Sunday, July 31, 2016

Suggestion For Animal Health

পোল্ট্রি পালন এবং খামার ব্যবস্থাপনা (ডাঃ মোঃ আকতার ফেরদৌস রানা)

ভূমিকা
তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। এদেশের অর্থনীতি মূলত: কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পোল্ট্রি শিল্প কৃষি শিল্পের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। উৎপাদন খরচ অপেক্ষাকৃত কম, দ্রুত ডিম ও মাংস পাওয়ার নিশ্চয়তা, দ্রুততার সাথে ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ, এদের মাংসে সীমিত চর্বির উপস্থিতি, হজমে সুবিধা, সকল ধর্মের মানুষের কাছে সমানভাবে সমাদৃত; এ সকল কারণে পোল্ট্রি পালন এবং এদের থেকে উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী (ডিম ও মাংস) মানুষের পুষ্টির যোগানে আদর্শ ও মানসম্পন্ন হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দিন দিন এ শিল্পের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। কৃষি উন্নয়ন তথা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে
পোল্ট্রি পালন আজ একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। গরিব, অল্প আয়ের লোক, বেকার শিক্ষিত যুবক ও যুব-মহিলাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী এই শিল্পের সাথে নিজেদের নিয়োজিত রেখে সাফল্য লাভ করেছে। পোল্ট্রি শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে নিচে পোল্ট্রি পালন এবং খামার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ

পোল্ট্রি পালনের গুরুত্ব
* এরা ডিম ও মাংসের যোগান দিয়ে থাকে। মানুষের জন্য ডিম হলো উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন আমিষজাতীয় খাদ্য।
* বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পোল্ট্রি পালনের মাধ্যমে শহর ও গ্রামের সাধারণ জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

* অন্যান্য শিল্পের তুলনায় পোল্ট্রি খামার স্থাপনে স্বল্প মূলধনের প্রয়োজন হয়। তেমন জমির প্রয়োজন হয় না, ইচ্ছা করলেই বসত বাড়িতে, ঘরের ছাদে, শয়ন ঘরের বারান্দায় এমনকি পুকুরে মাচা তৈরি করেও পালন করা যায়।
* স্বল্পতম সময়ে অর্থ বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কারণ এরা ৫-৬ মাস বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং ব্রয়লার মুরগি ৫-৭ সপ্তাহ বয়সে মাংসের জন্য বিক্রয় উপযোগী হয়।
* এদের পালক হতে নানা রকম প্রসাধনী দ্রব্য যেমন-শ্যাম্পু, সুগন্ধি তৈল এবং ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি করা যায়।

* ডিমের কুসুম গরুর জাত উন্নয়নে কৃত্রিম প্রজননের জন্য ব্যবহৃত হয়।
* ডিম পরীক্ষাগারে জীবাণুর বংশ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
* মুরগির ডিম ও মাংসে পুষ্টি উপাদান গরুর দুধের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। যেমন, একটি ডিমে দুই গ্লাস দুধের সমান পুষ্টি থাকে।
সারণী-১ ঃ গরুর দুধ, হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংসে ভোজ্য পুষ্টি উপাদানের পার্থক্য

* মুরগির ডিম গরুর দুধ অপেক্ষা অনেক বেশি ভিটামিনযুক্ত খাবার।
সারণী- ২ ঃ গরুর দুধ এবং মুরগির ডিম ও মাংসে গড় ভিটামিনের পরিমাণ নিম্নরূপ

* পোল্ট্রির বিষ্ঠা একটি উৎকৃষ্টমানের জৈব সার। গরু-মহিষের মল-মূত্র থেকে পোল্ট্রির বিষ্ঠায় বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম থাকে যা জমির ঊর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিসহ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
* পোল্ট্রি খামারের বিষ্ঠা দ্বারা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যায়।

খামার ব্যবস্থাপনা
 
(ক) মুরগির বাচ্চার ব্রুডিং ব্যবস্থাপনা
ব্রুডিং (Brooding)
ব্রুডিং শব্দটি এসেছে জার্মান শব্দ ব্রুড থেকে। যার অর্থ তাপ দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে ব্রুডিং বলতে ১ দিন বয়স থেকে ৪ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মুরগির বাচ্চাকে সমস্ত প্রতিকূল অবস্থা যেমন প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যপ্রাণী এবং অন্যান্য সমস্যা থেকে রক্ষা করাকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ একদিন বয়সের মুরগীর বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রা থাকে ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট আর বয়স্ক মুরগীর শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট। বাচ্চা অবস্থায় মুরগির বাচ্চা তার শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কারণ, এই সময় তাদের শরীরে তাপ নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটে না। ফলে ঠান্ডা, বাতাস প্রবাহ, বৃষ্টি বা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না। যার জন্য বাচ্চাকে এমন একটি কৃত্রিম অবস্থায় রাখতে হয় যাতে মুরগির বাচ্চা আরামদায়ক ও নিরাপদ থাকে এবং তাপ নিয়ন্ত্রয়ণকারী অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটে। চার সপ্তাহ পর মুরগির তাপ নিয়ন্ত্রয়ণকারী অঙ্গগুলি পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং তখন থেকে মুরগি তাপ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা অর্জন করে।
মুরগির বাচ্চার প্রথম খাদ্য

ডিম হতে সদ্য ফুটন্ত বাচ্চার উদর গহ্বরে কুসুমের কিছু অংশ থেকে যায় যা থেকে প্রথম ২-৩ দিন কোনো প্রকার খাদ্য বা পানি গ্রহণ ছাড়াই বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকতে পারে। তবে বাচ্চাকে খামারে আনার পর দেরিতে খাদ্য ও পানি প্রদান করলে দৈহিক বৃদ্ধির হার কমে যায় এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যেতে পারে, সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব বিশুদ্ধ পানি পান করতে দিতে হবে। পানি প্রদানের কমপক্ষে ৩-৬ ঘন্টা পর বাচ্চাগুলিকে খাদ্য দিতে হবে। প্রাথামিকভাবে পানিতে গ্লুকোজ, ভিটামিন সি এবং মাল্টিভিটামিন ১ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। পানি প্রদানের পূর্বে খাদ্য প্রদান করা উচিত নয়। এতে করে বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি এবং খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা কমে যায় ও মৃত্যুহার অধিক হয়। প্রথম ২-৩ দিন খাদ্যের পাশাপাশি ইলেক্ট্রলাইট মিশ্রিত পানি দেয়া উচিত যা বাচ্চাগুলিকে পানিশূন্যতা এবং সকল প্রকার ধকল থেকে রক্ষা করে।
ব্রুডিং এর প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ
১. ব্রুডার ঘর
ব্রুডিং এর জন্য আলাদা ঘর হলে ভালো হয়। ব্রুডিং সাধারণত বড় মোরগ-মুরগীর ঘর থেকে কমপক্ষে ১০০ ফুট দূরে পৃথক স্থানে আলাদাভাবে করাই উত্তম। খেয়াল রাখতে হবে যেন বাইরের মুক্ত বাতাস ব্রুডার ঘরে ঢুকতে পারে এবং ভেতরের দূষিত বাতাস সহজে বাইরে যেতে পারে। লেয়ার বা ব্রয়লার পালনের ঘরও ব্রুডার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে নিম্নের কাজগুলি প্রথমে করতে হবে।
* বাচ্চা তোলার কমপক্ষে ১ সপ্তাহ আগে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক দ্বারা ভালোভাবে ধুয়ে শুকাতে হবে।
* সম্ভব হলে সম্পূর্ণ ঘর চট বা পলিথিন দিয়ে ধুয়ে মুছে ফিউমিগেশন করতে হবে। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও ফরমালিন দ্বারা ফরমালডিহাইড গ্যাস সৃষ্টির মাধ্যমে ফিউমিগেশন করা যায়। প্রতি ১০০ ঘনফুট জায়গার জন্য ১২০ মিলি. ফরমালিন এর সাথে ৬০ গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবহার করা যায়।
২. হোভার
তাপ যাতে ওপরের দিকে চলে না যায় সেজন্য হোভার প্রয়োজন। হোভার টিন, কাঠ বা বাঁকা বাঁশ দ্বারা তৈরি করা যায়। হোভারকে সাধারণত ঝুলিয়ে রাখা হয়। তবে নিচে পা লাগিয়ে দাঁড় করিয়েও রাখা যায়। পাঁচ ফুট ব্যাসের হোভারের নিচে ৫০০ টি বাচ্চা রাখা যায়।
৩. ব্রুডার

মুরগির বাচ্চার ঘরে তাপের উৎসকে ব্রুডার বলে। ব্রুডার হিসেবে বৈদ্যুতিক হিটার, কেরোসিন বাতি, হ্যাজাক, ইত্যাদি ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দেয়া যায়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ১০০ ওয়াটের ২টি বাল্ব এবং ৬০ ওয়াটের ১টি বাল্ব আর শীতকালে ২০০ ওয়াটের ২টি এবং ১০০ ওয়াটের ২টি বাল্ব প্রতি ৫০০ বাচ্চার জন্য ব্রুডারে ব্যবহার করা যথেষ্ট। বাচ্চা ব্রুডারে ছাড়ার ১০-১২ ঘন্টা পূর্বে ব্রুডার চালু করে প্রয়োজনীয় তাপ দিতে হবে।
৪. চিকগার্ড
ব্রুডার থেকে ১.৫-৩ ফুট দুরত্বে ১.৫ ফুট উচুঁ চাটাই বা হার্ডবোর্ডের বা তারের জালের বেষ্টনী তৈরি করা হয়। ফলে বাচ্চা ব্রুডার থেকে দূরে যেতে পারে না। প্রতি ৫০০ বাচ্চার জন্য চিকগার্ডের ব্যাস হবে ১২ ফুট (ব্যাসার্ধ ৬ ফুট। ক্ষেত্রফল = ৩.১৪ x ৩৬ = ১১৩.০৪ বর্গফুট)। প্রতিটি বাচ্চার জন্য জায়গা হবে ১১৩.০৪/৫০০ = ০.২১৮ বর্গফুট। চিকগার্ডের উচ্চতা গরমের সময় ১'-৬'' এবং শীতের সময় ২'-৬'' হবে। বাচ্চা বড় হবার সাথে সাথে চিকগার্ডের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. খাবার পাত্র ও খাবার ব্যবস্থাপনা
প্রথম ১-২ দিন কাগজের ওপর এবং পরবর্তীতে ১-২ সপ্তাহ ফ্লাট ট্রে ব্যবহার করা যায়। অতঃপর ৩য় সপ্তাহ থেকে হপার বা টিউব ফিডারে খাদ্য সরবরাহ করা যায়। প্রথম দুই সপ্তাহ ২ ঘন্টা অন্তর খাদ্য সরবরাহ করা ভালো। খাবার পাত্রের দৈর্ঘ্য = ২', প্রস্থ =    ১'-৩' এবং কিনারা ১.৫'' হওয়া উচিত। প্রথম ৩ ঘন্টা ইলেক্ট্রলাইট মিশ্রিত পানি দিতে হবে। প্রথমে ভুট্টা ভাঙ্গা বা সাগুদানা খাবারের পাত্রে মিশিয়ে দিলে ভালো হয়। কারণ এগুলো সহজে হজম হয়। খাবার কখনোই ব্রুডারের নিচে ছিটানো উচিত নয় কেননা এতে বাচ্চা ছত্রাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। বাচ্চার ওজন এবং আকারে সমতা আনার জন্য খাবার শেষ হওয়ার আগেই খাবার দেয়া উচিত। চার সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত দৈনিক ৩-৪ গ্রাম খাদ্য দিতে হবে। এরপর দৈনিক ২-৩ বার দিলেই চলবে।
৬. পানির পাত্র ও পানি ব্যবস্থাপনা
বাচ্চার জন্য ছোট প্লাস্টিকের পানির পাত্র পাওয়া যায়। ছোট টিনের কৌটার নিচে থালা বসিয়েও পানির পাত্র বানানো যায়। পানির পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করে প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। প্রথম অবস্থায় ৫০০ টি বাচ্চার জন্য ১ লিটারের ৬-৮ টি ড্রিংকার দিতে হবে। এতে করে এক সঙ্গে সকল বাচ্চা পানি পান করতে পারে। প্রতি ১০০ লিটার পানিতে ৩-৫ গ্রাম ক্লোরিন মিশানো যেতে পারে। অবশ্য টিকা বা ওষুধ পানিতে মিশিয়ে খাওয়ানোর সময় ক্লোরিন মেশানো উচিত নয়। প্রথম অবস্থায় পানি (২৫-৩০) ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় রাখা ভালো। চিকস ড্রিংকার ৮-১০ দিন রাখতে হবে। প্রতিটি মুরগির পানি পান করানোর জন্য ২.৫ সেমি. জায়গা করে দিতে হবে।
৭. ঘরের আলো ও আলো ব্যবস্থাপনা
বাচ্চার ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বাচ্চা খাদ্য ও পানির পাত্র সহজে দেখতে পারে। দিনের বেলা হলে আলাদা আলো প্রদানের প্রয়োজন নেই। তবে রাতে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে কৃত্রিম আলো প্রদান করতে হবে। ব্রুডারে বাচ্চা তোলার ৩ দিন পর হতে রাতে ১-২ ঘন্টা অন্ধকার রাখতে হবে। যাতে বাচ্চাগুলি অন্ধকারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং বিদ্যুৎ না থাকলে অন্ধকারে ভয় না পায়।
৮. তাপমাত্রা ও এর ব্যবস্থাপনা
ডিম হতে বাচ্চা ফুটার পর ৪ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত বাচ্চার দেহে তাপ নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গগুলির পরিপূর্ণতা লাভ করে না। তাই এই সময় বাচ্চাকে কৃত্রিম উপায়ে তাপ দিতে হয়। প্রথম সপ্তাহে সাধারণত ৯৫ক্ক ফারেনহাইট তাপ দিয়ে ব্রুডিং আরম্ভ করতে হয়। এই তাপমাত্রা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে নিম্নলিখিত মাত্রায় আনতে হয়।

ওপরে যে তাপের তালিকা প্রদান করা হলো তা ব্রুডার ঘরের কাম্য তাপমাত্রা এবং থার্মোমিটারের সাহায্যে এই তাপমাত্রা সহজেই নিরূপন করা যায়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে টিকা দেয়ার পর তাপমাত্রা ১০ সে. বাড়িয়ে রাখতে হবে। এতে করে বাচ্চা টিকার প্রতি ভালো সাড়া দিয়ে থাকে।
৯. স্থান সংকুলান
ব্রুডার ঘরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকতে হবে। শীতকালে নিম্নলিখিত পরিমাপ অনুযায়ী স্থান সঙ্কুলান করতে হবে।

গ্রীষ্মকালে নিম্নলিখিত পরিমাপ অনুযায়ী স্থান সঙ্কুলান করতে হবে।

১০. আলোর ব্যবস্থাপনা
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাড়ন্ত মুরগীর জন্য শুধু দিনের আলোই যথেষ্ট। নিম্নলিখিত বিষয়গুলির জন্য বাড়ন্ত এবং ডিম পাড়ার সময় আলোক দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
* সঠিক বয়সে ও পূর্ণ গঠনে ডিম উৎপাদন শুরু এবং পরিপক্ক করার জন্য।
* সবচেয়ে ভালো ডিম উৎপাদনের হার অর্জনের জন্য।
* ডিমের আকার বড় হওয়ার জন্য।
* সঠিক শারীরিক ওজন অর্জনের জন্য।

(খ) বাড়ন্ত মুরগীর ব্যবস্থাপনা
মুরগীর ৬-১৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত সময়কেই বাড়ন্তকাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বাড়ন্তকালে মুরগীর নিম্নলিখিত তথ্যগুলি নিয়মিত সংরক্ষণ করতে হবে।
* শারীরিক ওজন
* খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ
* পানি গ্রহণের পরিমাণ
* আলোর পরিমাণ
* টিকাদান
* মৃত্যুহার
* তাপমাত্রা
* রোগের প্রাদুর্ভাব
* ঠোঁট কাটা
* খাদ্যের প্রকার (আমিষ ও শক্তির মাত্রা, ইত্যাদি)
সব সময় তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট বয়সের বৈশিষ্ট্যের সাথে প্রাপ্ত তথ্যগুলি তুলনা করতে হবে। ফলাফল প্রত্যাশিত না হলে ঝাঁকের মুরগীর সঠিক দক্ষতার জন্য ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই কোনো না কোনো পরিবর্তন আনতে হবে।
ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি
কাম্য উৎপাদন এবং সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি  গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি ঝাঁকে ৮০% মুরগী ঝাঁকের গড় ওজনের ১০% কম বা বেশির মধ্যে থাকে, তবে ওই ঝাঁকের সুষম বৃদ্ধি হয়েছে বলে ধরা হয়।
বাড়ন্ত মুরগী পালনে অবশ্য করণীয় কাজ
৬ থেকে ১৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত মুরগীকে বাড়ন্ত মুরগী বলে। এই সময়ে এমনভাবে যত্ন নিতে হবে যেন ডিম উৎপাদনকালে ওজন (ভারী মুরগীর ক্ষেত্রে) কমপক্ষে ১.৫ কেজি হয়। বাড়ন্ত মুরগী পালনে নিম্নের বিষয়গুলি অনুসরণ করতে হবে।
* প্রথমত ঘরের পুরাতন লিটার ও আসবাবপত্রাদি বের করে ঘর সুন্দরভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
* পানিতে জীবাণুনাশক ওষুধ মিশিয়ে ঘর ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
* ঘরের মেঝেতে আয়তন অনুযায়ী বাড়ন্ত মুরগী রাখতে হবে।
* ঘরে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র দিনের আলোতে পালন করতে হবে। দিনের আলো ব্যতিত রাতে ঘরে আলো জ্বেলে রাখলে শীঘ্র যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং ডিম পাড়া শুরু করে।

(গ) ডিমপাড়া মুরগী পালন ও তার ব্যবস্থাপনা
ডিমপাড়া মুরগী বাছাই
মুরগীসমূহ ডিমপাড়ার আগে বাছাই করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ ডিম উৎপাদনের ওপর খামারের লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে। তাই পুলেটসমূহকে লেয়ার ঘরে নেয়ার পূর্বে তাদের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি দেখে বাছাই করতে হবে।

ঘর তৈরির জন্য স্থান নির্বাচন
* উঁচু জায়গা যেখানে পানি জমে না।
* লোকালয় থেকে দূরে।
* অন্য মুরগি এবং প্রাণীর ঘর থেকে দূরে হবে।
* যাতায়াত ব্যবস্থা সুবিধাজনক হতে হবে।
* বাজারজাতকরণের সুবিধা থাকবে।
* পানি ও বিদ্যুৎ এর সুবিধা থাকবে।

মুরগি পালনের পদ্ধতি
তিন পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হয়। যথাক্রমে- (১) লিটার বা বিছানা পদ্ধতি (২) মাঁচা পদ্ধতি (৩) খাঁচা পদ্ধতি
আমাদের দেশে সাধারণত দোচালা ঘরে মুরগি পালন সুবিধাজনক।
১। লিটার বা বিছানা পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে ঘরের মেঝের ওপর বিছানা হিসেবে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য ব্যবহার করা হয়। যেমন-
তুঁষ, কাঠের গুঁড়া, বালি, ছাই, আখের ছোবড়া, খড়ের ছোট টুকরা, ইত্যাদি।
ভালো লিটার দ্রব্যের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা
* আরামপ্রদ
* অধিক পানি শোষণ ক্ষমতা সম্পন্ন
* অনার্দ্র ও শুষ্ক
* সহজলভ্য ও সস্তা
* ছত্রাক ও পরজীবী মুক্ত
* লিটার হিসেবে ব্যবহারের পর সার হিসেবে ব্যবহার করা যায় এমন।
মুরগি রাখার এক সপ্তাহ পূর্বে ঘরে লিটার দ্রব্য বিছাতে হবে। লিটারের পুরুত্ব কমপক্ষে ১.৫-২ ইঞ্চি হবে। লিটারের আর্দ্রতা ২০-২৫ ভাগের মধ্যে হতে হবে। লিটার মাঝে মধ্যে উল্টে পাল্টে দিতে হবে।
২. খাঁচা পদ্ধতিতে মুরগী পালন     
আধুনিক বিশ্বে বর্তমানে খাঁচা পদ্ধতিতে অধিক দক্ষভাবে ডিম পাড়া মুরগী পালন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের খাঁচা বাজারে পাওয়া যায়।

খাঁচার মাপ হবে ১৮'' x ১২'' x ১৯'' (দৈর্ঘ্য x প্রস্থ x উচ্চতা )। এ ধরনের একটি খাঁচায় অনায়াসে ৩টি ডিম পাড়া মুরগী রাখা যায়।
ডিমপাড়া মুরগী পালনে করণীয় কাজ
খামার সুষ্ঠু ও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলির প্রতি নজর দিতে হবে। যেমন
* ডিমপাড়া মুরগীর ঘরের তাপমাত্রা (আদর্শ তাপমাত্রা ১৫-২৩ ডিগ্রী সে.)।
* খাবার পাত্রে জায়গার পরিমাণ (১৮-৭৫ সপ্তাহ বয়সে খাবার পাত্র থেকে প্রতি মুরগীর রৈখক দুরত্ব ১০ সেমি. এবং গোলাকার দুরত্ব ৪ সেমি.)
* পানির পাত্রে জায়গার পরিমাণ (বয়স ১৮-৭৫ সপ্তাহ পর্যন্ত ২.৫ সেমি./মুরগী)
* খাদ্য ও পানি প্রদান (খাদ্য = ১১৫-১২০ গ্রাম/দিন/মুরগী এবং পানি ৩০০-৫০০ মিলি/দিন/মুরগী)
* সঠিক আলোক ব্যবস্থাপনা

বাণিজ্যিক লেয়ারের আলোক কর্মসূচি

* ১০ লাক্স আলোক উজ্জ্বলতার জন্য ৭ ফুট উচ্চতায় ১টি  ৬০ ওয়াট বিশিষ্ট বাল্ব প্রতি ২৪০ বর্গফুট জায়গার জন্য যথেষ্ট।
* ১৮ সপ্তাহ শেষে কাঙ্খিত ওজন আসলেই ১৯ সপ্তাহের শুরুতে কর্মসূচী অনুযায়ী আলো বাড়াতে হবে। যদি কাঙ্খিত ফল না আসে সে ক্ষেত্রে ১০% ডিম উৎপাদন হওয়া পর্যন্ত আলোক সময়কাল বাড়ানো বন্ধ রাখতে হবে।
বাণিজ্যিক লেয়ার মুরগীর নূন্যতম টিকাদান কর্মসূচী

এছাড়াও অভিজ্ঞ প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফাউল কলেরা, মাইকোপ্লাজমোসিস, কক্সিডিওসিস, ই.ডি.এস, ইনফেকশাস করাইজা, ইত্যাদি রোগের বিরুদ্ধে টিকা প্রদান করা উচিত।
মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির পরিমাণ

যে সকল কারণে খামারের উৎপাদন ব্যহত হয়
নানাবিধ কারণে খামারের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। যেমন-
* হঠাৎ দৈহিক তাপমাত্রা পরিবর্তন।
* খাদ্যের পরিবর্তন বিশেষ করে আমিষ, এমাইনো এসিড, (লাইসিন, মিথিওনিন) এবং লিনোলেনিক এসিড পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
* ডিমপাড়া অবস্থায় মুরগীকে টিকা দেয়া হলে কয়েক দিনের জন্য ডিম উৎপাদন কমে যেতে পারে।
* এন্টিবায়োটিক এবং সালফার ড্রাগ সেবনের কারণে ডিম উৎপাদন সাময়িক কমে যেতে পারে।
* কৃমির ওষুধ নিয়মিত ও সময়মত না খাওয়ালে।
* ফাউল কলেরা, মাইকোপ্লাজমা, সালমোনেলা, ইত্যাদি জীবাণুর উপস্থিতি থাকলে ডিম উৎপাদন কমে যায়।
* মুরগী কোনো কারণে ভয় পেলে।
* হঠাৎ ঝড় বৃষ্টির কারণে মুরগী ভিজে গেলে।
* পরিবেশের তাপমাত্রা অত্যধিক ওঠানামা করলে।
* আফলাটক্সিকোসিস বা মাইকোটক্সিকোসিস হলে।
উপসংহার
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আমিষের  চাহিদা পূরণ, বেকারত্ব হ্রাস, ইত্যাদি কারণে পোল্ট্রি শিল্প বর্তমানে একটি দ্রুত বিকাশমান খাত। সফলভাবে পোল্ট্রি পালন করতে হলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, খামার ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়গুলি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা লাভ এবং তার প্রয়োগ, রোগ নিয়ন্ত্রণ অথবা চিকিৎসা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন অতীব প্রয়োজন। তবেই পোল্ট্রি পালনে আসবে সফলতা এবং ঘটবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।
সূত্র
১. বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালন ও খামার ব্যবস্থাপনা- প্রফেসর ড. মো. জালাল উদ্দিন সরদার।
২. হাঁস-মুরগির যতœ ও চিকিৎসা- এগ্রোভেট ডিভিশন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেড।
৩. হাঁস-মুরগি পালন ও চিকিৎসা- ডাঃ এইচ.কে.নিয়োগি।
৪. নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা।
৫. Poultry Science & Medicine- Professor Dr. Md. Abdus Samad.
ডাঃ মোঃ আকতার ফেরদৌস রানা
ডি.ভি.এম (আর,ইউ) এম.এস ইন ফার্মাকোলজি (বি.এ.ইউ)
ফেলো, ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি (জি.ও.বি)
ভেটেরিনারি প্রাকটিশনার
খানজাহান আলী, খুলনা।

সৌদি আরবের জন্মের ইতিহাস!



সৌদি আরবের জন্মের ইতিহাস আমরা কতজন জানি ? আজ আসুন একটু জেনে নেই সেই ইতিহাস ।
আবদুল্লাহ বিন সৌদ
সৌদি আরব হলো কোনো ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর একমাত্র মুসলিম দেশ। অন্য কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কোনো ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রিয়াদের নিকটস্থ দিরিয়া নামের একটি কৃষিবসতির প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ বিন সৌদ। এই উচ্চাভিলাষী মরুযোদ্ধা ১৭৪৪ সালে আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব [ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা]-এর সাথে মৈত্রী চুক্তি করে “দিরিয়া আমিরাত” গঠন করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে শিরক-বিদাত পালনের অভিযোগে এই দুজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। ওই “দিরিয়া আমিরাত”-ই বিশ্বের প্রথম সৌদি রাজ্য/আমিরাত। মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সৌদ-এর মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হয়।
এই আবদুল আজিজ তত্কালীন বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী মোড়ল ব্রিটেনের সাথে হাত মিলিয়ে তুরস্কের খলিফাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। শ্বশুর ইবনে ওয়াহাবের ধর্মীয় মতবাদকে ঢাল (নবীর মতই ধর্মের ঢাল) হিসেবে ব্যবহার করে তথাকথিত শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে ব্রিটিশদের সাথে তুর্কি খিলাফত ধ্বংসের কাজে লিপ্ত হয় আবদুল আজিজ। ১৭৯২ সালে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মৃত্যু হয়। ১৮০১/২ সালে আবদুল আজিজ তুর্কি খিলাফতের কাছ থেকে ইরাক দখল করে হজরত আলী (রা.) ও হজরত হুসেন (রা.)-এর মাজার শরিফ ভেঙে ফেলে। এর প্রেক্ষিতে ১৮০৩ সালে একজন শিয়া মুসলিম আজিজকে দিরিয়ায় আসরের নামাজরত অবস্থায় হত্যা করে।

এর পর আবদুল আজিজের ছেলে সৌদ বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতায় এসে তুর্কিদের পরাজিত করে ১৮০৩ সালে মক্কা ও ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করে নেয়। দুই পবিত্র নগরী দখল করে তারা ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়। তারা মক্কা-মদিনার বহু মুসলিমকে হত্যা করে। সবই করা হয় সেই শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে! ওয়াহাবী মতবাদের ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযানের অজুহাতে তারা বহু সাহাবীর কবরস্থান ধ্বংস করে। এমনকি খোদ মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কবরে ছায়াদানকারী মিম্বরগুলোও এরা ভেঙে ফেলে! মহানবী (সা.)-এর পবিত্র রওজাকে তুর্কি খলিফারা যেসব মণি-মুক্তায় সাজিয়েছিলেন, শুদ্ধি অভিযানের নামে সেসবও তুলে ফেলে সৌদ-এর বাহিনী। এসবই চলে ব্রিটিশদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা নিয়ে।
ইরাক-মক্কা-মদিনায় সৌদিদের এই ধ্বংসযজ্ঞে তত্কালীন তুর্কি খলিফাগণ ভীষণ রুষ্ট হন। ১৮০৮ সালে খলিফা ২য় মাহমুদ ক্ষমতাসীন হয়ে সৌদিদের দমনে শক্তিশালী সেনাদল পাঠান। ব্রিটিশ এবার আর সৌদিদের বাঁচাতে পারেনি। ১৮১৮ সালে সৌদের ছেলে, তত্কালীন সৌদি শাসক আবদুল্লাহ বিন সৌদ তুর্কিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আবদুল্লাহ বিন সৌদকে বন্দী করে ইস্তাম্বুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই পবিত্র নগরী ও বহু মসজিদ ধ্বংসের শাস্তি হিসেবে খলিফা ২য় মাহমুদ-এর নির্দেশে আবদুল্লাহ বিন সৌদ ও তার দুই ছেলেকে ইস্তাম্বুলে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ করা হয়।
খলিফা ২য় মাহমুদ
এভাবেই প্রথম সৌদি আমিরাত (১৭৪৪-১৮১৮)-এর পতন হয় ও পবিত্র মক্কা-মদিনাসহ আরবে উসমানিয়া খিলাফতের শাসনকর্তৃত্ব ফিরে আসে।
সৌদ পরিবারের দিরিয়ার আখড়া ১৮১৮ সালে ধ্বংস হয়ে গেলে প্রথম সৌদি আমিরাতের শেষ আমীর আবদুল্লাহর তুর্কি নামের এক পুত্র মরুভূমিতে পালিয়ে যায়। এই তুর্কি বিন আবদুল্লাহ পালিয়ে বনু তামিম গোত্রে আশ্রয় নেয়। পরে ১৮২১ সালে সে আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে এসে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
১৮২৪ সালে তুর্কি বিন আবদুল্লাহ উসমানিয়াদের নিয়োজিত মিশরীয়দের হটিয়ে দিরিয়া ও রিয়াদ দখল করে নেয়। রিয়াদকে রাজধানী করে গঠিত এই “নজদ আমিরাত”। যা ইতিহাসে দ্বিতীয় সৌদি রাজ্য নামে পরিচিত। দ্বিতীয় সৌদি রাজ্যটি অবশ্য খুব কম এলাকাই দখলে নিতে পেরেছিল। এটি বেশিদিন টিকেওনি। এই নজদ আমিরাতের প্রধানকে “ইমাম” বলা হত এবং ওয়াহাবী মতাবলম্বীরাই ধর্মীয় বিষয়ে কর্তৃত্বশীল ছিল।
তবে এবার সৌদ পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কথিত ইমাম তুর্কি বিন আবদুল্লাহকে তাঁর এক জ্ঞাতি ভাই মুশারি বিন আবদুর রহমান বিদ্রোহ করে ১৮৩৪ সালে হত্যা (বরাবরের মতই) করে। তবে ক্ষমতা পায়নি মুশারি। তুর্কির ছেলে ফয়সাল এরপর নজদ আমিরাতের ইমাম হয়।
সৌদ পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। অবশেষে ১৮৯১ সালে মুলায়দার যুদ্ধে উসমানিয়াদের অনুগত রাশিদী বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় সৌদি আমিরাতের পতন ঘটে। সৌদিদের শেষ ইমাম আবদুর রহমান বিন ফয়সাল তার সাঙ্গোপাঙ্গসহ পালিয়ে যায়।
আবদুর রহমান বিন ফয়সাল
বিশাল বালুকাময় রুব আল খালি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আবদুর রহমান তার পুত্র আবদুল আজিজকে নিয়ে দক্ষিণপূর্বে মুররা বেদুইন গোত্রে গিয়ে পালায়। সেখান থেকে তারা বাহরাইনের রাজপরিবারের কাছে গিয়ে কিছুদিন আশ্রয় নেয়। তার পর ১৮৯৩ সালে আবদুর রহমান ও তার পুত্র শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ মিত্র হিসাবে পরিচিত কুয়েতি আল-সাবাহ রাজপরিবারের আশ্রয় পায়।
কুয়েতি রাজপরিবারের সহায়তায় সৌদিরা উসমানিয়া খিলাফতের কর্তৃত্বাধীন নজদে একের পর এক চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে। ওয়াহাবী মতবাদের আলোকে পরিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে এসব হামলা চলতে থাকে। কিন্তু এসব হামলায় সৌদিরা তেমন কোনো বড় সাফল্য পায়নি। ১৯০১ সালে সারিফের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে আবদুর রহমান তার হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের সব উদ্যম হারায়।

১৮৯৯ সালের জানুয়ারিতে কুয়েতের আমির মুবারক আল সাবাহ ব্রিটেনের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে কুয়েতকে ব্রিটেনের করদরাজ্য (Protectorate)-এ পরিণত করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের প্রভাবের বিরুদ্ধেই কুয়েত এই চুক্তি করে ব্রিটেনের সাথে।
সৌদ পরিবারের লড়াইটিও ছিল উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধেই। তাই ১৯০১ সালে সারিফের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে পিতা আবদুর রহমান হতোদ্যম হলেও পুত্র আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ আবারও আশার আলো দেখে। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ১৯০১ সালের শেষের দিকে কুয়েতের আমির মুবারকের কাছে উসমানিয়াদের নিয়ন্ত্রিত রিয়াদ আক্রমণের জন্য সাহায্য চায়। ব্রিটিশ মদদপুষ্ট কুয়েত সানন্দে ইবনে সৌদকে ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহ করে।
আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ – বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ।
১৯০২ সালের ১৩ জানুয়ারি ইবনে সৌদ সৈন্যসহ রিয়াদের মাসমাক দুর্গ আক্রমণ করে। মাসমাকের উসমানিয়া অনুগত রাশিদী প্রশাসক ইবনে আজলানকে হত্যা করে সৌদিরা। ইবনে সৌদ যুদ্ধজয় শেষে ইবনে আজলানের ছিন্নমস্তকটি নিয়ে দুর্গশীর্ষে আসে এবং নিচে সমবেত উদ্বিগ্ন রিয়াদবাসীর দিকে ছুঁড়ে মারে।রক্তপাতের মাধ্যমে যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে রিয়াদ ছিনিয়ে নেওয়ার পর সৌদ পরিবারের অনেক কট্টরপন্থী প্রাক্তন সমর্থক ইবনে সৌদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সাথে যোগ দেয়। ইবনে সৌদ ক্যারিশমাটিক কট্টরপন্থী ছিলেন। তিনি বিভিন্না ডাকাত দলের মাধ্যমে ব্রিটিশদের দেওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে তার লোকদের তা সরবরাহ করেন। পরের দুই বছর তিনি ও তার বাহিনী নজদের প্রায় অর্ধেক রশিদিদের কাছ হেকে ছিনিয়ে নেয়, পরাজিত গোত্রগুলোর নারীদেরও গণিমতের মাল হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেয় সৌদ পরিবারের অধীনে থাকা কট্টরপন্থী গোত্রগুলো, শিশুদের জীবনে নেমে আসে মৃত্যু; রক্তে ভেসে যায় নজদ।

আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের রিয়াদ আমিরাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে তৃতীয় সৌদি রাজ্যের সূচনা হয়। এর পর সৌদিরা একে একে রাশিদীদের নজদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হটিয়ে দিতে থাকে। ১৯০৭ সালের মধ্যে সৌদিরা নজদের বিরাট এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশরা সামরিক অফিসার William Henry Irvine Shakespear-কে কুয়েতে নিয়োগ দিলে সৌদ পরিবার আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। শেক্সপিয়ারকে ইবনে সৌদ সামরিক উপদেষ্টা বানিয়ে নেয়।

১৯১৩ সালে সৌদিরা উসমানিয়া সৈন্যদের কাছ থেকে পূর্ব আরবের গুরুত্বপূর্ণ মরুদ্যান হাসা শহর দখল করে নেয়। এর পর পার্শ্ববর্তী কাতিফ শহরও সৌদিরা দখলে নেয়।
পরের বছর ১৯১৪ সালে বিশ্বজুড়ে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার মিত্রশক্তি জার্মানি-উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। রিয়াদে ব্রিটিশরা শেক্সপিয়ারের মাধ্যমে সৌদিদের সাথে উসমানিয়া অনুগত রাশিদীদের যুদ্ধ লাগায়।

১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত এই যুদ্ধে রাশিদীরা জয়ী হয় ও শেক্সপিয়ারকে হত্যা করে। রাশিদীরা শেক্সপিয়ারের শিরশ্ছেদ করে ও তার হেলমেট উসমানিয়াদের কাছে হস্তান্তর করে। উসমানিয়ারা সৌদিদের সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্কের প্রমাণস্বরূপ শেক্সপিয়ারের হেলমেট মদিনার প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দেখায়।

শেক্সপিয়ারকে হারিয়ে বিপর্যস্ত ইবনে সৌদ ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশদের সাথে দারিন চুক্তি স্বাক্ষর করে। ব্রিটিশদের পক্ষে ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য প্রধান মেজর জেনারেল স্যার পার্সি কক্স ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি মোতাবেক সৌদি রাজত্ব ব্রিটিশদের করদরাজ্য (Protectorate)-এ পরিণত হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জার্মান-উসমানিয়া খিলাফতের দুর্বল অবস্থা ও আল-সৌদ পরিবারের সাথে ব্রিটিশদের সখ্য দেখে চিন্তিত হয়ে ওঠেন মক্কার উসমানিয়া সমর্থিত শাসক হুসাইন বিন আলী।
হুসাইন বিন আলী
১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে হুসাইন মিশরের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি ম্যাকম্যাহনের গোপনে পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত এই পত্র আদান-প্রদান চলতে থাকে। উসমানিয়া খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিশাল আরব ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মতবিনিময় করে।
ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মদদে মক্কার শাসক সেই হুসাইন বিন আলী উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তৈরি করে। ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্সের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতক হুসাইন মিডল-ইস্টার্ন ফ্রন্টে উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে বহু উসমানিয়া সৈন্য বন্দী হয় ও অবশেষে উসমানিয়ারা ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়।

১৩০০ বছর পর মধ্যপ্রাচ্য মুসলিম খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে যায়।
পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশরা ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর হুসাইন বিন আলীর দ্বিতীয় ছেলে আব্দুল্লাহকে জর্ডানের রাজত্ব ও তৃতীয় ছেলে ফয়সালকে ইরাকের রাজত্ব দেয়। হুসাইনকে রাখা হয় হেজাজ (পবিত্র মক্কা-মদিনা ও তাবুক অঞ্চল)-এর শাসক হিসেবে।

এভাবে ১ম বিশ্বযুদ্ধ আল-সৌদ পরিবারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে। কেননা ব্রিটিশদের পা-চাটার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ হুসাইন পরিবার এগিয়ে যায় এবং যুদ্ধ শেষে হুসাইন ও তার দুই ছেলে মিলে তিন দেশের রাজত্ব পায়। তবে নজদ (রিয়াদ ও তদসংলগ্ন অঞ্চল)-এর শাসক সৌদিরাই থেকে যায়।
দারিন চুক্তির আওতায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ব্রিটিশদের কাছ থেকে বহু অস্ত্র ও মাসে ৫,০০০ পাউন্ড ভাতা পেতে থাকে।
যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের উদ্বৃত্ত বিপুল গোলাবারুদ দিয়ে দেয়। ওই ব্রিটিশ অস্ত্র ও গোলাবারুদের সম্ভার নিয়ে সৌদিরা ক্রমধ্বংসমান উসমানিয়া খিলাফতের অনুগত রাশিদীদের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিম আরব অঞ্চলে আক্রমণ শুরু করে। ১৯২০ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত লড়ে রাশিদীরা শেষ পর্যন্ত সৌদিদের হাতে পুরোপুরি পরাজিত হয়। ফলে আরবে আল-সৌদ পরিবার নিয়ন্ত্রিত ভূ-খণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। ইরাকে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত Percy Cox-এর মধ্যস্থতায় ১৯২২ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত Uqair Protocol-এর আওতায় ওই বিশাল অঞ্চলে সৌদি রাজত্ব স্বীকৃতি লাভ করে।
এ-সময় পর্যন্ত আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কখনোই ব্রিটিশ অনুগত হেজাজের শাসক হুসাইনের সাথে সংঘাতে জড়ায়নি।

১৯২৪ সালের ৩ মার্চ কামাল পাশা তুরস্কে অফিসিয়ালি খিলাফত বিলুপ্ত করে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের সাথে মক্কার হুসাইন বিন আলীও নবীর আমল থেকে ১৩০০ বছর পর্যন্ত চলমান মুসলিমদের রাষ্ট্র খিলাফতের পতনে ব্যথিত হন। পৃথিবী থেকে খিলাফত মুছে গেছে, এটা হুসাইনের চেতনায় আঘাত করে। ব্রিটিশদের ক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও ৫ মার্চ হুসাইন নিজেকে মুসলিমদের খলিফা ঘোষণা করেন।
ব্যস, এ-সুযোগটিই কাজে লাগায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। ব্রিটিশরা স্বাভাবিকভাবেই হুসাইনের নিজেকে খলিফা ঘোষণা করা মেনে নেয়নি এবং হেজাজের শাসক হিসেবে হুসাইনের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কালবিলম্ব না করে হেজাজ আক্রমণ করে এবং ১৯২৫ সালের শেষ নাগাদ পুরো হেজাজ দখলে নিয়ে নেয়। ১৯২৬ সালের ৮ জানুয়ারি আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ মক্কা-মদিনা-জেদ্দার গোত্রীয় নেতাদের সমর্থনে নিজেকে হেজাজের “সুলতান” ঘোষণা করে। ১৯২৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ইবনে সৌদ আগের নজদ ও বর্তমান হেজাজ মিলিয়ে Kingdom of Nejd and Hejaz ঘোষণা করে। ৪ মাস পর সেই বছরের ২৭ মে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা Kingdom of Nejd and Hejaz-কে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

নতুন জেদ্দা চুক্তি, ১৯২৭-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ-সৌদের “Protectorate” স্ট্যাটাসের দারিন চুক্তি, ১৯১৫-এর সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তী ৫ বছর আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে আলাদা রেখেই শাসন করে। অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে একত্রিত করে তার নিজের ও বংশের পদবি অনুসারে দেশের নাম “Kingdom of Saudi Arabia” (আরবি: المملكة العربية السعودية al-Mamlakah al-‘Arabiyyah as-Su‘ūdiyyah) ঘোষণা করে।

মোট কথা সেই ১৪০০ বছর আগের সেই রক্তের বদলে রক্ত নিয়ে ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ভোগবাদী তত্ত্বের প্রচার ও প্রসার চলছেই , আর তাতে বেকুবের মত প্রান দিচ্ছে সাধারন মানুষ । অথচ এদের মূল অস্ত্রই সাধারন মানুষের অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস ।

আঁধারের রঙ লাল!

আঁধারের রঙ লাল!

অন্ধকারের রঙ কী? কালো? আমিও তাই জানতাম। অন্ধকার মানে আলোর অনুপস্থিতি, অন্ধকার মানে নিকষ কালো। কিন্তু ইদানীং আমার মনে হচ্ছে আমরা ভুল জানতাম, অথবা আমাদের এ অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে কথাটা ভুল। এখানে আঁধারের রঙ কালো নয়, এখানে আঁধারের রঙ লাল। গাড় টকটকে লাল। এখানে আঁধার কোন বিমূর্ত ধারণা নয়,এখানে আঁধার লাল রঙের তরল পদার্থ। এ অঞ্চলটিতে আলো খুব কমই এসেছে,তবে এত আধার আসেনি আগে। এ অঞ্চলে এর আগেও এসেছে কালো অন্ধকার, কিন্তু লাল রঙের অন্ধকারের সাথে এত ঘনিষ্ট সম্পর্ক আগে কখনও সৃষ্টি হয়নি। প্রথমে লাল রঙের আঁধারকে ভেবেছিলাম আলো। ভেবেছিলাম এই লাল,কালো অন্ধকারকে ধুয়ে মুছে আলোকিত করবে পূর্বদিগন্তে নতুন সূর্যের মত। কিন্তু না, আমরা এখন বুঝতে পারছি এখানে অন্ধকারের রঙই হল লাল। দেশের সব থেকে আধুনিক, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষগুলোর রক্তের মত লাল।

মগজ পঁচে গেলে শরীর ঠিক থাকবে- এমনটা ভাবা বাতুলতা। মগজ পঁচে গেছে, অথবা পঁচিয়ে ফেলা হচ্ছে। তাই দেশ নামের সমগ্র শরীরটিতেই দেখা যাচ্ছে নানা রকম দুরারোগ্য ব্যধির উপসর্গ। অসুস্থ মানুষের অসুস্থ অনুভূতি প্রবল হয়। এখানেও হয়েছে। এখানেও সকলের একটি অনুভূতি অত্যন্ত প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রধাণমন্ত্রি থেকে রাস্তার ভিক্ষুক সকলেরই এই অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র এখন। অনুভূতিটির নাম ‘ধর্মানুভূতি’। অন্য সকল অনুভূতির থেকে এই অনুভূতিই এখন প্রবল, অল্প স্পর্শতে কিংবা স্পর্শ না পেলেও হঠাৎই কাতর হয়ে ওঠে এই অনুভূতি। প্রধানমন্ত্রী আঘাত প্রাপ্ত হন, আমলা আঘাত প্রাপ্ত হন, রিকশাওয়ালা আঘাত প্রাপ্ত হন, গুলিস্তান মোড়ের লুলা ভিক্ষুক আঘাতপ্রাপ্ত হন , এমনকি এই অনুভূতির আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় ধর্ষক, খুনী এবং স্বয়ং ইবলিস শয়তান। বিচিত্র অনুভূতি আঘাত প্রাপ্ত হয় অতি সহজেই। স্পর্শ করলেই এ কাতর হয়, অনেক সময় হয় স্পর্শ না করলেও।

এদেশের প্রতিটি মানুষ অত্যন্ত ধার্মিক। এদেশের ধার্মিকরা শৌচকর্ম থেকে শুরু করে যৌনকর্ম, ভাত খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুষ খাওয়া- প্রতিটি কাজের আগে ও পরেই ব্যাপক ধর্মকর্ম করে। বিসমিল্লা,ইনশাল্লা,আলহামদুলিল্লাতে মুখরিত করে প্রতিটি দিনের প্রতিটি কার্যক্রম। এরা প্রচুর নামায পড়ে,মসজিদে যায়গা হয়না,তাই রাস্তা বন্ধ করে নামায পড়ে। ধর্ম পালন করলে যদি ‘রহমত’ বর্ষিত হত তাহলে এদেশ এখন হত জান্নাতুল ফেরদৌস। কিন্তু এদেশ এখন পরিণত হয়েছে হাবিয়া দোযখে। মুসলমানদের পৌরাণিক কাহিনী কুরানে যে ইবলিসের কথা বলা হয়েছে সেও ছিল অত্যাধিক সৎ, এদেশের ধার্মিকদের থেকে। বিচিত্র এই ধর্ম ও সেই অনুভূতিকে রক্ষা করতে হয় ভয়াবহ সব ‘অপশক্তি’র থেকে। ভয়াবহ সেই অপশক্তি গুলো হল- ব্লগ,ফেসবুক,প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা,লেখালেখি কিংবা সেতার। এই ভয়াবহ অপশক্তির চর্চাকারীদের তাই থামিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর অত্যাধিক ধার্মিকরা। অত্যাধিক ধার্মিকদের থেকে ‘একটু কম ধার্মিক’রা নিজেরা সেই কাজটি করতে না পারলেও অত্যন্ত খুশি হয় অত্যাধিকদের এই কর্মকান্ডে। অরগাজমের থেকেও বেশি সুখের সেই অনুভূতি।

এদেশে এত অন্ধকার আগে কখনও এসেছিল কি? এত বোরখা বেড়েছে চারদিকে,তার সাথে বেড়েছে ধর্ষন। এত ‘ধর্মপ্রাণ মুসল্লি’ বেড়েছে মসজিদগুলোতে,সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতি। এত ধার্মিক সৃষ্টি হয়েছে এখানে,সেই সাথে সৃষ্টি হয়েছে অজ্ঞতা-কুসংস্কার। নিকৃষ্টদের রাজত্বে উৎকৃষ্টরা প্রাণ হারানোর আশংকায় দিন যাপন করছেন,রাত অতিবাহিত করছেন। মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন মানুষ গুলো। একরাশ উৎকন্ঠা আর ভয় নিয়ে বেঁচে আছে তাদের প্রিয় মানুষ আর পরিবারের সদস্যরা। আর আমাদের নির্বোধ মন্ত্রীরা করে চলেছেন অপলাপ। বলছেন তারা কিভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছেন। গলা এবং মাথায় চাপাতির কোপের থেকেও ভয়াবহ সেই আঘাত। নির্বোধ জনগণের মন্ত্রীরাও যে নির্বোধ হবেন এই স্বাভাবিক। নিকৃষ্ট জনগণের নেতাও হবেন নিকৃষ্ট। নিকৃষ্ট না হলে টিকে থাকতে পারবেন না তিনি নেতা হিসেবে।তাই নেতা হওয়ার স্বার্থে, টিকে থাকার স্বার্থেই তাঁকে হতে হবে নিকৃষ্টতম।

আবুল মনসুর আহমেদ নামে আওয়ামিলীগের একজন স্বনামধন্য নেতা ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ২১ দফার রচয়িতা ছিলেন তিনি,পরে হয়েছিলেন মন্ত্রী। আওয়ামিলীগের এই নেতা ছিলেন ‘পর্ন লেখক’। গল্পের ছলে পর্ন লিখতেন তিনি। হুযুরে কেবলা, ধর্মরাজ্য, নায়েবে নবী, লীডরে কওম, আহলে সুন্নত সহ আরও অসংখ্য গল্পে তিনি পর্ন লিখেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়তো নিজ দলের একসময়ের এই ডাকসাইটে নেতার পর্ন লেখকের লেখার সাথে পরিচিত নন। তাই তিনি একালের পর্ন লেখকদের অভিসম্পাত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই আরও অনেক প্রতিষ্ঠিত পর্ন লেখকদের সুনাম করেন,হয়তো তিনি পরিচিত নন তাদের লেখার সাথে। যেমন বেগম রোকেয়া,কাজী নজরুল ইসলাম,লালন। বিরোধীদলে থাকাকালীন সময়ে দেশের বিখ্যাত পর্ন লেখক হুমায়ুন আজাদকে দেখতে পায়ে হেটে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। জানলে হয়তো যেতেন না। অথবা হয়তো প্রধানমন্ত্রী হলেই নির্বোধদের সাথে গলা মিলিয়ে নির্বোধের মত কথা বলতে হয়।

আচ্ছা আপনাদের মধ্যে কেউ কি এখনও স্বপ্ন দেখেন? কেউ কি জানেন উত্তরণের উপায়? কতটুকু পতন হলে বলা যাবে এটাই পতনের শেষ সীমা? দেশ পাকিস্তান,আফগানিস্তান বা সিরিয়া হলে? আমাদের যাত্রা যে সেদিকেই। বাকি সব কিছু অর্থহীন। আমরা এখন বন্ধ্যা হয়ে গেছি। আমাদের মস্তিষ্ক বন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমরা এখন কিছু লিখিনা,লিখলেও সেগুলো একরাশ হতাশার উপাখ্যান ছাড়া আর কিছু হয়না। কার জন্য লিখব? কাদের জন্য লিখব? প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় আর মানসিক যন্ত্রণা আমাদের আষ্ট্র-পৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। জ্ঞান বিজ্ঞান আর মানবিকতার আলো এভাবেই নিভে যাচ্ছে। অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের কিংবা নিয়েছে ইতিমধ্যেই। এই অন্ধকারের রঙ লাল। গাড় টকটকে লাল। এবং আমাদেরই রক্তে ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে এই লাল অন্ধকার।
এখানে আঁধারের রঙ লাল
এখানে স্বপ্নের রঙ কালো,
এখন উন্মাদের রক্তকেলির কাল-
এখানে চাপাতির কোপে রক্তাক্ত জ্ঞানের আলো।

শফি হুজুরের “তেঁতুল তত্ত্বের” বৈজ্ঞানিক প্রমান এবং উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীর প্রতারনার স্বরূপ।

শফি হুজুরের “তেঁতুল তত্ত্বের” বৈজ্ঞানিক প্রমান এবং উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীর প্রতারনার স্বরূপ।

ভুমিকা
“ইসলামিক বিজ্ঞান” বিষয়ে আমরা অনেকেই জানি। পবিত্র কুরআন শরিফের পাতায় পাতায় বিজ্ঞানের কথাই লেখা আছে এমন অনেক মতামত আমরা পাই ইসলামী স্কলারদের কাছ থেকে। বাংলা ভাষাতেও আমরা ইসলাম ও বিজ্ঞান বিষয়ক এই ধরনের নানান মতামত জানতে পারি বাংলাদেশের ইসলামী স্কলারদের বক্তৃতায়, ওয়াজ মাহফিল থেকে। আগ্রহ উদ্দীপক হচ্ছে এই ধরনের বয়ানের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমান হিসাবে হাজির করা হয়ে থাকে আমেরিকার বিজ্ঞানের গবেষনাকর্ম কে। আমেরিকায় যেহেতু অগ্রসর গবেষনাগুলো হয়ে থাকে, তাই ইসলামী বয়ানের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে আমেরিকার বিভিন্ন গবেষনার উল্লেখ করাটা ইসলামী স্কলারদের একটি প্রিয় কাজ। এরকমের একটি বক্তৃতা দিয়ে এই লেখাটি শুরু করতে চাই।
বাংলাদেশের একজন ইসলামী স্কলার, একটি ইসলামী ওয়াজ মাহফিলে ব্যাখ্যা করছেন, মুসলমানদের পায়ের গোড়ালির উপরে প্যানট পরার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। এই ইসলামী স্কলার ব্যাখ্যা করছেন যে, আমেরিকায় গবেষণা করে পাওয়া গেছে যে, পুরুষের যৌবনের হরমোন হচ্ছে – টেস্টেসটেরোন, আর এই টেস্টেসটেরোন বিপুল পরিমানে জমা থাকে পুরুষের পায়ের গোড়ালীতে। পুরুষ যদি কোনও কাপড় দিয়ে পায়ের গোড়ালী ঢেকে রাখে, তাহলে সেই টেস্টেসটেরোন গুলো নস্ট হয়ে যায়। সে জন্যেই ইসলামের কঠিন নির্দেশ আছে টাকনুর বা গোড়ালীর উপরে প্যান্ট পরার জন্যে। যেহেতু আমেরিকায় গবেষনা করে পাওয়া গেছে, তাই আমেরিকানরা এখন সবাই টাকনুর উপরেই প্যান্ট পরে থাকেন। এমন কি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন বাংলাদেশ ভ্রমন করেছিলেন, তখন তিনিও টাকনুর উপরে প্যান্ট পরেছিলেন।আমার বর্ণনা অবিশ্বাস্য মনে হলে, এখানে ভিডিওটি দেখা যেতে পারে। ভিডিও টি দেখুন এখানে

মানুষের শরীরের হোরমোন সম্পর্কে যদি ন্যূনতম ধারনা থাকে, তাহলে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে এই ইসলামী স্কলার আসলে তাঁর সামনে বসে থাকা মানুষ গুলোর অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা প্রচার করছেন। তিনি তাঁর মস্তিস্ক প্রসুত অবৈজ্ঞানিক ভাবনাগুলো শুধুমাত্র ইসলামের মাহাত্ম প্রচারের জন্যে প্রচার করছেন। এটা অপবিজ্ঞানও নয়, এটা এক ধরনের মিথ্যাচার এবং এই মিথ্যাচার তিনি প্রচার করছেন ধর্মের মহিমা প্রতিষ্ঠা করতে। এখন আপাত ভাবে এটা মনে হতে পারে, আসলে এই বক্তৃতাটি এই ইসলামী স্কলার এর অজ্ঞানতার ফসল, তিনি হয়তো নিজেও তা জানেন না। হয়তো তারই মতন কোনও একজন তাকে এই স্টোরী বা গল্পটি বলেছেন এবং তিনিও কোনও রকমের যাচাই – খোজ খবর না করেই আরো হাজার মানুষের মাঝে এটা প্রচার করছেন। এটা কি প্রতারণা? এটা কি মানুষের সরল বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা নয়? এই ধরনের মিথ্যা গল্প ফেঁদে এইভাবে ইসলামের মাহাত্ম প্রচার কি আসলে ইসলাম কে বড় করে? নাকি ইসলাম যে কেবল অশিক্ষিত ও নির্বোধদের মাঝে টিকে আছে সেই কথাই প্রমান করে?

উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীর বিজ্ঞান প্রচার
এটাতো গেলো একজন আপাত স্বল্প শিক্ষিত ইসলামী উলামার মিথ্যাচারের কথা। আসুন এবারে দেখি একজন অতি উচ্চ শিক্ষিত ইসলাম প্রচারক এর কথা। যিনি বহুদিন ধরে বাংলা অনলাইন মাধ্যমে ইসলামের মহিমা প্রচার করছেন। রাজা রামমোহন রায়কে ব্যবহার করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মহিমা প্রচার করছেন। বাংলা ভাষায় নাস্তিক ও মুক্তমনাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন যুদ্ধ করে চলেছেন, সেই রকমের একজন মানুষের একটি উদাহরণ দেখা যাক। নিচের ছবিটি দেখুন –
pinaki_shofi
দেখুন এই মানুষটি প্রথমে একটি বয়ান হাজির করেছেন কোটেশন চিহ্নের ব্যবহার করে, এবং তারপরে দাবী করছেন যে এই বয়ানটি শফি হুজুরের নয় বরং এই বয়ানটি আমেরিকার একটি গবেষনার ফলাফল। এই লেখার শুরুতে উল্লেখিত ইসলামী উলামা সাহেবের চাইতে আমাদের এই উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালী আরেক কাঠি সরেস, তাই তিনি আমেরিকার জার্নাল খানার নামও উল্লেখ করে দিচ্ছেন। অর্থাৎ সুন্দরী নারীর সাথে সামান্য বাতচিতে পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ বেড়ে যায় এই ফলাফলটি আমেরিকার জার্নাল “ইভলিউশন এন্ড হিউম্যান বিহেভিয়ার” এ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে বয়ানটি হাজির করছেন, তারপরে বলছেন যে এটা আমেরিকার একটি গবেষনায় পাওয়া গেছে এমন কি গবেষনাটি কোন জার্নালে ছাপা হয়েছে সেটাও বলে দিচ্ছেন। সুতরাং একথা অবিশ্বাস করার কি কোনও কারণ আছে যে আসলেই – “সুন্দরী মহিলাদের সাথে সামান্য বাতচিতেই পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ বেড়ে যায়”? অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই, তাঁর প্রমান হচ্ছে, ছবিটি ভালোকরে দেখুন কতজন মানুষ এই বয়ানটিকে পছন্দ করেছেন আর কতজন মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা শেয়ার করে আরো হাজার হাজার মানুষ কে তা জানিয়ে দিয়েছেন। এই বয়ানটি যারা পছন্দ করেছেন তাঁদের মাঝে বহু নারী আছেন, পুরুষ আছেন, ডাকসাইটে বামপন্থী নেতা আছেন, করপোরেট কর্মকর্তা আছে এমন কি ডাক্তারও আছেন। তাহলে এই বয়ানটিকে কি অবিশ্বাস করার সুযোগ আছে? তবুও বহু অবিশ্বাসী মানুষ চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। এই সকল অবিশ্বাসী মানুষেরা এই ধরনের বয়ান কে আরেকটু বাজিয়ে দেখে নিতে চায়। তাই মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল ইয়াসিন নামের একজন সরাসরি জার্নালখানার লিংকটি চেয়ে বসেন। কিন্তু বয়ান উপস্থাপনকারী ভদ্রলোক (?) মানে আমাদের ভট্টাচার্য মহাশয়ও কম যান না, তিনি কি এতো সহজে ভড়কে যাবার মানুষ? তিনি খুব ভালো করেই জানেন, বাঙ্গালীর দৌড় ওই লিংক চাওয়া পর্যন্তই … কোনও বাঙ্গালীর এতো সময় নেই যে লিংকের ভেতরে কি আছে তা একটু পরিশ্রম করে দেখে নেয়ার। তাই জনাব ভট্টাচার্য, নিঃসংকোচে অত্যন্ত স্মার্ট ভঙ্গিতে জার্নাল আর্টিকেলটির লিঙ্ক দিয়ে দেন। ব্যস এর পরে কি আর তাঁকে সন্দেহ করার কোনও কারণ আছে? এই দেখুন, তিনি কত স্মার্ট ভাবে লিংকটি দিচ্ছেন।
shofi_PinakI2
ব্যস খেল খতম। যারা এতদিন শফি হুজুর কে গালিগালাজ করেছেন তাঁরা যে কত নির্বোধ, কত খারাপ মানুষ তা প্রমান হয়ে গেলো, হলোনা? শফি হুজুর বলেছিলেন মেয়েরা হচ্ছে তেতুলের মতন, তাঁদের কে দেখলে পুরুষের মুখ থেকে লালা ঝরে, আর আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও বলছেন একই কথা। হলোতো?

মন্দ অবিশ্বাসী মন আমার
কিন্তু অবিশ্বাসী মন আমার। তাই লিংকটিতে ক্লিক করে আরটিকেল টি ডাউনলোড করলাম। দুইবার পড়লাম। আরেকজন ডাক্তার নিউরোলজিস্ট বন্ধুকে দিয়ে ‘ পড়ালাম। একই গবেষকের আরো দুইটি একই রকমের গবেষনা আরটিকেল পড়লাম। তারপর ভাবতে বস্লাম, আসলেই কি এই আরটিকেলটিতে জনাব ভট্টাচার্য মহাষয়ের উল্লেখ করা এই ধরনের কোনও কথা লেখা আছে? আরটিকেলটির লিঙ্ক নিচে দিয়ে দিলাম, আর্টিকেলটি বিনা পয়সায় ডাউনলোড করা যায়। দেখুন তো এই আর্টিকেলটিতে আসলেই কি এই ভট্টাচার্য মহাশয়ের লেখা এই ধরনের কোনও কথা পাওয়া যায় কিনা? ব্যক্তিগত ভাবে একজন চিকিৎসক হিসাবে বলছি, এই আরটিকেলটির শিরোনাম থেকে শুরু করে শেষ বাক্য পর্যন্ত কোথাও এমন কোনও কথা নেই। আমি আবার লিখছি, এই আর্টিকেলটির শিরোনাম থেকে শুরু করে শেষ বাক্য পর্যন্ত কোথাও পুরুষের লালা নিঃসরণ সংক্রান্ত একটি বাক্যও নেই। কোটেশন চিহ্নের ভেতরে যে বাক্যটি এই ভট্টাচার্য মহাশয় আমেরিকার গবেষণা বলে দাবী করেছেন, তা যদি এই আরটিকেল থেকে কেউ বের করে দিতে পারেন, তাহলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে দুই কান মলে, বিনীত ভাবে ক্ষমা চেয়ে এই লেখাটি প্রত্যাহার করে নেবো। বাক্যটি তো দুরের কথা, এই আরটিকেলটিতে “পুরুষের লালা নিঃসরণ” সংক্রান্ত কোনও আলোচন, একটি বাক্যও যদি কেউ বের করে দিতে পারেন, তাহলেও আমি একই কাজ করবো, অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা পূর্বক এই লেখাটি প্রত্যাহার করে নেবো এবং স্বীকার করে নেবো যে হ্যাঁ আসলেই – “সুন্দরী মহিলার সাথে সামান্য বাতচিতেই পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ বেড়ে যায়। প্রফেসর জেমস রনির রিসার্চ ইন্টারেস্ট হচ্ছে নারীর সাথে পুরুষের সামাজিক সম্পরক ও তাঁর ফলে তাঁর আচরনের ও হরমোনের পরিবরতন বিষয়ে, এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত এই আর্টিকেলটির পরেও তাঁর আরো একাধিক আরটিকেল প্রকাশিত হয়েছে একই বিষয়ে। যেখানে পুরুষের মুখের লালা নয়, পুরুষের হরমোন টেস্টেস্টেরোন হচ্ছে মুল রিসার্চ কোয়েসচেন বা মুল প্রসঙ্গ। তাহলে কি পুরুষের মুখের লালা আর টেস্টেস্টেরোন একই বস্তু? নাকি পুরুষের টেস্টেস্টেরন তৈরী হয় পুরুষের মুখের লালায়? দেখুন টেস্টেস্টেরোন নিয়ে একজন ইসলামী উলামা এবং আমাদের উচ্চ শিক্ষিত ভট্টাচার্য মহাশয়ের চিন্তার কি দারুন মিল। একজন টেস্টেস্টেরন দিয়ে ইসলামের টাকনুর বা গোড়ালির উপরে প্যান্ট পরাকে ব্যাখ্যা করছেন, আরেকজন টেস্টেস্টেরোন কে পুরুষের মুখের লালা বানিয়ে শফি হুজুরের মুখের বয়ান কে জায়েজ করছেন। একজন বলছেন পুরুষের টেস্টেস্টেরোন থাকে গোড়ালীতে আর আরেকজন বলছেন পুরুষের টেস্টেস্টেরোন আর মুখের লালা আসলে একই বস্তু যা সুন্দরী নারীর সাথে বাতচিত করলে বেড়ে যায়। আর্টিকেলটির এবস্ট্র্যাক্ট এর স্ক্রিনশট টি দিয়ে দিলাম এবং অধিক আগ্রহীদের জন্যে লিংকটি জুড়ে দিচ্ছি এখানেঃ যারা আগ্রহী এবং যাদের হাতে সময় কম তাঁরা এবস্ট্র্যাক্ট টা পড়ে দেখতে পারেন।আরটিকেল টি পড়ার জন্যে এখানে ক্লিক করুন
Roney_article_screenshot
আরটিকেলটির লিঙ্ক এখানে দিয়ে দিলাম, আর্টিকেলটি বিনা পয়সায় ডাউনলোড করা যায়। দেখুন তো এই আর্টিকেলটিতে আসলেই এই ভট্টাচার্য মহাশয়ের লেখা এই ধরনের কোনও কথা পাওয়া যায় কিনা? ব্যক্তিগত ভাবে একজন চিকিৎসক হিসাবে বলছি, এই আরটিকেলটির শিরোনাম থেকে শুরু করে শেষ বাক্য পর্যন্ত কোথাও এমন কোনও কথা নেই। আমি আবার লিখছি, এই আর্টিকেলটির শিরোনাম থেকে শুরু করে শেষ বাক্য পর্যন্ত কোথাও পুরুষের লালা নিঃসরণ সংক্রান্ত একটি বাক্যও নেই। কোটেশন চিহ্নের ভেতরে যে বাক্যটি এই ভট্টাচার্য মহাশয় আমেরিকার গবেষণা বলে দাবী করেছেন, তা যদি এই আরটিকেল থেকে কেউ বের করে দিতে পারেন, তাহলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে দুই কান মলে, বিনীত ভাবে ক্ষমা চেয়ে এই লেখাটি প্রত্যাহার করে নেবো। বাক্যটি তো দুরের কথা, এই আরটিকেলটিতে “পুরুষের লালা নিঃসরণ” সংক্রান্ত কোনও আলোচনা, একটি বাক্যও যদি কেউ বের করে দিতে পারেন, তাহলেও আমি একই কাজ করবো, অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা পূর্বক এই লেখাটি প্রত্যাহার করে নেবো এবং স্বীকার করে নেবো যে হ্যাঁ আসলেই – “সুন্দরী মহিলার সাথে সামান্য বাতচিতেই পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ বেড়ে যায়।
একটু টেকনিক্যাল হয়ে যাবে, তবুও উল্লেখ করছি, এই গবেষনার প্রধান অধ্যাপক জেমস রনি কিভাবে তাঁর গবেষনার উদ্দেশ্য ও ফলাফল কে ব্যাখ্যা করেছেন।
” This study was designed to assess possible hormonal and behavioral reactions of heterosexual men to cues from potential mates n an ecologically realistic situation”.
এবস্ট্র্যাকট এ এভাবে লেখা হয়েছে – “this study tested for behavioral and hormonal reactions of young men to brief social encounters with potential mating partners”. বলুন ত এখানে সুন্দরী মহিলার কথা কথায় আছে আর পুরুষের লালা ঝরার কথাই বা কোথায় আছে? শুধু এখানে নয়,পুরো আরটিকেল এর কোথাও নেই।
মুল আরটিকেলের আলোচনায় ফলাফল কে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে –
“Results were generally consistent with the possibility of a mating response in human males. Men in the female condition showed a significant increase in Testerone over baseline levels and were rated as having expressed more polite interest and display behaviors than were men in the male condition.”


বলুন তো এখানে কোথায় পুরুষের লালা নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ার কথা লেখা হয়েছে? তাহলে কি টেস্টেস্টেরোন পুরুষের লালা? এখানে তো নয়ই, পুরো গবেষনার কোথাও পুরুষের লালা নিঃসরণ নিয়ে কোনও কথা নেই, আলোচনা নেই। সমগ্র গবেষনায় লালার প্রসঙ্গ টি এসেছে কারন টেস্টেস্টেরোন পরীক্ষা করার জন্যে যে স্যাম্পল নেয়া হয়েছে, সেটা নেয়া হয়েছে মুখের লালা থেকে। এই বিশয়টা চিকিতসক এবং মেডিক্যাল টেকনিশিয়ানরা বুঝবেন ভালো, সাধারন পাঠকের হয়তো বুঝতে একটু কস্ট হবে, তবুও বলছি – ইদানিং রক্তের অনেক পরীক্ষাই মুখের লালা থেকে নেয়া হয়, কারন রক্তের পরীক্ষা করতে হলে শরীর ফুটো করে রক্ত নিতে হয়, সেই তুলোনায় মুখের লালা থেকে স্যাম্পল নেয়াটা অনে সহজ, মেডিক্যাল পরিভাষায় যাকে বলা হয় “নন-ইনভেসিভ” বা সহজ বাংলায় কম বেদনাদায়ক। যেহেতু সাধারন পাঠকেরা লালার স্যাম্পল থেকে টেস্টেস্টেরোন এর পরীক্ষার বিষয়টি বুঝবেন না, সেই কারনেই জনাব ভট্টাচার্য মহাশয়, পাঠকের তথ্যের অসমতার পুরো সুযোগ টি নিয়েছেন। “Salivary TesTerone” কে বানিয়ে দিয়েছেন “Salivary Secretion”। একেই বলে সৃজনশীল প্রতারনা।

কিন্তু কেনও উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালী এমনটা করে থাকে?

যে বৈজ্ঞানিক আরটিকেলটির মধ্যে পুরুষের লালা নিঃসরণ নিয়ে একটি বাক্যও নেই, এমন কি যে গবেষনায় “পুরুষের লালা নিঃসরণ” সংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন বা রিসার্চ কোয়েশ্চেন ও ছিলোনা, সেই রকমের একটি গবেষনা আরটিকেল কে উল্লেখ করে এই রকমের মিথ্যাচার করাটা হয়তোবা একজন স্বল্পশিক্ষিত সুবিধাবঞ্চিত ইসলামী উলামার পক্ষে মানায়, কিন্তু আধুনিকতার সকল সুবিধা প্রাপ্ত, উচ্চ শিক্ষিত, চিকিতসা বিজ্ঞান পাঠ করা মানুষ কেনও এই রকমটা করে থাকেন? হিউম্যান বিহেভিয়ার ও হিউম্যান সাইকোলজির জন্যে এটা একটা ভালো গবেষনা প্রশ্ন হতে পারে। তবে আমাদের আলোচিত উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীটি যেহেতু বহুদিন ধরে হেফাজতে ইসলামের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করে আসছেন, তাই হয়ত হেফাজতের প্রতি দার্শনিক আনুগত্য একটা বড় কারণ হতে পারে এই রকমের মিথ্যাচার করার পেছনে। প্রশ্ন হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে এই রকমের ডাহা মিথ্যাচার করাটা কতটা সততার পরিচায়ক? পাঠকের কাছে প্রশ্ন থাকলো। আরেকটি কারণ রয়েছে, হেফাজতের আমির আহমদ শফি বাংলাদেশের নাস্তিক মুক্তচিন্তার মানুষদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন, আমাদের আলোচিত উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীটিও বাংলাদেশের নাস্তিক ও মুক্তচিন্তার মানুষদের প্রতি যুদ্ধ করে চলেছেন প্রতিদিন। যেহেতু আহমদ শফির তেঁতুল তত্ত্বের বিরোধিতাকারীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে বাংলাদেশের নাস্তিক – মুক্তমনা প্রজন্ম, তাই তাঁদের কে পাবলিকলি হেনস্থা করার এই সুযোগটি তিনি ছাড়তে চান নি, কারণ তিনি নিশ্চিত করেই জানেন, বাঙ্গালী লিংক চায় বটে, কিন্তু কোনদিনও লিংক চেক করে দেখেনা তাঁর ভেতরে কি আছে। সুতরাং এই দিয়ে যদি নাস্তিক – মুক্তমনাদের খানিকটা বাঁশ দেয়া যায়, ক্ষতি কি?
আরেকটি কারণ রয়েছে, হেফাজতের আমির আহমদ শফি বাংলাদেশের নাস্তিক মুক্তচিন্তার মানুষদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন, আমাদের আলোচিত উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীটিও বাংলাদেশের নাস্তিক ও মুক্তচিন্তার মানুষদের প্রতি যুদ্ধ করে চলেছেন প্রতিদিন। যেহেতু আহ্মদ শফির তেঁতুল তত্ত্বের বিরোধিতাকারীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে বাংলাদেশের নাস্তিক – মুক্তমনা প্রজন্ম, তাই তাঁদের কে পাব্লিকলি হেনস্থা করার এই সুযোগটি তিনি ছাড়তে চান নি, কারণ তিনি নিশ্চিত করেই জানেন, বাঙ্গালী লিংক চায় বটে, কিন্তু কোনদিনও লিংক চেক করে দেখেনা তাঁর ভেতরে কি আছে। সুতরাং এই দিয়ে যদি নাস্তিক – মুক্তমনাদের খানিকটা বাঁশ দেয়া যায়, ক্ষতি কি?
সবশেষ কারণ টি হচ্ছে, এই উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীটি হচ্ছেন একজন ট্যাবলয়েড মস্তিস্কের মানুষ। ট্যাবলয়েড মস্তিস্কের মানুষেরা কখনই বিশয়ের গভীরে প্রবেশ করেন না। তাঁরা ট্যাবলয়েড এর শিরোনাম এবং ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেন। অধ্যাপক জেমস রনির এই গবেষণার ফলাফলটিকে দেখুন ইংল্যান্ডের দুইটি পত্রিকা কিভাবে প্রকাশ করেছে। প্রথমে দেখুন ইংল্যান্ডের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা কি শিরোনাম দিয়েছে এবং কিভাবে খবরটিকে প্রকাশ করেছেঃ সংবাদ টি পড়ার জন্যে এখানে ক্লিক করুন
Telegraph_screen_shot
Daily mail
আমাদের আলোচিত উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীটি এমন কি এই ট্যাবলয়েড এর সংবাদটিও ভেতরের অংশটুকু পড়েন নি, পড়লে তিনি বুঝতে পারতেন গবেষনাটি আসলে ছিলো টেস্টেস্টেরন এর ঘনত্ত নিয়ে পুরুষের মুখের লালা নিঃসরণ নিয়ে নয়। তিনি শিরোনাম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা প্রচারের, কারণ শিরোনামটিই যথেষ্ট হেফাজতের আমির আহমদ শফির বক্তব্যটিকে প্রমান করবার জন্যে। কারণ কেউ তো এই সংবাদের ভেতর টা পড়ে দেখবেন না। অধিক আগ্রহী পাঠকদের জন্যে এই সংবাদটির লিংক দিয়ে দিচ্ছি এখানে। বলে নেয়া ভালো যে, মেইল অনলাইন হচ্ছে ইংল্যান্ডের একটি কুখ্যাত বর্ণবাদী পত্রিকা এবং বিজ্ঞানের বিষয় কে বিকৃত প্রকাশ করবার জন্যে তাঁদের বেশ কুখ্যাতি আছে। 

এবারে দেখুন একটি মূলধারার পত্রিকা এই একই খবর কিভাবে প্রকাশ করেছে। দেখুন একই সংবাদ মেইল অনলাইন এবং টেলিগ্রাফ এর মধ্যে কতটা আকাশ পাতাল পার্থক্য। কিন্তু আমাদের এই উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালী তাঁর নিজের পাতায় সংবাদটি পরিবেশনের জন্যে কোনও মূলধারার সংবাদপত্র বেছে না নিয়ে বেছে নিয়েছেন একটি কুখ্যাত ট্যাবলয়েড এর সংবাদ কে। কারণ তিনি জানেন ট্যাবলয়েড পত্রিকাটির শিরোনামটি দিয়ে হেফাজতের আমিরের কথাটিকে প্রমান করাটা সহজ এবং তিনি খুব ভালো করে জানেন, বাঙ্গালী কখনই কোনও কিছু চেক করে দেখেনা। টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদ টি পড়তে হলে এইখানে ক্লিক করুন

অতএব,কি আসে যায় বিজ্ঞান নিয়ে মিথ্যা কথা রটালে? কি আসে যায় বিজ্ঞানের ভুয়া ব্যাখ্যা করে দিয়ে আহমদ শফি হুজুরের বয়ান কে প্রচার করলে? বাঙ্গালী তো কখনও পরীক্ষা করে দেখবেনা। সুতরাং চলুক এই নিরাপদ মিথ্যার বেসাতি।
শুধু আমরা হচ্ছি বেয়াদব, তাই আমাদের কাজ হচ্ছে এদের মুখোশ টা খুলে ভেতরের অসৎ চেহারাটি দেখিয়ে দেয়া।

“মাদ্রাসাকে মাদ্রাসার জায়গায়” রেখে দেয়া কি “মাদ্রাসা প্রেম”? নাকি গরীবের বাচ্চাদের বিরুদ্ধে অভিজাতদের ষড়যন্ত্র?


madrasa
১.
মাদ্রাসা শিক্ষাকে মুল ধারার শিক্ষার সাথে যুক্ত করার দাবীটি বহু পুরনো। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গুলো অন্তত গত তিন দশক ধরে দাবী করে আসছে, মদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং একে ক্রমশ মুলধারার শিক্ষার সাথে যুক্ত করার কথা। এর প্রধান যুক্তিগুলো হচ্ছে –
– মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যুগোপযুগী শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা, যেনো তাঁদের মাঝে শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষতা তৈরী হয়।
– একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজে অসমতা বা ইনিকুয়ালিটি হ্রাস করতে সহযোগিতা করবে
– মূলধারার শিক্ষায় বৃহত্তর ছাত্র সমাজের সাথে অংশ গ্রহনের ফলে এই ছাত্র ছাত্রীরা মূলধারার বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত হতে পারবে
– সর্বোপরি, এই সকল শিশুরা যেনো, আজকের অগ্রসর পৃথিবীর নানান বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে পারে

এখন, এই বিশাল ছাত্র গোষ্ঠীকে মূলধারার শিক্ষার সাথে একিভুত করার অর্থনৈতিক দায়টি রাস্ট্রের। বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গুলো সেই লক্ষেও কাজ করছে বহু বছর ধরে। রাস্ট্রের কাছে দাবী জানিয়েছে, শিক্ষার অর্থনৈতিক দায় যে রাস্ট্রকেই নিতে হবে, সে আন্দোলন আজও জারি আছে।
বলাই বাহুল্য, মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্রিক যে রাজনীতি বাংলাদেশে রয়েছে, সেই গোষ্ঠী এই ধরনের শিক্ষা আন্দোলনকে মাদ্রাসা শিক্ষা “ধংসের” আন্দোলোন বলে চিনহিত করে আসছে বহু বছর ধরেই। এরা এই একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার আন্দোলন কে মাদ্রাসা ছাত্রদের “বিরুদ্ধে” বলে প্রচার করে থাকেন। অথচ, আজ পর্যন্ত, কোনও ছাত্র সংগঠন এ ধরনের কোনও দাবী তোলেনি যে মাদ্রাসা ছাত্রদের শিক্ষা তুলে দিতে হবে বা তাঁদের শিক্ষার অধিকার বাতিল করতে হবে। বরং এই সকল ছাত্র সংগঠন গুলো “শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার” এই দাবীতেই আন্দোলন করে যাচ্ছে গত চার – পাচ দশক ধরে। এই সকল সংগঠন যে শিক্ষার অধিকারের সংগ্রামে নিষ্ঠ সেখানে মাদ্রাসার সকল শিশুর শিক্ষার অধিকারের প্রশ্নটিও যুক্ত। তুলনা করবার জন্যে দুটি ছবি তুলে দিলাম আপনাদের জন্যে। একটি মাদ্রাসার এবং একটি ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলের। বলুন তো একজন নৈতিক মানুষ হিসাবে, আমরা কি এই অসমতা কে সমর্থন করবো?
madrasa2
(বাংলাদেশের একটি মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র)
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী মৌলবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হয়েছে হেফাজত এ ইসলামী এবং তাঁদের পোশাকী সমর্থকেরা। যদিও এই সকল পোশাকী “মাদ্রাসা প্রেমিক” দের সন্তানেরা পড়াশুনা করেন শহরের সবচাইতে দামী ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে এই সকল মাদ্রাসা প্রেমিকদের সন্তানেরা চলে যান আমেরিকার, কিম্বা যুক্তরাজ্যের বা নিদেন পক্ষে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে। এই সকল অভিজাত পোশাকী মাদ্রাসা প্রেমিকদের মুল লক্ষ্য হচ্ছে, মাদ্রাসা শিক্ষারথিদের কে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার দাবীকে “মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে” বা “মাদ্রাসা ছাত্রদের বিরুদ্ধে” বলে প্রচার করা।
এই সকল পোশাকী মৌলবাদী দের দাবী হচ্ছে “মাদ্রাসাকে মাদ্রাসার যায়গায় থাকতে দিন” ! এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ধরনের পোশাকী মৌলবাদীদের পোশাক খানিকটা খুলে এদের নগ্ন ঘিনঘিনে চেহারাটা খানিক্টা তুলে ধরা।

২.
আমাদের দেশের ভদ্রলোক নাগরিকদের একটি অংশ মনে করেন “মাদ্রাসা কে মাদ্রাসার স্থানে থাকতে দেয়া উচিত”। অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষা কে নিয়ে কোনও রকমের সংস্কার বা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন বিষয়ে কিছু বলা যাবেনা। এরা বলেন মাদ্রাসায় এদেশের দরিদ্র মানুষের সন্তানেরা পড়ে, সুতরাং মাদ্রাসা থাকতে হবে। মাদ্রাসা না থাকলে দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা কোথায় পড়বে? দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষার এই ধারনাটি খুব জনপ্রিয়, কিন্তু বাঙ্গালী উচ্চ শিক্ষিত গোষ্ঠী কোনদিনও এই দুইটি প্রশ্ন করেন না নিজেদেরঃ

১ – মাদ্রাসা না থাকলে কি এই দরিদ্র মানুষের সন্তানেরা পড়তে পারবে কোথাও? পৃথিবীর বিভিন্ন স্বল্প আয়ের দেশে যেখানে মাদ্রাসা নেই সেখানে কি দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা পড়াশুনা করেন? নেপালে দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা কোথায় পড়েন? শ্রীলঙ্কায় দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা কোথায় পড়েন? ভারতের কেরালায়, যেখানে প্রায় ১০০% মানুষ স্বাক্ষর, এই অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা কোথায় পড়েন? ঘানা কিম্বা ইথিওপিয়া কিম্বা সুদানে দরিদ্র মানুষের বাচ্চারা কোথায় পড়াশুনা করে?

২ – যদি ধরেই নেয়া হয় যে, মাদ্রাসা ছাড়া আসলেই গরীব মানুষের বাচ্চাদের আর কোনও গতি নেই, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মাদ্রাসায় পড়ে কি এই সকল দরিদ্র মানুষের সন্তানেরা আদৌ তাদের নিজেদের ও পরিবারের দারিদ্র ঘোচাতে পারছেন? তাঁরা কি পারছেন তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক “বর্গ” বা “শ্রেনী” র উত্তোরন ঘটাতে?

-অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর নতুন পুস্তক “The country of first boys” পুস্তকের একটি লেখায় চমৎকার একটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যারা বইটি পড়েন নি, তাঁদের জন্যে উল্লিখিত প্রবন্ধটির একটি সারাংশ তুলে ধরছি প্রথমে। উল্লেখিত প্রবন্ধটির শিরোনামেই তিনি পুস্তকটির নামকরণ করেছেন। তারপরে অমর্ত্য সেনের যুক্তি দিয়ে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার চেস্টা করবো।
এই প্রবন্ধটিতে অমর্ত্য সেন ভারতের “ফার্স্ট বয়” সংস্কৃতির বেশ ভদ্রস্থ ভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, বহু বছর ধরে ভারতে এই “ফার্স্ট বয়” সংস্কৃতি চালু হয়ে আসছে। তিনি তাঁর নিজের শৈশবেও দেখেছেন এই সংস্কৃতি। বহু সফল মানুষ তাঁদের প্রৌঢ় বয়সের সময়েও ভুলতে পারেন না যে তাঁরা এক সময় “ফার্স্টবয়” ছিলেন। এমন কি বহু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সারা জীবন ধরে সেই স্মৃতি বয়ে নিয়ে বেড়ান। কেউ কেউ, স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় গণিতে বা পদার্থবিজ্ঞানে কত নাম্বার পেয়েছিলেন সেটাও মুখস্থ রাখেন সারা জীবন ধরে আর বিভিন্ন পার্টী বা সামাজিক অনুষ্ঠান গুলোতে খোশগল্পে সেসব বলে বেড়ান। এরপর ডঃ সেন, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাধারণ আলোচনা করেছেন, কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনা করেছেন ভারতের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা। এবং ভারতের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন। সেই সকল প্রশ্নের একটি প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে এই রকমঃ
ভারতের প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ শিশু হাইস্কুল পর্যন্ত আসতে পারেনা। অর্থাৎ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন যে সেখানে যারা সারা ভারতে “ফার্স্টবয়” হচ্ছেন, তাঁরা আসলে এক ধরনের শিথিল প্রতিযোগিতায় “ফার্স্টবয়” হচ্ছেন। যেখানে প্রতিযোগিতায় শতকরা ৫০ ভাগ প্রতিযোগী আসতেই পারছেন না। পুরোটা ফাকা মাঠে গোল দেয়া না হলেও, অন্তত অর্ধেক ফাকা মাঠে গোল দিচ্ছেন এই সকল কথিত “ফার্স্টবয়”রা। এটা কি একটা “ফেয়ার গেম” বলা যাবে? যাবেনা। ধরুন ভারতের এই বঞ্চিত শতকরা ৫০ ভাগ শিশুকে যদি কোনোভাবে হাইস্কুল ফাইনাল পর্যন্ত ধরে রাখা যায়, তাহলে কি বিষয়টা আমাদের বর্তমান “ফার্স্টবয়”দের জন্যে খানিকটা হলেও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, তাঁদের “ফার্স্টবয়ত্ত্ব” ধরে রাখার ক্ষেত্রে?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরেকধাপ এগিয়ে, ভারতের এই সকল “ফার্স্টবয়” গন, পড়াশুনা করেন হয় ইংরাজি মিডিয়ামে, অথবা প্রাইভেট স্কুলে নিদেন পক্ষে পাবলিক স্কুলে পড়লেও বাড়ীতে বা শিক্ষকের বাসায় টিউশন মিলিয়ে এদের পেছনে বাবা-মার মাসের বেতনের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে থাকে। এবার দ্বিতীয় অবস্থাটির কথা ভেবে দেখুন তোঃ

ভারতের যে শতকরা ৫০ ভাগ বঞ্চিত শিশু, তাঁরা শুধু হাইস্কুলে আসাই নয়, যদি তারাও এই সকল “ফার্স্টবয়”দের মতো একই রকমের সুবিধাদি পেতো, তাহলে এই সকল “ফার্স্টবয়”দের “ফার্স্টবয়ত্ত্ব” ধরে রাখাটা কতটা সহজ বা কঠিন হতো?

এই দুটি প্রশ্নের পরে, অধ্যাপক অমর্ত্য সেন, এই সংক্রান্ত রাজনীতিটির আলোচনা করেছেন। ভারতের যে মূলধারার রাজনীতি এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর যে রাজনীতি, তাতে করে উল্লেখিত বঞ্চিত শতকরা ৫০ শিশু কখনই মূলধারার প্রতিযোগিতায় এসে ভিড়তে পারবেনা। সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাকেই সেভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, গড়ে তোলা হয়েছে, এবং এই ব্যবস্থাকেই মহিমান্বিত করা হচ্ছে প্রতিদিন, যাতে এই সকল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের সন্তানদের সারাজীবনের “ফার্স্টবয়” ইমেজ টী প্রবল প্রতিযোগিতার সম্মুখিন না হয়। যেনো আরো বহু বহু বছর ধরে এদের সন্তানদের “ফার্স্টবয়” হওয়া টা ঝামেলা মুক্ত, নির্ঝঞ্ঝাট হয়।

- এবার আসুন, অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এর এই এনালজি টা যুক্তি কাঠামোটি বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রোয়োগ করে দেখা যাক।

দৃশ্যপট – ১
ধরুন বাংলাদেশের ষাট লক্ষ কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা বাংলাদেশের জিলা স্কুল গুলোতে চলে আসলো। সেখানে আরো অনেক ছাত্রের সাথে গণিত, ইংরাজি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োলজি, সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম ইত্যাদি পড়তে শুরু করলো। অবস্থা টা কি দাঁড়াবে বলুন তো? জিলা স্কুলের “ফার্স্টবয়”দের কি পরিশ্রম আরেকটু বেশী করতে হবে, তাঁদের “ফার্স্টবয়ত্ত্ব” ধরে রাখার জন্যে?

দৃশ্যপট – ২
ধরুন বাংলাদেশের এই ষাট লক্ষ কওমি মাদ্রাসার ছাত্র যদি দেশের বিভিন্ন জিলা স্কুলে অর্থাৎ মূলধারার স্কুল গুলোতে চলে আসে, সেখানে আরো অনেক ছাত্রের সাথে গণিত, ইংরাজি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োলজি, সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম ইত্যাদি পড়তে শুরু করলো। শুধু তাইই নয়, বরং এদেরও বাড়ীতে প্রাইভেট শিক্ষক পাওয়া গেলো, কিম্বা টিচারের বাড়ীতে ব্যাচে পড়ার সুযোগ পেলো এই শিশুরা, তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়াবে বলুনতো? আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখার পারফরম্যান্স কি চাপের মুখে পড়ে যাবে? আমাদের উচ্চ মধ্যবিত্ত – উচ্চবিত্ত পরিবারের যে সকল ছেলে মেয়েরা এখন ফার্স্টবয় বা ফার্স্ট গার্ল হচ্ছেন, তাদের নিজ নিজ আসন টি কি একটু অনিশ্চিত হয়ে পড়বে?
আমি আরেকটু এগিয়ে যেতে চাই –

দৃশ্যপট – ৩
ধরুন বাংলাদেশের এই ষাট লক্ষ কওমি মাদ্রাসার ছাত্র যদি দেশের বিভিন্ন ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে অর্থাৎ মূলধারার দেশী বিদেশী ইংরাজি মিডিয়াম স্কুল গুলোতে চলে আসে, সেখানে আরো অনেক ছাত্রের সাথে গণিত, ইংরাজি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োলজি, সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম ইত্যাদি পড়তে শুরু করলো, ও লেভেল এবং এ লেভেল পড়তে লাগলো। বলুন তো ধনীর দুলাল দের কি অবস্থা হবে? এই ধনীর দুলালেরা যারা বাবার গাড়ী করে স্কুলে যান, টিফিনে কে এফ সি বা পিজ্জা হাটে বেড়াতে যান, তাদের পক্ষে তাদের গ্রেড ধরে রাখা কি আরেকটু কস্টকর হয়ে উঠবে?
কিন্তু বাস্তবে এই তিনটি দৃশ্যপটের কোনটিই হবে না। কেননা, আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তি, শিক্ষিত বাঙ্গালী মনে করেন, মাদ্রাসা কে মাদ্রাসার যায়গাতেই রাখতে হবে। এর কোনও সামাজিক উল্লম্ফন ঘটানো যাবেনা। গরিবের বাচ্চা মাদ্রাসায় পড়বে আর “আমাদের বাচ্চা” জিলা স্কুলে পড়বে কিম্বা আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়বে। এর নাম হচ্ছে “মাদ্রাসা প্রেম” । উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীর “মাদ্রাসা-প্রেম”।
ভেবে বলুন তো এটা কি আসলে মাদ্রাসা প্রেম? নাকি পরের সন্তান চুলোয় যাক, “আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে”র নাগরিক স্বার্থপরতা?

মাদ্রাসাকে মাদ্রাসার যায়গায় রেখে দিলে কি মাদ্রাসার ছাত্রদের সামাজিক গতিশীলতা বা “সোশ্যাল মোবিলিটি”র পথ খুলে যায়? নাকি চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়? রিকশা চালকের ছেলে রিকশা চালাবে, কাঠ মিস্তিরির ছেলে আমার ফারনিচার বানাবে, ডাক্তারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে আর ইঞ্জিনিয়ার এর ছেলে ডাক্তার হবে, চিরকাল ধরে এই ব্যবস্থা চলতে থাকে, সেটা কি খুব কাম্য? হ্যা সমাজের অভিজাত শ্রেনীর কাছে সেটাই সবচাইতে কাম্য দৃশ্যপট, সেটাই স্বাভাবিক, সেটাই ধর্ম, সেটাই শাশ্বত ! এর ব্যতিক্রম যারা বলে, তাঁরা বেয়াদব, নাস্তিক, অশিক্ষিত, বোকা। রিকশা চালকের ছেলে বড় জোর মসজিদের তৃতীয় মুয়াজ্জিন হবে, সেতো আর আমার ছেলের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারেনা, তাই না? রিকশা চালকের ছেলেটি যেনো চিরকাল মাদ্রাসায় যেতে পারে, তাই “মাদ্রাসা কে মাদ্রাসার যায়গায়” রাখা দরকার। মাদ্রাসার ছেলে যেনো কখনও একাউন্টিং না পড়ে, তাহলে তো স্ট্যান্ডারড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে আমার ছেলের চাকুরীটা ঝামেলায় পড়ে যাবে, তাই না? মাদ্রাসার ছেলে যেনো কখনও ফারমেসি না পড়ে, তাহলে তো নোভারটিস এ আমার মেয়ের চাকুরী টা ঝামেলায় পড়ে যাবে, তাই নয় কি? সুতরাং মাদ্রাসা কে মাদ্রাসায় রাখতে হবে। এর বিরোধিতা যারা করবে, তাদের কে “সেকুলার” বলে ব্যাঙ্গ করা হবে, তাদেরকে নাস্তিক বলে ছি ছি করা হবে, তাদের কে নিরবোধ বলে হেসে উড়িয়ে দেয়া হবে।

সামাজিক গতিশীলতা বা “সোশ্যাল মোবিলিটি”র ধারনা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা
“সোশ্যাল মোবিলিটি”র ধারনাটি খুব সহজ। ধরুন – ডাক্তার এর ছেলে ডাক্তার – ইনজিনিয়ার বা উকিল হবে আর রিকশা চালকের ছেলে হবে রিকশা চালক বা কাঠ মিস্ত্রি বা বড়জোড় টেম্পো চালক। যদি এমনটাই ঘটে কোনও সমাজে, তাহলে এটা একটি বদ্ধ সমাজের উদাহরণ, যেখানে সোশ্যাল মোবিলিটি প্রায় শুন্যের কোঠায়। সোশ্যাল মোবিলিটির ধারনাটি একটি পজেটিভ ধারনা। স্বাভাবিক ভাবেই, আমাদের দেশে এটি একটি বিরল ঘটনা, সেই জন্যেই, মাদ্রাসার একটি ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজী বিভাগে সুযোগ পেলে তা জাতিয় পত্রিকায় খবর হয়ে ওঠে, কারণ এটি একটি বিরল ঘটনা।

সোশ্যাল মোবিলিটির সমস্যাটি শুধু আমাদের নয়, ভারত, পাকিস্থান, চীন এমন কি আমেরিকা সহ পৃথিবীর বহু দেশে বিদ্যমান। একটা বেশ জনপ্রিয় বিবৃতিও চালু আছে পসচিমা দেশে – আমেরিকায় কোনও একটি তরুন যদি এক প্রজন্মে তাঁর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন চায়, তাহলে তাঁর ফিনল্যান্ডে ইমিগ্রেশন নেয়া উচিত। অর্থাৎ একজন দরিদ্র আমেরিকান যুবক তাঁর সপ্ন বাস্তবায়ন করাটা আমেরিকায় যতটা কঠিন ফিনল্যান্ডে ততটা কঠিন নয়।
বলুন তো, মাদ্রাসার ছাত্ররা যদি বংশ পরম্পরায় মাদ্রাসাতেই থেকে যায়, তাহলে সেটা সেই সকল পরিবারগুলোর জন্যেও কি খুব সুবিধাজনক কিছু?

শেষ প্রশ্ন !
সুতরাং যে সকল এলিট মানুষেরা বলেন, “মাদ্রাসাকে মাদ্রাসার যায়গাতেই রাখতে হবে”, তাঁরা কি আসলে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের কিম্বা তাঁদের পরিবারের বন্ধু? নাকি এরা আসলে নিজেদের সন্তানদের পেশার যায়গাটিকে ঝুকিমুক্ত রাখার জন্যে এই রাজনৈতিক সংগ্রামটি চালিয়ে যাচ্ছেন “মাদ্রাসা প্রেমিক” হিসাবে? এরা বলছেন “মাদ্রাসা কে মাদ্রাসার যায়গায় থাকতে দিন”, এই কথাটি কি তাঁরা আসলে মাদ্রাসার বাচ্চাদের প্রতি প্রেম থেকে বলছেন, নাকি নিজেদের সন্তানদের চাকুরীর বাজার নিষ্কণ্টক রাখার জন্যে বলছেন? প্রশ্নটি খতিয়ে দেখুন। দেখুন, এই সকল মাদ্রাসা প্রেমিকের কতজনের বাচ্চা কাচ্চারা মাদ্রাসায় পড়ে, তাহলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। হিসাব করে দেখলে দেখবেন, শতকরা ৯৯.৯৯% মাদ্রাসা প্রেমিকের বাচ্চারা পড়েন, মুল্ধারার স্কুলে, অভিজাত স্কুলে কিম্বা শহরের সবচাইতে দামী ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে। সুতরাং এদের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সোস্যাল মোবিলিটির চাকাটিকে সব সময় নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে রাখা।
English_med
(বাংলাদেশের একটি ইংরাজি মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রদের একটি ছবি, উপরের ছবিটির সাথে, এই ছবিটির কি কোনও পার্থক্য আছে? )
এই সকল ভন্ড “মাদ্রাসা প্রেমিক” দের চিনে নেয়াটা জরূরী।
আমি বিভোর হয়ে স্বপ্ন দেখি, আজ যে বাচ্চা ছেলেটি বা মেয়েটি মাদ্রাসায় যাচ্ছে, তাঁরা যেনো কখনও মূলধারায় পড়াশুনার সুযোগ লাভ করে, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ফার্মেসী, একাউন্টিং এই সকল এপ্লাইড বিশয়ে পড়ার সুযোগ পায়, আর সেই সকল প্রতারক “মাদ্রাসা প্রেমিক” দের সন্তানদের ঘাড়ে টোকা দিয়ে বলে – “সরে যা, আমি এসেছি” …… !

বাংলাদেশের সকল মাদ্রাসার ছাত্র – ছাত্রী বাচ্চারা মাদ্রাসার কবল থেকে মুক্তি পাক ! আর যে সকল ভন্ড প্রতারকেরা নিজেদের সন্তানদের ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে পাঠিয়ে “মাদ্রাসা প্রেমিক” সাজেন, তাঁদের পোশাকটি খুলে ফেলে চিনে নিক এই সকল প্রতারকদের। চিনে নিক সেই সকল প্রতারকদের, যারা “মাদ্রাসা প্রেমিক” সেজে আসলে মাদ্রাসার বাচ্চাদের বংশ পরম্পরায় মাদ্রাসায় বন্দী করে রাখতে চায়।
আমি জানি, সেদিন খুব দূরে নয়।

আমাদের সবার গায়ের রক্তই লাল।

আমাদের সবার গায়ের রক্তই লাল---

মাথায় মাঝে মাঝে আগুন উঠে যায়। হায়রে মানুষ! নিজেদেরকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী বলে দাবি করে, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য, সবচেয়ে নীচ কাজগুলোও এরাই করে।
পৃথিবী এবং এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি কেন হল? এই পৃথিবীতে আমরা কেন এসেছি? এই দুটো প্রশ্নের জেরেই এত এত মত, এত এত ধর্ম, এত এত কু-সংস্কার আর এত নাটকের রাজত্ব! কারণ, যেহেতু প্রশ্ন দুটোর উত্তর কষ্ট করে খুঁজে বের করে লাগবে তার চেয়ে বরং কোনো এক অলৌকিক শক্তি এই কাজ করে রেখেছে ধরে নিলেই মিটে যায়! এবং এই তত্ত্ব কমবেশি সবাই মেনে নিয়েছে। কিন্তু এরকম ব্যাপার যদি মেনে নেওয়া যদি ঠিক হয় তাহলে পরীক্ষার সময় পরিক্ষার্থীর কোনো প্রশ্নের উত্তর যদি জানা না থাকে এবং সে যদি লেখে-“এই প্রশ্নের উত্তর সৃষ্টিকর্তার নিজস্ব ব্যাপার। তার লীলা। সুতরাং এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্যে ভয়ংকর অপরাধ,” তাকে সম্পুর্ণ নম্বরই দিয়ে দেওয়া উচিত!

পৃথিবীর মানুষের চরিত্র বেশ দারুণ! যুগে যুগে যাঁরাই এদেরকে এক করার চেষ্টা করেছে তাদেরকে এরা নাস্তিক বলেছে, ম্লেচ্ছ বলেছে, বলেছে কাফের। পৃথিবিতে শুধুমাত্র নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে গিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বিশ হাজারেরও বেশি আলাদা আলাদা ধর্ম ও আলাদা আলাদা সৃষ্টিকর্তা! হ্যাঁ, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষমতার জোরেই এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত ইতিহাস তাই-ই বলে। এটাই অবিশ্বাস্য যে এই মানুষগুলোর মতে যে সৃষ্টিকর্তা এত শক্তিমান, সে তাকিয়ে তাকিয়ে এই রঙ্গ কিভাবে সহ্য করছে! তার নামে মানুষ মানুষকে খুন করছে। তার নামে মানুষ তার মতই আরেক রক্ত-মাংসের মানুষকেই তার সাথে জাতের দোহাই দিয়ে বসতে দিচ্ছে না, স্পর্শ করতে দিচ্ছে না। আর পরম করুণাময়(!) সেটি বসে বসে দেখছেন!

যখন বলি যে, এত অন্যায় অবিচার সৃষ্টিকর্তা কিভাবে সহ্য করছেন? তখন উত্তর আসে, “অন্যায় না থাকলে ন্যায় এর মর্ম বোঝা যায় না।” বাহ! তাহলে মোটা মোটা ধর্মগ্রন্থগুলোতে কেন বলা হয়েছে যে “সদা সত্য কথা বলিবে। মিথ্যা বলিবে না। মিথ্যা বলা মহাপাপ?” এই যুক্তি অনুসারে মিথ্যা না বলাই তো মহাপাপ! কারণ, মিথ্যা বলা ছেড়ে দিলে সত্যের মর্ম বোঝা যাবেনা! কিন্তু এই কথা বলতে গেলে এখন পালটা যুক্তি না পাওয়া গেলেও মাথার পিছনে চাপাতির কোপ পাওয়া যাবে!

মানুষ বড্ড অলস। নিজের সৃষ্টির রহস্য খুঁজতে তার পরিশ্রম করতে বড়ই অনীহা। তার চেয়ে সহজ পন্থায় নিজের ও এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণ হিসেবে সে যুক্তিহীন ও অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ কথাবার্তাতেই বিশ্বাসী। আর এই অজ্ঞতার রাস্তাকে কাজে লাগিয়েই সে হয়ে ওঠে মস্ত বড় ধার্মিক। সাথে সাথে ফুলে ওঠে তার পকেটও! একটা উদাহণ দেই এখানে, ভারতের বিখ্যাত যোগগুরু বাবা রামদেব। উগ্রবাদী ও মৌলবাদিতে বিশ্বাসী এই লোকটা ধর্মের নাম করে আর যোগব্যায়ামের মাধ্যমে কোটি কোটি অনুসারী এবং রীতিমত ডলারে ইনকাম করেছে! তার প্রাইভেট জেট পর্যন্ত রয়েছে। অথচ তার অনেক অনুসারীই দু’বেলা খেতে পায় না। তিনি যখন এতই ধার্মিক তখন তো তার উচিত পায়ে হেঁটে চলাচল করা এবং তার সকল অর্থ গরিব-দুঃখী দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া! বিলিয়ে দেওয়াই তো ধর্ম! কিন্তু এইসব লোকের কপালেই আমাদের সমাজ “ধার্মিক” ও “সজ্জন” ব্যক্তির ছাপ লাগিয়ে দেয়!

এইসব লোকজন যুক্তিবাদী ও বাস্তববাদী মানুষদের বলে, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।” ঠিক আছে, আপনি একটু পরে চোখ বন্ধ করুন। এবার মনে মনে বিশ্বাস করুন যে দুই মিনিটের মধ্যে আপনার সামনে একটি দশ টাকার নোট চলে আসবে। কিন্তু পৃথিবী লয় হয়ে গেলেও তা আসার কথা না! এবং আসবেও না! এটিই বাস্তব। কঠিন বাস্তব। হে ধার্মিকগণ, বিশ্বাসে সামান্য দশ টাকাই মিলছে না! আর কোথায় আপনারা এই বিশ্বাসের মাধ্যমেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য খুঁজছেন! আপনাদের এই ভন্ডামির জন্যেই আজ গ্যালিলিওর মত বিজ্ঞানীকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

সারা পৃথিবী জুড়ে কোণঠাসা মানুষগুলো বুঝতে চায়না যে তারা যে জিনিসের ওপর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে সেটি কিছু ব্যবসায়ীর সৃষ্টি। আরে বাবা, এই কাগজ আর লিপিই সৃষ্টি হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। তার আগে নিশ্চয়ই কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। অর্থাৎ, এখন পৃথিবীতে বর্তমানে রাজত্ব করা এই নামীদামী ধর্মমতেরও কোনো অস্তিত্ব ছিল না! কিন্তু মানুষ তো সেই দুই মিলিয়ন বছর ধরে এই পৃথিবীতে রয়েছে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ধর্মগ্রন্থ গুলোতে যত কাহিনী এবং নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়েছে তা আমাদের চৌদ্দগুষ্টির জন্মের আগের কাহিনী। এ যদি সর্বসময়ের সব মানুষের ধর্মগ্রন্থই হয় তাহলে একুশ শতকের মানুষ কী দোষ করল?

এসব তো গেল তত্ত্বের কথা। বাস্তবে যাই। মানে প্রাক্টিক্যাল ঘটনায়। আমার জন্ম তো এই বাংলাদেশে, তাই যথারীতি হিন্দু-মুসলিম নিয়ে মারামারি তে চলে যাই। বেশি আগে যাবোনা। ১৯৯২। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দিল সাচ্চা হিন্দুস্তানিরা(!)। তার সাথে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর চলল অত্যাচার, খুন। এদিকে ঐ পারের ভাইয়েরা মরছে, মারছে কারা? এপারের মালাউনদের দাদারা! মার শালাদের! হিন্দুদের ধন-সম্পদ ও হিন্দু মেয়েগুলো ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের(!) দ্বারা গণিমতের মাল হিসেবে ঘোষিত হল! মাঝখান দিয়ে সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে দুই দেশের মৌলবাদী গুলোর স্বার্থ হাসিল হল আর দুই দেশের লাখ লাখ সংখ্যালঘু হিন্দু আর মুসলিম হল নিঃস্ব। যারা এই মৌলবাদীদের সমর্থন দিয়েছে, তাদের নোংরা মনে কি একবারো মনে হয়নি যে আমি হিন্দু হই আর মুসলিম হই, আমার ধর্মগ্রন্থ(যার দোহাই দিয়ে এত দক্ষযজ্ঞ) বলে যে আমরা সবাই ই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি? তাহলে কোন অধিকারে ভারত পবিত্র(!) করার জন্য মুসলিমদের মারা হয়? কোন অধিকারে হিন্দু মেয়েরা ভোগের পণ্য হয়?

সমস্যা হচ্ছে আমাদের এই শান্তিপ্রিয় জাতি আস্তিক ঠিকই, কিন্তু যারা সরাসরি এই ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত না তাদের জন্য দিনে ভাত-কাপড় আর রাতে সোহাগ পেলেই তাদের জীবন ধন্য। কার জন্য কে মরল, কে খেল না খেল তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না। আবার ধর্মগুরুরা ডাক দিলে কিন্তু তাদের মন ঠিকই আনচান করে। কিন্তু এই স্থুল ও নোংরা দিকগুলো রাস্তার কোনে পড়ে পড়ে মার খাওয়া ভিখারী থেকে শুরু করে বিশাল বাঙলোবাড়ির শোবার ঘরের কোনে পড়ে থাকা ক্রন্দনরত নির্যাতিতা স্ত্রী, কারোরই চোখে পড়ে না। কারণ, তাদের মধ্যে বিশ্বাসের ভাইরাস খুব দারুণভাবেই ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। কারো মধ্যে যদি ভুল করে সত্যিটা জেগেও যায়, তাহলে আমাদের শক্তিশালী ব্যবসায়ীগণ ঠিকই তাদের মুখ চেপে ধরে।
আজ ধর্মের ফ্যাশনধারী মানুষের সংখ্যাই বেশি। শ্রীকৃষ্ণের ছবি বিকৃত করলে, মহানবী(স) কে নিয়ে কটুক্তি করলে এদের পরাণ জ্বলে যায়। দা-চাপাতি নিয়ে সেই বেজন্মা(!)কে কুপিয়ে শেষ করতে পারলেই যেন ধর্ম রক্ষা হয়। ওহে ধর্মপত্তুর যুধিষ্ঠিরের দল, আমি নই, তোদের ইতিহাসই বলে মহানবী(স) কে পাথরের আঘাতে মৃত্যুশয্যায় নিয়ে গেছিল পৌত্তলিকেরা। তিনি কি তাদের চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছিলেন? আমি তো জানি, তিনি তার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন,”হে প্রভু, এদের জ্ঞান দাও।“ তিনি চাপাতি নিয়ে ওই পৌত্তলিকদের কোপাতে যাননি। মহানবী(স) কে নিয়ে এই মৌলবাদি গুলো স্রেফ ব্যবসা করে। তাঁর আদর্শ কেউই মানে না। দাঁড়ি রেখে, নামাজ পড়ে বাহ্যিকভাবে তাকে অনুকরণ করে আর ঘরে গিয়ে বউকে পেটায়, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করলে বাধাও দিতে আসেনা। এদের মতে পৃথিবীতে কোনো মুক্তচিন্তার(প্রকৃতপক্ষে এদের ব্যবসাবিরোধী) মানুষ থাকতে পারবেনা। এরা যদি এতই ধর্মপ্রাণ হয় তাহলে চাপাতি দিয়ে কোপানো এদের কোন ধর্মগ্রন্থে লেখা রয়েছে? সবচেয়ে দুঃখের বিষয় সাধারণ মানুষও সস্তা পুণ্য বা সোয়াব অর্জনের জন্য এদেরকে অকুন্ঠ সমর্থন দেয়। এদের কাছে বোরখা না পরে মেয়েদের বাইরে বেরোনো ভয়ঙ্কর অপরাধ। কিন্তু যে নষ্ট, বিকৃত মানসিকতার জানোয়ারগুলো মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করে তাদের বিরুদ্ধে এদের কন্ঠ সোচ্চার হতে শোনা যায়নি। ঘরে শৌচাগার নেই, ঘরের বউকে রাতের বেলা বাইরে যেতে হয় বাধ্য হয়ে। তাতে জাত যায় না, জাত যায় নিকটাত্মীয়ের সামনে মুখের ঘোমটা সরে গেলে। ঘরের কাজের মুসলমান কাজের মহিলা থালাবাসন একবার ধুয়ে গেলে তা পুনরায় নিজে একবার ধুয়ে নেয় ধর্মপ্রাণ হিন্দু গৃহিণী। অথচ নামী রেস্তোরায় যেয়ে যে প্লেটে সে খায় সেটিতে আগে কোনো মুসলমান খেয়ে থাকলেও তার গায়ে লাগে না, সেই প্লেটটি যদি কোন মুসলমান ধুয়ে থাকে তাতেও তার জাত যায় না। এমনকি ওই রেস্তোরার খাবার যদি মুসলমানের রান্না করা হয় তাতেও আমাদের ধর্মপ্রাণ হিন্দুর জাত যাওয়ার ভয় থাকেনা।

মানুষের আজ সময় নেই এই ধর্মব্যবসাকে বোঝার। আজ শিবসেনারা চলন্ত বাসে নারীদের গণধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনা। তারা আন্দোলন করে গরুর মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে। কারণ, গরুর মাংস মুসলমানরা খায়! আজ পহেলা বৈশাখে নারীর শাড়ির আঁচল ধরে টান দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন করে না হেফাজতে ইসলাম। তারা আন্দোলন করে আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখা কাটার জন্যে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু লেখক!

যিনি এই লেখাটি পড়ছেন, তার কাছেই সরাসরি প্রশ্ন করব, বলতে পারেন? আর কত? আর কত অন্যায় অবিচার গ্লানি সহ্য করার পর সেই সৃষ্টিকর্তা মুখ তুলে তাকাবেন? আজ ধর্মের নামে, সৃষ্টিকর্তার নামে যা হচ্ছে তাকে খালি চোখে একটা কথাই বলা যায়, “ভন্ডামি।”

সৃষ্টিকর্তা যদি থেকেই থাকতেন তাহলে এই ভন্ডামিই গুলো কখনই হত না। আজ হবার সুযোগ পাচ্ছে। কারণ, এই মানুষ গুলোই এই ভন্ডগুলোই আজ আমাদের মনে বিশ্বাসের ভাইরাস ঢোকাচ্ছে। এই ভন্ডগুলো বলতে চাইছে তাদের সৃষ্টিকর্তার নামে কিছু বললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা। এই ভন্ডগুলো আবার তাদের সৃষ্টিকর্তাকে সর্বশক্তিমান বলে। যিনি সর্বশক্তিমান তিনি নিজের রক্ষা নিজেই করতে পারেন। যে ভন্ড নিজের জীবনেরই গ্যারান্টি দিতে পারেনা সে নাকি সর্বশক্তিমানকে রক্ষা করবে! কিন্তু এই ভন্ডামি ঠেকানোর কেউই নেই। সর্বশক্তিমান বলে যদি কেউ থাকতেন তিনি নিশ্চয়ই ঠেকাতেন।
আর আমার এই লেখাটা পড়ে কারো সামান্যতম উপকার হোক বা না হোক অন্তত একজন হিন্দু আর একজন মুসলিম যদি আমায় খুন করতে চান তাও আমার লেখা সার্থক! কারণ, একজন হিন্দু আর একজন মুসলিম “একত্রে” আমাকে খুন করতে চান! কাজী নজরুল ইসলাম যেটা করতে চেয়েছিলেন সেটা আমি করতে পারব! এইটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা বোধহয়!

সবশেষে, এইটাই বলব, আপনাদের সৃষ্টিকর্তা, আপনাদের ধর্ম আমি মেনে নেব একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে পারলে। আপনাদের সামনে সদ্য জন্ম নেওয়া মাত্র ৫ টি শিশুকে রেখে বলতে বলব যে-“বলুন, এদের মধ্যে কে হিন্দু? কে মুসলিম? কে বৌদ্ধ? কে খ্রিস্টান? কে জৈন? কে ইহুদি?” পৃথিবীর কোনো মানুষ যদি বলতে পারেন যে ঐ শিশুগুলি কে কোন জাতের তাহলে আমি সব মেনে নেব। আমাকে যে শাস্তি দেওয়া হবে তাই মেনে নেব। কিন্তু যদি না পারেন তাহলে আপনাকে একটা সহযোগিতা করি আমি। এই যে ৫ টি শিশুর কথা বললাম আমি? এই ৫ টি শিশুর প্রত্যেকেই “মানুষ।” দয়া করে এই পরিচয়টাকে ভুলবেন না।
“সবার ওপরে মানুষ সত্য,
তাহার উপরে নাই।”
সত্যিই, সবার ওপরে আমরা মানুষ। কোনো ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তাই তার উপরে নেই। কারণ, আমাদের সবার গায়ের রক্তই লাল।”

বোরখা, হিজাব এবং আমার কিউরিয়াস মাইন্ড।

বোরখা, হিজাব এবং আমার কিউরিয়াস মাইন্ড---

হিজাব আর বোরখা নিয়ে আমার যথেষ্ট পরিমানে আগ্রহ এবং কৌতূহল আছে। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর পাচ্ছি না। মেয়ে মানুষ গুলো প্রকৃত কারনে কেন হিজাব পরে আমার জানা নাই। তবে লোকমুখে যা শুনে আসছি তার অর্থ বা ব্যাখ্যা ঠিক এই রকম।
যেমন, হিজাব করা হয় মাথার চুল ঢেকে রাখার জন্য। পর পুরুষ বা বেগানা কোন পুরুষ যেন মাথার চুল দেখতে না পায় তাই হিজাব করে মাথার চুল ঢেকে রাখা হয়। কারন চুল বের হয়ে থাকলে পুরুষ মানুষ এর কাম বাসনার উদয় হতে পারে এবং মেয়েদের দৃশ্যমান কেশবিন্যাসের কারনে শরীরে কাম উত্তেজনা দৃশ্যমান হতে পারে।
এখন আমার প্রশ্ন হল, একজন মানুষ এর সম্পূর্ণ শরীরের কোন অংশটি সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয়? আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন আমি অবশ্যই মুখমণ্ডলের কথা সবার আগে বলবো। কারন মানব শরীরে বা প্রথম দর্শনে সবার নজর মুখমণ্ডলের দিকেই সরাসরি চলে যায়। মুখশ্রী ভাল হলেই তাকে আমরা বলি অনিন্দ্য সুন্দর, মায়াময়, মোহনীয় , সুদর্শন অথবা সুশ্রী। মুখমণ্ডলের পর আসে অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অথবা কেশ। তাহলে মুখমণ্ডলের চেয়ে কেশবিন্যাসের আকর্ষণ ক্ষমতা কি সবচেয়ে বেশী?
মুখমণ্ডলটি খোলা রেখে হিজাব করার মানে টা আমার ঠিক বোধগম্য নয়। আসল আকর্ষণীয় অংশটি খোলা রেখে কেশবিন্যাস ঢাকতে হিজাবের ফ্যাশনটা আজকাল বড় বেশী চোখে লাগে। তাহলে মুখমণ্ডল খোলা রেখে পাহাড় সমান উঁচু হিজাবি নারীরা আসলেই কি পুরুষদের লোভনীয় কামাত্ত দৃষ্টি থেকে মুক্ত? আপনি কি বলেন?
আমি বলি, কখনই না। বরং আজকালকার হিজাবি মেয়েদের ফ্যাশন দেখে নিজেই রীতিমত থতমত খাই। ইয়া বড় বড় উটের পিঠের কুঁজোর মতো মাথাটাকে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে রাখে। মুখ ভর্তি অতিরঞ্জিত মেকআপ দিয়ে রাঙিয়ে রাখে। আবেদনময়ি চোখের সাজে ইয়া লম্বা করে কাজল টানে। ঠোঁটে সলিড রঙের কড়া লিপস্টিক অথবা গ্লসি বোল্ড ঠোঁট নিয়ে ঠাটিয়ে চলে। আর পরনে ফিটিংস লম্বা আলখাল্লা। দেখেলেই মনে হয় আবেদনময়ী নারী তার সাজসজ্জা দিয়ে বোঝাতে চাইছেন তোমরা সকলে আমাকে দেখ। প্রানভরে দেখ। আমি সুন্দর করে সেজেছি তাই দেখ। কিন্তু আমি হিজাব করেছি। হিজাবের সহি সম্মানার্থে আমাকে ভদ্রভাবে দেখ। খারাপ নজরে দেখ না। খারাপ নজর দিও না কারন আমি ইসলামের বিধান অনুযায়ী হিজাব করেছি এবং পুরো শরীর বোরখা (ফিটিংস আলখাল্লা) দিয়ে ঢেকেছি। আমাকে দেখে কাম রসে ভিজে যেও না।
আচ্ছা বলুনতো, বোরখা কেমন হউয়া উচিৎ? আঁটসাঁট নাকি ঢিলেঢালা? যেন শরীরের শেপ বোঝা না যায় সেরকম। তাহলে এই হিজাবি অতিরঞ্জিত মেকআপ দিয়ে রাঙ্গানো মেয়েরা আঁটসাঁট বোরখা কেন পরে? এটা কি শরিয়ত মতো নিয়ম মেনে পরা হচ্ছে? ইসলাম কি বলে? এইরকম করে কি ইসলাম নারীদের চলার অনুমতি দিয়েছে? যদি দিয়ে থাকে অনুরোধ করি রেফারেন্স সহ বইটির নাম জানাবেন।
আর যদি এমন কোন নিয়ম না থেকে থাকে তাহলে আপনারা এই রকম ইসলাম অবমাননাকারি নারীদের বিরুদ্ধে কোন আইনি বাবস্থা নিচ্ছেন না কেন? কেন তাদেরকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়ার জন্য গ্রেফতার করছেন না? নাকি এই জন্য করছেন না যে, তারা আপনাদের চলার পথের আনন্দের খোঁড়াক। রাস্তাঘাটে , কলেজ, ইউনিভারসিটিতে, কর্মক্ষেত্রে ননস্টপ বিনোদন আর যৌন আকাঙ্ক্ষা নিবারনের খোঁড়াক। সাময়িক কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী বিনা মূল্যে লোভনীয় আইটেম গার্ল, যা যখন তখন দেখে তৃপ্ত হয়া যায়। বিকৃত পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া যায়।
একটা কথা বলুনতো , যদি ধর্ম পালন করতেই হয় তাহলে তা যথার্থ ভাবে পালন করা উচিৎ কিনা বলুন? আর যদি পালন না করা যায় নিয়মকে এভাবে বিকৃত করে পালন করা কোন ভাবেই উচিৎ নয়। কারন এভাবে মতভেদ সৃষ্টি হয়। ধর্ম হয় প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বাসে পরে ছেদ। ভিত্তি হয় নড়বড়ে। কি লাভ এই ভণ্ডামি করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কি লাভ এই বিকৃত ফ্যাশন করে? এর চেয়ে হিজাব আর বোরখা না পরেই মনের মতো পোশাক পড়ুন। যেমন ইচ্ছে পোশাক পড়ুন। আপনার ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ান। আপনার ইচ্ছেমত সাজুন। মনের মাধুরি মিশিয়ে সাজুন। নিজেকে সুন্দর করে সাজান। কেউ কিছু বলবে না। শুধু মাত্র ধর্মের নামে ভণ্ডামি করবেন না। নিজেদের মান টুকু নষ্ট করবেন না।
আমি নারী জাতিকে কখনও অসম্মান করিনা। ওটা আমার এখতিয়ারে পরে না। আমি জানার জন্য জিজ্ঞেস করি মাত্র। আমরাও ফ্যাশন করি। দেশের বাহিরে থাকার সুবাদে পোশাকের স্বাধীনতা বাংলাদেশের চেয়ে বহু গুন বেশী। সেটাও যেমন দেখেছি আবার এখানে হিজাব/ বোরখা ধারীদের ফ্যাশন এর স্টাইল ও অন্যরকম বা চোখে লাগার মতো। আমি তো আর মধ্যা বয়স্কা নই, ফ্যাশন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারনা রাখি/করি।
আমার মোদ্দা কথা হল আপনি যা খুশি পড়ুন যা ইচ্ছা পড়ুন কোন আপত্তি নেই। আপত্তি হল যখন হিজাব/ বোরখা ধারীদের কারো সাথে কথা বলি বা ইসলাম সম্পর্কে এই এরাই যখন অনেক বড় বড় বয়ান দেন বা তাদের বাবা মাকে উগ্র পন্থি হতে শুনি/দেখি সেখানেই সমস্যা।

সবাক---অত্যন্ত বেয়াদব এক ভূতের গল্প!

অত্যন্ত বেয়াদব এক ভূতের গল্প

লিখেছেন
১.
বেচারা রফিক মিয়া চৈত্রের অস্থির গরম থেকে বাঁচতে সন্ধ্যার পর বাড়ির দরজায় নারিকেল গাছের সাথে গা ঠেকিয়ে একটু বাতাস খেতে আসছেন। বাতাস খেতে ভালোও লাগছিলো। কিন্তু আচমকা কোন বদমাশ এসে দিলো পাছার উপর কষে এক থাপ্পড়! আজব ব্যাপার, কার হঠাৎ শখ জাগলো ৫৫ বছর বয়সী পাছায় থাপ্পড় মারার? কী বিচ্ছিরি বিষয়। এটা কোন কথায়ই না। থাপ্পড় মারার পর আবার বলে – কিরে সোহাগ, বাতাস খাইতে খুব ভালো লাগে? বাতাসের সাথে একটা থাপ্পড় হলে খারাপ হয় না, তাই না।
এটা শুনে রফিক মিয়া বললেন, “আমি সোহাগ না, রফিক।“ খাইছে! ব্যাপারটাতো পুরা কাবজাব হয়ে গেলো। যে থাপ্পড় মারছে, সে দিলো দৌড়। দৌড় দিবেই না কেন, বাপের পাছায় থাপ্পড় মারাতো যেনতেন ব্যাপার নয়। ছেলে বাপের পাছায় থাপ্পড় মেরে পরে বুঝতে পেরে দৌড় দিলো, আর বাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে – এ কী হলো! অন্ধকারে মুখ চেনা না গেলেও কণ্ঠ শুনে বুঝলেন এটা তারই ছেলে নাসির।
রফিক মিয়া খেয়াল করে দেখলেন থাপ্পড় মোটেও হালকা ছিলো না। ৫৫ বছর বয়সী পাছাটা খুব ব্যাথা করছে। অবশ্য ব্যাথার মাঝেও কিছুটা আনন্দ হচ্ছে। ছেলেটা খুব শক্তিমান হয়েছে। এটা রফিক মিয়ার একমাত্র ছেলে। নাম নাসির। নাসিরের জন্মের পর সবাই বলেছিলো এত ছোট সাইজের বাচ্চা বাঁচবে না। বাঁচলেও অনেক রোগা হবে, খাটো হবে। এখন নাসিরের বয়স ২০ বছর। যেমন লম্বা, তেমন স্বাস্থ্যবান। নিন্দুকের মুখে চুনকালি মেখে ছেলে এখন বাপের পাছায় থাপড়াইতে জানে। তাও যেনতেন থাপ্পড় না। থাবড়ে বাপের পাছা লাল করে দিয়েছে।
বাপ কী ভাবছে ছেলের জানার সুযোগ নেই। ছেলে আছে ভয়ে, আতংকে আর লজ্জায়। কত বড় কুলাঙ্গার সন্তান হলে বাপের পাছায় থাপ্পড় মারতে পারে! ছি ছি!! তাও ব্যাপারটা এমন না যে, বন্ধু বান্ধবের পাছায় থাপ্পড় মারার অভ্যাস আছে তার। দুষ্টুমির ছলে কিল ঘুষি লাত্থি মারে হয়তো, কিন্তু পাছা জিনিসটা অশ্লীলতো, তাই অন্যের পাছা ছুঁইতে নাসিরের তীব্র আপত্তি আছে। এখন সমস্যা সেটা না। সমস্যা হচ্ছে বাপকে মুখ দেখাবে কী করে? বাপের পাছায় থাপ্পড় মারা পরবর্তী কাজটাইবা কী? বাপের পা ধরে ক্ষমা চাইবে? বলবে, “আব্বা আমি ভুল করে থাপ্পড় মেরেছি। ভেবেছি চাচাতো ভাই সোহাগ দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা আমারে মাফ করে দেন।“ কিন্তু এটা বলার জন্য বাপের সামনে কিভাবে যাবে!
মোটকথা হচ্ছে নাসির বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না। জীবনে কখনো বাপের পাছার দিকেই তাকায়নি সে। আরে বাবা, পাছাটাতো বাপের, এটার দিকে কিভাবে তাকায়! আপনারা ভুল বুঝবেন না, নাসির কখনো বিপরীত লিঙ্গের মানুষের পাছার দিকেও লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায় না। নাসিরের সমস্ত আগ্রহ গরুর পাছার দিকে। গরুর পাছার মাংস খেতে খুব পছন্দ করে। নাসিরের বাপ আবার গরুর সিনার হাঁড় মাংস পছন্দ করে। কিন্তু মাংস কেনার সময় ছেলের কথা মাথায় রেখে পাছার মাংসও কিনে।
এখন এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে? নাসির কখনোই বাপের পাছায় থাপ্পড় মারা ছেলে হতে চায়নি। বাপের মুখ উজ্জ্বল করা ছেলে হতে চেয়েছে। কিন্তু বাপের মুখ উজ্জ্বল করা বাদ দিয়ে পাছা লাল করে দিয়েছে। আপনারা হয়তো হাসছেন। কিন্তু নাসিরের ব্যাপারটা একবার বুঝার চেষ্টা করুন। এখনো নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি সে। বাপের টাকায় খেয়ে পরে বেঁচে আছে। ভুল করে বাপের পিঠে চাপড় দিলেও রক্ষে হয়, কিন্তু পাছা? এটাতো ভাই বড় অশ্লীল হয়ে গেলো! এখন বাপরে হয়তো বুঝানো গেলো চাচাতো ভাই মনে করে বাপের পাছায় থাপ্পড় মরেছে, কিন্তু বাপের মনতো উল্টাপাল্টাও বুঝতে পারে। বাপতো ভাবতে পারে তার ছেলের ইয়ের দোষ আছে। যৌবনের ক্ষুধায় ছেলেদেরকে পছন্দ করে সে। উফ! যদি এমন কিছু ভাবে, তাহলে বেদনায় বাপের বুক ভেঙ্গে যাবে। সব বাবাই চায় ধুমধাম করে একটি সুন্দরী মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিবে। কিন্তু ছেলের যদি অন্য দোষ থাকে, তাহলে আরেকটা ছেলেকে কিভাবে বৌ করে ঘরে আনবে? সমাজের মানুষরাইবা কী বলবে! সমাজ এখানে বিশাল ব্যাপার।
আপনারা মোটেও আন্দাজ করতে পারছেন না এই মুহূর্তে নাসিরের অবস্থা কত খারাপ। নাসির ভাবছে আত্মহত্যা করবে। অথবা পালিয়ে যাবে। কোনভাবেই এই মুখ নিয়ে বাপের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। এই মুহূর্তে নাসির অসহায়, বিপদে আছে। কিন্তু এতকিছুর পরও ছেলেটি বাস্তববাদী। আত্মহত্যা কিংবা পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলেও আসলে সে অন্য কোন পথ খুঁজছে। পথের খোঁজও পেয়েছে। হয় পাগল সাজবে, নয়তো ভুতের আছরের নাটক করবে। যেন তার বাবা সমস্ত পুত্রস্নেহ দিয়ে ছেলেকে সুস্থ করে উঠেপড়ে লাগেন।
এক্ষেত্রে পাগলের বেশ ধরা রিস্কি। পাগল হলে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। ডাক্তাররা চালাকি ধরে ফেলবে। কিন্তু ভুতের বিষয়টা সামনে আনলে ঘটনা আর হাসপাতালে যাবে না, যাবে ঠাকুর অথবা মসজিদের হুজুরের কাছে। এটা অনেক নিরাপদ। অন্ততপক্ষে নাসির সেটাই মনে করে।
নাসির বুদ্ধি করে ঘটনাটি পুরো গ্রামে ছড়িয়ে দিলো। বাজারে কয়েকশ মানুষের সামনে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বারের পাছায় দিলো কষে এক থাপ্পড়! সবাইতো হতবাক। মেম্বারও ক্ষ্যাপা।
– তুই আমার পাছায় থাপ্পড় মারলি ক্যান?
– ওমা, পাছাতো থাপড়ানোরই জিনিস। তাই থাপড়াইছি। পেছনে ঘোরেন, আরেকটা থাপ্পড় মারি।
মেম্বারসাব মান সম্মান নিয়ে দৌড়ে পালানেন। বিচার গেলো নাসিরের বাপের কাছে। বাপ ভাবছে ঘটনা কী, ছেলে এভাবে পাছা থাপড়ানো শুরু করছে ক্যান!
বাপের সাথে চোখাচোখি হয় না। ছেলেকে দেখলে বাপ দূরে সরে যায়, বাপকে দেখলে ছেলে। পাছা কেলেংকারি বাপ ছেলের মাঝে একটি সুনির্দিষ্ট দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে। দুপুর বেলা বাড়িতে গোসল করতে অন্য সবার সাথে ঘাটে গেছে নাসির। চাচাতো ভাই সোহাগের বাবা গোসল সেরে ঘাটে উঠে দাঁড়ালেন। নাসির খুব মনযোগ দিয়ে চাচার পাছা দেখছে। চাচা বিষয়টা খেয়াল করলেন। বিব্রত হলেন।
– চাচা, আপনার পাছাটা খুব সুন্দর। অনেক মাংস। এদিকে আসেন, একটু থাপড়ে দিই।
এই কথা শুনে কিছু বুঝে উঠার আগেই লুঙ্গির উপর দিয়ে ভেজা পাছাটায় কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নাসির। নাসিরের চাচীও পুকুর ঘাটে। স্বামীর হৃষ্টপুষ্ট পাছাটা তার খুব প্রিয় হলেও কখনো থাপ্পড় দেয়ার চিন্তা করেননি। উল্টো এই লোভ মেটান নাতির পাছার উপর। ২ বছর বয়সী নাতিটারে উপুর করে আচ্ছামতো পাছায় থাপড়ান। কিন্তু এখন নাসির এটা কী করলো! ছি ছি! ছেলেটারে খুব আদর করতেন তিনি। নিজের ছেলের মত জানতেন। অথচ সেই ছেলেই কিনা চাচার পাছায় থাপ্পড় দিলো। তাও আবার ভেজা পাছা। ভেজা গায়ে থাপ্পড় যে কী জোরে লাগে! স্বামীর জন্য মনে মনে বেদনা অনুভব করলেন তিনি।
যথারীতি নাসিরের আব্বার কাছে বিচার গেলো। পড়লেন দুশ্চিন্তায়। তিনি তার বাকি দুই ভাইকে নিয়ে বসলেন আলোচনায়। নাসিরতো এরকম ছেলে না। হঠাৎ তার কী হলো! আলোচনার এক পর্যায়ে নাসিরকেও ডাকা হলো। নাসিরতো লজ্জায় শ্যাষ। অনেক কষ্ট করে গায়ের কাঁপুনি নিয়ন্ত্রণে এনে বাপ চাচাদের সামনে দাঁড়ায়। সকল জড়তা কাটিয়ে নাসিরকে জিজ্ঞাসা করা হলো সে কেন সবার পাছায় থাপ্পড় মারছে?
এটা শুনে নাসিরতো আকাশ থেকে পড়লো। লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। বিস্ময়ে চোখ দুইটা ঠেলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
– আব্বা, আব্বা, আপনি এসব কী বলতেছেন! ছি ছি! আপনাকে এসব কে বলেছে? আব্বা আপনিই বলেন আমি কেন সবার পাছায় থাপ্পড় মারবো?
– কিন্তু ঘটনাতো সত্য।
– আব্বা, বিশ্বাস করেন, আমি কারো পাছায় থাপ্পড় মারি নাই। পাছা একটা নোংরা ও অশ্লীল জিনিস। আব্বা, আমি কিভাবে যে বুঝাই, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। চাচার পাছায় থাপ্পড় মেরেছি! কী ভয়ংকর অশ্লীল অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে। আব্বা, আমার মরন ছাড়া আর উপায় নাই।
– তুই আমার পাছায়ও থাপ্পড় মেরেছিস, হারামজাদা।
এটা শুনে নাসির আর নাই। মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। বাপ চাচারা সবাই এসে নাসিরকে জড়িয়ে ধরেছে। চোখে মুখে জলের ছিটা দিচ্ছে। নাসিরতো ঘেমেটেমে একাকার। জলের ছিটা খেয়ে নিজের হারানো জ্ঞান ফিরিয়ে আনলো সে। সেজো চাচা আর ছোট চাচার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদেরকে দূরে উল্টো পাশে হাতের ইশারা দিয়ে বললো, “চাচা দেখতো ওইটা কী?” এটা শোনার পর চাচারা পাশ ঘুরলেই নাসির দুই হাত দিয়ে দুই চাচার পাছায় গায়ের সব শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারলো। তারাও গায়ের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করলো। চিৎকার শুনে নাসির আবার অজ্ঞান হয়ে যায়।
এসব দেখে চাচারা বললো নিশ্চয় নাসিরকে ভূতে ধরেছে। নইলে সবার প্রিয় বুদ্ধিমান ছেলেটা এরকম কেন করবে? নাসিরের বাবা রফিক মিয়া ভাইদের কথায় সায় দিলো। নাসিরের ছোট চাচা বললো, তবে ভূতটা ভালো। শুধু পুরুষদের পাছায় থাপ্পড় মারতেছে। নিশ্চয় ভুতটা কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের। ভদ্র এবং সভ্য।
ঘটনার এই পর্যায়ে এসে যেহেতু ভূতের বিষয়টা ধরা পড়লো, সেহেতু এখন ভূত তাড়ানোর জন্য এক্সপার্ট দরকার। এই গ্রামে দুইজন মানুষ ভূত তাড়ায়। একজন হলো ব্রাহ্মণ ভাসান ঠাকুর, আরেকজন মসজিদের ইমাম। ভাসান ঠাকুরদের ভূত তাড়ানোর ইতিহাস অনেকদিনের। তার বাবা অতীশ ঠাকুরও ভূত তাড়াতেন। তারা ভূতকে ঝাড়ুপেটা করে তাড়িয়ে দেয়। লতাপাতার ধোঁয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। গু মাখানো জুতা শুঁকিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
ঠাকুর আর হুজুরের প্রশ্নে নাসিরের বাবা ঠাকুরের পক্ষে। কিন্তু নাসিরতো সব শুনেছে। লতাপাতার ধোঁয়া না হয় মানা যায়, কিন্তু গু মাখানো জুতা সে কোনভাবেই শুঁকতে পারবে না। দেরি না করে অজ্ঞান নাসির সটান উঠে বসে হুংকার ছাড়লো, “কোন হিন্দু খোনকার ডাকলে আমি যাদের পাছায় থাপ্পড় দিয়েছি, তাদের পাছায় কাঁটাওয়ালা গাছের জন্ম হবে। এইসব কাঁটায় থাকবে ভয়ানক বিষ। পাছায় বিষকাঁটার গাছ নিয়ে এই মানুষগুলো বসতে পারবে না, চিৎ হয়ে শুইতে পারবে না, দেয়ালে ঠেক ধরতে পারবে না। কিন্তু যদি মসজিদের ইমাম আনে, তাহলে সবার পাছাই রবে অক্ষত এবং নিরাপদ। পাছায় কাঁটাওয়ালা গাছতো দূরে থাক, একটা ঘাসও গজাবে না।
নাসিরের মেজো চাচা খুব খুশি। কারণ সে চেয়েছে মসজিদের ইমামকে দিয়ে ভূত তাড়াতে। তার মতে ওইসব ঠাকুর মাকুর ভুয়া জিনিস। সব ধান্ধাবাজের দল। কিন্তু মসজিদের ইমাম, তার মাঝে কোন ধান্ধা নেই। তিনি ফেরেশতার চাইতেও ফ্রেশ। নিজ দায়িত্বে বেরিয়ে গেলেন ফ্রেশ ইমামকে নিয়ে আসতে।
নাসিরের অবস্থা ভালো না। তারচেও খারাপ হচ্ছে নাসিরের মা’র অবস্থা। একমাত্র ছেলেকে ভূতে ধরেছে। না জানি কোন ক্ষতি করে দেয়। ভূতে কোন বিশ্বাস নাই। ভূত খুব খারাপ জিনিস। নাসিরের মা ভূতকে দুই চোখের কোনায়ও দেখতে পারেন না। ঘৃণাভরে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন।
এখন চৈত্রের গরমে সবাই ঘামছে। কিন্তু নাসির একটু বেশিই ঘামছে। তার চোখ দুইটা কট্টর লাল। যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে। কী যে ভয়ংকর এক চেহারা হয়েছে নাসিরের! ছেলের এই অবস্থা দেখে নাসিরের মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ওইদিকে নাসিরের ছোট চাচা ছিলেন সুযোগের অপেক্ষায়। ভাবীর কান্না দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে দেবরও কান্না শুরু করে দিলো। দেবরটা ভালোই, কিন্তু ভাবীর প্রতি একটু দুর্বল আরকি!
নাসিরের এসব নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। সে ভাবছে এই ফালতু ঝামেলাটা যত দ্রুত মিটে যায়, ততই মঙ্গল। অভিনয় খুব কষ্টের বিষয়। টানা এতক্ষণ অভিনয় করে সে হাঁপিয়ে উঠছে। কিন্তু তাকে যে আরো অনেকটা সময় অভিনয় করে যেতে হবে। কারণ ইমাম সাহেব নেই। কোন আত্মীয়ের বাড়িতে গেছেন, পরশু আসবেন।
নাসিরের বাপ চাচারো পড়লো বিপদে। এখন নাসিরকে কী করবে? সেতো যাকে পাবে তার পাছায় থাপ্পড় মারবে। মনে মনে ভূতকে নোংরা সব গালি দিচ্ছেন। নাসির বুঝতে পারছে তার বাবা ভূতকে গালি দিচ্ছে। সে চিৎকার করে বললো – খবরদার, গালি দিবি না। আর দিলেও এত নোংরা গালি না।
২.
রফিক মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে ঘরে দরজা বন্ধ করে রাখবেন। কিন্তু নাসিরের চাচা বললো এটা নিরাপদ না। ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে। তারচে ভালো পায়ে লোহার শিকল দিয়ে আটকে রাখা হোক। ভূত লোহা ভেঙ্গে যেতে পারবে না। এটা শুনে নাসিরের মা’তো পারলে দেবরের গলা ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি বললেন, কোনভাবেই তার ছেলেকে পাগলের মত পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা যাবে না। হুজুর আসা পর্যন্ত সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করবে।
বিকাল বেলা নাসির গেলো বাজারে। বাজারে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষ সব ভয়ে পালাচ্ছে। কেউই বেইজ্জতি হইতে চায় না। শুধু একজন মানুষ পালাচ্ছে না। যিনি ছোট বেলায় নাসিরকে পড়িয়েছেন। তার বিশ্বাস নাসিরের ভূত অন্তত তার শিক্ষককে অপমান করবে না। স্যার মানুষ, সাহস করে নাসিরের কাছে গেলেন। মাথায় হাত বুলালেন। জিজ্ঞাসা করলেন চা খাবে কিনা। কিন্তু নাসির কিছু কয় না। স্যার আবারো জিজ্ঞাসা করে, জুস খাবে কিনা, মিষ্টি খাবে কিনা। নাসির তাকিয়ে আছে স্যারের পাছার দিকে। স্যার সাহস করে বললেন –লুঙ্গিটা নতুন কিনেছি, সুন্দর না?
– সুন্দর। কিন্তু লুঙ্গির নিচে কী আছে স্যার?
– শর্ট প্যান্ট পরেছি। কারণ আমি শক্ত করে লুঙ্গি পরতে পারি না। যখন তখন খুলে যেতে পারে, এই ভয়ে।
– শর্ট প্যান্টের নিচে কী আছে স্যার?
এটা শুনে স্যার সত্যি সত্যি ভয় পেলেন। তিনি বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলেন। পাশ ঘুরে পা ফেলতেই নাসির দিলো থাপ্পড়। অবশ্য হালকাভাবেই দিয়েছে। শত হলেও স্যার মানুষ। স্যারকে থাপ্পড় দিতে নাসিরের মোটেও ভালো লাগেনি। কিন্তু কোনভাবেই প্ল্যানে ফাঁক রাখা যাবে না। পিতা পুত্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার কাছে স্যারের পাছা মূল্যহীন। একটাইতো থাপ্পড়, পরে মাফ চেয়ে নিলে হবে।
যাইহোক, স্যার অপমানিত হয়ে চলে গেলেন। ওইদিকে নাসিরের চাচা থেমে নেই। তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গিয়েছেন হুজুরের আত্মীয়ের বাড়িতে। হুজুরকে নিয়েই ফিরলেন। তারপর নাসিরের বাবা ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে গেলেন। উঠানে বসলেন হুজুরসহ। হুজুর আর নাসির মুখোমুখি। নাসিরের দুই পাশে তার দুই চাচা। দূরে মুখে আঁচল কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে নাসিরের মা। আশপাশের বাড়ির মানুষরা ভিঁড় জমিয়েছে। নাসিরের ভূত তাড়ানো দেখবে।
হুজুরতো সেইরকম ভাব নিয়ে বললেন – অনেক জরুরী কাজ ফেলে রেখেছি। কই, দেখি বলতো তোমার নাম কী?
– মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন কুয়াবাসী
– তুমি এখানে কেন এসেছো?
– এটা আমার জন্মস্থান। আমার পূর্বপুরুষরাও এই গ্রামের বাসিন্দা।
– নাসিরের উপর কেন আছর করেছো, সেতো খুব ভালো ছেলে।
– নাসির কুয়ার জলে প্রস্রাব করেছে তাই। বেয়াদব ছেলে প্রস্রাব করেছেতো করেছে, তাও আবার দাঁড়িয়ে। ওর বাপও বেয়াদব। ছেলেকে বসে প্রস্রাব করা শেখায়নি।
– তো, এখন তোমার প্ল্যান কী?
– ভালোইতো আছি, আবার কিসের প্ল্যান?
– না, তোমাকেতো ছেড়ে যেতে হবে, তাই না? এর আগেও তিনজন ভূত এইভাবে চলে গেছে। কোন জোর জবরদস্তি করা লাগেনি।
– না, আমি যাবো না।
– বুঝছি। আচ্ছা বলো, কত টাকা দিলে যাবে?
এটা শুনে নাসির মনে মনে বলে, শালারপুত দেখি আমার বাবার টাকার দিকে নজর দিয়েছে। কখনো শুনিনাই ভূত কারো কাছ থেকে টাকা নেয়। একটু ভেবে চিন্তে নাসির (ভূত) সিদ্ধান্ত জানালো।
– এক লাখ এক টাকা।
– এত টাকা হবে না। সর্বোচ্চ দশ হাজার এক টাকা দেয়া যাবে।
– দুই লাখ দুই টাকা।
– আচ্ছা বাদ দাও, বিশ হাজার এক টাকা দিবো।
– তিন লাখ তিন টাকা।
– এতো মহা মুশকিল! ঠিক আছে, এক লাখ এক টাকাই দিবো।
– চার লাখ চার টাকা।
হুজুর ভাবলেন ভালোই হলো, লাভতো তারই হবে। এই টাকাতো আর ভুতের কাছে যাবে না, হুজুরের কাছেই যাবে। নাসিরও ভাবছে ঘরে বাগান বিক্রি করা ক্যাশ টাকা আছে। চার লাখ টাকা তার বাবার জন্য এখন কোন ব্যাপারই না। যাইহোক, হুজুর রাজি হয়ে গেলেন। নাসিরের বাবাও চার লাখ চার টাকায় রাজি। ছেলের জন্য তিনি আরো কিছু করতে প্রস্তুত।
– আর কী চাস বল? কোরমা, পোলাও, খাসি, মোরগ?
এই প্রশ্ন শুনে নাসির ভাবলো হুজুর বড় সেয়ানা মাল। এই উসিলায় কোরমা পোলাও খাইতে চাইছে। কিন্তু নাসির যদি খেতে না চায়, তাহলে জনমনে সন্দেহ জাগতে পারে। নাসির সম্মতি দিলো।
– আর কিছু চাওয়ার আছে?
– আছে।
– কী, তাড়াতাড়ি বলো।
– আপনার পাছায় একটা থাপ্পড় মারবো। এটাই হবে আমার জীবনের শেষ থাপ্পড়।
হুজুরতো ভীষণ রাগ করলেন। এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তিনি একজন মসজিদের ইমাম। সারা গ্রামের মুসলমানরা তার পেছনে নামাজ পড়ে। এখন যদি নাসিরকে আছর করা ভূত হুজুরের পাছায় থাপ্পড় মারে, তাহলে নামাজে দাঁড়িয়ে সবাই হুজুরের পাছার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কী বাজে অবস্থাটাই না হবে। হুজুর মোটেও রাজি হননি। তিনি বললেন থাকুক ভূত, আমি পাছা বাঁচাই। কিন্তু হুজুর বললেইতো আর হবে না। নাসিরের বাপ চাচা ও বাড়ির লোকজন হুজুরকে ধরলেন। বুঝালেন। এবং বললেন থাপ্পড় মারার সময় কারো নজর এখানে থাকবে না। সবাই অন্য দিকে তাকিয়ে থাকবে।
– ঠিক আছে, থাপ্পড় মারতে পারবে। কিন্তু এখানে কেউ থাকবে না। শুধু আমি আর তুমি থাকবো।
– তিন থাপ্পড় মারবো।
– আহা, ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করো। আমি চাইলেই কিন্তু তোমারে বোতলে ভরে ফেলতে পারি। অযথা ঝামেলা করছো কেন?
– ছয় থাপ্পড়।
হুজুর আড়ালে গিয়ে নাসিরের বাবার সাথে কথা বললেন এবং বুঝালেন এটা সম্ভব না। অনেক অনুরোধের পর নাসিরের বাবা খোলাখুলি বললেন, তিনি যদি ভূতের হাতে পাছায় থাপ্পড় থেকে রাজি হন, তাহলে তাকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হবে। হুজুর তবুও আমতা আমতা করছেন। এরপর নাসিরের বাবা বললেন ৫০ হাজার দেয়া হবে। হুজুর মেনে নিয়ে ভূতের কাছে গেলেন।
– ঠিক আছে থাপ্পড় দাও।
– থাপ্পড়তো এখন দিবো বলিনি। কোরমা পোলাও খাওয়ার পর দিবো।
– আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু কোন ঝামেলা যেন না করো, চুক্তি অনুযায়ী সব করতে হবে। নইলে কিন্তু বোতলে ভরে ফেলবো।
– সেই বোতল দুনিয়াতে এখনো বানানো হয় নাই। নয় থাপ্পড়।
৩.
টাকা প্যাকেট হলো, পোলাও কোরমা রান্না হলো। খাবারগুলো টেবিলে সাজানো। হুজুর বললেন, এই খাবার সবাই খেতে পারবে না। শুধু হুজুর আর ভূত খাবে। এটা শুনে নাসির মনে মনে হাসে। খাউয়া মার্কা হুজুরের পোলাও কোরমার কী শখ! নাসির গর্জে উঠে বললো, “এই খাবার শুধু মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন কুয়াবাসী খাবে। আর কেউ নয়।“ হুজুরের মুখতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। যাইহোক, তিনি কোন দ্বিমত করেননি। ভূতের নামে নাসির বসে বসে খাচ্ছে। সবাই চারপাশে ভিঁড় করে আছে। ভূতের খাওয়া দেখছে। আর হুজুর সবাইকে এই গ্রামের ভূতের বিষয়টা বুঝিয়ে বলছে।
– এই গ্রামে ভূত মোট ২১ টা। এর আগে তিনটাকে তাড়ানো হয়েছে। এইটা সহ চারটা হবে। বাকি থাকবে আরো ১৭ টা। এখন এলাকাবাসীকে সাবধান থাকতে হবে। ডোবা, কুয়া, বেত বাগান আর বাঁশ বাগান এড়িয়ে চলতে হবে।
এটা শুনে নাসির ভাবলো হুজুরের কী লোভ! আরো ১৭ বার ভূত তাড়াবেন আর পোলাও কোরমা খাবেন! মনে মনে বলছে, তোর কোরমা পোলাওতে ছাই ঢালছি, দাঁড়া।
– ভূতের সংখ্যা সঠিক নয়। গত বিশ বছর ধরে এই গ্রামে শুধু আমিই ছিলাম। আর কোন ভূত নেই। আমিও থাকতাম না, অভিশাপ দিয়ে ফেলে চলে গেছে। গত বিশ বছর ধরে আমি নাসিরদের ওই কুয়াতে বন্দী ছিলাম। নাসির যখন দাঁড়িয়ে কুয়ার মাঝে প্রস্রাব করছিলো, আমি তার প্রস্ত্রাবের লাইন ধরে উঠে আসি। আমি চলে যাওয়ার পর এই গ্রামে আর কখনো ভূত আসবে না।
হুজুরের মুখে কোন কথা নাই। কিন্তু চারপাশের মানুষের মুখে অনেক কথা। সবাই খুশি। নিজেদের গ্রামকে বাংলাদেশের একমাত্র ভূতমুক্ত গ্রাম ঘোষনার প্রস্তাবও এসেছে। সবার মনে ভূতের ভয়হীন বসবাসের আনন্দ, কিন্তু হুজুরের মুখ কালো। চোখের সামনে টেবিলে এত মজার সব খাবার, ছুঁয়েও দেখতে পারলেন না। এখন আবার আজীবনের জন্য ভূত তাড়ানোর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অবশেষে নাসিরের খাওয়া শেষ। ততক্ষণে এশার ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আজান দিয়ে নাসিরদের উঠোনেই সবাই নামাজ পড়ে নিলো। নামাজ শেষে ভূত তাড়ানোর পালা। ভূতকে জিজ্ঞাসা করা হলো সে কিভাবে যাবে। ভূত বললো, টাকা বুঝে পাওয়ার পর নাসিরদের বাড়ি থেকে উত্তর দিকে খালের উপর যে কালভার্টটা আছে, তার পাশে একটা বাঁশঝাড় আছে, সেই বাঁশঝাড়ের সামনে গিয়ে ভুত চলে যাবে। তার সাথে আর কেউ থাকতে পারবে না, শুধু হুজুর থাকবে। কারণ ভূত চলে যাওয়ার পর নাসির জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে। হুজুর নাসিরকে ধরবে। ভূত আবারো মনে করিয়ে দিলো, তার সাথে শুধু হুজুর যাবে। অন্য কেউ যাওয়ার চেষ্টা করলে হুজুরের ঘাড় মটকে দিবে।
উপস্থিত মানুষের মধ্য থেকে একজন জানতে চাইলো হুজুরের পাছায় থাপ্পড় মারবে কখন? ভূত বললো গায়েব হওয়ার একটু আগে। তো, তারপর ভূতের (নাসিরের) হাতে ৪ লাখ ৪ টাকা তুলে দেয়া হলো। সবাই উঠোনে রয়ে গেলো, শুধু নাসির আর হুজুর কালভার্টের দিকে রওনা দিলেন। এদিকে হুজুরের আর কোন আশা রইলো না। খাবারও পেলেন না, টাকাও না। কপালে শুধু থাপ্পড়টাই রইলো।
বাড়ির দরজা পেরিয়ে রাস্তায়। পাশাপাশি হাঁটছে দু’জন। অন্ধকার। কারো মুখে কোন কথা নাই। নিরবতা ভাঙলো নাসির।
– হুজুর, এভাবে আর কত?
হুজুর কিছু কয় না। চুপ মেরে আছে।
– এই গ্রামে এখনো ১৭টা ভূত আছে, তাই না? আচ্ছা বলেনতো, মানুষের সাথে এসব প্রতারণা করলে গুনাহ হয় না?
– দেখো, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর সেজো মেয়েটার বিয়ে। জামাই পক্ষকে ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দিতে হবে। তাই আমি ভেবেছি তোমার যাই হোক না কেন, আমি যেন টাকাটা পাই। এই জন্য নতুন তৃতীয় স্ত্রীর সাথে রাত কাটানোর লোভ সামলে তোমার ভূত তাড়াতে চলে এসেছি। এখন তুমিতো সব মাটি করে দিলা।
– আমিতো জানতাম আপনার এক স্ত্রী। এখন শুনি তিন স্ত্রী। গোপন রাখলেন কেন?
– এখনকার মুসলমানরা বহুবিবাহ ভালো চোখে দেখে না। যদিও ৪ বিয়ে পর্যন্ত করার অধিকার আমার আছে। তাছাড়া এটা খারাপ কী, আমিতো আর দাসী রাখছি না। বিয়ে করে নিচ্ছি।
– ভালোই। এখন কালভার্টতো এসে পড়লো। পাছায় থাপ্পড় খাওয়ার জন্য রেডিতো?
– দেখো, আসল কাহিনী আমিও জানি, তুমিও জানো। তাহলে হুদাই পাছায় থাপ্পড় মারবে কেন?! বাদ দাও না এসব।
– আপনার পাছাটা ভারী সুন্দর, হৃষ্টপুষ্ট। কিন্তু হুজুর, আমি বুঝি না বেশিরভাগ হুজুর এত স্বাস্থ্যবান হয় কিভাবে? আপনাদেরতো এত বেশি আয়ও নেই, খেতেও পারেন না ভালো। এটা বুঝি আল্লাহর রহমত?
– বাদ দাও না। আমারে টাকাগুলো দিয়ে তুমি অজ্ঞান হয়ে যাও। টাকাগুলো বাশঝাড়ে লুকিয়ে রেখে তোমারে কোলে করে ঘরে দিয়ে আসবো। পরে এসে টাকার প্যাকেট নিয়ে যাবো।
– কিন্তু এত হৃষ্টপুষ্ট পাছায় কয়টা থাপ্পড় মারতে না পারলে, পুরা মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে। প্লীজ কালভার্টের উপর উপুর হয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি থাপ্পড়গুলো দিয়ে নিই। বাবাতো বলছেই আপনাকে ৫০ হাজার টাকা দিবে। সমস্যা কী?
একরকম জোর করে হুজুরকে কালভার্টের উপর শুইয়ে পাছায় কষে নয়টা থাপ্পড় মারলো নাসির। আর মৃদু স্বরে বলছে, “ভূত তাড়াচ্ছি” “ভূত তাড়াচ্ছি।“ তারপর বললো ৪ লাখ ৪ টাকা তারই থাকবে। আর হুজুর পাবে তার বাবার কাছ থেকে থাপ্পড় বাবদ ৫০ হাজার টাকা।
৪.
নাসিরকে কাঁধে তুলে নিলেন হুজুর। বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। হুজুরের কাঁধে শুয়ে নাসির মুখ চেপে ধরে হাসছে। হাসির ধাক্কায় হুজুরের পা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পায়ের কদমে ভুল হচ্ছে। ভারসাম্য রাখা মুশকিল।
ওইদিকে মুখ চেপে ধরে হাসির আড়ালে নাসির ভাবছে সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবার সাথে প্রথম কথাটা কী বলবে, আর আচরণইবা কেমন করবে। এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো জীবনে কখনো কারো পাছায় থাপ্পড় মারবে না।
[গল্পটি কোন সত্য ঘটনা অবলম্বনে নয়। আবার রূপকও নয়। এটা একটি গল্প। এমনিএমনি গল্প।]

নিহত ব্লগারদের লেখা খতিয়ে দেখে যেভাবে তদন্ত হয়

লিখেছেন
“ব্লগার হত্যা জাতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ব্লগার হত্যা এমন একটা বিষয়, যার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা কোনভাবেই ব্লগার হত্যা এড়িয়ে যেতে পারি না। ব্লগার হত্যা এড়িয়ে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়, এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যদি এগিয়ে যেতে চান, তাহলে ব্লগার হত্যার ঘটনা এড়িয়ে যাবেন না। সুতরাং এটা প্রমাণিত যে, ব্লগার হত্যা মোটেও অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমি বলতে চাই, পুলিশ বাহিনী এসব ব্লগার হত্যার রহস্যের উন্মোচন করতে প্রাণবাজি রাখবে। হত্যার পরিকল্পনাকারীকে গ্রেফতার করতে জানবাজি রাখবে। হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া খুনীদের ধরতে প্রাণবাজি রাখবে। তোমরা যেসব পুলিশ সদস্য প্রাণবাজি রাখতে অপারগতা জানাবে, বুঝতে হবে তাদের প্রাণের কোন মূল্য নাই, গুরুত্ব নাই। তাই নিজের প্রাণের মূল্য প্রমাণ করতে পুলিশ বাহিনীকে ব্লগার হত্যার তদন্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।“
– আবারো ব্লগার খুন হওয়া প্রেক্ষিতে ডাকা জরুরী বৈঠকে প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন পুলিশের আইজি।
এরপর তিনি উপস্থিত অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তদন্তের বিষয়ে আইডিয়া চাইলেন। আইজিপি বললেন, “একটি সফল তদন্তের জন্য সবার আগে প্রয়োজন ফাটাফাটি আইডিয়া। ফাটাফাটি আইডিয়া একটি সফল তদন্তের ভিত গড়ে দেয়। ফাটাফাটি আইডিয়া ছাড়া একটি তদন্ত সফল হয়ে উঠে না। আমরা একটি সফল তদন্তের জন্য ফাটাফাটি আইডিয়া চাই। এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তারা সবাই একটি করে ফাটাফাটি আইডিয়া দেন। আমরা সবগুলো ফাটাফাটি আইডিয়ার সমন্বয় করে একটি সুপার ফাটাফাটি আইডিয়া বের করে নিবো।“
উপস্থিত সবাই তাদের আইডিয়াগুলো বলতে থাকলেন।
এডিশনাল আইজিপিঃ
স্যার, আমার মনে হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টীমের বড়হুজুর রাহমানিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসতে পারে মূল ঘটনা।
ডিএমপি কমিশনারঃ
পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই টিকটিকি আছে। এই মুহূর্তে যেটা দরকার, সেটা হচ্ছে বাহিনীর মধ্যে ফাঁদ পাতা। এই ফাঁদে টিকটিকি ধরা পড়বেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, টিকটিকি ধরার জন্য ইঁদুর ধরার কল বসালে লবে না। টিকটিকির কলই বসাতে হবে।
যুগ্ম কমিশনার, ডিবিঃ
এসব কলে টলে হবে না। ব্লগার হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত যারা জামিনে আছে, তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিলে কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে। আমরা সেইসব ক্লু ধরে এগিয়ে গেলে হত্যায় অংশ নেয়াদের শনাক্ত করতে পারবো।
ডিসি ওয়ারী জোনঃ
স্যার, আমার মনে হয় ওলামালীগ নেতাদের ফোনে আড়ি পাতলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
ওসি, সূত্রাপুর থানাঃ
ওলামালীগ নয়। আড়ি পাততে হবে হেফাজত নেতাদের ফোনে। আমি মনে করি এটাতে কিছু ফল পাওয়া যেতে পারে।
এডিশনাল ডিআইজিপিঃ
ওলামা লীগ আর হেফাজততো খুব সহজ সন্দেহ। একটু ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। সরকারের কতিপয় বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীর সাথে জঙ্গী কানেকশন আছে। তাদের প্রতি নজর রাখলেও কিছু একটা পাওয়া যেতে পারে।
ডিআইজিপিঃ
কথাতো অনেক বলা যায়। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাই, সেটা হলো এই তদন্তটাও আগের তদন্তগুলোর মতো যেনতেনভাবে শেষ করে দিই। কিন্তু ভবিষ্যতে যেন খুন ঠেকাতে না পারলেও খুনীদের ধরতে পারি, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে পারি। কিন্তু ঢাকা শহর এখনো পুরোপুরি সিসিটিভির আওতায় আসেনি। কিন্তু এক মাসের মধ্যে পুরো শহরকে সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
এএসপিঃ
আমি এই ভেবে অবাক হচ্ছি যে, কেউই দেখি তদন্তের কলাকৌশল নিয়ে কথা বলছে না। সবাই শুধু সস্তামার্কা বিপ্লবের থিওরি দিয়ে যাচ্ছে। আমরাতো আগে তদন্ত করতে হবে, পরে না খুনী ধরবো। আমাদেরকে যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে কতগুলো সূত্র ধরে এগুতে হবে। এর সব সূত্রই আমাদের জানা আছে। এটা নিশ্চিতভাবেই ইসলামী জঙ্গীদের কাজ। দুইজন জঙ্গীপোষককে ফেলে দিয়ে তৃতীজনের কাছে গেলেই সুরসুর করে পুরো ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
এএসআই মতিনঃ
কিন্তু আমাদেরতো আগে জানতে হবে তাকে কেন খুন করা হয়েছে। সে কী এমন লিখতো, যার কারণে তাকে খুন করতে হবে। আরো জানতে হবে সে কি কারো অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লিখতো? লিখলে কাকে আঘাত দিয়ে লিখতো? আসলে তদন্তের একমাত্র মোটিভ হতে হবে নিহত ব্লগারের লেখালেখি খতিয়ে দেখা। সে কী লিখতো, এটা যদি বুঝতে না পারি, তাহলে আমরা কখনো কাউকে বলতে পারবো না তাকে আসলে কেন খুন করা হয়েছে।
টেবিল চাপড়ানোর আওয়াজ, ধুম করে শব্দ হলো। শব্দ শুনে সবাই আইজিপির দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনি বললেন, “ফাটাফাটি! ফাটাফাটি আইডিয়া!! লেখালেখি খতিয়ে দেখার আইডিয়াটাই ফাটাফাটি। অত্যন্ত ফাটাফাটি। আমাদের প্রত্যেকের উচিত যেসব ব্লগার মরে যাচ্ছে, তাদের লেখালেখি খতিয়ে দেখা। এটা খুবই জরুরী একটা ব্যাপার। লেখালেখি খতিয়ে দেখতেই হবে। আসলে লেখালেখি খতিয়ে দেখা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।“
উপস্থিত সবাই সম্মতি জানালেন। একজন বললেন, সেক্ষেত্রে এই বৈঠকে বসেই লেখালেখি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এবং এই মিটিংয়ে বসেই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ফেলা যায়।
আরেকজন বললেন কম্পিউটার অপারেটরকে এই বৈঠকে ডেকে আনতে। লেখা খতিয়ে যা যা পাওয়া যাবে, সে সাথে সাথে লিখে ফেলবে। তাহলে দ্রুততার সাথে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা যাবে।
যে ভদ্রলোক দুইজন জঙ্গীপোষককে মেরে ফেলার আইডিয়া দিয়েছেন, তিনি বললেন পুলিশ বাহিনীর সামনে একাধিক বিশ্বরেকর্ডের রেকর্ডের হাতছানি আছে। প্রথমত দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির রেকর্ড, দ্বিতীয়ত মাঠে না গিয়ে একই স্থানে বসে থেকে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির রেকর্ড, তৃতীয়ত একটি টেবিলে বসে থেকে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির রেকর্ড। আমরা এমন কিছু রেকর্ড অর্জন করতে পারবো, যা পৃথিবীর কোন পুলিশ বাহিনী করতে পারেনি। এটা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয় হবে।
লেখা খতিয়ে দেখার জন্য একজন ফেসবুক এক্সপার্ট এবং খতিয়ে দেখার পর ক্লুগুলো লেখার জন্য একজন টাইপরাইরাট প্রস্তুত। গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধানের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা খতিয়ে দেখা শুরু হলো।
ফেসবুক এক্সপার্টঃ
স্যার শুরুতেই একটা ক্লু পাওয়া গেলো। নিহত লেখকের নাম দেখে বুঝা যাচ্ছে সে একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার নামের আগে মুহম্মদ লাগানো নেই।
আইজিপিঃ
কী নাম লেখা আছে?
এক্সপার্টঃ
নাজিমুদ্দিন সামাদ।
আইজিপিঃ
হোয়াট ডু য়্যু মীন বাই নাজিমুদ্দিন সামাদ? ইজ ইট নাজিম উদদীন সামাদ?
এক্সপার্টঃ
না স্যার, এই যে প্রজেকশনে দেখুন।
ডিএমপি কমিশনারঃ
যা ভেবেছি তাই। এটাতো স্যার পুরাই একটা অনুভূতি কেইস। ভেরি স্যাড!
আইজিপিঃ
টাইপরাইটার লিখো, যেহেতু তার নামের আগে মুহম্মদ নাই এবং নামের বানান বিকৃত করেছে, সেহেতু খুনের ঘটনাটি সন্ধ্যায় ঘটেছে। এক্সপার্ট, তারপর খতিয়ে দেখো।
ডিআইজিপিঃ
স্যার, আমি একটা কথা বলবো। এই বৈঠকে, আই মীন এই টেবিলে বসে থাকাদের মাঝে অন্তত দুই জনের নামের আগে মুহম্মদ নেই। এটা স্যার পুলিশ বাহিনীর জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। আজ সাধারণ মানুষ যে পুলিশকে দুই চোখে দেখতে পারে না, তা এসব পাপিষ্ঠদের পাপের ফসল। মুসলমান হয়েছে, অথচ নামের আগে মুহম্মদ নেই। আমারতো সন্দেহ হয় এদেরকে মুসলমানি করানো হয়েছে কিনা।
এক্সপার্টঃ
মুহম্মদ নাজিম উদদীন সামাদের একটি কভার ফটোতে মানবজাতির উদ্ভব বিষয়ে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মীয় মতবাদের তুলনা করে দেখানো হয়েছে ধর্মীয় মতবাদ ভুয়া।
আইজিপিঃ
ওহ মাই আল্লাহ! সত্যি সে এটা করেছে! আনবিলিভেবল!! ৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশে বসবাস করে কভার ফটোতে মানুষ এসব কিভাবে শো করে! এটা পরিষ্কার কুফরী কাজ। টাইপরাইটার, তাহলে এর দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে যখন এই কাফিরকে খুন করা হয়, তখন সে রাস্তায় হাঁটছিলো। তারপর…
এক্সপার্টঃ
আরেকটি কভার ফটোতে সে নাস্তিক অভিজিৎ রায় এর ছবি ব্যবহার করেছে।
যুগ্ম কমিশনার ডিবিঃ
স্যার, একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে আমার অবজারর্ভেশন বলে এই খুনের পরিকল্পনা নিহত ব্লগার নিজেই করেছে। আপনি দেখুন স্যার, একজন নাস্তিকের ছবি কভার ফটোতে ঝুলানোর মানে হচ্ছে মুহম্মদ নাজিম উদদীন সামাদ নিজেকে নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। আমরা যদি এটাকে অনুবাদ করি, তাহলে যেটা পাই সেটা হলো, “আমি নাস্তিক, এসো আমাকে খুন করো।“
আইজিপিঃ
দারুণ বলেছো তুমি। টাইপরাইটার, স্পষ্ট করে লিখো খুনের পরিকল্পনাকারী নিহত নাস্তিক নিজেই।
এক্সপার্টঃ
এই নাস্তিকের ওয়ালে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে সে উদাম গায়ে মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। বুকে আর পেটের উপর লেখা রাজাকার নিপাত যাক। এই যে স্যার, প্রজেকশনে বড় করে দেখুন।
ডিসি, ওয়ারী জোনঃ
নাউজুবিল্লাহ! স্যার, উদাম গায়ে জাতীয় পতাকা মাথায় বাঁধা জারাজার গুনাহ। তাছাড়া পতাকা ব্যবহারের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী আছে। এটা স্যার কখনোই মাথায় বাঁধা যাবে না। এই নাস্তিক যা করেছে তা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। সে রাষ্ট্রের নিশানার অপমান করেছে।
আইজিপিঃ
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। নোট ইট। এক্ষেত্রে লিখতে হবে, নিহত নাস্তিক একই সাথে পুলিশকে আহবান করেছে তাকে গ্রেফতার করতে এবং পিটিয়ে পাছার ছাল তুলে ফেলতে। ভাগ্য ভালো সে মরে গেছে। জীবিত থাকলে এখন পুলিশ তার এই আহবানে সাড়া দিতো। স্টুপিড কোথাকার।
এক্সপার্টঃ
খতিয়ে দেখার এই অবস্থায় এসে দেখা যাচ্ছে এই নাস্তিক মরার পর তার ফেসবুক ওয়ালজুড়ে শত শত নাস্তিকদের পোস্ট। সবাই বিচার চাইছে। অনেকে কান্নাকাটি করছে।
আইজিপিঃ
এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এক নাস্তিকের জন্য অপর নাস্তিকের টান থাকবে। যেমন পুলিশের জন্য পুলিশের টান আছে। তো, এই টান বিশ্লেষণ করলে যেটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে নাস্তিকটি আগে থেকে জানতো তাকে খুন করা হবে। কারণ সে নিজেই পরিকল্পনা করেছিলো। আর যেহেতু তার মৃত্যুর পর একাধিক নাস্তিক কান্নাকাটি করছে, সেহেতু হত্যাকান্ডে একাধিক খুনী অংশ নিয়েছে। এটা মোটেও একজন খুনীর কাজ নয়।
এক্সপার্টঃ
মৃত্যুর ২৪ ঘন্টা আগে দেয়া একটা পোস্টে দেখা যাচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করেছে এবং সরকারকে জনরোষের হুমকী দেখিয়েছে। বলেছে সরকার নাকি রেহাই পাবে না।
আইজিপিঃ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা! মানে নাস্তিকের বাচ্চা পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দিয়েছে। ব্লাডি নাস্তিক! আর সরকারকে হুমকী? মানে রাষ্ট্রকে হুমকী! মাথায় পতাকা বেঁধেই ক্ষান্ত হয়নি, আবার রাষ্ট্রকেও হুমকী দেয়। এখন আমরা যদি এই দুইটা বিষয়ে আলোকপাত করি, তাহলে দেখতে পাই যে, চাপাতির আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। এবং সেটা একজনের চাপাতির আঘাতে নয়। একাধিক ব্যক্তির চাপাতির আঘাতে।
এক্সপার্টঃ
তার ওয়ালে অন্য একজনের পোস্ট করা একটা স্ক্রীণশটে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারি মাসে তার দেয়া এক পোস্টে বলেছে যারা শতভাগ ধর্ম মানতে চায়, তারা জঙ্গী। আর এই টেবিলে যারা আছি, মানে আমাদের মত যারা আংশিক ধর্ম মানি, তারা মডারেট। সে আরো বলেছে, আমরা, মানে মডারেটরা আছি বলেই ধর্ম এখনো বিশ্বমানবতার প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়নি।
আইজিপিঃ
যাক বাবা, সে পুলিশকে জঙ্গী বলেনি, মডারেট বলছে। এবং বাংলাদেশ পুলিশের কারণে ধর্ম এখনো বিশ্বমানবতার প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কী দারুণ কমপ্লিমেন্ট! ভেরি ওয়েল সেইড। তো, এবার বোধহয় আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদঘাটন করতে পেরেছি। এই নাস্তিককে মারার সময় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও হয়েছে। অর্থাৎ চাপাতি দিয়ে কোপানোর পর তাকে গুলিও করা হয়েছে। এখানে ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট হলো, এর আগে কোন নাস্তিককে হত্যার সময় গুলি করা হয়নি। এটা কিন্তু ঘটনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্ট।
এক্সপার্টঃ
স্যার, খতিয়ে দেখতে দেখতে এবারতো ভয়ংকর একটা জিনিস পেলাম। মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষার বিরোধিতা করেছে এই বদমাশ। সে বলেছে এর মাধ্যমে নাকি জঙ্গী উৎপাদন হবে।
আইজিপিঃ
উফ! আমি আর নিতে পারছি না। এসব কিছু আমার সহ্য ক্ষমতার বাইরে। এটা বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই না। টাইপরাইটার লিখো, যেহেতু নাস্তিকটা মসজিদ নিয়ে আকথা কুকথা লিখেছে, সেহেতু বুঝাই যাচ্ছে খুন করার সময় খুনীরা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে ঘটনাস্থল মুখরিত করে রেখেছিলো। এই লাইন লেখার পর সুবহানাল্লাহ লিখে বোল্ড আর ইটালিক করে দিও।
এক্সপার্টঃ
স্যারগো, এবার যা দেখলাম, তা বলার মতো সাহস আমার নাই। হারামজাদা তনু হত্যা নিয়ে খুব সেনসেটিভ মন্তব্য করেছে। এবং সারা দেশের মানুষকে কুমিল্লা গিয়ে ঝাঁকুনি দিতে বলেছে। স্যার, তনু হত্যা যেহেতু সেনানিবাসে হয়েছে, সেহেতু সে আসলে সেনানিবাসে ঝাঁকুনি দিতে বলেছে। কতটা সেনসেটিভ ইস্যু, আপনি খেয়াল করেছেন?
এসআই মতিনঃ
শেষপর্যন্ত আমাদের গর্বের সেনাবাহিনীকে ঝাঁকুনি দিতে বলে নাস্তিক **** পুত এই দেশের জনগণের সেনানুনুভূতিতে আঘাত করেছে। কী নোংরা একটা নাস্তিক! থু!!
আইজিপিঃ
খুবই হতাশাজনক বিষয়। এটা সে কিভাবে করলো! কিভাবে সে সেনাবাহিনী নিয়ে এরকম আচরণ করতে পারলো? এটাতো দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। খুব করুণা হচ্ছে এই অপদার্থ রাস্কেল নাস্তিকটার জন্য। যাইহোক, তার এসব স্পর্ধা ধারা প্রমাণিত হয়, খুন হওয়ার পর তার লাশ রাস্তায় পড়েছিলো, মিরপুর স্টেডিয়ামে কিংবা চন্দ্রিমা উদ্যানে নয়। অর্থাৎ এটা নিয়ে কোন বিভ্রান্তির অবকাশ নেই।
ওসি, সূত্রাপুর থানাঃ
কিন্তু এক্সপার্ট, তুমি যেভাবে চুলচেরা খতিয়ে দেখছো, তাতেতো আমাদের বিশ্বরেকর্ডের বিষয়টা হুমকীর মুখে চলে যাচ্ছে। যতদ্রুত খতিয়ে দেখা শেষ করবে, ততদ্রুত তদন্ত শেষ হবে, তারচে অধিক দ্রুত আমাদের বিশ্বরেকর্ড হয়ে যাবে। শুনো, এরকম চান্স বারবার আসে না। তুমি একটু দ্রুত হাত চালাও।
এক্সপার্টঃ
চিন্তা করবেন না ওসি সাহেব। আমি খতিয়ে দেখার একেবারে শেষ পর্যায়ে। শেষ পর্যায়ে এসে একটি হৃদয় বিদারক বিষয় উল্লেখ করবো। আমি জানি এটা বলার পর এখানে অত্যন্ত আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমি দুঃখিত, অত্যন্ত দুঃখিত। কিছু করার নাই। এই নাস্তিকের প্রোফাইল ফটোতে দেখা যাচ্ছে তার গায়ে মুজিব কোট। আরো দুঃখের বিষয় হচ্ছে ঘৃনিত এই নাস্তিক বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ সিলেট শাখার তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক। এই পর্যায়ে আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। আমায় আপনারা ক্ষমা করুন। জীবনে এই প্রথম টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে কান্না করছি। আমি লজ্জিত।
আইজিপিঃ
এখানে লজ্জার কিছু নাই এক্সপার্ট। তুমি যা বললে, তা শুনে এখানে উপস্থিত সবারই কমবেশি কান্না পাচ্ছে। কিন্তু আমার পাচ্ছে না। আমি আসলে অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছি। বিশ্বাস করতে পারছি না এই ছেলে আওয়ামীলীগের কর্মী। কী বলবো বুঝতে পারছি না। আমার আর কীইবা বলার আছে। আওয়ামীলীগে এইভাবে নাস্তিক ঢুকে যাচ্ছে, অথচ ঠেকানোর কোন উপায় নেই। একটি আওয়ামীলীগ ধ্বংস করার জন্য একফোটা নাস্তিকই যথেষ্ট। সেই জায়গায় পুরো একপিস নাস্তিক! আওয়ামীলীগকে বুঝি আর টেকানো গেলো না। জনগণের আশা আকাংখার প্রতীক, মাটি ও মানুষের প্রাণের দল, মুসলিম জাহানের অংহকার, মদীনা সনদের পতাকাবাহী আওয়ামীলীগ এভাবে হারিয়ে যাবে!
ডিআইজিপিঃ
স্যার, তদন্ত প্রতিবেদনে এটা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, দলে নাস্তিকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের আরো কঠোর ও বিচক্ষণ হতে হবে। নইলে আওয়ামীলীগের গৌরব ধুলিস্মাৎ হয়ে যাবে। ডজন ডজন নাস্তিক হত্যা করেও তা ফিরে পাওয়া যাবে না।
আইজিপিঃ
যাইহোক তদন্তের বিষয়ে আসি। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। এটা আনপ্রেডিক্টেবল ছিলো। তদন্তের বিষয়টাকে যত সহজ ও সরল ভেবেছি, ততটাই দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। গন্ডমূর্খটা যেসব লিখেছে, তা পড়ার পর মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। আপনাদেরকে কিভাবে বুঝাই, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে এই পোশাক খুলে চাপাতি হাতে দ্বীনের পথে বেরিয়ে যাই। থাক, তদন্তে ফিরে যাই। এখানে নিহত নাস্তিকের গায়ে মুজিব কোট থাকার মানে হচ্ছে চাপাতি দিয়ে কোপানোর পর আবার গুলি করে মারার বিষয়টি দুঃখজনক। আর আওয়ামীলীগের সহযোগী সংগঠনের সংগঠক হওয়ার মানে হচ্ছে, তার এসব লেখালেখি করা ঠিক হয়নি। তো, আমরাতো তদন্ত প্রতিবেদনের সবকিছু বের করলাম, এবার দরকার উপসংহারের জন্য দুইটা লাইন। এটা হতে পারে “ব্লগার খুন একটি অপরাধ। আর মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখালেখি করা এক্সট্রিমলি গর্হিত অপরাধ।“
ডিএমপি কমিশনারঃ
তারপরও আমরা যদি কয়েকজন জঙ্গীর সাথে কথা বলে তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে এড করি, তাহলে ভালো হতো না?
আইজিপিঃ
স্যরি কমিশনার, আপনার আইডিয়াটা রাখতে পারলাম না। জঙ্গীদের বক্তব্য নিতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। বিশ্বরেকর্ড হবে না। তদন্ত এখানেই শেষ। এবার ঘড়ি দেখে বলুন, তদন্ত শেষ করতে ঠিক কত মিনিট সময় লেগেছে। তারপর গিনেস বুককে ফোন লাগান।
লেখা খতিয়ে দেখা শেষ, মদীনা সনদের বাংলাদেশ।

ঈশ্বর আমার মৃত্যু কামনা করেন

লিখেছেন
যার যার ঈশ্বর দেখতে তার তার পূর্ব পুরুষদের মতন। ঈশ্বরের চেহারায় পূর্ব পুরুষদের ছাপ থাকে। গতরাতে আমার ঘুম আসছিলো না। এমনিতে ঘুম না এলে স্বপ্ন আসে। এদিন স্বপ্ন আসেনি, তাই তিনি এলেন। তিনি বললেন, দেখো, আমার চেহারায় তোমার বাবা ও দাদার ছাপ আছে। আমিই তোমার ঈশ্বর।
নিজেকে আধুনিক ঈশ্বর বলে দাবি করেন এবং বলেন, তিনি আসবেন তাই আমার ঘুম আসেনি। আমি নাকি তার জন্য অপেক্ষা করছি। এ কথা শুনে কিছুক্ষণ হাসলাম। তিনিও হাসলেন।
ঈশ্বর এলেন মৃত্যুর দাবি নিয়ে। তিনি চান আমি যেন স্ব-ইচ্ছায় মৃত্যুবরন করি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে, আমার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ এনেছেন এবং বলেছেন এসব মেনে নিতে। ঈশ্বর যখন অভিযোগসমূহ বলছিলেন, তখন তাকে খুব রাগান্বিত দেখিয়েছে। বেশ ক্ষুব্ধতার সাথে তার অভিযোগ বললেন।
-গত বর্ষায় বৃষ্টির দিনে তোমার বাসার বাম পাশের গলির মুখে যমদূত পাঠিয়েছিলাম। কথা ছিলো তুমি খুন হবে এবং বৃষ্টির জলধারা রক্তে লাল হয়ে নেমে পড়বে ওয়াসার ড্রেনে। কিন্তু তুমি গেলে ডান পাশের গলি দিয়ে এক সুন্দরী নারীর ছাতা ভাগাভাগি করে।
-দুঃখিত। বিষয়টা আমি জানতাম না।
– তার কিছুদিন পর অফিসের পাশে আন্ডারপাসের সিঁড়িতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার কথা ছিলো। যেখানে সিঁড়ি শেষ, সেখানে সামান্য জল জমে থাকবে আর তোমার রক্ত সিঁড়ি বেয়ে সেই জলে মিশে যাবে। অথচ তুমি সেদিন অফিসেই গেলে না। বাসায়ও ছিলে না।
– আপনার এই পরিকল্পনার কথাও আমার অজানা ছিলো।
– পরের সপ্তাহের একদিন রাত বারোটায় তোমার সিগারেট শেষ হয়ে গেলে সিগারেট কিনতে বের হবে। ওঁৎ পেতে থাকা যমদূত তোমার প্রাণ নিয়ে আমার কাছে ফিরে আসবে। এই দেখো, ঠিক এরকমই লেখা আছে তোমার প্ল্যান বুকে। সিগারেট ঠিকই শেষ হয়েছে। কিন্তু সিগারেট কিনতে বের হয়েছিলো তোমার বন্ধুর গাড়ির ড্রাইভার। এবং সেটা তোমার বন্ধুর বাসায়। মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বৌ বাচ্চাকে ঘরে একা রেখে বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলে মদ খেতে, আড্ডা দিতে। যমদূত দেখেছে তোমার স্ত্রী ভয়ে সারা রাত ঘরে আলো জ্বেলে রেখেছিলো। অথচ তোমার কোন লজ্জা হয়নি।
-বন্ধুর বাসায় গিয়ে মদ খাওয়া এবং আড্ডা দেয়ার বিষয়ে আমার স্ত্রীর কোন অভিযোগ ছিলো না। সে আলো ভালোবাসে, তাই আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলো। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের পরিবারের সবাই অন্ধকারে অনভ্যস্ত।
ঈশ্বর বললেন, আমাদের পারিবারিক বিষয়ে তার কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু আমি যা করেছি, কিছুই তার পরিকল্পনায় ছিলো না। আমি নিজ পরিকল্পনায় চলছি এবং আইন অনুযায়ী একজন বিদ্রোহী। কিন্তু যেহেতু নিজস্ব পরিকল্পনায় চলার যোগ্যতা অর্জন করেছি, সেহেতু যোগ্যতার মর্যাদাস্বরূপ কোন শাস্তি পেতে হবে না। শুধু তার পরিকল্পনা মতে মৃত্যুকে বরন করে নিলেই তিনি খুশি।
খুব জোরশব্দে হাসার চেষ্টা করলাম। পেরেছিও। এমন উচ্চস্বরে খুব টান টান দম নিয়ে এর আগে কখনো হাসিনি। আমি জানি কারো হাসির শব্দ দূর থেকে মনযোগ দিয়ে শুনলে খুব বিশ্রী লাগে। অস্বস্তিকর। হাসি থামিয়ে জানতে চাইলাম আমাকে কেন এভাবে পথে ঘাটে মরে থাকতে হবে এবং আমার রক্ত কেন উচ্ছিষ্ট জলে গিয়ে মিশবে? এমন অপ্রচলিত মৃত্যুর কারণ কী?
ইশ্বর ভরাট গলায় বললেন, তোমার দেশের বেশিরভাগ মানুষ এরকম মৃত্যু পছন্দ করে। তাছাড়া তোমার বন্ধুদের মধ্যে যারা এর আগে এভাবে মারা গেছে, তাদের মৃত্যু দেশের অধিকাংশ মানুষকে আহত করেনি। অর্থাৎ তোমাদের জন্য এটাই প্রচলিত মৃত্যু।
– কিন্তু বিষয়টাতো আমার উপর নির্ভর করছে। এভাবে মারা যাওয়া আমার পছন্দ নয়। আমি আরো সম্ভ্রান্ত মৃত্যু চাই।
– শোনো, তোমার দেশে এখন একপক্ষ মরছে, আরেকপক্ষ মারছে। এরা সংখ্যায় কম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এসব মৃত্যুর জন্য যারা মরছে তাদেরকে দোষ দিচ্ছে। তোমার উচিত জনমতকে শ্রদ্ধা জানানো। আমি চাই তুমি আরো গণতান্ত্রিক হও।
– এসব কথা আপনার মত করে বলছেন। মানুষের মত পরিবর্তন হয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আপনি এমন একজনকে মানুষের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মরে যেতে বলছেন, যে কিনা মানুষের মত পরিবর্তনের জন্য কাজ করে। আপনি যুক্তি ছাড়া কথা বলছেন। আপনি একজন অযৌক্তিক ঈশ্বর।
এরপর ঈশ্বর বললেন আমি যেন তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করি। তিনি আমার বয়সে ছোট। আমার আর আমার ঈশ্বরের জন্ম একই সময়ে হয়নি। আমার জন্মের অনেক পরে নাকি তাকে সৃষ্টি করেছি।
-মিথ্যা কথা। আমি তোমাকে সৃষ্টি করিনি।
– তোমার বাবা, দাদা, মক্তবের হুজুর, স্কুলের শিক্ষকরা মিলে আমাকে তোমার জন্য সৃষ্টি করেছে। এরপর তুমি ধারণ করেছো।
– কিন্তু শেষে তোমাকে ঘৃনা করেছি। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি।
-হ্যাঁ, ঘৃনার আড়ালে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। সেই ভালোবাসার টানে এসেছি। তুমি রাজি হও, খুন হয়ে যাও। প্লীজ!
– কী অদ্ভুত!
– আচ্ছা তোমরা ঈশ্বরকে সৃষ্টি করার পর যে পরিমান ক্ষমতা বা পাওয়ার দিয়ে থাকো, সত্যি সত্যি যদি কেউ সমপরিমান মহাপরাক্রমশালী হয়ে তোমার প্রাণ নিতে আসে, তুমি কি তাকে বাধা দিতে পারবে?
– আমরা কি কোন ব্যাটারিচালিত ঈশ্বর নিয়ে আলোচনা করছি? এ বিষয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই।
এবার তিনি খুব হতাশ হলেন। আমার কাছে এরকম আচরণ আশা করেননি। কথাটিকে গালি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তার মতে ঈশ্বররা অদৃশ্য ক্ষমতায় চলেন, তাদের কোন ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না। অথচ তার মতামতকে আমি এতটুকু মূল্য দিইনি। এমন কথার জবাবে তাচ্ছিল্যে হাসি হাসলাম।
তার সাথে আলোচনায় আগ্রহ হারাচ্ছি দেখে তিনি আমার সাথে মৃত্যুর উপায় নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মৃত্যুর কথা বললেন। ঈশ্বরের মতে এটা একটা সুযোগ। তিনি আমাকে মৃত্যুর অপশন দিবেন। সেখান থেকে পছন্দসই উপায়ে মারা যেতে পারবো। এই বিশেষ সুযোগটি কেবল আমার জন্য। এরকম বললেন।
– মনে করো তারা তোমাকে নিয়ে একটি ৩০ তলা দালানের উপর উঠলো। তারপর চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। দালানের যে পাশে ধাক্কা মারবে, সে পাশে থাকবে একটি সুন্দর ফুলবাগান। সেক্ষেত্রে তোমার রক্ত ফুল বাগানের মাটিতে মিশে যাবে। সার হবে এবং সেই সারের পুষ্টিতে বাগানে আরো বেশি বেশি ফুল ফুটবে। রক্ত ড্রেনের জলে মিশে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
রক্তের শক্তিতে হৃষ্টপুষ্ট ফুলের জবাবে আমি কিছু বলিনি।
– অথবা ধরো তারা তোমাকে একটি বড় মাঠে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করলো। তারপর ঠিক সেখানেই মাটিতে পুঁতে ফেললো।
– জ্যন্ত পুঁতে ফেললে কী হয়?
– যাদের জন্য তুমি মারা যাবে, তাদের আত্মতৃপ্তির একটা ব্যাপার থাকে না! চাপাতি দিয়ে কোপানোর বিষয়টা এখন কালচার। এভাবেই হচ্ছে।
– বাদ দাও এসব।
– আচ্ছা, আরো একটা উপায় বলি। প্রথমে তারা একটি গর্ত খুঁড়লো। এরপর তোমাকে সেখানে শুইয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিলো। এতে আপত্তি আছে?
– তুমি কি ঈশ্বর? নাকি ডেথ প্ল্যানার? এত নৃশংস মৃত্যু পরিকল্পনা নিয়ে বেঁচে আছো। তোমার লজ্জা করে না?
– দেখো, ঈশ্বর কখনো কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। তিনি যে কাজে দক্ষ, সেটা হচ্ছে মৃত্যু। আজ পর্যন্ত দেখেছো ঈশ্বর কাউকে বাঁচিয়ে রেখেছে? সবাই মরে যায়। মরতে হয়।
উনার কথা শুনে আমার গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইলো। তখনো ভোর হতে ঘন্টাখানেক বাকি ছিলো। বমি করার জন্য যথেষ্ট সময় ছিলো। চেষ্টাও করেছি, কিন্তু হয়নি। ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি, যেহেতু আমি তাকে বিশ্বাস করি না, সেহেতু তিনি যেন আমার কাছে না আসেন। আমার এসব ভালো লাগে না।
আরেকটি কথা তাকে স্পষ্টভাবে বলেছি। তার ইচ্ছা অনুযায়ী মারা যাওয়ার কোন আগ্রহ আমার নেই। তিনি বললেন আগ্রহ যে নেই, এটা পুরোপুরি ঠিক না। তার দেয়া মৃত্যুর অপশন বিষয়ক আলোচনায় আমি অংশ নিয়েছি এবং জ্যন্ত পুঁতে ফেলার মত একটি অপশন প্রস্তাব করেছি। পরোক্ষভাবে এটা নাকি আমার সম্মতি। আমি বলেছি, এটা আমার সম্মতি নয়। বরং এটা হচ্ছে ভয়। কখনো যদি খুনীর মুখোমুখি হই, তখন হয়তো তাদের কাছে রক্তপাতহীন মৃত্যু দাবি করবো। আমি লাল গোলাপ, লাল শিমুল, লাল ফিতা, লাল চুড়ি, লাল জুতো, লাল সূর্য, লাল ওয়াইন পছন্দ করি। কিন্তু রক্ত নয়। এতকিছু বলার পরও তিনি আমার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলেন। খুব অসহায়বোধ করলাম।
-কিছু কথা বলি, মন দিয়ে শোনো। এই দেশে তুমি যখন তখন মরে যেতে পারো। মনে করো তুমি অটোরিক্সা করে কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল যাচ্ছ। একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তোমাকে বহন করা অটোরিক্সাটি চাপা দিলো। তুমি গেলে। অথবা মনে করো শশুর বাড়ি যাওয়ার সময় লঞ্চে করে পদ্মা নদী পাড়ি দিচ্ছো। একটি ডুবো চরে ধাক্কা খেয়ে লঞ্চের তলায় ফাটল ধরে পানি ঢুকে ডুবে যেতে লাগলো। ক্লান্ত শরীরে তুমি তখন ঘুমিয়ে আছো। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে লঞ্চের সবগুলো লাইফবয় অন্য যাত্রীরা দখল করে নিলো। অনেক কিছু আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে চাইলে, কিন্তু পারলে না। ডুবে মরলে।
– প্লীজ, এসব বন্ধ করো। তুমি এত বর্বর কেন? একটি মৃত্যু নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন? এটা খুব বোরিং।
– এমনওতো হতে পারে তোমার বাসায় আগুন লাগলো। বৌ বাচ্চাদের বাসা থেকে বের করতে গিয়ে শেষে নিজেই আটকা পড়লে। আচ্ছা মানলাম তুমি আগুনে পুড়ে মরলে না। কিন্তু ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মরে গেলে। আসলে আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, জঙ্গীদের হাতে চাপাতির কোপ খেয়ে না মরলেও অন্য অনেক কারণে মরে যেতে পারো। এখানে মরার জন্য হাজারটা সহজলভ্য উপায় আছে। মরেই যখন যাবে, তখন আগামীকালই মরবে না কেন? আচ্ছা ঠিক আছে। পরশু মরো। অথবা তার পরদিন। তুমি একটা ডেট দাও। সেদিন যমদূত পাঠাবো। কোন ঝামেলা না করে মরে যাও।
– প্রয়োজনে আমি দেশ ছাড়বো। এমন দেশে যাবো, যেখানে মৃত্যুর হাজারটা সহজলভ্য উপায় নেই।
– কোথায় যাবে? জামার্নী, সুইডেন, নরওয়ে, কানাডা, নেদারল্যান্ডস অথবা মনে করো সুইজারল্যান্ডই গেলে। সবগুলো শীতের দেশ। মনে করো এমন শীত পড়লো যে, তুমি বরফে জমে গেলে। মৃত্যু কিন্তু তোমার পিছু ছাড়বে না। আচ্ছা বাদ দাও। শোনো, তোমার সাথে কথা বলাটা এখন আর এনজয় করছি না। খুব বোরড ফীল করছি। এটা দ্রুত শেষ করো।
আসলে ততক্ষণে আমিও খুব বিরক্ত ও বিব্রতবোধ করছিলাম। কখনো ভাবিনি ঈশ্বরের সাথে শুধু মৃত্যু নিয়ে কথা বলবো। কিছুদিন ধরে প্রচুর মুভি দেখছি। কয়েকটা মুভিতে ভয়াবহ প্লটহোল খুঁজে পেয়েছি। খুব ভালো হতো যদি উনার সাথে মুভি নিয়ে কথা বলতে পারতাম। অথবা আমার ছোট ছেলের মাথার চুল নিয়ে। তার চুলগুলো খুব দ্রুত বাড়ছে এবং বাদামী হয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা পারিবারিকভাবে অত্যন্ত ব্যস্ত। তার চুলের বেড়ে উঠা এবং রং পরিবর্তন নিয়ে বেশিরভাগ সময় আলোচনা করি। কিন্তু ঈশ্বর এলেন শুধুই মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে। অসহ্য। এমনকি আমার সাথে তার কোন ভালো সম্পর্কও নেই। আমার কাছে তিনি মঞ্চের ভাঁড়ের চাইতে হাস্যকর, এবং ভাঙা মদের গ্লাসের চাইতে বিরক্তিকর। কখনোই আমি তাকে আশা করিনি।
– এতো বেশি ঘৃনা করা ঠিক না। তোমার চারপাশে অনেক উদাহরণ আছে। যারা একসময় আমাকে খুব ঘৃনা করতো, এখন তারচে বেশি ভালোবাসে। যখনই তুমি আমাকে ঘৃনা করতে থাকবে, তখনই আমি আশাবাদী হতে থাকবো। কারণ আমি জানি একসময় তুমি আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসবে। তাছাড়া তুমি যদি আমাকে আশা না করতে, আমি এখানে আসতে পারতাম না। যেভাবেই হোক, তুমি আমাকে আশা করেছ। তাই এসেছি।
– না, আমি তোমাকে আশা করিনি। একটুও না।
– তাহলে তোমার স্বপ্ন আসেনি কেন? তুমি কী অস্বীকার করতে পারবে যে দিন দিন কেমন স্বপ্নহীন হয়ে যাচ্ছো। ঈশ্বরের কোন ক্ষমতা নেই আত্মবিশ্বাসী কোন স্বপ্নবান মানুষের কাছে ঘেঁষার। আজ তুমি সম্পূর্ণরূপে স্বপ্নহীন ছিলে বলেই আমি এসেছি। অথচ কেমন বাজে ব্যবহারটাই না করলে। যদিও তাতে বিন্দুমাত্র অবাক হইনি। কারণ মানুষের প্রতি এখন আর আমার কোন বিশ্বাস নেই। মানুষ নিজে যাকে সৃষ্টি করে, আবার তাকেই ধ্বংস করে।
– এতক্ষণে একজন অভিমানী ঈশ্বরের দেখা পেলাম। হা হা হা।
– দেখো, আমি আমাকে সৃষ্টি করিনি। এটা সম্ভব না। তোমরা ঈশ্বর বানাও, ধর্মগ্রন্থ বানাও। আবার ঈশ্বরকে ধ্বংস করো, ধর্মগ্রন্থ নিয়ে হাসাহাসি করো। এসব গ্রন্থ কি আমি লিখেছি? তোমরা এখন এসব গ্রন্থকে হাস্যকর বলো, উদ্ভট বলো। অথচ এগুলো তোমাদের পূর্ব পুরুষরাই লিখে গেছে। তোমরা নিজেরা যা জানো না, যা বুঝো না, যা আবিষ্কার করতে পারোনি, তার সবকিছু ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার জন্য ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছো। তোমাদের সকল ব্যর্থতার ভার আমাদেরকে বহন করতে হয়। অনেক সময় কৃতিত্বের ভাগও দাও। কিন্তু সেটা সবসময় না। তোমরা নিজেদের মত করে আমাদেরকে মহিমান্বিত করেছো। তারপর আবার তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করছো। তোমরা আমাকে নিয়ে খেলছো। এটা খুবই ফালতু একটা গেইম, যা তোমরাই সৃষ্টি করেছো।
– বলে যাও। খারাপ লাগছে না।
– আমাকে তোমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ আজ তুমি আমাকে স্বীকার করো না। আমি তোমার কাছে আসার জন্য, পাশে বসার জন্য শকুনের মতো তাকিয়ে থাকি। কখন একটু সুযোগ পাবো, এই আশায়। বহুদিন পর আজ সুযোগ পেয়েছি। যতই অবহেলা, অপমান করো না কেন, আমার ভালো লেগেছে। তুমি হয়তো জানো না, একা থাকার কী কষ্ট।
– তোমার কথায় যুক্তি আছে। এতক্ষণে মনে হচ্ছে তোমার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
– কিন্তু আমাকে বলো কেন তুমি মরতে চাও না?
– আসলে এটা মৃত্যুর জন্য সঠিক বয়স নয়। তুমি জানো আমি এখন কী পরিমান ব্যস্ত। হাতে অনেক কাজ। তাছাড়া আমার দু’টো ছেলে এখনো অনেক ছোট। আমি তাদের যুবক বয়সটা দেখে যেতে চাই। তারা কিভাবে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলে, কিভাবে অন্যের কাছে আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থান করে, তাদের প্রতি আমার কতটুকু প্রভাব নিয়ে বেড়ে উঠে, কেমন মেয়ের সাথে প্রেম করবে, এসব। তাছাড়া তাদেরকে সাথে নিয়ে আমি পাহাড় বাইতে যাবো। তারা আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। বলবে, কিভাবে পাহাড় বাইতে হয়।
– তুমি কি এটাকে তোমার স্বপ্ন হিসেবে নির্মাণ করেছো?
– অনেকটা তাই।
– তুমি আমাকে এভাবে দুর্বল করতে পারো না। আমিও কিছু স্বপ্ন নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। কিন্তু তোমার স্বপ্ন যেভাবে নির্মিত হয়, আমার স্বপ্ন একই সাথে একইভাবে ধ্বংস হয়। খুব মন খারাপ হলো। কিছুটা সময় একা থাকতে পারলে ভালো লাগতো। আশপাশে কেউ থাকলে মন খারাপ শেষ করা যায় না। বড়জোর এড়িয়ে যাওয়া যায়।
– তার আগে একেবারে সত্যি করে বলো, তুমি কেন আমাকে মারতে এত আগ্রহী।
– কারণ আমি মুক্তি চাই। তোমার আমার জন্ম একইসাথে না হলেও আমাদের মৃত্যু একইসাথে হবে। মানুষের মৃত্যুর পর আর তার ঈশ্বর বেঁচে থাকে না। ইশ্বর তার মালিক ছাড়া একা বাঁচতে পারে না। হয় আমাকে ভালোবাসো, নয় মুক্তি দাও।
আলোচনা এমন মানবিক রূপ ধারন করবে বুঝিনি। ঈশ্বরকে একটু একা থাকতে দিয়ে জলপান করতে রান্না ঘরে যাই। জগে জল ছিলো না। জার থেকে জল ঢেলে খুব প্রশান্তি নিয়ে পেটভরে জল নিলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাইরে ভোরের আলো ছড়িয়েছে। গতকালের ভোরের সাথে আজকের ভোরের বিশেষ পার্থক্য নেই। একইরকম আলো, একইরকম কুয়াশা। হঠাৎ খুব শীত শীত লাগছে। খেয়াল করে দেখি, আমার গায়ে একটি হালকা ফুলহাতা টীশার্ট। অথচ এতক্ষণ শীত গরম কিছুই অনুভব করিনি। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে রীতিমত কাঁপছি। দ্রুত শোবার ঘরে গেলাম সোয়েটার পরতে। গিয়ে দেখি আমি আমার বিছানার উপর বসে আছি। সোয়েটার পরে। শোবার ঘরে এখন দু’টো আমি। একটি সোয়েটার পরা, আরেকটি সোয়েটার ছাড়া। ঈশ্বর চেহারা পাল্টে হুবহু আমার রূপ ধরে বসে আছেন। বললেন, খুব শীত পড়ছে, এসো ঘুমিয়ে পড়ি।
তার কথা এড়িয়ে যেতে পারিনি। হঠাৎ চোখের পাতায় প্রচুর ঘুম নেমে আসে। বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রতিদিন আমি দু’টো বালিশ মাথায় দিয়ে খাটের মাঝখানে ঘুমাই। ঈশ্বর বালিশ দু’টো পাশাপাশি রাখলেন। তিনি ডানের বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লেন। শীত থেকে বাঁচার জন্য আমিও দ্রুত বাম পাশের বালিশে শুয়ে পড়ি। ঠিক তখন কানের কাছে মুখ এনে ঈশ্বর ফিসফিস করে বললেন, “মারা যাওয়ার কথাটা মাথায় রেখো। চাইলে আত্মহত্যাও করতে পারো।“
তারপর আর কিছু মনে নেই। সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আজ দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি ঈশ্বরের বালিশে শুয়ে আছি। বাম পাশের বালিশটি খালি। শোবার ঘরে আমি ছাড়া কেউ নেই।

তার অনেকগুলো বদ অভ্যাসের একটি ছিলো উল্লাপাল্টা স্বপ্ন দেখা

লিখেছেন
শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটা যায় না। ডানে বামে তাকাতে হয়। এখন আবার পেছনেও তাকাতে হয়। পেছনে ঠিক কয়জন মানুষ হাঁটছে, কে কত দূরে আছে, কার হাঁটার গতি কেমন, একা কয়জন আর দলবেঁধে কয়জন, কার গালে দাঁড়ি আছে কার গালে নাই, ব্যাকপ্যাক আছে কিনা, যাদের ব্যাকপ্যাক আছে তাদের দৈহিক গড়ন কেমন, বয়স কত হতে পারে, আরো কত কী যে ভাবতে হয়! এক দেখায় এত কিছু মার্ক করা যায় না, কারণ পেছনে তাকিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে পারেন না মাঝ বয়সী লেখক ও কলামিস্ট কাজল মাহমুদ। তাই বার বার পেছনে তাকাতে হয়। গত এক বছর ধরে হাঁটার সময় এভাবে পিছনে তাকিয়ে এখন তার ঘাড় ব্যাথা রোগে ধরেছে। প্রতি সপ্তাহে একবার ডাক্তারের কাছে যান। এখনও ডাক্তারের কাছে যাবেন বলেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন। বেরিয়েই গাড়ি পাওয়া যায় না। একটু হেঁটে সিএনজি অটোরিক্সা নিতে হয়।
বছরখানেক আগে এক ব্লগারের মৃত্যুর পর দৈনিক পত্রিকায় বিশাল প্রবন্ধ লিখেছিলেন। একটি ইসলামিক জঙ্গী সংগঠনের খুনী দল ওই ব্লগারকে তার বাসার কাছে কুপিয়ে হত্যা করে। পত্রিকার প্রবন্ধে কাজল মাহমুদ লিখেছেন “কোরআনে যুদ্ধ ও হত্যা বিষয়ক বিভিন্ন আয়াত পড়ে এবং সাহাবীদের জীবনী পড়ে বর্তমান সময়ের মুসলিম তরুণরা ধর্ম বিরুদ্ধ মানুষদের খুন করার উৎসাহ পায়।“ তিনি আরো লিখেছেন “যেসব মুসলমান ওইসব আয়াত ও জীবনী পড়ে খুন করতে উদ্বুদ্ধ হয় না, তাদের উচিত এসব খুনের প্রতিবাদ করা।“ ব্যস! তিনদিন পর ফোনে হুমকী পেলেন, এরপর পেলেন চিঠি। তার কয়দিন পর পেলেন ফেসবুকে মেসেজ। এরপর ইমেইল। পরপর এতগুলো মাধ্যমে হুমকী পেয়ে ভয় পেলেও একেবারে ভেঙ্গে পড়েননি তিনি।
এরপর থেকে হাঁটার সময় কিছুক্ষণ পর পর পেছনে তাকানোর অভ্যাস করতে হয়েছে। অভ্যাস নয় ঠিক, নিয়ম হয়ে গেছে। কারণ জঙ্গিরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে। তারা অসম্ভব ভীতু এবং সাহসী। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মানুষ খুন করার সাহস আছে তাদের।
এখন কাজল মাহমুদের পেছনে যারা হাঁটছে, তাদের মাঝে ৪ জনের একটা দল আছে। দুই জনের গালে দাঁড়ি আছে, দুই জনের নাই। একজনের হালকা দাঁড়ি, আরেকজনের খোঁচা খোঁচা। ব্যাকপ্যাক আছে সবারই। বয়স গড়ে বাইশ তেইশ হবে। বেশ সুন্দর সুঠাম দেহ সবার। এই মুহূর্তে এদেরকে নিয়েই কাজল মাহমুদের যত ভয়। ব্লগারদেরকে মারার অপারেশনে যারা যায়, তাদের সাথে এদের হুবহু মিল। তাই বার বার তাকাচ্ছেন।
এবার পেছনে তাকিয়ে ভালো করে দেখেন সবাই তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে এবং বেশিরভাগ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউই সামনের দিকে আসছে না। কাজল মাহমুদ ভাবলেন, এটা আবার কী হলো! ওরা সবাই এভাবে দাঁড়িয়ে গেলো কেন। ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখেন পাঁচ জন যুবক চাপাতি তাক করে তার পথরোধ করে আছে। সবার মুখে কালো কাপড় বাঁধা। চেহারা দেখে চেনা যাচ্ছে না। এরা সবাই ফুটপাতের পাশে একটি দোকানে অপেক্ষমান ছিলো। কাজল মাহমুদ বুঝতেই পারেননি কখন তারা হুট করে সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো!
বুঝতে পারছেন না তার এখন কী করা উচিত। দৌড় দিবেন নাকি চিৎকার করবেন। কিন্তু চিৎকার করবেন কিভাবে, গলা একদম শুকিয়ে গেছে। ঢোক গিলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তিনি খেয়াল করলেন গায়ে কোন শক্তি নেই। কিছুক্ষণ আগে প্রস্রাবের বেগ ছিলো, এখন আর নেই। ঘাড়ের ব্যাথাও নেই। কোপ খেলে অনেক ব্যাথা লাগবে, এই বিষয়টাও মাথা থেকে চলে গেছে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে কোন বোধ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আশপাশে অনেক মানুষ, আবার মনে হচ্ছে কেউ নেই। এইখানে এই মুহূর্তে তিনি ভীষন একা। খুব দ্রুত প্রচন্ড শীতে গ্রাস হয়ে যাচ্ছেন। শরীরের ভেতরে শীতের ঢেউ টের পাচ্ছেন তিনি। অনেক শীত। পূর্ণ মাঘেও কখনো এতো শীত লাগেনি তার। তাছাড়া এটা কেমন যেন কাঁচা কাঁচা শীত, তরতাজা শীত। প্রথমে গায়ে এসে লেপ্টে যাচ্ছে, তারপর কামড়ে ধরছে। ঘটনার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এমন কাঁপুনি এলো যে দাঁতের দুই পাটি একে অপরের শত্রু হয়ে খুব পেটাচ্ছে। ঘাড়ের চারপাশ, চেয়াল ও মাথার বিভিন্ন জায়গায় কুঁচকানো শীতে শির শির করছে। মনে হচ্ছে চাপাতির কোপগুলো এসব জায়গায় পড়বে। নিহত ব্লগারদের ছবি দেখেছেন তিনি, এসব জায়গাতেই কোপায় তারা।
এটা ঘোর না, আবার বোধহীনও না। আবার অচেতন অবস্থা কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্নতাও নয়। কেমন একটা শোধবোধহীন জেগে থাকা অবস্থা। এই অবস্থা ভেঙে গেলো মুখ ঢাকা যুবকদের একজনের কথায়।
– ভয় পাচ্ছেন কেন? আমরা আপনাকে মারতে আসিনি।
এমন সাবলীল কণ্ঠে কথাটি বললো, যেন চাপাতি দিয়ে টেবিল টেনিস খেলতে আসছে। বিশ্বাস হয় না কাজল মাহমুদের। তবুও মনে মনে খুশি হয়েছেন এই ভেবে যে, যেহেতু তিনি ব্লগার নন, সেহেতু হয়তো প্রাণে মারবে না। কয় কোপ দিয়ে ফেলে রেখে চলে যাবে। তারপর আশপাশের মানুষরা যদি সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং ডাক্তার পাওয়া যায় এবং অপারেশন থিয়েটার খালি পাওয়া যায় এবং পর্যাপ্ত রক্ত হাতের কাছে মিলে যায়, তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে যাবেন।
– না, আমরা আপনাকে আঘাত করতে আসিনি। বিশ্বাস করুন, আপনার ঘাড়, মাথা কিংবা মুখে একটা কোপও দিবো না। অভ্যাসবশতঃ মুখোশ পরে এবং চাপাতি হাতে করে চলে এসেছি। এর মানে এই না যে আমরা আপনাকে কোপাবো। আবার এর মানে এও না যে আমরা আপনাকে ছেড়ে দিবো।
কাজল মাহমুদ মনে মনে বললেন, “বুঝলাম না!”
– বুঝাবুঝির কিছু নাই। হুজুর বলেছেন আপনাকে সাথে করে নিয়ে যেতে। কী একটা বিষয়ে জরুরী আলাপ আছে। আপাতত কোন কথা না বলে চুপচাপ আমাদের সাথে গাড়িতে উঠেন। ফেয়ার এন্ড ফ্রেন্ডলি। -শেষের শব্দ তিনটি একটু ধমকের সুরে বললো ছেলেটি।
কাজল মাহমুদের হঠাৎ মনে পড়লো ঘাড়ে ব্যাথার কথা। মনে পড়লো ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। ভাবছেন যেহেতু এরা তাকে মারতে আসেনি, সেহেতু মনে হয় ডাক্তারের কথা বললে ছেড়ে দিবে। কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুচ্ছে না। ডিম পাড়া মুরগির ডাকের মত কক কক শব্দ হলেও সেটা অন্য কেউ শুনতে পায়নি।
– সমস্যা নেই, পথে আপনাকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে যাবো। ঘাড় খুব সেনসেটিভ অঙ্গ। তাছাড়া আপনি চিন্তাশীল লেখক। মুক্তচিন্তার মানুষ। মানুষের সব চিন্তা থাকে মাথায়, ঘাড়ের উপর ভর করে মাথা থাকে। অর্থাৎ ঘাড় হচ্ছে মানুষের চিন্তার স্ট্যান্ড। স্ট্যান্ডে গল্ডগোল থাকলে মাথা ঠিকমতো কাজ করবে না। এতে করে চিন্তায়ও গোলমাল হতে পারে।
এই কথা বলে মুখোশধারী ছেলেগুলো কাজল মাহমুদকে একটা কালো গ্লাসের ঝকঝকে চকচকে নতুন মাইক্রোবাসে তুললো। গাড়িতে উঠে সিটে বসার সময় তার সবকিছু সচল হলো। চিন্তাশক্তি, বাকশক্তি, শরীরের চেতন ফিরে ফেলেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না এতক্ষণ কোন ছেলেটি তার সাথে কথা বলেছে। ছেলেটির কথার বুনন খুব সুন্দর। বাক্য গঠন ও শব্দচয়ন বেশ কমিউনিকেটিভ ও ইনোভেটিভ। এরকম ভাবতে ভাবতে দেখলেন সবগুলো ছেলে মুখের কালো কাপড় সরিয়ে নিলো। তাদের চেহারা দেখে কাজল মাহমুদ নিজের অজান্তে একেবারে আওয়াজ করে বলে ফেললেন – বাহ্ তোমাদের চেহারাও খুব সুন্দর। অসাধারণ।
একটি ছেলে বললো – মাহমুদ সাহেব, আপনার সাথে আমিই কথা বলেছি এতক্ষণ।
একে একে সবাই পরিচিত হলো। কিন্তু মাহমুদ সাহেব বুঝে ফেললেন এগুলো একটাও অরজিনাল নাম নয়। এসব তাদের ছদ্মনাম। বখতিয়ারের ঘোড়া, লাল তলোয়ার, নিপাট সত্য, মরু বীর, নিঃসঙ্গ আকাশ, এগুলো কোন মানুষের নাম হতে পারে না।
নিপাট সত্য নামের ছেলেটি বললো, আরে এসবতো আমাদের ফেসবুক প্রোফাইলের নাম। নাম নিয়ে আপনি এত চিন্তা করছেন কেন? মুক্তচিন্তার মানুষ হয়েছেন বলে কি সবকিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবে? তাছাড়া নাম দিয়ে কী হয়! আমাদের প্রত্যেকেরই দশটি করে গুনবাচক নাম আছে। যেমন আমার দশটি গুনবাচক নাম হচ্ছে, পরোপকারী, সত্যবাদী, একনিষ্ঠ, সৎখেয়ালী, বিশ্বস্ত, অনুগত, ভ্রাতৃপ্রতীম, মিষ্টভাষী, মনযোগী ও একাগ্রচিত্তের মানুষ। এভাবে এখানে আমরা পাঁচজনের পঞ্চাশটি নাম আছে। সবগুলো গুণবাচক নাম। এসব নাম হুজুর দিয়েছেন। শুধু নাম নয়, হুজুর আমাদেরকে আরো অনেক কিছু দেন। বিশেষত প্রচুর দোয়া দেন। তার দোয়ায় আজ পর্যন্ত কোন অপারেশন ব্যর্থ হয়নি। তিনি অত্যন্ত দোয়াশীল হুজুর।
মাহমুদ সাহেব ভাবলেন ছেলেগুলো ভালো আছে। গাড়িতে যেতে যেতে তাদের সাথে আলোচনা করা দরকার। অনেক কিছু জানার আছে, জেনে নেয়া যাবে। সাহস করে বলে ফেললেন, কিন্তু তোমাদের বুকের ভেতরে আমি একজন করে খুনী দেখতে পাচ্ছি যারা মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যা করে।
– হ্যাঁ, আমরা খুন করতামতো। সর্বশেষ যে ব্লগার নিহত হয়েছে, আমরা এই পাঁচজন তাকে নির্মমভাবে খুন করেছি। শেষ কোপটা আমিই দিয়েছি। প্রথম কোপ দিয়েছে মরু বীর। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়েছিলো। কিছু রক্ত মরু বীরের হা হয়ে থাকা মুখের ভেতর ঢুকে যায়। কিন্তু জানেন, খুনোখুনি একটা বোরিং কাজ। তাছাড়া আমরা এখন আর খুনের পক্ষে নই। খুনের সংস্কৃতি থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। রক্তভেজা ঐতিহ্য ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীর অগ্রযাত্রায় খুন কোন ভূমিকা রাখে না। অযথা টাইম লস, এনার্জি লস।
– বাহ! খুব ভালো কথা।
– শুধু কি তাই! আমরা এখন একে অপরের সমালোচনা করতে পারি। সইতেও পারি। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে হুজুরের সাথে গ্রুপ চ্যাট করি। চ্যাটে আমরা সবাই মিলে হুজুরের সমালোচনা করি, হুজুর তা খন্ডন করার চেষ্টা করেন। কখনো পারেন, কখনো পারেন না।
– খুব ভালো উদ্যোগ। আলোচনা সমালোচনা করলে জ্ঞানের চাষাবাদ হয়। নতুন নতুন চিন্তার সাথে যুক্ত হওয়া যায়।
– আপনারা মুক্তচিন্তার মানুষ। কিন্তু কীইবা এমন চিন্তা করেন। আমাদের হুজুর অনেক বড় চিন্তাশীল মানুষ। তিনি মানুষের স্বপ্ন নিয়ে চিন্তা করেন। হুজুর বলেছেন, “আর কখনো মানুষ খুন করবে না। একজন মানুষ খুন হওয়ার সাথে সাথে তার স্বপ্নও খুন হয়ে যায়। কারণ খুন হয়ে যাওয়ার মানুষটির উত্তরসূরীরা হয়তো তার স্বপ্ন বয়ে বেড়াতে রাজি নাও হতে পারে।“
– হুজুর কি নিজের বাড়িতে থাকেন, নাকি ভাড়া বাড়িতে? যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?
– আপনি হয়তো জানেন হুজুরেরও হুজুর আছে। তো, সেই হুজুরেরা আমাদের হুজুরকে একটা বাড়ি দিয়েছিলেন। সেটা ছেড়ে দিয়ে এখন একটা ভাড়া বাড়িতে থাকেন। বাড়ি বলতে বাসা আরকি। এক রুমের বাসা। যেতে বেশিক্ষণ লাগবে না। সামনেইতো আপনার ডাক্তারের চেম্বার। একটা ব্রেক নিবো আমরা।
– ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। ঘাড়ে ব্যাথা ভালো হয়ে গেছে। আর কখনো ব্যাথা হবে না মনে হয়।
– বাহ্! বেশতো। বেঁচে গেলেন। ঘাড়ে ব্যাথা খুব বিরক্তির। অসহ্য যন্ত্রনাকর। জানেন, পত্রিকায় প্রকাশিত আপনার ওই বিশাল প্রবন্ধটিই আমাদেরকে বদলে দিয়েছে। ওই প্রবন্ধ পড়ার পর হুজুর আমাদেরকে নতুন করে চিন্তা করতে বলেছেন।
– তাই নাকি! কিন্তু সেটাতো অনেক আগে লিখেছি। এতদিন পর কেন পরিবর্তন হলো?
– আরে, ওইসময়তো শুধু টাইটেল পড়েই হুজুর আপনার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে দিয়েছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে কীভাবে যেন পুরো লেখাটি পড়ে ফেললেন। তারপর এই ঘটনা। আপনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। ভাবনার জগতে ফাটল ধরিয়েছেন। আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
মাহমুদ সাহেব ভাবছেন এসব হচ্ছেটা কী! সত্যিকার অর্থে পত্রিকার লেখাটি অনেক আবেগী ছিলো। এই আবেগী লেখা জঙ্গীদের জীবনবোধ পাল্টে দিবে ভাবেননি। কিন্তু সব চিন্তা কি ওদের হুজুরই করে। ওরা কোন চিন্তা করে না?
– চিন্তাতো আগে থেকেই করতাম। ব্লগারদেরকে মারতে যাওয়ার আগে সারারাত চিন্তা করতাম। কতকিছু ভাবতাম! ভাবতাম এমন যদি হয় যে, তার ঘাড়ে শুধু কুপিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কাটা যাচ্ছে না, মাথায় কোপ দিলে আগুন ধরে যাচ্ছে; তখন আমি কী করবো? আল্লাহু আকবার বলে তার সামনে সিজদায় পড়ে যাবো? নাকি ভূত ভূত বলে চিল্লানি দিবো?
লাল তলোয়ার নামে ছেলেটির এই কথা শুনে নিঃসঙ্গ আকাশের মনে পড়লো একটি দুঃস্বপ্নের কথা। – একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম এক ব্লগারকে জবাই করার সময় রক্তের সাথে অনেকগুলো বাংলা বর্ণমালা বেরিয়ে আসছে। তারপর সেগুলো দিয়ে শব্দ হলো, আপনা আপনি বাক্য হলো। শেষে সবগুলো বর্ণ শব্দ আর বাক্য মিলে একটি কবিতা হলো। কৌতুহলে কবিতার গায়ে হাত দিতেই আমার আঙ্গুল কাটা গেলো। কী ধারালো! ঘুম ভেঙ্গে গেলে আর সারারাত ঘুমাতে পারিনি। খুব ভয় পেয়েছি।
অদ্ভুত! হরর গল্পের মতো। কিন্তু এমনিতে তোমরা কী চিন্তা করো? – বললেন মাহমুদ সাহেব।
জবাবে বখতিয়ারের ঘোড়া বললো, আমরাতো এখন আর চিন্তা করি না; মুক্তচিন্তা করি। আমাদের প্রত্যেকের একটি করে মুক্তচিন্তা আছে। আপনি শুনে দেখেন, ভালো লাগবে।
– আমার মুক্তচিন্তা হচ্ছে, খুন করার চাইতে একটি গাছ লাগানো অনেক ভালো। এর অক্সিজেন দিয়ে অনেক মানুষ বাঁচতে পারবে।
– রং অনেক শক্তিশালী একটা জিনিস। আমরা পানি দেখলে সাতার কাটার জন্য ঝাঁপ দিই কিন্তু লাল রঙের পানি দেখলে রক্ত ভেবে ভয় পাই। রঙ সবকিছু বদলে দেয়। পানিকে রক্ত বানিয়ে দেয়। এই জন্য হুজুররা রক্ত ভয় পায় না, রঙ ভয় পায়।
– নদী, বন এসব বাঁচানোর জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে কোন লাভ নাই। যেখানে মানুষের হাত পড়ে যায়, ঈশ্বর সেখানে অসহায়।
– দ্বিমত করার অভ্যাস গড়ার আগে একমত হওয়া শিখতে হয়। তা না হলে দ্বিমত করার সাহস অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
– ঈশ্বরের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। মানুষ ঈশ্বরকে যতটুকু ক্ষমতাবান মনে করে, তিনি কেবল ততটুকুই ক্ষমতাবান। মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ঈশ্বরকে ক্ষমতা দান করে। ঈশ্বর বেঁচে থাকেন মানুষের দয়ায়।
সবার চিন্তা শুনে ভাবনার জটে পড়ে যান মাহমুদ সাহেব। তিনি ভাবেন, মাত্র এক সপ্তাহে এরা এত জটিল কিছু চিন্তা করতে শিখে ফেলেছে! নাকি এরা আগে যা চিন্তা করতো, এখন তার উল্টোটা চিন্তা করে?
– কী যা তা ভাবছেন! একেবারে ঘাড় থেকে কল্লা আলাদা করে দিবো। আমাদের চিন্তা নিয়ে মশকরা করেন? একদম জিহ্বা কেটে দিবো। শালা ফাউল কোথাকার!
লাল তলোয়ার নামের ছেলেটির মুখে এমন কথা শুনতে প্রস্তুত ছিলেন না মাহমুদ সাহেব। আচমকা ভয়ে জড়সড় হয়ে যান। শরীরে চিকন ঘাম ছেড়ে দেয়ার আগেই ছেলেটি সংশোধন করে দিলো। – স্যরি, অভ্যাসবশতঃ বলে ফেলেছি। আমরা যা চিন্তা করেছি, তা নিয়ে আপনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবেন। এটা আপনার অধিকার।
তবুও ভয় কাটে না মাহমুদ সাহেবের। ঘোর সন্দেহ হয়। ভাবছেন এরা বোধহয় জবাই করার জন্যই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো হুজুরের ইচ্ছে হয়েছে নিজ হাতে জবাই করবে, তাই লোক পাঠিয়ে সিস্টেমে নিয়ে যাচ্ছে। আরামসে নিজের ঘরে বসে বসে জবাই করবে। ছেলেগুলো গাড়িতে ভালো ভালো কথা বলছে ধরা খাওয়ার ভয়ে। যদি চিল্লাপাল্লা করে, ঝামেলা করে! কিন্তু কী করা যায়, তাই ভাবছেন। এখনও সময় আছে, পালিয়ে যাওয়ার। প্রস্রাবের কথা বলে গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দেয়া যায় কিনা ভেবে দেখছেন। নাকি পকেট থেকে কলমটা বের করে ড্রাইভাবের ঘাড়ে গেঁথে দিবেন! তাহলে গাড়ি এলোমেলো চলবে, এই সুযোগে দরজা খুলে লাফ দেয়া যাবে। কিন্তু হালকা ব্রেক কষে গাড়িটি থেমে গেলো।
– আমরা চলে এসেছি, গাড়ি থেকে নামুন। আপনার জন্য হুজুর অপেক্ষা করছেন।
শুনে হতাশ হলেন মাহমুদ সাহেব। খুব অসহায় বোধ করছেন। ভাবলেন ওদেরকে বিশ্বাস করে ভুল হয়েছে। আরো আগে পালানোর কথা চিন্তা করা উচিত ছিলো। গাড়ি থেকে নেমেই দৌড় দেয়ার চিন্তা করেছেন। কিন্তু ওরা এমনভাবে ঘিরে দাঁড়িয়েছে, দৌড় দেয়ার কোন উপায় নেই। ওদের সাথে হুজুরের বাসায় যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। উপায়ন্ত না দেখে ঘটনার শেষ দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন।
হুজুরের রুমে ঢুকতেই বসা থেকে উঠে কাজল মাহমুদকে অভ্যর্থনা জানালেন দারুন এক হুজুর। আসার সময় কোন অসুবিধা হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। কিন্তু হুজুরকে দেখে অবাক হলেন মাহমুদ সাহেব। মনে মনে ভাবলেন হুজুরের দাঁড়ি কই? তাছাড়া টিশার্টটিও বোধহয় আজিজ সুপার মার্কেট থেকে কেনা। জীবনানন্দ দাশের কবিতার স্ক্রীণ প্রিন্ট। পরনে থ্রি কোর্যার্টার প্যান্ট। এরকম হুজুর এর আগে দেখেননি তিনি।
– আমার গেটআপ নিয়ে কী সব উদ্ভট চিন্তা করছেন! দাঁড়ি দিয়ে হুজুর চেনার চেষ্টা করছেন? আরে ভাই, আমরাতো বানরের বংশধর। গায়ে একটু আধটু চুল থাকবেই। গালের চুলগুলো গতকাল কেটে ফেলেছি। এখন কিছুটা ফ্রেশ লাগছে। পরে ভালো লাগলে আবার রেখে দিবো, সমস্যা কী? এসব চুল টুল নিয়ে না ভেবে আসেন গুরুত্বপূর্ণ আলাপটা সেরে ফেলি। তারপর একসাথে দুপুরের খাবার খাবো।
আরো একবার অবাক হলেন মাহমুদ সাহেব। ভাবলেন অন্যকিছু চিন্তা না করে বরং হুজুরের কথাগুলো শুনি। মনে হয় না জবাই টবাই করবে। হুজুর এখন জবাইয়ের মোডে নেই। হুজুরের চোখ ভরা কৌতুহল। নিশ্চয় চিত্তাকর্ষক কিছু নিয়ে ভাবছিলেন বসে বসে। চিত্তাকর্ষক চোখ খুবই নিরাপদ। আস্থা রাখা যায়। নিশ্চিন্তমনে হুজুরের মুখোমুখি চেয়ারে বসে চোখ ঘুরিয়ে ঘরটা দেখে নিলেন। সাদামাটা। কিছু ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস, একটা খাট, তিনটা চেয়ার, একটা টেবিল, একটা আলমারি আর একটা বইয়ের তাক। খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো। রুমে কেউ নেই। ওই পাঁচজন যুবক এখন বাইরে।
– তাহলে শুরু করা যাক। আসার পথে ছেলেগুলো কী কী বলছে, সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ওরা নিশ্চয় আপনার মাথায় চিন্তার ঝট পাকিয়ে দিয়েছে। আমি জানি আপনি বেশ স্বপ্নবান একজন মানুষ। আমিও আপনার মতোই। তো, স্বপ্নই সমস্যা আবার স্বপ্নই সম্ভাবনা। আমরা প্রত্যেকে স্বপ্ন দেখি। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, সবারই অনেক অনেক স্বপ্ন। কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়, আবার কিছু হয় না। তবুও মানুষ নতুন নতুন স্বপ্ন দেখে। আবার কিছু স্বপ্ন মানুষ নিজের থেকে বাদ করে দেয়। যেমন আমার স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট এর খলিফা হওয়ার। কিন্তু গত সপ্তাহে এই স্বপ্নটি বাদ করে দিয়েছি। এখন নতুন স্বপ্ন দেখছি। অনেকগুলো মানুষের স্বপ্ন নিয়ে আমার স্বপ্ন। আপনি কি বুঝতে পারছেন আমার কথা?
– জ্বি বলুন। শুনতে খুব ভালো লাগছে।
– ধন্যবাদ। আপনি নিশ্চয় ফরিদপুর জেলা সম্পর্কে জানেন। এই জেলার বেশিরভাগ ভূমি পদ্মা নদীতে ভেঙ্গে যাওয়া আবার বেশিরভাগ ভূমি নদী থেকে উঠে আসা। চর মির্জাপুর সেরকমই একটি এলাকা। চর ভদ্রাসন উপজেলার এই চরের মানুষ মূলত কৃষক ও মৎস্যজীবী। শিক্ষার হার খুবই কম। কিন্তু এই চরের মানুষ বেশ স্বপ্নবান। তারা প্রচুর স্বপ্ন দেখে। যখন তখন স্বপ্ন দেখে। এদের স্বপ্ন দেখার কোন রুটিন নেই। এবং স্বপ্নের হারও ব্যাপক। কিন্তু বেশিরভাগ স্বপ্নই পূরণ হয় না। চরের মানুষগুলো স্বপ্ন সচেতন নয়। তারা স্বপ্নের যত্ন নিতে পারে না বলে প্রায় সব স্বপ্ন মরে যায়। অথবা নদী ভেঙে নিয়ে যায়। এখন আমি চাইছি তাদের স্বপ্নগুলো টিকে থাকুক এবং পূরণ হোক। এই জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। প্রকল্পের দায়িত্বটা আপনাকেই দিতে চাই। আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ। অনেক আস্থা আপনার প্রতি। আশাকরি আপনি মনযোগ দিয়ে শুনছেন।
কিছুই বুঝতে পারছেন না মাহমুদ সাহেব। পুরো বিষয়টা ক্লীয়ার হওয়ার জন্য দেরি সইছে না। চোখে মুখে দুনিয়ার সব কৌতুহল এক করে বললেন, -জ্বি বলুন।
– ওই চরে নদীর তীর ঘেঁষে একটি কাঠের ঘর বানিয়েছি। ঘরের চালও কাঠের, বেড়াও কাঠের। শরতে হেমন্তে চারপাশ কাশফুলে সাদা হয়ে থাকে। উপজেলা থেকে আসা একটি রাস্তা সোজা এসে ঘর থেকে কিছুটা দূরে বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁক থেকে আরেকটি নতুন রাস্তা ওই ঘরের দিকে গেছে আর বাঁক নেয়া রাস্তাটি গেছে গ্রামের দিকে। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আপনি সেই ঘরে উঠবেন। সেখানে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করা আছে। খাবারের ব্যবস্থাও আছে। পড়ার জন্য আছে বিশাল একটি লাইব্রেরি। গান শোনার, মুভি দেখার ব্যবস্থাও আছে। চব্বিশ ঘন্টা বিদ্যুত থাকবে। ইন্টারনেট আছে। আর আছে একটি ল্যাবরেটরি। সেখানে একটি মেশিন বসানো আছে। অনেকগুলো তাকে সাজানো আছে ছোটবড় কয়েক হাজার বয়াম। এরমধ্যে কিছু বয়াম ড্রাম সাইজের আবার কিছু পেনিসিলিন লিকুইডের ছোট্ট শিশির সমান। চরের বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারে না তারা আসলে কী স্বপ্ন দেখে। আপনি মেশিন দিয়ে তাদের স্বপ্ন নির্ণয় করবেন। তারপর তাদেরকে সেটা বলবেন এবং সেই স্বপ্ন সাইজ অনুযায়ী বয়ামে ভরে রাখবেন। আমরা এসব স্বপ্ন লালন পালন করবো এবং একটা সময় তাদের সব স্বপ্ন পূরণ করে দিবো। এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এবার আপনার সিদ্ধান্ত বলুন।
– অসাধারণ প্রকল্প। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কী সুন্দর চিন্তা আপনার! সত্যিই অসাধারণ! আমি এক কথায় রাজি। নিঃশর্তভাবে রাজি। আপনার আইডিয়াটা খুবই ভালো লাগলো। সবকিছু শুনে আমার বাবার কথা মনে পড়লো। তার একটা স্বপ্ন ছিলো। মনে হয় কখনো পূরণ হবে না। বাবা বেঁচে নেই, থাকলে উনার স্বপ্নটিও বয়ামে ভরে রাখতাম। তারপর একটা সময় পূরণ হতো। উনি স্বপ্ন দেখতেন আমি একদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবো। তারপর আমার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় দেশ ভরে উঠবে সুখ ও সমৃদ্ধিতে। গতরাতেও ভেবেছি, বাবার স্বপ্ন যদি পূরণ হতো, আর আমি যদি প্রধানমন্ত্রী হতাম, তাহলে এখন এভাবে চাপাতির আতংক নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো না। আমার নিরাপত্তার জন্য কত মানুষ নিযুক্ত থাকতো। তাদের নিরাপত্তার চাদর ডিঙিয়ে চাপাতিতো দূরে থাক, একটা সুঁইও বের হতে পারবে না। আহা! কী যে মজা হতো।
কথাগুলো বলতে বলতে কাজল মাহমুদ টের পেলেন তার শরীরটা ক্রমশ হালকা হয়ে যাচ্ছে। দেহের ভেতরে খুব শূন্যতা অনুভব করছেন। হাত পা নাড়াতে পারছেন না। চোখ দু’টো বুঁজে আসতে চাইছে। ঘোলাটে দেখছেন সবকিছু। বহুকষ্টে ভালো করে চেয়ে দেখলেন তার পুরো শরীর রক্তে ভেজা। রক্ত গড়িয়ে ফুটপাতের পাশে ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। অনেক রক্ত। লাল রক্ত। এর আগে কখনো কাছ থেকে এত রক্ত একসাথে দেখেননি। চাপাতির কোপে হা হয়ে থাকা গালের মাংসে বাতাস লাগছে। খুব শীত লাগছে ওইসব কাটা স্থানে।
তাকে ঘিরে মানুষের জটলা, কেউ কেউ বলছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা। কেউ বলছে একটু সাহস করলেই খুনীদের ধরা যেতো। কেউ বলছে নিশ্চয় ব্লগার, ব্লগার ছাড়াতো কাউকে এভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে না।
মানুষের জটলা থেকে ভেসে আসা শেষের কথাগুলো ঠিকমতো শুনতে পাননি লেখক ও কলামিস্ট কাজল মাহমুদ। নিজেকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। মরে গেলেন। মরে যেতে যেতে কিছু স্বপ্ন দেখেছেন। এটা নতুন কিছু নয়। উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখা ছিলো লেখক ও কলামিস্ট কাজল মাহমুদের অনেকগুলো বদ অভ্যাসের একটি।


প্রধানমন্ত্রীর পোষা বাঘ

লিখেছেন
প্রধানমন্ত্রী বাঘ কিনেছেন। পুষবেন, তাই।
গৃহপালিত বাঘ, খুব সুন্দর, হৃষ্টপুষ্ট। গায়ের পশমগুলো চিকচিক করছে। হলুদের উপর কালো ডোরাকাটা দাগ। কোনরকম তর্জন গর্জন ছাড়াই ভয়ংকর মিষ্টি দেখায়, দারুণ আকর্ষনীয়। তর্জন গর্জন শুধু তখনই করবে, যখন প্রধানমন্ত্রীর সাহসের প্রয়োজন হবে। এখন থেকে সুদর্শন এই বাঘটি প্রধানমন্ত্রীকে সাহস দিবে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সব কর্মকর্তা কর্মচারী ভীষণ আগ্রহ নিয়ে বাঘ দেখছেন, প্রধানমন্ত্রীর বাঘ। তিনি সবাইকে ডেকেছেন তার ক্ষমতা ও সাহসের প্রতীক মনযোগের সাথে দেখে তারপর গুণগান গাইবার জন্য। সবাই গুণগান গাইছে।
– আমার জীবনে দেখা সেরা বাঘ, অকল্পনীয় একটা বাঘ।
– আপা, কী বলবো, সবকিছুই অসাধারণ! কিন্তু চোখের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। বাঘের চোখে আপনার ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি। সমৃদ্ধি ও সুখ শান্তিতে ভরপুর।
– আমি এত প্রগাঢ় ও বিদগ্ধ থাবার বাঘ এর আগে দেখিনি। যেমন থাবার আকার, তেমন তার আকৃতি। এই থাবার প্রভাব বিশাল ও বিস্তৃত হবে। আমি নিশ্চিত।
– এখনো একটা দাঁতও পড়েনি। একেবারে ভার্জিন বাঘ। বুঝা যাচ্ছে বেশ ক্ষিপ্র হবে। প্রথম দেখায় আপনার বাঘের ভক্ত হয়ে গেলাম। আমি মুগ্ধ।
– সত্যি কথা বলতে কী, এর আগে এতো কাছ থেকে কখনো বাঘ দেখিনি। বাঘ পোষার সাহস আছে, এমন কোন মানুষকেও চিনতাম না। বাঘের কথা আর কী বলবো, আপনার কথা ভাবছি। আমি খুব ভাগ্যবান, আপনার কর্মচারী হতে পেরে।
– কোন খুঁত নাই। একদম নিখুঁত। এরকম নিখুঁত বাঘ সমাজে বিরল। কী বলবো, বুঝতে পারছি না। বিশ্বে সেরা একশ বাঘের তালিকা করলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বাঘ নিশ্চিত এক নাম্বারে থাকবে। এটা হলফ করে বলতে পারি।
– আপা, সবাই বলে ফেলেছে। আমি আর কী বলবো। রহমত ভাই’র কথার সূত্র ধরে বলি, এই বাঘ যদি হয় এতো সাহসী, তাহলে সেই বাঘ যার পোষ মেনেছে, সে না জানি কতো সাহসী!
প্রধানমন্ত্রী সবার কথা শুনে খুব একটা খুশি হতে পারলেন না। তার বাসভবনের কর্মকর্তা কর্মচারীরা শুধু বাঘের সাহসের কথা বললো, বুদ্ধির কথা বললো না। একটা বিশেষ ধরনের বাঘ, অর্ডার দিয়ে বানানো। এটা তারা বুঝলোই না! বাঘটি শুধু সাহস ও ক্ষমতার প্রহরী নয়, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ভূমিকাও পালন করবে। তিনি সবার উদ্দেশ্য বললেন, “পৃথিবীতে এই প্রথম কোন শাসক তার উপদেষ্টা হিসেবে একজন বাঘ নিয়োগ দিয়েছে।“ শুনে সবাই বললো – বাহ্, কী অসাধারণ! কী সুন্দর! সাবাশ আপা, সাবাশ।
প্রশংসা অনুষ্ঠান শেষে সবাই যার যার কাজে চলে গেলো। শুক্রবার, ঘরে নতুন গৃহপালিত পশু এসেছে। তাও আবার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। এই উছিলায় আজ সবাই একটু ভালোমন্দ খাবে। ওইদিকে কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আসছেন বাঘের সাথে দুপুরের খাবার খাবেন বলে। তাই দ্রুত রান্না ঘরে গেলো পাচক হোসনেআরা ও রহমত ভাই। কিন্তু হোসনেআরার চেহারায় অনেক সন্দেহ। রান্নায় তার সহকারি রহমত ভাই’র উপরও খানিকটা ক্ষ্যাপা। রহমত ভাই জিজ্ঞাসা করেন – কী হইছে তোর? হোসনেআরা কয় – আপনি যে বাঘের এত প্রশংসা করে আসলেন, বিষয়টা আমার ভালো লাগে নাই। আপনি কি দেখেন নাই বাঘের চোখের চারপাশ কালো করার জন্য বাড়তি কাজল ব্যবহার করা হইছে। এটাতো একটা মেকআপ করা বাঘ। এত প্রশংসার কী আছে!
রহমত ভাই যতটুকু পেরেছেন হোসনেআরাকে সাবধান করে দিয়েছেন। এসব কথা আপার কানে গেলে চাকরি চলে যাবে। এই আরামের কাজ হারাম হয়ে যাবে। বাঘ নিয়ে কারো কোন অসন্তুষ্টি আপায় সহ্য করবেন না। সাফ বলে দিয়েছেন তিনি।
বাঘকে গোসল করাতে হবে। এই পদে গণভবনে কোন কর্মচারী ছিলো না। গতকাল দু’জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। হাশেম আর কাশেম নামে দুই সুঠামদেহী সহোদর যুবক বাঘকে গোসল করাতে নিয়ে গেলো। অসম্ভব খুশী দু’জন। জীবনে বহুবার গরু ছাগল গোসল করিয়েছে, কিন্তু বাঘকে গোসল করানোর সুযোগ পাবে ভাবেনি। একটা বাঘকে গোসল করানোর জন্য কত প্রসাধনী, কত সুগন্ধি, কত আয়োজন! হাশেম কাশেম দেখে আর অবাক হয়।
নাচতে নাচতে জল ঢেলে তোয়ালেতে প্রসাধনী মেখে বাঘের গায়ে ঘষা দিতেই “আল্লাহগো” বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো কাশেম। বাঘের গায়ের রং উঠে যাচ্ছে! হলুদ রং উঠে ধবধবে সাদা হয়ে গেছে। চিৎকার শুনে প্রধানমন্ত্রী চলে আসলেন।
– কী হয়েছে, এত জোরে চিৎকার করো কেন?
– আপা সর্বনাশ হয়ে গেছে। বাঘের গায়ের রং উঠে গেছে। এটাতো সাদাকালো বাঘ!
– তাতে কী হয়েছে? সাদা আর কালো দু’টোই পবিত্র রং। ভালোই হয়েছে।
– কিন্তু আপা, আমার মনে হয় এটা নকল বাঘ। রং করে তেল মেখে পশমগুলো চিকচিকে করে আপনার কাছে বিক্রি করেছে।
– এই কে কোথায় আছিস? এই মূর্খটাকে কে নিয়োগ দিয়েছে? এর চাকরি নট করে দাও। সাহস কত আমার বাঘের গায়ের রং নিয়ে কথা বলে!
কাজের প্রথম দিনই চাকরি খোয়ালো কাশেম। কী দরকার ছিলো অযথা গায়ের রং নিয়ে এত কথা বলার। তাছাড়া গায়ের রং সাদা হলেই কী আর বেগুনী হলেই কী, বাঘটাতো প্রধানমন্ত্রীর। ভাইয়ের জন্য মনের ভেতর খুব দুঃখ অনুভব করলো হাশেম। একা একা পবিত্র বাঘটাকে গোসল করালো। গোসল শেষে দেখে বাঘের গায়ে কালো ডোরাকাটা দাগও নেই। পুরো বাঘ সাদা হয়ে গেছে। এটা দেখে হাশেম আর ভয়ে কিছু কয় না। প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাঘের গোসল করানো দেখছিলেন। হাশেমকে জিজ্ঞাসা করলেন – কী হাশেম, কী বুঝলে?
হাশেম কয় – আপা, বাঘ এবার পুরোপুরি পবিত্র হয়ে গেছে। আর কোন কালো দাগ নাই। কী যে সুন্দর লাগতেছে!
প্রধানমন্ত্রী বললেন- বুদ্ধিমান ছেলে। তোমার চাকরি পাকা।
২.
কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এসেছেন বাঘের সাথে পরিচিত হতে। পরিচয় পর্ব শেষে এখন দুপুরে সবাই একসাথে খাবেন। খাবার টেবিলে প্রধানমন্ত্রী, বাঘ ও মন্ত্রীবর্গ আছেন। সবাই খুব খুশি। এতজন মন্ত্রীর সামনে বাঘকে কিছুটা লাজুক লাজুক মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বললেন এটা হচ্ছে বিনয়। খুব সাহসী, ক্ষমতাশালী ও বুদ্ধিমান হলেও বাঘটা বিনয়ী। অন্তত মনিবের অতিথিদের সামনে। মন্ত্রীরা সবাই বাঘ দেখে যারপরনাই খুশি। সব মন্ত্রীই স্ব-স্ব মন্ত্রণালয় থেকে বাঘের জন্য কিছু বরাদ্ধ দিতে চান।
– আমার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বাঘের খাবারের জন্য মোরগ, হাঁস ও ছাগল সাপ্লাই দিতে চাই।
– তার চাইতে বরং আপনি আর আমার কৃষি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি হাঁস, মুরগি ও ছাগলের খামার করি। আপনার পরিকল্পনার অংশ হতে চাই।
– রেলওয়ের প্রচুর খালি জমি পড়ে আছে। অসভ্য লোকজন বাড়িঘর বানিয়ে দখল করে রেখেছে। আপনাদের খামারের জন্য আমি রেলওয়ের কিছু জমি বরাদ্ধ দিতে চাই।
– এই খামার নির্মাণের জন্য যদি কোন নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করতে হয়, তাহলে আমি বন্দরের শুল্ক বিভাগকে বলে দিবো যেন কোন শুল্ক আদায় না করে। এটা নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সামান্য কন্ট্রিবিউশন।
– এক্ষেত্রে আপনাদের সবার জন্য ফিন্যান্স মিনিস্ট্রি একটা ডিসেন্সি এ্যালটমেন্ট দিবে। এ্যাজ সুন এ্যাজ পসিবল। আসলে পুরো ব্যাপারটা অ্যামাজিং। আই উড লাইক টু এনশিওর মাই এফোর্ট।
এতসব বরাদ্দের কথা শুনে বাঘ সত্যি সত্যি লজ্জা পেয়েছে। লজ্জায় চোখের পাতা নিচের দিকে নামিয়ে বসে আছে। একেবারে মুখ ফুটে বলেই ফেললো – আপনাদের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা আমার জীবনকে ধন্য করেছে। এখানে এসে এমন অনেক কিছু পেয়েছি, যা এর আগে কখনো পাইনি। সব মিলিয়ে আমি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
বাঘের মুখে কথা শুনে সবাই অবাক। তাও আবার অসম্ভব সুরেলা, কানায় কানায় ভরাট দারুন মিষ্টি কণ্ঠ। কী যে ভালো একটা বাঘ কিনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মন্ত্রীরা মনে মনে ভাবছেন, এজন্যই তিনি প্রধানমন্ত্রী আর তারা শুধু মন্ত্রী। পার্থক্যটা যোগ্যতা, মেধা আর দক্ষতার। এমনও হতে পারতো মন্ত্রীদেরকে বাঘ কিনতে পাঠালে তারা বড় সাইজের একটা বিলাই নিয়ে আসতেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বকা খেতেন। বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী তাই বাঘ কেনার কথা আগে কাউকে জানাননি। এমন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে সবাই মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানালেন।
৩.
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। ফর্সা আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত। প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকখানার বারান্দার ছোট্ট বাগানের ফুলগুলো চাঁদের আলোয় হাসছে। সবুজ পাতাগুলো চিকচিক করছে। বারান্দা আলোকিত করে বসে আছেন তিনি ও তার গৃহপালিত বাঘ। তাই এখানে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি আলো। নিরব কিন্তু মুখরিত আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন দু’জনে। নিরবতা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী বললেন-কেমন আছো প্রিয় বাঘ?
– আমাদের সামনে বরকতময় ভবিষ্যত। আপনি সমৃদ্ধ হবেন। আপনার জনগণ সুখী হবে।
– তোমার মত বুদ্ধিমান, স্মার্ট ও সাহসী বাঘের সমর্থন আমাকে খুব ক্ষমতাবান করবে। তাছাড়া বেশ সাহস পাচ্ছি।
-আপনার যত সাহস লাগে নেন। আমার কাছে অফুরন্ত সাহস আছে।
– ক্ষমতার কথা কিছু বলো। আমার আসলে ওটাই দরকার।
– শোনেন, পৃথিবী যেমন সূর্যের চারপাশে ঘোরে, বাংলাদেশের ক্ষমতাও এখন আপনার চারপাশে ঘুরবে। আপনি-ক্ষমতা, ক্ষমতা-আপনি, এভাবে একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবেন। আমি যখন আপনার পাশে আছি, তখন আর কোন ভাবনা নেই। আপনিই ক্ষমতার প্রাণ।
– তা জানি প্রিয়। আমি আর আমার প্রিয় বাঘ একসাথে থাকলে সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
– ঠিক তাই। আমি বলি কী, আপনি একটা সিংহাসন বানান। স্বর্ণের কাঠামোর উপর হীরক খচিত। বাঘ, সিংহ, সূর্যসহ বিভিন্ন শক্তি ও ক্ষমতার আকৃতি আঁকা থাকবে সিংহাসনের গায়ে। সেই সিংহাসনে আপনি বসবেন। আমি বসবো নিচে আপনার পায়ের কাছে। বসে সবার দিকে চোখ রাঙিয়ে করে তাকাবো, আপনি সিংহাসনে বসে মন্ত্রীদেরকে দিক নির্দেশনা দিবেন। দেখবেন কাজ কর্মের গতি পাল্টে যাবে। সবাই খুব কর্মমূখর হয়ে উঠবে। একটা চঞ্চলতা দেখা দিবে। আপনি বলবেন এটা হয়ে যাক, মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যাবে। জাস্ট বলার দেরি আর হওয়ার দেরি। কারণ আপনার পায়ের কাছে বসে থাকবে দুর্নিবার দুর্ধর্ষ, ভয়ংকর ক্ষিপ্র, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন পৃথিবীর সবচে সাহসী বাঘ।
– আহা! সিংহাসনের ডিজাইনটা আমার চোখের সামনে ভাসছে। দারুণ হবে।
– অনেক রাত হয়েছে। আমি ঘুমোতে যাবো। প্রতিদিন রাত দশটায় ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস আমার। আপনিও ঘুমোতে যান।
ঘুমাতে যাওয়ার সময় বাঘ দেখে একটি রুমের দরজা খোলা। সেই রুমে থাকে পিয়নদের কো-অর্ডিনেটর হারুন। কানে কম শোনে, তাই রাতে দরজা খোলা রাখে। যেন কোন প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ডাকলেই সাড়া দিতে পারে। হারুনের রুমের সামনে চারটি ফুল গাছের টব। একটি গাছে অনেক ফুল ধরেছে। সাদা গোলাপ। বাঘটি সোজা গিয়ে সেই টবে ছ্যার ছ্যার করে প্রস্রাব করে দিলো। প্রস্রাবের বিশ্রি শব্দে কানে কম শোনা হারুনের ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে দেখে এই তামাশা। রাগে তার পুরো শরীর গরগর করে কাঁপছে। কিন্তু কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে রইলো। প্রস্রাব শেষ করে বাঘ চলে যাওয়ার পর হারুন গেলো সিনিয়র কর্মচারী শমসের আলীর রুমে। গিয়ে ঘটনাটি বললো। এরকম বিচ্ছিরি ঘটনা শুনে শমসের খুব হতাশ হলেন। প্রধানমন্ত্রী কেন এমন বাঘ কিনলেন, যে বাঘ গাছ দেখলেই কুকুরের মত ছ্যার ছ্যার করে মুতে দেয়! একজন সিনিয়র কর্মচারী হিসেবে এটা কিভাবে মেনে নিবেন, তাই ভাবছেন।
শমসেরের রুমে তার সাথে ভাতিজা সম্পর্কের এক পিয়ন থাকে। নাম জহির। ঘুমের ভান করে সবকিছু শুনেছে। তার সাথে হারুনের সম্পর্ক ভালো না। হারুন অনেক বকাবকি করে জহিরকে। তাই হারুনের উপর রাগ আছে তার। পরদিন সকালে জহির সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, “হারুন ভাই’র ফুল গাছে আপার পবিত্র বাঘ প্রস্রাব করেছে। আর এটা উনি সবার কাছে বলে বেড়াচ্ছেন। হারুন ভাই কি কাজটা ঠিক করলেন?” ব্যস, দুই কান চার কান করে এটা প্রধানমন্ত্রীর কানেও গেলো। তিনিতো মহা ক্ষ্যাপা। কীসব বাজে ব্যাপার। এরা বাঘের নামে কানাঘুষা করে! এটা চলতে দেয়া যাবে না। হারুন, জহিরসহ দশ জনকে ছাঁটাই করে দিলেন। সিনিয়র হিসেবে শমসের আলীকে সতর্ক করলেন। বাগানের মালিকে ডেকে বললেন বাঘের ঘরে এটাচ বাথরুমে অনেকগুলো ফুল গাছের টব দিয়ে দিতে। তার প্রিয় বাঘ যেন প্রকৃতির কাছে গিয়েই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পারে।
একসাথে দশ জনের চাকরি চলে যাওয়ার পর অবস্থা বেগতিক দেখে বাকিদের নিয়ে মিটিং করলেন শমসের আলী। সবাইকে খুব ভালোভাবে বুঝালেন বাঘের বিষয়ে মুখে তালা লাগাতে। এই জিনিস নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না। বাঘ যা খুশি তা বলে বেড়াবে, করে বেড়াবে। সবাই বাঘের কৃতকর্মে সমর্থন জানাবে। কেউ যেন কোন আপত্তি না করে। আপত্তি করলেই চাকরি চলে যাবে। চাকরি বাঁচাতে চাইলে মুখ বন্ধ। সবাই শমসের আলীর পরামর্শ মেনে চলার বিষয়ে সম্মতি দিলো।
কর্মচারীদের মিটিংয়ের কথা জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী খুব খুশি। তার পোষা বাঘ নিয়ে কথা যত কম হবে, ততই ভালো। তিনি চান না তার পছন্দের কিছু নিয়ে খুব বেশি ওজর আপত্তি চলুক। এটা খুবই বিরক্তিকর। তাই এরকম একটা মিটিংয়ের আয়োজন করার জন্য শমসেরকে ধন্যবাদ ও কিছু বকসিশ দিলেন।
৪.
প্রধানমন্ত্রীর জন্য সিংহাসন বানানো হয়েছে। ঠিক যেমনটি চেয়েছেন, তেমন। ক’দিন হলো সিংহাসনে বসে দাপ্তরিক কাজকর্ম করার প্র্যাকটিস করছেন। বাঘ তখন তার পায়ের কাছে বসে থাকে। চোখ রাঙানোর রিহার্সাল দেয়।
বাঘের বলে বলীয়ান প্রধানমন্ত্রীর সাহস বেড়েছে কয়েকগুন। চারদিকে সংস্কার চালাচ্ছেন নিজের ইচ্ছেমত। পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে কথা বলেন। অনেক দেশের তুলনায় তার দেশ এগিয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সব ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে তিনি অন্য সবার চেয়ে দ্রুত দৌড়াচ্ছেন।
দেশে এখন প্রধানমন্ত্রীর বিরোধীপক্ষ বলে কিছু নেই। সব শালা কুপোকাত। তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনরকম আন্দোলন সংগ্রাম নাই। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। যাদের সুখ নাই, শান্তি নাই, তারা চুপ থাকে। কথা কয় না। চোখ তুলে তাকায় না। গোঁ গোঁ করে না।
এই সুযোগে দেশের সব সুখী মানুষ মিলে প্রধানমন্ত্রীর বিশাল এক ভাবমূর্তি নির্মাণ করছে। এই মূর্তি মহাকায়, বিশাল। তার নিচে সবাই তুচ্ছ, ছোট্ট, পতঙ্গসম। দেশের ইতিহাসে তিনি হয়ে উঠলেন এক মহাপরাক্রমশালী অধ্যায়। নিজের ক্ষমতার বাহার দেখে নিজেই হাততালি দেন। হাসেন।
৫.
কিন্তু অবস্থা আসলে খুব একটা ভালো না। যেই বাঘের বলে প্রধানমন্ত্রী আজ ব্যাখ্যাতীত বলীয়ান, সেই বাঘ অসহ্যকর একটা বাঘ। এটাকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারেনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কর্মকচারীরা। করবে কিভাবে? সে কাউকে গান শুনতে দেয় না, বই পড়তে দেয় না, কবিতা আবৃত্তি করতে দেয় না। এমনকি রাতের বেলা জানালা খুলে একটু আকাশের তারা গুনতেও দেয় না। সবকিছুতে তার আপত্তি। বাঘের অত্যাচার সইতে না পেরে কয়েকজন কর্মচারি চাকরি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আর কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়ে চাকরি হারিয়েছে। সর্বশেষ পুরো বাসভবনে শুধু শমসের আলী ও পাচক হোসনেআরা ছিলেন। আজ সকাল থেকে হোসনেআরাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বললেন, জাহান্নামে যাক সবাই। একটা পোষা বাঘ যারা সইতে পারে না, তাদের কারোরই এখানে থাকার দরকার নাই। আমি নিজেই রান্না করতে পারি। নিজের ভাত নিজে রেঁধে খাবো। কোন রাধুনি লাগবে না।
এই অবস্থায় শমসের আলী খুব একা হয়ে গেলেন। এত বড় বাড়িতে দুইজন মানুষ ও একটি পশু। অথচ কিছুদিন আগেও এখানে দুই ডজন কাজের মানুষ ছিলো। তাদের পায়ের শব্দে সারা বাড়ি কাঁপতো। কত মানুষ, কত কাজ, কত কথা। আজ মানুষ নাই, কথা নাই, কাজও নাই। একটি বাঘ একা একা সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কী অশ্লীল, কী নোংরা তার চলাফেরা!
শমসের আলী প্রথম বাঘ দেখেছিলেন ছোটবেলায় ঢাকার মিরপুর চিড়িয়াখানায়। তারপর যৌবনে এসে সুন্দরবন গিয়ে বাঘ দেখেছেন। চিড়িয়াখানার ওই রোগা বাঘটিও অনেক স্মার্ট। আর সুন্দরবনের বাঘেরতো কোন তুলনা নেই। দেখলেই বুকটা সাহসে ভরে যায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ কেমন বাঘ কিনে আনলেন। গায়ের রঙ উঠে যায়, গাছের গোড়ায় প্রস্রাব করে, পঁচা-বাসি মাংস খায়। অলক্ষ্মী অপয়া বাঘটি আসার পর থেকে এই বাড়িতে যেন অন্ধকার নেমেছে। কোন আলো নেই। সব আলো এই ভয়ংকর বাঘ একা গিলে খেয়েছে। এসব আর ভালো লাগছে না শমসের আলীর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার অনেক মায়া। অনেক শ্রদ্ধা। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে শমসেরের অনেক ভয়। নিজের সন্তানের প্রতিও এত খেয়াল রাখেন না, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যত খেয়াল রাখেন।
মন ভরা বিষন্নতা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে শুয়ে আছেন। ঘুম আসছে না। খাঁ খাঁ বাড়িতে রাতের বেলা খুব ভয় লাগে। তাই আলো জ্বালিয়ে রাখেন শমসের আলী। হঠাৎ খেয়াল করলেন প্রধানমন্ত্রীর পোষা বাঘ তার ঘরে। বিছানার পাশে বসে আছে। কখন এসেছে, টেরই পাননি। ভীষন চমকালেন। কী বলবেন কিছু বুঝতে পারছেন না। বাঘটি উঠে দাঁড়ায়।
– তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি যা বলি শুনে যাও। বুঝতেইতো পারছো এই বাড়িতে আর থাকতে পারবে না। সবাই চলে গেছে, তুমিও যাবে। এই বাড়ি সাহসীদের, ক্ষমতাবানদের। তুমি শমসেরের কোন সাহস নাই, ক্ষমতা নাই। মাথায় দুই এক ফোটা বুদ্ধিও নাই। তাহলে এখানে তুমি কিভাবে থাকবে? একদিন না একদিনতো যেতেই হবে। তারচে ভালো আজ রাত পোহানোর সময় চলে যাও। নিজে থেকে না গেলে অপমানিত হয়ে যেতে হবে। এটা কি ভালো হবে? তাছাড়া আমার স্বভাব চরিত্র খুব একটা ভালো না। কোন সময় দুই চার ঘা বসিয়ে দিই, তার ঠিক নেই। এই বুড়ো বয়সে বাঘের ঘা সইতে পারবে না। একদম মরে যাবে।
৬.
রাত পোহানোর আর বেশি দেরি নেই। শমসের আলীর চোখে জল। এভাবে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিতে হবে ভাবেননি। এমনিতেও আর বেশিদিন চাকরি করতে পারতেন না। বড়জোর এক বছর। কিন্তু সেই বিদায় এমন হতো না। এখন এই বাড়িতে শমসের আলীকে বিদায় দেয়ার জন্য একজন মানুষও নেই। প্রধানমন্ত্রী ঘুমে। তার পোষা বাঘ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে শমসের আলী বেরিয়ে যাচ্ছে কিনা। বিদায় বেলায় এমন একটা বিশ্রি বাঘ সাক্ষি হিসেবে দাঁড়িয়ে রইলো, মেনে নিতে পারছেন না তিনি। জীবনে এমন কোন পাপ করেননি, যে পাপের ফল এত নির্মম হতে পারে।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সবচে প্রবীণ এবং সর্বশেষ কর্মচারী শমসের আলী বিদায় নিলেন। এখন পুরো বাড়িতে মহাপরাক্রমশালী প্রধানমন্ত্রী ও তার পোষা বাঘ ছাড়া আর কেউ নেই।
প্রধানমন্ত্রী ঘুম থেকে উঠে শমসেরকে না পেয়ে কিছুটা নাখোশ হলেন। মনে মনে বললেন, শমসের তুমিও! তুমিও থাকতে পারলে না!! একটা বাঘ সইতে পারলে না, শমসের!!! শমসেরকে না পেয়ে বাঘের ঘরে গিয়ে দেখলেন বাঘও নেই। খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে দেখেন সিংহাসনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে তার গৃহপালিত পোষা বাঘ। দেখে প্রথম ধাক্কায় ব্যাপারটা হজম করতে পারেননি। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ নিয়ে হাসতে হাসতে বলার চেষ্টা করলেন, – বাহ্, তোমাকে খুব মানিয়েছে।
– তাই নাকি! ভালোতো। তো আসো, তুমি আমার জায়গায় বসো। দেখি তোমাকে কেমন মানায়।
“তুমি আমার জায়গায় বসো।“ মানে প্রধানমন্ত্রীকে বাঘের পায়ের কাছে বসতে বলছে! পোষা বাঘের মুখে এমন কথা শুনে এক অচেনা শংকার বিষে নীল হয়ে গেলেন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা মহাকায় প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না তার প্রিয় বাঘ সত্যি সত্যি এমন করছে কিনা, নাকি স্বপ্ন দেখছেন। বুঝতে পারছেন না এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত। এই বিশাল বাড়িতে আর কেউ নেই। খুব একা লাগছে তার। বাঘের আচরণ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না।
– এমনই হওয়ার কথা ছিলো। আমি তোমার পায়ের কাছে বসে বসে সাহস দেয়ার চাইতে নিজের সাহসে সিংহাসনে বসা বেটার না? তাছাড়া দেশটাতো আসলে আমরাই চালাই। এই দেশে আমার স্বজাতির শাসন কায়েম হবে, এই স্বপ্নতো আজ কালের নয়।
এই কথা বলে সিংহাসনে বসে খুব ভয়ংকরভাবে হাসছে প্রধানমন্ত্রীর বাঘ। বিদঘুটে গলার স্বর, অচেনা অঙ্গভঙ্গি। এটা বাঘের সাথে যায় না। বাঘের অঙ্গভঙ্গি এমন হয় না। সবকিছু কেমন গোলমেলে ঠেকছে।
– ভালো, ভালো। গোলমেলে ঠেকা ভালো। মাত্রতো শুরু হলো। আরো কতকিছু যে গোলমেলে ঠেকবে! বোকা প্রধানমন্ত্রী!
আবার সেই ভয়ংকর বিদঘুটে হাসি। এবার বিস্ময়ের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো যখন দেখলেন সিংহাসন থেকে উঠে তেড়েফুড়ে প্রধানমন্ত্রীর বাঘ তার দিকে এগিয়ে আসছে। এটা নিশ্চিত আক্রমণের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসা। এবার চূড়ান্ত ভয় পেলেন তিনি। কৌশলে পিছু হটে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে যা দেখলেন, তা দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রস্তুত ছিলেন না। এমদমই না। তার পোষা বাঘ আসলে বাঘ নয়। অন্য কিছু। ছদ্মবেশ ধারণ করে ছিলো। শরীর থেকে এক এক করে ছদ্মবেশ খুলছে আর ভয়ংকরভাবে হাত পা ছুঁড়ে নাচছে। ভয়ে, আতংকে প্রধানমন্ত্রী কাঁপছেন। রাগে ক্ষোভে ফুঁসছেন। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিচ্ছেন। বাঘের মুখোশ পরা আস্ত একটা হায়েনা কিনে এনেছেন পোষার জন্য। ছদ্মবেশ খুলে হায়েনা এখন পুরো বাসভবনে তান্ডব চালাচ্ছে। সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। উপায় না দেখে ফোন দিলেন তার সেনাপ্রধানের কাছে।
– খুব বিপদে আছি। আমাকে উদ্ধার করুন। আমার অনেক দামে কেনা হায়েনা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাকে থামান।
– কী বলছেন এসব! হায়েনা পেলেন কোথায়? আমরাতো শুনেছি আপনি খুব সুন্দর, বিচক্ষণ, সাহসী বাঘ কিনেছেন পুষবেন বলে।
– ওটা বাঘ নয়। ওরা বাঘের মুখোশ পরিয়ে আমাকে একটা ভয়ংকর ধুরন্ধর হায়েনা ধরিয়ে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি।
ফোন রেখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে একা একা হায়েনার তান্ডব দেখছেন, আর সৈন্যবাহিনীর অপেক্ষা করছেন বিপদগ্রস্থ প্রধানমন্ত্রী। সবমিলিয়ে হয়তো তিনি একা নন, কিন্তু সবাইকে আগেই তাড়িয়ে দিয়েছেন।