লিখেছেন -ফিনিক্স পাখি
সৃষ্টি জগৎ কে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা মানুষের সহজাত। যেদিন থেকে মানুষের
টিকে থাকাটা বন্য জীব জন্তুর থেকে কিছুটা উন্নত হল সেদিন থেকেই মানুষ
আশেপাশের জগতের দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো, তার মনে উদয় হল প্রথম দার্শনিক
প্রশ্ন- ‘আমি কে?’, আমি কোথা থেকে এলাম?কেন এলাম?এই পৃথিবী এল কোথা
থেকে?প্রশ্ন মনে এলেও উত্তর জানার মত পর্যাপ্ত তথ্য মানুষের কাছে ছিলনা
তখনও। কিন্তু মানুষ শূন্যস্থান পছন্দ করেনা। পছন্দ করেনা বলেই সেই শূণ্য
স্থান পূরণ করল নানা রকম কল্পিত পৌরাণীক কাহিনী দিয়ে, সৃষ্টি হল
ধর্ম-আচার। ধর্ম তাই জগৎ কে ব্যাখ্যা করার প্রথম দিকের একটি হাইপোথিসিস
মাত্র কিন্তু নিঃসন্দেহে সেরা হাইপোথিসিস নয়! ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা
জগতের উন্নতি ঘটলো, বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে হাতে এল পর্যাপ্ত তথ্য।
প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে বাতিল হয়ে যেতে লাগলো পুরানো ব্যাখ্যা গুলো, সৃষ্টি
হল নতুন ব্যাখ্যা, তাও অসম্পূর্ণ ভাবেই কিন্তু পূর্বের তুলনায় উন্নত ভাবে।
হাজার হাজার বছরের জ্ঞান ও দর্শনের রাস্তা পার হয়ে আজ আমরা বিজ্ঞানের চরম
উৎকর্ষের যুগে বাস করছি। এযুগে বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের অগাধ আস্থা, যদিও
অধিকাংশ মানুষের বৈজ্ঞানিক চেতনা নেই বললেই চলে। কিন্তু যেকোন কিছুকেই টিকে
থাকতে হলে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথর পার হয়েই যেতে হচ্ছে আজকাল, এমনকি ধর্ম
কেও! একারণে ধর্মীয় বই গুলোতে ফুটনোটে লেখা হয়- “ইহা বিজ্ঞান মতে
প্রমাণিত”! কিন্তু ধর্ম এবং ধর্ম গ্রন্থ গুলো যেহেতু আদিম অসম্পূর্ণ
হাইপোথিসিস, তাই এগুলো বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু
টিকে আছে বৈজ্ঞানিক চেতনার অভাবে। ধর্মীয় আদেশ ও অবৈজ্ঞানিক পৌরাণীক
কাহিনী গুলোর ‘যৌক্তিক’ ও ‘বৈজ্ঞানিক’ ব্যাখ্যা তৈরি করছে তাই আজ ধর্ম
ব্যবসায়ী, ধর্মগুরুরা। তারা জানে বিজ্ঞানের সত্যায়িত সিল না পেলে
গ্রহনযোগ্যতা হারাবে তারা, তাই কুযুক্তি-ভুল যুক্তি আর গোজামিল দিয়ে ধর্ম
গুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানে ব্যস্ত এই ধর্মীয় লেবাসধারীরা। আর
এভাবেই তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞানের মৌলবাদী ব্যবহার!
সব ধর্মের অনুসারীরাই দাবি করে তাদের ধর্ম গ্রন্থটি বিজ্ঞানসম্মত! অনেকে
এমনও দাবী করে বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কার নাকি অনেক আগে থেকেই তাদের
ধর্মগ্রন্থে বলে দেয়া আছে। বিজ্ঞানের কোন নতুন আবিষ্কারের পরেই তারা দাবী
করে বসে এটার কথা নাকি তাদের ধর্মগ্রন্থে অনেক আগে থেকেই আছে। এই দাবী
প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নানা রকম চাতুরীর আশ্রয় নেয় তারা- ইচ্ছাকৃত এবং
অনিচ্ছাকৃত ভাবে। সেগুলো সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতেই এই লেখার অবতারণা।
বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কারের পরে সেগুলো আগে থেকেই ধর্মগ্রন্থে আছে বলে
দাবীদাররা কিন্তু আবিষ্কারের আগে ধর্মগ্রন্থ খুঁজে সেগুলো বের করতে পারেনা।
তারা যদি এই কাজটি করতে পারত তাহলেই বিজ্ঞানীদের শ্রম, সময় আর অর্থ বেঁচে
যেত! কিন্তু হায়, সে আর হচ্ছে কই! দেখা যাক কী ধরণের কৌশল তারা অবলম্বন
করে-
# অনুবাদের চাতুরীঃ
যেহেতু ধর্মগ্রন্থ গুলো আমাদের মাতৃভাষায় রচিত নয় তাই বিপুল সংখ্যক
পাঠককে ধর্মগ্রন্থ বুঝতে নির্ভর করতে হয় অনুবাদের উপর। আর এই অনুবাদের
সময়ই সব থেকে বড় চাতুরিটি করে থাকা ধর্মের বৈজ্ঞানিক
ব্যাখ্যাপ্রদানকারীরা। ইচ্ছাকৃত ভাবে তারা এমন কিছু শব্দ ঢুকিয়ে দেয় যা
সংশ্লিষ্ট আবিষ্কারের কোন বৈজ্ঞানিক পরিভাষার সাথে মিলে যায়। একটা উদাহরণ
দেয়া যাক।
সূরা ওয়াকিয়া এর আয়াত নং ৬৮-৭০ আয়াতের মূল অনুবাদ হল-
“হ্যা তোমরা দেখ তো তোমরা যে পানি পান কর। তোমরা কি উহাকে মেঘ হইতে
নামাইয়াছ না আমি নামাইয়া থাকি?যদি আমি ইচ্ছা করি, তবে উহা লবণাক্ত করিতে
পারি। তবুও তোমরা কেন আমার শোকর আদায় করিতেছ না?”
এই আয়াতটি আধুনিক ব্যাখ্যাকারের অনুবাদে এসেছে এভাবে-
“তোমরা যে পানি পান কর তার উপর কি তোমরা কখনো চিন্তা ও গবেষণা করেছ?ঐ পানি
কি আমরার মতো নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়া তোমরা মেঘ তৈরি করে বৃষ্টি বর্ষাতে
পারতে?আমি ইচ্ছা করলে নোনা পানির ভিতর থেকে নোনা পানিই বাষ্পাকারে তুলে
নিয়ে নোনা পানিই বর্ষাতে পারতাম। কিন্তু তা করিনা তোমাদের ক্ষতি হবে তাই।
তবু তো তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করনা। ”
পাঠক, লক্ষ করুন- আধুনিক অনুবাদে ‘চিন্তা ও গবেষণা’ , ‘নোনা পানির ভিতর
থেকে নোনা পানিই বাষ্পাকারে তুলে নিয়ে ‘ ইত্যাদি অংশ উদ্দেশ্যপ্রনোদিত
ভাবে সংযোজিত করা হয়েছে এবং দাবী করা হয়েছে কোরানের এই আয়াতে নাকি পানি
চক্রের কথা উল্লেখ আছে! মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়- এটা খালি চোখেই দেখা যায়,
এখানে পানি চক্রের কোন নিদর্শন নেই। কিন্তু পানিচক্রের নিদর্শন খোজার জন্য
আধুনিক কালে অনুবাদ গুলো করা হয় এভাবেই! আরও একটি উদাহরন-
সূরা সারিয়ার ৪৭, ৪৮ নং আয়াতের মূল অনুবাদ-
“আর আসমান কে আমি আপন হাতে সৃজন করিয়াছি এবং আমি অবশ্যই সব ক্ষমতাই রাখি।
আর পৃথিবীকে আমি প্রসারিত করিয়াছি, আমিই চমৎকার বিছাইতে পারি। ”
সাম্প্রতিককালে বিগ-ব্যাং তত্ত্বের সাথে মিলানোর জন্য পরিবর্তিত অনুবাদ-
“আকাশমন্ডলী, আমি উহাকে সৃষ্টি করিয়াছি ক্ষমতার বলে। নিশ্চয়ই আমি উহাকে
সম্প্রসারিত করেতেছি”। (এই আয়াত দিয়ে মহাবিশ্ব যে সম্প্রসারণশিল এটা যে
কুরানে বলে দেয়া হয়েছে আগে থেকে এই দাবী করা হয়! যদিও এখনও সর্বাধুনিক
তত্ত্ব স্ট্রিং থিউরি নিয়ে কোন আয়াত হাজির করেনি মৌলবাদীরা!)
এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। একদিকে যেমন অনুবাদে ইচ্ছাকৃত ভাবে
পরিবর্তন আনা হয়, অন্যদিকে আয়াত গুলোও ভাসাভাসা, সেখানে অনেক খুঁজে পেতে
‘বিজ্ঞান’ বের করতে হয়! আধুনিক কালের জাকির নায়েক মূলত এই চাতুরিটি সব
থেকে বেশি ব্যবহার করে থাকেন। আসলে এই মৌলবাদী ব্যাখ্যাকাররা যৌক্তিক বলেই
বিশ্বাস করেনা, বিশ্বাস কে পাকা করার জন্য যুক্তি তৈরি করে!
# সংখ্যা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিঃ
এই চাতুরীটি খুব মোক্ষমভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে কারণ
সাধারণভাবে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে, যা অংক কষে দেখানো যায়
তা একেবারেই নির্ভুল! অংকে বা গণিতেও যে গোজামিল বা ফাঁক থাকতে পারে সেটা
তারা ভেবে দেখেনা। যেমন বলা হয়ে থাকে কোরানে সূরা সংখ্যা ১১৪, আয়াত
সংখ্যা শব্দ সংখ্যা অক্ষর সংখ্যা প্রতিটি ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। এরকম গানিতিক
ভাবে সাজানো একটি গ্রন্থ ঐশ্বরিক না হয়ে যায়না! আসলেই কি তাই?
পদ্য আকারের বা ছন্দোবদ্ধ রচনাগুলোর অক্ষর, শব্দ ইত্যাদির সংখ্যা
নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যা দিয়ে বিভাজ্য হতে পারে ছন্দোবদ্ধতার কারণেই। ছন্দ
মেলালে অসচেতন ভাবেও এই মিল চলে আসতে পারে। যেমন পয়ার ছন্দোবদ্ধ রচনাগুলোর
অক্ষর প্রায়ই ১৪, ৭ ও ২ দিয়ে বিভাজ্য। মহাভারত সহ অনেক বিশাল
কাব্যগ্রন্থ প পুঁথি এই ছন্দে লেখা। মূল আরবি কোরানও একটি ছন্দোবদ্ধ রচনা।
সেখানেও এই ধরণের ঘটনা থাকাটা আলৌকিক কোন ব্যাপার নয়।
অনেক সময় অনেক চতুর ব্যাখ্যাকাররা এরকম কিছু সংখ্যার প্রমাণ হাজির করে। সেগুলো মূলত অনুবাদের চাতুরী ব্যতিত কিছু নয়।
# প্রচলিত ধর্মীয় আচার গুলোকে বিজ্ঞানসম্মত বলে প্রচারঃ
রোযার সময় দেখা যায় পত্র-পত্রিকা গুলোতে রোযা কিভাবে শরীরের উপকারি এই
শিরোনামে বিশাল ফিরিস্তি ছাপা হয়। এসময় চিকিৎসকরাও রোযার স্বপক্ষে বলতে
বাধ্য হন! রোযাকে মোটাদাগে স্বাস্থ্যপ্রদ বলা মোটেও ঠিক নয়। এমন কেউ নেই
যে রোযার প্রথমদিকে গ্যাস্ট্রিক বা পেটের সমস্যায় আক্রান্ত হননা। তবে
আমাদের বায়োলজিকাল সিস্টেমের কারণে খুব দ্রুতই তা খাপ খাইয়ে নেয়। হিন্দু
ধর্ম সহ অনেক ধর্মেই উপবাস প্রথা প্রচলিত আছে এবং সকলেই এর পক্ষে
‘বৈজ্ঞানিক’ ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকেন!
হিন্দুদের বিশ্বাস তুলসী গাছে তেত্রিশ কোটি দেবতা থাকে। এরফলে গাছটি
পবিত্র এবং রোগ বালাই থেকে রক্ষা করে। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভেষজ গুণ
সম্পন্ন গাছ, রোগ বালাই দূর করতে এই ভেষজ গুণই যথেষ্ট, তেত্রিশ কোটি কেন,
একজন দেবতারও প্রয়োজন নেই!
# ধার্মিক বিজ্ঞানীদের উদাহরণ প্রদানঃ
ধার্মিক দের আরও একটি প্রিয় ব্যাপার হল যেকসল প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরা
ধর্ম পালন করেন তাদের উদাহরণ টানা, যেন বিজ্ঞানীরা বলেছেন বলেই সেটা সঠিক!
নিউটন কিংবা আইনস্টাইন কিছু বললেই কিন্তু সেটাকে সবাই মেনে নেয়নি, তাদের
কে সেটা প্রমাণ করে দেখাতে হয়েছে। কাজেই কোন বিজ্ঞানী বললেই সেটা সঠিক
ব্যাপারটি এমন নয়, তাকে সেটা প্রমাণ করে দেখাতে হবে। অনেক বিজ্ঞানী আছেন
যারা নিজ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করলেও অন্য ক্ষেত্রে আজন্ম লালিত
সংস্কারের দ্বারাই চালিত হন। এটা কখনই ধর্মের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়! আবার
অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ঈশ্বর বলতে প্রকৃতি বা কোন মহাশক্তিকে বুঝিয়ে
থাকেন, এই ঈশ্বর প্রচলিত ধর্মের ঈশ্বর নন। যেমন, আইনস্টাইন। তিনি ঈশ্বর
বলতে প্রকৃতির মহাশক্তিকে বুঝিয়েছেন কোন প্রচলিত ধর্মের ঈশ্বরকে না।
# বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কে ভুল প্রমাণের চেষ্টাঃ
যে তত্ত্ব গুলোকে কোন ভাবেই ধর্মের সাথে খাপ খাওয়ানো যায়না সেই তত্ত্ব
গুলোকে তখন বাতিল করে দেয় ধর্মীয় চেতনাধারীরা। যেমন, বিবর্তনবাদ।
বিবর্তনবাদের মত একটি প্রতিষ্ঠিত প্রমাণিত তত্ত্ব ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক
বলে একে অস্বীকার করে ধর্মান্ধরা। অবশ্য যতই দিন যাচ্ছে, বিবর্তনের পক্ষে
ততই প্রমাণ জোড়দার হচ্ছে।
বিজ্ঞানের একটি বৈশিষ্ট্য হল এটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। হাজার বছরের
স্বীকৃত কোন তত্ত্ব মুহুর্তেই বাতিল হয়ে যেতে পারে। আর এটাই বিজ্ঞানের
সৌন্দর্য। বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তন কে সাদরে গ্রহণ করেন। কাজেই এখন কোন
কিছুর ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারছেনা মানে এই না যে ভবিষ্যতে পারবেনা।
কাজেই কোন কিছুর ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেই সেটাকে বিজ্ঞানের ত্রুটি হিসেবে
চিহ্নিত করে রহস্যময় আখ্যা দেয়াটা এক প্রকার চাতুরী, যা ধর্ম অনুসারীরা
করে থাকে। তাদের ভাষায়- ‘কোন এক জায়গায় এসে বিজ্ঞান থেমে যায়, সেটাই
স্রষ্টার জগত। ‘বিজ্ঞান থেমে যায় মানে এই না যে সে আর এগোবে না। যতই দিন
যাবে ততই বিজ্ঞানের অতিক্রান্ত পথ বাড়বে এবং তথাকথিত স্রষ্টার জগৎ সংকুচিত
হবে।
যৌক্তিক কষাঘাত থেকে ধর্ম কে বাচাতে মৌলবাদীরা অত্যন্ত সংগঠিত ভাবে কাজ
করে চলছে। এজন্য তারা অর্থ খরচ করতেও কার্পণ্য করছেনা। বাজার সয়লাভ হয়ে
গেছে এদের তৈরি অসংখ্য বই, সিডি, ভিডিও, পত্রিকা ইত্যাদি দ্বারা। মরিস
বুকাইলি নামক এক লেখকে ‘বাইবেল কুরান বিজ্ঞান’ বইটি একটি উদাহরণ। সেখানে
কুরান কে বিজ্ঞান সম্মত করার এমন অনেক অপচেষ্টা লক্ষনীয়। যদিও বুকাইলি
সাহেব নিজে কেন মুসলমান হলেন না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়! আধুনিক কালে
ইন্টারনেট ব্যবহার করেও তারা এই কাজটি করছে। লেখাপড়া জানা অনেক শিক্ষিত
মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। এদের কে প্রতিহত করতে আমাদের কে বিজ্ঞান
জানতে হবে, বুঝতে হবে, বৈজ্ঞানিক চেতনায় নিজেদের কে গঠন করতে হবে এবং এদের
সমস্ত অপপ্রচার কে নস্যাৎ করে দিতে হবে।
মৌলবাদীরা বুঝেছে যে বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু
উভয়ের পথ ও পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অতএব গোজামিল ছাড়া উপায়
কি?একমাত্র সঠিক শিক্ষা আর বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা ভাবনাই এদের প্রতিরোধ করতে
পারে। পথটা সহজ নয়, কখনও সহজ ছিলনা। সেই সক্রেটিস থেকে আজকের অভিজিৎ রায়-
এরই প্রমাণ।
(সহায়ক গ্রন্থাবলি-
১। বিজ্ঞানের মৌলবাদী ব্যবহার- মনিরুল ইসলাম
২। বিজ্ঞানের চেতনা- জে ব্রনোওস্কি
৩। বাইবেল, কুরান, বিজ্ঞান- মরিস বুকাইলি
৪। কোরান শরিফ- অধ্যক্ষ আলী হায়দার অনূদিত
৫। কোরান শরিফ- ইসলামি ফাউন্ডেশন )
মৌলবাদের শিকড়
একজন মানুষ কি জন্ম থেকেই মৌলবাদী হয়ে গড়ে ওঠে?অবশ্যই
না।ধর্ম,ভাষা,প্রথা ইত্যাদি ছাড়াই একটা মানুষের জন্ম হয়।যে পরিবার বা সমাজে
সে লালিত পালিত হয় সেই পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাই তার মধ্যে ভাষা,ধর্ম
আর নানা রকম প্রথার বীজ বপন করে।এরপর সমাজের নানারূপ সংগঠনের পরিচর্যায় সেই
বীজ মহিরূহে রূপান্তরিত হয়।খুব অল্প সংখ্যক মানুষই পরবর্তীতে সঠিক শিক্ষা
লাভ করে সেই প্রথা কিংবা ধর্ম কে চ্যালেঞ্জ করবার সক্ষমতা অর্জন করে।কাজেই
কোন মানুষ মৌলবাদী হবে কিনা,কিংবা হলেও তার মাত্রা কতটুকু হবে সেটা নির্ভর
করে পারিবারিক শিক্ষা তথা শিশুকালে প্রাপ্ত শিক্ষা হতেই।একই ভাবে একজন
মানুষ মুক্তচিন্তা করতে সক্ষম হবে কিনা সেটাও অনেকাংশে নির্ভর করে ঐ
শিশুকালে প্রাপ্ত শিক্ষা হতেই।ছোটবেলা থেকে যদি পরিবারে উদার মানবিক শিক্ষা
প্রদান করা হয় এবং শিশুটি যদি বই কে সঙ্গী করে বড় হতে পারে তাহলে
আপনা-আপনিই তার মধ্যে মুক্তচিন্তা এবং যুক্তিবদ্ধ চিন্তা করার সক্ষমতা তৈরি
হবে।তাই মৌলবাদ বলি আর মুক্তচিন্তা- দুটোর শিকড়ই লুকিয়ে আছে একদম শিশু
বয়সে,পরিবারের শিক্ষায়।আমাদের দেশে মৌলবাদের তীব্র বিস্তার,জঙ্গিবাদ এবং
চরমপন্থা আর সাধারণের ধর্মান্ধতা- সব কিছুর সূত্রপাত ঘটে ঐ শিশুকালেই।
মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া একটি শিশু প্রথমেই শিক্ষা লাভ করে সেই
শ্রেষ্ঠ,তার হিন্দু সহপাঠিটি তার থেকে নিকৃষ্ট।সে আল্লাহর অনুগ্রহ
প্রাপ্ত,শেষ নবীর উম্মত কিন্তু ঐ হিন্দু বন্ধুটি অভিশপ্ত।বেশি গোড়া পরিবার
হলে হিন্দু সহপাঠীটির সাথে বন্ধুত্ব করতেও নিষেধ করা হয় তাকে।এভাবে প্রথমেই
অন্য ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং নিজ ধর্মের ভিত্তিহীন শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে
বড় হতে থাকে সে।তার ভিতরে বপিত এই ঘৃণার বীজে জলসিঞ্চন করে আমাদের শিক্ষা
ব্যবস্থা।কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যবই এ শেখানো হয় ঘৃণার বাণী।সে দেখে ‘ধর্ম
শিক্ষা’ নামে বিষয়টি সবার জন্য এক নয়।সে যে বইটি পড়ছে,তার হিন্দু সহপাঠীটি
সেই বইটি পড়ছেনা।এভাবে সে শিখে যায় ‘বিভাজন’।ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোন
ধর্মের বই-এ অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়নি।অন্য কোন ধর্মের
বই-এ নরকের বিভৎস বর্ণনা দিয়ে শিশুদের মস্তিষ্কের বারোটা বাজানো হয়নি।এভাবে
ছোট থেকে একেবারে মাধ্যমিক পর্যন্ত সে বিভাজন,অন্য ধর্মের প্রতি
বিদ্বেষ,নিজের ভিত্তিহীন শ্রেষ্ঠত্ব শিখতে শিখতে বড় হয় এবং তার মধ্যে এই
ক্ষতিকর চেতনা গুলো চিরস্থায়ী রূপ নেয়।বন্ধ হয়ে যায় চেতনার বিকাশ।এতো বললাম
সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা।মাদ্রাসা শিক্ষার কথা তো বলাই বাহুল্য!
আমাদের দেশে বাঙলা বর্ণমালা শেখানোর আগে শিশুকে শেখানো হয় আরবি
বর্ণমালা,শিশুর বেহেশত নিশ্চিত করতে ছোটবেলায় মোল্লা রেখে কোরান খতমের
ব্যবস্থা করা হয়।এভাবে শিশুটি দুর্বোদ্ধ আরবি অক্ষর চিনে পড়তে পারে ঠিকই
কিন্তু অর্থ তার কাছে অজানাই থেকে যায়! এবং এই ভাষা কে সে গণ্য করে পবিত্র
ভাষা হিসেবে।আরবি ভাষা মাটিতে রাখা যাবেনা,নীচে পড়ে থাকলে তুলে চুমু খেতে
হবে,আরবি ভাষা পবিত্র ভাষা ইত্যাদি বিচিত্র মনস্তাত্তিক অপশিক্ষা তার মনের
মধ্যে আসন গেড়ে বসে।আর তাইতো আমাদের সরকার দেয়ালে প্রস্রাব ঠেকাতে দেয়ালে
দেয়ালে আরবি লিখে রাখার হাস্যকর পরিকল্পনা করতে পারে!
আমাদের দেশে বই পড়ার চর্চাটা খুব কম বলে (যারাও পড়ে তাদের বেশির ভাগের
দৌড় কিছু অপন্যাস পর্যন্তই) এই অযৌক্তিক অপশিক্ষাকে মোকাবিলা করার মত
মানসিক সক্ষমতা শিশুদের মধ্যে গড়ে উঠতে পারেনা।যেসব ছেলেমেয়ে ছোটবেলা থেকে
প্রচুর ‘আউটবই’ পড়ে কিংবা যাদের পরিবারে নানা বিষয়ে নানা রকম বই পড়ার
চর্চাটা আছে সেই ছেলেমেয়ে গুলোর মধ্যে এই সকল অযৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার
সক্ষমতাও তৈরি হয়। একারণেই বাইরের বই কে তথাকথিত ‘গুরুজন’ দের এত
ভয়!লাইব্রেরীকে এত ভয়!সরকার যেহেতু মৌলবাদী চেতনা কে জিইয়ে রাখতে চায়
নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে সেকারণে একটা এলাকায় দশটা মসজিদ স্থাপনে তাদের যে
আগ্রহ,ঐ এলাকায় একটা লাইব্রেরী স্থাপনে সেই প্রচেষ্টা বা বরাদ্দ নেই!ঢাকা
শহরে দশ কিলোমিটারের মধ্যে একশটা মসজিদ পাওয়া যাবে কিন্তু একটাও লাইব্রেরী
পাওয়া যাবেনা।সেই পরিকল্পনাও কারও আছে বলে মনে হয়না।
যেকোন সমস্যা সমাধান করতে হলে আগে সমস্যাটাকে স্বীকার করে নিতে
হয়।তাহলেই সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করা যায়।কিন্তু আমাদের দেশে মূল
সমস্যার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেনা,আমরা বারবার চিৎকার করে বললে আমদের গলা
টিপে ধরছে রাষ্ট্রযন্ত্র।মূল সমস্যাকে জিইয়ে রেখে একশ জঙ্গিকে ফাঁসিতে
ঝুলালেও কোনই লাভ হবেনা।এই সমস্যার সমাধান ব্যক্তি উদ্যোগে করা যাবেনা।এর
জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দরকার।’নৈতিক শিক্ষা’ বিষয়টাকে রেখে ধর্ম শিক্ষা
অংশটুকু জাতিয় পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিতে হবে।রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিক কে
নৈতিক করে গড়ে তোলা,ধার্মিক করে নয়।ধর্ম নাগরিকের ব্যক্তিগত
ব্যাপার,নাগরিকগণ সেটা ব্যক্তিগত ভাবে চর্চা করবে।রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমে
ধর্ম শিক্ষা রাখার কোন যৌক্তিকতা নেই।বরঞ্চ এর স্থলে নৈতিক শিক্ষাকে জোরদার
করা জরুরি।ধর্মের প্রসারে সরকার যেভাবে অগ্রগামী,শিক্ষার প্রসারে তেমনটি
নয়।প্রতি উপজেলায় একটি মডেল মসজিদ এর থেকে একটি মডেল লাইব্রেরি দেশের
উন্নয়নের সম্ভাবনা হাজার গুণে বাড়িয়ে দেবে।সরকারের কি সেরকম কোন পদক্ষেপ
আছে?
ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের
কাজ চলছে দেশে।কিন্তু সেগুলো অপ্রতুল।রাষ্ট্রীয় ভাবেই এই কাজটি করতে
হবে।মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার দাবি আজকের নয়।কিন্তু সরকার সেই দাবিতে
কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করেনি।যদি করত তাহলে আজকে হয়তো মৌলবাদের এই
আস্ফালন দেখতে হতনা।
মৌলবাদী চিন্তার বিপরীতে আধুনিক যুক্তিবাদী মানবিক চেতনা গড়ে তোলা সম্ভব
সুশিক্ষা-প্রচুর পরিমাণে বই পড়ার অভ্যাস আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের
মাধ্যমে।ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পর্যায়ে এই আন্দোলন চললেও সামগ্রিক ভাবে
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এমন কোন পদক্ষেপ নেই।যেমন,মুক্তমনা একটি সাংস্কৃতিক
লড়াইয়ের উদাহরণ।আমাদের বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্লগ ফোরাম গুলো এর উদাহরণ।পাড়ায়
মহল্লায় ব্যক্তিউদ্যোগে গড়ে তোলা লাইব্রেরী গুলো এর উদাহরণ,গ্রাম পাঠাগার
আন্দোলন এর উদাহরণ।যেহেতু মৌলবাদী গোষ্ঠিটি দলে ভারি এবং শক্তিশালী তাই
তাদের বিরূদ্ধে যারাই দাঁড়াবে তাদের উপরে নেমে আসবে অত্যাচারের খড়গ।তেমনটিই
দেখতে পাচ্ছি আজ আমরা।হুমায়ুন আজাদ স্যার থেকে দীপন- এই যুদ্ধেরই
শহীদ।লড়াইটা অসম কিন্তু নিঃসন্দেহে আমরা শুভ শক্তি।আর ইতিহাস সাক্ষী যে শুভ
শক্তির জয় অবশ্যাম্ভাবী।
রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের বিপক্ষে।কাজেই লড়াইটা আরও কঠিন।থেমে গেলে
চলবেনা।ব্যক্তি উদ্যোগেই আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে- নিজ নিজ পরিবার,নিজ
নিজ এলাকা মহল্লা থেকে,নিজ নিজ গন্ডী থেকে।এতে জীবন সংশয় হতে
পারে,হচ্ছেও।কিন্তু পিছুহটার উপায় নেই।কারণ আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা আমরা
লাভ করিনা,অর্জন করে নিতে হয়।কাজেই মুক্তচিন্তার মানুষদের দায়বদ্ধতাও অনেক
বেশি।সেই দায়বদ্ধতা থেকেই মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েও আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে
হবে।আপাত কলম-চাপাতির এই অসম লড়াই!