Wednesday, October 24, 2018

ধর্মালয় নয়, প্রয়োজন মানবালয়…

লিখেছেন: সুমন চৌকিদার।
প্রাতঃস্মরণীয় কবিগুরুর কয়েকটি বাক্য:
“…আমাদের জাতি যেমন সত্যকে অবহেলা করে, এমন আর কোনো জাতি করে কি না জানি না। আমরা মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া অনুভব করি না। মিথ্যা আমাদের পক্ষে অতিশয় সহজ স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে। আমরা অতি গুরুতর এবং অতি সামান্য বিষয়েও অকাতরে মিথ্যা বলি। … আমরা ছেলেদের সযত্নে ক খ শেখাই, কিন্তু সত্যপ্রিয়তা শেখাই না– তাহাদের একটি ইংরাজি শব্দের বানান ভুল দেখিলে আমাদের মাথায় বজ্রাঘাত হয়, কিন্তু তাহাদের প্রতিদিবসের সহস্র ক্ষুদ্র মিথ্যাচরণ দেখিয়া বিশেষ আশ্চর্য বোধ করি না। …তাহাদের সাক্ষাতে মিথ্যাকথা বলি ও স্পষ্টত তাহাদিগকে মিথ্যাকথা বলিতে শিক্ষা দিই। আমরা মিথ্যাবাদী বলিয়াই তো এত ভীরু! এবং ভীরু বলিয়াই এমন মিথ্যাবাদী। …স্পষ্ট করিয়া সত্য বলিতে পারি না বলিয়া আমরা এত হীন। …মিথ্যা আমাদের গলায় বাধে না বলিয়াই আমরা এত হীন। সত্য জানিয়া আমরা সত্যানুষ্ঠান করিতে পারি না বলিয়াই আমরা এত হীন। পাছে সত্যের দ্বারা আমাদের তিলার্ধমাত্র অনিষ্ট হয় এই ভয়েই আমরা মরিয়া আছি।”
যে দেশে সত্যের চর্চা নেই, সেখানে সত্যবাদিতা আশা করা বোকামি। সত্য বন্দি বলেই আমাদের হৃদয় বাড়ে না বরং সংকুচিত হয়। ধর্মশিক্ষার অবস্থাও তাই। কারণ ধর্ম সত্য প্রকাশে বাধা দেয়। কুসংস্কারগুলো ধামাচাপা দেয় বলেই সমাজে এর কোনো সুফল নেই। অর্থাৎ ধর্মের যেটুকু ভালো, সেটুকুর প্রভাবও এখন মানুষের উপর নেই।
লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি যতোটা চলে তারচেয়ে বেশি শব্দ করে। ধর্মও যতোটা না মানুষের উপকারে লাগে, তারচেয়ে বহুগুণ এবং অবিরতভাবে হৈচৈ-চেঁচামেচি করে জানান দেয়! অর্থাৎ উম্মাদনা সৃষ্টি, চেঁচিয়ে, দাপিয়ে, ধমকিয়ে দেখানে ও শেখানো, গোল বাঁধানো, গ্যালন গ্যালন অ্যালকোহল পান করানো…। সবকিছুতেই ঝনঝন, ঠনঠন, ঝরঝর, কড়কড়, ধরমার… শব্দ। কুফলগুলো বোঝাতে চাইলেও গোল বাঁধে। তবে এসব মোটেও অযথা নয়। ফলে ধর্মের ভয়ে সকলেই ভীত। যারা মানে না, তারাও! কারণ প্রাণের চেয়ে বড় কিছুই হতে পারে না।
শতকোটি মুখ থেকে একযোগে সহস্রকোটি প্রশংসা গ্রহণ যার প্রধান লালসা, না পাইলেই অভিশাপ। এক ইঞ্চিও ছাড় নয়, পুরোটাই চাই, না হলে কঠিন শাস্তি। এ ভয়ে মানুষ সৎ হোক বা না হোক, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই; ওর চাই প্রশংসা, আদার, সম্মান, সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান… কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। ত্যাগ করাও চলবে না। যদিও পরিসংখ্যান করলে দেখা যাবে- ধর্মের কারণে মানুষ সৎ হওয়ার গতি অত্যন্ত নিম্নমুখী। সততা নিম্নমুখী হলেও, ধর্মের গতিবেগ শুধু উর্দ্ধমুখীই নয়, আলোর গতিকেও হার মানিয়েছে! ধর্মের চলা, বলা, প্রচার-প্রসার, চিৎকার, চেঁচামেচি, শোরগোল… এতোটাই বিকট যে, কে কী প্রচার করছে বা বলছে, কাকে ডাকছে… প্রায়ই বোঝা যায় না। গলার শিরদ্বারা ফুলিয়ে চিৎকারের অর্থ বোঝা প্রায় অসম্ভব হলেও, ধার্মিকরা নাকি বোঝেন! আসলে কাজের কাজ কিছুই না। কী শুনলো, কী বুঝলো এসবের গুরুত্ব নেই, যেন শেখানো মন্ত্র প্রথামত কোটিকণ্ঠে চেঁচিয়ে যাওয়াই পূণ্যি।
অথচ ধর্ম পালন ও শেখাই মানুষের প্রধান কর্তব্য নয়। নিজেকে জানাই প্রধান। নিজেকে জানলে, অদৃশ্য-কাল্পনিক ঈশ্বর নামক কোনো জীবের কাছে মাথা নত করার প্রয়োজন নেই। নিজেই ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছু উপলব্ধি করতে পারেন। ফলে তিনি কারো ক্ষতি করেন না, অসৎ উপায়ে ধন-সম্পদ বা চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি… করেন না। কোনোকিছুর কাছে আত্মসমর্পণও করেন না। বিপদে দুর্বল হয়ে কাতর কণ্ঠে কাউকে ডাকেন না। হে ঈশ্বর, হে ঈশ্বর, গুণা/পাপ মাফ কর বলে চিৎকার বা কান্নাকাটিও করেন না, পরকালে (থাকলেও) মহাসুখের আশাও করেন না…। অর্থাৎ কথিত ঈশ্বর খুঁজতে হয় না, বরং ঈশ্বরই (যদি থাকে) তাকে খুঁজবে। কারণ এরূপ হৃদয়ে যে প্রীতি, ভক্তি, দয়ামায়া, স্নেহ-ভালোবাসা, সৌন্দর্য… আছে তা অনন্ত। সেই অনন্তকে যে একবার হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন, তিনিই সফল এবং প্রকৃত মানুষ। অথচ মানুষ ঈশ্বর খুঁজছে ধর্মালয়ে, গৃহের কোণায়, গয়া-কাশি, বৃন্দাবন, মক্কা-মদিনায়…! বিদ্বানরা বলেন, সত্যই সীমা, সত্যই নিয়ম, সত্যের দ্বারাই সবকিছু প্রকাশিত। সত্যের ব্যতিক্রম হলেই সব উচ্ছৃঙ্খল। সত্যের অভাবেই ধর্ম লোকদেখানো পালনীয় অভ্যাসে পরিণত। অথচ কোনোকিছুই পালন করলেই হবে না, অন্তরে লালন/ধারণ করতে হবে। যদিও পালন করা সহজ কিন্তু লালন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি- কঠিনকে নয়, সহজকেই গ্রহণ করা। তাই অধিকাংশই কঠিন মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে সহজ ধর্মকেই বেছে নিয়েছে। অথচ ঈশ্বরদের প্রয়োজন মানুষের নেই, বরং ঈশ্বরদেরই মানুষের প্রয়োজন! কারণ মানুষ না বাঁচলে, কথিত একটা ঈশ্বরও বাঁচবে না। তাই হয়তো শতকরা ৯৯ ভাগ অসৎ মানুষ (বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের) দেখেও ঈশ্বরেরা কেউই আর (কথিত ওল্ডস্টেটামেন্ট অনুযায়ী) মহাপ্লাবন কিংবা অগ্নিবর্ষণ করে মানুষ ধ্বংস করছে না। বরং আরো অসৎ জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে দেবতারা স্বর্গে কৃষ্ণলীলায় ব্যস্ত, ব্র‏হ্মাস্ত্র নিয়ে অসুরদের উপর আর ঝাপিয়ে পড়ে না। হয়তো রাজনীতিবিদদের ন্যায় ঈশ্বরেরাও মানুষকে অন্যায় করার সুযোগ দিয়ে দল টিকেয়ে রাখতে এবং অনুসারী বাড়াতে ব্যস্ত! কারণ, অন্যায় করার সুবিধা না দিলে, দল ভেঙ্গে যাবে যে!
প্রতিটি ধর্মই মারাত্মকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহংবোধে আক্রান্ত। অংহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার ফলেই মানবতাবোধ থেকে অনেকাংশেই বিচ্যুত। অহংবোধের কারণেই বিধর্মীদের ঈশ্বরের সন্তান ভাবতে পারে না। এমনকি একই ধর্মানুসারী হয়েও নিজেদের মধ্যে ঘৃণা, বিভেদ, বৈষম্য চরমে। অথচ মানুষ এসব বোঝে না; না বোঝাটাও অংহকারের ফল। কারণ প্রচণ্ড অহংকারে আক্রান্ত ও আলো থেকে বিচ্যুত এবং জন্মান্ধ ধর্মের আলোতে আসার ও ভুল-ক্রুটি স্বীকারের সাহস নেই। সুতরাং যা অহংবোধে ভরা, তা সত্য নয় বরং মিথ্যা, নোংরা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন। অথচ এটাই পুরো মানবজাতিকে কৌশলে অহংকারের বিষপান করিয়ে মানসিকভাবে পঙ্গু করে রেখেছে।
ধর্মান্ধ বলেই মানুষ মানবতার চেয়ে ধর্মকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য এবং মানবতাকে ধর্মের নিয়মে বেঁধে রেখেছে। কারণ ধর্মকে বড় করে দেখার অর্থই মানবতাকে ছোট করা। মানবতাকে ছোট করা মানেই, মনুষ্যত্বকে বলি দেয়া। মানুষ যেমনিভাবে প্রতিদিন চিরঅভ্যস্ত ও প্রথামত ঈশ্বরকে ডাকে, তেমনি রাগ, হিংসা, লোভ করে; মোহে পড়ে, ঘুষ-দুর্নীতি, মিথ্যাচার করে…। অথচ ধর্মকর্ম তথা বিধিব্যবস্থার তিলমাত্র ত্রুটি করে না এবং যতোই যুক্তিপূর্ণ হোক, ধর্মের বিপক্ষে যায় এমন কিছু সহ্য করে না! এসব কী আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই দেখছি না? নাকি মানুষ লাগমহীন দুর্নীতি করুক, মিথ্যা বলুক, ঠকবাজ হোক… ক্ষতি নেই, ধর্ম পালন করলেই হলো, অর্থাৎ এতেই ধর্মের সন্তুষ্টি? সুতরাং একই সাথে ধার্মিকতা ও দুর্নীতির মহামারী দেখে মনে হয়- মানব জীবনে ধর্মের প্রয়োজন শুধু ধার্মিক হবার জন্য; মানুষ হবার জন্য নয়। কেননা, মানুষ হওয়ার জন্য মনের পবিত্রতা ও দৃঢ়তাই যথেষ্ট। না হলে, প্রায় শতভাগ ধার্মিকের এই দেশ হতো- পৃথিবীর স্বর্গ!
সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, লোভ ও লাভের মহড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে ধর্মের ঢাক পিটানো দেখে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, সৎ হওয়ার জন্য নয়; নিষ্ঠুর ঈশ্বর ভীতির কারণেই মানুষ ধর্মকর্ম করে। ধর্ম যদি গুণা/পাপের তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা রাখতো এবং কার্যকরি ও চাক্ষুস প্রয়োগ থাকতো, তাহলে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতাম না, বরং খুশি হতাম। কিন্তু এতো নৈতিকহীনতা সত্ত্বেও, ধর্ম স্বমহিমায় টিকেই শুধু নয়, বরং দিনদিনই আরো হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে। তাই মনে হয়, মানবজাতির দুর্ভোগ কোনোদিনও যাবে না বরং বাড়বে।
পূর্বেও বলেছি, ধর্মই একমাত্র বিষয়, যা সঠিকভাবে না পড়ে, না বুঝে… খাঁটি(!) ধার্মিক হওয়া ও থাকা সম্ভব। ফলে ধার্মিকের চিত্ত যে অতিসংকীর্ণ বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকে, যা জানতে/বুঝতে পারেন না। সঠিকভাবে না জানাটা অন্যায় নয়, তবে জানার চেষ্টা না করা অবশ্যই অন্যায়। সুতরাং ধর্মকে সঠিকভাবে জানা সমস্ত মানবজাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি ও মঙ্গলজনক। অথচ ধর্ম মস্তবড় উপকারী, এ ছাড়া মানবজাতির উপায় নেই… সর্বক্ষণ এবং জোরালোভাবে চারিদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ধর্মের গুণগান একমুহূর্তের জন্য থামালেই মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে! ফলে ধর্মের নেশায় নেশাগ্রস্ত ও বিভোর মানুষগুলো একে অত্যন্ত উদার ও অত্যাবশ্যকীয় বলে প্রচার করছে। এসব মিথ্যা প্রচার একেবারে নির্মূল করতে না পারলে, সত্যের মৃত্যু ঘটতেই থাকবে।
ধর্মই মানবজাতির রক্ষক ও উন্নতির সোপান হলে ধর্মহীন ব্যক্তি ও জাতির কেনো এতো উন্নতি হচ্ছে? ধার্মিক ব্যক্তি ও জাতিগুলোরই বা এতো অবনতি কেনো? সন্দেহ নেই কথিত ধর্মে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ, মহান… এ অহংবোধর মধ্যে কী হীনতা, শঠতা নেই? কারণ ধর্মের কী ক্ষতি হচ্ছে, কে করেছে, কেনো করেছে… এসব বিষয়ে সদাসতর্ক কিন্তু মনের দুর্দশার প্রতি কোনো খেয়াল নেই। ভেবে দেখি না, বিধর্মী বা ধর্মহীন জাতির মধ্যে এমন কী গুণ আছে, যার ফলে সেখানে প্রায় সব মহান বিজ্ঞানী, মাহান দার্শনিক জন্মাচ্ছে… অথচ ধার্মিক জাতিগুলোর মধ্যে উল্লেখ করার মতো মানুষ জন্মাচ্ছে না কেনো? কী এমন গুরুতর দোষ-ত্রুটির কারণে ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে বেশিরভাগই স্বার্থপর, মিথ্যাবাদি, অহংকারী, লোভী, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, লুটেরা, ধর্মদানব… সৃষ্টি/জন্ম নিচ্ছে? এসব ভেবে দেখলে ও পরিবর্তনের চেষ্টা করলে জাতি উপকৃত হবে। তাছাড়া আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, অন্যেরটা মন্দ, বারবার, যখন-তখন এরূপ মিথ্যাচারে কোনো সুফল আনতে পারে না। যা প্রমাণিত সত্য।
সবচেয়ে অবাক ও ভয়ানক, এসব কেউ বোঝাতে চাইলেও ধার্মিকরা বুঝতে চায় না। ভয়ানক এজন্যই, যদি কেউ শিশুকালে ধর্মশিক্ষায় সন্ত্রাসী হওয়ার মন্ত্র পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে দিয়ে যেকোনো নৃশংস্য হত্যাকাণ্ড/খারাপ কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব। কেননা ধর্মের বিভ্রান্তিকর শিক্ষার কারণেই- কারো চিত্ত বিকৃত, কারোটা জটিল, কারোটা অত্যন্ত জটিল; অনেকের সহজ-সরল হলেও, যতোটা হওয়ার কথা, ধর্ম কাউকেই ততোটা হতে দেয় না। কারণ হৃদয়কে সংকীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ রাখাই ধর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য। গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে না যাওয়ার জন্য দিবারাত্র সতর্ক ও ভয়ানক ভীতি প্রদর্শন আমৃত্যুই চলতে থাকে। অর্থাৎ ধর্ম মানব চিত্তের স্বাধীনতা দেওয়ার মতো উদার নয়। সেজন্যই ধর্মে-ধর্মে এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও এতো মতপার্থক্য এবং বনিবনা হয় না। হতেই পারে না। কেননা যে শিক্ষা/অভ্যাস পড়ে-জেন-বুঝে নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া; যার আদর্শ/লক্ষ্য/উদ্দেশ্য মাপার/বোঝার… পূর্বে নিজের অজান্তেই গড়ে ওঠেছে, যে শিক্ষার মধ্যে ভালোর চেয়ে মন্দ মোটেও কম নয় বরং বেশি (কুসংস্কার, কুপ্রথা, ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা-পরনিন্দা, গরিমা, হুমকি, লোভ, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার, বাড়াবাড়ি… ইত্যাদি)। অর্থাৎ যে অভ্যাস বাইরে থেকে চাপানো, চিত্ত তা গ্রহণ করে কেবল মঙ্গলজনক কাজে ব্যবহার করবে, না চাইলেও ভুল পথে পরিচালিত করবে না, কিংবা পরিচালিত করার মানসিকতায় প্রস্থত রাখবে না, এর গ্যারান্টি কোথায়?
কারণ সংশয়ের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হলে সুশিক্ষা সম্ভব না। যে ছাত্রটি বেশি প্রশ্ন করে, তার শিক্ষা আর প্রশ্নহীন ছাত্রটির শিক্ষার মান এক নয়। পৃথিবীর প্রায় সব বিষয়কেই প্রশ্নের সম্মুখীন এবং সত্য-মিথ্যার প্রমাণ দিতে হলেও, ধর্মশিক্ষায় যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ। একমাত্র ধর্মের ব্যাপারে এহেন একচোখা নিয়ম, আইন, আচরণ তথা প্রশ্নহীন বিশ্বাসই মানবজাতির সবচেয়ে বড় বোকামি। অথচ এরূপ বোকামিকে মহৎ বলতে ও ভাবতে মানুষের দ্বিধা নেই বরং গর্ব আছে। ভাবখানা এমন- ধর্মে স্বোচ্ছাচারিতা বা ভুলভ্রান্তি আছে থাক না। খোঁজ-খবর বা পড়াশেনার দরকার কী? হোক না এ নিয়ে- বিতর্ক, হিংসা-বিদ্বেষ, অংহকার, লুটপাট, ধর্ষণ, পাশবিকতা, বিকৃত রুচির ও ভয়ংকরতম হত্যাযজ্ঞসহ নানা প্রলোভন, ভয়ভীতি, রক্তাক্ত যুদ্ধ-দাঙ্গা… (যেন এসব ধর্মের অঙ্গ)। দুঃখের বিষয়, এরূপ চিরবিবাদের পরেও তা আন্তর্জাকিতভাবে স্বীকৃত এবং কিচ্ছুটি বলা চলবে না; মহাকাশে তুলে রাখতেই হবে। বুঝলাম, কারো বিশ্বাসে হাত দেয়া উচিত নয়, কিন্তু যখন তা অবিরতভাবে মানবতায় আঘাত করে (শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও), একটি পবিত্র শিশুকে অপবিত্র তথা অহংকারী করে তোলে, ঘৃণা কিংবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ এবং বিধর্মীদের খারাপ বা ছোট ভাবতে শেখায়… তথাপিও চুপ থাকতে হবে! এ কেমন আইন!
ক্ষমা করবেন, নিজে বোকা হলেও, ধর্মের প্রতি এরূপ একপেশে ও অন্ধ সমর্থনের জন্য পুরো মানবজাতিকেই দায়ী করছি! কারণ, সর্ববিষয়েই মানবজাতির অন্ধত্ব এবং বোকামির সীমা আছে; ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার ও সংশোধনের চেষ্টাও আছে। একমাত্র ধর্মের ব্যাপারে বোকামির সীমা-পরিসীমা নেই। যদিও প্রচুর মানুষ আছে, যারা ধর্মের ভুল-ভ্রান্তি বুঝলেও স্বীকার করতে নারাজ বরং ভুল স্বীকারকে আজন্ম লালিত অংহবোধে আঘাত এবং ধর্মের হীনতা, অগৌরব, অপমান… বলে মনে করেন। অথচ এরা প্রত্যেকেই অন্য ধর্মের প্রচণ্ড সমালোচক (প্রকাশ্যে কম, গোপনেই বেশি)। এর প্রধান কারণ, সামান্যতম অপমান (যুক্তিপূর্ণ হলেও) সহ্য না করার মন-মানসিকতা সৃষ্টির মধ্যেমেই শিশুর ধর্মশিক্ষা শুরু, যা আমৃত্যু হৃদয়ের গভীরে চির অম্লান থাকে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ধর্মের ভাগ্য অতি চমৎকার ও বিষ্ময়করই নয়, অতি নিরাপদও বটে। যদিও মানুষের উচিত ধর্মকে প্রশ্রয় না দিয়ে ক্রুশে দেয়া। অথচ ওটাকে কাঠগড়ায় তোলার বদলে তোলা হয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে (তাও নৃশংস্যতম হত্যাকাণ্ডের মতো কিছু ঘটালে)। বলা, ভাবা ও সমর্থন করা হয়- ধর্মের কোনো দোষ নেই, দোষ যা ব্যক্তির বা গোষ্ঠির! অথচ ধর্মই যে আড়ালে থেকে সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, শিক্ষা, আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছে… মানুষের এই সামান্য বুদ্ধিটুকুও ধর্ম খেয়ে ফেলেছে! অধম মনে করে, এটাই মানবজাতির চরম ভুল এবং মানবতার চরম আতঙ্ক! যে আতঙ্কে সারাবিশ্ব ত্রাহিত্রাহি। বর্তমান বিশ্বে এতো ভয়ানক অন্য কোনো বিষয় আছে কী? রাজনৈতিক যুদ্ধও বোধকরি এর নৃশংস্যতার কাছে শিশু। প্রশ্ন হলো- ধর্ম কীভাবে বাঁধাহীন, স্বসম্মানে ও নিরাপদে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে? জানি না, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেনো ধর্মের উপকার-অপকার, প্রয়োজনীয়তা, আদর্শ-অনাদর্শ… নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না; সমীক্ষা বা পরিসংখ্যান করছে না? যথা, ধর্মের কারণে মানুষ কতোটা সৎ ও আদর্শবান হচ্ছে, পক্ষান্তরে অধার্মিক/নাস্তিকরা কতোটা হচ্ছে? অথবা ধার্মিক জাতির আদর্শ এবং অধার্মিক জাতির আদর্শের তফাৎ কতো? ইত্যাদি। এরূপ পরিসংখ্যান থাকলে, নিশ্চয়ই ধর্মের মুখোশ অনেকটাই উন্মোচিত হতো। এতে ধর্মের/ধার্মিকদের কিছুটা হলেও লজ্জা হতো এবং বাড়াবাড়ি, খুনাখুনি, দরিদ্র-অসহায় জনগণসহ সংখ্যালঘু নির্যাতন ও বিতাড়ন অবশ্যই কমতো।
উদাহরণস্বরূপ, প্রায় সব ধর্মরাষ্ট্রগুলোই প্রচণ্ড ক্ষমতালোভী, অগণতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাচারি, একনায়ক কিংবা স্বৈরশাসক দ্বারা শাসিত। স্পষ্টতই এরা আইনের শাসনের চেয়ে ধর্মের শাসন বেশি পছন্দ করে। ফলে ক্ষমতা ধরে রাখতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে, দরিদ্রের উন্নয়নের চেয়ে ধর্মের উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। যদিও তাদের ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্যই বিধর্মীই শুধু নয়, স্বধর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। এরা ধর্ম ব্যবহার করে নানান জঙ্গিগোষ্ঠি সৃষ্টি করা ছাড়াও চিরস্থায়ীভাবে দাঙ্গা লাগিয়ে রাখছে। ফলে (ঘোষিত বা অঘোষিত) প্রায় সব ধর্মরাষ্ট্রগুলোতেই যুদ্ধ-দাঙ্গা, লুটপাট, ধর্ষণসহ বর্বর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং হাজার হাজার শরণার্থী সৃষ্টি করছে। অথচ এসব শরণার্থী নিজ দেশে বা নিজ ধর্মের কাছে আশ্রয় না পেয়ে বিধর্মীদের দেশে ছুটছে (রোহিঙ্গা ব্যতিত)। পালাতে গিয়ে সাগরে ডুবে, মরুভূমিতে শুকিয়ে কিংবা বন্তেজঙ্গলে না খেয়ে মরছে। এতে ধার্মিক রাষ্ট্রগুলোর মহাধার্মিক কর্মকর্তাদের যে তেমন মাথাব্যথা নেই, তা বুঝতে আইনস্টাইন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ এদের প্রধান উদ্দেশ্য ধর্ম বাঁচানো, মানুষ নয়। এরা বিশ্বাস করে- ধর্ম নিয়ে ভাবলেই চলবে, মানুষ নিয়ে মাথাব্যথার বহু বিধর্মী রাষ্ট্র আছে! এরা মহাখুশি যে, মানুষ গোল্লায় যাক আমরা ধর্ম পালন ও রক্ষা করি, ধর্মালয় গড়ি, নিয়মিত-প্রতিদিন এবং বাৎসরিক সব ধর্মানুষ্ঠান করি… সেহেতু, আল্লা/ঈশ্বরেরা (কথিত প্রতিশ্রুতি মতো) অবশ্যই আশির্বাদ করতে বাধ্য! এসব কারণেই তাদেরকে বোকা বলতে এ মূর্খের দ্বিধা নেই। এসব ধর্ম-মদান্ধরা মানুষ মেরে ও তাড়িয়ে ধর্ম পালন করছে। অথচ বিধর্মী দেশগুলো শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে দিতে ক্লান্ত, এদের স্রোত সামাল দিতে প্রচণ্ড হিমশিম খাচ্ছে। অপারগ ও বাধ্য হয়ে নতুন আইন করে থামাতে চাইলেও মানবতার কারণে পারছে না। অথচ ধর্মরাষ্ট্রগুলোকেই শরণার্থীদের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব যেচেই নেয়া উচিত ছিলো। কারণ অসহায়দের সহয়াতা পরম পূণ্যের কাজ, যা ধর্মেই নির্দেশ আছে। এরপরও ধর্মের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েও লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে আশ্রয় ও অন্ন, বস্ত্রহীন বানিয়েও ধার্মিক হিসেবে এবং নিশ্চিন্তেই আছে।
যদি এর উল্টাটি ঘটতো, অর্থাৎ বিধর্মীরা অত্যাচারিত হয়ে ওইসব ধার্মিক দেশেগুলোতে ঢোকার চেষ্টা করতো, তাহলে কী হতো? উত্তর পাঠকদের জন্য রইলো। আবার এসব শরণার্থীদের মধ্যেও বহু ধার্মিক আছে যারা বিধর্মীদের খেয়েপরে বেঁচে আছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধেই মরণ কামড় দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সময় ও সুযোগ বুঝে সাধারণ মানুষগুলোকে নিত্য নতুন কৌশলে কিংবা গাড়িচাপা দিয়ে মরিচবাটা করে ফেলতেও হৃদয় একটুও কাঁপে না বরং সঙ্গে সঙ্গেই গর্বের সাথে স্বীকার করে। কাঁপবেই বা কেনো, এতো যে-সে শিক্ষা নয়, এক্কেবারে খাঁটি ধর্মীয় শিক্ষা! এরাই ধর্ম-মদান্ধ, নিজেদের ভাষায়- ধর্মবীর! কী হিংস্র এদের ধর্মশিক্ষা! এসব স্বধর্মী দানবদের ভয়েই, বেশিরভাগ স্বধর্মী রাষ্ট্র তাদের দরজা চিরতরে বন্ধ রেখেছে। তাদের বর্ডারে গেলে গলাধাক্কা থেকে গুলি পর্যন্ত খেতে হবে জেনেই স্বধর্মীদের দেশে ঢোকার চিন্তাও করে না, বরং দৌঁড়ায় বিধর্মীদের দেশে। কারণ তারা ভালো করেই জানে, স্বর্ধীদের ন্যায় বিধর্মীরা গুলি কেনো, গলাধাক্কাও দেবে না। বরং অনিচ্ছা ও অতিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আশ্রয় দেবেই। এর কারণ তারা ধার্মিক নয়, প্রকৃত মানুষ। কোনো কোনো বিধর্মী দেশ যতোই কড়াকাড়ি করুক, চোখের সামনে মানুষ মরতে দেখলে, আশ্রয় না দিয়ে পারে না। না দিলে, মানবতাবাদি এক্টিভিস্টদের কারণে বাধ্য হয়। এটাই মানবতাবাদিদের প্রকৃত ধর্ম; তারা সাধারণত আইন লঙ্ঘন করে না, কিন্তু মানুষ মরতে দেখলে আইনের তোয়াক্কা করে না। হয়তো বলবেন, ধর্মসন্ত্রাসীরা তো মুষ্টিমেয়। অস্বীকার করছি না, তবে সভ্যতা/মানবতা ধ্বংসের জন্য কয়েকটা দানবই তো যথেষ্ট! যদিও দানবের সংখ্যা কম কিন্তু দানব সৃষ্টির পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রচুর সমর্থক ছাড়াও লাদেন অথবা জাকির নায়েকদের মতো ছোট-বড় বহু ধার্মিকই তৎপর! এরা বহু সাধারণ ধার্মিকদের কাছেই ঈশ্বরতুল্য।
বলছি- ধর্ম যদি একটা দানবও বানায়, তাহলে এর দায়িত্ব ধর্মের অর্থাৎ ধার্মিকদেরই। এ দায়িত্ব মানবতাবাদি কিংবা ধর্মহীনরা নেবে কোনো? এমন অভদ্র-অসভ্য যুক্তি মানবেই বা কেনো? কারণ ধর্ম যখন কোনো ভালো কাজ করে, তখন ধার্মিকরা গর্বে হিমালয়ের ন্যায় ফুলে ওঠে, খারাপ কাজ করলে দায় এড়িয়ে যায়, এসব কী অসভ্যতা নয়? কারণ এটাই- ধার্মিকরা ধর্ম বোঝে, মানবতা বোঝে না। আর মানবতাবাদি/নাস্তিকরা মানুষ বোঝে, ধর্ম বোঝে না। এতোকিছুর পরেও ধার্মিকরা কেবল ধর্ম রক্ষা ও বিস্তারের জন্যই উম্মাদ হচ্ছে, মানবতা তথা মানবধর্মের নাম মুখে আনছে না। অতএব প্রশ্ন- কাদের ধর্ম মহৎ, ধার্মিকদের নাকি মানবতাবাদি/নাস্তিকদের?
দেখুন, ধর্ম-মদান্ধদের বোকামি কতোটা প্রবল। কখন, কেথায়, কী বলতে হয়, বুঝেও না। সবকিছুতেই যেমন ধর্মের গন্ধ পায়, তেমনি ধর্মের আলতা লাগায়। যার বহু উদাহরণের মধ্যে (একজন উচ্চপদস্থর) একটি বক্তব্য:- দেবতা চটে যাওয়াতেই কেরলে বন্যা! বিতর্কিত মন্তব্য আরবিআই কর্তার যাহোক প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, যেখানে খুশি, যেমন খুশি ধর্মানুষ্ঠান কিংবা ধর্মালয় তৈরি করতে চাইলে, প্রায় সকলেই খুশি মনে ও বিনা প্রশ্নে জায়গা-জমি, অর্থ-সম্পদ দিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মানবাধিকার, সত্যানুষ্ঠান, নৈতিক শিক্ষার… জন্য (বিশেষভাবে ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে) একটুখানি জায়গা বা অর্থ চেয়ে দেখুন তো, কতোটুকু পান! অর্থাৎ ঈশ্বরদের অভিশাপের ভয়ে কিংবা অন্ধ মোহের বশে হোক, ধর্মশিক্ষা ও ধর্মানুষ্ঠানের মহামারী চলেছেই। কিন্তু মানবধর্ম শিক্ষায় আগ্রহ নেই। ফলে প্রচণ্ড যানজটের ঢাকা শহরে রাজপথ আটকে ধর্মানুষ্ঠান করলে মানুষ বিরক্ত হয় না বরং খুশিই হয়। আবার অনেক ধর্মালয়ই রাজপথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। জনগণের যতো অসুবিধাই হোক, ধর্মালয় ভেঙ্গে রাস্তা প্রশস্ত করা যাবে না; ধর্মানুষ্ঠান চলতে দিতেই হবে, বরং যেখানে খুশি, যেভাবে খুশি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ওসব করা/গড়া যাবে! অর্থাৎ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা যতোই বাঁধাগ্রস্ত হোক, ধর্মের স্বেচ্ছাচারিতায় হাত দেয়া চলবে না। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধর্মালয় গড়ে উঠুক প্রতিবাদ করাও যাবে না। প্রতিবাদীদের ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে খুনসহ দেশ ছাড়া ও নাস্তানাবুদ করতেও ধর্মের জুরি নেই (যাতে রাষ্ট্রসহ প্রায় সকলেরই সমর্থন থাকে)।
ধর্মের এরূপ বহু স্বেচ্ছাচারিতার জন্য দায়ী- পরিবার, সমাজ এবং ঘোষিত-অঘোষিত ধর্মরাষ্ট্রগুলো। এসব রাষ্ট্রের প্রায় সব সাধারণ মানুষ এবং কর্ণধারেরা ধার্মিক হলেও, দৈন্যতা এবং পরস্পরের প্রতি বৈরিতায় পৃথিবীর সেরা। ফলে তারা বারবার এবং চিরপ্রথা/অভ্যাসমতে একই ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন এবং ধর্মালয় তৈরির চেয়ে মহৎ ও জনহিতকর কাজ খুঁজে পায় না! ধর্মালয় তৈরি ও ধর্মানুষ্ঠানের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচকে হতদরিদ্রদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের… স্থায়ী ব্যবস্থার চেয়েও মহা পূণ্যের কাজ বলে মনে করে (যদিও দান-খয়রাত যৎসামন্য করে)। পাতলা ডাল ও শাক ভাত খাওয়া হাড়জিরজিরে এতিম বাচ্চাদের ধর্মশিক্ষা দেয়াই যেন মহৎ কাজ! অথচ এতিমখানার কর্ণধারদের ভুড়ি দেখলে মনে হবে- হাইব্রিড কোনো দৌত্য! অনেক দেশ (স্বধর্মী) অন্য দেশকেও ধর্মালয় তৈরিতে দান করে, অনুপ্রেরণা যোগায়…। মনে হয় যেন, একমাত্র ধর্ম বিস্তার, রক্ষা, প্রচার… করলেই মানুষ সৎ ও নীতিবান হবে ও থাকবে, অন্যথায় গোল্লায় যাবে। অথচ বাস্তব ফলাফল (ধর্ম পালনে মানুষ কতোটা সৎ হচ্ছে) কখনো পরিসংখ্যান করে না, আমলেই নেয় না। তাছাড়া এসব ধার্মিকদের চরিত্র, আচার-ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে, হয়তো যে ফল প্রকাশ পাবে, তাতে বোধকরি কথিত ঈশ্বর/আল্লাও কেঁপে উঠবে! যাহোক, এসবে ধর্মের কী উপকার হয় জানি না, তবে মানবতার যে চরম সর্বনাশ, সেটা স্পষ্ট।
ধর্মকে আঘত দূরে থাক, সামান্য কটুকথা বললেই ধার্মিকদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। এ নষ্টানুভূতি আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার স্বীকৃত! যা অত্যন্ত দুঃখজনকই নয়, চরম হতাশার এবং ভয়ংকরও বটে। মনে হচ্ছে, ধর্ম ব্যবহার করে মানুষ হত্যায় যে অন্যায় হয়, তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি অন্যায় এর সমালোচনায়। ধার্মিকরা যে ধর্মই বোঝে, মানবতা বোঝে না, এর বহু উদাহরণের দু’টি:- প্রথমত: ১১/০৯/২০০১ থেকে ১১/০৯/২০১৮) পর্যন্ত (১৭ বছরে) ৩৩,৭৮৩টি রক্তাক্ত ধর্ম সন্ত্রাস (যা চলমান ও প্রতিদিনই বাড়ছে)। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ২,০০০টি, প্রতি মাসে প্রায় ১৬৬টি এবং প্রতিদিন প্রায় ৬টি হামলা। এরপরও ধর্ম কীভাবে এর দায় এড়িয়ে যাচ্ছে বোধগম্য নয়। এমন বেহায়া এ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি থাকলে দেখান। কারণ ধর্মের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী, কেনো, কারণই বা কী… ইত্যাদি প্রশ্নগুলো যেমন নিজেরা করেন না, তেমনি শিশুর হার্ডডিস্ক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা হয়। ফলে অন্য সব বিষয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ থাকলেও, ধর্মবিষয়ে আজীবনের তরে মূক ও বধির। এভাবেই মানুষ চিরজীবনের তরে ধর্মের গোলাম হয়ে যায়। আর এ গোলামি থেকে বের হওয়া যে কতোটা কঠিন, কতোটা বিপজ্জনক, তা ধর্ম পরিত্যাগকারী ছাড়া কেউ বুঝবে না। তবে বের হতে পারলে, আত্মার যে প্রকৃত মুক্তি মেলে, তা কথিত স্বর্গপ্রাপ্তির চেয়েও অনেক বেশি আনন্দদায়ক।
দ্বিতীয়ত: বিধর্মী দূরে থাক, নিজের মিথ্যা অহংকার ও অস্তিত্ব রক্ষায় এরা স্বধর্মীদেরও ছাড়ে না। না হলে, ২৫ বছরে সোয়া কোটি স্বধর্মী খুন! এর কারণ ধর্মের অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস। ধর্মের নেশার সাথে যুদ্ধের নেশা ও অহংকারেও মানুষ পূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ধর্মের ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে যুদ্ধ-দাঙ্গা-দখলবাজির ইতিহাস। ফলে ধর্ম ছাড়াও এরা অতি সামান্য বিষয় নিয়েও যুদ্ধ করতেই যেন ভালোবাসে।
এবার মূল প্রশ্ন- যে দেশে যতোবেশি ধর্মালয় এবং ধর্মকর্ম, সেই দেশের মানুষ কী ততোবেশি সৎ? ধর্মের কারণে কী দেশের মানুষ দ্রুতগতিতে সৎ হচ্ছে? দুর্নীতি, ঘুষ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নাস্তিক হত্যা, ধর্ষণ, ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ-ক্ষোভ, মিথ্যাচার… এসব কী কমে যাচ্ছে? নাকি এর উল্টাই হচ্ছে? না হলে, জনগণের অর্থে (বিধর্মীদের অর্থসহ) ৫৬০টি ‘মডেল’ মসজিদ তৈরি করা হচ্ছে কেনো? যে দেশের মানুষ ধর্মশিক্ষা করে সৎ হয়, সেদেশে ৫৬০টি নয়, ৫৬০ লক্ষ ধর্মালয় বানালেও খুশি হতাম। প্রয়োজনে ধর্মের গুণগানে রাস্তায় নামতাম। কিন্তু যে দেশে প্রতি পাড়ায় গড়ে ৪/৫টির অধিক ধর্মালয় (সংখ্যালঘু বাদে), সেই দেশে আরো ধর্মালয়ের প্রয়োজনে কোনো? বাস্তবে কী দেখছি! যতো ধর্মালয়, ততো মতভেদ, বিবাদ, ক্ষমতা ও অর্থের লড়াই… নয় কী? কোনো একটি ধর্মালয় আছে কী, যেখানে নোংরা পলিটিক্স নেই? ধর্মালয়, মাজার/দরগা/আশ্রম/দেবালয়… এসব দখলে রাখতে, হাতাহাতি থেকে মামলা-মোকদ্দমাসহ খুনাখুনি কী হচ্ছে না? এছাড়া, ক্ষমতা ও অর্থের লোভে এক ধর্মজীবি অন্য ধর্মজীবিকে হেয় করতে (প্রকাশ্য বা গোপন) যে কুটচাল চালছে, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তা কী কারো অজানা? তাহলে কীভাবে ও কেনো আশা করছেন- যতো ধর্মালয়, ততো সৎ মানুষ?
আরো প্রশ্ন- বর্তমানের লক্ষ লক্ষ ধর্মালয়গুলো কী মডেল বা আদর্শের নয়? তাহলে, হাজার হাজার বছর ধরে এগুলো কী- অনাদর্শ, অসততা, প্রলোভন, ঘৃণা, হিংসা, অহংকার, কুশিক্ষা, সন্ত্রাসের… শিক্ষা দিয়ে আসছে? এগুলো সব মানদণ্ডহীন বলেই কী দুর্নীতি কমছে না বরং বাড়ছেই? ‘মডেল মসজিদ’বানালে কী এসব বন্ধ হবে বা কমে যাবে? যদি মডেল মসজিদ বানিয়েও বাঙালিদের সৎ বানাতে ব্যর্থ হন, তাহলে- কী করবেন? আরো নতুন নতুন মহা-মডেল মসজিদ বানাতেই থাকবেন? অধমের মনে হচ্ছে- আপনারা ধর্মকে আদর্শ বানাতে মরিয়া, মানুষকে নয়! মানুষ যেহেতু অভ্যাসের দাস, সেহেতু হাজার হাজার বছরের অভ্যাস ছাড়াতে, হাজার হাজার ‘মডেল মসজিদ’ বানালেও হবে না। কারণ মানুষ যেমন ধর্মে শতভাগ অভ্যস্ত; দুর্নীতিতে তারচেয়ে একটুও কম অভ্যস্ত নয়।
গ্যারান্টি দিয়ে বলছি- ধর্ম পালন করে মানুষ ধার্মিক হতে পারে, সৎ হতে পারে না! যদি হতো, তাহলে ধার্মিকরাষ্ট্রগুলো প্রতিটিই বিশ্বের মডেল হতো! কিন্তু… হায়!!! তাই বলছি- মানুষকে আদর্শবান বানাতে হলে, কোন ধর্মালয়েরই প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার পরিবর্তন। অর্থাৎ ধর্ম নয়, সর্বপ্রথমেই শিশুকে নৈকিতকতা তথা মানবিক (মানুষের প্রকৃত ধর্ম) শিক্ষা দিতে হবে। জানি, একথা শুনে ধার্মিকদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে- ধর্ম গেলো, খেয়ে ফেললো… বলে চিৎকার করছেন! ভাবছেন, গর্দভটা বলে কী? ধর্মের পরিবর্ততে মানবিকতা শিক্ষা! হ্যাঁ, বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ধর্মকে কোথায় নামিয়েছে, আর মানবিকতাকে কোথায় উঠিয়েছে! যে কারণে, মূল্যবান জিনিসপত্র হারিয়ে গেলেও থানায় কিংবা নির্দিষ্ট স্থান থেকে বেশিরভাগই খুঁজে পাওয়া যায়। আর আমাদের দেশে, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া আর আকাশের চাঁদ পাওয়া একই কথা (ব্যতিক্রম থাকতেই পারে)! এমনকি চোরাকারবারিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত/জব্দকৃত মালামাল, খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্য, কয়লা, ব্যাংক থেকে অর্থ এবং স্বর্ণও গায়েব চলছেই। যদি আরো প্রমাণ চান, তাহলে তাদের দেশের পরিসংখ্যান দেখুন, কতো পার্সেন্ট ধার্মিক এবং কতো পার্সেন্ট সৎ। আর আমরা ধার্মিকতায় প্রায় শতভাগ হলেও কতো পার্সেন্ট সৎ, নির্লোভ ইত্যাদি।
দয়া করে বুঝতে চেষ্টা করুন, নাগরিকদেরকে আদর্শবান বানানোর জন্য ধর্মের উপর এতো অন্ধ এবং অকুণ্ঠ সমর্থন ও নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি কোনো আলোর গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে? কেনো শত-সহস্র বছর ধরে, আদর্শ মানুষ সৃষ্টিতে ধর্মের চরম ব্যর্থতা ও কার্যকরহীনতা? অতএব, আদর্শ মানুষ তৈরিতে ধর্ম যে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ, তা স্বীকার করাই অতীব মঙ্গলজনক। যা পশ্চিমারা বহু বছর পূর্বেই বুঝেছিলো কিন্তু ধার্মিক রাষ্ট্রগুলো আজে বুঝছে না, যা আপনাদের প্রচেষ্টায় ও কর্মকাণ্ডেই প্রমাণিত! না হলে- সর্বগ্রাসী দুর্নীতির এই দেশে, বাসগৃহের আশেপাশে, যত্রতত্র, এতো ধর্মালয় ও ধর্মশিক্ষার স্কুল-কলেজ… থাকতে কেউ কী আরো ধর্মালয় গড়ে? দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও কী বাকি আছে যেখানে ধর্মের প্রচার/সাইবোর্ড/ব্যনার… বিশেষ করে ধর্মীয় বাণী শোনা যায় না? অতএব আর ধর্মালয় নয়, চাই মানবালয় (মানবিক শিক্ষাকেন্দ্র)। কারণ ধর্মের জাতপাত, বিভেদ, ঘৃণা, হিংসা, বৈষম্য… পূর্বেও ছিলো, আজো আছে, চিরদিনই থাকবে… মানবতায় ওসব নেই। ধর্মে যে নীতি-নৈতিকতা একেবারে নেই, তা বলছি না। কিন্তু ওসব তলানিতে পড়ে থাকে। সমাজে এর তেমন প্রয়োগ নেই। বিশেষ করে ধর্মজীবিদের বিচার-সালিশী করার অধিকার এখন আর তেমন নেই। এর কারণও ধর্মজীবিদের প্রতি সাধারণদের অনাস্থা। কারণ তারা যা করে প্রায়ই তা পক্ষপাতদুষ্ট, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই করে। এছাড়া, ধর্মজীবিরা কতো পার্সেন্ট সৎ সেটাও দেখার বিষয়। অধমের মনে হয় ধর্ম ব্যবসার সাথে যুক্তদের মধ্যে ১%ও সৎ আছে কিনা সন্দেহ।
যাহোক, প্রবাদ আছে, “যার হয়, তার নয়তেই (৯) হয়, যার হয় না তার নিরাব্বইতেও (৯৯) হয় না।” এ অধম মনে করে, শত-সহস্র বা কোটিতেও হয় না। তাই বলছি, কোটি কোটি ধর্ম প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেও মানুষ সৎ হবে না, হতে পারে না, হলে যা আছে তাতেই হতো। এর প্রমাণ কী সর্বত্রই অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে না? কোথায় মানুষের সততা! তাছাড়া মানুষকে সৎ বানাতে ধর্মালয় নয়, প্রয়োজন- কঠিন ও কঠোর আইন প্রয়োগ বিশেষ করে স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা ও কঠিন শাস্তি প্রয়োগ করা। অর্থাৎ ধর্ম বিস্তারে কোনো লাভ নেই, যদি বিচার ব্যবস্থা তথা বিচারক এবং তদন্তকারীরা পাথরের ন্যায় কঠিন সৎ না থাকে। এর প্রমাণ উন্নত বিশ্বের বহু দেশ। যারা কয়েদির অভাবে কারাগার বন্ধ করে দিচ্ছে, আমরা বাড়াচ্ছি। অথচ তাদের সন্তানেরা স্কুলে, কলেজে, পথেঘাটে ধর্ম শিক্ষা পায় না, পায় নৈতিক শিক্ষা আর আমরা পাই ধর্মশিক্ষা! এ দুই শিক্ষার তফাৎ বোধহয় বুদ্ধিমান এ জাতি, আমি মূর্খের চেয়ে কম বোঝেন না। কিন্তু হায়! তবু তালগাছটাই চাই!
কবিগুরুর কথা দিয়েই শেষ করছি:-
“…আমরা যে আগাটায় জল ঢালিতেছি, তাহার গোড়া নাই, নানাবিধ অনুষ্ঠান করিতেছি কিন্তু তাহার মূলে সত্য নাই, এইজন্য ফললাভ হইতেছে না। …আমরা জানি শাস্ত্রেও মিথ্যা আছে, চিরন্তন প্রথার মধ্যেও মিথ্যা আছে, …অনেক সময়ে আমাদের হিতৈষী আত্মীয়েরা মিথ্যাকেই আমাদের যথার্থ হিতজ্ঞান করিয়া জ্ঞানত বা অজ্ঞানত আমাদিগকে মিথ্যা উপদেশ দিয়া থাকেন। ….মন্দ মনে করিয়া ভালোকে দূর করিয়া দিলে দেশের বিশেষ উপকার হয় না, …গোরা ডাকিয়া সিপাই তাড়াইলে, এখন গোরার উৎপাতে দেশছাড়া হইতে হয়! …সত্য সকলের গোড়ায় এবং সত্য সকলের শেষে, আরম্ভে সত্যবীজ রোপণ করিলে শেষে সত্যফল পাওয়া যায়; মিথ্যায় যাহার আরম্ভ মিথ্যায় তাহার শেষ।”
অতএব কবিগুরুর বক্তব্যের মর্মার্থ অনুধাবন করে- ধর্ম নয়, সর্বাগ্রে শিশুর খালি হার্ডডিস্কে সত্যবীজ (মানবধর্ম) রোপণ করাই হোক প্রতিটি মানুষের অঙ্গীকার! নতুবা ধর্মালয় বৃদ্ধিই পেলেও প্রকৃত মানুষ মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজতে হবে!!! কারণ ধর্মের আরম্ভ মিথ্যায়, শেষও মিথ্যায়…! ফলে শিশুকালেই যার হার্ডডিস্ক মিথ্যা দিয়ে ঠাসা হয়, সে আর কোনোদিনও “সত্যের সন্ধান” করে না

Tuesday, October 9, 2018

আলফা α- বিটা β- গামা- γ

লিখেছেন: গাজী ইয়াসিনুল ইসলাম
বিষয়বস্তু- মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
আলফা- যুগে যুগে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারনার পরিবর্তন ও বিভিন্ন বিজ্ঞানীর আবদান।
মহাবিশ্বের উৎপত্তি
বিটা- মহাবিশ্বের ক্রমবিকাশ- নক্ষত্রের জন্ম মৃত্যু পরিনতি এবং গালাক্সীর উৎপত্তি ও গঠন
গামা- পৃথিবীর বিবর্তন, প্রাণের উৎপত্তি ও প্রাণের ইতিহাস

(প্রথম অংশ)
আমরা কোথা থেকে এলাম? এই প্রশ্ন ভাবিয়েছে সব যুগের মানুষকে। সেই আদি বন্য মানুষ থেকে বর্তমান সভ্য মানুষ সবাই চেষ্টা করেছে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে। অনেকেই কল্পনা করেছেন যুক্তি তর্ক ছাড়া, জন্ম দিয়েছেন বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর। কিছু মানুষ তার চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সঠিক ভাবে ভাবতে পেরেছে। এদের বিজ্ঞান মানসিকতার জন্য আজ আমরা বুঝতে শিখেছি সৃষ্টির শুরুতে কী ঘটেছিল, কীভাবে মহাবিশ্ব তার বর্তমান অবস্থায় আসল, প্রাণের ইতিহাস এবং বুদ্ধিমান প্রাণীরা কখন প্রশ্ন করতে শিখল মহাবিশ্ব সম্পর্কে। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের পর থেকে মানুষ নিজেকে রক্ষার জন্যই সর্বদা ব্যস্ত থাকত। এরপর তারা নিজেদের জীবনকে সহজ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভব করতে থাকে। তারা ভাবতে শুরু করে তাদের চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে। দিনের আকাশে সূর্য, রাতের আকাশে চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি নিয়ে গঠিত ছিল তাদের মহাবিশ্ব।
সুমেরীয় সভ্যতা ও চন্দ্র পঞ্জিকা :
টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ ভূমির (মেসোপটেমিয়া) বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে সভ্যতা। যেমন-সুমেরীয়, ব্যাবিলোনীয়, এসেরিয়ান সভ্যতা। এদের মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা সবচেয়ে পুরাতন। সুমেরিয়ানরা প্রথম চন্দ্র পঞ্জিকা (Lunar Calendar) চালু করে ৩২০০ BCE এর কাছাকাছি সময়ে। তারা দিনের হিসাব রাখত আকাশে চাঁদের আনাগোনার উপর ভিত্তি করে। চাঁদের বারটি চক্র (বারমাস) পূর্ণ হলে ঋতুর পুনারাবৃত্তি হয় (বছর) ।এ হিসাব ফসল লাগানো, আবহাওয়ার পরিবর্তন, নদী ও জলাশয়ে পানির পরিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের অবশ্য কোন ধারণাটি ছিল না যে বছর সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর পূর্ণ ঘূর্ণনের কারণে হয়। এক চন্দ্র মাসে উনত্রিশ এবং অর্ধ দিন (২৯.৫) থাকে। ফলে চন্দ্র বছর হয় (২৯.৫x১২) ৩৫৪ দিনে। যা সৌর বছর থেকে ১১ দিন কম। শত শত বছর ধরে তারা বুঝতে শেখে চন্দ্র মাস হিসাব করলে বছর বা ঋতুর আবর্তণ পূর্ণ হয় না। তারা এ সমস্যা সমাধানের জন্য কয়েক বছর পরপর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করে বছর পূর্ণ করত। চাঁদের বিভিন্ন দশার সাথে দিন ও মাসের হিসাব রাখা অতি পুরাতন একটি পদ্ধতি।
মিশরীয় সভ্যতাও সৌর পঞ্জিকা :
চন্দ্র বছর ঋতু আবর্তনের সাথে সম্পূর্ণ মিলে না, তা মিশরীয়রাও পর্যবেক্ষণ করে। ২০০০ BCE এর কাছাকাছি সময়ে তারা সৌর পঞ্জিকা চালু করে। তারা খেয়াল করে যে একটি উজ্জ্বল তারা (যাকে আমরা সিরিস (Sirius) বলি) প্রতি বছর একদিন সকালে সূর্যের সাথে সরাসরি মিল রেখে ওঠে। এই দিনকে তারা নতুন বছরের প্রথম দিন ধরে হিসাব শুরু করে। এই নতুন হিসাব তাদের আরো সূক্ষতার সাথে ফসল বোনা ও নীলনদের বন্যার ভবিষৎবানীতে সাহায্য করত। তাদের গণিতও জ্যামিতিতে অসাধারণ দক্ষতা ছিল।
ব্যাবিলোনিয়ান সভ্যতা ও ভবঘুরে নক্ষত্র :
মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনে হাজার বছরের ব্যবধানে দুটি সভ্যতা গড়ে উঠে।এদের বলা হয় আদি (২০০০ BCE-১৬০০ BCE) এবং নব্য (c.৭৫০- c.৫৫০ BCE) ব্যাবিলোনিয়ান সভ্যতা। পৃথিবীর প্রথম লিখিত আইন ‘কোড অফ হামুরাবি (Code of Hammurabi) (c.১৭৯০ BCE)’ আদি ব্যাবিলোনিয়ান সভ্যতার নির্দশন। ঈশতার গেইট (Ishtar Gate), ঝুলন্ত উদ্দ্যান (Hanging Garden) নব্য ব্যাবিলোলিয়ান সভ্যতার নির্দশন।
আদি ব্যাবিলোনিয়ানদের গাণিতিক পদ্ধতি সম্পর্কে ভাল ধারণা ছিল। তারা দিনকে বার এককের দুইটি সেটে হিসাব করত [c.২০০০ –c.১৮০০ BCE মধ্যবর্তী সময়ে]। আপনি ভাবতে পারেন দিনকে হয়তো দশ এককে ভাগ করে হিসাব করা সহজ হত। কিন্তু কেন আমরা বার গুনিতকএককে দিনকে ভাগ করি? এই ভাগ আমরা অর্জন করেছি আদি ব্যাবিলোনিয়ানদের নিকট থেকে। তারা চন্দ্রের বার চক্রের সাথে বছর পরিবর্তনের মিল রেখেই এই হিসাব চালু করেছিল বলে ধারণা করা হয় (Duodecimal Time Reckoning) । যদিও সভ্যতার পর সভ্যতা পার হয়ে গেছে গেছে কিন্তু মূল ধারণা পরিবর্তন হয়নি।
নব্য ব্যাবিলোনিয়ানরা রাতের আকাশকে খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা দেখেছে অন্যান্য তারা থেকে পাঁচটি তারা অনেক বেশী ঘুরাঘুরি করে আকাশ জুড়ে [৭৫০ BCE এর কাছাকাছি সময়ে] । গ্রীকরা এই জ্ঞান ব্যাবিলোনিয়ানদের নিকট থেকে অর্জন করে। গ্রীকরা এই তারার নাম দেয় Planet বা গ্রহ যার আবিধানিক অর্থ হল ভ্রাম্যমাণ তারা। তখন পাঁচটি গ্রহ সম্পর্কে মানুষের ধারনা ছিল। তবে সে সময়কার মানুষের ধারণা ছিল ন যে গ্রহের নিজস্ব আলো নেই।
এনুমা এলিশ (Enuma Elish):
ব্যাবিলোনিয়ান সৃষ্টি সম্পর্কিত পুরাণ এনুমা এলিশ নামে পরিচিত। এনুমা এলিশের বর্ণনা অনুসারে মহাবিশ্বের আবির্ভাব বিশাল আকৃতিহীন বিশৃঙ্খল জলীয় বিস্তার থেকে। এই আদি পতিত জলভূমি থেকে উন্থিত হয় আপসু (Apsu)- স্বাদু পানির দেবতা এবং তিয়ামাত (Tiamat)- লোনাপানির দেবতা। আপসু ও তিয়ামাত থেকেই অন্য দেবদেবীদের উদ্ভব। এই পুরাণ অনুসারে মারদুক (Marduk) নামক দেবতা পৃথিবী, আকাশ, চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্ররাজি তৈরি করেন।
মিশরীয় পুরাণে সৃষ্টি তত্ত্ব :
মিশরীয় পুরাণ (হেলিওপোলিস ভার্সন) অনুসারে সৃষ্টির আাদিতে ছিলেন নু (Nu)- সীমাহীন শূন্যতা ও অন্ধকার। নু থেকে নিজের প্রজ্ঞা ও সৃষ্টির ইচ্ছা থেকে জেগে উঠল অটম (Atum)। অটম জন্ম দিল শু (Shu) ও টেফনাট (Tefnut) নামের দেবতা। শু এবং টেফনাট মহাবিশ্বে শৃঙ্খলা নিয়ে আসল। এদের সন্তান জেব (Geb) ও নুট (Nut) । প্রথমে জেব ও নুট একতাবদ্ধ ছিল। শু নুটকে জেব থেকে পৃথক করে উপরে তুলে দিল । সৃষ্টি হল পৃথিবী (Geb) ও আকাশ (Nut). এদের সন্তানরা হল বিভিন্ন দেবতা (ওসাইরিস, আইসিস, সেথ) যারা মহাবিশ্ব শাসন করত। অন্যান্য সভ্যতা থেকে মিশরীয়রা মৃত্যু সম্পর্কে একটু বেশীই চিন্তা করত। অমর হবার প্রচেষ্টা এদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। গিজার বড় পিরামিড ত্রয় কালপুরুষের (Orion) কোমরে থাকা তিনটি উজ্জ্বল তারার সাথে মিল রেখেই তৈরি (সে সময়ের অবস্থান অুনযায়ী) । কালপুরুষ রাতের আকাশের একটি পরিচিত নক্ষত্র সজ্জা বা Star Constillation. এটি দেখতে অনেকটা অস্ত্র হাতে যোদ্ধার মত। পিরামিড ত্রয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড়টিতে ফারাও কুফুর (Kufu) সমাধি। এই সমাধি কক্ষ থেকে দুটি ছিদ্র বাঁকাভাবে সরাসরি বাইরে উন্মুক্ত। এই ছিদ্র দুটির এলাইনমেন্ট একপাশে কালপুরুষের কোমরের একটি নক্ষত্র ও অন্য পাশে থুবান (Thuban) নক্ষত্রের সাথে সরাসরি যুক্ত (তখনকার আকাশ অনুসারে). ঠিক যেন কুফুর আত্ম ঐ পথে যাত্রা করে যাবে নক্ষত্র লোকে।

ছবি-১ কুফুর সমাধি ও নক্ষত্র সজ্জার মিল।
গ্রীক পুরাণে সৃষ্টিতত্ত্ব :
First there was chaos, the vast
Immeasurable abyss, outrageous
As a sea, dark, wasteful, wild. [Milton]
সৃষ্টির আদিতে ছিল বিশাল আকারহীন অন্ধকার, সীমাহীন হিংস্রতা, বিভৎস্য বন্যতা। এই বিশৃঙ্খল সংজ্ঞাবিহীন আকারহীনতা কে গ্রীকরা বলতে Chaos। ক্যাওস থেকে জন্ম নিল নিক্স (Nyx) এবং এরিবাস (Erebus) নামের দেবদেবী। নিক্স রাত্রি বা অন্ধকার তুল্য দেবী এবং এরিবাস মৃত্যুর তুল্য দেবতা। এই অন্ধকার ও মৃত্যু থেকে জন্ম হল আলো (Ather) ও দিনের (Hemera) । এদের জন্মের সাথে শূন্যতা, তিমিরও বন্যতা ভেদ করে শৃঙ্খলা, আলো ও সৌন্দর্যের আবির্ভাব হল। পূর্ণতা পেতে শুরু করল মহাবিশ্ব। এরপর এল গেইয়া (Gaea) ও ইউরেনাস (Urenus)। গেইয়া হল ধরনী মাতা এবং ইউরেনাস স্বর্গ পিতা (আকাশ ও পৃথিবী)। এদের থেকে ধীরে ধীরে টাইটান দেবতাদের আবির্ভাব হয়েছিল। এদের দ্বন্দ্ব ও সিংহাসন দখলের ইতিহাস অন্য সময়ে বলা যাবে । এখানে লক্ষ্যনীয় যে মিশরীয় ও গ্রীক পুরাণে সৃষ্টির আদি অবস্থার বর্ণনা প্রায় একই। Chaos বা Nu সীমাহীন অন্ধকার ও আকারহীনতার প্রতীক। এনুমা এলিশে এই প্রাথমিক অবস্হা শুধু পানি দ্বারা পূর্ণ। কিন্তু গ্রীকও মিশরীয় মিথে তা নয়। তবে সবাই বলতে চায় সংজ্ঞাবিহীন একটি অবস্থা থেকেই মহাবিশ্বের সূচনা।
গ্রীক সভ্যতা ও বিজ্ঞান :
দিন ও ঋতুর পরিবর্তন, রাতের আকাশে তারা সম্পর্কে প্রাচীনকালের মানুষের বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণা থাকলেও কুসংস্কারের অভাব ছিলনা। মহাবিশ্ব নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক ভাবে ভাবতে শুরু করে গ্রীক দার্শনিকরা। পূর্বে মানুষ পৃথিবীকে গোলাকার থালার মত মনে করত। গ্রীক দার্শনিকেরা ধারণাদেন যে পৃথিবী গোলাকার। অনেকে বলে পিথাগোরাস (৫৩০ BCE এর কাছাকাছি সময়ে) এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেন। পিথাগোরাস এখনো বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর বিখ্যাত থিওরামের জন্য (সমকোনী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ বাকি দুই বাহুর বর্গের সমান)।
গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (Democritus, ৪৬০-৩৭০ BCE) তত্ত্ব দেন যে, মহাবিশ্ব অসংখ্য অবিভাজ্য ক্ষুদ্রকণা দ্বারা গঠিত। যার নাম দেন Atom.
মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে সর্ব প্রথম ধারনা দেন প্লেটো (Plato, ৪২৯-৩৪৯ BCE)। প্লেটো এবং তার ছাত্র Eudoxus একটি মডেল দাঁড় করান। তবে মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে প্লেটোর আরেক ছাত্র অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ BCE) যে ধারনা দেন তা বেশী প্রচারনা পায়। এটি মূলত প্লেটোর ধারণার পূর্ণ রূপ।
অ্যারিস্টটলের মহাবিশ্ব :
মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের ধারণা নিম্ন রূপ-
ক) পৃথিবী গোলকার ও স্থির।
খ) পৃথিবী এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে একাধিক অদৃশ্য (Transparent) মহাজগাতিক গোলক (celestial sphere) রয়েছে। গ্রহ নক্ষত্র সবকিছুই এই গোলকে বসানো (attested) আছে।
গ) এই মহাজাগতিক গোলক গুলো স্বর্গীয় বস্তু (গ্রহ নক্ষত্র) নিয়ে ঘূর্ণয়মান।
ঘ) তিনি ৪৪ টি ভিন্ন ভিন্ন গোলকের কথা উল্লেখ করেন।
ঙ) মহাবিশ্ব অসীম নয়।
তার ধারণা ছিল উল্কা ও ধুমকেতু পৃথিবীর বায়ুমন্ডলেই সৃষ্টি হয়। পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে বসানোর অ্যারিস্টটলীয় ধারনা বহু বছর ধরে মানুষকে প্রভাবিত করে। কিন্তু কেন অ্যারিস্টটল পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে বসালেন? পৃথিবী থেকে যা কিছু ছুড়ে মারা হয় তা পৃথিবীতে ফিরে আসে। তিনি ধারনা করলেন পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র যার কারনে সব কিছু কেন্দ্রর দিকেই ফিরে আসে।
এরিস্টারকাসের আধুনিক চিন্তা :
সামোসের অধিবাসী এরিস্টারকাস (Aristarchus of Samos, ৩১০-২৩০ BCE) সৌরজগত সম্পর্কে যে ধারনা দেন তা আধুনিক চিন্তার কাছাকাছি। তার উল্লেখযোগ্য অবদান হল-
ক) তিনি চাঁদের ব্যাস পরিমাপ করেন পৃথিবীর একচতুর্থাংশ (সঠিক অনুপাতের কাছাকাছি)
খ) তিনি চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব হিসাব করেন (যা সঠিক পরিমাপের কাছাকাছি)
গ) তিনি সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হিসাব করেন। যদিও এ হিসাব ভুল ছিল। তবে তার পদ্ধতি সঠিক ছিল। সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির অভাবে ভুল পরিমাপ হয়। চোখের উপর ভরসা করে কী সব হিসাব সঠিক হয়। তার পরিমাপ অনুসারে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব চাঁদের দূরত্বের প্রায় ২০ গুণ (আসলে তা ৩৯০ গুন)।
ঘ) তিনি অংক কষে বুঝতে পারেন যে সূর্য পৃথিবী থেকে আকারে অনেক বড় । তিনি তখন ধারনা দেন যে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে সূর্য অবস্থান করছে পৃথিবী নয়। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। তার এ চিন্তা যৌক্তিক হলেও প্রচার পায়নি এরিস্টটলের পৃথিবী কেন্দ্রিক তত্ত্বের জন্য। তবে সে সময়ে এরিসটারকাসের সূর্যকেন্দ্রিক ধারনা ছিল তার মুক্ত চিন্তার প্রতীক। এই সৌরকেন্দ্রিক ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে সময় লেগেছিল প্রায় এক হাজার বছর।
এর এক শত বছর পর সেলুকাস (Seleucus) নামক দার্শনিক আরো যুক্তি দিয়ে সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রচার করলেও তা জনপ্রিয়তা পায়নি।এরাটোসথেনিস (Eratosthenes, ২৭৬-১৯৬ BCE) সর্বপ্রথম জ্যামিতিক ও গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে পৃথিবীর পরিধি মাপেন যা সঠিক মাপের কাছাকাছি।

ছবি-২ পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব মাপার জন্য এরিসটারকাস প্রস্তাবিত পদ্ধতি।
টলেমীর মহাবিশ্ব :
ক্লডিয়াস টলেমী (Claudius Ptolemy, ১০০-১৭০ CE) ছিলেন গ্রীকো-মিশরীয় জ্যোতির্বিদ ও গাণিতবিদ। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার নিকট একটি মানমন্দিরে কাজ করতেন। আকাশে তারা ও গ্রহের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করে তিনি মহাবিশ্বের একটি মডেল দাড় করান। যা মূলত এরিস্টটলীয় মডেলের ভিন্ন রূপ। তার প্রধান কাজ যা বছরের পর বছর তার পর্যবেক্ষণের ফসল তা মূলত পরিচিতি পায় আরবী নাম Almagest (the great system) নামে। তার মতাদর্শ নিম্ন রূপ-
ক) তিনি সূর্য নয় পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। পৃথিবীর চারপাশে বিভিন্ন গোলকে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান। পৃথিবী তার অবস্থানে স্থির।
খ) টলেমীর মতে প্রতিটি গ্রহ দুটি বৃত্তাকার পথে ঘোরে। বড়টিকে নাম দেন Deferent এবং ছোটটিকে নাম দেন Epicycle । Deferent বা বড় বৃত্তাকার পথের কেন্দ্র পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আলাদা ।
গ) গ্রহগুলো ছোট বৃত্তাকার পথে (Epicycle) ঘুরতে ঘুরতে বড় বৃত্তাকার পথও (Deferent) প্রদক্ষিণ করে।
ঘ) গ্রহগুলোর গতির মূল কেন্দ্রকে বলা হয় Equant, যা পৃথিবীর কেন্দ্র ও Deferent এর কেন্দ্র থেকে আলাদা।
এ জটিল পদ্ধতিতে চিন্তার কারণ হল এই পদ্ধতিতে তখনকার সময়ে দৃশ্যমান গ্রহের গতি ও উজ্জ্বল্য ব্যাখ্যা করা যেত। যদিও তা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না।
টলেমীর এই ধারণা প্রায় এক হাজার বছর টিকে ছিল। টলেমীর পর বহু জ্যোতির্বিদের উল্লেখ পাওয়া যায় যারা সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন কিন্তু কোপার্নিকাসের পূর্বে কারো ধারণাই প্রতিষ্ঠা পায়নি।

ছবি-৩- টলেমীর মডেল
[CE = Common/Current Era, Anno Domini বা AD এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়।
BCE = Before Current Era, Before Christ বা BC এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়।
c = Circa, Latin for about or around. সালের পূর্বে ব্যবহার করা হয়]
কোপারনিকাস ও সূর্য :
নিকোলাস কোপারনিকাস (Nicholus Copernicus, ১৪৭৩-১৫৪৩) [এটি তার ল্যাটিনকৃত নাম, আসল নাম নিকোলাই কোপারনিক] বিখ্যাত হয়ে আছেন তার সৌরকেন্দ্রিক(Heliocentric) মহাবিশ্বের ধারনা প্রস্তাবের জন্য। কোপারনিকাসই প্রথম জ্যোতির্বিদ নন যিনি সৌরকেন্দ্রিক ধারণা প্রস্তাব করেন। এরিসটারকাস ১৭০০ বছর পূর্বেই এই ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন। সম্ভাবত কোপারনিকাস তার শিক্ষকের মাধ্যমে এরিসটারকাসের কাজ সম্পর্কে জানতে পারেন। কোপানিকাস ছিলেন একজন ক্যাথলিক যাজক। সৌরকেন্দ্রিক ধারণা বাইবেলের ধারণার পরিপন্থি বলে তিনি এ ধারণা প্রচারে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তবে তার জীবনের শেষ দিকে On the Revolution of Heavenly Sphere প্রকাশের মাধ্যমে সৌরকেন্দ্রিক ধারনা প্রস্তাব করেন। বইটি তার মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রকাশিত হয়।
কোপারনিকাস প্রস্তাব করেন যে
ক) সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং তা স্থির।
খ) সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ গুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরছে।
গ) নক্ষত্রসকল স্থাপন করেন গ্রহগুলোর বাইরে অনেক অনেক দূরের একটি স্তর হিসাবে।
সৌরকেন্দ্রিক ধারণার প্রচারে তার ভূমিকা খুবই কম। বরং কেপলার ও গ্যালেলেও এই ধারনা প্রতিষ্ঠিত করেন। তাছাড়া তার ধারণায় অনেক ভুল ছিল। যেমন-তিনি মনে করতেন সূর্য স্থির এবং গ্রহ গুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরছে। দুটো ধারণাই ভুল। আবার সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। মহাবিশ্বের অসীম, এর কোন কেন্দ্র নেই।
টাইকো ব্রাহি
টাইকো ব্রাহি (Tycho Brahe,১৫৪৬-১৬০১) ছিলেন ড্যানিশ জ্যোতির্বিদ। তিনি খালি চোখে রাতের পর রাত আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছেন । বহু বছরের পর্যবেক্ষণের ফলে তিনি বিশাল ডাটা সংগ্রহে সমর্থ্য হন। ১৫৭২ সালে তিনি আকাশে হঠাৎ নতুন তারার আগমন পর্যবেক্ষণ করেন (এখন আমরা জানি, এটি ছিল সুপারনোভা)।
বহু বছরের পর্যবেক্ষণের পর তিনি নিজেই একটি মডেল দাঁড় করান। যার কেন্দ্রে পৃথিবী। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চন্দ্র ও সূর্য ঘুরছে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে বাকি সব গ্রহ ঘুরছে।

ছবি-ব্রাহির মডেল
কেপলার ও গ্রহ সমূহ :
I measured the havens, now I measure the shadows
Skyward was the mind, the body rests in the earth.
[কোপলারের এপিটাফে এই কথাগুলো লেখাছিল। এ কথাগুলো তার নিজের লেখা]
জোহানেস কেপলার [Johannes Kepler, ১৫৭১-১৬৩০] ছিলেন একজন মুক্তচিন্তাবিদ বিজ্ঞানী, তার সারা জীবনের কাজ খুব সুন্দর ভাবেই এপিটাফের বাক্য দুটিতে ফুটে উঠেছে। টাইকো ব্রাহির মৃত্যুর পর তার সংগ্রহ করা বিশাল ডাটা কেপলারের হাতে আসে। তিনি ডাটা গুলো ব্যবহার করে এমন একটি মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন যাতে গ্রহগুলোর গতি ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মডেলকে মানদণ্ড হিসাবে ধরে নেন। তবে বৃত্তাকার পথে গ্রহ প্রদক্ষিণ করলে তাদের গতি ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি দেখলেন যে, উপবৃত্ত (Ellipse) বা ডিম্বাকার কক্ষপথে গ্রহ ঘুরলে গতি ব্যাখ্যা করা সহজ হয়। উপবৃত্তকে বিকেন্দ্রিক বৃত্ত বলা যায়। উপবৃত্ত ডিম্বাকৃতির হয়। এর দুটি ফোকাই (foci, একবচনে focus) থাকে। ডিম্বাকৃতির হওয়ায় এর ব্যাস সবখানে সমান নয়। তাই এর বড় (major) এবং ছোট (minor) অক্ষ (axis) নামে দুটি অক্ষ থাকে। ফোকাস দুটে যতই দূরে সরে যায় উপবৃত্ত ততই ডিম্বাকৃতির হতে থাকে। ঠিক উল্টো ভাবে ফোকাস দুটোর দূরত্ব কমতে থাকলে তা বৃত্তের মতই দেখায় এবং ফোকাস দুটো একবিন্দুতে মিলে গেলে তা বৃত্তে পরিণত হয়। তখন অক্ষ দুটো সমান হয়ে যায়। গ্রহ গুলো সূর্যকে একটি ফোকাসে রেখে প্রদক্ষিণ করে। প্রতিটি গ্রহরে উপবৃত্তাকার পথের বিকেন্দ্রিকতা খুবই কম। পৃথিবীর কক্ষ পথের বড় ও ছোট অক্ষের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য মাত্র ০.০১৪% । এই সামান্য পার্থক্যই গ্রহের গতি অনেক বদলে দেয়। কেপলারের আগে কেউ এইভাবে উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কথা চিন্তা করেনি।
১৯২১ সালে কেপলার গ্রহের গতি সম্পর্কিত তিনটি সূত্র দেন। এই সূত্র নিউটনকে তার গ্রাভিটির সূত্র দাঁড় করাতে অনেক সাহায্য করেছিল।

ছবি-উপবৃত্ত
গ্যালেলে ও এবং বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদের নাচ :
সৌরকেন্দ্রিক মডেল প্রতিষ্ঠার পেছনে আরো একজন বিজ্ঞানীর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হলেন গ্যালেলেও গ্যালেলেই (Galileo Galilei, ১৫৬৪-১৬৪২)। গ্যালেলেও টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন। [টেলিস্কোপ আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব ডাচ লেন্স করিগর হ্যান্স লিপার্শেকে দেওয়া যেতে পারে। লিপার্শে উত্তল লেন্স ব্যবহার করে দূরের বস্তুকে দেখার পদ্ধতি বের করেন। গ্যালেলেও শুধু পদ্ধতি একটু পরিবর্তন করে আকাশ দেখার জন্য ব্যবহার করেন।] টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের দিকে চোখ দিলেই নতুন জগৎ। আগে যা খালি চোখে ধরা পড়েনি তা গ্যালেলেও দেখতে শুরু করলেন। চাঁদকে আমরা অতি সুন্দর হিসাবেই জানি। কিন্তু গ্যালেলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলেন চাঁদের আসল রুপ। তিনি চাঁদের গায়ে পাহাড় ও খাদ সম্পর্কে ধারণা দেন। চন্দ্রপৃষ্ঠ মোটেও সমতল নয়। চাঁদের সৌন্দর্য শুধু কবিদের বাণিজ্যিক প্রচারণা। এই সত্য গ্যালেলেও প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন । তিনি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের দিকে টেলিস্কোপ দিয়ে বললেন এটি আসলে অসংখ্যা তারার সমষ্টি। তিনি শুক্র গ্রহের বিভিন্ন দশা সমূহ বর্ণনা করেন।
গ্যালেলেওর সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ ছিল বৃহস্পতি গ্রহকে কেন্দ্র করে। তিনি বৃহস্পতির দিকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলেন চারটি চাঁদ (উপগ্রহ) [বৃহস্পতি আরো উপগ্রহ আছে। কিন্তু এই বড় চারটি সহজেই দেখা যায়। গ্যালেলেওর কম শক্তির টেলিস্কোপ দিয়ে চারটি উপগ্রহই স্পষ্ট বোঝা যেত] তিনি বহুদিন পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলেন যে উপগ্রহ গুলো বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। ঐ চার চাঁদের নাচ গ্রহরাজ বৃহস্পতিকে ঘিরেই। এই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই পর্যবেক্ষণ থেকে গ্যালেলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। মহাবিশ্বের সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে তার উপগ্রহ গুলো ঘুরছে। সুতরাং পৃথিবী সব মহাজাগতিক গতির কেন্দ্র নয়। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরাতন এরিস্টটলীয় ধারনা -‘পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র’ চূড়ান্ত ভাবে ভুল প্রমাণিত হল। দেখলেনতো সূর্যকে কেন্দ্র করে সব গ্রহ গুলো ঘুরছে তা বোঝার জন্য সৌরজগতের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখার প্রয়োজন পড়েনি। পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাই যথেষ্ট এবং তা পৃথিবীতে বসেই করা সম্ভব। একদিন পৃথিবীতে বসেই সমগ্র মহাবিশ্বকে দেখা যাবে। বোঝা যাবে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ।
গ্যালেলেও ইতালিয়ান ভাষায় The Starrry Massage বইটির মধ্যমে তার পর্যবেক্ষণের কথা সাধারন মানুষের কাছে তুলে ধরেন ( তখন বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা সাধারনত ল্যাটিন ভাষায় লেখা হত যা সাধারন মানুষের পড়ার উপযুক্ত নয়)। গ্যালেলেও সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের সপক্ষে জোর প্রচারনা শুরু করেন। সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রচারের কারনেই গ্যালেলেও ক্যাথোলিক চার্চের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ১৬৩৩ সালে প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে বলার জন্য তাকে বিচারের সম্মুক্ষীণ করা হয় এবং বাকি জীবন গৃহবন্দি রাখা হয়।
কেপলার এবং গ্যালেলেও হলেন এমন দুইজন বিজ্ঞানী যারা বিজ্ঞানকে দর্শন থেকে মুক্তি দিয়ে ডাটা, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণ নির্ভর করে তোলেন।
জুলাই, ২০১৬এ NASA’র স্পেস প্রব জুনো বৃহস্পতি গ্রহের নিকট পৌঁছে। এতে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি (রেডিয়েশন থেকে বাচানোর জন্য) গ্যালেলেওর লেগো মিনিফিগার দিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে গ্যালেলেও বৃহস্পতি দেখার সুযোগ পেলেন।
কোপারনিকাস, কেপলার ও গ্যালেলেও এটা প্রতিষ্ঠা করেন যে, সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলো ঘুরছে। মহাবিশ্ব অনেক বড় তারা সূর্যের মতই উজ্জ্বল বস্তু যা অনেক দূরে অবস্থিত।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফল ও মহাবিশ্বের গল্প :
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফল কোনটি? আমি উত্তর দেব আপেল। আপেল (বা আপেল জাতীয় ফল) খেয়েই আদম (Adam) স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন। এক আপেলের কারণেই ট্রয়যুদ্ধ বেধেছিল (Apple of Discord) । সুন্দরী প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর প্রাপ্য সোনার আপেল প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির (Aphrodite) হাতে তুলে দিয়ে প্যারিসই ট্রয় যুদ্ধের সূচনা করেছিল (Judgement of Paris) । গ্রীক মিথলজিতে আরো অনেক আপেলের গল্প পাওয়া যায়। আপেলের কারণেই আটালান্টা (Atalanta) দৌঁড়ে হেরে বাধ্য হয়েছিল মেলানিয়ন (Melanion) কে বিয়ে করতে। হেস্পারাডিসের (Hesperides) সোনার আপেল আনতে গিয়ে মহাবীর হারকিউলিস আকাশে কাঁধে তুলেছিলেন। আকাশ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টাইটান অ্যাটলাসের (Atlas) কাজ।
অবশেষে কোন একটা আাপেলকেই পড়তে হল নিউটনের সামনে। ইংল্যান্ডে কি আর কোন ফল জন্মায় না? নিউটনের সামনে আপেল পড়ায় নিউটন ভাবতে শুরু করলেন এমন এক বল নিয়ে যা সারা বিশ্বকে গঠন করেছে। নিউটন আর আপেল গল্পের সত্যতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। বৃদ্ধ বয়সে গল্প করতে করতে নিউটন নাকি তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, একটি আপেল তার সামনে পড়তে দেখে তিনি ভাবতে শুরু করলেন- যে বল আপেলকে পৃথিবী পৃষ্ঠে ফেলছে সেই বল কি চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরানোর জন্য দায়ী হতে পারে?
সেই সময় এটা জানা ছিল যে, কোন এক বলের কারণে বস্তু সমূহ পৃথিবী পৃষ্ঠে পড়ে। নিউটন এই বলকে স্বর্গীয় বস্তু সমূহের মধ্যেও ছড়িয়ে দিলেন এবং স্বর্গকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনলেন। তিনি ভাবতে শেখালেন যে গ্রাভিটি নামক বলের কারণে আপেল মাটিতে পড়ে সেই গ্রাভিটির কারণেই সূর্যের চারপাশে গ্রহ সমূহ এবং গ্রহের চার পাশে উপগ্রহ ঘুরতে থাকে। গ্রাভিটি হল মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী বল। ১৬৮৭ সালে নিউটনের বিখ্যাত গ্রন্থ Philosophiae Naturalis Principia Mathematica (The Mathematical Principles of Natural Philosophy)) প্রকাশিত হয়। এটি প্রিন্সিপিয়া নামেই পরিচিত ছিল। প্রিন্সিপিয়া হয়তো বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ গ্রন্থ । এই গ্রন্থেই নিউটন গ্রাভিটির সূত্র প্রকাশ করেন । এই সূত্রটি ছিল মূলত গ্রাভিটি হিসাব করার গাণিতিক বর্ণনা।
F = G m1Xm2/r^2
“মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজ দিকে আকর্ষন করে। এই আকর্ষন বলের মান বস্তুদ্বয়ের ভরের গুণফুলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। এই বল বস্তুদ্বয়ের কেন্দ্র বরাবর কার্যকর হয়।”
এখানে,G হল গ্রাভিটেশনাল ধ্রুবক। G এর মান নিউটনের মৃত্যুর পর নির্ধারণ করার হয়। গ্রাভিটির ধারণা মহাবিশ্বের গঠনকে বদলে ছিল মারাত্মক ভাবে।
নিউটনের মহাবিশ্ব :
ক) সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো গ্রাভিটির কারণে উপবৃত্তকার পথে ঘুরছে।
খ) মহাবিশ্বে নক্ষত্র গতিশীল এবং সংখ্যায় অসীম।
গ) মহাবিশ্ব সীমাহীন বা অসীম ।
ঘ) মহাবিশ্ব চিরকালই অপরিবর্তনীয় বা স্থির (Static)। মহাবিশ্ব সংকুচিত বা প্রসারিত হচ্ছে না ।
গ্রাভিটির দ্বারা গঠিত মহাবিশ্বের নিউটনীয় মডেলে সমস্যা দেখা দিল। যদি সব বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে তাহলে এরা নিশ্চই একদিন এক বিন্দুতে পতিত হবে। নিউটন হয়তো বলতে পারতেন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে তাই এরা সাংকুচিত হবে না। এ অনুমান করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু নিউটন স্থির মহাবিশ্বে বিশ্বাস করতেন। তিনি সমাধান দিলেন- অসীম মহাবিশ্বে, অসীম সংখ্যক গতিশীল তারা গ্রাভিটির কারণে কেন্দ্রে পতিত হবে না কারণ অসীম মহাবিশ্বের কোন বিন্দুই কেন্দ্র হতে পারেনা। আরো সমস্যা হল, একটি অসীম স্থির মহাবিশ্বে দৃষ্টির প্রতিটি রেখাই একটি তারার উপর শেষ হবে। সুতরাং রাতেও আকাশ দিনের মত উজ্জ্বল থাকবো। ১৮২৩ সালে জার্মান দার্শনিক হইনরিখ ওলবারস (Heinrich Olbers) আরো অনেক যুক্তি দিয়ে সমস্যাটিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
নিউটন বিজ্ঞানী হিসাবে যেমনি সমাদৃত তেমনি ব্যক্তি হিসাবে সমালোচিত ছিলেন। তার সহকর্মীদের অধিকাংশের সাথে তার সম্পর্ক ভাল ছিল না। শিক্ষক হিসাবেও তার তেমন দক্ষতা ছিল না। এডমান্ড হ্যালি (Edmund Hally, ১৬৫৬-১৭৪২) ই বোধহয় নিউটনের সত্যতিকারের বন্ধু ছিলেন। হ্যালি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে প্রিন্সিপিয়া প্রকাশ করে। এই হ্যালিকে আমরা চিনি তার নামে নামকৃত ধূমকেতুর জন্য ।
ক্যালকুলাসের প্রবক্তা হিসাবে নিউটনের নামই আমরা জানি। গথফ্রীড লাইবিনেজ (Gottfried Leibniz) ও সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে ক্যালকুলাস পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। নিউটন অবশ্য কখনোই তা স্বীকার করেননি এবং লাইবিনেজের নাম প্রকাশে অসহযোগিতা করেন। তবে বর্তমানে দুজনকেই ক্যাললকুলাসের প্রবক্তা মনে করা হয়। নিউটন রয়েল সোসাইটি থেকে রবার্ট হুকের একমাত্র পোট্রেট টি সরিয়ে ফেলেন।
নিউটনের প্রিন্সিপিয়া প্রকাশিত হবার কয়েক বছর পর ১৬৯৩ সালে নিউটন মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এটা হয়তো তার রাসায়নিক গবেষণার সময় পারদ বিষক্রিয়া থেকে ঘটে। তিনি সেরে উঠলেও পরবর্র্তী দিনগুলো বিজ্ঞানে তেমন কোন অবদান রাখতে পারেননি। তিনি ১৯২৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
নিউটনীয় পদার্থ বিজ্ঞানের অবসান ঘটান আইনস্টাইন। কিন্তু এখনো আমাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে নিউটনীয় পদার্থবিদ্যার ধারনা কাজে লাগে। নিউটনকে মনে করা হয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের অন্যতম।
আলো আমার আলো :
আলোই পৃথিবীতে শক্তির প্রধান উৎস। কিন্তু আলো কী? কী দিয়ে তৈরি? এটা মহাশূন্যে কিভাবে বেগমান হয়? আলোর কী কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে নাকি এটি অসীমবেগে চলমান হয়? গ্যালেলেও এবং নিউটনই প্রথম বিজ্ঞানী যারা আলো সম্পর্কে সঠিক প্রশ্নগুলো করেন। কোন বিষয় বুঝতে হলে সঠিক প্রশ্ন করতে পারতে হবে। ঐ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেই বিষয়টি বোঝা যাবে। গ্যালেলেও আলোর বেগ মাপতে পরীক্ষা চালান। কিন্তু তাৎকালীন প্রযুক্তি দিয়ে তিনি আলোর বেগ মাপতে ব্যর্থ হন। ১৬৭৬ সালে ড্যানিশ জ্যোতির্বিদ রোমের (Olaus Romer) বৃহস্পতির উপগ্রহের গ্রহণ (Eclipse) পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে, আলো অসীম বেগে চলে না। তিনি আলোর বেগ মাপার জন্য একটি পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। কিন্তু তখন পৃথিবীর আকার জানা ছিল না বিধায় সঠিক ভাবে আলোর বেগ মাপা সম্ভব হয়নি। তবে তার পদ্ধতি সঠিক ছিল। ১৮৫০ সালে দুইজন ফরাসী পদার্থবিদ (Armand Hipolyte Fizeu & Jean Foucanlt) আলোর বেগ মাপতে সমর্থ্য হন। শূন্যস্থানে আলোর প্রকৃত বেগ, ২,৯৯,৭৯২.৪৫৮ ≈ ৩x ১০৫ (৩,০০,০০০) কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগ বিভিন্ন মধ্যম যেমন পানি, বাতাস, কাচ এ শূন্যস্থান থেকে কম। আলোর বেগ বলতে শূন্যস্থানে (Vaccum) আলোর বেগ বোঝানো হয়। মহাকাশে (Space) আলোর বেগ শূন্যস্থানের আলোর বেগের সমান বিবেচনা করা হয়।
নিউটন ও আলোর কণা :
নিউটন ১৬৭০ সালে কাঁচের প্রিজম দিয়ে পরীক্ষা চালান এবং তিনি দেখান যে সাদা আলো প্রিজমের মধ্যদিয়ে গেলে বর্ণালীতে ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ (দূশ্যমান) সাদা আলো মূলত বেগুনী, নীল, আসমানি, হলুদ,কমলা ও লাল আলোর সমন্বয়ে গঠিত। নিউটন প্রস্তাব করেন যে, আলো অসংখ্যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত। ১৬৭৮ সালে ডাচ পদার্থবিদ ক্রিস্টিয়ান হুইজেন (Christiaan Huygens) নিউটনের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন এবং বলেন যে, আলো কণা নয় বরং তরঙ্গ হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে।
থমাস ইয়াং ও আলোর তরঙ্গ :
১৮০১ সালে ইংলিশ পদার্থবিদ থমাস ইয়াং (Thomas Youngh) একটি পরীক্ষা চালান। একে বলা হয় আলোর দ্বিচির পরীক্ষা বা ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট (Double Slit Experiment)। এই পরীক্ষা প্রমাণ করে আলো আসলে তরঙ্গ। ফলে নিউটনের কণাতত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়। আধুনিক কালেও এই পরীক্ষাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিখ্যাত আমেরিকান পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনমেনের মতে কোয়ান্টম থিওরীকে এই পরীক্ষার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। যদিও কোয়ান্টম থিওরী প্রতিষ্ঠিত হয় এই পরীক্ষা প্রায় ১৩০ বছর পর।
ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট :
পরীক্ষাটির জন্য একটি অন্ধকার কক্ষে দুটি সমান্তরাল ও সুরু ছিদ্র যুক্ত একটি বোর্ডের একপাশে নির্দিষ্ট রঙ্গের (অর্থাৎ নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে) আলো এবং অন্য পাশে একটি পার্দ রাখা হয়।
ক. দুটি ছিদ্রের একটি খোলা রেখে আলো ফেললে, পর্দায় একটি লম্বা আলোর ব্যান্ড তৈরি করে।
খ. কিন্তু দুটি ছিদ্র খোলা রেখে আলো ফেললে, পর্দায় আলো ও আধারের পাশপাশি ব্যান্ড তৈরি হয় যাকে বলা হয় ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন।

ছবি: থমাস ইয়াং এর ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট।
যদি নিউটনের আলোক কণা তত্ত্ব সঠিক হত তবে এই পরীক্ষায় দুটি খোলা ছিদ্রের জন্য পর্দায় পাশাপাশি দুটি আলোর ব্যান্ড তৈরি হত। পরীক্ষায় প্রাপ্ত ইন্টারফোরেন্স প্যাটার্ণ কেবলমাত্র আলোকে তরঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করলেই ব্যাখ্যা করা যায়।
এনালজি :
ধরা যাক সমুদ্রের ঢেউ দুটি ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে উপকূলে আঘাত হানছে। দুই ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করা ঢেউ/তরঙ্গ একসাথে মিশে কোথাও একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে স্থির পানি তৈরি করে (দুটি তরঙ্গের শীর্ষ-Crest এবং খাঁজ-Trough পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে) এবং কোথাও উঁচু ঢেউ তৈরি করে (দুটি তরঙ্গের শীর্ষ-crest এক হয়ে বড় ঢেউ তৈরি করে) এর ফলে উঁচু ঢেউ এবং স্থির পানির একটি প্যাটার্ণ তৈরি হয়। থমাস ইয়াং এর পরীক্ষায়ও একই ঘটনা ঘটে। উজ্জ্বল ব্যান্ড যেখানে আলোক তরঙ্গ মিশে বড় তরঙ্গ তৈরি করে এবং অন্ধকার ব্যান্ড যেখানে আলোক তরঙ্গ পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
ম্যাক্সওয়েল ও তড়িৎ চৌম্বকীয় বল :
১৮৬০ সালে স্কটিশ গণিতবিদ ও পদার্থবিদ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell) চারটি সমীকরণের মাধ্যমে তড়িৎ ও চৌম্বক বলের ধর্ম ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখান যে তড়িৎ ও চৌম্বকীয় বল মূলত একটি বলের দুটি ভিন্নরূপ যাকে আমরা এখন তড়িৎচৌম্বকীয় বল (ElectroMagnatic Force) বলি। তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ শূন্যস্থানে ৩,০০,০০০ কি.মি/সে বেগে ধাবমান হয়। আলোক তরঙ্গ ও একই বেগে চলে। তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো মূলত একই।

ছবি: বিভিন্ন তরঙ্গ দৈঘ্যের ও কম্পাঙ্গের আলো।
তড়িৎ চৌম্বকীয় বলের একীভূত করণের পর বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিল। যেমন ব্লাকবডি রেডিয়েশন, ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট এবং আলোর বেগের আপেক্ষিকতা। আমরা পর্যায়ক্রমে এগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
ব্লাকবডি রেডিয়েশন :
ব্লাক বডি- যারা সব কম্পাঙ্কের ও তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ শোষণ করে নেয়।
হোয়াইট বডি- যারা তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ সবদিকে প্রতিফলিত করে দেয়।
সূর্য বা অন্যান্য নক্ষত্র ব্লাকবডির উদাহরণ। কারণ নক্ষত্র সকল বিকিরণ শোষণ করে নেয় কোন বিকিরণ প্রতিফলিত করে না। ব্লাকবডিকে কালো দেখাতে হবে এমন কোন কথা নেই। সূর্য ব্লাক বডি হলেও এর তাপমাত্রা প্রায় ৫৮০০ K হওয়ার এটি উজ্জ্বল দেখায়। টেবিল, বই, খাতা হোয়াইট বডির উদাহরণ। কারণ এরা আলোর প্রতিফলন ঘটায়।
বিজ্ঞানীরা যখন সূর্য বা অন্য নক্ষত্র থেকে বিকিরিত তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের শক্তির হিসাব শুরু করে তখন দেখা গেল নক্ষত্র অসীম হারে শক্তি বিকিরণ করে। (তখনকার জ্ঞান মতে) কোন উত্তপ্ত বস্তু থেকে উৎপ্নন সকল তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ সমান শক্তি বহন করে তা তার কম্পাঙ্ক/তরঙ্গদৈর্ঘ্য যাই হোক না কেন। আবার কোন উত্তপ্ত বস্তু সমভাবে সকল কম্পাঙ্কের তরঙ্গ উৎপন্ন করতে পারে। অর্থাৎ উত্তপ্ত বস্তু অসীম সংখ্যক তরঙ্গ উৎপন্ন করতে পারে। সুতরাং উত্তপ্ত বস্তুবা ব্লাক বডি থেকে বিকিরিত শক্তির পরিমান হবে অসীম। এ গণনা সঠিক নয় এবং আজগুবি তা বিজ্ঞানীরা জনত। তারা অন্যকোন উপায় খুজছিল ব্লাক বডি রেডিয়েশন ব্যাখ্যার জন্য।
ফটো ইলেক্ট্রিক ইফেক্ট :
১৮৮৭ সালে জার্মান পদার্থবিদ হায়েনরিখ হার্জ (Heinrich Hertz) দেখলেন যে, কোন কোন ধাতব পদার্থের উপর তড়িৎ চৌম্বকীয় রেডিয়েশন বা আলো ফেললে তা থেকে ইলেক্ট্রন নির্গত হয়। এই নির্গত ইলেক্ট্রনের গতি আলো তীব্রতার উপর নির্ভর করেনা, কম্পাঙ্গের উপর নির্ভর করে। কম কম্পাঙ্গের আলো ফেললে ইলেক্ট্রন নির্গত হয় না। বেশী কম্পাঙ্গের আলো ফেললে ইলেক্ট্রন নির্গত হয় এবং এর বেগ কম্পাঙ্গের উপর নির্ভর করে।
ম্যাক্সপ্লাঙ্ক ও কোয়ান্টা :
১৯০০ সালে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্লাঙ্ক (Max Plank) প্রস্তাব করেন যে, আলো ও অন্যান্য তরঙ্গ যেমন ইচ্ছা বিকিরিত হতে পারে না। বিকিরিত হতে পারে কেবলমাত্র বিশেষ প্যাকেট আকারে। যার নাম তিনি দিয়েছিলেন কোয়ান্টা (Quanta, যা কোয়ান্টাম-Quantum এর বহুবচন)। প্রতিটি কোয়ান্টামে একটি বিশেষ পরিমান শক্তি থাকে এবং তরঙ্গের শক্তি কম্পাঙ্গের সমানুপাতিক। যে তরঙ্গের কম্পাঙ্গ বেশী সে বেশী শক্তি বহন করে। ফলে বেশী কম্পঙ্গের তরঙ্গ বিকিরণে বেশী শক্তির প্রয়োজন হবে। সুতরাং উচ্চ কম্পাঙ্গে বিকিরণ কমে যাবে । এই কোয়ান্টম হাইপোথিসিসের দ্বারা ব্লাক বডির অসীম হারে তাপ বা শক্তি বিকিরণ সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
ম্যাক্স প্লাঙ্ককে বলা হয় কোয়ান্টম থিওরীর জনক। তার কোয়ান্টম ও হাইপোথিসিসই কোয়ান্টম মিকানিক্সের ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তী প্রায় ত্রিশ বছর ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞানী কোয়ান্টম মিকানিক্সকে পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব হিসাবে দাড় করান। তবে কোয়ান্টম থিওরীর যাত্রা এভাবেই শুরু হয়েছিল আলো ও আলোর বিভিন্ন ধর্মের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। আমরা এর পরের ঘটনাগুলিও আস্তে আস্তে জানব।
ইথার ও আলোর বেগ :
১৮৬০ সালের দিকে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ চৌম্বকীয় তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বানী ছিল আলোক তরঙ্গগুলো একটি বিশেষ স্থির দ্রুতিতে চলমান হবে। কিন্তু নিউটনীয় পদার্থ বিদ্যা পরম স্থিতির (Absolute Rest) ধারণা দূর করেছিল। যদি আলো নির্দিষ্ট স্থির গতিতে চলে তাহলে বলতে হবে আলো কিসের সাপেক্ষে স্থির গতিতে চলে? তরঙ্গ যেমন শব্দ তরঙ্গ কোন মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে চলে। আলোক তরঙ্গ কিসের মধ্যে দিয়ে চলে? তখন ইথার বা লুমিনিফেরাস ইথার (Luminiferous Ether) এর ধারণা প্রবর্তণ করা হয়। ইথার ভরহীন, অদৃশ্য, নিষ্ক্রিয় একটি পদার্থ যা সবখানে এমনকী মহাশূন্যেও বিদ্যমান। আলোক তরঙ্গ ইথারের মধ্যদিয়ে চলাচল করে যেমন শব্দ তরঙ্গ বাতাসের মধ্যে দিয়ে চলে। আলোক তরঙ্গ ইথারের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট বেগে চলাচল করে। ইথারের সাপেক্ষে চলমান বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের নিকট আলোর বেগ বিভিন্ন মনে হবে কিন্তু ইথারের সাপেক্ষে তা ধ্রুব। বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবী ইথারের সাপেক্ষে বিভিন্ন দিকে চলমান হয়। ফলে পৃথিবী ইথারের দিকে চলমান হলে আলোর বেগ যা হবে, পৃথিবী ইথারের সমকোণে গেলে আলোর বেগ তার কম হবে।

ছবি-ইথার পৃথিবী ও আলোর বেগ।
মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষা:
১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানী এলবার্ট মাইকেলসন (Albert Michelson) এবং এডওয়ার্ড মর্লি (Edward Morley) একটি পরীক্ষা করেন। তারা একটি হাফ-গ্লেজড (Half Glazed) আয়নার উপর আলো ফেলে বোঝার চেস্টা করেন যে দিক পরিবর্তন করলে আলোর বেগ পরিবর্তন হয় কীনা। তারা এর সাথে পৃথিবীর গতি ও আলোর গতির দিক এক হলে বা সমকোণ হলে আলোর বেগ পরিবর্তনের তুলনা করেন। কিন্তু তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন দুটি বেগই নির্ভুল ভাবে একই। পরীক্ষার ফলাফল ইথারের ধারণার পরিপন্থি। অনেকেই মাইকেল অন মর্লি পরীক্ষার ব্যাখ্যার চেষ্টা করেন।

ছবি-মাইকেলসন মাল পরীক্ষা।
এক কেরাণীর স্পর্ধা:
১৯০৫ সালে সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের জনৈক কেরাণী তিনটি বিজ্ঞান পত্র প্রকাশ করেন। এর মধ্যে দুটি গবেষণা পত্র ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ও ইথার-আলোর বেগ সমস্যার সমাধান এনে দিল। এই অখ্যাত কেরানী দ্রুতই বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। তিনি বদলে দিলেন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারনা। তিনি হলেন আমাদের মিস্টার ইউনিভার্স অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (Albart Einstein, ১৮৭৯-১৯৫৫)
আইনস্টাইনের তিনটি বিজ্ঞান পত্রের মধ্যে একটি ছিল ব্রাউনীয় গতি সম্পর্কে। তার দ্বিতীয় পত্রটি ছিল ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট সম্পর্কে। ম্যাক্স প্লাঙ্কের কোয়ান্টম হাইপোথিসিস মাথায় রেখে আইনস্টাইন প্রস্তাব করেন যে, আলো অসংখ্যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোয়ান্টা বা প্যাকেট দিয়ে গঠিত (আইনস্টাইন নিউটনের আলোর কণা তত্ত্ব ফিরিয়ে দেন)। আইনস্টাইন আলোর কোয়ান্টাকে ফোটন (Photon) নাম দেন। যখন আলো অর্থাৎ ফোটন ইলেক্ট্রনকে আঘাত করে তখন ইলেক্ট্রন ফোটন থেকে শক্তি নিয়ে কক্ষপথ থেকে বের হয়ে আসে। ফোটনের এই শক্তি আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের সমানুপতিক (অর্থাৎ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ব্যাস্তানুপাতিক)। বেশী কম্পাঙ্কের আলোর (যেমন UV আলো) ফোটনের শক্তিও বেশী তাই এরা ইলেক্ট্রনকে বেশী শক্তি দেয়। আবার কম কম্পাঙ্গের আলোর (যেমন ইনফ্রারেড আলো) ফোটনের শক্তি কম তাই এরা ইলেক্ট্রনকে কম শক্তি দেয় ফলে ইলেক্ট্রন তার কক্ষপথ থেকে বের হতে পারে না। ধাবত পদার্থের উপর ইনফ্রারেড আলো ফেললে তাই ফটোইলেক্ট্রিক ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করা যায় না। ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ব্যাখ্যার জন্য আইনস্টাইন ১৯২১ সালে নোবেল পুরুস্কার পান।
স্পেশাল থিওরী অফ রিলেটিভিটি:
আইনস্টাইনের তৃতীয় পত্রটি ছিল Zur Elektrodynamik Bewegter Korper(On Electrodynamic of Moving Bodies)। এই বিজ্ঞাপনটিই পরবর্তীতে স্পেশাল থিওরী অফ রিলেটিভিটির ভিত্তি স্থাপন করে। আইনস্টাইনের দুটি স্বীকার্য ছিল-
ক. অবাধে চলমান ব্যক্তি বা বস্তুর ক্ষেত্রে তার গতি যাই হোক না কেন) বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব গুলো একাই হবে [এটা নিউটনীয় তত্ত্বও সমর্থন করে]
খ. সকল ব্যক্তি যে গতিতে চলুক না কেন সকলেই আলোর একই গতি মাপবেন। [এটা নিউটনীয় তত্ত্বের বাইরে নতুন ধারনা প্রবর্তন করে]
দ্বিতীয় স্বীকার্যটি মূলত স্পেশাল থিওরী অফ রিলেটিভিটির ভিত্তি স্থাপন করে। এর ফলে ইথারের ধারনার আর প্রয়োজন পড়ে না এবং মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার ফলাফলের সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। নিউটন পরম স্থিতির ধারনা থেকে মুক্তি দেন এবং আইনস্টাইন পরম কালের (Absolute Time) ধারনা থেকে মুক্তি দেন। স্পেশাল থিওরী অফ রিলেটিভিটি অনুসারে-
১। স্থান-কাল: স্পেশাল রিলেটিভিটি পরম কালের ধারনা সমাপ্তি ঘটায়। এই তত্ত্ব অনুসারে সময় পরম নয়, সময়ও পরিবর্তনীয়। আমাদের দৈনিক জীবনেরও অবস্থান দৈর্ঘ্য, প্রস্থ , উচ্চতার সাথে যোগ হল সময়। এখান থেকেই স্থান-কালের (Space-Time) এর ধারণা শুরু হল।
২। সময় সম্প্রসারণ : গতিশীল ঘড়ি স্থির ঘড়ির তুলনায় ধীরে চলে। অর্থাৎ গতিশীল থাকলে সময় ধীরে বাহিত হয়। দুই জমজ ভাই সোহেল ও রাসেল। রাসেল বিশ বছর বয়সে মহাশূন্যে পাড়ি দিল আলোর বেগের কাছাকাছি গতিতে। সোহেল পৃথিবীতে থেকে গেল। রাসেল মহাশূন্যে দশ বছর পার করে পৃথিবীতে ফিরে আসলে দেখবে তার জমজ ভাই সোহেল তার থেকে বুড়ো হয়ে গেছে। কারণ গতিতে সময় ধীরে চলে।
৩। দৈর্ঘ্য সংকোচন : চলমান লাঠির দৈর্ঘ্য স্থির লাঠির দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম হবে।
৪। E=mc^2পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ। এটি থি.স্পে.রিলেটিভিটিরই ফলশ্রুতি। এই সমীকরণ অনুসারে E ∞ m [এখানে c আলোর বেগ ধ্রুবক] অর্থাৎ শক্তি ও ভর সমানুপাতিক। শক্তিকে ভরে রূপান্তর সম্ভব আবার ভরকেও শক্তিতে রূপান্তর সম্ভব। E=mc^2মহাবিশ্বের শুরুর ঘটনা ব্যাখ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তখন আমরা দেখব কীভাবে শক্তি থেকে পদার্থ (ভর) তৈরি হতে পারে।
৫। সর্বোচ্চ গতিসীমা : এই তত্ত্ব অনুসারে কোন কিছুই মহাশূন্যে (Space) আলোর গতি থেকে দ্রুত চলতে পারে না।
৬। আলোর গতির সমান গতি আমাদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা ৯৯.৯৯৯% পর্যন্ত অর্জন করতে পারি কিন্তু এই শেষ ভগ্নাংশটুকু আর অর্জন সম্ভব নয়। কারণ E=mc^2 অনুসারে শক্তি ও ভর সমানুপাতিক। গতিবৃদ্ধির জন্য শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শক্তি বৃদ্ধির জন্য ভরও বৃদ্ধি পায় ফলে তখন আরো গতি বৃদ্ধির জন্য আরো শক্তি দরকার হয়। কোন বস্তু আলোর বেগের ১০% বেগে চললে তার ভর বৃদ্ধি হবে ০.৫% । এবং আলোর বেগ পৌছালে ভর হবে অসীম । অসীম ভরের বস্তুর গতির জন্য অসীম শক্তি প্রয়োজন। অসীম শক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। আলোর কণা ফোটনের কোন ভর নেই। কেবল ভরহীন কণাই আলোর গতিতে যেতে পারে।
স্পেশাল রিলেটিভিটির ইফেক্ট বোঝা যায় যদি আলোর বেগ বা তার কাছাকাছি বেগে চলা যায়। এই পার্থিব গতির জন্য নিউটনের সূত্র গুলোই যথেষ্ট।
ক্লাশ অফ দি টাইটান- আইনস্টাইন ও নিউটনের দ্বন্দ্ব :
আলোর বেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কি.মি. বা এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় আট মিনিট। যদি হঠাৎ সূর্য ধ্বংস হয় তারপরও আট মিনিট পৃথিবীতে আলো থাকবে। কিন্তু সূর্য ধ্বংসের পর কতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী সূর্যের গ্রাভিটির কারনে ঘুরতে থাকবে? নিউটনীয় তত্ত্ব মতে গ্রাভিটি অসীম বেগে কার্যকর হয়। তাই সূর্য ধ্বংস হবার সাথে সাথেই পৃথিবী সূর্যের মহাকর্ষ থেকে মুক্ত হবে। তাহলে গ্রাভিটির গতিবেগ আলোর গতিবেগ থেকে বেশী। কিন্তু স্পেশাল থিওরী অফ রিলেটিভিটির একটি অনুসিদ্ধান্ত হল কিছুই আলোর থেকে বেশী বেগে যেতে পারেনা। এটা আমরা একটু আগেই বর্ননা করেছি। তাহলে তত্ত্ব টিকাতে হলে আইনস্টাইনকে গ্রাভিটির নতুন ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমরা দেখেছি নিউটন গ্রাভিটি হিসাবের জন্য সূত্র দিলেও কেন এই বল অনুভুত হয় তা ব্যাখ্যা করেননি। আইনস্টাইন তার চিন্তা ভাবনাকে গ্রাভিটির ব্যাখ্যা দেবার জন্য ব্যায় করতে শুরু করলেন। প্রায় দশ বছর চেস্টার পর তিনি গ্রাভিটির নতুন ব্যাখ্যা ও গাণিতিক সমীকরন দাঁড় করাতে সমর্থ্য হন। গ্রাভিটির এই নতুন তত্ত্বই জেনারেল থিওরী অফ রিলেটিভিটি হিসাবে পরবর্তীতে প্রচার পায়। জেনারেল থিওরী অফ রিলেটিভিটির সমীকরণ গুলো ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়।
জেনারেল থিওরী অফ রিলেটিভিটি :
আইনস্টাইন বলেন যে, কোন ভর বিশিষ্ট বস্তু মহাবিশ্বের গঠনকে বিকৃত করে (Wraps the febric of Space-Time) । মহাবিশ্বের গঠনকে কল্পনা করা যেতে পারে একটি সমতল রাবারের সীট হিসাবে। কোন রাবারের সীটে গোলক রাখা হলে তা ডেবে যাবে বা বেঁকে যাবে। ঠিক তেমনি মহাবিশ্বে কোন ভর বিশিষ্ট বস্তু তার চারপাশের স্থান-কাল (Space-Time) কে বাকিয়ে দেয়। এই বেঁকে যাওয়া স্থান কালই গ্রাভিটির কারন। মহাবিশ্বের গঠন (Febric of Cosmos) এর উপর কোন বস্তুর প্রতিক্রিয়াই হল গ্রাভিটি। এই বল আলোর গতিতেই কার্যকর হয়। এর বেশী বেগে নয়। সূর্য ধ্বংস হলেও পৃথিবীতে আট মিনিট আলো থাকবে এবং আট মিনিট পৃথিবী সূর্যের গ্রাভিটির কারনে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইন নিউটনের গ্রাভিটির ধারণা বদলে দিলেন।
আইনস্টাইন তার জেনারেল থিওরী অফ রিলেটিভিটি দিয়ে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারনা চিরতরে বদলে দেন। আইনস্টাইনের সমীকরন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অনেক মডেল দাঁড় করানো শুরু করলেন।
রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্ব কেবল মাত্র বিশেষ অবস্থা অর্থাৎ আলোর বেগ বা তার কাছাকাছি বেগে চলমান বস্তুর জন্য প্রযোজ্য হয়। তাই একে স্পেশাল বা বিশেষ তত্ত্ব বলা হয়। রিলেটিভিটির জেনারেল তত্ত্ব মহাবিশ্বের সবখানে সব সময় প্রযোজ্য হয়। গ্রাভিটি সবার জন্য সব সময়ের জন্য সত্য। গ্রাভিটি মহাবিশ্ব গঠনকারী বল। তাই একে রিলেটিভিটির জেনারেল বা সাধারণ তত্ত্ব বলা হয়।

ছবি: গ্রাভিটি এবং মহাবিশ্বের গঠন
জেনারেল থিওরী অফ রিলেটিভিটি অনুসারে-
১। গ্রাভিটেশনাল ওয়েব (Gravitational Wave) :
আইনস্টাইন সমীকরণ অনুসারে মহাবিশ্বের গঠন (Geometry)= ভর (Matter) +শক্তি (Energy)। এই সমীকরণের ডান পাশ (ভর ও শক্তি) পরিবর্তন হলে বাম পাশ (মহাবিশ্বের গঠন) ও পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ মহাকর্ষ ক্ষেত্র মহাবিশ্বের গঠনকে প্রভাবিত করে তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। যা গ্রাভিটেশনাল ওয়েব বা মহাকষীয় তরঙ্গ নামে পরিচিত। অতি সম্প্রতি LIGO টিম মহাকষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ত্ব সনাক্ত করতে সমর্থ্য হয়েছে।
২। সময়ের উপর গ্রাভিটির প্রভাব :
গ্রাভিটি যতই বাড়বে সময় ততই সংকুচিত হবে। অনেক বড় গ্রহ বা নক্ষত্র যার মহাকর্ষ বল বেশী তার পৃষ্ঠে সময় ধীরে চলবে। এমনকী পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ি মহাশূন্যের ঘড়ি থেকে ধীরে চলে। তবে পৃথিবীর গ্রাভিটি কম হওয়ায় তা সাধারন চোখে ধরা পড়ে না। কোন বড় নক্ষত্রের বা ব্লাকহোলের পাশে থাকলে সময় কম দ্রুত যাবে কারণ সময় যেখানে সংকুচিত হয়।
৩। আলোর গতি ধ্রুব তবে গ্রাভিটি আলোর গতিকে কমিয়ে দিতে পারে।
৪। গ্রাভিটি আলোর গতি পথকে বাকিয়ে দিতে পারে। দূরবর্তী কোন নক্ষত্র থেকে আসা আলো পথে অনেক নক্ষত্র বা গ্যালাক্সীর গ্রাভিটির কারনে বাকিয়ে আমাদের চোখে পড়ে। ফলে আমরা দূরের নক্ষত্র যেখানে দেখি আসলে সে ঐ স্থানে নেই। গ্রাভিটির কারনে আলোর গতিপথ বেকে যাওয়ার এমন মনে হয়।
৫। ব্লাক হোল ও ওয়ার্ম হোল :
এই বিষয় দুটি নিয়ে আরো আলোচনা করব। এখন শুধু এইটুকু জানি যে এদের ধারন জেনারেল রিলেটিভিটির মধ্যেই সৃষ্টি। গ্রাভিটি আলোর বেগ কমিয়ে দিতে পারে। তাহলে এমন ক্রিটিকাল গ্রাভিটি আছে যার থেকে বেশী বল হলে আলোও স্থির হয়ে যাবে। এমন হাইপোথিটিকাল স্থানকেই বলে ব্লাকহোল।

Saturday, September 22, 2018

মানহানির মামলা কীভাবে করবেন ?

ধরুন,
কোনো ব্যক্তি আপনাকে নিয়ে লোকজনের কাছে আজেবাজে মন্তব্য করছেবা কুৎসা রটাচ্ছে। এতে আপনি মানহানির শিকার হলেন। এখন ভাবছেন, আপনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু কীভাবে  আইনি প্রতিকার পাবেন, তা জানেন না। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ্যণীয়।

মানহানির অভিযোগ এনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা বা মোকদ্দমা করা যায়। ফৌজদারি আদালতে মানহানির মামলা করার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সে অভিযোগ শুনে আদালত অভিযোগ থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমন জারি করতে পারেন। তবে মানহানির মামলায় সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় না। সমন দেওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি আদালতে হাজির না হন, সে ক্ষেত্রে বিচারক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।

দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানি কিসে হবে আর কিসে হবে না,তা বিস্তারিত বলা আছে। এ ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা এমন হবে জেনেও উদ্দেশ্যমূলক শব্দাবলি বা চিহ্নাদি বা দৃশ্যমান প্রতীকের সাহায্যে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমনভাবে কোনো নিন্দা প্রণয়ন বা প্রকাশ করে, তাহলে ওই ব্যক্তির মানহানি করেছে বলে ধরা হবে। এমনকি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে বললেও তা মানহানি হবে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন মানহানির অভিযোগ আনতে পারবেন। আইনে এমন কিছু ব্যতিক্রম অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির নামে মানহানিকর কিছু বললে, লিখলে বা প্রচার করলেও মানহানি হবে না। যেমন:

১. জনগণের কল্যাণে কারও প্রতি সত্য দোষারোপ করলে মানহানি হবে না।

২. সরকারি কর্মচারীর সরকারি আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করলে তা মানহানির শামিল হবে না।

৩. সরকারি বিষয়-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে কোনো ব্যক্তির আচরণ নিয়ে মত প্রকাশ করলে মানহানি নয়।

৪. আদালতসমূহের কার্যবিবরণী প্রতিবেদন প্রকাশ করা মানহানির অন্তর্ভুক্ত হবে না।

৫. যেকোনো জনসমস্যা সম্পর্কে ও কোনো ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করা মানহানির শামিল নয়।

৬. আদালতে সিদ্ধান্তকৃত মামলার দোষ, গুণ বা সাক্ষীদের সম্পর্কে বা অন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ সম্পর্কে অভিমত মানহানির পর্যায়ে পড়বে না।

৭. গণ-অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে কোনো মতামত দেওয়া মানহানি নয়।

৮. কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে সৎ বিশ্বাসে কারো সম্পর্কে অভিযোগ করা হলে সেটিও মানহানি হবে না। যেমন: পুলিশের কাছে কারো ব্যাপারে সৎ বিশ্বাসে অভিযোগ।

৯. কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার বা অন্য কারো স্বার্থ রক্ষার্থে দোষারোপ করা মানহানি নয়।

১০. জনকল্যাণার্থে সতর্কতা প্রদানের উদ্দেশ্যে কারো সম্পর্কে কিছু বলা হলে মানহানি হবে না।

দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানির শাস্তি বর্ণনায় বলা হয়েছে,এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ৫০১ ও ৫০২ ধারা অনুসারে, মানহানিকর বলে পরিচিত বিষয় মুদ্রণ বা খোদাইকরণ সম্পর্কে এবং এর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Friday, September 14, 2018

ধর্মের উৎপত্তি।

লিখেছেনঃ উত্তর পুরুষ।
পৃথিবীতে ধর্মের কি ভাবে শুরু কিংবা উৎপত্তি হয়েছিল তার ব্যাখ্যা ও ইতিহাস বিস্তর। এনিয়ে শত শত পুস্তক লিখা যাবে। কিন্তু মূল সত্যকে জানতে হলে থাকতে হবে গভীর ও তীক্ষ্ণ অনুমান। থাকতে হবে কল্পনার প্রখর শক্তি। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন { ইমাজিনেশন ইজ মোওর ইমপোরটেন্ট দ্যান নলেইজ } কারণ আজ থেকে হাজার হাজার বৎসর আগে মানুষ যে ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে’ বসবাস করতো, সেই পরিবেশটাকে বুঝতে হবে কল্পনা ও অনুমানের কঠিন সত্য দিয়ে। তখন না ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না ছিল নির্দিষ্ট কোনো ভাষা, না ছিল উত্তম বাসগৃহ, না ছিল চলাফেরা করার মত উত্তম রাস্তা-ঘাট। যা ছিল তা হলো গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে বসবাসের প্রয়োজনীয়তা, ছিল নিরাপত্তার চরম অভাব, আর ছিল খাদ্য অন্বেষণের জন্য শিকার ও চাষবাসের নানাবিধ প্রচেষ্টা। আধুনিক যুগের মানুষ পৃথিবীর ইতিহাস ও জাগতিক বহুমুখী শিক্ষা থেকে নিঃসন্দেহে বুঝতে পারে “মানুষ জাতির অগ্রগতি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ” ঘটেছে শতাব্দি ও সহস্রাব্দির ধাপে ধাপে। তৎসঙ্গে মানুষের ভাষা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর শতাব্দির চাকায়। এই সভ্যতার ক্রমবিকাশের জন্য কোনো ইশ্বর কিংবা মহাপ্রভু মাটির পৃথিবীতে নেমে এসে প্রকাশ্যে মানুষকে দিয়ে যাননি কোন অলৌকিক ক্ষমতা কিংবা কোনো সংবিধান। মানুষ আদিম যুগ থেকে নিরাপত্তার কারণে ও বাঁচার তাগিদে নানাবিদ প্রচেষ্টা করেছে নিজ বুদ্ধিবলে। এই বুদ্ধি হচ্ছে প্রাকৃতিক। মানুষের এই প্রচেষ্টা ও বুদ্ধির প্রয়োগ আজ পর্যন্ত টিকে আছে অব্যাহত গতিতে। প্রতিকুল পরিবেশে আত্মরক্ষা, শিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য দুর্বলের উপর আক্রমণ, বুদ্ধির বলে নানাবিধ কৌশল দ্বারা অপরকে পরাজিত করা, ভাষার সুন্দর প্রয়োগ দ্বারা শান্তি , ঐক্য ও ভালবাসা স্থাপন করা, এসমস্ত মানুষ আয়ত্ত্ব করেছে নিজেদের বিবেক বুদ্ধির প্রয়োগ এবং তা থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার দ্বারা। আমরা যদি ধর্মের উৎপত্তি বিষয়ে নানা গবেষণা চালাই ও ইতিহাসের পাতা ওল্টাই তা হলে দেখতে পাবো ভয়, বুদ্ধি, স্বপ্ন, ভাষা, এবং কৌশল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। এর পেছনে ইশ্বরের কোনো হাত নেই।
মানুষ আদিম কাল থেকে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। যেমন: ঝড় তুফান, খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, ব্জ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, ফসলের উপর পঙ্গপালের আক্রমণ এবং নানাবিধ ভয়ানক রোগ ব্যাধি। এসব ছিল মানুষের জন্য অত্যাধিক আতঙ্ক ও জীবন হুমকির ব্যাপার। মানুষ ঐ সমস্ত দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষার জন্য নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির কাছে প্রকাশ্যে বিনয়ের সাথে আত্মসমর্পন করে কান্নাকাটি করতো এবং খুশি করার জন্য পূজো ও দিতো। প্রধান প্রধান শক্তিগুলো হলো: বিক্ষুব্ধ বাতাস, সাগর,তারপর পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য, অন্ধকারের ভূত প্রেত, ভয়ঙ্কর বন্যজন্তু , আগুন ও পানি। একারণে সুদুর অতীক কাল থেকে কোনো কোনো সম্প্রদায় কিংবা কোনো কোনো এলাকায় কল্পিত পানির রাজাকে (বা দেবতাকে) খুশি করার জন্য পানিতে পূজো দেয়ার ব্যবস্থা করে। তাই সাগর, হৃদ, দীঘি ও নদীর জলের মধ্যে সুগন্ধিযুক্ত ফুল ছড়ানো, মিষ্টি ফল বিতরণ করা ছাড়াও উপঢৌকন হিসেবে নানাবিধ অলঙ্কার ও কাপড় চোপড় ইত্যাদি দেয়া হতো। যা আজো পৃথিবীর ভিবিন্ন আদি সমাজ ও বিজ্ঞান শিক্ষায় বঞ্চিত দেশগুলোর আনাচে কানাচে হচ্ছে। এসব ব্যবস্থাপনা শুরু হয় পরিবার ও গোষ্ঠীর ক’জন মিলে, নানাবিধ পরামর্শের পর। এভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বাতাস যখন প্রবল বেগে বইতে শুরু করে তখন আদিম মানুষ বাতাসকে ক্রোধান্বিত না হওয়ার জন্য নানা রকমের ছড়া কাটতে কাটতে বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে দিতো সুগন্ধিফুল, শস্য দানা ইত্যাদি। সূর্য যখন উদয় হয় তখন সমস্ত আঁধার কেটে যায়। অন্তর থেকে দূর হয় বন্যপ্রাণীর আক্রমনের ভয়, ভূত প্রেতের ভয়। শিকার, কাজকর্ম ও চলাফেরা করতে হয় সুবিধে। সূর্যের আলো দ্বারা হয় শীত নিবারণ। অতএব সূর্য হচ্ছে এক বিশাল উপকারি দেবতা। সুতরাং সূর্যকে খুশী না করলে ওটা মাঝে মাঝে রাগ করে বসে। সব কিছু পুড়িয়ে দিতে চায় (খরা) আবার বৃষ্টির সময়ে গর্জন করে (বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত দ্বারা) নানা বিপত্তি ঘটায়। অতএব সূর্য দেবতা ভীষণ শক্তিশালী, ওকে খুশ রাখা খুবই জরুরি। এরকম মানসিক ধারণা থেকে সূর্যকে মানুষ নানা ভাবে পূজো দিতে শুরু করে। অনেক আদিম সমপ্রদায় আগুনকে সূর্যের প্রতিনিধি মনে করে অগ্নিপূজা করতো। এভাবে ভয়ের কারণে আত্মরক্ষার তাগিদে শুরু হয়েছে প্রকৃতিপূজা বা ধর্মীয় আচরণ। তদ্রূপ নানা যুক্তি তর্কের মধ্যে শক্তিমান প্রাণী হিসেবে হাতি, সিংহ ও ঈগলকে, আবার উপকারি জন্তু হিসেব গরু ঘোড়া ও ভেড়াকে অনেক আদিম শ্রেণীর মানুষ পূজো দিতে আরম্ভ করে। কোন কোন সম্প্রদায় ধর্মীয় পুণ্যের জন্য এই নিরীহ প্রাণীগুলোর রক্ত মাংস দেব-দেবী কিংবা ইশ্বরের নামে উৎসর্গ করে। এভাবে বিভিন্ন রোগে মানুষ যখন আক্রান্ত হতো তখন সে ভাবতো যে ‘প্রকৃতি’ বা যে ‘প্রাণী’ বেশী শক্তিশালী তার কাছে গিয়ে অনুনয় বিনয় করতে হবে। তার গুণ-কীর্তন করতে হবে। কোন কোন গোষ্ঠীপতিরা ভাবতো নদী বা পানি শক্তিশালী, কেউ ভাবতো আগুন, কেউ ভাবতো সূর্য, কেউ ভাবতো বাতাস। এভাবে একেক শক্তিকে নিজ নিজ বুদ্ধিমত্তার বলে দেয়া হত পূজো। কেউ পূজো দিতে গিয়ে গান, নাচ এবং ছড়া কাটার ও প্রবর্তন করে। আবার কোন কোন গোষ্ঠীর ভক্তরা পূজো দিতে গিয়ে চুপি চুপি ছড়া কাটতো, যাকে আমরা মন্ত্রপাঠ হিসেবে প্রাথমিক ভাবে ধরে নিতে পারি। তারা মনে করতো এতে “শক্তির” অধিকারী অদৃশ্য দেবতা বা রাজা খুশি হয়ে তাদের মঙ্গল করবে বা বিপদ আপদ থেকে মুক্ত করবে। এসব করতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠি গুলোর মধ্যে পূজোর (ওরশিপ রিচুয়েলের) আচার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রকম ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। যদিও তাদের মৌলিক উদ্দেশ্য এক।
এভাবে সময়ের ধাপে ধাপে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা কওমের মধ্যে তুলনামুলকভাবে কিছু কিছু বুদ্ধিমান লোকের আর্বিভাব হয়। তারা গোষ্ঠী বা কওমের মধ্যে নিজেকে নেতা বা অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এসব নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ ওরসিপ বা পূজো-প্রার্থণার দায়িত্ব একাই নিতো। তারা মুরব্বী বা অভিভাবক হিসেবে নিজেদের কওমের মধ্যে নানাবিধ দাবি খাটাতো। নিজ বুদ্ধি বলে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের অসুখ বিসুখ, জীন, ভূত ডাইনীদের নজর না লাগার জন্য নানাবিধ পথ্যাদি ও উপায় বাৎলে দিতো। জীবনের অভিজ্ঞতায় ঝড় বৃষ্টি খরা ইত্যাদির ইঙ্গিত ও কিছু কিছু ভবিষ্যদ্বাণী খয়রাত করে গোষ্ঠীর মধ্যে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে সম্মান পেতো। এছাড়া বিপদ আপদ না আসার জন্য নানাবিদ তন্ত্র মন্ত্র, পূজো প্রার্থণা এসব ছিল তাদের মৌলিক দায়িত্ব। কোন গোষ্ঠীর সাথে কোন ঝগড়া বিবাদ হলে তার মীমাংশা কিংবা জোর পূর্বক কোন কিছু দখল করতে হলে (যেমন পানির উৎস, ফসলের ভূমিসত্ত্ব ইত্যাদি) তার আদেশ নির্দেশ সবাই মেনে নিত নির্দ্বিধায়। এভাবে যুগ ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এরা হয়ে উঠলো এক শ্রেণীর অঘোষিত “সমাজ সর্দার”। কোনো দেবতার দ্বারা সাহায্য লাভ কিংবা কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে কখন কি ভাবে মোকাবেলা করতে হবে তার দায়ভাগ তাদের উপর গুরু দায়িত্ব হিসেব অর্পিত হলো। বিনিময়ে সেই ব্যক্তি সমাজের নানাবিধ সুযোগ সুবিধাও হাতিয়ে নিতে থাকলো। অতএব বিভিন্ন দৈবশক্তি কিংবা ঐশী শক্তির একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে লোকটি সমাজে এভাবেই একক প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেতো। প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর একখানা উপাসনালয় বা দেবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আর কোন বাধা থাকবেনা। কোন কাজে পাপ, কোন কাজে পুণ্য, কোন কাজ না হলে শক্তিমান দেবতা বিপদ দেবেন এবং কি কি কাজে তিনি খুশি হয়ে পুরস্কার দেবেন তার সব অনুশীলন এই দেবালয় থেকে শুরু হলো। কেউ কেউ পাহাড়ের গুহাকে ধ্যানের উপাসনা হিসেবে বেছে নিতেন। এভাবে নিজ বুদ্ধি বলে শুরু হলো আরেকটি নীরব সাম্রাজ্যের জয় যাত্রা। কালক্রমে এই উপাসনালয় বা দেবালয়ের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। অবতার নামের সমাজ সর্দারগণ এখন প্রকাশ্যে তাদের মতবাদ প্রকাশ করতে থাকে। কারণ এখন তাদের দলে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা যথেষ্ট। এসব দেবালয়ে কিংবা উপাসনালয়ে এখন সাহায্যকারি কর্মের মানুষ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কুমারী বালিকারা এর মধ্যে প্রধান। তারাও গুরুর আদেশে উপদেশে নানাবিধ সেবা শ্রম দেবে। যে নারী সন্তান পাচ্ছেনা সেও নির্দিষ্ট সময়ে এসে গুরুর পরামর্শ অনুযায়ী নানাবিধ সেবাশ্রম দেবে। তাদের কাজ কর্মের কোন কৈফিয়ত বা জবাবদিহিতা কাউকে দিতে হবেনা। দিতে পারবেনা কেউ কোন অভিযোগ। তারা কেবল উপাসনালয়ের কর্তৃত্ব যার হাতে, তার কাছে এবং অদৃশ্য ইশ্বর কিংবা দেবতাদের কাছে নিজেদের ভুল ত্রুটির কৈফিয়ত দেবে।
যে লোকটি (পুরোহিত, যাযক, মোংক, মোল্লা, ব্রাম্মণ ইত্যাদি) এখন এই দেবালয়ের সর্বেসর্বা, ভবিষ্যতে তার পুত্র প্রপৌত্ররা হবে এর দায়িত্ববান মালিক। যদি উপযুক্ত কেউ না থাকে তবে নিজ গোষ্ঠীর বা আত্মীয়ের মধ্য থেকে কেউ এসে ধরবে এর হাল। এখন কেউ যদি এসে লোকটিকে বলে “ওহে দয়ার ঠাকুর আমি তো ঠিক মতো আরতি যোগে ফুল দিলাম, প্রণাম দিলাম, যজ্ঞ দিলাম তবু কেনো আমার ক্ষেতে ফসল হলোনা ?” লোকটি তখন চোখ বন্ধ করে বলে ” শোনো গো মা, ফুলতো ঠিকই দিয়েছিলে কিন্তু ফুলটিতে কোন এক সময় ঋতুবতী মহিলার স্পর্শে হয়েছে অপবিত্র, এ কারণে ফসল ভাল হয়নি”। এভাবে নিজ বুদ্ধি বলে একটা ত্রুটি বের করে এরা মানুষদের বোকা বানিয়ে রাখতো। কেউ হয়তো এসে বললো আপনি আপনার শক্তিমান গো দেবতাকে বলুন “কেন দশ মাস থেকে আমার গাভীটা ভাল দুধ দিচ্ছেনা ?” একথা শুনে পুরোহিত ভদ্রতা ও সামাজিকতার খাতিরে তার সাথে নানাবিধ আলাপ করতে থাকলো। কথা প্রসঙ্গে পুরোহিত হয়তো বললো, আচ্ছা বাবা তার আগে বল দেখি তোমার পরিবারে কে কে আছে ? তোমার সংসার চলে কি ভাবে ? পরিবারের কে কি করে ? এরকম মামুলী কয়েকটি প্রশ্নের পর পুরোহিত লোকটি বললো “তৃতীয়া নক্ষত্রের রাত্রিতে (না হয় অমাবশ্যার রাত্রিতে) আমি এক নতুন প্রার্থণা বা জপতপ শেষে তোমার গাভী ও দুধের জবাব জেনে নেব।” লোকটি খুশি মনে চলে গেল। কয়দিন পর যখন লোকটি পুণরায় তার গাভীর দুধ সম্পর্কীত জবাবটি জানতে চাইলো তখন পুরোহিত হাসতে হাসতে জবাব দিলেন ‘দেখ বাবা জীবিশ্বরের (জীব জানোয়ারের ইশ্বর) কত দয়া।’ তুমি একে একে তিনটি মেয়ে যখন পেলে, তখন মন থেকে শুধু ছেলে সন্তানের জন্য হাহাকার করেছিলে। দিয়েছিলে পূজো, করেছিলে প্রার্থণা। সে কারণে ইশ্বর তোমার ভাগ্য থেকে দুধের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে বিনিময়ে ছেলে সন্তান করেছেন দান। কারণ তিনি জানেন দুধ অপেক্ষা তোমার ছেলে সন্তানের প্রয়োজন বেশী, সে কারণে তিনি তোমার প্রার্থণা কবুল করেছেন। পুরোহিতের কথা শুনে লোকটি খুশিতে বাগ বাগ হয়ে পরদিন নিয়ে এলো কিছু মূল্যবান উপঢৌকন। এভাবে বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন কওমের মধ্য থেকে বুদ্ধিমান লোকগুলো ধীরে ধীরে সমাজের মধ্যমণি হয়ে উঠলো। তারা এখন সাধারণ মানুষের আরও সমর্থন পাওয়ার জন্য নানাবিধ চেষ্টার কৌশল চালিয়ে যেতে লাগলো। বিনিময়ে তারা কিছুই চাহেনা। তারা চাহে মানুষের আন্তরিক আশীর্বাদ ও কর্মের আন্তরিক সমর্থন। আর এই সমর্থনটা হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় মুলধন যা নিরাপত্তরর জন্য এক বিশাল হাতিয়ার। এ উদ্দেশ্যে তারা শোষিত মানুষদের মুক্তির জন্য করেছে নানাবিধ প্রচেষ্টা। অত্যাচারী রাজাদের তারা ভয় দেখিয়েছে পরকালের। অপর দিকে শোষিত মানুষদেরকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঘটিয়েছে ঐক্য এবং ইশ্বরের দাবি হিসেবে নায্য পাওনার দাবি করেছে শাসকবর্গদের কাছে। এতে অনেক দাবি আদায় হয়েছে। আবার কোথাও তা নিয়ে বেঁধেছে যুদ্ধ। এসব যুদ্ধের ফলে অনেক শাসকদের জ্ঞানচক্ষু খুলেছে, তারা বুঝতে পেরেছে নির্যাতীতেরাও ধর্মের ডাকে ঐক্য স্থাপিত করে মানুষের অধিকার আদায় করতে জানে। যারা অতি মাত্রায় ধূর্ত তারা ‘ধর্মের প্রতিনিধি’ হিসেবে বিলাস বহুল জীবনকে ঘৃণা করেছে। প্রকাশ্যে নারীর সান্নিধ্য কে পাপের চোখে উপেক্ষা করেছে । যার ফলে তারা সাধারণ দাসদের ও শ্রমজীবি মানুষের স্তরে নেমে এসে একাত্মহয়েছে। প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে তার বংশধর কিংবা কর্মের স্মৃতি অক্ষুন্ন রেখে চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। এটা মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাব। এই স্বভাবের ভিত্তিতে ধর্মীয় নেতাগণের প্রবল আকাঙ্খা ও সবুজনক্সা ছিল এরকম যেমন: (ক) একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে গেলে চিরজীবন তার নাম অক্ষুন্ন থাকবে (খ) ইশ্বরের গুণকীর্তন করার সাথে তার নিজের যশ খ্যাতির গুণকীর্তন ও করা হবে নিঃসন্দেহে (গ) ধর্মের সমর্থকরা তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করবে আজীবন (ঘ) তার নিজের গোষ্ঠীর গৌরব উজ্জ্বল দিক ইতিহাসে অঙ্কিত হবে আর রক্ত পঙ্কিল দিক কালের গহব্বরে হারিয়ে যাবে।
এভাবে গোষ্ঠী কর্তৃক স্বীকৃত (কিংবা স্বঘোষিত) ইশ্বরের প্রতিনিধিরা কালের স্রোতে নিজেদেরকে সমাজসেবী হিসেবে করেছে প্রতিষ্ঠিত। প্রথমে তা করা হয়েছে নিজ এলাকায়, নিজের সমাজে। যেখানে সামাজিক অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলায় ছিল ভরপুর। এই সমাজ সেবা করতে গিয়ে পৃথিবীর মানুষের মাথায় নানাবিধ আইন কানুন বাধ্যতামুলক ভাবে বেধে দেয়া হয়। এটা অবশ্যই একটি গোপনীয় স্বেচ্চাচারিতা। ইশ্বরের নামে নিজের মগজ থেকে তৈরি করা আইন ‘সব সমাজের জন্য’ ‘সব যুগে’ কখন ও উপযোগি হতে পারেনা। এটা মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরে পরাধীনতার একটি শৃঙ্খল। পৃথিবীর সবকিছু যেমন চলমান, সমাজ ও তেমনি চলমান। সমাজ কখনও স্থবির নয়। হাজার হাজার বৎসরের পুরানো সামাজিক অবস্থার সাথে বর্তমান সামাজিক অবস্থার মিল কখনও এক হয়না। তাই যদি হতো তাহলে মানব সমাজে “সভ্যতার ক্রমবিকাশ” বলে যে শব্দটি আছে এবং ক্রমবিকাশের ধারায় আমরা বর্তমানে যে অবস্থানে পৌচেছি তা কখনও সম্ভব হতো না। সুতরাং ধর্ম সর্বরোগের মহৌষধ হিসেবে ধারণা দেয়া কিংবা ‘কমপ্লিট কোড অব লাইফ’ আখ্যা দিয়ে মানুষকে “নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল” এই প্রবচনটি প্রয়োগ করে মানুষদের বুঝ দেয়া একটি ভুল ধারণা। তাই যদি হয় তাহলে গোটা পৃথিবীর মানুষ কি এত বোকা যে তারা এত আধূনিক শিক্ষা, এত গবেষণা, এত বিশ্ববিদ্যালয়, এত সমাজ তত্ত্ব, এত সংগঠন, এত আইন শাস্ত্র, এত কোর্ট-কাছারী নিয়ে বেহুদা ঘাটাঘাটি করছে ?
ধর্মের ইতিহাস থেকে জানা যায় পৃথিবীতে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশী ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল। এতদ্ব্যতীত ভারতে এবং ইউরোপের গ্রীস ও ইতালীতে ধর্মের প্রবল প্রতাপ ছিল। মধ্য প্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি গোত্রেই কেউ না কেউ সময়ের স্রোতে ইশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে আত্ম প্রকাশ করেছে। এর কারণ এবং অনুসন্ধান হিসেবে যে সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় তা হলো,’ (১) কয়েক বৎসর পর পর পৃথিবীতে একজন ইশ্বর প্রতিনিধি আসবেন’ এরকম একটি ধারণা মানুষের মনের মধ্যে সর্বদাই বিদ্যমান থাকতো’। (২) ‘মানুষের নিদ্রাজাত স্বপ্ন’। এর দু’টি ব্যাখ্যা আছে। প্রথমটি হলো সেই আদি যুগে মানুষ যখন স্বপ্নের মধ্যে নানাবিধ বিষয়বস্তু দেখতো তখন সে বিশ্বাস করতো ঘটনাটির মধ্যে সে নিজেই জড়িত। সে নিজেই বিভিন্ন যায়গায় ছিল। অথচ সজাগ হয়ে বুঝতে পারে সে তার গুহার মধ্যে অথবা কুড়ে ঘরে ঠিকই শুয়ে আছে। তাহলে সে বাইরে গেল ক্যামনে ? এত কিছু দেখলো ক্যামন করে ? বিষয়টি তৎকালীন আদিম মানুষদের দারুন দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। তারা তখন ভাবতে থাকে তাহলে মানুষের মধ্যে খুব সম্ভব দু’টি আত্মা আছে। একটি আত্মা রাত্রি বেলা ঘুমের মধ্যে যাওয়া আসা করে, ঘুরে বেড়ায়। আর অপর আত্মাটি সব সময়ে সঙ্গে থাকে। সব সময় যে আত্মাটি থাকে সেটি একবার বেরিয়ে গেলে আর ফেরত আসেনা। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে অদৃশ্যে উদাও হয়ে যায়। মানুষের মৃত্যুকালীন সময়ে মুখ ও বুকের যে অবস্থা হয় এতে অতীতের মানুষ অনুমান করেছিল আত্মা জিনিসটি বুকের ভেতর থাকে। আর মৃত্যুর সময়ে সেটি মুখ দিয়ে অতি কষ্টের সাথে বের হয়। তৎকালে হার্ট বা হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম সম্বন্ধে মানুষের উন্নত ধারণা ছিলনা। তৎকালীন আদিম সমাজের শুরু থেকে বুদ্ধিমান যাযক বা পুরোহিত সম্প্রদায় মানুষকে এই ধারণা দিয়ে আসছে যে আত্মার মৃত্যু হয়না। যে ধারণা আজো বহাল তবিয়তে ঠিকে আছে সারা পৃথিবীতে। অতএব যাযক বা পুরোহিত সমপ্রদায় নিজেদের (ঐশ্বরিক) প্রতিনিধিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য বলে বেড়ালো যে পৃথিবীতে তুমি যত কিছু গোপনে কিংবা অন্যায় ভাবে করে থাকো তা সকল দৈব শক্তির অধিকারী ইশ্বর বা ইশ্বরগণ জানেন। এজন্য মৃত্যুর পরে শাস্তি হিসেবে তা তোমার আত্মার উপর আরোপিত হবে। তারা উদাহরণ স্বরূপ স্বপ্নের মধ্যে নানাবিধ কষ্ট পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। কেউ কেউ সেই আত্মা থেকে আবার দেহ সৃষ্টি করে দেহের উপর শাস্তি আরোপ করা হবে বলে নিশ্চয়তা দেন। কেউ কেউ মৃত্যুর পর আত্মা থেকে পুনর্জন্ম লাভ করে নিকৃষ্ট শ্রেণীর পশুতে পরিণত হবার কথা উল্লেখ করেন। কেউ কেউ বলেন সেই আত্মা ভূত প্রেত বা পিশাচ হিসেব পৃথিবীর অন্ধকারে ঘুরে বেড়াবে।
ইসলাম ধর্মের হাদীসে বলা হয়েছে মৃত্যুর পর যখন মানুষকে কবরে রাখা হবে। তারপর আত্মীয় স্বজনগণ চল্লিশ কদম (পদক্ষেপ) দুরে সরে আসার পর, কবরস্থানে দু’জন অদৃশ্য ফেরেশতা এসে সেই মৃত মানুষের ভেতরে রূহ বা আত্মার সংযোজন ঘটাবেন। মৃত মানুষটি তখন জেগে উঠবে এবং ভয়ানক চিৎকার করবে। সেই চিৎকার কেবল মাত্র কিছু পশু পক্ষী ছাড়া কেউ শুনবেনা। তারপর সেই মানুষটিকে তিনটি প্রশ্ন করা হবে। সেই তিনটি প্রশ্নের জবাব যারা দিতে পারবে তারা শান্তির সাথে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়বে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত। আর যারা সঠিক জবাব দিতে পারবেনা তাদের আজাব (শাস্তি) শুরু হয়ে যাবে। সেই আজাব হতে পারে আত্মার উপর কিংবা দেহের উপর। তবে অধিকাংশের মতামত হলো দেহের উপর। এই আজাবের কোন ক্রন্দন বা চিৎকার কোন মানবজাতি শুনতে পাবেনা। এই গল্পের শেষে আমি একজন মৌলভী সাহেবকে হাস্যমুখে বলেছিলাম তাহলে ইসলাম ধর্ম আর্বিভাবের পূর্বে পৃথিবী থেকে যে কোটি কোটি মানুষ মারা গেলো তারা কেউতো এই তিনটি প্রশ্ন সম্পর্কে কোন প্রস্তুতি নিয়ে মারা যায়নি। অতএব তারা নিশ্চয়ই ফেল করবে এবং তাদের অবস্থা তখন কি হবে ? মৌলভী সাহেব তখন জবাব দিয়েছিলেন ‘যেহেতু ইসলাম ধর্ম তখন আসেনি সেজন্য সেই সময়কার ধর্ম অনুযায়ী তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে’। এরকম তৈরি করা জবাব দানে তারা সর্বদাই ওস্তাদ। জানিনা পৃথিবীর ইশ্বরের প্রতিনিধিগণ তাদের লোকদের সেই পাঁচটি প্রশ্ন ও জবাবের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন কিনা ।
‘নিন্দ্রাজাত স্বপ্নের’ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটির প্রতি আমার বিশ্বাস হল এই, মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা প্রবল উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণ খেজুর, আঙ্গুর, বেদানা ও এই জাতীয় ফলের রস পান ও ভক্ষণ করতেন। পান করতেন বকরী ও উটের দুধ। এতে নিদ্রা হতো বড়ই গভীর ও স্বপ্নময়। মধ্যপ্রাচ্যে সবুজ গাছ-গাছালি, সবুজ মাঠ প্রান্তর ও নদ নদীর বড় অভাব ছিল। অভাব ছিল পাখির কল-কাকলী ও মেঘ বৃষ্টির। যে কারণে রাত্রিকালিন স্বপ্নের আমেজ ভোরবেলা তাদের মন থেকে হারিয়ে যেতনা। কারণ ওখানে সবুজ দৃশ্যাবলী ও নদ নদীর বদলে বিদ্যমান ছিল গনগনে সূর্যের তপ্ত আকাশ আর নীচে ছিল উত্তপ্ত মরুভূমির বালুরাশি। সুতরাং দিনের বেলাতে ও তারা বিগত রাত্রির স্বপ্নটি নিয়ে ভাববার অবকাশ পেতেন। এই স্বপ্ন কেন দেখলো ? স্বপ্নের রহস্য কি ? তা হলে নিশ্চয়ই কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে আভাসে ইঙ্গিতে কিছু বলতে চাইছে। এরকম শত শত প্রশ্ন তার মনকে ভাবিয়ে তুলতো। সে ভাবতো নিশ্চয়ই সেটা অদৃশ্য শক্তির সাথে তার অদৃশ্য আত্মার খেলা। অতএব সেই ব্যক্তিটি মানুষের ভাল মন্দ, বিপদ আপদ ইত্যাদি জাগতিক বিষয় আসয়ের সাথে স্বপ্নের কাল্পনিক অঙ্ক মিলাতে চেষ্টা করে। কিছু কিছু মিলে ও যায়। এতে তার সাহস এবং উৎসাহ উভয়ই বাড়তে থাকে। যার ফলে সে নিজে ‘অদৃশ্য শক্তির প্রতিনিধি হতে যাচ্ছে বলে মনের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে’। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে এবং তৎকালীন প্রচলিত কিছু কিছু ঔষধ পত্রকে অনুকরণ করে রোগীদের সেবা ও পথ্য বাৎলে দিতে থাকে নিজ বুদ্ধির জোরে। এতে কিছু কিছু কৃতকার্যতা আসে। তার সাথে পানি পড়া, ঝাড় ফুক, এটা ওটা মন্ত্র আওড়িয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য নানাবিধ ফন্দি ফিকিরের চেষ্টাও চলতে থাকে অব্যাহত গতিতে। মাতৃভাষায় কথা বলার মধ্যে বিনয় ও বাকপটুতা তাদেরকে করে তুলে অতি আত্মবিশ্বাসী। ধীরে ধীরে দুর দুরান্ত থেকে মানুষ আসতে থাকে আরোগ্য লাভের আশায়। কেউ আসে চুরির উট বকরী ফিরে পাবার আশায়। সন্তানহীনা নারী আসে সন্তান পাবার কামনায়। কেউ আসে ভাল ফল ও শস্যতে বরকত হবার আশায়। কেউ কেউ আসে ঝগড়া বিবাদের একটা ফয়সালা করার জন্য মধ্যস্ততা হিসেবে ভূমিকা নেয়ার। কেউ কেউ আসে বুদ্ধি পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনীয়তায়। এভাবে লোকটি যখন জনপ্রিয় হতে শুরু করে তখন একদিন সুযোগ বুঝে নিজেকে অদৃশ্য শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেয়। শুরু হয় তার কথায় ও কাজে কৌশল প্রয়োগের নানাবিধ সুযোগ ও সতর্কতা। তখন নিজ কওমের বা গোষ্ঠীর লোকেরা গর্বিত হয়। তাকে তখন সকল প্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এভাবে ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে একজন মানুষের গোড়া পত্তন হয় পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে।
ইতিহাস আমাদের সাক্ষী দেয় হাজার হাজার কাল ও শতাব্দীর সিড়ি বেয়ে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে মানুষের ভয়, কৌতুহল ও আপন অস্তিত্বকে জানার প্রয়োজনে। ইশ্বরের প্রয়োজনে নয়। “বিজ্ঞান ও ধর্ম, সংঘাত নাকি সমন্বয়” এর একটি সিদ্ধান্তে যাবার আগে আর ও কিছু কথা না বলে সিদ্ধান্তে যেতে পারছিনা । এ জন্য প্রিয় পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে সামান্য বিরক্ত করবো বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কথা হল পৃথিবীতে এত গবেষণাগার, এত বিশ্ববিদ্যালয়, এত আবিষ্কার, এত আমূল পরিবর্তন সাধিত হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে আদম ও ইভ নামক দু’জন মানুষের স্বর্গ বিচ্যুতি থেকে পৃথিবীতে মানুষ ও ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ কই ? এতে এটাই প্রমাণিত হয় পৃথিবীর মানুষ এখনও বিজ্ঞান বুঝেনা। ইতিহাস ও বিজ্ঞানের আবিস্কারগুলোকে তারা মানুষের এক ধরণের কারসাজি হিসেবে বিশ্বাস করে। এই কারসাজি দ্বারা তারা বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন করে মুনাফায় ধন-দৌলত আয়ত্ব করে। তারা আরও বিশ্বাস করে এসমস্ত তথ্য ও আবিষ্কারের সাথে ইশ্বরের কিংবা পরলৌকিকতার কোন সম্পর্ক নেই। যদি ওগুলোকে বিশ্বাস করা হয় তাহলে সে নাস্তিক হয়ে যাবে না হয় মুরতাদ হয়ে যাবে। বিজ্ঞান মানুষকে পৃথিবীতে শোষণ, অত্যাচার ও যু্দ্ধ বাধিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান ইহ জগতে ভোগ-বিলাসের মদতদানকারী এক বিশাল দানব। কিন্তু ধর্মের উৎপত্তি প্রচার ও বিশ্বাস নিয়ে শুরু থেকেই যে রক্তপাত ও সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে মানুষে মানুষে হিংসা বিদ্বেষ ও প্রতিপ্রত্তি তথা জয়লাভের নেশায় (ধর্মীয় আইন বাস্তবায়ন করার জন্য) রক্তপাত চালিয়ে যাচ্ছে এই সত্যটুকু তারা মানতে নারাজ। এই সত্যকে তারা দেখেও দেখেনা, শুধুই অপর পক্ষকে দোষারোপ করে যাওয়াই তাদের অনড় সিদ্ধান্ত । বিজ্ঞানের এই বিশাল অবদান মানব সমাজের জন্য রোগ ক্ষুধা ও উন্নত জীবন যাপনের যে কত বড় আর্শীবাদ তা তারা এখনও বুঝতে চান না। একটা ছাতা কিংবা একটা তুচ্ছ সেলাই করার সুচ পর্যন্ত ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা তৈরি হয়নি সে কথাটা তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনা। ধর্মীয় গল্পগুলো বা অলৌকিক কেচ্ছা কাহিনীগুলো সব সময়েই যে অতিরঞ্জিত অর্থাৎ তিলকে তাল করা কিংবা মানুষকে বিশ্বাসী বানানোর জন্য খোঁড়া যুক্তির সমাবেশ তা তাদেরকে বুঝানো যায়না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বা তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য হয়তো এসব গল্পের সৃষ্টি হতে পারে, তা তাদের কিছুতেই বোধগম্য করানো যায়না। হাতের লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া, বিশাল তিমি মাছের পেটে বেঁচে থাকা, মৃত মানুষকে জীবিত করে তুলা, সাত আসমান ভ্রমন ইত্যাদি গল্প গুলোর সাথে বিজ্ঞানের যে ছাত্র বায়োলজী, ক্যামেষ্ট্রি ও ফিজিক্স পুঙ্খানুপুঙ্খু ভাবে বুঝতে পারে, সেই ছাত্রটিও তার বিবেক থেকে কখনও এসব বিশ্বাস করতে পারেনা। এসবে বিশ্বাসী না হলে সমাজে এবং পরিবারে তার খাদ্য ও বাসস্থান মিলবেনা। একারণেই সে তা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। তা ছাড়া বাল্যকাল থেকে ধর্মীয় প্রভাবের কারণে সে মগজ ধুলাইয়ের শিকার। নিরপেক্ষ চিন্তা ভাবনা নিয়ে এসব ধর্মীয় গল্পের সমালোচনা লিখলে এটা “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” অপবাদ দিয়ে রক্ষণশীলরা মহা হুলস্তুল কাণ্ড ঘটাতে চান। ধর্মের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের চিন্তা ভাবনা সর্বদাই দুর্বল এবং পরনির্ভরশীল। তাদের নিজস্ব স্বাধীন যুক্তি সর্বদাই পাপের ভয়ে হয় মৃত নয়তো ম্রিয়মান। সেই যে হাজার হাজার বৎসর আগে ধর্মীয় অবতারগণ যা বলেছিলেন সেটাই তারা আচ্ছা করে গাঁট বেধে মনের ভেতর পুঁতে রেখেছেন। সেই গাঁট তারা কখনও খুলে দেখতে চান না ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয়ে। ধর্মীয় কেতাবগুলোতে উল্লেখ আছে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদমকে সৃষ্টি করার পূর্বে স্বয়ং বিধাতা তার ফেরেশতাগণের সাথে যুক্তি করেছিলেন পৃথিবীতে মানুষ পাঠানো হবে কি হবে না। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে বিষয়টি আলোচনা করলে দেখা যাবে ওখানে স্বয়ং বিধাতা ফেরেশতাগণের মতামত নিয়ে ‘গণতন্ত্রের’ সুচনা করেছিলেন। অথচ পৃথিবীতে তারা গণতন্ত্র মানতে চান না। তারা ধর্মীয় কিতাবের একনায়কতন্ত্রী আইন কায়েম করতে চান। ধর্মীয় উক্তি বা হাদীসগুলোকে বিধাতার আইন হিসেবে মেনে নিয়ে মানুষের স্বাধীনতা ও মানুষের সময় এ দুটো কে নির্মূল করতে অতিশয় উৎসাহী। নিরপেক্ষ মনোভাব নিয়ে বলছি কোন দেশের গণতন্ত্রের অনুকরণ নয়, বরং যা একটি দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর তার উপর জনগণের অধিকাংশের মতামতে বিল পাশ করে যদি আইন তৈরি হয় তবে সেটি ধর্মীয় আইনের চেয়ে উত্তম হবেনা কেন ? এতে কি আল্লাহর মহা ক্ষতি হয়ে যাবে ? বিষয়টি আমি পাঠক সমাজকে বিবেচনা করতে অনুরোধ করি। উপরোক্ত নিবন্ধের আলোচনা শেষে আমি এটা বলতে চাই বিজ্ঞান পরীক্ষা নিরীক্ষার যুক্তি প্রমাণে ও বাস্তববাদিতায় প্রতিষ্ঠিত। কোন কিছু মিথ্যা প্রমাণিত হলে বিজ্ঞান ও সেটাকে মেনে নেয়। তার পূর্ব পরীক্ষিত সত্যকে বাতিল ঘোষণা দিতে রাজী থাকে। জোর পূর্বক মেনে নেয়ার জন্য বিজ্ঞান মানুষের মুণ্ড কিংবা রগ কাটার আদেশ জারি করেনা। আর ধর্ম জীবন যুক্তির কল্পনা ও অদৃশ্যের বিশ্বাস নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। ধর্ম নগদ অপেক্ষা বাকিতে অধিক বিশ্বাসী । সুতরাং এ দুয়ের সমন্বয় সাধন একটি কঠিন ব্যাপার। তবে আদব কায়দা, শ্রদ্ধা, সম্মান, সৎ ব্যবহার, ক্ষমা, মানবতা ইত্যাদি নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে (এথিক্স) বিষয়গুলো যে কোন প্রচলিত সামাজিক আচরণের উত্তম দিক হিসেবে বিবেচিত ও গ্রহণ যোগ্য। এসব উত্তম আচরণগুলো পৃথিবীর সকল আদি-গোষ্ঠীতেই কম বেশি দেখা যায়, যা পরবর্তীতে ধর্ম প্রচারকগণ ধর্মের মধ্যে টেনে নিয়ে ধর্মকে মজবুত করেছেন।

এই যদি হয় ইসলামের আদর্শবান তবে!

মানব জাতির শ্রেষ্ট মানব মহানবী হযরত মোহাম্মদ এর চরিত্র ফুলের মত পবিত্র সেটাই আমরা জানি, প্রতিটি মুসলমান তাই জানে বা জন্মের পর থেকে জেনে এসেছে।প্রতিটি মুসলমান জন্মের পর জ্ঞান হওয়া থেকে শুরু করে শুনে এসেছে, মোহাম্মদ অতীব সৎ, অতীব দয়ালু, অতীব মহৎ, অতীব ন্যায় পরায়ন ইত্যাদি। এর বাইরে কখনই তারা শোনেনি যে মোহাম্মদ একজন লুটেরা/ডাকাত বা নারী লোলুপ বা কামার্ত বা খুনী বা ক্ষমতা লোভী হতে পারে।এসব হতে পারা তো দুরের কথা- এসব হওয়ার কল্পনাও কোন মুসলমান করতে পারে না, কারন যদি করে তাহলে তার জন্য জাহান্নামের কঠিন আগুন অপেক্ষা করবে। সুতরাং কার এমন বুকের পাটা যে সে আল্লাহর নবী মোহাম্মদের সম্পর্কে এমন ধারনা পোষণ করবে ? কারন কোরানের আল্লাহ আর মোহাম্মদ সে তো একই ব্যাক্তি। সুতরাং সঙ্গত কারনে এটা মনে হয় যে মোহাম্মদ সর্বপ্রথম যে বিষয়টির আশ্রয় নিয়েছেন তা হলো প্রতারনা ও মিথ্যার। অথচ ইসলামি বিশ্বে তিনি হলেন আল আমীন বা মহা সৎ লোক।তিনি সর্বপ্রথমেই যে অসত্যের আশ্রয় নিয়েছেন তা হলো নিজের বানীকে আল্লাহর বানী হিসাবে চালিয়ে দিয়ে আরবদেরকে প্রতারনা করেছেন ও তাদেরকে বোকা বানিয়েছেন।বিষয়টিকে এবার একে একে বিবৃত করা যাক।
মোহাম্মদ ও আল্লাহ যে একই ব্যাক্তি তা পরিস্কার হয় নিচের আয়াত সমূহে:
যে কেউ আল্লাহ ও তার রসুলের আদেশ মত চলে তিনি তাকে জান্নাত সমূহে প্রবেশ করাবেন যেগুলোর তলা দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। ০৪:১৩
যে কেউ আল্লাহ ও তার রসুলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন যেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ০৪: ১৪
উপরোক্ত আয়াত থেকে পরিষ্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে আল্লাহ ও তার রসুলের আদেশ সমার্থক। তার অর্থ আল্লাহ ও তার রসুল একই ব্যাক্তি।
কোরান যদিও বলছে আল্লাহ এর সাথে কাউকে শরিক করা যাবে না, কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তো মোহাম্মদের রূপ নিয়ে দুনিয়াতে আসতে পারে,আর আল্লাহর জন্য তা খুবই সম্ভব,সেক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কারো শরিক করাও হয় না। কেন জানি মুসলমানরা সেটাকেও তেমন একটা আমল দেয় না, বোধ হয় তা হলে তা হিন্দুদের অবতার তত্ত্বের সাথে মিলে যাবে এই ভয়ে।কিন্তু যে কেউ একটু মন দিয়ে খোলা দৃষ্টি দিয়ে পড়লেই বুঝতে পারবে যে , কোরানের কথাগুলো স্রেফ মোহাম্মদের নিজের কথা। কোরানের কথা যে খোদ মোহাম্মদের নিজের কথা তা বুঝতে কোরানের নিচের আয়াতগুলো দেখা যেতে পারে:
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালূ । ০১:০১
কথাগুলো আল্লার হলে, আল্লাহ নিজেই নিজের নামে শুরু করতেন না ।
আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি ও তোমার সাহায্য কামনা করি। ০১:০৫
কথাগুলো আল্লাহর হলে আল্লাহ নিজেই নিজের ইবাদত করবেন না।
এখানে প্রশ্ন আসে , কে শুরু করছে? কারা ইবাদত করে ? যদি ধরা হয় এগুলো মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে তাহলে সঠিক বাক্যগুলো এরকম হলেই তা বরং আল্লাহর কথা হতো-
শুরু কর আমার( আল্লাহর) নামে, আমি পরম করুনাময়, অতি দয়ালূ।
তোমরা একমাত্র আমারই ইবাদত কর ও আমার সাহায্য কামনা কর।
এ প্রসঙ্গে হিন্দুদের কাছে পবিত্র গীতার কথা উল্লেখ করা যায়। হিন্দুদের বিশ্বাস গীতার বানী হলো স্বয়ং তাদের ভগবান তথা কৃষ্ণের নিজের বানী। শ্রী কৃষ্ণকে তারা স্বয়ং ভগবান বলে বিশ্বাস করে যিনি মানুষ রূপে এ পৃথিবীতে অবতরন করেছিলেন পাপীদেরকে শাস্তি দিতে ও সাধুদেরকে রক্ষা করতে। গীতার দু একটি শ্লোক নিচে দেখা যাক:
হে ধনঞ্জয়, আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ট পরম তত্ত্ব আর কিছু নেই।সূত্রে যেমন মনি সমূহ গাথা থাকে, ঠিক তেমনি ভাবে জগতের সবকিছু আমার মধ্যে বিরাজ করছে। ০৭:০৭
হে অর্জুন, আমি ভুত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে জানি। কিন্তু আমাকে কেহই জানে না। আমি সর্বজ্ঞ, আমি কোন মায়ার অধীন নহি, কারন আমি মায়াধীশ। কিন্তু জীব মায়ার অধীন তাই তারা অজ্ঞ। কেবল আমার অনুগৃহীত ভক্তগনই আমার মায়াকে অতিক্রম করিয়া আমাকে জানিতে পারে। ০৭:২৬
লক্ষ্যনীয় এখানে বক্তা যেহেতু স্বয়ং ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তাই তিনি সর্বদা নিজেকে প্রথম পুরুষ অর্থাৎ আমি , আমাকে এ সর্বনাম পদ দিয়ে প্রকাশ করছেন। শ্রী কৃষ্ণ তার শিষ্য অর্জুনকে উপদেশ দিচ্ছেন আর সেই উপদেশ বানী সমূহের সমাহার হলো গীতা।অথচ কোরানের বানী খোদ আল্লাহর বানী হওয়া সত্ত্বেও তার সব বাক্য এরকম প্রথম পুরুষ তথা আমি, আমাকে এ সর্বনাম পদ দিয়ে প্রকাশ করেন নি।কোথাও কোথাও যদিও সেভাবে প্রকাশ করেছেন, যেমন-
সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরন রাখ, আমিও তোমাদেরকে স্মরন রাখব এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হইও না। ০২: ১৫২
অবশ্যই আমি তোমাদেরকে কিছুটা পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, জান ও মালের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। ০২: ১৫৫
যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, নিরক্ষর মোহাম্মদ আসলে নিজের বাক্যকে আল্লাহর বানী বলে চালাতে গিয়ে এ ভুলটি করে ফেলেছেন।বাক্য গঠন সম্পর্কে তার কোন সম্যক ধারনা ছিল না, যেমন খুশী তার নিজের বানানো কিচ্ছা বলে গেছেন, আর সাহাবীরা যাএকটু শিক্ষিত ছিল তারা শুনে তা তাদের মত লিখে রেখেছে বাক্যগুলোকে কিছুটা পরিমার্জন করে। কিন্তু মোহাম্মদের বর্ননা করা বাক্যগুলোর সংখ্যা ও ব্যকরনগত অসাম্যঞ্জস্যতা এত বেশী ছিল যে সাহাবীরা সব গুলোকে তাদের মত লিখতে পারে নি।।অনেকগুলোই তারা মোহাম্মদ হুবহু যেমন বলেছিল সেরকম ভাবেই লিখে রেখে গেছে আর পরবর্তীতে সেরকম ভাবেই আমাদের কাছে এসেছে।কিন্তু তখন এসব নিয়ে তেমন কেউ তখন চ্যলেঞ্জ করেনি, করার হিম্মতও কেউ দেখায়নি।দেখালে গর্দান যাওয়ার ভয় ছিল। নিচের আয়াতটি লক্ষ্য করা যাক-
যে কেউ আল্লাহ ও তার রসুলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন যেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। ০৪: ১৪
অথচ ঠিক এর পরের আয়াতটি হলো –
আর তোমরা তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যাভিচারিনী তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজনকে সাক্ষী হিসাবে হাজির কর, অত:পর তারা যদি সাক্ষী প্রদান করে তাহলে সংশ্লিষ্টদেরকে গৃহে আবদ্ধ রাখ যে পর্যন্ত তাদের মৃত্যু না হয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য ভিন্ন কোন পথ না প্রদর্শন করেন। ০৪:১৫
০৪:১৪ যদি ঠিক ০৪:১৫ আয়াতের ব্যকরনগত বাক্য রীতি অনুসরন করত তাহলে তা হতো নিম্নরূপ:
যে কেউ আমার(আল্লাহ) ও আমার রসুলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে, আমি তাকে আগুনে প্রবেশ করাব যেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।
কিন্তু তার পরেও ০৪: ১৫ আয়াতে কিছুটা গোলমাল করে ফেলেছে। বলছে- অথবা আল্লাহ তাদের জন্য ভিন্ন কোন পথ না প্রদর্শন করেন। এখানে আল্লাহ স্বয়ং বক্তা হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে নিজেকে তৃতীয় পুরুষ হিসাবে উল্লেখ করছেন যা ব্যকরনগত ভুল।আল্লাহর বক্তব্য হলে এটা হতো এরকম – অথবা আমি তাদের জন্য ভিন্ন কোন পথ না প্রদর্শন করি। অর্থাৎ আল্লাহ নিজেকে তৃতীয় পুরুষ রূপে উল্লেখ না করে প্রথম পুরুষ রূপে উল্লেখ করতেন।
আমি তাদের পেছনে মরিয়ম তনয় ইসাকে প্রেরন করিয়াছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। ০৫: ৪৬
আল্লাহ পরিস্কার ভাবে বলছেন- আমি, অর্থাৎ প্রথম পুরুষে নিজেকে বর্ননা করছেন। অথচ ঠিক এর পরের আয়াতটি হলো –
ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিৎ আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ন করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ন করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা পাপাচারী। ০৫: ৪৭
আল্লাহর বানী হলে আয়াতটি হতো এরকম-
ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিৎ আমি তাতে যা অবতীর্ন করেছি সে অনুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আমি যা অবতীর্ন করেছি সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না , তারা পাপাচারী।
আর একটি আয়াত-
হে মুমিন গন, তোমরা ইহুদি ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহন করো না। তারা একে অপরের বন্ধু।তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদের পথ প্রদর্শন করেন না।০৫:৫১
আয়াতের প্রথম অংশটি আল্লাহর বানী বলে মনে হলেও আল্লাহ জালেমদের পথ প্রদর্শন করেন না– এ অংশটুকুকে তা মনে হয় না।এটা যদি এরকম হতো- আমি জালেমদের পথ প্রদর্শন করি না-তাহলে তা আল্লাহর সরাসরি বানী মনে হতো।গোটা কোরানে এরকম উদ্ভট ব্যকরনগত ভুলের ছড়াছড়ি। যে কেউ একটু দিল মন খোলা রেখে পড়লে তা পরিস্কার বুঝতে পারবে। তবে যাদের হৃদয়ে সীল মারা তারা বুঝতে পারবে না। এ বিষয়ে দু একজনের সাথে আলাপ করে দেখেছি তাদের যুক্তি হলো- আরবী ব্যকরনে নাকি এ ধরনের বাক্যরীতি সিদ্ধ। অর্থাৎ বক্তা নিজেকে প্রথম পুরুষ বা দ্বিতীয় পুরুষ বা তৃতীয় পুরুষ যে কোন ভাবেই প্রকাশ করতে পারে।আরও গভীর ভাবে আলাপ করতে গিয়ে শুনেছি আরও অদ্ভুত কথা। তা হলো- আরবী ব্যকরন তারা অনুসরন করে কোরানের ভিত্তিতে অর্থাৎ কোরানে যে রকমভাবে আরবী ব্যকরনকে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাই শুদ্ধ আরবী ব্যকরন রীতি। কোরানকে আল্লাহর বানী প্রমান করতে গিয়ে এক শ্রেনীর অন্ধ মানুষ নিরক্ষর মোহাম্মদের উদ্ভট কথা বার্তাকেই আদর্শ ব্যকরন রীতি ধরে একটা ভাষার আদি ও অকৃত্রিম ব্যকরনের রীতি নীতিকেই বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে।
মুসলমানদের কাছে পৌত্তলিক হিসাবে আখ্যায়িত হিন্দুদের কিতাব গীতায়ও কিন্তু এ ধরনের অসামঞ্জস্যতা নেই অর্থাৎ বাক্য গঠনে ব্যকরনগত ভ্রান্তি নেই। এর কারনও সহজ বোধ্য। তা হলো- গীতার রচয়িতারা ছিল সেই প্রাচীনকালের ভারতের উচ্চ শ্রেনীর শিক্ষিত সম্প্রদায়।তারা ব্যকরণে ছিল বিশেষ পারদর্শী।যে কারনে তাদের রচনায় আর যাই হোক ব্যকরণগত ভুল ছিল না।পক্ষান্তরে,মোহাম্মদ নিজে ছিল অশিক্ষিত, নিরক্ষর , ব্যকরণ কি জিনিস তাই তার জানা ছিল না। ব্যকরণ না জানলেও কিচ্ছা কাহিনী বলতে তো কোন অসুবিধা ছিল না।তবে তা বলতে গেলে ব্যকরণ সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক আর তারই প্রমান ভুরি ভুরি তথাকথিত আল্লাহর কিতাব কোরানে। যেটুকু সঠিক বাক্য বিন্যাস আমরা কোরানে দেখি তার কৃতিত্ব মোহাম্মদের নয়, বরং কিছুটা শিক্ষিত কতিপয় সাহাবীদের। তারাই যতটুকু পারা যায় শুদ্ধ ভাবে মোহাম্মদের বলা কাহিনী কিচ্ছা গুলোকে মুখস্থ করে রেখেছিল বা কাঠ চামড়াতে লিখে রেখেছিল।আর সবাই জানে যে কোরান সংকলিত হয়েছিল মোহাম্মদের কালে নয়, তৃতীয় খলিফা ওসমানের কালে। এটাও সবাই জানে যে , ওসমানের সময় কালে ইসলামী সাম্রাজ্য আরবের পুরো জায়গাতে ছড়িয়ে পড়েছিল কিন্তু সমস্যা হয়েছিল, বিভিন্ন যায়গাতে মানুষ বিভিন্নভাবে কোরান পাঠ করত।এক অঞ্চলের কোরানের সাথে অন্য অঞ্চলের কোরানের মিল ছিল না। যে কারনে কোরানে আল্লাহ নিজের কোরান নিজেই হেফাজত করবেন বলে হুংকার ছাড়ার ( আমি নিজে কোরান অবতারন করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।১৫:০৯) পরেও অবশেষে সে কাজটা ওসমানকেই করতে হয়।কারন ততদিনে যার যার মত কোরান পাঠ শুরু হয়ে গেছিল।তা করতে গিয়ে যে কাজটি তিনি করেন তা হলো- কতিপয় ব্যাক্তি নিয়ে গঠিত কমিটি তাদের পছন্দমত কোরানের আয়াতগুলো সংকলন করেন ও কোরানের বাকী কপি সমূহ পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলেন।আর সে সংকলনের সময় তারা হুবহু মোহাম্মদের কাছ থেকে পাওয়া কোরানের বানী সংরক্ষন করেছিল তা মনে করার কোন সংগত কারন নেই। তা করলে কোরানে আরও অসংখ্য গাজাখুরী তথ্য ও ব্যকরণগত ভ্রান্তি খুজে পাওয়া যেত।যারা কোরান সংকলন কমিটিতে ছিল তারা মোটামুটিভাবে সেখানকার সেকালের শিক্ষিত মানুষ ছিল। যার ফলে তারা অনেকটাই পরিমার্জিত আকারে কোরান সংকলন করেছে তা বোঝাই যায়।বিষয়টি যে এরকম তা বোঝা যায় নিচের হাদিসটিতে:
আবু আনাস বিন মালিক বর্নিত- যখন সিরিয়া ও ইরাকের লোকেরা আজারবাইজান ও আরমেনিয়া বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করছিল তখন হুদায়ফিয়া বিন আল ইয়ামান উসমানের নিকট আসল। হুদায়ফিয়া একারনে ভীত ছিল যে সিরিয়া ও ইরাকের লোকেরা ভিন্ন ভাব ও উচ্চারনে কোরান পাঠ করত।তাই সে উসমানের নিকট বলল- হে বিশ্বাসীদের প্রধান,কিতাবকে বিভক্ত করার আগেই মুসলমান জাতিকে রক্ষা করুন, যেমনটা ইহুদি ও খৃষ্টানরা তাদের কিতাবকে পূর্বে বিভক্ত করেছিল।সুতরাং উসমান হাফসার নিকট কোরানের আসল কপি চেয়ে পাঠালেন যাতে করে তা থেকে বেশ কিছু কপি তৈরী করা যায়।হাফসা সেটা উসমানের কাছে পাঠালে উসমান যায়েদ বিন তাবিতকে প্রধান করে আব্দুল্লাহ বিন আয-যুবায়ের, সাইদ বিন আল আস এবং আব্দুর রহমান বিন হারিথ বিন হিসাম এ কয়জনের এক কমিটি করে দিয়ে কোরান সংকলন করতে আদেশ করলেন। তিনি আরও বললেন- যদি যায়েদ বিন তাবিত এর সাথে কোন বিষয়ে ঐকমত্য না হয়,তাহলে সেটা যেন কুরাইশ কথ্য রীতি অনুযায়ী লেখা হয় কারন কোরান কুরাইশ এ রীতিতেই প্রকাশ হয়েছিল।তারা সেভাবেই কোরান সংকলন করেছিল ও আসল কপি হাফসার নিকট পুনরায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। অত:পর এ সংকলিত কপির এক খন্ড করে প্রতিটি প্রদেশে পাঠান হয়েছিল এবং বাকী যেসব পান্ডুলিপি যা আংশিক বা সম্পুর্ন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন জিনিসে লিখিত ছিল তা সব পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন উসমান।যায়েদ বিন তাবিত আরও বলেন- যখন তিনি কোরানের কপি তৈরী করছিলেন তখন সূরা আহযাবের একটা আয়াত হারিয়ে ফেলেছিলেন যা তিনি নবীকে বলতে শুনেছেন। তখন সেটার খোজ শুরু হয় এবং সেটা খুজাইমা বিন তাবিত বিন আল আনসারীর কাছে পাওয়া যায় ( আয়াতটি: মুমিনদের মধ্যে কতক তাদের ওয়াদা পূর্ন করেছে।তাদের কতক মারা গেছে,কতক এখনও অপেক্ষা করছে।তা বোঝা যায় নিচের হাদিসটিতে:
আবু আনাস বিন মালিক বর্নিত- যখন সিরিয়া ও ইরাকের লোকেরা আজারবাইজান ও আরমেনিয়া বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করছিল তখন হুদায়ফিয়া বিন আল ইয়ামান উসমানের নিকট আসল। হুদায়ফিয়া একারনে ভীত ছিল যে সিরিয়া ও ইরাকের লোকেরা ভিন্ন ভাব ও উচ্চারনে কোরান পাঠ করত।তাই সে উসমানের নিকট বলল- হে বিশ্বাসীদের প্রধান,কিতাবকে বিভক্ত করার আগেই মুসলমান জাতিকে রক্ষা করুন, যেমনটা ইহুদি ও খৃষ্টানরা তাদের কিতাবকে পূর্বে বিভক্ত করেছিল।সুতরাং উসমান হাফসার নিকট কোরানের আসল কপি চেয়ে পাঠালেন যাতে করে তা থেকে বেশ কিছু কপি তৈরী করা যায়।হাফসা সেটা উসমানের কাছে পাঠালে উসমান যায়েদ বিন তাবিতকে প্রধান করে আব্দুল্লাহ বিন আয-যুবায়ের, সাইদ বিন আল আস এবং আব্দুর রহমান বিন হারিথ বিন হিসাম এ কয়জনের এক কমিটি করে দিয়ে কোরান সংকলন করতে আদেশ করলেন। তিনি আরও বললেন- যদি যায়েদ বিন তাবিত এর সাথে কোন বিষয়ে ঐকমত্য না হয়,তাহলে সেটা যেন কুরাইশ কথ্য রীতি অনুযায়ী লেখা হয় কারন কোরান কুরাইশ এ রীতিতেই প্রকাশ হয়েছিল।তারা সেভাবেই কোরান সংকলন করেছিল ও আসল কপি হাফসার নিকট পুনরায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। অত:পর এ সংকলিত কপির এক খন্ড করে প্রতিটি প্রদেশে পাঠান হয়েছিল এবং বাকী যেসব পান্ডুলিপি যা আংশিক বা সম্পুর্ন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন জিনিসে লিখিত ছিল তা সব পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন উসমান।যায়েদ বিন তাবিত আরও বলেন- যখন তিনি কোরানের কপি তৈরী করছিলেন তখন সূরা আহযাবের একটা আয়াত হারিয়ে ফেলেছিলেন যা তিনি নবীকে বলতে শুনেছেন। তখন সেটার খোজ শুরু হয় এবং সেটা খুজাইমা বিন তাবিত বিন আল আনসারীর কাছে পাওয়া যায় ( আয়াতটি: মুমিনদের মধ্যে কতক তাদের ওয়াদা পূর্ন করেছে।তাদের কতক মারা গেছে,কতক এখনও অপেক্ষা করছে।তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।৩৩:২৩)।সহি বুখারী, বই-৬১, হাদিস-৫১০
উপরোক্ত হাদিস থেকে কতকগুলি বিষয় পরিস্কার। তা হলো-
১। আল্লাহ নিজে কোরানের রক্ষাকর্তা বলে ঘোষণা দিলেও তিনি তা পালনে ব্যর্থ।আল্লাহ নিজেই রক্ষা করবেন বলেই মোহাম্মদ নিজ জীবনে কোরান সংরক্ষন করেননি। কিন্তু আল্লাহ তো মোহাম্মদের নিজেরই কল্পিত চরিত্র যাকে তিনি অনুভব করতেন তার হিস্টিরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার সময়, সুতরাং বলাই বাহুল্য যে সে আল্লাহ কোরান সংরক্ষন করবেন না বা করতে পারার কথাও না। সেকারনেই কোরান খুব তাড়াতাড়ি সিরিয়া বা ইরাকে বিভিন্নভাবে পড়া হতে থাকে । বলা বাহুল্য, বিভিন্ন উচ্চারনে পড়ার অর্থ হলো কোরানের বিভিন্ন অর্থ হওয়া, অর্থাৎ কোরান বিকৃত হয়ে যায় খুব দ্রুতই।
২। কোরান যে উক্ত কমিটি বা মোদ্দা কথায় কমিটির নেতা যায়েদ বিন তাবিত কর্তৃকই অনেকাংশেই নিজের বা নিজেদের মত করে লেখা তা উসমানের নিজের কথায় প্রতিফলিত কারন তিনি বলছেন, কোন বিষয়ে যায়েদ বিন তাবিতের সাথে ঐকমত্য না হলে যেন কুরাইশ কথ্য রীতি অনুযায়ী কোরান লেখা হয়। আর পরে সেভাবেই কোরান লেখা হয়। উল্লেখ্য, যায়েদ বিন তাবিত হল মূল লেখক। সে যদি কমিটির অন্যের কোন বলা আয়াতের সাথে এক মত না হয় শুধু তখন মাত্র কুরাইশ কথ্য রীতি অনুসরন করতে হবে। কিন্তু তার নিজের বলা আয়াত সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। সে কোরান সংকলনের সর্বে সর্বা ক্ষমতার অধিকারী আর সে ক্ষমতা তাকে প্রদান করা করেছেন উসমান।
৩।পূর্ন একটি কোরানের কপি যদি মোহাম্মদের অন্যতম স্ত্রী হাফসার কাছে থেকেই থাকে তাহলে তো সোজা সেটা কপি করে নিলেই হতো। সেখানে উসমানের উপরোক্ত আদেশ দেয়ার কোন অর্থই হয় না। তার মানে হাফসার কাছে রক্ষিত কোরান পূর্নাংগ ছিল না বা থাকলেও উসমান ও তার কমিটি নিজেদের কিছু কথা নতুন কপি করা কোরানে জুড়ে দিয়েছেন। তবে পূর্নাঙ্গ যে ছিল না তা বোঝা যায় সূরা আহযাবের একটি আয়াত হারিয়ে যাওয়ার ব্যপারে। হারিয়ে যাওয়া সে আয়াত খোজার জন্য তখন খুজাইমার নিকট যাওয়ার দরকার পড়ত না।আর একটা আয়াত হারিয়ে যাওয়ার কথা যখন স্বীকার করা হয়েছে তখন আরও কত আয়াত যে হারিয়ে গেছে বা উক্ত কমিটি নিজেদের মত বানিয়ে কতকগুলো আয়াত কোরানে জুড়ে দিয়েছে তার হদিস কে দেবে?
৪।চামড়া, খেজুর পাতা বা হাড়ের ওপর যেসব সূরা লেখা ছিল, তার মধ্যে সংকলিত কোরানের সূরার সাথে যে গুলোর মিল ছিল সেসব পান্ডুলিপি কেন পুড়িয়ে ফেলতে উসমান আদেশ দিলেন? সেগুলো তো পুড়িয়ে ফেলার কোন সঙ্গত কারন দেখা যায় না।আর যদি আয়াত ভিন্ন ভাবে লেখা থাকে সেগুলোই বা কে লিখল? কেন লিখল?
৫। উপরোক্ত বিষয় গুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে- মোহাম্মদের কোরানের সাথে উসমানের কোরানের অনেক পার্থক্য বিদ্যমান।সে পার্থক্যের অন্যতম একটি হলো- মোহাম্মদের কোরানে অনেক বেশী ভূল ভ্রান্তি বা ব্যকরণগত ভূল ছিল কারন তিনি ছিলেন নিরক্ষর। উসমানের করা কমিটির লোকজন ছিল শিক্ষিত, তাই তারা যে কোরান সংকলন করেছে তা অনেকটাই নিজেদের সম্পাদিত, অনেকটাই শুদ্ধ করে লেখা।কিন্তু তারাও বেশী শুদ্ধ করতে পারেনি তার কারন তখনও কোরানের বহু আয়াত সাহাবীদের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল যাকে খুব বেশী সংস্কার করে পাল্টে ফেলা যায় নি। তা করলে সংকলিত কোরানের গ্রহন যোগ্যতা নিয়ে ব্যপক প্রশ্ন উঠত। আর ঠিক সেকারনেই আমরা কোরানের যে ভার্সন আজকে পাই তাও ব্যপকভাবে ব্যকরণগত ভুলে ভরা।যখন একটা সংকলন তৈরী হয়েই গেল তখন থেকে তার অনুলিপিই শুধুমাত্র প্রকাশ হতে থাকে। এভাবেই গত ১৪০০ বছর ধরে কোরান অবিকৃত থেকেছে। অথচ কি অদ্ভুত ব্যাপার – এ বিষয়টিকেই কিছু তথাকথিত ইসলামী পন্ডিত বর্গ আল্লাহর অশেষ কুদরত হিসাবে বিবেচনা করে। তারা স্বাড়ম্বরে প্রচার করে- চৌদ্দ শ বছর ধরে একটি কিতাব অবিকৃত থেকেছে, এটা আল্লাহর কুদরত ছাড়া কিভাবে সম্ভব? উদ্ভট যুক্তিতে এসব তথাকথিত ইসলামী পন্ডিতদের জুড়ি মেলা ভার।
বিষয়টি নিয়ে আমি ভেবেছি, মোহাম্মদের মত অত বুদ্ধিমান ও সুচতুর ব্যাক্তি এমন ব্যকরণগত ভুল কিভাবে করলেন? ভাবতে ভাবতে এর একটা সমাধান সূত্রও আমি বের করেছি যার অভিজ্ঞতা খোদ আমার নিজ জীবনেই প্রত্যক্ষ করেছি। যেমন একবার যে কোন কারনে আমার এক বন্ধুকে আমি মিথ্যা বলেছিলাম। রংপুরে অবস্থান করেও আমি বন্ধুকে বলেছিলাম আমি ঢাকা আছি। বন্ধুটি আমার ছিল চট্টগ্রামে।তো হঠাৎ করে বন্ধুটি বলল সে একটা ব্যবসায়িক কারনে রংপুর যাবে। আমি তাকে বললাম- এখন এখানে আসাটা বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে না। কারন এখানে এখন বন্যা , চারদিকে শুধু পানি আর পানি। একটু খেয়াল করলেই কিন্তু আমার বক্তব্য থেকে বের হয়ে আসে যে আমি আসলে বন্ধুকে আমার অবস্থান সম্পর্কে মিথ্যা বলেছি।অর্থাৎ আমি যে ঢাকা অবস্থান না করে রংপুর অবস্থান করছি তা বোঝা যাবে সহজেই।আমি মনের অগোচরে বলে ফেলেছি- এখানে এ শব্দটা। এখানে এ শব্দটা একজন বক্তা সে যায়গা সম্পর্কেই বলে যে যায়গাতে বক্তা বক্তব্য প্রদানের সময় অবস্থান করে। কিন্তু কেন আমি এ ভুলটি করলাম? এর কারন হলো অবচেতন মন। আমি অনেক কথাই তার সাথে সুচতুর ভাবে বলেছি যা থেকে আমার বন্ধু বুঝতে পারবে না আসলে আমি কোথায় অবস্থান করছি। কিন্তু তার পরেও যেহেতু আমি অনেক কথাই বলেছি আর সে কারনে অবচেতন মনে বলে ফেলেছি আসল সত্যটা। মানুষের মন ঠিক এরকমভাবেই কাজ করে। কোরানের বিষয়টিও হুবহু তাই। মোহাম্মদ অবচেতন মনেই ভুলগুলো করে ফেলেছেন।আর সেকারনে গোটা কোরান পাঠ করে সহজেই বোঝা যায় যে তার নিজের বানীকে আল্লাহর বানী বলে চালাতে গিয়ে বার বার ঠিক সেই ভুলটি করেছেন। যে কারনে বার বার আল্লাহ নিজে তৃতীয় পুরুষ রূপে উল্লেখিত হয়েছে কোরানে যদিও কোরান হলো আল্লাহর নিজের মুখের বানী। এর সোজা অর্থ ইসলাম একটা মিথ্যা দিয়ে শুরু হয়েছিল যদিও মোহাম্মদকে সবাই আল আমীন বলে জানে ও বিশ্বাস করে।
তার ওহী পাওয়ার ঘটনা যে একটা কাল্পনিক কিচ্ছা বা হিস্টিরিয়া গ্রস্থ মানুষের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সময়কার ঘটনা ছাড়া আর কিছুই নয়, তা বোঝা যায় কতিপয় ঘটনায়।
আয়শা থেকে বর্নিত- আল্লাহর নবীর কাছে ওহী আসত স্বপ্নের মাধ্যমে অনেকটা দিনের আলোর মত।—-আল্লাহর নবী আল্লাহর ওহী নিয়ে ফিরে আসলেন তখন তার হৃৎপিন্ড প্রচন্ড রকম কাঁপছিল, -অত:পর তিনি বিবি খাদিজার কাছে ফিরে গেলেন ও বললেন, আমাকে আবৃত কর, আবৃত কর। তিনি তাকে কম্বল দিয়ে আবৃত করলেন যে পর্যন্ত না তার ভয় দুরীভুত হলো। তার পর আল্লাহর নবী হেরা পর্বতের গুহায় কি ঘটেছে সবিস্তারে খাদিজার নিকট বর্ননা করলেন ও বললেন- আমার ভয় হচ্ছে আমার ওপর কিছু একটা ভর করেছে।—— এর পরদিন খাদিজা তাকে নিয়ে তার চাচাত ভাই ওয়ারক্কা ইবনে নওফেলের কাছ নিয়ে গেলেন যিনি ইহুদী থেকে খৃষ্টান হয়েছিলেন ও হিব্রু ভাষায় গসপেল লিখতেন।তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ও তার দৃষ্টি শক্তি ক্ষীন হয়ে পড়েছিল।খাদিজা ওয়ারাক্কাকে বললেন- হে চাচাত ভাই, আপনার বোন জামাইয়ের কাছে শুনুন তার কি ঘটেছে। তখন ওয়ারাক্কা মোহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার কি ঘটেছে? আল্লাহর নবী সবিস্তারে তখন সব বর্ননা করলেন।সব কিছু শুনে ওয়ারক্কা বললেন- এই ব্যক্তি সেই ব্যাক্তি যিনি মূসা নবীর নিকট আল্লাহর বানী নিয়ে আসত ।—–এর কিছুদিন পর ওয়ারাক্কা ইবনে নওফেল মারা গেলেন এবং ওহী আসা কিছুদিনের জন্য বন্দ থাকল। জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল আনসারি বর্নিত- একদা ওহী আসা বন্দ হওয়া নিয়ে কথা বলার সময় আল্লাহর নবী বললেন- যখন আমি হাটছিলাম হঠাৎ আকাশ থেকে একটা শব্দ শুনলাম। আমি আকাশের দিকে তাকালাম আর সেই ফেরেস্তাকে দেখলাম যাকে আমি হেরা গুহায় দেখেছিলাম। সে বসেছিল আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে একটা চেয়ারে।আমি আবার ভীত হয়ে পড়লাম ও তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে গেলাম ও খাদিজাকে বললাম- আমাকে কম্বল দিয়ে আবৃত কর, আবৃত কর। আর তখন আল্লাহ সেই ওহী নাজিল করলেন- হে চাদরাবৃত, উঠুন সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন ( কোরান, ৭৪:১-৪) সহী বুখারী, বই-০১, হাদিস নং-০৩
উপরের হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে, মোহাম্মদ নিজেই আসলে নিশ্চিত নন কিভাবে তার কাছে ওহী আসত।। একবার বলছেন স্বপ্নের মাধ্যমে, একবার বলছেন জিব্রাইল ফিরিস্তা সরাসরি তার কাছে বানী নিয়ে আসত।স্বপ্নে ওহী পাওয়া তো আমাদের দেশে প্রচলিত স্বপ্নে নানা রকম ওষুধ পাওয়ার ব্যবসার মত।এর সাথে মোহাম্মদের ওহী পাওয়ার কোন তফাৎ তো দেখা যাচ্ছে না। এছাড়াও ওহী আসার অন্য নানা পদ্ধতি আছে, যেমন, ঘন্টা বাজার ধ্বনির মত। তো এসব তো একজন মানুষ হিস্টিরিয়াতে আক্রান্ত হলেই এসব ঘন্টা ধ্বনি শুনতে পায় আরও কত কিছু শোনে ও দেখে দ্বীন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ট ও শেষ নবী জিব্রাইল ফিরিস্তাকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছেন তিনি বুঝতেই পারলেন না যে তিনি আল্লাহ প্রেরিত নবী। শুধু তাই নয় তিনি এমনকি জিব্রাইল ফিরিস্তাকে চিনতেও পারলেন না।কি আজব কথা! তার পরে এমন ভয় পেয়ে গেছেন যে তার গায় জ্বর এসে গেছে আর তার মনে হচ্ছে কোন অশুভ আত্মা তার ওপর ভর করেছে যে কারনে তিনি বলছেন – আমার ভয় হচ্ছে আমার ওপর একটা কিছু ভর করেছে। শুভ আত্মা ভর করলে তো ভয়ের কোন কারন নেই।এসব তো একজন হিস্টিরিয়া রোগীর লক্ষন যা আমরা হর হামেশা দেখি।কেউ হিস্টিরিয়াতে আক্রান্ত হলে ঠিক এরকম লক্ষনই প্রকাশ পায়। সে মনে করে কি যেন অশরিরী তার ওপর ভর করেছে, তার সাথে কে যেন দেখা করেছে, তার ওপর আবোল তাবোল অনেক আধি ভৌতিক কথাবার্তা বলে যার কোন মাথা মুন্ডু নেই।অনেক সময় তার গায়ে প্রচন্ড জ্বর আসে ও পাগলের মত প্রলাপ বকতে থাকে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। জিব্রাইল নিজে মোহাম্মদের কাছে পরিচয় দিল না সে কে।কেনই বা সে তার কাছে এসেছে তাও বলল না।আল্লাহর কি মহিমা! আল্লাহর মহিমা বোঝা বড় দায়! কে বুঝতে পারল মোহাম্মদ আল্লাহর নবী? অশিতি পর এক বৃদ্ধ ওয়ারাক্কা, তাও বোঝার কয়েক দিনের মধ্যেই পটল তুলল ও সে নিজেও আর কাউকে এ কিচ্ছা প্রচার করার সুযোগ পেল না যা যথেষ্ট রহস্যজনকও বটে। যে জিব্রাইল হেরা পর্বতের ছোট্ট একটা গুহার মধ্যে দিব্যি ঢুকে গেল, সেই জিব্রাইলকে মোহাম্মদ আবার দেখল আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে রাখা চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায়।তার মানে সে চেয়ার মোটেও ছোট খাট চেয়ার নয়, অতি বিশাল চেয়ার, তা না হলে আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে রাখা চেয়ার– এভাবে চেয়ারের বর্ননা দেয়া হতো না। আর বিশাল চেয়ারে বসে থাকা জিব্রাইলের আকারও নিশ্চয়ই অতি বিশাল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা বলে কথা, তাই অতি বিশাল জিব্রাইল অতি ছোট আকার ধারন করে ঢুকে পড়েছিল হেরা পর্বতের ছোট্ট গুহার মধ্যে। মজার কথার সেটাই শেষ নয়। ইতোপূর্বে তো মোহাম্মদ জেনে গেছেন তিনি আল্লাহর নবী, জিব্রাইল হলো ফেরেস্তা যে আল্লাহর বানী তার কাছে নিয়ে আসে। প্রথমবার তিনি তাকে চিনতে পারেননি বলে ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু পরের বার তো তার আর ভয় পাওয়ার কথা নয়। অথচ এবারও তিনি আকাশে তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন।তার গায়ে জ্বর চলে আসল। এটা কি প্রমান করে যে তিনি সত্যি সত্যি জিব্রাঈলকে দেখেছেন? নাকি হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আধি ভৌতিক জিনিস দেখেছেন? ভাবতেও অবাক লাগে এসব আধি ভৌতিক উদ্ভট কিচ্ছা কাহিনীর মাধ্যমে তিনি একদল মানুষকে স্রেফ বোকা বানিয়েছিলেন আর আজকেও কোটি কোটি মানুষ সেই বোকামীর শিকার জেনে , না জেনে।শুধু শিকার নয়, কিছু কিছু লোক তো সেই বোকামীর শিকার হয়ে রীতিমতো ফ্যানাটিক, জীবন দিতেও তাদের কোন দ্বিধা নেই।যা আমরা নানা সময়ে নানা রকম আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করছি।
এই জিব্রাইল একবার মোহাম্মদের সাথে কি অদ্ভুত ও গাজাখুরি কান্ডটি করেছে তা এবার দেখা যাক:
আবু দার বর্নিত- আল্লাহর নবী বলেছিলেন- আমি যখন মক্কার বাড়ীতে ছিলাম একদিন বাড়ীর ছাদ খুলে গেল ও সেখানে জিব্রাইল অবতরন করল এবং আমার বক্ষ বিদীর্ন করল।,জম জমের পানি দিয়ে আমার বক্ষ ধুয়ে সাফ করে দিল।তারপর সে একটা জ্ঞান ও বিশ্বাস ভর্তি সোনার পাত্র নিয়ে তা দিয়ে আমার বক্ষে প্রবিষ্ট করে অত:পর বক্ষ বন্দ করল ।তারপর সে আমার একটা হাত ধরে নিকটবর্তী বেহেস্তে নিয়ে গেল। আমরা বেহেস্তের দ্বারে গেলাম ও জিব্রাইল দ্বার রক্ষককে দ্বার খুলে দিতে বলল—-( এর পরের ঘটনা হলো মোহাম্মদ অত:পর সমস্ত বেহেস্ত ঘুরে ঘুরে দেখলেন ও অনেক পূর্ববর্তী নবীদের সাথে খোশ গল্প করলেন)– সহী বুখারী, বই-০৮, হাদিস নং-৩৪৫