওয়া
যায়। সেক্ষেত্রে “ব্যক্তিগত রেটিং” এই কথাটা
উল্লেখ করা উচিত। তাহলে আমরা পরবর্তী
পয়েন্ট পেলাম,

রেটিং/ ব্যক্তিগত রেটিং:
এরপর আমরা দিব রিভিউ । রিভিউতে যদি পুরাপুরি ফ্লাপের
লেখা হুবহু তুলে দেই তবে সেটাকে বলা হবে
প্রিভিউ । তাই রিভিউ না প্রিভিউ তা এখানে শুরুতেই বলে
দেওয়া ভাল। রিভিউ লেখার সময় সম্পূর্ণ কাহিনী
তুলে দেওয়া উচিৎ না। এতে পাঠকের ঐ বই
সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাবে। যদি দিতেই হয়
তবে সবার উপরে তা লিখে দেবেন। যেমন,
spoiler alart. রিভিউ লেখার সময় মাথায় রাখবেন যে
আপনি পুরা কাহিনী লিখছেন না, লিখছেন কাহিনীর
সারমর্ম। তাই তা যত ছোট আর তথ্যসমৃদ্ধ হয় তা ততই
পাঠকের কাছে ভাল লাগবে। লিখতে হবে যথেষ্ট
রহস্যময়টা নিয়ে যাতে পাঠকদের মনে বইটা
সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। যদি রিভিউ পড়ে
পাঠকের মনে আগ্রহই তৈরি না হয় তবে সেই
বুঝতে হবে রিভিউ আসলে রিভিউই হয় নি।
রিভিউয়ের পরে বই সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রিকায়
প্রকাশিত উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। দিতে
পারলে সেটা প্লাস পয়েন্ট কিন্তু না দিতে পারলেও
বিশেষ কোন ক্ষতি নেই।

পত্রিকার উদ্ধৃতিঃ
এরপর দিতে হবে লেখক পরিচিতি। লেখকের
জন্ম-মৃত্যু, পড়াশুনা, পেশা, আর কি কি বই লিখেছেন,
কতটা জনপ্রিয়, এখন কি করছেন, সামনে আর কি
লেখা আসবে ইত্যাদি তথ্য দেওয়া যেতে পারে।

লেখক পরিচিতিঃ
বইটি যদি অনূদিত হয় তবে লেখকের পরিচিতির পর
অনুবাদকের পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ
এরপর বইটি সম্পর্কে একনজরে কিছু তথ্য দিতে
হবে।

ক্যাটাগরিঃ বইটি অনুবাদকৃত নাকি মূল তা লিখতে হবে।

বইয়ের নামঃ

লেখকের নামঃ

অনুবাদকের নামঃ (অনুবাদিত হলে)

প্রকাশনীঃ কোন প্রকাশনী থেকে বের
হয়েছে তা উল্লেখ করতে হবে।

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখ করলে পাঠক
বইয়ের আকার আর ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারনা পাবে।

মূল্যঃ এটা উল্লেখ করা জরুরি। কেননা এর মাধ্যমে
পাঠক বুঝতে পারবেন বইটি তার বাজেটের মধ্যে
কিনা বা কত টাকা লাগবে তা জানলে কিনতে যাওয়ার
আগে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে পারবেন।

প্রাপ্তিস্থানঃ অনলাইন প্রাপ্তিস্থানের লিঙ্ক দেওয়া
যেতে পারে আর সম্ভাব্য প্রাপ্তিস্থানের ঠিকানা
দিলে পাঠকদের ভোগান্তি কম হয়।

উইকিপিডিয়া লিঙ্কঃ এরপর বই সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায়
কোন নিবন্ধ থাকলে সেটার লিঙ্ক দিয়ে দেওয়া
যেতে পারে।

মূল বইয়ের ওয়েবসাইটঃ মূল বইয়ের কোন
ওয়েবসাইট থাকলে সেটার লিঙ্ক উল্লেখ করা
যেতে পারে।

লেখকের ওয়েবসাইটঃ লেখকের ওয়েবসাইট
আর সোশ্যাল সাইটের লিঙ্ক দেওয়া যেতে
পারে।

সফটকপির লিঙ্কঃ বইয়ের কোন সফট কপির লিঙ্ক
পাওয়া গেলে দিতে পারেন।

ব্যক্তিগত মতামতঃ সবশেষে বই সম্পর্কে আপনার
দিয়ে শেষ করতে পারেন।



একনজরে রিভিউ লেখার ফর্মটিঃ
বইয়ের নামঃ
লেখকের নামঃ
ঘরানারঃ
রেটিং/ ব্যক্তিগত রেটিংঃ
রিভিউ/প্রিভিউঃ
পত্রিকার উদ্ধৃতিঃ(Optional)
লেখক পরিচিতিঃ
অনুবাদকের পরিচিতিঃ (যদি অনুবাদিত হয়
সেক্ষেত্রে)(Optional)
ক্যাটাগরিঃ
লেখকঃ
অনুবাদকঃ (যদি অনুবাদিত হয় সেক্ষেত্রে)
প্রকাশনীঃ
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ
অধ্যায়ঃ (যদি থাকে)
মূল্যঃ
অনলাইন প্রাপ্তিস্থানঃ (যদি থাকে)
প্রাপ্তিস্থানঃ
উইকিপিডিয়া লিঙ্কঃ যদি থাকে (Optional)
বইয়ের ওয়েবসাইটঃ যদি থাকে (Optional)
লেখকের ওয়েবসাইটঃ যদি থাকে (Optional)
সোশ্যাল সাইটঃ যদি থাকে (Optional)
সফট কপির লিঙ্কঃ যদি পাওয়া যায়(Optional)
ব্যক্তিগত মতামতঃ (Optional)



সবশেষে একটি কথা, শুরুতেই বলেছি বই
রিভিউয়ের কোন ব্যাকরণ নেই। আমি যা দিয়েছি তা
একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে
দিয়েছি। যেভাবেই লিখুন না কেন তাতে যেন প্রান
থাকে, পাঠকরা যেন রিভিউটা পড়ে বইটা পড়তে
আগ্রহ বোধ করে।


সংকলনেঃ সায়েম মাহামুদ,'
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
Sayemkajal@gmail.com

সোনালী অনুপাত(golden ratio) নিয়ে ব্যস্ত

-" শুভ তোমাকে একটি প্রশ্ন করি!"

- "জি স্যার,করুন"

-"তুমি কি জানো তোমার চেহেরা সুন্দর কেন? শুধু তোমার না পৃথিবীর যত চেহেরা সুন্দর ওয়ালা মানুষ আছে তাদের চেহেরা সুন্দর কেন?"

-" হ্যাঁ স্যার , আসলে যার যার চেহেরা ভালো লাগে তার জন্য তার চেহেরা সুন্দর। আপনার হইতো আমার চেহেরা ভালো লাগে তাই আপনার জন্য আমি সুন্দর।"

-" কিন্তু কি এমন কারণ যে একজনের মানুষের চেহেরা অন্য জনের সাথে মিলেনা?"

-আমি চুপচাপ

- "বিজ্ঞানীদের মতে, সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে চোখ, মুখ ও কানের মাঝামাঝি অংশের ডায়মেনশন এর মধ্যে।
অতঃপর তারা মাপজোক করে বললেন কারণ সোনালী অনুপাত! সোনালী অনুপাত(Golden Ratio) কি জিনিস জানো???"

আমি স্যারকে কোন সাঁয় দিলাম না, শুধু চুপচাপ স্যারের কথায় ডুবে আছি। কিছু মানুষের আছে যাদের কথা শুনার মধ্যে আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে, মজা আছে।নান্টু স্যার তাদের মধ্য অন্যতম। উনার কথা আমি যত শুনি তৃপ্তি সহায়ক আনন্দ টা সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। জানিনা এটাকে বিজ্ঞান কি বলে??

- "শুভ, তুমি কি জানো প্রকৃতি সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক কি ? "

-" আসলে স্যার, প্রকৃতিরর মাঝে আমরা বিজ্ঞান কে বিশেষ করে গণিত কে খুজে পাই, আর বিজ্ঞানের অন্যতম উৎস হল প্রকৃতি "

-" তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের গাঢ় রহস্য হল গণিত তথা সোনালী অনুপাত(Golden Ratio) প্রকৃতির সৌন্দর্যের সব কিছু এর মধ্যে নিহিত। সোনালী অনুপাত বা Golden ratio নিয়ে গণিতপ্রেমীদের মাতামাতির শেষ নেই। আর মাতামাতি হবেই বা না কেন , এই দুষ্টু (অমূলদ ) সংখ্যার এত মাহাত্ম্য কিসে্র? আসলে এই সংখ্যাতেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টিজগতের অনেক রহস্যের সমাধান , একটু গভীর ভাবে দৃষ্টি দিলেই আমরা একে খুঁজে পাব আমাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে , গোটা জীব জগতে , পদার্থ কিংবা রসায়নে , পাব আমাদের সৌরজগতে , আমাদের গ্যালাক্সিতে ; খুঁজে পাব অ্যাপল ,মার্সিডিজ এর মত বিখ্যাত কোম্পানীর লোগোতে । এই সংখ্যাই আমাদের বলে দিবে কেন পিরামিড কিংবা তাজমহল এত মনোমুগ্ধকর ? কেন ভিঞ্চির মোনালিসা
জগতখ্যাত ? কেন আমাদের বান্ধবীর চেয়ে ক্যাটরিনা কাইফ বেশি সুন্দরী ? কে বেশি আকর্ষণীয়,
আঞ্জেলিনা জোলি নাকি অনন্ত জলিল ? কে বেশি
ঠাণ্ডা (Cool), টম ক্রুজ নাকি শাকিব খান ? এ সব
প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে এই সংখ্যা থেকে।
হইতো এটি সৃষ্টিকর্তার সুন্দর এক কৌশল যা কিনা প্রকৃতির সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন এই সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে মানুষ বিভিন্ন কৃত্রিম কিছু সৃষ্টিতে তে ব্যবহার করছেন সোনালী অনুপাত "

এই বলে স্যার মুখে আরেকটি পান দিলেন। স্যারের কথায় বেশ মজা আছে। যাকে বলা যায় খাঁটি মজা।

"- রহস্যময়তা কিংবা প্রায়োগিক দিক অথবা প্রকৃতির মাঝে খুঁজতে চাইলে সবচেয়ে বেশি এবং প্রকটভাবে ধরা পরবে গোল্ডেন রেশিও; এবং বার বার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিবে তার শ্রেষ্ঠত্ব। একারনেই সর্বাধিক গবেষণা হয়েছে এই সংখ্যাটিকে নিয়ে।
যাকে নিয়ে এতো গবেষণা সেই Golden Ratio টা
আসলে কি? এটা আসলে আর কিছুই নয়, একটা গাণিতিক অনুপাত মাত্র যার মান 1.618033988……।
হ্যা ব্যাপারটা নির্মম হলেও সত্য যে এই Golden Ratio অন্য দুই বিখ্যাত সংখ্যার মতই দুষ্টু (অমূলদ সংখ্যা)।

Golden Ratio বা সোনালী অনুপাতকে প্রকাশ করা হয় ল্যাটিন অক্ষর Φ (PHI/ ফাই ) দ্বারা। ১৫৯৭ সালে Michael Maestlin এই Φ (PHI/ ফাই ) আবিষ্কার করেন। এর মান ১.৬১৮০৩৩৯৮৯ (প্রায়)। এটি একটি অমূলদ সংখ্যা । ফিবোনাচ্চি রাশিমালার সাথে এর পিতা পুত্রের সম্পর্ক রয়েছে।

-"শুভ, তুমি তো ফিবোনাচ্চির ইতিহাস জানো, হুম?"

- "জ্বি স্যার, ফিবোনাচ্চি রাশিমালার আবিষ্কারক ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ Leonardo Da Pisa. উনার ডাকনাম ফিবোনাচ্চি। ১২০২ সালে Liber Abaci নামক পুস্তকটির মাধ্যমে তিনি পশ্চিম ইউরোপীয় গণিতকে “ফিবোনাচ্চি সিরিজের” সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যদিও এই পরিচয় করিয়ে দেবার অনেক আগেই ভারতীয় গণিতে এই রকম একটা সিরিজের কথা বলা হয়েছিল। ফিবোনাচ্চি সিরিজ নিয়ে ফিবোনাচ্চি সাহেব বলেছিলেন- “প্রকৃতির মূল রহস্য রাশিমালাতে আছে”।

-"হুম, ভালো বলছ। মিস্টার ফিবোনাচ্চি ঠিকই বলছেন প্রকৃতির মূল রহস্য ফিবোনাচ্চি রাশিমালাতে আছে তার অকাট্য একটি দলিল সোনালী অনুপাত। ফিবোনাচ্চি রাশিমালার সাথে সোনালী অনুপাতের পিতা-পুত্রের সম্পর্ক টা একটু বুঝায় বলি।
0, 1, 1, 2, 3, 5, 8, 13, 21, 34, 55……
এইটাই ফিবোনাচ্চি সিরিজ। কিভাবে আসলো এইটা??? এই সিরিজের যে কোন সংখ্যা তার পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফলের সমান। যেমনঃ 0+1=1, 1+1=2, 2+1=3,
3+2=5, 5+3 =8..........ইত্যাদি। গণিতের ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়- f(0)=0, f(1)=1…… হলে f(n)= f(n-1)+f(n-2). ( ফিবোনাচ্চি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসুন " নান্টু স্যার & আরেকটু ফিবোনাচ্চি science-ahmedshuvo969.blogspot.com/2016/01/blog-post.html?m=1 ) ফিবনোচ্চি সিরিজের যেকোন পদকে আগের পদ দিয়ে ভাগ করলে সেই সংখ্যাটাই PHI । প্রথম কয়েকটা পদের জন্য হিসেব কিছুটা বিদঘুটে মনে হলেও ফিবনোচ্চি সিরিজ ধরে যত সামনে যাওয়া হবে তত ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত PHI এর দিকে এগবে এবং ৩৯ তম পদ থেকে ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত প্রায় ধ্রুব হয়ে যাবে।
যেমন
2/1=2,
3/2=1.5,
5/3=1.665,
8/5=1.6,
13/8=1.625,
21/13=1.615
.....................
এখানে প্রথম দুটি ভাগফল বাদ দিলে বাকি ভাগফলগুলোর মান প্রায় সমান বা ধ্রুবক। Luca Pacioli’s এর বই De divina proportione এ
প্রথম গোল্ডেন রেশিও এর ব্যাপারে প্রকাশিত হয়।
এরপর Mathematician Euclid তার Elements (Greek:Στοιχεῖα) গ্রন্থে প্রথম PHI এর জ্যামেতিক ব্যখ্যা দেন।

অথবা উল্টো করে বললে এই অনুপাতকে আমরা 1 : 1.6180… = 0.6180… ও বলতে পারি । এই 0.6180… কেও কিন্তু গোল্ডেন রেশিও বলা হয় । এবং একে ছোট হাতের ফাই ( φ) দ্বারা প্রকাশ করা হয় । তার মানে সম্পর্কটা হচ্ছে এরকম : Φ=1/ φ
PHI কে কিন্তু আরো অনেকভাবে প্রকাশ করা যায় ;
দেখতো এটা পরিচিত মনে হয় কিনা :
Φ=1+1/(1+1/(1+…))
এই PHI ই হল একমাত্র সংখ্যা যা এই ধরনের অদ্ভুত আচরণ করে :

ধর, a এবং b দুইটি সংখ্যার মধ্যে সোনালী অনুপাত বজায় তাহলে লিখা যায়
(a+b)/a = a/b = Φ
or, ((a/b)+1)/(a/b) = a/b
যেহেতু a/b = Φ
সুতরাং, (Φ+1)/ Φ = Φ
or, Φ+1 = Φ^2
or, Φ^ 2= Φ+ 1
ot, Φ^2 - Φ-1 = 0
উপোরোক্ত সমীকরণটি একটি দ্বিঘাত সমীকরণ যার
সমাধান হচ্ছে :
Φ = (1+ √5)/2 = 1.68033.....
এখন বুঝলে কিভাবে সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়?

আমি চুপচাপ মন দিয়ে স্যারের কথা শুনছিলাম
-"শুভ "
-" জ্বি স্যার"
-"গণিতের আবিজাবি দেখে কি বিরক্ত? "
-"না, স্যার তবে বাস্তব উদাহরণ ফেলে ভালো লাগবে, আরো মজা করে গিলতে পারব"

স্যার আমার দিকে একটু তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন।

-" লিওনার্দো দাদকে তো চিন?"
- "হ্যাঁ স্যার,"
_"লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি দাদা ভাইকে– Golden Ratio এর মাস্টার বলা হয় আর সে দাদা ভাই সোনালী অনুপাত কে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘The Divine Proportion’ বা ‘ স্বর্গীয় অনুপাত’ নামে । কারণ
তিনিই প্রথম মানবদেহে PHI এর উপস্থিতি লক্ষ করেন ;
বুঝতে পারেন এর মর্ম। তিনি মৃত মানুষের দেহের বহিঃস্থ ও ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে অনেক গবেষণা করতেন ; ময়নাতদন্ত যাকে বলে আর কি । আমরা ডাক্তারের চেম্বারে কিংবা মেডিকেল কলেজে যেসব মানুষের অঙ্গের ছবি দেখি সেগুলো প্রথম দাদা ভাই ডিজাইন করেছিলেন। আর এত ভালো ডিজাইনের রহস্য হল মানব দেহে PHI, বুঝা যায় দাদা ভাইয়ের মাথায় ভালো পুষ্টি ছিল।
স্যার কে থামিয়ে আমি প্রশ্ন না তুলে পারলাম না
-"মানব দেহে PHI ? সেটা আবার কি রকম স্যার?"
-" ভালো প্রশ্ন, তুমি একটু সোজা হয়ে দাঁড়াও"
স্যারের কথা মত আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, স্যার আমার শরীলের মাপজোপ শুরু করে দিল। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না স্যার কি করছেন। প্রথমে আমার কাঁধ থেকে হাটু পর্যন্ত এবং হাটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত ডিসটেন্স নিয়ে খাতায় টুকে রাখললেন ৪৩ এবং ২৬.৭।
-"শুভ, ৪৩ কে ২৬.৭ দিয়ে ভাগ দাও, কত হয়?"
- " ১.৬১০ স্যার, স্যার এটি তো একটি সোনালী অনুপাত "
-" তোমাকে বাস্তব উদাহরণ দিলাম হইতো এই জিনিসটিকে মাথায় রেখে ফরাসিরা আইফেল টাওয়ার বানাইলেন
শুধু কাঁধ থেকে হাটু পর্যন্ত এবং হাটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত দূরত্বের অনুপাত PHI না, ছেলে/মেয়ে সকল বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই , দেহের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য : নাভির নিচ থেকে বাকি অংশের দৈর্ঘ্য = 1.6180…(PHI) ; আবার ; মানুষের বাহু (বাইসেপ্স) এর সাথে সম্পূর্ণ হাত এর অনুপাতের মান হল 1.6180…(PHI); মানুষের আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে কনুই এর দৈর্ঘ্য এবং কবজি থেকে কনুই এর দৈর্ঘ্যের অনুপাত 1.6180…(PHI) ; মানুষের মুখমণ্ডলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত 1.6180…(PHI) ; ঠোঁটের দৈর্ঘ্য ও নাকের প্রস্থের অনুপাত , চোখের ২ প্রান্তের দুরুত্ব ও চুল থেকে চোখের মনির দুরুত্ব ও 1.6180…(PHI) ।সারা মুখমন্ডলের সবকিছুতে , শরীরের গিঁটে গিঁটে , মেরুদন্ডে, অভ্যন্তরের অঙ্গেপ্রত্যঙ্গে সবখানে এই PHI খুঁজে পাওয়া যাবে । গোটা মানবদেহে প্রায় ৩ শতাধিক Golden Ratio (PHI) খুঁজে পাওয়া যায় ; মুখমণ্ডলেই পাওয়া যায় ৩০ টিরও বেশি । , মানুষের চেহারায় Golden Rectangle এবং Golden Spiral পুরো খাপে খাপে বসে যায় । এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই ।
এদিকে আমাদের লিওনার্দো ভিঞ্চি সাহেব কিন্তু
শুধু মানুষের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়েই বসে
ছিলেন না । তিনি নির্দ্বিধায় (অথবা অবচেতন মনে )
সমানে প্রয়োগ করতে লাগলেন এই Golden Ratio (PHI) । কোথায় ? তার শিল্পকর্মে । তার বেশির ভাগ
শিল্পকর্মতেই PHI খুঁজে পাওয়া যায় ; The last Supper , Merry Magdalin , Monalisa সবগুলোই PHI এর কারিশমা । এবং এজন্যই এগুলো জগতখ্যাত , মানুষের মন জয় করে নিয়েছে । তিনি সবচাইতে বেশি খ্যাত হয়েছেন Monalisa শিল্পকলাটির জন্য; (তারপরও একটা জিনিস কিন্তু Monalisa ’র নাই !!! ভ্রু নাই … এছাড়াও Monalisa ‘র ছবির আরো অনেক রহস্যময় দিক আছে ) ।
শুধু মানবদেহই নয় , গোটা প্রানীকুলে-উদ্ভিদকুলে সব কিছুতেই মাত্রাগত ভাবে PHI বিদ্যমান । সকল উদ্ভিদ– প্রানীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গও PHI অনুপাতে বিভক্ত ।
এমনকি যে প্রানীর কোন হাত-পা-মাথা কিছুই নেই যেমন শামুক-ঝিনুক-সী-শেল এসবেও কোন-না-
কোনভাবে PHI রয়েছে !! তারপর ধরুন একটা মৌচাকে স্ত্রী মৌমাছি ও পুরুষ মৌমাছির সংখ্যার অনুপাত PHI । ফুলের ভেতর প্রতি স্তরের রেনুর সাথে পরের স্তরের রেনুর অনুপাত PHI । গাছের প্রতি স্তরে স্তরে পাতা বৃদ্ধির অনুপাত PHI । তারপর ধরুন মৌমাছি সহ আরো অনেক ধরণের মাছি ,কীট, ওয়াইল্ড ডগ ইত্যাদির চলাফেরার পথ কিংবা আক্রমনের পথ হয় Golden Spiral অনুযায়ী (মানে PHI )।
আমাদের DNA তেও আমরা যদি বৃহৎ খাঁজ(Major Groove) ও ক্ষুদ্র খাঁজের (Minor Groove ) অনুপাত নেই সেটাও হবে PHI । এমনকি মুরগীর ডিমেও Golden Spiral খাপে খাপে বসে যায়!
পদার্থবিজ্ঞানের চৌম্বকক্ষেত্র কিংবা বিদ্যুৎক্ষেত্রে ,সরল ছন্দিত স্পন্দনে , তাপবিজ্ঞানে সবখানেই পাওয়া যায় PHI । কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকে আমরা যদি ইলেকট্রন কিংবা প্রোটনের g-factor ব্যখ্যা করতে চাই , সেখানেও PHI : g-factor of electron = -2sin(PHI)।
আমরা যদি পোলারাইজড হাইড্রোজেন বন্ড ও
সাধারন হাইড্রোজেন বন্ডের অনুপাত নেই সেটাও হবে
PHI।
বর্তামান বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিখ্যাতরা এর অনেক ব্যবহার করেছেন এমনকি বর্তমানে মার্কেটিং এ এর ব্যবহার হচ্ছে । আড্রিয়ান বেজান এর মতে , মানুষের চোখ অন্য ইমেজের চেয়ে, যেসব ইমেজ Golden Ratio কে অনুসরণ করে তাকে খুব সহজে উপভোগ্য হিসেবে নিতে পারে। আর যেসব ইমেজকে চোখ সহজে নিতে পারে সেগুলোকেই আমরা বলি, আহা কি সৌন্দর্য! সে জন্যই বিখ্যাত অনেক শিল্পীরাই তাদের কাজে PHI প্রয়োগ করেছেন যেমন মিসরের পিরামিডে , আগ্রার তাজমহলে ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারে , নটরডেমে, পারথেননে , ইউনাইটেড নেশন বিল্ডিং সহ আরও অজস্র স্থাপত্যে PHI ব্যবহৃত হয়েছে।PHI থাকার কারণেই এগুলো এত বেশি দৃষ্টিনন্দন ।
:
সঙ্গীতের নোটের ক্ষেত্রেওও PHI বিদ্যমান ।
ভায়োলিনসহ আরো অনেক বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়েছে
PHI দিয়ে। বিখ্যাত কোম্পানির লোগো যেমন Apple, Adidas, Honda, Toyota, Mercedes-Benz, CocaCola, Pepsi, National Geography ইত্যাদি আরো অনেক বড় বড় কোম্পানি PHI ব্যবহার করেছে।
হারিকেন ,ঘূর্ণিঝড় , ধোঁয়ার কুণ্ডলী সবসময়ই Golden
Spiral অনুসরন করে বৃদ্ধি পায়। এমনকি গ্যালাক্সি
গুলোও Golden Spiral অনুসরন করে বিস্তৃত হয় ।
আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর সূর্যের চারপাশে
আবর্তনকালও PHI এর সাথে সম্পর্কিত । তারা পৃথিবীর
আবর্তনকালের সাথে PHI এর সুচক আকারে পরিবর্তিত
হয় ।


পৃথিবীর আবর্তনকালের সাথে গ্রহগুলো PHI এর সুচক আকারে পরিবর্তিত হয়। কো-অরডিনেট পদ্ধতিতে পুর্ব দাগ্রিমাংশ +৩৯.৮২ এবং উত্তর অক্ষাংশ +২১.৪২ । যা দ্বারা প্রমানিত হয় পৃথিবীর গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে পবিত্র কাবা । ৯০+৩৯.৮২ = ১১১.৪২ সুতরাং ১১১.৮২ / ১৮০= 0.৬১… এবং ১৮০+৩৯.৮২ = ২১৯.৮২ সুতরাং ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১…. তাই গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট Φএর মান অনুযায়ী মক্কা এবং ক্বাবাই হচ্ছে পৃথিবীর
গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট ।

এরকম আরো অসংখ্য PHI খুঁজে পাওয়া গিয়েছে
সৌরজগতে , মহাবিশ্বে , আমাদের পৃথিবীর আনাচে
কানাচে । মহাবিশ্বের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও PHI
(Golden Ratio) বজায় রেখেছে তার শৃঙ্খলা । সবকিছুর ভেতরে এক অপার মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে । সবকিছুতেই একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই PHI খুঁজে পাওয়া যাবে। এজন্যই একে বলা হয় The number of life , The divine proportion ( স্বর্গীয় অনুপাত ) । "

স্যার একটানা বলেন গেলেন আর আমি মনোযোগী হয়ে আনন্দ গিলছি, মনে হচ্ছে অনেক সহজ একটি অনুপাত অথচ আমাদের চারপাশ তার থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আমি নান্টু স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি উনি মিটমিট হাসি ফুটাচ্ছেন, পৃথিবী তে মানুষের বৈচিত্র্যময় ঢল দেখা যায় তবে স্যারের মত কাউকে আগে কখনো দেখিনি, স্যার কাউকে বুঝিয়ে সব চাইতে শান্তি পান, বিজ্ঞান প্রেমিকরা এরকমি হই।

বেশ কিছু সময় পর, আমি আনন্দে ২ ফুটের একটি লাফ দিতে দেরি করলাম না।
-"স্যার পেয়ে গেছি"
স্যার অবাক হয়ে প্রশ্ন তুলল
-"কি পেলে? "
-"I love you"
স্যার আরো অবাক হয়ে
-"কি??"
-" I love you এর মধ্যে স্যার ফিবোনাচ্চি আর সোনালী অনুপাত আছে। যেমন I love you বাক্যে i love একজন ব্যক্তির অংশ আর you আরেকজন ব্যক্তির অংশ। তাহলে ২য় জন ব্যক্তির you এর ফিবোনাচ্চি ৩ আর প্রথম জনের i love এর ফিবোনাচ্চি ৫ তাহলে গোল্ডেন রেশিও ৫/৩"

হাহাহাহা আমরা দু-জনে হাসছি।জানিনা এই হাসির মধ্যে কোন অনুপাত আছে কিনা


___আহমেদ শুভ৯৬৯

পোল্ট্রি পালন এবং খামার ব্যবস্থাপনা (ডাঃ মোঃ আকতার ফেরদৌস রানা)

ভূমিকা
তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। এদেশের অর্থনীতি মূলত: কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পোল্ট্রি শিল্প কৃষি শিল্পের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। উৎপাদন খরচ অপেক্ষাকৃত কম, দ্রুত ডিম ও মাংস পাওয়ার নিশ্চয়তা, দ্রুততার সাথে ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ, এদের মাংসে সীমিত চর্বির উপস্থিতি, হজমে সুবিধা, সকল ধর্মের মানুষের কাছে সমানভাবে সমাদৃত; এ সকল কারণে পোল্ট্রি পালন এবং এদের থেকে উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী (ডিম ও মাংস) মানুষের পুষ্টির যোগানে আদর্শ ও মানসম্পন্ন হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দিন দিন এ শিল্পের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। কৃষি উন্নয়ন তথা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে
পোল্ট্রি পালন আজ একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। গরিব, অল্প আয়ের লোক, বেকার শিক্ষিত যুবক ও যুব-মহিলাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী এই শিল্পের সাথে নিজেদের নিয়োজিত রেখে সাফল্য লাভ করেছে। পোল্ট্রি শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে নিচে পোল্ট্রি পালন এবং খামার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ
পোল্ট্রি পালনের গুরুত্ব
* এরা ডিম ও মাংসের যোগান দিয়ে থাকে। মানুষের জন্য ডিম হলো উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন আমিষজাতীয় খাদ্য।
* বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পোল্ট্রি পালনের মাধ্যমে শহর ও গ্রামের সাধারণ জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

* অন্যান্য শিল্পের তুলনায় পোল্ট্রি খামার স্থাপনে স্বল্প মূলধনের প্রয়োজন হয়। তেমন জমির প্রয়োজন হয় না, ইচ্ছা করলেই বসত বাড়িতে, ঘরের ছাদে, শয়ন ঘরের বারান্দায় এমনকি পুকুরে মাচা তৈরি করেও পালন করা যায়।
* স্বল্পতম সময়ে অর্থ বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কারণ এরা ৫-৬ মাস বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং ব্রয়লার মুরগি ৫-৭ সপ্তাহ বয়সে মাংসের জন্য বিক্রয় উপযোগী হয়।
* এদের পালক হতে নানা রকম প্রসাধনী দ্রব্য যেমন-শ্যাম্পু, সুগন্ধি তৈল এবং ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি করা যায়।

* ডিমের কুসুম গরুর জাত উন্নয়নে কৃত্রিম প্রজননের জন্য ব্যবহৃত হয়।
* ডিম পরীক্ষাগারে জীবাণুর বংশ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
* মুরগির ডিম ও মাংসে পুষ্টি উপাদান গরুর দুধের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। যেমন, একটি ডিমে দুই গ্লাস দুধের সমান পুষ্টি থাকে।
 
সারণী-১ ঃ গরুর দুধ, হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংসে ভোজ্য পুষ্টি উপাদানের পার্থক্য

* মুরগির ডিম গরুর দুধ অপেক্ষা অনেক বেশি ভিটামিনযুক্ত খাবার।
 
সারণী- ২ ঃ গরুর দুধ এবং মুরগির ডিম ও মাংসে গড় ভিটামিনের পরিমাণ নিম্নরূপ

* পোল্ট্রির বিষ্ঠা একটি উৎকৃষ্টমানের জৈব সার। গরু-মহিষের মল-মূত্র থেকে পোল্ট্রির বিষ্ঠায় বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম থাকে যা জমির ঊর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিসহ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
* পোল্ট্রি খামারের বিষ্ঠা দ্বারা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যায়।
খামার ব্যবস্থাপনা
(ক) মুরগির বাচ্চার ব্রুডিং ব্যবস্থাপনা
ব্রুডিং (Brooding)
ব্রুডিং শব্দটি এসেছে জার্মান শব্দ ব্রুড থেকে। যার অর্থ তাপ দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে ব্রুডিং বলতে ১ দিন বয়স থেকে ৪ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মুরগির বাচ্চাকে সমস্ত প্রতিকূল অবস্থা যেমন প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যপ্রাণী এবং অন্যান্য সমস্যা থেকে রক্ষা করাকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ একদিন বয়সের মুরগীর বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রা থাকে ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট আর বয়স্ক মুরগীর শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট। বাচ্চা অবস্থায় মুরগির বাচ্চা তার শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কারণ, এই সময় তাদের শরীরে তাপ নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটে না। ফলে ঠান্ডা, বাতাস প্রবাহ, বৃষ্টি বা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না। যার জন্য বাচ্চাকে এমন একটি কৃত্রিম অবস্থায় রাখতে হয় যাতে মুরগির বাচ্চা আরামদায়ক ও নিরাপদ থাকে এবং তাপ নিয়ন্ত্রয়ণকারী অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটে। চার সপ্তাহ পর মুরগির তাপ নিয়ন্ত্রয়ণকারী অঙ্গগুলি পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং তখন থেকে মুরগি তাপ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা অর্জন করে।
মুরগির বাচ্চার প্রথম খাদ্য

ডিম হতে সদ্য ফুটন্ত বাচ্চার উদর গহ্বরে কুসুমের কিছু অংশ থেকে যায় যা থেকে প্রথম ২-৩ দিন কোনো প্রকার খাদ্য বা পানি গ্রহণ ছাড়াই বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকতে পারে। তবে বাচ্চাকে খামারে আনার পর দেরিতে খাদ্য ও পানি প্রদান করলে দৈহিক বৃদ্ধির হার কমে যায় এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে, সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব বিশুদ্ধ পানি পান করতে দিতে হবে। পানি প্রদানের কমপক্ষে ৩-৬ ঘন্টা পর বাচ্চাগুলিকে খাদ্য দিতে হবে। প্রাথামিকভাবে পানিতে গ্লুকোজ, ভিটামিন সি এবং মাল্টিভিটামিন ১ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। পানি প্রদানের পূর্বে খাদ্য প্রদান করা উচিত নয়। এতে করে বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি এবং খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা কমে যায় ও মৃত্যুহার অধিক হয়। প্রথম ২-৩ দিন খাদ্যের পাশাপাশি ইলেক্ট্রলাইট মিশ্রিত পানি দেয়া উচিত যা বাচ্চাগুলিকে পানিশূন্যতা এবং সকল প্রকার ধকল থেকে রক্ষা করে।
ব্রুডিং এর প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ
১. ব্রুডার ঘর
ব্রুডিং এর জন্য আলাদা ঘর হলে ভালো হয়। ব্রুডিং সাধারণত বড় মোরগ-মুরগীর ঘর থেকে কমপক্ষে ১০০ ফুট দূরে পৃথক স্থানে আলাদাভাবে করাই উত্তম। খেয়াল রাখতে হবে যেন বাইরের মুক্ত বাতাস ব্রুডার ঘরে ঢুকতে পারে এবং ভেতরের দূষিত বাতাস সহজে বাইরে যেতে পারে। লেয়ার বা ব্রয়লার পালনের ঘরও ব্রুডার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে নিম্নের কাজগুলি প্রথমে করতে হবে।
* বাচ্চা তোলার কমপক্ষে ১ সপ্তাহ আগে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক দ্বারা ভালোভাবে ধুয়ে শুকাতে হবে।
* সম্ভব হলে সম্পূর্ণ ঘর চট বা পলিথিন দিয়ে ধুয়ে মুছে ফিউমিগেশন করতে হবে। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও ফরমালিন দ্বারা ফরমালডিহাইড গ্যাস সৃষ্টির মাধ্যমে ফিউমিগেশন করা যায়। প্রতি ১০০ ঘনফুট জায়গার জন্য ১২০ মিলি. ফরমালিন এর সাথে ৬০ গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবহার করা যায়।
২. হোভার
তাপ যাতে ওপরের দিকে চলে না যায় সেজন্য হোভার প্রয়োজন। হোভার টিন, কাঠ বা বাঁকা বাঁশ দ্বারা তৈরি করা যায়। হোভারকে সাধারণত ঝুলিয়ে রাখা হয়। তবে নিচে পা লাগিয়ে দাঁড় করিয়েও রাখা যায়। পাঁচ ফুট ব্যাসের হোভারের নিচে ৫০০ টি বাচ্চা রাখা যায়।
৩. ব্রুডার

মুরগির বাচ্চার ঘরে তাপের উৎসকে ব্রুডার বলে। ব্রুডার হিসেবে বৈদ্যুতিক হিটার, কেরোসিন বাতি, হ্যাজাক, ইত্যাদি ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দেয়া যায়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ১০০ ওয়াটের ২টি বাল্ব এবং ৬০ ওয়াটের ১টি বাল্ব আর শীতকালে ২০০ ওয়াটের ২টি এবং ১০০ ওয়াটের ২টি বাল্ব প্রতি ৫০০ বাচ্চার জন্য ব্রুডারে ব্যবহার করা যথেষ্ট। বাচ্চা ব্রুডারে ছাড়ার ১০-১২ ঘন্টা পূর্বে ব্রুডার চালু করে প্রয়োজনীয় তাপ দিতে হবে।
৪. চিকগার্ড
ব্রুডার থেকে ১.৫-৩ ফুট দুরত্বে ১.৫ ফুট উচুঁ চাটাই বা হার্ডবোর্ডের বা তারের জালের বেষ্টনী তৈরি করা হয়। ফলে বাচ্চা ব্রুডার থেকে দূরে যেতে পারে না। প্রতি ৫০০ বাচ্চার জন্য চিকগার্ডের ব্যাস হবে ১২ ফুট (ব্যাসার্ধ ৬ ফুট। ক্ষেত্রফল = ৩.১৪ x ৩৬ = ১১৩.০৪ বর্গফুট)। প্রতিটি বাচ্চার জন্য জায়গা হবে ১১৩.০৪/৫০০ = ০.২১৮ বর্গফুট। চিকগার্ডের উচ্চতা গরমের সময় ১'-৬'' এবং শীতের সময় ২'-৬'' হবে। বাচ্চা বড় হবার সাথে সাথে চিকগার্ডের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. খাবার পাত্র ও খাবার ব্যবস্থাপনা
প্রথম ১-২ দিন কাগজের ওপর এবং পরবর্তীতে ১-২ সপ্তাহ ফ্লাট ট্রে ব্যবহার করা যায়। অতঃপর ৩য় সপ্তাহ থেকে হপার বা টিউব ফিডারে খাদ্য সরবরাহ করা যায়। প্রথম দুই সপ্তাহ ২ ঘন্টা অন্তর খাদ্য সরবরাহ করা ভালো। খাবার পাত্রের দৈর্ঘ্য = ২', প্রস্থ =    ১'-৩' এবং কিনারা ১.৫'' হওয়া উচিত। প্রথম ৩ ঘন্টা ইলেক্ট্রলাইট মিশ্রিত পানি দিতে হবে। প্রথমে ভুট্টা ভাঙ্গা বা সাগুদানা খাবারের পাত্রে মিশিয়ে দিলে ভালো হয়। কারণ এগুলো সহজে হজম হয়। খাবার কখনোই ব্রুডারের নিচে ছিটানো উচিত নয় কেননা এতে বাচ্চা ছত্রাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। বাচ্চার ওজন এবং আকারে সমতা আনার জন্য খাবার শেষ হওয়ার আগেই খাবার দেয়া উচিত। চার সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত দৈনিক ৩-৪ গ্রাম খাদ্য দিতে হবে। এরপর দৈনিক ২-৩ বার দিলেই চলবে।
৬. পানির পাত্র ও পানি ব্যবস্থাপনা
বাচ্চার জন্য ছোট প্লাস্টিকের পানির পাত্র পাওয়া যায়। ছোট টিনের কৌটার নিচে থালা বসিয়েও পানির পাত্র বানানো যায়। পানির পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করে প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। প্রথম অবস্থায় ৫০০ টি বাচ্চার জন্য ১ লিটারের ৬-৮ টি ড্রিংকার দিতে হবে। এতে করে এক সঙ্গে সকল বাচ্চা পানি পান করতে পারে। প্রতি ১০০ লিটার পানিতে ৩-৫ গ্রাম ক্লোরিন মিশানো যেতে পারে। অবশ্য টিকা বা ওষুধ পানিতে মিশিয়ে খাওয়ানোর সময় ক্লোরিন মেশানো উচিত নয়। প্রথম অবস্থায় পানি (২৫-৩০) ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় রাখা ভালো। চিকস ড্রিংকার ৮-১০ দিন রাখতে হবে। প্রতিটি মুরগির পানি পান করানোর জন্য ২.৫ সেমি. জায়গা করে দিতে হবে।
৭. ঘরের আলো ও আলো ব্যবস্থাপনা
বাচ্চার ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বাচ্চা খাদ্য ও পানির পাত্র সহজে দেখতে পারে। দিনের বেলা হলে আলাদা আলো প্রদানের প্রয়োজন নেই। তবে রাতে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে কৃত্রিম আলো প্রদান করতে হবে। ব্রুডারে বাচ্চা তোলার ৩ দিন পর হতে রাতে ১-২ ঘন্টা অন্ধকার রাখতে হবে। যাতে বাচ্চাগুলি অন্ধকারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং বিদ্যুৎ না থাকলে অন্ধকারে ভয় না পায়।
৮. তাপমাত্রা ও এর ব্যবস্থাপনা
ডিম হতে বাচ্চা ফুটার পর ৪ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত বাচ্চার দেহে তাপ নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গগুলির পরিপূর্ণতা লাভ করে না। তাই এই সময় বাচ্চাকে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দিতে হয়। প্রথম সপ্তাহে সাধারণত ৯৫ক্ক ফারেনহাইট তাপ দিয়ে ব্রুডিং আরম্ভ করতে হয়। এই তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে নিম্নলিখিত মাত্রায় আনতে হয়।

ওপরে যে তাপের তালিকা প্রদান করা হলো তা ব্রুডার ঘরের কাম্য তাপমাত্রা এবং থার্মোমিটারের সাহায্যে এই তাপমাত্রা সহজেই নিরূপন করা যায়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে টিকা দেয়ার পর তাপমাত্রা ১০ সে. বাড়িয়ে রাখতে হবে। এতে করে বাচ্চা টিকার প্রতি ভালো সাড়া দিয়ে থাকে।
৯. স্থান সংকুলান
ব্রুডার ঘরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে। শীতকালে নিম্নলিখিত পরিমাপ অনুযায়ী স্থান সঙ্কুলান করতে হবে।

গ্রীষ্মকালে নিম্নলিখিত পরিমাপ অনুযায়ী স্থান সঙ্কুলান করতে হবে।

১০. আলোর ব্যবস্থাপনা
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাড়ন্ত মুরগীর জন্য শুধু দিনের আলোই যথেষ্ট। নিম্নলিখিত বিষয়গুলির জন্য বাড়ন্ত এবং ডিম পাড়ার সময় আলোক দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
* সঠিক বয়সে ও পূর্ণ গঠনে ডিম উৎপাদন শুরু এবং পরিপক্ক করার জন্য।
* সবচেয়ে ভালো ডিম উৎপাদনের হার অর্জনের জন্য।
* ডিমের আকার বড় হওয়ার জন্য।
* সঠিক শারীরিক ওজন অর্জনের জন্য।
(খ) বাড়ন্ত মুরগীর ব্যবস্থাপনা
মুরগীর ৬-১৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত সময়কেই বাড়ন্তকাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বাড়ন্তকালে মুরগীর নিম্নলিখিত তথ্যগুলি নিয়মিত সংরক্ষণ করতে হবে।
* শারীরিক ওজন
* খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ
* পানি গ্রহণের পরিমাণ
* আলোর পরিমাণ
* টিকাদান
* মৃত্যুহার
* তাপমাত্রা
* রোগের প্রাদুর্ভাব
* ঠোঁট কাটা
* খাদ্যের প্রকার (আমিষ ও শক্তির মাত্রা, ইত্যাদি)
সব সময় তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট বয়সের বৈশিষ্ট্যের সাথে প্রাপ্ত তথ্যগুলি তুলনা করতে হবে। ফলাফল প্রত্যাশিত না হলে ঝাঁকের মুরগীর সঠিক দক্ষতার জন্য ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই কোনো না কোনো পরিবর্তন আনতে হবে।
ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি
কাম্য উৎপাদন এবং সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি  গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি ঝাঁকে ৮০% মুরগী ঝাঁকের গড় ওজনের ১০% কম বা বেশির মধ্যে থাকে, তবে ওই ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি হয়েছে বলে ধরা হয়।
বাড়ন্ত মুরগী পালনে অবশ্য করণীয় কাজ
৬ থেকে ১৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মুরগীকে বাড়ন্ত মুরগী বলে। এই সময়ে এমনভাবে যত্ন নিতে হবে যেন ডিম উৎপাদনকালে ওজন (ভারী মুরগীর ক্ষেত্রে) কমপক্ষে ১.৫ কেজি হয়। বাড়ন্ত মুরগী পালনে নিম্নের বিষয়গুলি অনুসরণ করতে হবে।
* প্রথমত ঘরের পুরাতন লিটার ও আসবাবপত্রাদি বের করে ঘর সুন্দরভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
* পানিতে জীবাণুনাশক ওষুধ মিশিয়ে ঘর ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
* ঘরের মেঝেতে আয়তন অনুযায়ী বাড়ন্ত মুরগী রাখতে হবে।
* ঘরে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র দিনের আলোতে পালন করতে হবে। দিনের আলো ব্যতিত রাতে ঘরে আলো জ্বেলে রাখলে শীঘ্র যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং ডিম পাড়া শুরু করে।
(গ) ডিমপাড়া মুরগী পালন ও তার ব্যবস্থাপনা
ডিমপাড়া মুরগী বাছাই
মুরগীসমূহ ডিমপাড়ার আগে বাছাই করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ ডিম উৎপাদনের ওপর খামারের লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে। তাই পুলেটসমূহকে লেয়ার ঘরে নেয়ার পূর্বে তাদের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখে বাছাই করতে হবে।

ঘর তৈরির জন্য স্থান নির্বাচন
* উঁচু জায়গা যেখানে পানি জমে না।
* লোকালয় থেকে দূরে।
* অন্য মুরগি এবং প্রাণীর ঘর থেকে দূরে হবে।
* যাতায়াত ব্যবস্থা সুবিধাজনক হতে হবে।
* বাজারজাতকরণের সুবিধা থাকবে।
* পানি ও বিদ্যুৎ এর সুবিধা থাকবে।
মুরগি পালনের পদ্ধতি
তিন পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হয়। যথাক্রমে- (১) লিটার বা বিছানা পদ্ধতি (২) মাঁচা পদ্ধতি (৩) খাঁচা পদ্ধতি
আমাদের দেশে সাধারণত দোচালা ঘরে মুরগি পালন সুবিধাজনক।
১। লিটার বা বিছানা পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে ঘরের মেঝের ওপর বিছানা হিসেবে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য ব্যবহার করা হয়। যেমন-
তুঁষ, কাঠের গুঁড়া, বালি, ছাই, আখের ছোবড়া, খড়ের ছোট টুকরা, ইত্যাদি।
ভালো লিটার দ্রব্যের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা
* আরামপ্রদ
* অধিক পানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন
* অনার্দ্র ও শুষ্ক
* সহজলভ্য ও সস্তা
* ছত্রাক ও পরজীবী মুক্ত
* লিটার হিসেবে ব্যবহারের পর সার হিসেবে ব্যবহার করা যায় এমন।
মুরগি রাখার এক সপ্তাহ পূর্বে ঘরে লিটার দ্রব্য বিছাতে হবে। লিটারের পুরুত্ব কমপক্ষে ১.৫-২ ইঞ্চি হবে। লিটারের আর্দ্রতা ২০-২৫ ভাগের মধ্যে হতে হবে। লিটার মাঝে মধ্যে উল্টে পাল্টে দিতে হবে।
২. খাঁচা পদ্ধতিতে মুরগী পালন     
আধুনিক বিশ্বে বর্তমানে খাঁচা পদ্ধতিতে অধিক দক্ষভাবে ডিম পাড়া মুরগী পালন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের খাঁচা বাজারে পাওয়া যায়।

খাঁচার মাপ হবে ১৮'' x ১২'' x ১৯'' (দৈর্ঘ্য x প্রস্থ x উচ্চতা )। এ ধরনের একটি খাঁচায় অনায়াসে ৩টি ডিম পাড়া মুরগী রাখা যায়।
ডিমপাড়া মুরগী পালনে করণীয় কাজ
খামার সুষ্ঠু ও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলির প্রতি নজর দিতে হবে।
যেমন
* ডিমপাড়া মুরগীর ঘরের তাপমাত্রা (আদর্শ তাপমাত্রা ১৫-২৩ ডিগ্রী সে.)।
* খাবার পাত্রে জায়গার পরিমাণ (১৮-৭৫ সপ্তাহ বয়সে খাবার পাত্র থেকে প্রতি মুরগীর রৈখক দুরত্ব ১০ সেমি. এবং গোলাকার দুরত্ব ৪ সেমি.)
* পানির পাত্রে জায়গার পরিমাণ (বয়স ১৮-৭৫ সপ্তাহ পর্যন্ত ২.৫ সেমি./মুরগী)
* খাদ্য ও পানি প্রদান (খাদ্য = ১১৫-১২০ গ্রাম/দিন/মুরগী এবং পানি ৩০০-৫০০ মিলি/দিন/মুরগী)
* সঠিক আলোক ব্যবস্থাপনা

বাণিজ্যিক লেয়ারের আলোক কর্মসূচি

* ১০ লাক্স আলোক উজ্জ্বলতার জন্য ৭ ফুট উচ্চতায় ১টি  ৬০ ওয়াট বিশিষ্ট বাল্ব প্রতি ২৪০ বর্গফুট জায়গার জন্য যথেষ্ট।
* ১৮ সপ্তাহ শেষে কাঙ্খিত ওজন আসলেই ১৯ সপ্তাহের শুরুতে কর্মসূচী অনুযায়ী আলো বাড়াতে হবে। যদি কাঙ্খিত ফল না আসে সে ক্ষেত্রে ১০% ডিম উৎপাদন হওয়া পর্যন্ত আলোক সময়কাল বাড়ানো বন্ধ রাখতে হবে।
বাণিজ্যিক লেয়ার মুরগীর নূন্যতম টিকাদান কর্মসূচী

এছাড়াও অভিজ্ঞ প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফাউল কলেরা, মাইকোপ্লাজমোসিস, কক্সিডিওসিস, ই.ডি.এস, ইনফেকশাস করাইজা, ইত্যাদি রোগের বিরুদ্ধে টিকা প্রদান করা উচিত।
মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির পরিমাণ

যে সকল কারণে খামারের উৎপাদন ব্যহত হয়
নানাবিধ কারণে খামারের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। যেমন-
* হঠাৎ দৈহিক তাপমাত্রা পরিবর্তন।
* খাদ্যের পরিবর্তন বিশেষ করে আমিষ, এমাইনো এসিড, (লাইসিন, মিথিওনিন) এবং লিনোলেনিক এসিড পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
* ডিমপাড়া অবস্থায় মুরগীকে টিকা দেয়া হলে কয়েক দিনের জন্য ডিম উৎপাদন কমে যেতে পারে।
* এন্টিবায়োটিক এবং সালফার ড্রাগ সেবনের কারণে ডিম উৎপাদন সাময়িক কমে যেতে পারে।
* কৃমির ওষুধ নিয়মিত ও সময়মত না খাওয়ালে।
* ফাউল কলেরা, মাইকোপ্লাজমা, সালমোনেলা, ইত্যাদি জীবাণুর উপস্থিতি থাকলে ডিম উৎপাদন কমে যায়।
* মুরগী কোনো কারণে ভয় পেলে।
* হঠাৎ ঝড় বৃষ্টির কারণে মুরগী ভিজে গেলে।
* পরিবেশের তাপমাত্রা অত্যধিক ওঠানামা করলে।
* আফলাটক্সিকোসিস বা মাইকোটক্সিকোসিস হলে।
উপসংহার
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আমিষের  চাহিদা পূরণ, বেকারত্ব হ্রাস, ইত্যাদি কারণে পোল্ট্রি শিল্প বর্তমানে একটি দ্রুত বিকাশমান খাত। সফলভাবে পোল্ট্রি পালন করতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, খামার ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়গুলি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা লাভ এবং তার প্রয়োগ, রোগ নিয়ন্ত্রণ অথবা চিকিৎসা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন অতীব প্রয়োজন। তবেই পোল্ট্রি পালনে আসবে সফলতা এবং ঘটবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।
সূত্র
১. বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালন ও খামার ব্যবস্থাপনা- প্রফেসর ড. মো. জালাল উদ্দিন সরদার।
২. হাঁস-মুরগির যতœ ও চিকিৎসা- এগ্রোভেট ডিভিশন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেড।
৩. হাঁস-মুরগি পালন ও চিকিৎসা- ডাঃ এইচ.কে.নিয়োগি।
৪. নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা।
৫. Poultry Science & Medicine- Professor Dr. Md. Abdus Samad.
ডাঃ মোঃ আকতার ফেরদৌস রানা
ডি.ভি.এম (আর,ইউ) এম.এস ইন ফার্মাকোলজি (বি.এ.ইউ)
ফেলো, ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি (জি.ও.বি)
ভেটেরিনারি প্রাকটিশনার
খানজাহান আলী, খুলনা।