Wednesday, February 3, 2016

সময় বিশ্লেষন

প্রাচীন কালের মানুষেরা রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। এই যে পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, আকাশ ভরা বিস্ময়, এর শুরু হয়েছিলো কখন ? আসলেই কি এর কোন শুরু আছে, নাকি চিরন্তন এই মহাবিশ্ব ? আদিকাল থেকে মানুষ এই মহাবিশ্বকে চিরন্তন ভেবে এসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই তারা ভাবত, এই মহাবিশ্ব বুঝি চিরকালই ছিল। আর তার কোন এক পর্যায়ে মানুষের মত প্রাণীরা এই পৃথিবীর বুকে বাস করা শুরু করেছে। প্রাচীন দার্শনিকরাও এই মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করেছেন। অ্যারিস্টটল(খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২) তার “Meteorology” -এর ১২ তম অধ্যায়ে যুক্তি দেখিয়েছেন- সময়ের কখনো থেমে থাকে না, আর এই মহাবিশ্বও চিরন্তন। অর্থাৎ তিনি ভাবতেন, সময়ের কোন শুরু বা শেষ নেই। যখন কিছু ছিল না তখনও সময় ছিল; আর এই বিশ্বজগতের পরিণতি যাই হোক না কেন, সময়ের মত সময় বয়েই চলবে। অ্যারিস্টটল ছিলেন তার সময়ের সবথেকে প্রভাবশালী দার্শনিক। তিনি এমনই প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন যে, তার মৃত্যুর প্রায় ২০০০ বছর পর পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার মতই মানুষ মেনে নিয়েছিল। অ্যারিস্টটল ছাড়া তার সমসাময়িক এপিকুরাসও (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪১ – খ্রিস্টপূর্ব ২৭০) একই রকম মতামত দিয়েছেন। এসব দার্শনিকদের মতে স্থান এবং সময় দুটোই ছিল পরম।

আসলে প্রাচীনকালের দার্শনিকদের কাছে সময় ছিল এক রহস্যের নাম। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা সময়ের রহস্য ভেদ করতে চেয়েছেন। কিন্তু কোন কূল কিনারা পাননি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন যে সময় এক অতিপ্রাকৃত বিষয়। আর সেসব দার্শনিক আরও গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, তারাও একটি নিশ্চিত উত্তর খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে একটা সময় তাদের ধারণা হয়েছিল যে, সময় সম্ভবত মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের উপলব্ধি। এরপর অনেক সময় চলে গেছে ;দর্শনের আধিপত্য শেষ হয়েছে। এখন আধুনিক বিজ্ঞানের যুগ। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে, সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা ঘড়ি দিয়েই সময়কে বুঝে নেই । কিন্তু সময় তো আর ঘড়ির উপর নির্ভর করে চলে না। ঘড়ির কাটা থেমে থাকলেও সময় বয়েই চলে। অনেক ক্ষেত্রে ঘড়ির এক ঘণ্টা পার হলেও আমাদের কাছে মনে হয় যেন এক ঘন্টার অনেক বেশি সময় চলে গেছে! আবার অনেক ক্ষেত্রে এর উল্টোটিও ঘটে। আসলে, সময় একটি ব্যক্তি নিরপেক্ষ জিনিস হলেও আমরা আমাদের মস্তিষ্কের সাহায্যেই সময়কে অনুভব করে থাকি। ফলে সময় নিয়ে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণা পেতে হলে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের উপর নির্ভর করলেই চলে না। পাশাপাশি শারীরতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মত বিষয়ের উপরও নির্ভর করতে হয়। আর পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করতে গেলে খুব কম কথায় সময় বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করাও বেশ কঠিন। তাই সময়ের সঠিক বিশ্লেষণের জন্য এর ভৌত রূপের(পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে) পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও(শারীরবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে) জানার প্রয়োজন রয়েছে ।

পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময়

যদি প্রশ্ন করা হয় সময় কি? তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর উত্তর কি হবে ? হয়ত বলা যেতে পারে, এটি একটি ভৌত রাশি। কারণ, পদার্থবিজ্ঞানের আলোচনায় যেসব রাশিকে দরকার হয় এবং সেটাকে পরিমাপ করা যায়, তাকে ভৌত রাশি বলা হয়। যেমন তাপমাত্রা। সময়ও তাপমাত্রার মত একটি ভৌত রাশি। কিন্তু তাপমাত্রাসহ অন্যসব রাশির সাথে সময়ের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, ভর, তড়িৎ প্রবাহ, দীপন ক্ষমতা ইত্যাদিকে আমরা মাপার পাশাপাশি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ধরতে, ছুতে ও অনুভব করতে পারি। যেমন- দৈর্ঘ্য,প্রস্থ ও উচ্চতাকে দেখা যায়, স্কেল দিয়ে মাপা যায়। কোন বস্তুকে হাত দিয়ে তুলে আমরা তার ভর অনুভব করতে পারি। তাপমাত্রা ও তড়িৎ প্রবাহের সংস্পর্শে এসে অনুভব করতে পারি( তাই বলে তড়িৎ প্রবাহ অনুভব করতে যাওয়াটা নিশ্চয় বোকামি হবে !)। অর্থাৎ- সব ভৌত রাশিকেই পরিমাপের পাশাপাশি ত্বক, চোখ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করা যায়। কিন্তু সময়কে শুধুমাত্র মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার সাহায্যেই অনুভব করতে হয়। ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করার কোন উপায় নেই। অন্য সব ভৌত রাশির সাথে এখানেই সময়ের পার্থক্য।

সময় যে বয়ে চলেছে এটি আমরা বুঝতে পারি পরিবর্তন বা গতির সাহায্যে। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে ঋতু পরিবর্তন হয়। পৃথিবীর নিজের অক্ষের উপর ঘোরার কারণে রাত-দিন হয়। আমরা বুঝতে পারি সময় বয়ে চলেছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঘড়িতে যে সময় মাপা হয় সেটিও কিন্তু গতির সাহায্যেই।

আদিকালের ঘড়িগুলোতে এই বিষয়টি খুব ভালমতো বোঝা যেত। সূর্যঘড়িতে ছায়ার পরিবর্তন থেক সময় মাপা হত। জলঘড়ি বা বালিঘড়িতেও এই পরিবর্তনের বিষয়টি সরাসরি দেখা যেত। এসব প্রাকৃতিক ঘড়ির পরে আবিষ্কার করা হয় যান্ত্রিক ঘড়ি। এসব ঘড়িতেও কোন একটি দণ্ড বা দোলকের পর্যায়কালকে ব্যাবহার করেই সময় মাপা হত।

এরপর আসে আণবিক ঘড়ি। একটি ক্রিস্টাল অণুর কম্পনের হারকে ব্যাবহার করে আণবিক ঘড়িতে সময় মাপা হয়। পারমানবিক ঘড়িতে মাপা হয় পরমাণুর কম্পনের সাহায্যে। এক কথায়, গতি ছাড়া সময়ের প্রবাহকে মাপার কোন উপায় নেই, এমনকি বোঝারও উপায় নেই। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় গতি কি ? তাহলেই একটি দার্শনিক সমস্যার মধ্যে পরে যাবেন। কারণ কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন বস্তুর সে সরণ হয়, সেটিই তার গতি। অর্থাৎ সময়ের ধারনা ছাড়া গতি পরিমাপের কোন উপায় নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে- সময়ের ধারনা ছাড়া গতিকে বোঝার উপায় নেই, আবার অন্যদিকে গতির সাহায্যেই সময়কে বুঝতে হচ্ছে। ফলে “গতি” ও “সময়” এই দুটি জিনিসকে এমনিতে খুব সাধারণ জিনিস মনে হলেও এদের মৌলিক রূপ বুঝতে চাইলেই এক রহস্যময় জট পাকিয়ে যায়। সময় যে একটি গোলমেলে জিনিস সেটি কিন্তু বহুকাল আগের থেকেই মানুষের জানা ছিল। আজ থেকে প্রায় সারে তিন হাজার বছর আগে সেন্ট অগাস্টিন বলেছিলেন- “ কেউ যদি জিজ্ঞেস করে সময় কি ? – মনে হয় জানি, কিন্তু উত্তর দিতে গেলেই বুঝতে পারি জানি না। ”

চিত্রঃ প্রাচীনকালে জলঘড়ি ও বালিঘড়ির সাহায্যে সময় মাপা হত।

গতি থেকেই যে সময়ের ধারনাটি সৃষ্টি হয়েছে, একথা প্রথম স্পষ্ট করেন বলেন অ্যারিস্টটল। তার ভাষায়- “ সময় হলো গতির পরিমাপ ।” কিন্তু গতিবিদ্যার(Dynamics) মৌলিক স্বীকার্য সম্পর্কে তার ধারণা ছিল একদম ভুল। তিনি ভাবতেন- হালকা বস্তুর থেকে ভারী বস্তু বেশি বেগে পতিত হয়। অর্থাৎ সময় সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের ধারণাকে আমরা গ্রহণ করতে পারছি না। অ্যারিস্টটলের পরে গতিবিদ্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন ইতালিয়ান জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি। তিনি পরীক্ষা করে দেখান যে- অ্যারিস্টটলের ধারণা ভুল। পাশাপাশি তিনিই প্রথম বলেন- গতিবিদ্যায়, বস্তুর দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষেত্রে বেগটিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ না, সময়ের সাথে কি হারে বেগ পরিবর্তন হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই গ্যালিলিওর হাত ধরে এই প্রথম পদার্থবিজ্ঞানের আলোচনায় ত্বরণের ধারণা প্রবেশ করে।

গ্যালিলিও ত্বরণ ও সময়কে বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেও বলবিদ্যা শুরু হবার আগ পর্যন্ত – স্থান, সময়, ত্বরণ এসবের গুরুত্ব ভালমতো বোঝা যায় নি। বলবিদ্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল, এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিউটনের আগে “স্থান” ও “সময়” এই দুটোকেই পরম বলে ভাবা হত। কিন্তু নিউটন তার মহাকর্ষ তত্ত্ব ও গতির সূত্র আবিষ্কার করার পর আমাদের পরম স্থানের ধারনা ত্যাগ করতে হয়েছে ।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন- বস্তুপি-গুলোর স্থিত অবস্থাই পছন্দ। অর্থাৎ কেউ যদি কোন বল প্রয়োগ না করে তাহলে কোন বস্তু সারা জীবন এই স্থির অবস্থায়ই থেকে যাবে। পাশাপাশি তিনি এটাও ভাবতেন যে, গতিশীল বস্তুও স্থিতিশীল অবস্থায় আসতে চায়। । আর নিউটনের তত্ত্বের পার্থক্যটি ঠিক এখানেই। নিউটনের তত্ত্ব থেকে জানা যায়- কোন বস্তুকে বল প্রয়োগ না করলে গতিশীল বস্তু চিরকাল চলতেই থাকবে; আর স্থির বস্তু চিরকাল স্থিরই থেকে যাবে। এই তত্ত্ব থেকে বোঝা গেল স্থিতির কোন পরম মানই আসলে নেই।

স্থিতির কোন পরম মান না থাকার বিষয়টি নিউটনকে খুব অস্বস্তিতে ফেলেছিল। এসব নিয়ে নিউটন একটু অসস্থিতে থাকলেও বিষয়টি কিন্তু বেশ মজার। কেননা, স্থিতির যদি কোন পরম মান না থাকে তাহলে কে “স্থির” আর কে’ই বা “গতিশীল” কোনভাবেই বলা সম্ভব না !! ধরুন একটি লোক রাস্তার পাশে দাড়িয়ে আছে, আরেকটি লোক একটি নির্দিষ্ট বেগে তার দিকে সাইকেল চালিয়ে আসছে। এখন অ্যারিস্টটলের তত্ত্ব অনুসারে আমরা বলতে পারব, কোন লোকটি স্থির আর কোন লোকটি চলমান। আমাদের উত্তর হবে- দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি স্থির, আর সাইকেল চালিয়ে আসা লোকটি চলমান। কিন্তু নিউটনের তত্ত্ব অনুসারে এভাবে নিদিষ্ট করে বলার কোন উপায় নেই। বলতে হবে দাঁড়ানো লোকটির সাপেক্ষে সাইকেলের লোকটি চলমান অথবা সাইকেলের লোকটির সাপেক্ষে দাঁড়ানো লোকটি চলমান। একি আজব কথা! শুনতে আজব শোনালেও বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন নিউটনের তত্ত্বই সঠিক।

নিউটনের তত্ত্ব সঠিক কিনা তা খুব সহজে একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। আমারা যদি পৃথিবীর ঘূর্ণনকে বিবেচনায় না আনি, তবে পৃথিবীর উপর একটি ট্রেনের গতিকে দুইভাবেই বলতে পারি । এক – পৃথিবী স্থির, আর রেল লাইনের উপর দিয়ে একটি ট্রেন পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে ছুটে চলেছে, অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে ট্রেনটি স্থির, আর পৃথিবী পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে ছুটে চলেছে। এখন ট্রেনের ভেতর যদি কেউ কোন গতিশীল বস্তু নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে, তবে দেখা যাবে নিউটনের সূত্রগুলো ট্রেনটির ভেতরেও প্রযোজ্য। যেমন- ট্রেনের একটি টেবিলের উপর যদি কেউ একটি পিংপং বল নিয়ে খেলে, তাহলে দেখা যাবে ট্রেনের বাইরের থাকা একটি টেবিলের উপরে এটি যেমন আচরণ করত এখানেও একই আচরণ করছে। ফলে রেলগাড়িটি চলছে নাকি পৃথিবী চলছে সেটি বলার কোন উপায় নেই।

স্থিতির কোন পরম মান না থাকলে কিন্তু আরও একটি সমস্যা হবে। যেমন- ট্রেনের ভিতর দুটি ঘটনা যদি ভিন্ন সময়ে ঘটে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক কোথায় ঘটেছে এ বিষয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাবে না। পিং বলটি যখন টেবিলের উপর থেকে লাফিয়ে এক সেকেন্ড পর টেবিলে ধাক্কা খাবে, তখন ট্রেনের বাইরে থাকা কোন লোকের মনে হবে- বল দুটো ধাক্কা খেয়েছে ৩০ বা ৪০ মিটার ব্যবধানে। কারণ এই এক সেকেন্ড সময়ের মধ্যে ট্রেনটি ৩০ মিটার দূরে সরে যাবে। কিন্তু ট্রেনে থাকা কারও মনে হবে যেন, ধাক্কাটি একই স্থানে হয়েছে। কারণ সে লক্ষ্য করবে ধাক্কার স্থানটি টেবিলের একই বিন্দুতে হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, পরম স্থিতি বা পরম স্থানের আসলে কোন অস্তিত্বই নেই। নিউটন ছাড়াও বিসপ বার্কেলে নামে একজন এংলো-আইরিশ দার্শনিক নিউটনের মত কোন গাণিতিক পদ্ধতি ছাড়াই স্থানের পরম ধারনাকে বাতিল করে দিয়েছিলেন।

নিউটনের আবিষ্কারের পর, স্থানের পরম ধারনা বাতিল হয়ে গেলেও সময়কে তখনও পরম বিবেচনা করা হত। অর্থাৎ সময়ের কোন আদি-অন্ত নেই। যখন কোন কিছু ছিল না, তখনও সময় ছিল। আবার যদি কখনো সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায় তবুও সময়ে একইভাবে বয়ে চলবে। পরম সময়ের আরেকটি অর্থ হলো- সময় সব ক্ষেত্রেই, সব স্থানেই একই গতিতে বয়ে চলে। পৃথিবীতে এক সেকেন্ড অতিবাহিত হলে মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তের জন্যও ঠিক এক সেকেন্ড অতিবাহিত হবে।

পরম সময় নিয়ে প্রাচীন কালেই কিছু দার্শনিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। কিছু কিছু দার্শনিক প্রশ্ন তুলেছিলেন যে- সময় যদি পরম হয়, অর্থাৎ মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে অসীম কাল বলে কিছু থেকে থাকে, তবে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সৃষ্টিকর্তা কেন অসীম কাল অপেক্ষা করেছিলেন ? আজ থেকে হাজার বছর আগে আসলে এসব প্রশ্নের কোন সমাধান সম্ভব ছিল না।

এসব দার্শনিক প্রশ্ন ছাড়া কিছু আধা-বৈজ্ঞানিক প্রশ্নও উঠেছিল। অনেকে বলেছিলেন- গতি ছাড়া যেহেতু সময়কে বোঝার উপায় নেই; আর পরম গতি বলেও কিছু নেই। তাহলে পরম সময় বলে কিছু আছে কি ? নাকি সময় নিজেও আপেক্ষিক ?

তবে আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলে- মহাবিশ্ব যদি ধ্রুব আর পরম বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তা সময়ই হবে। স্থানের পরম ধরানা নিয়ে অনেকে সন্দেহ পেষণ করলেও, কোন বিজ্ঞানী কোনদিন সময়ের পরম ধারনা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলে নি। কিন্তু সবাই তো আর স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া বিজ্ঞানী না। আলোর বেগ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন নামে সুইস পেটেন্ট অফিসের এক কেরানী, যুগান্তকারী এক আবিষ্কার করে ফেললেন! শেষ পর্যন্ত আমাদের পরম সময়ের ধারনা ত্যাগ করতেই হল।

সেই ছোটবেলা থেকেই আইনস্টাইনের আলো নিয়ে অনেক কৌতূহল ছিল। ছোট্ট আইনস্টাইন ভাবতেন, যদি একটি আলোক রশ্নিকে ধরে ফেলা যায়, তাহলে সেটি দেখতে কেমন হবে ? অথবা যদি একটি আলোর তরঙ্গের সাথে সমান গতিতে ছোটা যায় তাহলে আমরা কি দেখতে পাব? একটি স্থির তরঙ্গ ? আমরা যদি একটি বাস বা ট্রেনের সাথে একই গতিতে ছুটতে শুরু করি, তাহলে পাশের ট্রেনের মানুষ, চেয়ার, টেবিল কোনকিছুকেই আমরা চলমান দেখব না। ঐ ট্রেনের সবকিছুকেই আমাদের স্থির মনে হবে। তেমনি আইনস্টাইন ভেবেছিলেন, যদি একটি আলোর তরঙ্গের সাথে এভাবে তাল মিলিয়ে চলা যায়, তাহলে সম্ভবত একসারি লম্বা স্থির আলোর তরঙ্গ দেখা যাবে। আইনস্টাইনের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখনই তিনি বুঝতে পারেন এই চিন্তায় কিছু একটা গলদ আছে। পরবর্তীতে তিনি তার এক লেখায় বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করেছেন:
“After ten years of reflection such a principle resulted from a paradox up on which I had already hit at the age of sixteen: If I pursue a beam of light with the velocity c (velocity of light in a vacuum) I should observe such a beam of light as a spatially oscillatory electromagnetic field at rest. However, there seems to be no such thing, whether on the basis of experience or according to Maxwell’s equations.”

আইনস্টাইন কলেজে পড়ার সময় জানতে পারলেন, আলোকে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎক্ষেত্র ও চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যেই প্রকাশ করা যায়। আর এই ক্ষেত্র দুটি ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রের সমীকরণগুলো মেনে চলে। আইনস্টাইন ভাবলেন, আলোকে ভালমতো বোঝার জন্য এর থেকে ভাল আর উপায় আর কি’ই বা হতে পারে !

তিনি তখন ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন। দেখা গেল তার ধারনাই ঠিক। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ সেরকম কোন স্থির তরঙ্গ অনুমোদন করে না। তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রের সমীকরণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আলোর কোন স্থির তরঙ্গের সারি দেখা মানে- একটি তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রকে স্থির দেখা। অর্থাৎ এরকম কোন কিছু বাস্তবে ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ কোনটিতেই সম্ভব নয়।

ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বক সমীকরণে আলোর বেগ ছিল একটি ধ্রুবক। অর্থাৎ এটির কোন পরিবর্তন হবে না। ম্যাক্সওয়েল নিজে এই ধ্রুবকের মান কত হবে তা নিজেই গণনা করে বের করেছিলেন। তিনি হিসেব করার পর দেখতে পেলেন, অবিশ্বাস্যভাবে এটি আলোর বেগের সমান। এ থেকেই তিনি প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন আলো আর কিছু নয়, এক ধরনের তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে আলোর বেগ সব সময় একই থাকবে। আমরা কত বেগে ছুটছি সেটি কোন বিষয় না। আলোর পেছনে আমরা যত দ্রুতই ছুটি না কেন, একে আমরা একই বেগে চলতে দেখবে। কিন্তু এ কি করে সম্ভব ?
ধরুন আপনার সামনে একটি ট্রেন আলোর বেগে চলছে। ধরলাম আলোর বেগ ১০০ কিঃমিঃ/ঘণ্টা । এখন আমরা যদি এই ট্রেনের পেছনে ৯৮ কিঃমিঃ/ঘণ্টায় ছুটি তাহলে আমাদের কাছে মনে হবে এটি ঘণ্টায় ২ কিঃমিঃ বেগে ছুটছে। এটাই স্বাভাবিক, এরকমই আমরা দেখে আসছি। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ বলছে- আমরা ৯৮ কিঃমিঃ বেগে ছুটার পরও আমরা দেখতে পাব এটি এখনো সেই ১০০ কিঃমিঃ বেগেই ছুটছে। কিন্তু এটিতো পুরোপুরি নিউটনের গতিসূত্রের লঙ্ঘন।

নিউটনের গতিসূত্র অনুসারে কোন কিছুর বেগকেও অন্য যেকোনো রাশির মত যোগ বিয়োগ করা যায়। যদি কেউ আমার দিকে ৫ কিঃমিঃ বেগে আসতে থাকে আর আমি তার দিকে ২ কিঃমিঃ বেগে যেতে থাকি, তাহলে আমার কাছে মনে হবে সে আমার দিকে (৫+২)=৭ কিঃমিঃ বেগে আসছে। আবার ধরি কেউ আমার সামনে ১০ কিঃমিঃ বেগে ছুটছে, আর আমি তার পেছনে ৮ কিঃমিঃ বেগে ছুটছি, তাহলে আমার মনে হবে সে আমার থেকে ২ কিঃমিঃ বেগে সামনের দিকে যাচ্ছে। এবার কেউ যদি পাশাপাশি কোন বাসে বা ট্রেনে একই বেগে চলে, তাহলে নিউটনের সূত্র অনুযায়ী আমরা সেই বাসের সবকিছুই স্থির দেখব। আসলে বাস্তবে আমরা কিন্তু তা’ই দেখি। তবে আলোর ক্ষেত্রে কিন্তু এমন নিয়ম আর খাটছে না। ম্যাক্স ওয়েলের সমীকরণ থেকে দেখা যায়, আলোকে আমরা কখনই ধরতে পারব না, কারণ আমরা যত দ্রুতই ছুটি না কেন সামনে তাকালে দেখা যাবে, এটি আমাদের সাপেক্ষে সেই আগের বেগেই চলছে। এ যেন এক ভুতের সাথে পাল্লা দেওয়া, আমরা যত জোড়েই ছুটি না কেন সেই ভুতকে আমরা ধরতে পারব না।

এই বিষয়টিই আইনস্টাইনকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। আলোর ক্ষেত্রে কেন এমন হবে? আর যদি সত্যি এমনটা হয়, তার মানে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ অথবা নিউটনের সূত্র যেকোনো একটি ভুল আছে। কিন্তু এটি কি করে হতে পারে! নিউটনের সূত্রের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মেকানিক্সের উপর ভিত্তি করে পুরো এক শিল্পবিপ্লব ঘটে গেল। আর তাছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রদের গতি পর্যন্ত নিউটনের তত্ত্ব থেকে নিখুঁতভাবে হিসেব করে ফেলা যায়। নিউটনের তত্ত্ব ভুল হবার কথা চিন্তাও করা যায় না। আবার ম্যাক্স ওয়েলের তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রের সমীকরণও খুবই সফল । আইনস্টাইন কোনভাবেই কিছু মেলাতে পারছিলেন না।
আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন আমরা প্রকৃতির এমন কিছু একটা জানি না, যার ফলে আমাদের মনে হচ্ছে নিউটন অথবা ম্যাক্সওয়েলের সূত্রে ভুল আছে। কিন্তু প্রকৃতির এই ধাঁধার একটা সমাধান তো অবশ্যই আছে।

১৯০৫ সালের কথা। আইনস্টাইন তখন বার্নের একটি পেটেন্ট অফিসে কেরানি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পেটেন্ট অফিসের কাজ শেষ হবার পরও তার হাতে প্রচুর সময় থাকত। এই সময়গুলোতে তিনি ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রের সমীকরণগুলোকে খুব সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণাপত্র লিখলেন। সেখানে তিনি দেখান যে, স্থির বেগে চলমান যেকোনো কাঠামো থেকেই আলোর বেগ সমান পাওয়া যাবে। সকল কাঠামোর সাপেক্ষে আলোর গতি সমান এটি দেখানোর পাশাপাশি- এই অবাস্তব ঘটনা কেন ঘটে তিনি তার ব্যাখ্যাও দেন। আর এই ব্যাখ্যা থেকেই তিনি বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব গঠন করেন।
প্রথমবার যখন তিনি আলোর বেগের এই অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন, তিনি নিজেও অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিলেন। কেননা এই ঘটনার শুধু একটাই সমাধান আছে; গতি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সময় ধীর হয়ে যায় ! সাধারণ মানুষ হয়ত কখনই এমন অদ্ভুত কথা ভেবেও দেখবে না। কিন্তু আইনস্টাইন দেখতে পেলেন শুধু এই বিষয়টি ধরে নিলেই আলোর বেগের রহস্য সমাধান হয়ে যায়। আমরা যখন কোন গাড়িতে দ্রুত বেগে ভ্রমণ করব তখন আমাদের গাড়ির ভেতরের সময় ধীর হয়ে যাবে। ফলে অতিক্রান্ত দূরত্বের হিসেব ঠিকই থাকবে।

বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করলে আরও ভালমতো বোঝা যাবে। আমরা সবাই জানি, সময়ের সাথে অবস্থানের পরিবর্তনকে বেগ বলে । কেউ যদি সেকেন্ডে ১০ কিঃমিঃ বেগে ১০ সেকেন্ড যায় তাহলে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে ১০X১০=১০০ কিঃমিঃ । এবার বেগ দুইগুণ বাড়িয়ে সেকেন্ডে ২০ কিঃমিঃ করা হল। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে বেগ বৃদ্ধির ফলে আমাদের ঘড়ির সময় ধীরে চলবে। বেগ দ্বিগুণ করার ফলে আমাদের সময় অর্ধেক হয়ে যাবে; ১০ সেকেন্ডের জায়গায় ৫ সেকেন্ড। অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে ২০X৫= ১০০ কিঃমিঃ। এবার আমরা বেগ আবারও দ্বিগুণ করে দিলাম; সেকেন্ডে ৪০ কিঃমিঃ । ফলে সময় আরও ধীর হয়ে ২.৫ সেকেন্ড হয়ে যাবে।ফলে অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে, ৪০X২.৫=১০০ কিঃমিঃ । এভাবে বেগ যত বাড়ানো হবে সময় তত ধীরে চলবে। কিন্তু আমরা হিসেব করলে দেখতে পাব অতিক্রান্ত দূরত্ব ঠিকই আছে।

এখানে স্থান ও সময় আমাদের সাথে এক রহস্যময় খেলা খেলছে। বাস্তব পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আমরা যত দ্রুতই ভ্রমণ করি না কেন, আমাদের সাপেক্ষে আলোর বেগ সব সময় একই থাকবে। এটি ঘটছে কারণ, আমরা যত দ্রুত ভ্রমণ করছি আমাদের ঘড়ি তত ধীর হয়ে যাচ্ছে। আলোর বেগ অস্বাভাবিক রকম দ্রুত, সেকেন্ডে প্রায় ৩০০০০০ কিঃমিঃ, যা আমাদের পরিচিত যেকোনো কিছুর বেগের চাইতে অনেকগুণ বেশি। তাই বাস্তব জীবনে আমরা সময় ধীর হবার এই প্রভাব বুঝতে পারি না। যদি আলোর বেগের কাছাকাছি দ্রুততায় ভ্রমণ করা সম্ভব হত, তাহলে সময় ধীর হবার এই প্রভাব আমরা বুঝতে পারতাম। এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভাল; আমরা কিন্তু কখনই সময় ধীর হবার বিষয়টি বুঝতে পারব না। কেননা আমরা যদি কোন রকেটে খুব দ্রুত ভ্রমণ করি, তাহলে সেই রকেটের সব কিছুর সময়ই ধীর হয়ে যাবে। এমনকি আমাদের মস্তিষ্কের ঘড়িও ধীর হয়ে যাবে। মস্তিষ্কের ভিতর নিউরোট্রান্সমিটারের অণু-পরমাণুর গতিও ধীর হয়ে যাবে। আমাদের মস্তিষ্ক তখন চিন্তাও করবে ধীর গতিতে। ফলে আমাদের মস্তিষ্ক কখনই বুঝতে পারবে না সময় ধীর হয়ে গেছে। তবে আমরা যদি পৃথিবীতে থাকা কোন ঘড়ির সাথে আমাদের ঘড়ি মিলিয়ে দেখি, তখন দেখা যাবে আমাদের ঘড়ির সময় ধীর হয়ে গিয়েছিল। আবার কেউ যদি কোন শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে আমাদের রকেটের ভেতরটা দেখতে পায়, সে দেখতে পাবে আমাদের রকেটের ভেতরের সবকিছুই ধীর হয়ে গেছে, আমাদের হাত-পা চলার গতিও ধীর হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের চলাফেরার এই ধীর গতি আমরা বুঝতে পারব না। কারণ আমাদের দেহঘড়িও একই তালে চলবে।

আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে দেখা যায় এই মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতি হলো আলোর বেগ। আর এই বেগের কোন তারতম্য হয় না। আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলবে- কোন কিছুর বেগ আবার সব ক্ষেত্রেই ধ্রুব হতে পারে নাকি, ধ্রুব যদি কিছু থেকে থাকে তো সেটা হবে সময়। কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে দেখা যায় আমাদের সাধারণ জ্ঞানের কোন দামই এখানে নেই। এক্ষেত্রে আমাদের পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের সাহায্য নিতে হবে। এই তত্ত্ব থেকে আমরা জানতে পারি, আলোর বেগের বিষয়টি প্রকৃতির একটি মূল নিয়ম, যা মহাবিশ্বের সকল বস্তুকণা ও মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই প্রযোজ্য। কিন্ত সময় বিষয়টি একটি ব্যক্তিগত ধারনা। কে সময় পরিমাপ করছে তার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে সময় কিভাবে বয়ে চলবে ।

আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশ হবার পর বিজ্ঞানী মহলে হৈচৈ পড়ে যায়। অনেকেই সময় স¤পর্কে পরম ধারনা ত্যাগ করতে রাজি ছিল না। তবে এই তত্ত্বের আবেদন শুধু বিজ্ঞানী মহলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আপেক্ষিক তত্ত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করার পর এ নিয়ে শত শত জনপ্রিয় ধারার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সেখানে এই তত্ত্বের সাথে বিজ্ঞান ও বাস্তবতার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। এর ভিতর কিছু লেখায় তত্ত্বটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে আসে উঠে আসে তা হল- সময়কে স্থান থেকে আলাদা করে দেখার কোন উপায় নেই। স্থানের তিনটি মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার মত, সময়ও স্থানের একটি মাত্রা। স্থান ও কাল মিলেমিশে এক অভিন্ন স্বত্বা তৈরি হয়, তাকে বলা হয় স্থান-কাল। স্থান-কালের ধারনার পেছনের মূল বিষয়টি সেসময় খুব কম মানুষই অনুধাবন করতে পেরেছিল।
স্থান-কাল এক হয়ে যাওয়ায় এদের মধ্যে একটি প্রতিসাম্যতার সৃষ্টি হয়। এদের একটিকে কোন অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরিয়ে সহজেই আরেকটিতে পরিণত করা যায়। আমরা যদি কোন বস্তুকে নিয়ে ৯০ ডিগ্রি ঘুরাই তাহলে এর দৈর্ঘ্য প্রস্থে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। আর প্রস্থ , উচ্চতায় রূপান্তরিত হয়ে যাবে। একটি সাধারণ ঘূর্ণনের মাধ্যমে স্থানের কোন মাত্রাকে অন্যটিতে পরিবর্তন করার স্বাধীনতা আছে। আর এখন সময় স্থানের আরেকটি মাত্রা হবার কারণে এই চতুর্মাত্রিক স্বত্বাকে একটি নির্দিষ্টভাবে ঘুরিয়ে স্থানকে সময়ে, আর সময়কে স্থানে রূপান্তরিত করা যায়। এই নির্দিষ্ট চারমাত্রিক ঘূর্ণনের ফলে স্থান-কাল একটি নির্দিষ্ট উপায়ে বিচ্যুত হওয়াটা বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের একটি দাবি। অন্যভাবে বললে বলা যায়, বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের কিছু নিয়ম মেনে স্থান-কাল পর¯পরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। অনেকেই ভাবতে পারেন, সময়ও যেহেতু মহাবিশ্বের স্থান-কালের একটি মাত্রা- তাই কোন বস্তুকে যদি উল্টো করলে দৈর্ঘ্যকে, প্রস্থ বা উচ্চতায় পরিণত করা যায়, তবে সময়কেও বুঝি উল্টো করে দেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, সময়কে কোন বস্তুর মত হাতে ধরে ঘুরানো যাবে না। তা করা গেলে আমরা ইচ্ছে মত সময়কে উল্টে দিয়ে অতীত ভ্রমণ করতে পারতাম। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট গাণিতিক উপায়েই এই বিষয়টি করে দেখানো যায়। আর এই গাণিতিকভাবে করা বিষয়টিকে বাস্তবে করতে গেলে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ শক্তির। শুধু তাই না, এই শক্তি আমাদের চেনাপরিচিত শক্তির মত না’ও হতে পারে ! সময়ের উল্টো দিকে চলতে গেলে আমাদের দরকার হয় বিশেষ ধরনের শক্তির ।

৩০০ বছর আগে নিউটন ভেবেছিলেন সময় একদম পরম, অর্থাৎ মহাবিশ্বের সকল স্থানেই সময় একই হারে বয়ে চলেছে। আমরা পৃথিবী, চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহ যেখানেই থাকি না কেন সময় একটি ধ্রুব গতিতে চলতে থাকবে। আর স্থানের সাথে সময়ের কোন স¤পর্ক নেই। কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে দেখা গেল, সময় সব ক্ষেত্রে ধ্রুব গতিতে চলে না, বরং আলোই একটি ধ্রুব গতিতে চলে। আলোর গতি সকল অবস্থায় সমান থাকবে, আর ঘড়ির কাটা কতটা দ্রুত চলবে তা নির্ভর করবে আমরা কতটা দ্রুত চলছি তার উপর। নিউটনের ধারনায় সময়ের সাথে স্থানের কোন স¤পর্ক না থাকলেও আপেক্ষিক তত্ত্বে স্থান ও সময় একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।

উপরে বেগ বৃদ্ধি পাবার ফলে সময় ধীর হবার যে উদাহরণটি দেওয়া হয়েছিল সেটি কিন্তু সঠিক না। শুধুমাত্র বোঝার সুবিধার্থে গাড়ির বেগের বিষয়টি দেখানো হয়েছিল। সময় ধীর হবার আপেক্ষিক প্রভাব সবচেয়ে ভালমতো বোঝা যায় আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে। আমাদের বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি রকেটগুলোর বেগ কিন্তু খুব বেশি না। কিন্তু আমরা যখন আলোর বেগের ৯০% -এর কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করার মত রকেট তৈরি করতে পারব তখন সেগুলো মাপতে আর সূক্ষ্ম ঘড়ির দরকার হবে না। নিচে আলোর বেগ বৃদ্ধির সাথে সাথে সময় কতটা ধীর হয়ে যায় তা দেখানো হলোঃ

আলোর বেগের ৮৭% – সময় ২ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৫% – সময় ৩ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৭% – সময় ৪ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৮% – সময় ৫ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৯% – সময় ৭ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৯.৯% – সময় ২২ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৯.৯৯% – সময় ৭০ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৯.৯৯৯৯% – সময় ৭০৭ গুন ধীর হয়ে যাবে ।
আলোর বেগের ৯৯.৯৯৯৯৯৯% – সময় ৭০৭১ গুন ধীর হয়ে যাবে।

এখন ধরা যাক আমরা এমন একটি রকেট তৈরি করতে পেরেছি যা আলোর বেগের ৯৯.৯৯% দ্রুততায় ভ্রমণ করতে পারে। যদি কেউ এই রকেটে চরে এক বছর কাটিয়ে আসে তাহলে আমরা আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রভাব বেশ ভালমতোই বুঝতে পারব। ধরে নিলাম কয়েকদিন আগে আপনার মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আপনি চাচ্ছেন কিছুদিন একটু দ্রুতগামী রকেটে করে একটু মহাকাশ ভ্রমণ করে আসলে মন্দ হয় না। আপনি একটি রকেটে করে আলোর বেগের ৯৯.৯৯% দ্রুততায় ১ বছর মহাকাশে ভ্রমণ করে এলেন। ফিরে এসে কি দেখবেন ? যা দেখবেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। আপনি রকেটের ভিতর থাকায় আপনার বয়স মাত্র এক বছর বেড়েছে, কিন্তু এদিকে পৃথিবীতে কেটে গেছে ৭০ টি বছর। ফিরে এসে আপনার বেশীরভাগ সহপাঠীকেই আর জীবিত পাওয়া যাবে না। আর যারা বেচে আছে তারা এতটাই বৃদ্ধ হয়ে গেছে যে আপনি তাদের চিনতেই পারবেন না। তাই এরকম মহাকাশ ভ্রমণ না করাই ভাল !



চিত্র: গতি বৃদ্ধির সাথে সাথে সময় ধীর হয়ে যায়

সময় ধীর হবার বিষয়টি কিন্তু শুধু মানুষ বা সচেতন প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং এই মহাবিশ্বের সকল প্রকার বস্তুকনিকার জন্যই প্রযোজ্য। যেমন- মিউওন কণিকার কথাই ধরা যাক। মিউওন খুবই অস্থায়ী একটি কণিকা, গড় আয়ু ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড । এক সেকেন্ডের দুই লক্ষ্য ভাগের একভাগ সময়ের মধ্যেই এর উৎপত্তি ঘটে আবার ধ্বংসও হয়ে যায়। তাই মহাকাশ থেকে(বায়ুম-লে এসে উৎপন্ন হয়) যখন কোন মিউওন কণিকা পৃথিবীতে প্রবেশ করে, সেটি খুবই আশ্চর্যজনক লাগে। কেননা এই কণিকাগুলো যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও ছুটে, তবুও ৭০০ মিটার পার হবার আগেই ধ্বংস হয়ে যাবার কথা । পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছানোটা একদম অসম্ভব। কিন্তু মিউওন যেহেতু আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে, তাই আপেক্ষিকতা বিশেষ তত্ত্ব অনুসারে মিউওনের নিজের সময় প্রায় ৩০ গুন ধীর হয়ে গেছে। তাই আমাদের ঘড়ির হিসেবে মিউওন কণিকার পৃথিবীতে পৌছুতে-পৌছুতে ধ্বংস হবার কথা থাকলেও, মিউওনের নিজের ঘড়িতে তখনও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড পার হয়নি।

আবার তেজস্ক্রিয় কোন পদার্থের কথাই ধরা যাক। তেজস্ক্রিয় পদার্থের বৈশিষ্ট্য হলো- একটি নিদিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পরমাণুর ক্ষয় হয়। এবার যদি কোন তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে মহাকাশযানে করে এক বছর ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফেরত আনা হয়, তবে দেখা যাবে , এই মহাকাশযানে থাকা অবস্থায় এক বছরে যে পরিমাণ পরমাণু ক্ষয় যাবার কথা ছিল তার থেকে অনেক কম পরিমাণ পরমাণু ক্ষয় গিয়েছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এই সময় ধীর হবার বিষয়টি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এমনকি অণু-পরমাণুর ভাঙ্গন বা কোন কণিকার গড় আয়ুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে দেখা যাচ্ছে সময় ধীর হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের পর আইনস্টাইন এমন এক তত্ত্ব গঠন করেন যার ফলাফল আরও বেশি অদ্ভুত। সেই তত্ত্ব থেকে দেখা যাবে সময় শুধু ধীরই হয় না, এমনকি বেকেও যেতে পারে; ঘুরপাক খেতে পারে !!

আলোর বেগের সমস্যা নিয়ে কাজ করার পর আইনস্টাইন মহাকর্ষ বল নিয়ে কাজ করতে চাইলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মহাকর্ষ বল কেন কাজ করে তা খুঁজে বের করা। কিন্তু এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি আবারও এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেললেন। তার গণনা থেকে বোঝা গেল, স্থানকে(মহাশূন্য) আমরা যেমন সমতল বলে ভাবি বিষয়টি আসলে মোটেই তেমন না। বরং স্থান হলো বক্র। আর স্থানের এই বক্রতার কারণেই মহাকর্ষ বলের উৎপত্তি ঘটে।

স্থানের বক্রতাকে সহজে বোঝার জন্য স্থানকে(মহাশূন্য) একটি পাতলা চাদরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আমরা যদি এই চাদরের উপরে একটি ভারি পাথরকে রাখি তাহলে চাদরের মাঝের জায়গাটি বিকৃত হয়ে যাবে। এখন চাদরে যত ভারি পাথর চাপানো হবে, চাদরের বক্রতাও তত বেড়ে যাবে। ফলে এই চাদরের উপর কোন বস্তুর চলার পথও একটি বাঁকা পথ হয়ে যাবে। এখন কোন বস্তুকে চাদরের উপর ছেড়ে দিলে সেটি পাথরের দিকে গড়িয়ে পড়ে যেতে চাইবে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে ভারি পাথরটি যেন বস্তুটিকে আকর্ষণ করছে। কিন্তু আসলে এটি কোন আকর্ষণ নয়, বরং চাদরের বক্রতার কারণেই এটি বস্তুটিকে ভারি পাথরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আইনস্টাইনের গণিত বলছে এটি কোন বল নয়, বরং চাদরের বক্রতার কারণেই এই বলের উদ্ভব হচ্ছে। তেমনি স্থান-কালের বক্রতার কারণেই বস্তুগুলো একে অপরের দিকে আকর্ষিত হয়। কারণ প্রতিটি গ্রহ নক্ষত্রই এভাবে তার চারপাশের স্থানকে বাকিয়ে দেয়। নিউটন এই আকর্ষণের নাম দিয়েছিলেন মহাকর্ষ । কিন্তু কেন এই টান কাজ করে তা তিনি বলতে পারেননি। মহাকর্ষ বল কেন কাজ করে, আইনস্টাইন তার রহস্য উদঘাটন করে ফেললেন। আশ্চর্য বিষয় হলো, স্থানের এই বক্রতা এমনকি আলোকেও বাঁকা পথে চলতে বাধ্য করে।

এই চাদরের বক্রতার বিষয়টি আমাদের সৌরজগতের সাথে তুলনা করা যাক। সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। আর সূর্য তার বিশাল ভরের কারণে তার চারপাশের স্থানকে বাঁকা করে দিয়েছে। ফলে আশেপাশের গ্রহগুলো সূর্যের প্রতি একটি আকর্ষণ অনুভব করছে। আর এই আকর্ষণ নিউটনের ব্যাস্তবর্গীয় নিয়ম মেনে চলার ফলে, প্রতিটি গ্রহই একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ দিয়ে সূর্যের চারদিকে ভ্রমণ করে চলেছে।
সূর্যের মত পৃথিবীও তার চারপাশের স্থানকে প্রতিনিয়ত বাকিয়ে চলেছে। আর সেকারণেই আমরা পৃথিবীর সাথে মাধ্যাকর্ষণের টান অনুভব করি। এই বক্রতা না থাকলে আমরা মহাশূন্যে ছিটকে যেতাম।


চিত্র: পৃথিবী তার ভরের কারণে চারপাশের স্পেস-টাইমকে বাকিয়ে চলেছে।

এখন লক্ষ করুন- বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা জেনেছিলাম যে, স্থান ও সময় মূলত একই সত্ত্বা। ফলে স্থান ছাড়া সময় চিন্তাও করা যায় না। তাই স্থানের বক্রতার কারণে একটি বিশেষ ব্যাপার ঘটে, তা হলো- স্থান যদি বেকে যায় তবে সময়ও বেকে যাবে।
আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বকে ম্যাচেস প্রিন্সিপল(Mach’s Principle ) নামে একটি নীতির সাহায্যে সামারাইজ করা যায়। উপরে একটি উদাহরণে আমরা দেখেছিলাম, চাদরের উপর যত ভারি পাথর চাপানো যায়, চাদরের বক্রতাও তত বেশি হয়। তেমনি আইনস্টাইনের তত্ত্বকে সামারাইজ করে বলা যায়- ভর-শক্তির উপস্থিতি তার চারপাশের স্থান-কালের বক্রতা নির্ধারণ করে। আইনস্টাইন দেখালেন, স্থান-কালের বক্রতা সরাসরি ভর-শক্তির পরিমাণের উপর নির্ভর করে।

আইনস্টাইনের সমীকরণকে নিচের মত করে লেখা যায়:

ভর-শক্তি ——–>> স্থান-কালের বক্রতা

এই স্থান কালের বক্রতার দ্বারা সবকিছুই প্রভাবিত হয়। সামান্য আলোক রশ্নি থেক শুরু করে, মহাবিশ্বের সব বস্তু। এর আগে আমরা দেখেছিলাম, গতি বৃদ্ধির ফলে সময় ধীর হয়ে যায়। কিন্তু শুধু গতি বৃদ্ধির কারণেই যে সময় ধীর হয় তা কিন্তু না। কোন বস্তুর মহাকর্ষ বলও সময়কে ধীর করে দিতে পারে। উদাহরণ সরূপ- পৃথিবীর ভর সূর্যের থেকে অনেক কম। ফলে পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের মহাকর্ষ বল অনেক বেশি। তাই আমরা যদি পৃথিবীতে অবস্থান করি তবে আমাদের সময় যেভাবে বয়ে চলবে সূর্যের ক্ষেত্রে আরও ধীরে চলবে। কেননা, সূর্যের মহাকর্ষ বল সময়কে ধীর করে দেবে।

মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সময় ধীর হবার এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আমরা জিপিএস( Global Positioning System) তৈরি করতে পেরেছি। জিপিএস মূলত একটি কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে কোন স্থানের অবস্থান নির্ণয় করে থাকে। ধরুন আপনি আপনার স্মার্ট-ফোনের জিপিএস ব্যাবহার করে আপনার অবস্থান জানতে চাচ্ছেন। এখন আপনার এই অবস্থান নির্ণয়ের কাজটি মূলত করা হবে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে। আমরা জানি- পৃথিবীর মহাকর্ষ বল সবথেকে বেশি থাকে পৃথিবীর পৃষ্ঠে। পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে যত উপরে বা নিচে যাওয়া যাবে এই বল তত কমতে থাকবে। কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবী থেকে অনেক উচ্চতায় অবস্থিত। তাই সেখানের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে কিছুটা কম। ফলে সেখানে সময়ের প্রবাহও কিছুটা দ্রুত । তাই কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে আপনার অবস্থান নির্ণয় করার জন্য যদি এই সময়ের ধীর হবার প্রভাব বিবেচনায় আনা না হয়, তবে আপনার সঠিক অবস্থান পাওয়া যাবে না। আইনস্টাইন যদি তার তত্ত্ব আবিষ্কার না করতেন, তাহলে জিপিএসের সাহায্যে নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হত না। কৃত্রিম উপগ্রহের সাথে আমাদের পৃথিবীর সময়ের ব্যবধান কিন্তু খুব সামান্য। কিন্তু আমরা যদি এই সামান্য প্রভাবকে গণনায় না ধরি তবে সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যাবে না। সময়ের এই প্রভাব গণনায় না ধরলে জিপিএসের হিসেবে ১২ কিলোমিটার এদিক ওদিক হয়ে যেত !

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে দেখা যাচ্ছে- সময় মূলত এক ধরনের নদীর মত। নদী যেমন কোথাও ধীরে চলে, আবার কোথাও দ্রুত চলে তেমনি। স্থান কালের বক্রতার ফলে আরও একটি মজার বিষয় ঘটে। স্থান-কালের বক্রতা যদি অনেক বেশি হয় তখন নদীর পানিতে যেমন ঘূর্ণি তৈরি হয়, স্থান-কালের বক্রতার ফলেও এমন ঘূর্ণি তৈরি হতে পারে। ফলে এমন ঘূর্ণিযুক্ত স্থানে ইচ্ছে করলেও সোজা চলা যাবে না, সময়ও যে শুধু সামনের দিকেই প্রবাহিত হবে এমনও বলা যায় না। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে দেখা যায়- মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সময় ধীর হয়ে যায়, বেকে যায় , এমনকি নদীর পানিতে যেমন ঘূর্ণি তৈরি হয় তেমনি সময়ও ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ হতে পারে। তবে সময় ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত হলেও সময় কখনো থেমে যাবে না। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সমীকরণ তা অনুমোদন করেনা।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব সময় সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিলেও, কিছু ধোঁয়াশা এখনো রয়েই গেছে। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? ব্যাখ্যা যদি স্পষ্টই হয়, তবে ধোঁয়াশার কথা আসছে কেন! তাহলে একটু খোলাসা করেই বলি। প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে সবকিছুর মূলে আছে চারটি মৌলিক বল। আমরা এই চারটির মধ্যে তিনটি বলের কোয়ান্টাম তত্ত্ব তৈরি করে ফেলেছি। কিন্তু মহাকর্ষ বলের কোয়ান্টাম তত্ত্ব এখনো সফল না। সমস্যা হলো মহাকর্ষ বলকে কোয়ান্টানাইজ করতে গেলে তো সময়কে কোয়ান্টানাইজ করতে হবে(কারণ মহাকর্ষের সাথে সময় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত)। তাই একটি পরিপূর্ণ কোয়ান্টাম গ্যাভিটির(মহাকর্ষ বলের কোয়ান্টাম তত্ত্ব) তত্ত্ব ছাড়া সময় সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে সম্পূর্ণ বলা চলে না। তাই এখনো অল্প কিছু ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

সময় বাতিলের প্রস্তাব

এমনিতে সময়ের কিছু বৈশিষ্ট্য একদম অপরিবর্তনীয়। আমরা না চাইলেও সময় তার গতিতে বয়ে চলে। অর্থাৎ একরকম বাধ্য হয়ে আমাদের সময়ের স্রোতে বয়ে চলতে হয়। স্থানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। স্থানে আমরা ইচ্ছে করলে চলতেও পারি আবার স্থিরও থাকতে পারি। কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে আমাদের ইচ্ছার কোন দাম নেই। মহাবিশ্ব সম্পর্কিত এই ধারনায় সময় মহাবিশ্বের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

কিন্তু অনেক দার্শনিক এমনকি পদার্থবিদও আছেন যারা সময়ের অস্তিত্বই স্বীকার করেন নি। সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন তেমন একজন দার্শনিক। তিনি “ কনফেশন অফ সেন্ট অগাস্টিন ” নামে ১৩ খণ্ডের একটি আন্তজীবনীমুলক বই লিখেন। ৪০০ খ্রিঃ দিকের এক লেখায় তিনি সময়ের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন। সেখানে তিনি সময়ের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছেন। তার মতে, সময় আমাদের মস্তিষ্কের একটি বিভ্রম মাত্র। তিনি অতীত ও ভবিষ্যৎের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চান নি। তার মতে অতীত সে তো গতই হয়েছে, আর ভবিষ্যৎ তো তাই, যা এখনো হয়নি। আর বর্তমান এমন একটি বিষয় যা ঠিক এই মুহূর্তেই পরিবর্তন হয়ে অতীত হয়ে গেল। তাহলে এগুলোর কোনটা আসলে সময় ? তার মতে এই অতীত বর্তমান বা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। তবে পুরোটা মিলেই সময়। তাহলে ঠিক সময় বলে কি আসলেই কিছু আছে ? তার মতে পুরো সময়টিই মানে বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যৎ একইসাথে ঘটে আছে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতার কারণে তা বুঝতে পারছি না।

তিনি তার সময়ের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরকে নিয়ে এসেছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল – ঈশ্বর কি সময়ের দ্বারা সীমাবদ্ধ? তিনি নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন। তার মতে ঈশ্বর যেহেতু সর্বশক্তিমান, তাই তিনি সময় দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। অর্থাৎ ঈশ্বর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই সাথে জানতে পারেন।

সেন্ট অগাস্টিনের সময় সম্পর্কে এসব ধারনা কিন্তু বৈজ্ঞানিক নয়। কিন্তু অগাস্টিনের মত আমরাও “সময়” ও সময় প্রভাবের অদ্ভুত অজানা ও আপাতবিরোধী বৈশিষ্ট্য দেখে অবাক হয়ে যাই। অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্ক ভাবতে পারে না, স্থান থেকে সময় কিভাবে আলাদা, আর আর কিভাবেই বা স¤পর্কিত। আমরা যদি স্থানের সামনে পেছনে বা বিভিন্ন দিকে ভ্রমণ করতে পারি, তাহলে সময়ের ক্ষেত্রে কেন পারি না? আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনকাল নির্দিষ্ট কিছু সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ভেবে অবাক হতে হয় আমরা অতীত মনে রাখি কিন্তু ভবিষ্যৎ কেন মনে রাখতে পারিনা।

এত গেল দার্শনিকের ধারণা। অনেক দার্শনিক ও সাধারণ মানুষের মত কয়েকজন বিজ্ঞানীও সময়ের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চান নি। তেমন একজন ছিলেন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জুলিয়ান বারবার। বারবার আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর কলোগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছেন। তবে তার মূল আকর্ষণ ছিল কোয়ান্টাম র্গ্যাভিটি নিয়ে।

পদার্থবিজ্ঞানীরা সময়কে যেভাবে দেখেন বারবার তার চেয়ে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে সময় বিষয়টিকে বাদ দিয়ে নতুন এক ধরনের পদার্থবিজ্ঞানের সূচনা করতে চেয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তার “The End of Time” বইয়ের মাধ্যমে তিনি সময়ের ধারনাকে উপেক্ষা করে এক নতুন মতবাদের সূচনা করেন। বারবারের মতে- সময় বলে আসলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, এটি শুধুমাত্র মস্তিষ্কের কল্পনা । তিনি যুক্তি দেখান যে, আমাদের স্মৃতি ছাড়া অতীত বিষয়টির অন্য কোন প্রমাণ নেই। তেমনি ভবিষ্যৎও আমাদের কল্পনা মাত্র; এর সাপেক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে না। তার মতে, বস্তুকণার স্থান পরিবর্তন করার বিষয়টি আমাদের মধ্যে “সময়” নামক এক বিভ্রমের সৃষ্টি করে। কিন্তু আদতে প্রতিটি মুহূর্তই স্বতন্ত্র ভাবে টিকে থাকতে পারে; আর তা সম্পূর্ণটাই একসাথে আছে। অর্থাৎ তার মতে পুরো সময়টাই বর্তমান । অতীত বা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। তিনি এর নাম দিয়েছেন “ Now ”।


চিত্রঃ পদার্থবিদ জুলিয়ান বারবার

বারবারের তত্ত্বের কাছাকাছি আরও একটি তত্ত্ব আছে। একে ব্লক ইউনিভার্স তত্ত্ব(Block universe theory) বলা হয়। ব্লক ইউনিভার্স তত্ত্বে, স্থান-কালকে একটি অপরিবর্তনীয় চার মাত্রিক পৃষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। এই তত্ত্ব মতেও সময়ের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই সাথে ঘটেই আছে। এতে পরিবর্তন করার কিছু নেই, বা প্রবাহেরও কিছু নেই। কিন্তু ব্লক তত্ত্বে বারবারের মত সময়ের ধারনাকে বাতিল করে দেওয়া হয়নি। ব্লক তত্ত্ব এমনিতেই অনেক ত্র“টি আছে । কিন্তু বারবারের তত্ত্ব সময়ের ধারনাকে বাতিল করে দেবার ফলে, সময়ের যে একটি মাত্রা আছে; স্থান আর কাল যে একই সত্ত্বার একটি ভিন্ন মাত্রা মাত্র; সে ধারনাকেও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই তত্ত্ব চূড়ান্ত রকম সমোলচনার সৃষ্টি করেছে। তাই শুরু থেকে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরাই একে সন্দেহের চোখে দেখেছেন।

পরবর্তীতে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ শন ক্যারল বারবারের সময়বিহীন মহাবিশ্বের ধারনাকে একরকম বাতিল করে দিয়েছেন। মজার বিষয় হলো- তিনি কিন্তু বারবারের তত্ত্বের কোন বিপরীত তত্ত্ব প্রস্তাব করেন নি বা তার ধারনাকে বাতিল করেও দেন নি। তিনি একটি জিনিস স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে- বারবারের এই সময়বিহীন ধারনা পদার্থবিজ্ঞানে কোন কাজেই আসবে না। অর্থাৎ এই ধারনা শুধু ধারনাতেই সীমাবদ্ধ, বিজ্ঞানে এর কোন ব্যাবহারই নেই। ফলে একে বাতিল না করলেও তা বিজ্ঞানের জায়গায় স্থান পাচ্ছে না।
সময়ের অস্তিত্ব নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন টিম মডলিন। তিনি মূলত বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে কাজ করেন। সময়ের ধারণার বিষয়ে মডলিনকে একদমই মৌলবাদী বলা যায় । তার ধারনাও একদম ¯পষ্ট। মডলিন যুক্তি দেখিয়েছেন যে- সময়ের তীর একদম বাস্তব একটি বিষয়, অর্থাৎ সময় কোন প্রতিসাম্যতা মানে না। আর পাশাপাশি বারবারের সময়হীনতার বিষয়টিকেও সরাসরি বাতিল করে দেন। তার যুক্তিগুলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও পদার্থবিজ্ঞানের আধুনিক ধারণার উপর ভিত্তি করে দেওয়া।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে এমনিতেও সময়বিহীন মহাবিশ্বকে অসম্ভব মনে হবে। নিউটনের বিশ্বে সময়কে পরম ভাবলেও, সময় নিয়ে নিউটনীয় বলবিদ্যার তেমন কিছু করার ছিল না। কেননা নিউটনের পদার্থবিদ্যায় সময়ের কোন উল্লেখই নেই। সেখানে সময়কে এক অর্থে শাশ্বত ধরে নেওয়া হয়েছে, আবার আরেক অর্থে হিসেবের মধ্যেই নেওয়া হয় নি। কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্বে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। স্থানের মাত্রার সাথে সময়ও মহাবিশ্বের আরেকটি মাত্রা। ফলে এই মহাবিশ্বের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হল সময়। আর গতির সাথে সময়ের একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে। আইনস্টাইনের তত্ত্বে গতি বৃদ্ধির ফলে ভর বৃদ্ধি পায়, দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত হয় , পাশাপাশি সময় ধীর হয়ে যায়। সময়ের যদি অস্তিত্বই না থাকত তবে সময় ধীর হবার প্রশ্ন আসত না। তাই আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারেও বারবারের সময় বিহীন মহাবিশ্বের ধারনা টিকছে না।

সময়কে বাতিল করার প্রস্তাবও যেমন এসেছে- তেমনি এর উল্টো প্রস্তাবও এসেছে। এমন একজন পদার্থবিদ হলেন লী স্মোলিন। তিনি মূলত একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কাজ করলেও পদার্থবিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এবিষয়ে তিনি সিরিজ আকারে বেশ কিছু থিসিস ও বই প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তিনি, “টাইম রিবর্ন” নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইতে(পৃঃ ১৭৯) তিনি দেখান যে- স্পেস বা স্থান একটি ইল্যুশন হলেও হতে পারে, কিন্তু সময় অবশ্যই বাস্তব ।

মনস্তাত্ত্বিক সময়

আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করার সময় মিওয়ন কণিকার সময় ধীর হয়ে যায়। অনেকেই হয়ত ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন- “ মিওয়ন কণিকার তাতে কি আসে যায় ? এসব নিয়ে যত মাথাব্যথা আমাদের মত মানুষের”। বেচারা মিউওনের তো কোন চিন্তার ক্ষমতাই নেই। তবে বিষয়টি কিন্তু অবশ্যই ভাবার মত। সময় ধীর হবার বিষয়টি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হলেও, জড় জগত তো আর তা উপলব্ধি করতে পারছে না। শুধুমাত্র মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রাণীর কাছে এই সময় ধীর হবার বিষয়টি গভীর তাৎপর্য বহন করে। সময় বিষয়টি ঠিক কি, তা না জেনেই প্রাচীনকাল থেকে মানুষ সময়কে জয় করতে চেয়েছে। সময় নিয়ে এই যে সচেতনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এটি শুধু মানুষেরই আছে। মানুষ সচেতনভাবে সময় নিয়ে চিন্তা করতে পারে। তারা ভাবতে পারে তাদের অতীতের সুখময় স্মৃতি ও দুঃখের অভিজ্ঞতার কথা। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের কিন্তু আবার সময় নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা নেই। এমনকি সময়কে তারা সঠিকভাবে উপলব্ধিও করতে পারে না।

মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের সময়-জ্ঞান কেমন তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে কানাডার “ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর” প্রফেসর উইলিয়াম রবার্টসের গবেষণা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। রবার্টস এবং তার সহকর্মীরা ইঁদুরের সময়-জ্ঞান নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করেন । এই পরীক্ষাগুলোতে তারা ক্ষুধার্ত ইঁদুরকে চিজ খুঁজতে দেন। তাদের পরীক্ষাতে দেখা যায়, একটি ইঁদুর কতক্ষণ সময় ব্যয় করে চিজ এক টুকরো চিজ পেয়েছে সেটি তাদের মস্তিষ্ক জেনে রাখে। কিন্তু এখন থেকে কত সময় আগে বা পরে চিজটি পেয়েছে তা তারা জানে না । অর্থাৎ অতীত বা ভবিষ্যতের কোন অর্থ তারা উপলব্ধি করতে পারে না।

সময় সম্পর্কে এই আবর্তক ধারণা মানুষের মনে বেশ জোরালো প্রভাব ফেলেছিল। প্রাচীন ভারতীয়দের কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় এই ধারনাই স্থায়ী আসন করে নেয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়দের আবর্তক ধারণা কিছুটা আরও ব্যাপক আকারের। ওরা মনে করত- একই ঋতু বার বার ফিরে আসা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা ফিরে ফিরে ঘটা বা গ্রহদের ফিরে আসাই শুধু না; বরং সমগ্র মহাবিশ্বের সকল ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে, আবার ধ্বংস হবে; আর এভাবে চলতেই থাকবে। প্রাচীনকালের বেশিরভাগ সভ্যতাই ছিল কৃষিনির্ভর। তাই এই আবর্তক ধারণা প্রায় সব প্রাচীন সমাজেই প্রভাব ফেলেছিল।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে সময়কে আমরা আজকে যেমন একটি রেখার মত কল্পনা করি যে- আমাদের পেছনে অসীম অতীত কাল ছিল, আর সামনেও অসীম ভবিষ্যৎ পরে রয়েছে, এমন ধারনাটা প্রাচীন সভ্যতার শুরু থেকেই ছিল না । সময়ের রৈখিক ধারণার শুরু হয় সেমেটিক ধর্মবিশ্বাস থেকে। আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে বিশ্বাস করা হয় যে- এই মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সময় আগে সৃষ্টি করা হয়েছিল, আর একটি নির্দিষ্ট সময় পরে এটি ধ্বংস হয়ে যাবে । অর্থাৎ সেমেটিক ধারণা অনুযায়ী সময়ের রূপ কিছুটা “রৈখিক” । ফলে এই ধারণাকে কিছুটা আধুনিক বলা যেতে পারে।

প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সময় নিয়ে সবচেয়ে সচেতন ছিল মধ্য অ্যামেরিকার মায়া সভ্যতা। মায়ানরাই সর্বপ্রথম নির্ভুলভাবে সময় হিসেব করতে শিখেছিল। ওরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে গণনা করে খুব আধুনিক একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল। ভাবতে অবাক লাগবে- আধুনিক সময় গণনার ভিত্তি হিসেবে আমরা যে গেগ্ররি ক্যালেন্ডার ব্যাবহার করি, মায়াদের ক্যালেন্ডার তার থেকেও নির্ভুল ছিল। কারণ, গেগ্ররি ক্যালেন্ডার প্রতি দশ হাজার বছরে তিনদিন পিছিয়ে যায়; আর মায়াদের ক্যালেন্ডার প্রতি দশ হাজার বছরে মাত্র দুই দিন এগিয়ে থাকে।


চিত্রঃ মায়ান ক্যালেন্ডার( পাথরে খোদাই করা )

মায়ানরা নির্ভুলভাবে সময় গণনার পদ্ধতি আবিষ্কার করলেও সময় সম্পর্কে তাদের ধারণা কিন্তু আজকালকার দিনের মত ছিল না। প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার মত তাদের কাছেও সময় ছিল কিছুটা ম্যাজিক্যাল। প্রতিটি বছর, দিন বা মুহূর্তকে ওরা কোন বিশেষ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করত। আমরা যেমন ভাবি- কোন কিছু ঘটুক আর না’ই ঘটুক, সময় বয়ে চলবেই। কিন্তু ওরা ভাবত ঐ বিশেষ ঘটনাগুলো ঘটার জন্যই বুঝি সময় বয়ে চলেছে।

মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের মন থেকে বিভিন্ন প্রকার ম্যাজিক্যাল ধারণা দূর হতে থাকে। সেই সাথে সময় সম্পর্কেও ম্যাজিক্যাল ধারণা বাতিল হয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা শুরু হতে থাকে। জার্মান জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলারই প্রথম সময়ের বৈজ্ঞানিক ধারনার উপর জোর দেন। তিনি সময়কে প্রানবাদ ও ম্যাজিক্যাল ধারণা থেকে মুক্ত করে, পুরো মহাবিশ্বটিকেই একটি যাত্রিক ঘড়ি হিসেবে দেখার প্রস্তাব করেন । পরবর্তীতে কেপলারের এই “যাত্রিক ঘড়ি” ধারনার বিকাশ ঘটান রেনে ডেকার্তে, বেঞ্জামিন থম্পসন, লর্ড কেলভিনের মত বিজ্ঞানীরা । মূলত তাদের চিন্তাধারাই সময়ের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লবাত্মক চেষ্টা ছিল।

লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন- উপরে বিভিন্ন প্রাণীর সময়-জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা সময় একটি বিষয়ের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, সেটি হলো- “ কে কত দূরভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে পারে”। কারন, যে প্রাণী যত বেশিদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বা পরিকল্পনা করতে পারে, তার সময়-জ্ঞান তত বেশি সূক্ষ্ম। সময়ের উপর থেকে ম্যাজিক্যাল ধারণা দূর হবার আগ পর্যন্ত আমরা আসলে খুব বেশিদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতেও পারতাম না। আর একই কারনে খুব বেশিদূর অতীত নিয়েও ভাবতে পারতাম না। ফলে এই পৃথিবী ও মহাবিশ্বটা আমাদের কাছে খুব বেশি পুরনো ছিল না। ডেকার্তে-কেপলারের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা শুরু হবার আগে পুরো ইউরোপে জুড়ে সেমেটিক বিশ্বাসই ছিল সবক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। সেমেটিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বের সবকিছুর সৃষ্টি মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে। ফলে তার আগের বিষয় নিয়ে ভাবার কোন দরকারই ছিল না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা শুরু হবার পর বৈজ্ঞানিকভাবে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের চেষ্টা চলতে থাকে।ও তাদের ব্যাবহার করা হাতিয়ার ইত্যাদি পাওয়া গেছে।


চিত্রঃ শানিদার গুহা

শানিদার গুহার সর্বশেষ স্তরটিই মূলত সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রায় ১০ টি নিয়ান্ডারথালদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। তার মধ্যে “শানিদার-৩” ও “শানিদার-৪” কে যে ইচ্ছে করেই কবর দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে বিজ্ঞানী ও প্রতœতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত হতে পেরেছেন [১] । পাশাপাশি সেখানে থাকা বিভিন্ন জিনিস থেকে বোঝা যায় যে, তারা মৃত্যুর পরবর্তী সময় নিয়ে চিন্তা করেই এই কবরগুলো তৈরি করেছিল। অর্থাৎ নিয়ান্ডারথাল মানবদের যে সময়-জ্ঞান ছিল এটা নিশ্চিত। অন্যান্য প্রাণীদের মত তারা শুধু বর্তমান সময়েই বাস করত না ।

এখন নিশ্চয় প্রশ্ন জাগছে, অন্য কোন প্রাণীর সময় জ্ঞান না থাকলেও শুধু নিয়ান্ডারথাল ও আধুনিক মানুষের কেন সময় জ্ঞান থাকবে ? এর নিশ্চয় কারণ আছে ? মূলত, অতীত-ভবিষ্যতের ধারণা থাকার জন্য বিশেষ ধরণের মস্তিষ্কের গঠনের দরকার হয় । মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরোন রয়েছে। এই নিউরোনগুলো আবার বিশেষভাবে একটি আরেকটির সাথে যুক্ত হয়ে নিউরাল সার্কিট তৈরি করেছে। এই নিউরাল সার্কিটগুলোই আমাদের স্মৃতি মনে রাখা, সচেতনভাবে ও যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই নিউরাল সার্কিট কিছুটা কম্পিউটারের লজিক গেটের মত কাজ করে। ক¤িপউটারের প্রোগ্রামিং ল্যাক্সগুয়েজে যেমন হ্যাঁ অথবা না প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যৌক্তিকভাবে কোন সমস্যা সমাধান করা হয়; আমাদের মস্তিষ্কও কিছুটা সেভাবেই কাজ করে ।

যে প্রাণীর মস্তিষ্কে যত বেশি নিউরন ও নিউরোন থেকে নিউরনের সংযোগ থাকবে, সেই প্রাণী তত বেশি বুদ্ধিমান হবে। মস্তিষ্কে যদি যথেষ্ট পরিমাণ নিউরোন ও আন্তঃনিউরোন সংযোগ থাকে, একমাত্র তখনই সময়-জ্ঞানের মত উন্নত ধরণের ধারণা থাকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকা সম্ভব। আর এত উন্নত মস্তিষ্ক শুধুমাত্র মানুষেরই আছে। আর তার কারণ- তাদের মস্তকটিও যথেষ্ট উন্নত। আসলে নিয়ান্ডারথালদের সাথে আধুনিক মানুষের খুব বেশি তফাৎ নেই। একদম সম্প্রতি, লরেন্স বার্কেলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এ্যাডয়ার্ড রুবিন পরীক্ষা করে দেখেছেন- আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথাল মানবের ডিএনএ এর মধ্যে মিল ৯৯.৫% – ৯৯.৯% পর্যন্ত । নিয়ান্ডারথালরাও মানুষের মত হাতিয়ার তৈরি করতে পারত। কিছু কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা তাদের সম্ভবত একটি ভাষাও ছিল। নিয়ান্ডারথালদের সময়-জ্ঞান থাকলেও সেটি কিন্তু আধুনিক মানুষের মত উন্নত না। এটি মস্তিস্কের পরিপক্কতার উপর নির্ভর করে। জন্ম নেবার পরেই মানবশিশুদের মস্তিষ্ক পরিনত মানুষের মস্তিস্কের মত কাজ করতে পারে না। ফলে মানবশিশুদের ভবিষ্যৎ সময় সম্পর্কে ধারণা খুবই অ¯পষ্ট। বলা যায় শিশুরাও একরকম বর্তমান চিত্রঃ একটি ইঁদুর কতক্ষণ সময় ব্যয় করে চিজ এক টুকরো চিজ পেয়েছে সেটি তাদের মস্তিষ্ক জেনে রাখে। কিন্তু এখন থেকে কত সময় আগে বা পরে চিজটি পেয়েছে তা তারা জানে না

ইঁদুরের থেকে আরও উন্নত প্রাণীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা এমন। কুকুরের মালিকরা লক্ষ্য করে দেখেছেন, কত সময় আগে বা পরে কোন একটি ঘটনা ঘটল, সেটি তাদের কুকুর বুঝতে পারে না। কুকুর তার মালিককে পাঁচ মিনিট পরে দেখলেও যেমন খুশি হয়, পাঁচ ঘণ্টা পর দেখলেও একই রকম খুশি হয়। অর্থাৎ তাদের সময় প্রবাহের জ্ঞান নেই।

এখন অনেকেই হয়ত ভাবছেন, কোন প্রাণীর যদি ভবিষ্যতের ধারণা একদমই না থাকে, তবে সে জীবন ধারণ করে কি করে? খাবার খাওয়া বা কোন শিকার ধরার জন্যও তো কিছুটা পরিকল্পনা করতে হয়! হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। এরকম কাজের জন্য সামান্য হলেও ভবিষ্যতের ধারণা থাকতে হয়। তবে সেই ভবিষ্যৎ চিন্তা খুব সামান্য। একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেই বিষয়টি ঠিকমত বোঝা যাবে। উপরে যেহেতু ইঁদুর ও কুকুরের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, তাই এই বিষয়টিও এসব প্রাণীর ক্ষেত্রে আলোচনা করা যেতে পারে।
এই বিষয়গুলো বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু মজার পরীক্ষা করেছেন। এসব পরীক্ষা করার জন্য ইঁদুর বা এমন প্রাণীদের প্রথমে কিছুটা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা কিছু ইঁদুরকে একটি প্রশিক্ষণ দিলেন যে- তোমরা যদি এই লিভারটিতে চাপ দাও তবে তোমরা এক টুকরো খাবার পাবে। দুই থেকে পাঁচ বার এভাবে প্রশিক্ষণ দিলেই ইঁদুরগুলো লিভার চেপে খাবার সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু এই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান যদি ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি হয়, ইঁদুর আর এই বিষয়টি মনে রাখতে পার না। অর্থাৎ লিভার চাপা ও খারাব পাওয়া এই দুটি ঘটনার ব্যবধান ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি হলে সেটি ইঁদুরের সময়-জ্ঞানের বাইরে চলে যায়। ইঁদুর থেকে উন্নত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই সময় আরও কিছুটা বেশি। বানরের ক্ষেত্রে এই সময় সর্বোচ্চ নব্বই সেকেন্ড। অর্থাৎ ইঁদুর ত্রিশ সেকেন্ড ও বানর নব্বই সেকেন্ডের বেশি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়না।

ইঁদুর , কুকুর বা বানরের সময়-জ্ঞান দেখে বোঝা যাচ্ছে, এসব প্রাণীরা মূলত বর্তমান সময়ে বাস করে। কিন্তু বর্তমান সময়টি কত দ্রুত বয়ে যাচ্ছে সেখানেও কিন্তু মানুষের সাথে অন্য প্রাণীদের অনেক তফাৎ রয়েছে। ভাবলে অবাক হবেন, এমনকি প্রায় সব প্রাণীর সময় প্রবাহই আলাদা আলাদা ।

সিনেমা বা ডকুমেন্টারিতে অনেক সময়ই আমরা স্লো মোশনের ভিডিও দেখে থাকি। ভাবুন তো, যদি আমাদেরকে একটি স্লো মোশনের বিশ্বে নিয়ে যাওয়া হয় তবে কেমন হবে ! আশেপাশের সবকিছুর পরিবর্তন তখন খুব ধীর গতিতে হবে। তবে একই সাথে যদি আমাদের মস্তিষ্কও ধীর গতিতে কাজ করে, তাহলে আমরা বিষয়টি বুঝতেই পারব না। কিন্তু আশেপাশের সবকিছু যদি ধীর গতির হয়, আর আমাদের মস্তিষ্ক যদি ঠিকঠাক কাজ করে, তবে বেশ মজাই হবে । তখন ইচ্ছে করলেই টেবিল থেকে পরে যাওয়া গ্লাস ধরে ফেলতে পারব। সমস্যা হবে খেলাধুলা নিয়ে। এমন সুবিধা পেলে গোলকিপারকে আর গোল দেওয়া যাবে না ! কিছু প্রাণী ঠিক এমন কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে। ওদের সময় প্রবাহ আমাদের থেকে আলাদা। ওরা জগতটাকে দেখেও কিছুটা স্লো মোশনের ভিডিওর মত।

কুকুরের কথাই ধরা যাক। কুকুরের জীবনকাল মানুষের প্রায় সাত ভাগের একভাগের সমান। অর্থাৎ কুকুরের এক বছর সমান মানুষের সাত বছর। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন আচ্ছা, তাহলে কুকুরের সময় প্রবাহ কি মানুষের তুলনায় ধীর? গবেষণায় দেখা গেল আসলেই তাই। কুকুরের সময় প্রবাহ মানুষের তুলনায় প্রায় পঁচিশ শতাংশ ধীর ।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোন প্রাণীর সময় প্রবাহের হার মূলত নির্ভর করে দুটি জিনিসের উপর। একটি হলো শরীরের ওজন, আর অন্যটি বিপাকের হার। কোন প্রাণীর ওজন যত কম হবে আর শরীরের ভেতর ঘটা রাসায়নিক প্রক্রিয়া যত দ্রুত হবে, সেই প্রাণীর সময় তত বেশি ধীর হবে। তবে সময় প্রবাহের হার যত কম বা বেশিই হোক না কেন, মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীরা মূলত বর্তমানেই বাস করে। অতীত ও ভবিষ্যতের ধারনা তাদের কাছে একদমই ঝাপসা।

মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর সময়-জ্ঞান না থাকলেও নিয়ান্ডারথাল মানবদের সময় জ্ঞান ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিয়ান্ডারথাল মানবরা ঠিক মানুষ না; তবে আধুনিক মানুষের(Homo sapiens) খুব কাছাকাছি । আজ থেকে চল্লিশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত মানুষদের পাশাপাশি এই নিয়ান্ডারথাল মানবরাও পাশাপাশি বাস করত। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম হলো- “শুধুমাত্র যোগ্যরাই টিকে থাকে” । প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে নিয়ান্ডারথালরা টিকতে পারে নি।চিরতরে হারিয়ে গেছে এই পৃথিবী থেকে। নিয়ান্ডারথালরা হারিয়ে গেলেও তাদের ইতিহাস হারিয়ে যায় নি। তারা দেখতে কেমন ছিল, তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল, আর তাদের বুদ্ধিমত্তা কেমন ছিল এসব বিষয়ে রয়ে গেছে শত শত আলামত ।


চিত্রঃ নিয়ান্ডারথাল মানবের কম্পিউটার রিজেনারেটেড ছবি

প্রাচীন মানব ও নিয়ান্ডারথাল মানবদের দেহাবশেষ ও ব্যাবহার করা হাতিয়ার ইত্যাদিসহ অনেক প্রাচীন গুহা রয়েছে। তেমনি এক গুহার নাম শানিদার গুহা। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে ইরাক সীমান্তের এক উপত্যকার নাম শানিদার। শানিদার মানে হলো স্বপ্ন উপত্যকা। এই উপত্যকার একপাশে অবস্থিত এই “শানিদার গুহা”। এই গুহাটিকে নিঃসন্দেহে বিশেষ একটি স্থান বলা যেতে পারে। কারণ, কার্বন ডেট টেস্ট করে জানা গেছে- এই গুহাটিকে সেই ৫০০০০ হাজার বছর আগে থেকেই বসবাস করার যায়গা হিসেবে ব্যাবহার করা হত। আজ থেকে প্রায় ৫০০০০ বছর আগে নিয়ান্ডারথাল মানবরা যেমন এই গুহাকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাবহার করেছে, তেমনি ১১০০০ বছর আগের আধুনিক মানুষরাও এই স্থানকে ব্যাবহার করেছে। এমনকি আজও কিছু স্থানীয় কুর্দিস্থানীরা বছরের বিশেষ কিছু সময়ে এই স্থানকে এখনো ব্যাবহার করে থাকে। গুহাটির খনন করার সময় চারটি স্তরে বিভিন্ন সময়ের বসবাস করা মানুষদের কঙ্কাল ও তাদের ব্যাবহার করা হাতিয়ার ইত্যাদি পাওয়া গেছে।


চিত্রঃ শানিদার গুহা

শানিদার গুহার সর্বশেষ স্তরটিই মূলত সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রায় ১০ টি নিয়ান্ডারথালদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। তার মধ্যে “শানিদার-৩” ও “শানিদার-৪” কে যে ইচ্ছে করেই কবর দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে বিজ্ঞানী ও প্রতœতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত হতে পেরেছেন [১] । পাশাপাশি সেখানে থাকা বিভিন্ন জিনিস থেকে বোঝা যায় যে, তারা মৃত্যুর পরবর্তী সময় নিয়ে চিন্তা করেই এই কবরগুলো তৈরি করেছিল। অর্থাৎ নিয়ান্ডারথাল মানবদের যে সময়-জ্ঞান ছিল এটা নিশ্চিত। অন্যান্য প্রাণীদের মত তারা শুধু বর্তমান সময়েই বাস করত না ।

এখন নিশ্চয় প্রশ্ন জাগছে, অন্য কোন প্রাণীর সময় জ্ঞান না থাকলেও শুধু নিয়ান্ডারথাল ও আধুনিক মানুষের কেন সময় জ্ঞান থাকবে ? এর নিশ্চয় কারণ আছে ? মূলত, অতীত-ভবিষ্যতের ধারণা থাকার জন্য বিশেষ ধরণের মস্তিষ্কের গঠনের দরকার হয় । মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরোন রয়েছে। এই নিউরোনগুলো আবার বিশেষভাবে একটি আরেকটির সাথে যুক্ত হয়ে নিউরাল সার্কিট তৈরি করেছে। এই নিউরাল সার্কিটগুলোই আমাদের স্মৃতি মনে রাখা, সচেতনভাবে ও যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই নিউরাল সার্কিট কিছুটা কম্পিউটারের লজিক গেটের মত কাজ করে। ক¤িপউটারের প্রোগ্রামিং ল্যাক্সগুয়েজে যেমন হ্যাঁ অথবা না প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যৌক্তিকভাবে কোন সমস্যা সমাধান করা হয়; আমাদের মস্তিষ্কও কিছুটা সেভাবেই কাজ করে ।

যে প্রাণীর মস্তিষ্কে যত বেশি নিউরন ও নিউরোন থেকে নিউরনের সংযোগ থাকবে, সেই প্রাণী তত বেশি বুদ্ধিমান হবে। মস্তিষ্কে যদি যথেষ্ট পরিমাণ নিউরোন ও আন্তঃনিউরোন সংযোগ থাকে, একমাত্র তখনই সময়-জ্ঞানের মত উন্নত ধরণের ধারণা থাকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকা সম্ভব। আর এত উন্নত মস্তিষ্ক শুধুমাত্র মানুষেরই আছে। আর তার কারণ- তাদের মস্তকটিও যথেষ্ট উন্নত। আসলে নিয়ান্ডারথালদের সাথে আধুনিক মানুষের খুব বেশি তফাৎ নেই। একদম সম্প্রতি, লরেন্স বার্কেলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এ্যাডয়ার্ড রুবিন পরীক্ষা করে দেখেছেন- আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথাল মানবের ডিএনএ এর মধ্যে মিল ৯৯.৫% – ৯৯.৯% পর্যন্ত । নিয়ান্ডারথালরাও মানুষের মত হাতিয়ার তৈরি করতে পারত। কিছু কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা তাদের সম্ভবত একটি ভাষাও ছিল। নিয়ান্ডারথালদের সময়-জ্ঞান থাকলেও সেটি কিন্তু আধুনিক মানুষের মত উন্নত না। এটি মস্তিস্কের পরিপক্কতার উপর নির্ভর করে। জন্ম নেবার পরেই মানবশিশুদের মস্তিষ্ক পরিনত মানুষের মস্তিস্কের মত কাজ করতে পারে না। ফলে মানবশিশুদের ভবিষ্যৎ সময় সম্পর্কে ধারণা খুবই অ¯পষ্ট। বলা যায় শিশুরাও একরকম বর্তমান সময় নিয়েই ভাবে।

শিশুর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার মস্তিষ্ক পরিণত হয়। আর সেই সাথে সে ভবিষ্যৎ স¤পর্কে আরও ভালমতো ভাবতে পারে। আর সময়কেও আরও সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এই মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের বিষয়টি, মানুষের ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম। মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানব জাতিরও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটেছে, ভাষার বিকাশ ঘটেছে, সেইসাথে সময় সম্পর্কে উপলব্ধি আরও তীক্ষè হয়েছে। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত সময় স¤পর্কে মানুষের ধারণা দিন দিন পরিবর্তন হয়েই চলেছে।

প্রাচীনকালের মানুষরা খুব বেশি দূরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবতে পারত না। আগুণ জালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ যোগার, বাড়তি খাদ্য সংরক্ষণ এসবের মধ্যেই তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সভ্যতা শুরু হবার পর মানুষ সময়কে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শিখেছে। তবে সেসময় তাদের কাছে সময় ছিল কিছুটা যাদুর মত। তারা ভাবত, যেটা ঘটার সেটা সময় হলে ঘটবেই।

এসব ধারণার পেছনে মূলত আদিম ধর্মবিশ্বাসের ভূমিকাটাই ছিল প্রধান। কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা শুরু হবার পর সময়কে কিছুটা আবর্তক মনে করা হত। ওরা ভাবত সবকিছুই বুঝি ঘুরে ফিরে আবার ঘটবে। কৃষিকাজ শুরু করার পর মানুষকে প্রকৃতির উপর খেয়াল রাখতে হত। তারা দেখত – একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর, গ্রীষ্ম আসে, বর্ষা আসে, শীত আসে। প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোও ফিরে ফিরে আসে। আদিম বিশ্বাস, তীক্ষè পর্যবেক্ষণের অভাব, প্রকৃতির উপর নির্ভরতা মানুষকে সময় সম্পর্কে এমন আবর্তক ও ম্যাজিক্যাল ধারণা পেতে বাধ্য করেছে। তবে এর পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাও ছিল। আদিম বিশ্বাসের কারণে তারা ভাবত- সবকিছু যদি ফিরে ফিরে এসেই থাকে- তবে মৃত মানুষও বুঝি আবার জন্মগ্রহন করতে পারে। কে চায় এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে। এসব মনস্তাত্ত্বিক কারণেই তারা মৃতের কবরে ফুল, খাদ্য , হাতিয়ার ইত্যাদি রেখে দিত।


চিত্রঃ প্রাচীন মানুষের খুব বেশি দূর-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারত না। তাদের চিন্তা শুধুমাত্র খাদ্য যোগার, আগুনের জন্য কাঠ যোগার বা শিকারের জন্য হাতিয়ার তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।


কমটি ডি বাফুন নামে এক ফরাসি গণিতবিদ প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করেন। তার হিসেবে দেখা যায় – পৃথিবীর বয়স কমপক্ষে পঁচাত্তর হাজার বছর। পরবর্তীতে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণের সঠিক উপায় আবিষ্কারের পর দেখা যায় পৃথিবীতে কয়েক শত কোটি বছর পুরনো পাথরের অস্তিত্ব রয়েছে ।আর মহাবিশ্ব সৃষ্টির আধুনিক তত্ত্ব থেকে দেখা যায় ১৩.২ বিলিয়ন বছর আগে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি। মহাবিশ্ব সৃষ্টিরও কয়েকশত কোটি বছর পরে, মাত্র ৪৫০ কোটি বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানের তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে আমরা আজ থেকে ৫০০ কোটি বা তারও বেশি সময় পরে এই পৃথিবী-সৌরজগতের অবস্থা কেমন হবে সেটাও ভাবতে পারছি। মূলত সৌরজগতের বিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হবার আগ পর্যন্ত আমাদের কাছে বৃহৎ সময় বলে তেমন কিছু ছিল না বললেই চলে। কিন্তু মহাবিশ্ব সৃষ্টির তত্ত্ব পাবার পর সময়ের অনেক বড় পর্যায় পর্যন্ত আমরা ভাবতে পারি । এমনকি সময় শুরু এবং শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা ভাবতে পারি। অনেক বড় সময়ের পাশাপাশি অনেক ক্ষুদ্র সময় নিয়েও আমরা ভাবতে পারি। এখন আমাদের এক সেকেন্ডের কয়েক কোটিভাগের মধ্যে ঘটে যাওয়া কোয়ান্টাম কণিকার সংঘর্ষের পরিণতি মাপতে হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে- মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের সময়-জ্ঞান দিন দিন বিস্তৃত ও সূক্ষ্ম হচ্ছে।

[১] শানিদার গুহায় পাওয়া ১০ টি নিয়ান্ডারথাল মানবদেরকে শানিদার-১ , শানিদার-২ এভাবে নামকরন করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:-
টাইম ট্র্যাভেলঃসময় ভ্রমণ এবং সময়ের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

Thursday, January 28, 2016

১৮+ পোষ্ট ( সবার জন্য নয়)

আমি সত্যিই ভয়ে ভয়ে এই লেখা পোস্ট করছি ... এই স্ট্যাটাস কারো পড়ার দরকার নেই। কারন এটা ১৮+ স্ট্যাটাস।
তবে হ্যা, যদি আপনার ভেতরে পর্ণগ্রাফি'র কোন 'প্রভাব' থেকে থাকে তাহলে পড়তে পারেন....
.
.
.
একজন টিনেজার যখন পর্ণ মুভি দেখে, তখন সে ওই পর্ণমুভির নায়ক নায়িকার যৌনক্ষমতা , যৌনশক্তি আর যৌনকুরুচি দেখে তাদের সুপার হিরো মনে করে। কম বয়স আর সদ্য কৈশরের তালমাতাল সময়ে পর্ণ দেখে ভাবতে থাকে ইশ! পর্ণ ক্লিপের নায়কের পেনিস কত বড়! ... ওহ! নায়িকার শরীর কত পারফেক্ট! ... আহ! কত পারফেক্ট সেক্স করছে তারা!
এসব দেখে বাস্তবেও কেউ কেউ সেক্সুয়াল হ্যারে্সমেন্ট করতে চায়, আইনত / সামাজিক / ধর্মীয় সীমা অতিক্রম করে রীতিমতো অপরাধ করার সুযোগ খুজে। আথবা অনেকেই পর্ণমুভির নায়ক নায়িকার শক্তি সামর্থ্য'র সাথে নিজের সামর্থের তুলনা করে আত্নবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে থাকে।
একদিকে বিকৃত রুচির বিস্তার বাড়ে, অন্যদিকে যৌনতা নিয়ে ভূল সংস্কৃতির অপবোঝা মগজ ধোলাই করতে থাকে।
কিন্তু এই পর্ণমুভিতে দেখা দৃশ্যগুলো কতটুকু সত্য বা ভেতরের বাস্তবতা কি সেটা নিয়ে কোন সচেতনতা তৈরি হয়না।
সমাজে পর্ণ ছবি দেখে তৈরী হওয়া কিছু ভুল ফ্যান্টাসি নিয়ে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট কিছু বিশ্লেষণ.......:
ভুল ধারনা
১) - পর্ণ মুভিতে দেখানো পুরুষের বড় যৌনাঙ্গ অনেক আকর্ষনীয় ব্যাপারঃ
আসলে পর্ণ দেখতে দেখতে অনেকেই ভাবেন যে "আহ! ছেলেটার যৌনাঙ্গ / পেনিস কত বড়! এই বড় সাইজের পেনিস দিয়ে সে মেয়েটাকে কত সুখ দিচ্ছে, কত পারফেক্ট সেক্স করছে!"
হ্যা, যে পুরুষেরা পর্ণ ছবিতে অভিনয় / যৌনতা করে তাদের যৌনাঙ্গ সাইজে বড় হয়। সেটা প্রাকৃতিক / সার্জারি করে বা ঔষুধ সেবনের মাধ্যমে, যেভাবেই হোক।
কিন্তু এই বড় সাইজের পেনিস পর্ণ ছবিতে যৌনরত মেয়েদের বেশিরভাগের জন্যই উপভোগ্য কিছু না। এতে না তারা কোন সুখ পায়, না এটাকে পারফেক্ট সেক্স বলা যায়।
হ্যা, অল্প কিছু নারী পর্নস্টার এটা সহ্য করতে পারে। আর অন্য পর্ন নায়িকাদের জন্য এই অস্বাভাবিক বড় পেনিস এর সাথে যৌনতা করা একটি নির্যাতন / ব্যাথার 'কাজ' ছাড়া কিছুই না।
তাই যখন একটি পর্ননায়িকার যোনীতে অস্বাভাবিক বড় আকারের পেনিস প্রবেশ করে, তখন সে আক্ষরিক অর্থেই ব্যাথায় চিৎকার করে, কান্না করে। এখানে যৌন আনন্দের কোন প্রশ্নই আসেনা। অনেক সময় এই নায়িকাদের চোখে মুখে কস্টের তীব্রতার সত্যিকারের ছাপ ফুটে উঠে। আর তারা তাদের পুরুষের উরুতে হাত চেপে ধরে রাখে, যেন ভেতরে কোন ক্ষত-বিক্ষত হবার সম্ভাবনা তৈরী হলে পুরুষটিকে বাধা দিতে পারে।
আর মেয়েদের এই ব্যাথা সহ্য করার দৃশ্য আনন্দের কিছু না। তাই পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে পর্নশ্যুট কিছুক্ষন থামিয়ে দেয়া হয় যেন মেয়েটি কিছুটা ধাতস্থ হতে পারে,আহত হয়ে যেন হাসপাতালে নিতে না হয়।
আর শ্যুটিং শেষে অমানবিক অংশগুলো মূল ভিডিও থেকে কেটে বাদ দেয়া হয়, কারন সিনগুলো দেখলে দর্শকরা বুঝে ফেলতে পারে যে আসলে ছেলে আর মেয়েটা 'সেক্স' করছেনা, বরং মজুরি পাওয়ার জন্য 'কাজ' করছে, কস্টকর কাজ।
----------------
ভুল ধারনা
 ২) পর্ণ মুভিতে নায়ক-নায়িকারা অনেক লম্বা সময় ধরে সেক্স করতে পারে / তারা ম্যারাথন সেক্স করেঃ
পর্ণ মুভিতে আপনারা যেটা দেখেন সেটা হচ্ছে নায়ক নায়িকারা টানা ২০-৬০ মিনিট পর্যন্ত সেক্স করতে পারে।
কিন্তু আপনারা যেটা দেখেন না সেটা হচ্ছে এইসব লম্বা সেক্সের ভিডিও কিভাবে তৈরী করা হয়।
পর্ণ ভিডিও তো আর লাইভ ক্রিকেট নয় যে আপনারা 'সরাসরি' দেখছেন। বরং আসলে যে সেক্স দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করা হয়,সেটা কাটাকুটি করে তৈরি করা হয় ফিনিশিং প্রোডাক্ট, যেটা পরে আপনারা দেখেন কম্পিউটার এর সামনে বসে।
তাই আপনাদের দেখা হয়না যে, সেক্স দৃশ্যের শ্যুটিং একশ্যুট এ করা হয়না। বরং শ্যুটিংএর ফাকে ফাকে বার বার ব্রেক নেয়া হয়। খাওয়া দাওয়ার ব্রেক। ড্রিংক্স ব্রেক। নায়ক - নায়িকার বাথরুম ধরায় ব্রেক। নায়কের দম ফুরিয়ে গেলে বিশ্রাম নেয়ার ব্রেক। নায়কের পেনিস এক সময় আর না দাড়ালে আবার ট্যাবলেট খাওয়ানোর জন্য ব্রেক। নায়কের উত্তেজনা ফুরিয়ে গেলে তার পেনিসের গোড়ায় আবার ইঞ্জেকশন নেয়ার জন্য ব্রেক।নায়কের বীর্য বের হয়ে গেলে পুনরায় তার পেনিস দাড় করানোর জন্য ব্রেক। নায়ক নায়িকার শরীরে আবার লুব্রিক্যান্ট মাখানোর জন্য ব্রেক ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঢালিউড / বলিউড / হলিউড এর সিনেমার যেমন মাসের পর মাস শ্যুটিং চলে, পরে সব শ্যুটিং এর ভিডিও কাটাকুটি করে দর্শকদের জন্য দুই আড়াই ঘন্টার ফিনিশিং প্রোডাক্ট তৈরী করা হয়, ঠিক তেমনি ভাবে বহুক্ষন ধরে নানা রকম বিচ্ছিন্ন শ্যুটিং শেষ করে সব দৃশ্য একসাথে কেটেকুটে বা জোড়া লাগিয়ে দর্শকদের জন্য ২০ থেকে ৬০ মিনিটের একটি পর্ণ ক্লিপ ফিনিশিং দেয়া হয়। তাই রেডিমেট পর্ণ দেখে পর্ণস্টারদের 'ম্যারাথন সেক্স' নিয়ে ভুল ফ্যান্টাসি লালন করে লাভ নেই।
কেউ ই সপ্তাহে ৭ দিন ধরে মাসের পর মাস সেক্স করে সুস্থ থাকতে পারেনা। যদি এর উল্টোটা আপনার মনে হয় তাহলে নিজে ট্রাই করে দেখতে পারেন ক্ষতি হলে দায় আপনার।
যে যে পর্নস্টার পুরুষেরা বছরকাল ধরে বিরামহীন সেক্স ওয়ার্ক করে তাদের পেনিস একসময় অনুভূতিহীন হয়ে যায়। তখন এমন এক সময় আসে যে সেক্স এর সময় তাদের আর উত্তেজনা আসেনা, স্বাভাবিক উপায়ে বীর্য্যপাত হয়না। তাদের তখন বিকল্প কোন উপায় বের করতে হয়।
আর তারা যখন বিকল্প হিসেবে মেডিসিন খেয়ে খেয়ে সেক্স ওয়ার্ক চালাতে চায় তখন একটা সময় আসে যখন ওই ওষুধও আর কাজ করেনা। তখন আর পেনিস দাঁড়ায় না, নিজের ব্যাক্তিগত যৌনজীবনেও দাঁড়ায় না, পর্ণ সিনেমায় 'কাজ' করার সময়ও দাঁড়ায় না।
--------------------------------------------------
ভুল ধারনা
৩) এনাল সেক্সঃ
পর্ণ মুভিগুলোতে যেকোন সেক্স দৃশ্য এমনভাবে দেখানো হয় যেন এটি খুব স্বতঃস্ফুর্ত আনন্দের বা সুখের দৃশ্য । কিন্তু দেখানো হলেই যে এটি সত্যি এমনটি ভাবার কিছু নেই।
বাস্তবে এনাল সেক্স করার আগে একজন পর্ণ নায়িকাকে বেশ কিছু প্রটোকল আর শর্ত মানতে হয়। প্রথমে হিসেব করা হয় মেয়েটি তার মলদ্বারে বড় সাইজের পেনিস নিতে পারবে কিনা / আহত হবে কিনা। তারপর মেয়েটির পায়ুপথে বারবার মেডিসিন / লুব্রিক্যান্ট প্রবেশ করানো হয়, প্রথমত পায়ুপথ পরিস্কার করতে অতঃপর ভেতরটা পিচ্ছিল করতে যেন পেনিস ঢুকলে পায়ুপথ ছিড়ে না যায়।
এখানেই শেষ নয়, মেয়েটিকে সেক্স দৃশ্যে অভিনয় করার ৪ থেকে ১২ ঘন্টা আগে থেকে অভুক্ত থাকতে হয় যেন শ্যুটিং এর সময় মেয়েটির পেট খালি থাকে। কারন পেট খালি না থাকলে / পায়ুপথ পরিস্কার না থাকলে এনাল সেক্স এর এক পর্যায়ে পর্ণনায়িকাদের বাথরুম (shit) বের হয়ে যাবে। কিন্তু এ ধরনের জঘন্য জিনিসগুলো মুল ভিডিওতে দেখানো হয়না, তাইনা? আর তাই আপনারা কিনা সবকিছুই ন্যাচারেল মনে করেন আর বাস্তবেও এসব করতে চান!

তাই যখন ভবিষ্যতে যদি কোন পর্ণ ক্লিপে এনাল সেক্স দেখেন তাহলে তাহলে একটু খেয়াল করে নিবেন। পর্ণ নায়িকাটি হয়তো বারো ঘন্টা ধরে অভুক্ত। অভুক্ত অবস্থায় যৌনরত মেয়েটি ক্ষিধেয় কাতরাচ্ছে হয়তো। আর অভুক্ত মেয়েটির সেক্স শ্যুটিং শুরু হবার আগে ক্লিনিক্যাল যন্ত্রপাতি দিয়ে তার এনালের ভেতর এতবার মেডিসিন আর লুব্রিক্যান্ট ঢুকানো হয়েছে যা হয়তো কোন রোগীর চাইতে অনেক অনেকগুন বেশি অস্বস্তিকর ও যন্ত্রনাদায়ক।
আর এ ধরনের এনাল সেক্স শ্যুটিং এর পর কিছু মেয়ের বাসায় যাওয়া হয়না, তাদের সরাসরি ভর্তি হতে হয় নার্সিং হোমে। আপনি যে মেয়েটির এনাল সেক্স ভিডিও দেখছেন সেও হয়তো শ্যুটিং শেষে ক্ষুধার্থ ও আহত অবস্থায় কোন নার্সিং হোমে যেয়ে পড়ে থেকেছে।
------------------------------
ভুল ধারনা
৪) পর্ণ নায়িকাদের যৌনসুখঃ
হ্যা, পর্ণ মুভিতে নায়িকারা 'যৌনকাজই' করে। তবে এখানে অনেক বড় আর বেশকিছু ''কিন্তু '' আছে যা অগ্রাহ্য করার মতো নয়।
আসলে যে মেয়েরা পর্ণমুভিতে কাজ করে তার মূল কারন যৌনসুখ নয়, বরং টাকা / অর্থ।আর তাই টাকা কামাতে যেয়ে কিছু পর্ণ নায়িকা কোন প্রকার সেক্স ই উপভোগ করেনা।
পর্ণ ইন্ডাস্ট্রিতে যে মেয়েটা স্বাভাবিক যৌনরুচির, শুধু মাত্র টাকার জন্য তাকে লেসবিয়ান পর্ণতে অন্য মেয়ের সাথে হোমোসেক্স করতে হয় যা সে হয়তো ব্যাক্তিজীবনে একদম আত্মা থেকে ঘৃনা করে। আবার হয়তোবা অন্য পর্ণমুভিতে এমন কোন নায়কের সাথে তাকে সেক্স করতে হয় যার সাথে করতে তার রুচি হচ্ছেনা/ নিজেকে নিরাপদ মনে করছে না/ আত্নসম্মানে লাগছে / যার সাথে সেক্স করতে সে আকর্ষন পাচ্ছেনা।
কিন্তু তারপরেও যাই হোক, তারা পর্ণমুভিতে পারফর্ম করে। মনের বিরুদ্ধে গিয়েও কিভাবে যৌনতা করা যায়, কিভাবে চেহারায় 'সুখী ' ভাব ফোটানো যায়, তা তারা জানে, পারে, কৃত্রিমভাবে হলেও।
আর পর্ণমুভির পরিচালক, ক্যামেরাম্যানরাও এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় না। একদিকে পর্নস্টার রা এমন ভাবে সেক্স করার ভান করে যে তারা এটা খুব উপভোগ করছে, অন্যদিকে পরিচালক কৌশলী ভাবে ক্যামেরা ধরে ও পরবর্তীতে পেশাদারী এডিটিং করে এমন ভাবে পর্ণমুভি বানিয়ে ফেলে যে দেখলে মনে হবে বিকৃত যৌনাচার অনেক মজার কিছু!
আর এভাবেই আপনারা পর্ণ দেখে সেই 'মজা' পান যেটা ওই মুভির নায়ক নায়িকাই হয়তো পায়নি!

ভুল ধারনা
৫) নারীর কামরসঃ
নারীর কামরস বের হওয়া / রাগমোচন এর নির্ণয় নিয়ে মেডিক্যাল সাইন্সেই এখনো অনেক বিতর্ক আছে। তাই বাস্তবে মেয়েদের কামরস ছিটকে বের হয় কিনা, সেটা নিয়ে কিছু না বলি। বরং পর্ণ সিনেমায় নায়িকাদের কামরস ছিটকে বের হওয়ার দৃশ্য কিভাবে বানানো হয় সেটা বলি।
আসলে বেশিরভাগ পর্ণ মুভিতে নায়িকারা সময়মতো হিসু করে দেয় যেটাকে ক্যামেরাতে দেখানো হয় নায়িকার বীর্য্যপাত / কামরস বের হওয়া হিসেবে।
অথবা সেক্স দৃশ্যের মাঝে ব্রেক নেয়া হয়, নায়িকার যোনীর ভেতর পানি ভরে টার্কি ব্লাস্ট ( পাম্প সিরিঞ্জ) ঢুকানো হয়। পরে সেই পাম্প থেকে ছিটকে পানি বের হয়। আর ক্যামেরাতে এটাকে দেখানো হয় নায়িকার যৌনসুখে বের হয়ে যাওয়া কয়েক ফুট লম্বা কামরস নিক্ষেপ / রাগমোচন হিসেবে। আর দর্শকরা ভূয়া জিনিস দেখে কল্পনার ফানুশ উড়াতে থাকে এবং পর্ণতে আরো আসক্ত হতে থাকে!

অন্যান্যঃ
৬) কনডম ছাড়াই সিংহভাগ পর্ণগ্রাফি মুভিগুলো তৈরী হয়। তাই এই ইন্ডাস্ট্রিতে এইডস ও অন্যান্য যৌনরোগ প্রকোপ উল্লেখযোগ্য।
৭) পর্ণ ইন্ডাস্ট্রির নায়ক নায়িকাদের মাঝে ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার হার আশংকাজনক।
৮) - যুক্তরাস্ট্রে মানুষের গড় আয়ুঃ ৭৮ বছর
পর্ণতারকাদের গড় আয়ুঃ মাত্র ৩৭ বছর
- মূল কারনঃ মেডিসিন, যৌনরোগ, ডিপ্রেশন, নেশা, আত্নহত্যা।
(তথ্যসূত্রঃ MenzHealth ম্যাগাজিন। এছাড়া ২০ বছর ধরে পর্ণ ইন্ডাস্ট্রির 'সফল' পরিচালক Seymore Butts এর স্বীকারোক্তিমূলক প্রবন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট গুগোল সার্চ।)
---------------------------------------------
-------
...... মনে রাখবেন, যৌন আবেশে করা "শীৎকার" আর অমানুষিক কস্টে করা "চিৎকার" এক জিনিস না। অন্তত সুস্থ মস্তিস্কের কারো জন্য তো অবশ্যই না।
সবাইকে শুভকামনা......

Saturday, January 16, 2016

হুমায়ুন আজাদের প্রবচন

১)এক-বইয়ের-পাঠক সম্পর্কে সাবধান।
২)এখানে অসৎরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত।
৩)রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দরকার ছিলো না, কিন্তু দরকার ছিলো বাঙলা সাহিত্যের। পুরস্কার না পেলে হিন্দুরা বুঝতো না যে রবীন্দ্রনাথ বড়ো কবি; আর মুসলমানেরা রহিম, করিমকে দাবি করতো বাঙলার শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে।
৪)আমি এতো শক্তিমান আগে জানা ছিলো না। আজকাল মিত্র নয়, শত্রুদের সংখ্যা দেখে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই।
৫)জন্মাতরবাদ ভারতীয় উপমহাদেশের অবধারিত দর্শন। এ- অঞ্চলে এক জন্মে পরীক্ষা দিতে হয়, আরেক জন্মে ফল বেরোয়, দু-জন্ম বেকার থাকতে হয়, এবং ভাগ্য প্রসন্ন হ’লে কোন এক জন্মে চাকুরি মিলতেও পারে।
৬)বুদ্ধিজীবীরা এখন বিভক্ত তিন গোত্রে। ভণ্ড, ভণ্ডতর, ভণ্ডতম।
৭)বাঙালি যখন সত্য কথা বলে তখন বুঝতে হবে পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
৮)আধুনিক প্রচার মাধ্যমগুলো অসংখ্য শুয়োরবৎসকে মহামানবরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৯)অধিকাংশ রূপসীর হাসির শোভা মাংসপেশির কৃতিত্ব, হৃদয়ের কৃতিত্ব নয়।
১০)পাকিস্তানিদের আমি অবিশ্বাস করি, যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে, তখনও।
১১)আবর্জনাকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করলেও আবর্জনাই থাকে।
১২)নিজের নিকৃষ্ট কালে চিরশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গ পাওয়ার জন্যে রয়েছে বই; আর সমকালের নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গ পাওয়ার জন্যে রয়েছে টেলিভিশন ও সংবাদপত্র।
১৩)হিন্দুরা মূর্তিপূজারী; মুসলমানেরা ভাবমূর্তিপূজারী। মূর্তিপূজা নির্বুদ্ধিতা; আর ভাবমূর্তিপূজা ভয়াবহ।
১৪)শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে। শামসুর রাহমান বোঝেন না কার সঙ্গে পর্দায়, আর কার সঙ্গে শয্যায় যেতে হয়।
১৫)আগে কারো সাথে পরিচয় হ’লে জানতে ইচ্ছে হতো সে কী পাশ? এখন কারো সাথে দেখা হ’লে জানতে ইচ্ছে হয় সে কী ফেল।
১৬)পা, বাঙলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্যে এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারো কোনো উদ্বেগ নেই।
১৭)হায় ! থাকতো যদি একটি লম্বা পাঞ্জাবি, আমিও খ্যাতি পেতাম মহাপণ্ডিতের।
১৮)এখানকার একাডেমিগুলো সব ক্লান্ত গর্দভ; মুলো খাওয়া ছাড়া ওগুলোর পক্ষে আর কিছু অসম্ভব।
১৯)পুঁজিবাদের আল্লার নাম টাকা, মসজিদের নাম ব্যাংক।
২০)সুন্দর মনের থেকে সুন্দর শরীর অনেক আকর্ষণীয়। কিন্তু ভণ্ডরা বলেন উল্টো কথা।
২১)ব্যর্থরাই প্রকৃত মানুষ, সফলেরা শয়তান।
২২)আমাদের অঞ্চলে সৌন্দর্য অশ্লীল, অসৌন্দর্য শ্লীল। রুপসীর একটু নগ্নবাহু দেখে ওরা হৈ চৈ করে, কিন্তু পথে পথে ভিখিরিনির উলঙ্গ দেহ দেখে ওরা একটুও বিচলিত হয় না।
২৩)মানুষ সিংহের প্রশংসা করে, কিন্তু আসলে গাধাকেই পছন্দ করে।
২৪)শিক্ষকের জীবনের থেকে চোর, চোরাচালানি, দারোগার জীবন অনেক আকর্ষণীয়। এ সমাজ শিক্ষক চায় না, চোর- চোরাচালানি-দারোগা চায়।
২৫)শয়তানের প্রার্থনায় বৃষ্টি নামে না, ঝড় আসে; তাতে অসংখ্য সৎ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
২৬)যে বুদ্ধিজীবী নিজের সময় ও সমাজ নিয়ে সন্তুষ্ট, সে গৃহপালিত পশু।
২৭)টেলিভিশন, নিকৃষ্ট জিনিশের একনম্বর পৃষ্ঠপোষক, হিরোইন প্যাথেড্রিনের থেকেও মারাত্মক। মাদক গোপনে নষ্ট করে কিছু মানুষকে, টেলিভিশন প্রকাশ্যে নষ্ট করে কোটি কোটি মানুষকে।
২৮)আর পঞ্চাশ বছর পর আমাকেও ওরা দেবতা বানাবে; আর আমার বিরুদ্ধে কোনো নতুন প্রতিভা কথা বললে ওরা তাকে ফাঁসিতে ঝুলোবে।
২৯)বাঙলাদেশে কয়েকটি নতুন শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে; এগুলো হচ্ছে স্তুতিবিজ্ঞান, স্তবসাহিত্য, সুবিধাদর্শন ও নমস্কারতত্ত্ব।
৩০)পরমাত্মীয়ের মৃত্যুর শোকের মধ্যেও মানুষ কিছুটা সুখ বোধ করে যে সে নিজে বেঁচে আছে।
৩১)একটি স্থাপত্যকর্ম সম্পর্কেই আমার কোনো আপত্তি নেই, তার কোনো সংস্কারও আমি অনুমোদন করি না। স্থাপত্যকর্মটি হচ্ছে নারীদেহ।
৩২)প্রতিটি দগ্ধ গ্রন্থ সভ্যতাকে নতুন আলো দেয়।
৩৩)বাঙলার প্রধান ও গৌণ লেখকদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে প্রধানেরা পশ্চিম থেকে প্রচুর ঋণ করেন, আর গৌণরা আবর্তিত হন নিজেদের মৌলিক মূর্খতার মধ্যে।
৩৪)মহামতি সলোমনের নাকি তিন শো পত্নী, আর সাত হাজার উপপত্নী ছিলো। আমার মাত্র একটি পত্নী। তবু সলোমনের চরিত্র সম্পর্কে কারো কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার চরিত্র নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।
৩৫)বাঙালি মুসলমানের এক গোত্র মনে করে নজরুলই পৃথিবীর একমাত্র ও শেষ কবি। আদের আর কোনো কবির দরকার নেই।
৩৬)অভিনেত্রীরাই এখন প্রাতঃস্মরণীয় ও সর্বজনশ্রদ্ধেয়।
৩৭)কবিরা বাঙলায় বস্তিতে থাকে, সিনেমার সুদর্শন গর্দভেরা থাকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রাসাদে।
৩৮)মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপজ্জনক।
৩৯)শ্রদ্ধা হচ্ছে শক্তিমান কারো সাহায্যে স্বার্থোদ্ধারের বিনিময়ে পরিশোধিত পারিশ্রমিক।
৪০)আজকাল আমার সাথে কেউ একমত হ'লে নিজের সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ জাগে। মনে হয় আমি সম্ভবত সত্যভ্রষ্ট হয়েছি, বা নিম্নমাঝারি হয়ে গেছি।
৪১)‘মিনিষ্টার’ শব্দের মূল অর্থ ভৃত্য। বাঙলাদেশের মন্ত্রীদের দেখে শব্দটির মূল অর্থই মনে পড়ে।
৪২)আগে কাননবালারা আসতো পতিতালয় থেকে, এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
৪৩)জনপ্রিয়তা হচ্ছে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। অনেকেই আজকাল জনপ্রিয়তার পথে নেমে যাচ্ছে।
৪৪)উন্নতি হচ্ছে ওপরের দিকে পতন। অনেকেরেই আজকাল ওপরের দিকে পতন ঘটছে।
৪৫)প্রতিটি বিজ্ঞাপনে পণ্যটির থেকে পণ্যাটি অনেক লোভনীয়; তাই ব্যর্থ হচ্ছে বিজ্ঞাপনগুলো। দর্শকেরা পণ্যের থেকে পণ্যাটিকেই কিনতে ও ব্যবহার
করতে অধিক আগ্রহ বোধ করে।
৪৬)কোন দেশের লাঙলের রূপ দেখেই বোঝা যায় ওই দেশের মেয়েরা কেমন নাচে, কবিরা কেমন কবিতা লেখেন, বিজ্ঞানীরা কী আবিষ্কার করেন, আর রাজনীতিকেরা কতোটা চুরি করে।
৪৭)যারা ধর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, তারা ধার্মিকও নয়, বিজ্ঞানীও নয়। শুরুতেই স্বর্গ থেকে যাকে বিতারিত করা হয়েছিলো, তারা তার বংশধর।
৪৮)যতোদিন মানুষ অসৎ থাকে, ততোদিন তার কোনো শত্রু থাকে না; কিন্তু যেই সে সৎ হয়ে উঠে, তার শত্রুর অভাব থাকে না।
৪৯)নারী সম্পর্কে আমি একটি বই লিখছি; কয়েকজন মহিলা আমাকে বললেন, অধ্যাপক হয়ে আমার এ-বিষয়ে বই লেখা ঠিক হচ্ছে না। আমি জানতে চাইলাম, কেনো ? তাঁরা বললেন, বিষয়টি অশ্লীল !
৫০)এদেশে সবাই শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক : দারোগার শোকসংবাদেও লেখা হয়, ‘তিনি শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক ছিলেন!'
৫১)শিল্পকলা হচ্ছে নিরর্থক জীবনকে অর্থপূর্ণ করার ব্যর্থ প্রয়াস।
৫২)কিছু বিশেষণ ও বিশেষ্য পরস্পরসম্পর্কিত; বিশেষ্যটি এলে বিশেষণটি আসে, বিশেষণটি এলে বিশেষ্যটি আসে। তারপর একসময় একটি ব্যবহার করলেই অন্যটি বোঝায়, দুটি একসাথে ব্যবহার করতে হয় না। যেমন : ভণ্ড বললেই পীর আসে, আবার পীর বলতেই ভন্ড আসে। এখন আর ‘ভণ্ড পীর’ বলতে হয় না; ‘পীর’ বললেই ‘ভণ্ড পীর’ বোঝায়।
৫৩)ভক্ত শব্দের অর্থ খাদ্য। প্রতিটি ভক্ত তার গুরুর খাদ্য। তাই ভক্তরা দিনদিন জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হয়ে আবর্জনায় পরিণত হয়।
৫৪)মূর্তি ভাঙতে লাগে মেরুদণ্ড, মূর্তিপূজা করতে লাগে মেরুদণ্ডহীনতা।
৫৫)আমাদের সমাজ যাকে কোনো মূল্য দেয় না, প্রকাশ্যে তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করে, আর যাকে মূল্য দেয় প্রকাশ্যে তার নিন্দা করে। শিক্ষকের কোনো মূল্য নেই, তাই তার প্রশংসায় সমাজ পঞ্চমুখ; চোর, দারোগা, কালোবাজারি সমাজে অত্যন্ত মুল্যবান, তাই প্রকাশ্যে সবাই তাদের নিন্দা
করে।
৫৬)সৌন্দর্য রাজনীতির থেকে সব সময়ই উৎকৃষ্ট।
৫৭)ক্ষুধা ও সৌন্দর্যবোধের মধ্যে গভীরসম্পর্ক রয়েছে। যে-সব দেশে অধিকাংশ মানুষঅনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যে-সব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে,সেখানে মেদহীন হওয়া রূপসীর লক্ষণ। এজন্যেই হিন্দি আর বাঙলা ফিল্মের নায়িকাদের দেহ থেকে মাংস চর্বি উপচে পড়ে। ক্ষুধার্ত দর্শকেরা সিনামা দেখে না, মাংস ও চর্বি খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে।
৫৮)বাঞ্ছিতদের সাথে সময় কাটাতে চাইলে বই খুলুন, অবাঞ্ছিতদের সাথে সময় কাটাতে চাইলে টেলিভিশন খুলুন।
৫৯)স্তবস্তুতি মানুষকে নষ্ট করে। একটি শিশুকে বেশি স্তুতি করুন, সে কয়েকদিনে পাক্কা শয়তান হয়ে উঠবে। একটি নেতাকে স্তুতি করুন, কয়েকদিনের মধ্যে দেশকে সে একটি একনায়ক উপহার দেবে।
৬০)ধনীরা যে মানুষ হয় না, তার কারণ ওরা কখনো নিজের অন্তরে যায় না। দুঃখ পেলে ওরা ব্যাংকক যায়, আনন্দেওরা আমেরিকা যায়। কখনো ওরা নিজের অন্তরে যেতে পারে না, কেননা অন্তরে কোনো বিমান যায় না।
৬১)শৃঙ্খলপ্রিয় সিংহের থেকে স্বাধীন গাধা উত্তম।
৬২)বাঙলায় তরুণ বাবরালিরা খেলারাম, বুড়ো বাবরালিরাভণ্ডরাম।
৬৩)প্রাক্তন বিদ্রোহীদের কবরে যখন স্মৃতিসৌধ মাথা তোলে, নতুন বিদ্রোহীরা তখন কারাগারে ঢোকে, ফাসিঁকাঠে ঝোলে।
৬৪)একনায়কেরা এখন গণতন্ত্রের স্তব করে, পুজিঁপতিরা ব্যস্ত থাকে সমাজতন্ত্রের প্রশংসায়।
৬৫)বেতন বাঙলাদেশে এক রাষ্ট্রীয় প্রতারণা। এক মাস খাটিয়ে এখানে পাঁচ দিনের পারিশ্রমিক দেয়া হয়।
৬৬)পুরস্কার অনেকটা প্রেমের মতো; দু-একবার পাওয়া খুবই দরকার, এর বেশি পাওয়া লাম্পট্য।
৬৭)বিধাতা মৌলবাদী নয়। কে প্রার্থনা করলো, কে করলো না; কে কোন তরুণীর গ্রীবার দিকে তাকালো, কোন রূপসী তার রূপের কতো অংশ দেখালো, এসব তাকে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন করে না। কিন্তু বিধাতার পক্ষে এতে ভীষণ উদ্বিগ্ন বোধ করে ভণ্ডরা।
৬৮)খুব ভেবে চিনতে মানুষ আত্মসমর্পণ করে, আর অনুপ্রাণিত মুহূর্তে ঘোষণা করে স্বাধীনতা।
৬৯)মানুষ যখন তার শ্রেষ্ঠ স্বপ্নটি দেখে তখনি সে বাস করে তার শ্রেষ্ঠ সময়ে।
৭০)এ-বদ্বীপে দালালি ছাড়া ফুলও ফোটে না, মেঘও নামে না।
৭১)অভিনেতারা সব সময়ই অভিনেতা; তারা যখন বিপ্লব করে তখন তারা বিপ্লবের অভিনয় করে। এটা সবাই বোঝে, শুধু তারা বোঝে না।
৭২)বাঙলাদেশের প্রধান মূর্খদের চেনার সহজ উপায় টেলিভিশনে কোনো আলোচনা-অনুষ্ঠান দেখা। ওই মূর্খমন্ডলিতে উপস্থাপকটি হচ্ছেন মূর্খশিরোমণি।
৭৩)বাঙলা, এবং যে-কোনো, ভাষার শুদ্ধ বানান লেখার সহজতম উপায় শুদ্ধ বানানটি শিখে নেয়া।
৭৪)পৃথিবী জুড়ে প্রতিটি নরনারী এখন মনে ক’রে তাদের জীবন ব্যর্থ; কেননা তারা অভিনেতা বা অভিনেত্রী হ'তে পারে নি।
৭৫)মৌলিকতা হচ্ছে মঞ্চ থেকে দূরে অবস্থান।
৭৬)এরশাদের প্রধান অপরাধ পরিবেশদূষণ : অন্যান্য সরকারগুলো পুরুষদের দূষিত করেছে, এরশাদ দূষিত করেছে নারীদেরও।
৭৭)বাঙালি একশো ভাগ সৎ হবে, এমন আশা করা অন্যায়। পঞ্চাশ ভাগ সৎ হ’লেই বাঙালিকে পুরস্কার দেয়া উচিত।
৭৮)বিশ্বের নারী নেতারা নারীদের প্রতিনিধি নয় ; তারা সবাই রুগ্ন পিতৃতন্ত্রের প্রিয় সেবাদাসী।
৭৯)কোন বাঙালি আজ পর্যন্ত আত্মজীবনী লেখে নি, কেননা আত্মজীবনী লেখার জন্যে দরকার সততা। বাঙালির আত্মজীবনী হচ্ছে শয়তানের লেখা ফেরেশতার আত্মজীবনী।
৮০)আজকালকার আধিকাংশ পি এইচ ডি অভিসন্দর্ভই মনে আশার আলো জ্বালায়; মনে হয় এখানেই নিহিত আমাদের শিক্ষাসমস্যা সমাধানের বীজ। প্রথম বর্ষ অনার্স শ্রেণীতেই এখন পি এইচ ডি কোর্স চালু করা সম্ভব, এতে ছাত্ররা আড়াই বছরে একটি ডক্টরেট ডিগ্রি পেতে পারে।এখানকার অধিকাংশ ডক্টরেটই স্নাতকপূর্ব ডক্টরেট; অদূর ভবিষ্যতে উচ্চ-মাধ্যমিক ডক্টরেটও পাওয়া যাবে।
৮১)সত্য একবার বলতে হয়; সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায়। মিথ্যা বারবার বলতে হয়; মিথ্যা বারবার বললে সত্য ব’লে মনে হয়।
৮২)ফুলের জীবন বড়োই করুণ। অধিকাংশ ফুল অগোচরেই ঝ’রে যায়, আর বাকিগুলো ঝোলে শয়তানের গলায়।
৮৩)ঢাকা শহরে, ক্রমবর্ধমান এ-পাগলাগারদে, সাতাশ বছর আছি। ঢাকা এখন বিশ্বের বৃহত্তম পাগলাগারদ; রাজধানি নয়, এটা পাগলাধানি; কিন্তু বদ্ধপাগলেরা তা বুঝতে পারে না।
৮৪)বদমাশ হওয়ার থেকে পাগল হওয়া অনেক মানবিক।
৮৫)পৌরানিক পুরুষেরা সামান্য অভিজ্ঞতা ভিত্তি ক‘রে অসামান্য সব সিদ্ধান্ত নিতেন। যযাতি পুত্রের কাছে থেকে যৌবন ধার ক’রে মাত্র এক সহস্র বছর সম্ভোগের পর সিদ্ধান্তে পৌছেন যে সম্ভোগে কখনো তৃপ্তি আসে না! এতো বড়ো একটি সিদ্ধান্তের জন্যে সহস্র বছর খুবই কম সময় : আজকাল কেউ এতো কম অভিজ্ঞতায় এতো বড়ো একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস করবে না।
৮৬)একজন চাষী বা নদীর মাঝি সাংস্কৃতিকভাবে যতোটা মূল্যবান, সারা সচিবালয় ও মন্ত্রীপরিষদও ততোটা মূল্যবান নয়।
৮৭)মানুষ ও কবিতা অবিচ্ছেদ্য। মানুষ থাকলে বুঝতে হবে কবিতা আছে : কবিতা থাকলে বুঝতে হবে মানুষ আছে।
৮৮)বাঙালি আন্দোলন করে, সাধারণত ব্যর্থ হয়, কখনোকখনো সফল হয়; এবং সফল হওয়ার পর মনে থাকে না কেনো তারা আন্দোলন করেছিলো।
৮৯)এদেশের মুসলমান এক সময় মুসলমান বাঙালি, তারপর বাঙালি মুসলামান, তারপর বাঙালি হয়েছিলো; এখন আবার তারা বাঙালি থেকে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি মুসলমান থেকে মুসলমান বাঙালি, এবং মুসলমান বাঙালি থেকে মুসলমান হচ্ছে। পৌত্রের ঔরষে জন্ম নিচ্ছে পিতামহ।
৯০)নিন্দুকেরা পুরোপুরি অসৎ হ’তে পারেন না, কিছুটা সততা তাঁদের পেশার জন্যে অপরিহার্য; কিন্তু প্রশংসাকারীদের পেশার জন্যে মিথ্যাচারই যথেষ্ট।
৯১)বাস্তব কাজ অনেক সহজ অবাস্তব কাজের থেকে ; আট ঘন্টা একটানা শ্রম গাধাও করতে পারে, কিন্তু একটানা এক ঘন্টা স্বপ্ন দেখা রবীন্দ্রনাথের পক্ষেও অসম্ভব।
৯২)একটি নির্বোধ তরুণীর সাথেও আধ ঘণ্টা কাটালে যে-জ্ঞান হয়, আরিস্ততলের সাথে দু-হাজার বছর কাটালেও তা হয় না।
৯৩)প্রতিটি সার্থক প্রেমের কবিতা বোঝায় যে কবি প্রেমিকাকে পায় নি, প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমের কবিতা বোঝায় যে কবি প্রেমিকাকে বিয়ে করেছে।
৯৪)বিলেতের কবিগুরু বলেছিলেন যারা সঙ্গীত ভালোবাসে না, তারা খুন করতে পারে; কিন্তু আজকাল হাইফাই শোনার সাথেসাথে এক ছুরিকায় কয়েকটি-গীতিকার, সুরকার, গায়ক/গায়িকাকে খুন করতে ইচ্ছে হয়।
৯৫)এখন পিতামাতারা গৌরব বোধ করেন যে তাঁদের পুত্রটি গুণ্ডা। বাসায় একটি নিজস্ব গুণ্ডা থাকায় প্রতিবেশীরা তাঁদের সালাম দেয়, মুদিদোকানদার খুশি হয়ে বাকি দেয়, বাসার মেয়েরা নির্ভয়ে একলা পথে
বেরোতে পারে, এবং বাসায় একটি মন্ত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৯৬)তৃতীয় বিশ্বের নেতা হওয়ার জন্যে দুটি জিনিশ দরকার : বন্দুক ও কবর।
৯৭)টেলিভিশনে জাহাজমার্কা আলকাতরার বিজ্ঞাপনটি আকর্ষণীয়, তাৎপর্যপূর্ণ; তবে অসম্পুর্ণ । বিজ্ঞাপনটিতে জালে,জাহাজে, টিনের চালে আলকাতরা লাগানোর উপকারিতার কথা বলা হয়; কিন্তু বলা উচিত ছিলো যে জাহাজমার্কা আলকাতরা লাগানোর উৎকৃষ্টতম স্থান হচ্ছে টেলিভিশনের
পর্দা, বিশেষ ক’রে যখন বাঙলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা যায়।
৯৮)রবীন্দ্রনাথ এখন বাঙলাদেশের মাটিথেকে নির্বাসিত, তবে আকাশটা তাঁর। বাঙলার আকাশের নাম রবীন্দ্রনাথ।
৯৯)গণশৌচাগার দেখলেই কেনোযেনো আমার বাঙালির আত্মাটির কথা বারবার মনে পড়ে।
১০০)আমাদের অধিকাংশের চরিত্রএতো নির্মল যে তার নিরপেক্ষ বর্ণনা দিলেও মনে হয় অশ্লীলগালাগাল করা হচ্ছে।
১০১)এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি,তুমি কথা বলো।
১০২)বিনয়ীরা সুবিধাবাদী, আর সুবিধাবাদীরা বিনয়ী।
১০৩)মোল্লারা পবিত্র ধর্মকেই নষ্ট ক’রে ফেলেছে; ওরা হাতে রাষ্ট্র পেলে তাকে জাহান্নাম ক’রে তুলবে ।
১০৪)জীবন খুবই মূল্যবান : জীবনবাদীরাযতোটা মূল্যবান মনে করে, তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। আর শিল্পকলা জীবনের থেকেও মূল্যবান।
১০৫)দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রেম ব'লে কিছু নেই। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন প্রতিটি প্রেমই প্রথম প্রেম।
১০৬)মার্ক্সবাদের কথা শুনলে এখন মোল্লারাও ক্ষেপে না, সমাজতন্ত্রের কথা তারা সন্তোষের সাথেই শোনে; কিন্তুশরীরের কথা শুনলে লম্পটরাও ধর্মযুদ্ধে নামে।
১০৭)কোন কালে এক কদর্য কাছিম দৌড়ে হারিয়েছিলো এক খরগোশকে, সে-গল্পে কয়েক হাজার ধ’রে মানুষ মুখর। তারপর খরগোশ কতো সহস্রবার হারিয়েছে কাছিমকে, সে-কথা কেউ বলে না।
১০৮)মানুষের তুলনায় আর সবই ক্ষুদ্র : আকাশ তার পায়ের নিচে,চাঁদ তার এক পদক্ষেপের দূরত্বে, মহাজগত তার নিজের বাড়ি।
১০৯)কারো প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখার উপায় হচ্ছে তার সাথে কখনো সাক্ষাৎ না করা।
১১০)চারাগাছেও মাঝেমাঝে ফোটে ভয়ংকর ফুল।
১১১)পুরুষ তার পুরুষ বিধাতার হাতে লিখিয়ে নিয়েছে নিজেররচনা; বিধাতা হয়ে উঠেছে পুরুষের প্রস্তুত বিধানের শ্রুতিলিপিকর।
১১২)হিন্দুবিধানে পুরুষ দ্বারা দূষিত না হওয়া পর্যন্ত নারী পরিশুদ্ধ হয় না!
১১৩)উচ্চপদে না বসলে এদেশে কেউ মূল্য পায় না। সক্রেটিস এদেশে জন্ম নিলে তাঁকে কোনো একাডেমির মহাপরিচালক পদের জন্যে তদ্বির চালাতে
হতো।
১১৪)সব ধরনের অভিনয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে রাজনীতি; রাজনীতিকেরা অভিনয় করে সবচেয়ে বড় মঞ্চে ও পর্দায়।
১১৫)মৌলবাদ হচ্ছে আল্লার নামে শয়তানবাদ।
১১৬)একটি ধর্মান্ধের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় আল্লা অমন লোককে পছন্দ করতে পারে না।
১১৭)ঐতিহ্য বলতে এখানে লাশকেই বোঝায়। তবে লাশ জীবনকে কিছুই দিতে পারে না।
১১৮)গাধা একশো বছর বাঁচলেও সিংহ হয় না।
১১৯)একটি আমলা আর একটা মন্ত্রীর সাথে পাঁচ মিনিট কাটানোর পর জীবনের প্রতি ঘেন্না ধ’রে গেলো; তারপর একটি চড়ুইয়ের সাথে দু-মুহূর্ত কাটিয়ে জীবনকে আবার ভালবাসলাম।
১২০)আমি ঈর্ষা করি শুধু তাদের যারা আজো জন্মে নি।
১২১)ভাবাদর্শগত জীবন হচ্ছে বন্দী জীবন। মানুষ জীবন যাপনের জন্যে জন্মেছে, ভাবাদর্শ যাপনের জন্যে জন্মে নি।
১২২)মুসলমানের মুক্তি ঘটে নি, কারণ তারা অতীত ও তাদের মহাপুরুষদের সম্পর্কে কোনো সত্যনিষ্ঠ আলোচনা করতে দেয় না।
১২২)গান্ধি দাবি করেন যে তিনি একই সাথে হিন্দু, খ্রিষ্টান, মুসলমান, বৌদ্ধ, ইহুদি, কনফুসীয় ইত্যাদি। একে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা মহৎ ব্যাপার ব’লে মনে করেছেন। কিন্তু এটা প্রতারণা, ও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ব্যাপার,- তিনি নিজেকে ক’রে তুলেছেন সব ধরনের খারাপের সমষ্টি। এমন প্রতারণা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে বাবরি মসজিদ উপাখ্যানের। তিনি যদি বলতেন আমি হিন্দু নই, খ্রিস্টান নই, মুসলমান নই, বৌদ্ধ নই, ইহুদি নই, কনফুসীয় নই; আমি মানুষ, তাহলে বাবরি মসজিদ উপখ্যানের সম্ভাবনা অনেক কমতো।
১২৩)ভারতীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের আধুনিক উৎস মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধি।
১২৪)সতীচ্ছদ আরব পুরুষদের জাতীয় পতাকা।
১২৫)পাপ কোনো অন্যায় নয়, অপরাধ অন্যায়। পাপ ব্যক্তিগত, তাতে সমাজের বা অন্যের, এমনকি পাপীর নিজেরও কোনো ক্ষতি হয় না; কিন্তু অপরাধ সামাজিক, তাতে উপকার হয় অপরাধীর, আর ক্ষতি হয় অন্যের বা সমাজের।
১২৬)সবচেয়ে হাস্যকর কথা হচ্ছে একদিন আমরা কেউ থাকবো না।
১২৭)পৃথিবীতে যতোদিন অন্তত একজনও প্রথাবিরোধী মানুষ থাকবে, ততো দিন পৃথিবী মানুষের।
১২৮)সক্রেটিস বলেছেন তিনি দশ সহস্র গর্দভ দ্বারা পরিবৃত। এখন থাকলে তিনি ওই সংখ্যার ডানে কটি শূন্য যোগ করতেন?
১২৯)বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিনত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে।
১৩০)নজরুলসাহিত্যের আলোচকেরা সমালোচক নন, তাঁরা নজরুলের মাজারের খাদেম।
১৩১)ভ্রষ্ট বাঙালিকে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উপায় তার গালে শক্ত ক’রে একটি চড় কষিয়ে দেয়া।
১৩২)ভিখিরির জীবন মহৎ উপন্যাসের বিষয় হ'তে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানদের জীবন সুখপাঠ্য গুজবনামারও অযোগ্য।
১৩৩)বাঙালির জাতিগত আলস্য ধরা পড়ে ভাষায়। বাঙালি ‘দেরি করে’, ‘চুরি করে’, 'আশা করে', এমনকি ‘বিশ্রাম করে’; বিশ্রামও বাঙালির কাছে কাজ।
১৩৪)বাঙালি অভদ্র, তার পরিচয় রয়েছে বাঙালির ভাষায়। কেউ এলে বাঙালি জিজ্ঞেস করে, ‘কী চাই?’ বাঙালির কাছে আগন্তুকমাত্রই ভিক্ষুক। অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে বাঙালি বলে, ‘দাঁড়ান’; বসতে বলার সৌজন্যটুকুও বাঙালির নেই।
১৩৫)এখানে সাংবাদিকতা হচ্ছে নিউজপ্রিন্ট-বলপয়েন্ট-মিথ্যার পাচঁন।
১৩৬)মানুষ মরণশীল, বাঙালি অপমরণশীল।
১৩৭)এ-সরকার মাঝে মাঝে গোপন চক্রান্ত ফাঁস ক'রে ফেলে। সরকার মাটি আর মানুষের সমন্বয় ঘটানোরসংকল্প ঘোষণা করেছে। আমি ভয় পাচ্ছি, কেননা মাটি ও মানুষের সমন্বয় ঘটে শুধু কবরে।
১৩৮)বাঙলাদেশের রাজনীতিকেরা স্থূল মানুষ, তারা সৌন্দর্য বোঝে না ব'লে গণতন্ত্রও বোঝে না; শুধু লাইসেন্স-পারমিট-মন্ত্রীগিরি বোঝে।
১৩৯)এমন এক সময় আসে সকলেরই জীবনে যখন ব্যর্থতাগুলোকেই মনে হয় সফলতা, আর সফলতাগুলোকে মনে হয় ব্যর্থতা।
১৪০)রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পুর্ণ বিপরীত বস্তু ; একটি ব্যাধি অপরটি স্বাস্থ্য।
১৪১)মহিলাদের ঘ্রাণশক্তি খুবই প্রবল। আমার এক বন্ধুপত্নী স্বামীর সাথে টেলিফোনে আলাপের সময়ও তার স্বামীর মুখে হুইস্কির ঘ্রাণ পান।
১৪২)আগে প্রতিভাবানেরা বিদেশ যেতো; এখন প্রতিভাহীনেরা নিয়মিত বিদেশ যায়।
১৪৩)অধিকাংশ সুদর্শন পুরুষই আসলে সুদর্শন গর্দভ; তাদের সাথে সহবাসে একটি দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর সাথে সহবাসের অভিজ্ঞতা হয়।
১৪৪)পৃথিবী জুড়ে সমাজতন্ত্রের সাম্প্রতিক দুরবস্থার সম্ভবত গভীর ফ্রয়েডীয় কারণ রয়েছে। সমাজতন্ত্রের মার্ক্সীয়, লেলিনীয়, স্তালিনীয় আবেদন ছিলো,কিন্তু যৌনাবেদন ছিলো না।
১৪৫)স্বার্থ সিংহকে খচ্চরে আর বিপ্লবীকে ক্লীবে পরিণত করে।
১৪৬)অপন্যাস হচ্ছে সে-ধরনের সাহিত্য, যা বছরেলাখ টন উৎপাদিত হ’লেও সাহিত্যের কোনো উপকার হয় না; আর আধ কেজি উৎপাদিত না হ’লেও
কোনো ক্ষতি হয় না।
১৪৭)আঠারো তলা টাওয়ারের থেকে শিশিরবিন্দু অনেক উঁচু। চিরকাল শিশিরবিন্দুর পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু অনেক টাওয়ারের চুড়োয় উঠেছি।
১৪৮)সৎ মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গ, আর সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।
১৪৯)বিপ্লবীদের বেশি দিন বাঁচা ঠিক নয়। বেশি বাঁচলেই তারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
১৫০)পুঁজিবাদী পর্বের সবচেয়ে বড়ো ও জনপ্রিয় কুসংস্কারের নাম প্রেম।
১৫১)পৃথিবীতে রাজনীতি থাকবেই। নইলে ওই অপদার্থ অসৎ লোভী দুষ্ট লোকগুলো কী করবে?
১৫২)ক্ষমতায় যাওয়ার একটিই উপায়; সমস্যা সৃষ্টি করা। সমস্যা সমাধান ক’রে কেউ ক্ষমতায় যায় না, যায় সৃষ্টি ক'রে।
১৫৩)পশু আর পাখিরাই মানবিক।
১৫৪)অন্যদের কাহিনীর ক্ষীণ সূত্র নিয়ে হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ লেখা, আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী কেটে কেটে, নষ্ট ক'রে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। অন্যের কাহিনীসূত্র নিয়ে হ্যামলেট লেখা মানবপ্রজাতির একজনের বিস্ময়কর প্রতিভার লক্ষণ, আর বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী ছিঁড়ে সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি চিত্রগ্রহণদক্ষতার পরিচায়ক। আরেকটি উৎকৃষ্টতর হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ, বা মেঘনাদবধ মানুষের ইতিহাসে আর লেখা হবে না; কিন্তু সত্যজিতের পথের পাঁচালীর থেকে উৎকৃষ্ট পথের পাঁচালী হয়তো তৈরি হবে আগামী দশকেই।
১৫৫)সত্যজিত যদি ভারতরত্ন হন, তবে বিভূতিভূষণ বিশ্বরত্ন, সভ্যতারত্ন; কিন্তু অসভ্য প্রচারের যুগে মহৎ বিভূতিভূষণকে পৃথিবী কেনো ভারতও চেনে না, চেনে গৌণ সত্যজিৎকে।
১৫৬)শিল্পীর কতোটা স্বাধীনতা দরকার ? নির্বোধেরা মনে করে এবং দাবি করে যে শিল্পীর দরকার অবাধ স্বাধীনতা। যেনো শিল্পীকে সমাজরাষ্ট্র অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে দেবে, আর সে মনের আনন্দে শিল্পকলা সৃষ্টি ক'রে চলবে। এটা শিল্পকলা ও স্বাধীনতা সম্পর্কে এক মর্মস্পর্শী ভ্রান্তি। সত্য এর বিপরীত। সাধারণ মানুষের থেকে একবিন্দুও বেশি স্বাধীনতা শিল্পীর দরকার নয়; সাধারণ মানুষেরই দরকার অবাধ স্বাধীনতা, কেননা তার স্বাধীনতা সৃষ্টি করতে পারে না। শিল্পীর কোনো দরকার পড়ে না দিয়ে দেয়া স্বাধীনতার, কেননা শিল্পীর কাজই স্বাধীনতা সৃষ্টি করা, আর স্বাধীনতা সৃষ্টি করার প্রথাগত নাম হচ্ছে শিল্পকলা।
১৫৭)মানুষ মরলে লাশ হয়, সংস্কৃতি মরলে প্রথা হয়।
১৫৮)ক্ষমতায় থাকার সময় যারা সত্য প্রকাশ করতে দেয় না, ক্ষমতা হারানোর পর তারা অজস্র মিথ্যার প্রকাশ রোধ করতে পারে না।
১৫৯)আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে।
১৬০)পৃথিবীর প্রধান বিশ্বাসগুলো অপবিশ্বাস মাত্র। বিশ্বাসীরা অপবিশ্বাসী।
১৬১)শয়তানই আজকাল আল্লা আর ঈশ্বরের নাম নিচ্ছে প্রাণ ভ’রে। আদিম শয়তান আর যাই হোক রাজনীতিবিদ ছিলো না, কিন্তু শয়তান এখন রাজনীতি শিখেছে; আল্লা আর ঈশ্বর আর জেসাসের নামে দিনরাত শ্লোগান দিচ্ছে।
১৬২)আমার লেখার যে-অংশ পাঠককে তৃপ্তি দেয়, সেটুকু বর্তমানের জন্যে; আর যে-অংশ তাদের ক্ষুব্ধ করে সেটুকু ভবিষ্যতের জন্য।
১৬৩)পৃথিবীতে একটি মাত্র দক্ষিনপন্থী সাম্যবাদী দল রয়েছে। সেটি আছে বাঙলাদেশে।
১৬৪)আমাদের প্রায়-প্রতিটি মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকের ভেতরে একটি ক’রে মৌলবাদী বাস করে। তারা পান করাকে পাপ মনে করে, প্রেমকে গুনাহ্ মনে করে, কিন্তু চারখান বিবাহকে আপত্তিকর মনে করে না।
১৬৫)শ্রেষ্ঠ মানুষের অনুসারীরাও কতোটা নিকৃষ্ট হ'তে পারে চারদিকে তাকালেই তা বোঝা যায়।
১৬৭)ঋষি রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখলে বাল্যকাল থেকেই তাঁর জন্মাব্দ ১৮৬১র আগে দুটি বর্ণ যোগ করতে আমার ইচ্ছে হয়। বর্ণ দুটি হচ্ছে খ্রিপূ।
১৬৮)বাঙলার প্রতিটি ক্ষমতাধিকারী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ দুর্বৃত্তদের সংঘ।
১৬৯)কবিতা এখন দু-রকম: দালালি, ও গালাগালি।
১৭০)বাঙলাদেশের সাহিত্যে আধুনিকতাপর্বের পর কি আসবে আধুনিকতা-উত্তর-পর্ব ? না। আসতে দেখছি গ্রাম্যতার পর্ব।
১৭১)পাকিস্থানের ইতিহাস ঘাতক আর শহীদদের ইতিহাস। বাঙলাদেশের ইতিহাস শহীদ আর ঘাতকদের ইতিহাস।
১৭২)বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর পাশে সত্যজিতের চলচিত্রটি খুবই শোচনীয় বস্তু, ওটি তৈরি না হ’লেও ক্ষতি ছিলো না; কিন্তু বিভূতিভূষণ যদি পথের পাঁচালী না লিখতেন, তাহলে ক্ষতি হতো সভ্যতার।
১৭৩)সৌন্দর্য যেভাবেই থাকে সেভাবেই সুন্দর।
১৭৪)শরীরই শ্রেষ্ঠতম সুখের আকর। গোলাপের পাপড়ির ওপর লক্ষ বছর শুয়ে থেকে, মধুরতম দ্রাক্ষার সুরা কোটি বছর পান ক’রে, শ্রেষ্ঠতম সঙ্গীত সহস্র বছর উপভোগ ক’রে যতোখানি সুখ পাওয়া যায়, তার চেয়ে অর্বুদগুণ বেশি সুখ মেলে কয়েক মুহূর্ত শরীর মন্থন ক’রে।
১৭৫)মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে দুটি তত্ত্ব রয়েছে : অবৈজ্ঞানিকটি অধঃপতনতত্ত্ব,
বৈজ্ঞানিকটি বিবর্তনতত্ত্ব। অধঃপতনতত্ত্বের সারকথা মানুষ স্বর্গ থেকে অধঃপতিত। বিবর্তনতত্ত্বের সারকথা মানুষ বিবর্তনের উৎকর্ষের ফল। অধঃপতনবাদীরা অধঃপতনতত্ত্বে বিশ্বাস করে; আমি যেহেতু মানুষের উৎকর্ষে বিশ্বাস করি, তাই বিশ্বাস করি বিবর্তনতত্ত্বে। অধঃপতন থেকে উৎকর্ষ সব সময়ই উৎকৃষ্ট।
১৭৬)শোনা যায় পুরোনো কালে ঘটতো নানা অলৌকিক ঘটনা, তবে পুরোনো কালের অলৌকিক ঘটনাগুলো বানানো বা ভোজবাজি। প্রকৃত অলৌকিক ঘটনার কাল হচ্ছে বিশশতক। পুরোনো কালের কোনো মোজেজ লাঠিকে সাপ বানাতে, বা সমুদ্রের উপর সড়ক তৈরি করতে পারতেন- ক্ষণিকের জন্যে। ওগুলো নিম্নমানের যাদু। সত্য স্থায়ী অলৌকিকতা সৃষ্টি করতে পেরেছে শুধু বিশশতকের বিজ্ঞান। বিদুৎ, বিমান, টেলিভিশন, কম্পিউটার,নভোযান, এমনকি সামান্য শেলাইকলটিও অতীতের যে-কোনো অলৌকিক ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি অলৌকিক। বিজ্ঞান অলৌকিকতাকে সত্যে পরিণত করেছে ব’লে গাধাও তাতে বিষ্মিত হয় না, কিন্তু পুরোনো তুচ্ছ অলৌকিকতার কথায় সবাই বিহ্বল হয়ে ওঠে।
১৭৭)পুরোনো কালের মানুষ যদি দৈবাৎ একটি টেলিভিশনের সামনে এসে পড়তো, তাহলে তাকে দেবতা মনে ক’রে পুজো করতো। আজো সেই পুজো চলতো।
১৭৮)ধর্মের কাজ মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা; তাই এক ধার্মিকের রক্তে সব সময়ই গোপনে শানানো হ’তে থাকে অন্য ধার্মিককে জবাই করার ছুরিকা।
১৭৯)ধার্মিক কখনোই সম্পুর্ন মানুষ নয়, অনেক সময় মানুষই নয়।
১৮০)মৃত সিংহের থেকে জীবিত গাধাও কতো জোতির্ময় উজ্জ্বল !
১৮১)আমার অনুরাগীরা চরম অনুরাগ প্রকাশের সময় খুব আবেগভরে বলেন যে আমার মতো পণ্ডিত ও প্রতিভাবান লোক আর নেই; তাই আমার অনেক কিছুই হওয়া উচিত। যেমন অবিলম্বে আমার হওয়া উচিত কোনো একাডেমির মহাপরিচালক, বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ইত্যাদি।শুনে আমি তাঁদের ও নিজের জন্যে খুব করুণা বোধ করি। আমি হ'তে চাই মহৎ, আর অনুরাগীরা আমাকে ক'রে তুলতে চান ভৃত্য।
১৮২)আপনি যখন হেঁটে যাচ্ছেন তখন গাড়ি থেকে যদি কেউ খুব আন্তরিকভাবে মিষ্টি হেসে আপনার দিকে হাত নাড়ে, তখন তাকে বন্ধু মনে করবেন না। মনে করবেন সে তার গাড়িটার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ ক'রে আপনাকে কিছুটা পীড়ন ক'রে সুখী হ'তে চায়।
১৮৩)শিশু, সবুজ, তরুণীরা আছে ব’লে বেঁচে থাকা আজো আমার কাছে আপত্তিকর হয়ে ওঠে নি।
১৮৪)টাকাই অধিকাংশ মানুষের একমাত্র ইন্দ্রিয়।
১৮৫)বাঙলার বিবেক খুবই সন্দেহজনক। বাঙলার চুয়াত্তরের বিবেক সাতাত্তরে পরিণত হয় সামরিক একনায়কের সেবাদাসে।
১৮৬)বাঙলাদেশ অমরদের দেশ। এ-দেশের প্রতি বর্গমিটার মাটির নিচে পাঁচ জন ক’রে অমর ঘুমিয়ে আছেন।
১৮৭)একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার; কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।
১৮৮)গত দু-শো বছরে গবাদিপশুর অবস্থার যতোটা উন্নতি ঘটেছে নারীর অবস্থার ততোটা উন্নতি ঘটে নি।
১৮৯)মসজিদ ভাঙে ধার্মিকেরা, মন্দিরও ভাঙে ধার্মিকেরা, তারপরও তারা দাবি করে তারা ধার্মিক, আর যারা ভাঙাভাঙিতে নেই তারা অধার্মিক বা নাস্তিক।
১৯০)মসজিদ ভাঙলে আল্লার কিছু যায় আসে না, মন্দির ভাঙলে ভগবানের কিছু যায় আসে না; যায় আসে শুধু ধর্মান্ধদের। ওরাই মসজিদ ভাঙে, মন্দির ভাঙে।
১৯১)মসজিদ তোলা আর ভাঙার নাম রাজনীতি, মন্দির ভাঙা আর তোলার নাম রাজনীতি। কিন্তু ওরা তাকে চালায় ধর্মের নামে।
১৯২)মসজিদ ও মন্দির ভাঙার সময় একটি সত্য দীপ্ত হয়ে ওঠে যে আল্লা ও ভগবান কতো নিষ্ক্রিয়, কতো অনুপস্থিত।
১৯৩)জীবনের সারকথা কবর।
১৯৪)শাড়ি প’রে শুধু শুয়ে থাকা যায়; এজন্যে বাঙালি নারীদেরহাঁটা হচ্ছে চলমান শোয়া।
১৯৫)শাশ্বত প্রেম হচ্ছে একজনের শরীরে ঢুকে আরেকজনকে স্বপ্ন দেখা।
১৯৬)প্রেম হচ্ছে নিরন্তর অনিশ্চয়তা; বিয়ে ও সংসার হচ্ছে চূড়ান্ত নিশ্চিন্তির মধ্যে আহার, নিদ্রা, সঙ্গম, সন্তান, ও শয়তানি।
১৯৭)মধ্যবিত্ত পতিতাদের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তারা পতিতার সুখ ও সতীর পূণ্য দুটিই দাবি করে।
১৯৮)ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর হাতে লেখা বিজিতের নামে একরাশ কুৎসা।
১৯৯)এখানে কোনো কিছু সম্পর্কে কিছু লেখাকে মনে করা হয় গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ। গাধা সম্পর্কে আমি একটি বই লিখেছি, অনেকে মনে করেন আমি গাধার প্রতি যারপরনাই শ্রদ্ধাশীল। গরু সম্পর্কে আমি একটি বই লিখেছি, অনেকে মনে করেন গরুর প্রতি আমি প্রকাশ করেছি আমার অশেষ শ্রদ্ধা। নারী সম্পর্কে আমি একটি বই লিখেছি। একটি পার্টটাইম পতিতা, যার তিনবার হাতছানিতেও আমি সাড়া দিই নি, অভিযোগ করেছেন, নারী সম্পর্কে বই লেখার কোনো অধিকার আমার নেই, যেহেতু আমি পতিতাদের শ্রদ্ধা করি না, অর্থাৎ তাদের হাতছানিতে সাড়া দিই না।
২০০)পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা।(সংগ্রহীত)

Tuesday, January 5, 2016

নক্ষত্রের বর্জই প্রানের পওন!

হাজার বছর ধরে মানুষ রাতের ঝলমলে আকাশ দেখে বিস্মিত হয়েছে আর মুগ্ধ নয়নে ভেবেছে বহুদুরের ঝুলন্ত আলোক বিন্দু নিয়ে। আকাশের বুকে জ্বলজ্বলে এই ঝুলন্ত বিন্দুই হলো তারা বা নক্ষত্র। তখনকার দিনে নক্ষত্র মানুষের মনে ঐশ্বরিক চিন্তার যোগান দিত, এমনকি নক্ষত্রদের মাধ্যমে নাবিকরা সমুদ্রে দিক ঠিক করতো। যদিও নক্ষত্র কি, কিভাবে এদের উৎপত্তি – এসব সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা ছিলনা। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আজ নক্ষত্রদের সম্পর্কে জানার তেমন কিছু বাকি নাই। মজার বিষয় হলো, নক্ষত্ররা নিষ্প্রাণ হলেও অনেকটা জীবিত; এদের জন্ম হয় এবং জীবন শেষে মৃত্যুবরন করে।

মহাবিশ্বে প্রাচুর্যতার দিক দিয়ে নক্ষত্ররাই সবথেকে এগিয়ে। নক্ষত্র হলো সৌরজগতের শক্তি এবং আলোর মুল উৎস। নক্ষত্রগুলো অনেকটা আজকের দিনের পারমানবিক চুল্লির মত, এদের কেন্দ্রেই উৎপন্ন হয় জীবন গঠনের যত প্রয়োজনীয় মৌল। মহাবিশ্ব যদি নক্ষত্রশুন্য হতো তাহলে কোন প্রানের উৎপত্তি হতোনা। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত সুর্য কিন্তু আদতে একটা নক্ষত্র।

নক্ষত্রের জন্মকথা

মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে বহুপ্রকার গ্যাস এবং ধূলিকণা। স্থান বিশেষ এই গ্যাস এবং ধূলিকণার অনুপাত বা পরিমান কমবেশি হয়ে থাকে। বিশেষ কিছু জায়গায় ধূলিকণার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি থাকে, এরকম জায়গাকে নেবুলা বলে। যখন কোন ভারী বস্তু নেবুলার পাশ দিয়ে যায় অথবা কাছাকাছি কোন সুপারনোভা বিষ্ফোড়ন ঘটে তখন তার মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নেবুলা সঙ্কুচিত হতে থাকে। এই সঙ্কোচনের ফলে নেবুলার অভ্যন্তরে অবস্থিত গ্যাস এবং ধূলিকণা কেন্দ্রে জড়ো হতে থাকে এবং শিশু নক্ষত্র গঠন করে, যাকিনা অনেকটা নক্ষত্রের মত কিন্তু অতবেশি ঘনত্বের নয়। মহাকর্ষের প্রভাবে শিশু নক্ষত্রটি আরো সঙ্কুচিত হয় এবং অধিক পরিমাণ ধূলিকণা এর সাথে যোগ হতে থাকে ফলে এর ভর ও ঘনত্ব দুটোই বেড়ে যায়। ভর ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে। এভাবে যখন ভর এবং তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে তখন নক্ষত্রটির কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হয় এবং নক্ষত্রটি পরিনত হয়। এটা নক্ষত্রের প্রথম পর্যায় এবং একে মেইন সিকুয়েন্স ফেজ বা মেইন সিকুয়েন্স নক্ষত্র বলে। নক্ষত্রদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটে এই ধাপে। উল্লেখ্য যে আমাদের সুর্য এখনো এ পর্যায়ে আছে।

নক্ষত্রের বিবর্তনঃ-

কালো বামন বলে।

এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিল কিন্তু উক্ত তারার ভর যদি অস্বাভাবিক রকম বেশি হয় তাহলে তারাটি খুব দ্রুত গতিতে চুপশে যাবে ফলে ভয়ংকর রকমের বিষ্ফোড়ন ঘটবে। একে সুপারনোভা বিষ্ফোড়ন বলে। তারাটির ভর যদি আমাদের সুর্যের ভরের ১.৪ গুন বেশি হয়, তাহলে এটি বিষ্ফোড়নের পরেও সঙ্কুচিত হতে থাকবে এবং নিউট্রন তারায় রুপান্তরিত হবে। কিন্তু যদি তারাটির ভর আমাদের সুর্যের ৩ গুন বা তার বেশি হয়, তাহলে এর সঙ্কোচনের হার এতোবেশি হবে যে তারাটির মধ্যকার সমস্ত পদার্থ একটি বিন্দুতে জড়ো হবে এবং বলতে গেলে এটা মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে। সবশেষে থাকবে অসীম মহাকর্ষ বলের একটা গর্ত যেখান থেকে কোন কিছুই বের হতে পারেনা, এমনকি আলোও নয়। এটাকে তখন ব্লাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর বলে।

যাহোক, সাধারণত নক্ষত্রগুলো প্লানেটারি নেবুলা হিসাবে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রসারিত হতে থাকে এবং নিকটবর্তী কোন ভারী বস্তুর মহাকর্ষের প্রভাবে পুনরায় সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। এভাবে অসীম সংখ্যকবার চলতে থাকে নক্ষত্র সৃষ্টির মহাজাগতিক পুনর্জন্ম এবং বিবর্তন। আমাদের সৌর জগত মুলত সৃষ্টি হয়েছে এধরনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় জেনারেশনের নেবুলা থেকে। একারনে আমাদের পৃথিবী তথা সৌরজগতে বিভিন্ন হালকা ও ভারী মৌলের এতো প্রাচুর্যতা যেটা প্রানের উৎপত্তি সম্ভব করেছে। আমাদের শরীর গঠনের যাবতীয় পরামানু এসেছে নক্ষত্রের কেন্দ্রে ঘটা নিউক্লিয়ার ফিশন থেকে অথবা সুপারনোভা বিষ্ফোড়ন থেকে। এমনকি এমনো হতে পারে যে, আমার দুটি হাতের মৌল হয়তো এসেছে দুটি ভিন্ন নেবুলা থেকে। সত্যি বলতে আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান। নক্ষত্রের বর্জ্যেই আমাদের পত্তন।