Saturday, June 9, 2018

সমকামিতা জিনগত নয়? মশাই আপনার তো ডাক্তার দেখানো উচিৎ।

কেন মানুষ সমকামী বিষমকামী বা উভকামী হয় সে বিষয়টা নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে রয়েছে অনেক রকম আগ্রহ, প্রশ্ন এবং ধোয়াশা। তবে বর্তমান অবস্থায় গবেষণাগুলো মানুষের যৌনতা বুঝার ক্ষেত্রে নব জানালার উন্মেষ ঘটিয়েছে। 

সমকামিতা আদৌ জিনগত জিনা তা নিয়ে ক্রস কালচারাল প্রমাণ থেকে প্রাথমিক আলোচনা করা যাক। প্রাথমিক প্রশ্ন হতে পারে, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স জিনিসটা কী?
ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স হলো, কোনো প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কয়েকটি গবেষনা আর তার ফলাফলকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা। এরকম তুলনা করে যখন একটি সিদ্ধান্তে পৌছানো হয়, তখন বলা হয়, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স থেকে এটা প্রমানিত অমুক বিষয়টি সঠিক।
আর্কাইভ অব সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার যৌনাচারণ প্রসঙ্গে এক গবেষনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে [১]; যার শিরোনাম ছিল “যৌনতার ধাঁধা”। আলবার্ট্রার লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের [২] গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সাধারণ জেনেটিক ফ্যাক্টর, পুরুষের সমলিঙ্গে যৌনতা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।[৩]
উত্তর মেক্সিকোর প্রাচীন সম্প্রদায় আছে যাদেরকে বলা হয় জাপোটেক (Zapotec) সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে দেখা যায় তারা পুরুষের প্রতি যৌনতাড়িত হয়। তারা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবেও বিবেচিত: তাদের মধ্যে যারা আচরণগতভাবে পুরুষ প্রকৃতি প্রদর্শন করে তারা পরিচিত মুক্সে নুগুইও (Muxe nguiiu) নামে আর যেসব মুক্সে পুরুষ নারী আচরণ প্রদর্শন করে তারা পরিচিত মুক্সা গুনাহ (muxe gunaa) নামে। পশ্চিম সংস্কৃতিতে তারা স্বতন্ত্র্যভাবে গে এবং রূপান্তরিত নারী হিসেবে পরিচিত হবে।
জৈবিকভাবে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের প্রতি আকর্ষণকে বলা হয় পুরুষ এণ্ড্রোফিলিয়া। এবিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে দেখা যায়। এরকম পুরুষ এণ্ড্রোফেলিয়া দেখা যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রস্তাবনা করা হয়েছে, একই মায়ের একাধিক বড় ভাই থাকার কারণকে। যেখানে বলা হয়েছে, একাধিক বড় ভাই থাকলে, ছোট ভাইয়ের সমকামী হবার সম্ভাবনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। পুরুষের বড় ভাই থাকার সাথে তার সমকামিতার কী সম্পর্ক তা বিস্তৃতপরিসরে জানতে বিজ্ঞানযাত্রায় প্রকাশিত আর্টিকেল পড়তে পারেন (ক) এবিষয়টি পাশ্চাত্য [৪] আর সামোয়া সংস্কৃতি[৫] উভয়তেই সুস্পষ্টরূপে দেখা যায়।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সমকামী ও বিষমকামীদের তুলনা করলে একটা অদ্ভুৎ ফলাফল দেখা গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, সমকামীরা তাদের প্রিয় মানুষ গুলো থেকে, তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কায় ভুগেন। এ আশঙ্কার হার বিষমকামীদের চেয়ে তুলনামুলক বেশি[৬] সামোয়া দ্বীপে গবেষনায় দেখা গিয়েছে, তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত ফাফাফাইন, যারা জৈবিক ভাবে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তারা শৈশবে সামোয়ার বিষমকামীদের তুলনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেশি ভুগে।[7] বিবর্তনের গতিপ্রক্রিয়ায় কেন সমকামিতা বিলুপ্ত হলো না, তা বিস্তৃতপরিসরে অনুবাদ হিসেবে রুপবান ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।(খ) পশ্চিমা এবং সামোয়া উভয় সংস্কৃতিতে এই প্যাটার্ন পাওয়ার পর গবেষকরা একেবারে ভিন্ন সংস্কৃতির দিকে নজর দেন। মেক্সিকোর ওয়াস্কা রাজ্যে তারা গবেষনা করেন।
১৪১ জন বিষমকামী নারী, ১৩৫ জন বিষমকামী পুরুষ এবং ১৭৮ জন মুক্সের (৬১ জন মুক্সে নুগুইয়ু এবং ১১৭ জন মুক্সে গুনা) উপর গবেষনা করা হয়। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সে তাদের দুশ্চিন্তা, বিভিন্ন মর্মবেদনা কেমন ছিল তা নিয়েই প্রশ্ন করা হয়।
বিষমকামীদের সাথে তুলনা করার পর দেখা গিয়েছে মুক্সেদের শৈশবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তুলনামুলক উচ্চতর। একই বিষয় দেখা গিয়েছে কানাডা ও সামোয়ার সমকামীদের (গে) মধ্যে। সমকামী নারীরা যাদের মেক্সিকোয় মুক্সে গুনা বলা হয়, তারাও সমান্তরাল উদ্বিগ্নতায় ভুগেছে, বলে গবেষেনা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
এ ফলাফলগুলোর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বিবেচনা করলে, সামাজিক অবস্থাকে এখানে ধর্তব্যের মধ্যে আনা যাবে না, কারণ পুর্বোক্ত গবেষনা দেখিয়েছে, এই উদ্বিগ্নতার বিষয়টি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রবাহিত হয়, যা শিশুর স্বভাবে পরবর্তীতে প্রকট হয় [৮]। যাইহোক, জৈব মেকানিজম, এ প্রসঙ্গে আরেকটি ভিন্ন বিষয় জানিয়েছে, তা হলো নারীত্বসুচক হরমোন (female typical sex steroid hormone) জন্মপুর্ব ক্রমবিকাশমান থেকেই সক্রিয় হয়ে পুরুষ মস্তিষ্ককে নারীর মত গঠন করে, এবং যৌন অভিমুখিতা তৈরী করে, যা উদ্বিগ্নতা ও অনুরক্ততাকে প্রভাবিত করে। [৯] এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, সমকামিতার সাথে উদ্বিগ্নতার একটা সংযোগ আছে, আর উভয়ের সাথে কমন ফ্যাক্টর হরমোনের সংযোগ আছে।
তবে এসবকিছুর উপরে আরো একটি পর্যবেক্ষণ আছে, তা হলো, আনবিক জিনপ্রকৌশল থেকে দেখা গিয়েছে এক্স ক্রোমোজমের শীর্ষে অবস্থিত এক্সকিউ২৮ উদ্বিগ্নতার[১০] বহিঃপ্রকাশ এবং পুরুষ অনুরক্ততায়[১১] জড়িত থাকে। এই গবেষনা থেকে বুঝা যায় একই জিন দুই অভিব্যক্তি প্রকাশে দায়ী থাকে। জমজের উপর করা করা গবেষণা থেকে ইতোমধ্যে প্রমাণিত যে, পুরুষে সমলিঙ্গে আকর্ষণ [১২] এবং তার স্নায়ুপীড়ার জন্য (উদ্বিগ্নতা সৃষ্টিতে) জিনগত কারণ নিহিত রয়েছে।[১৩]
নিভৃতচারী সমকামী থেকে (closet gay) প্রকাশ্যে এসে জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে প্রায় সব সংস্কৃতির সমকামীরাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার একটা আশঙ্কায় ভুগে। অর্থাৎ, সমকামিতা এবং উদ্বিগ্নতা এ যেন একে অপরের পরিপুরক। আর উভয়কেই নির্ধারণ করছে কমন ফ্যাক্টর। হোক তা একইরুপ হরমোন অথবা একই জেনেটিক মার্কার।
এবার পাঠক আসা যাক, সমকামিতার সাথে প্রকৃতপক্ষে জিন আছে কি নেই, সে প্রসঙ্গে।
১৯৯০ তে ডিন হ্যামার সর্বপ্রথম সমকামিতার সাথে জেনেটিক সংযোগ আছে, এরকম এক প্রস্তাবনা করেন।[১৪] যা তৎকালীন সময়ে স্যাম্পল বায়াজ ইস্যুতে বিতর্কিত হয়। পরবর্তীতে সরকারীভাবে তদন্ত করে দেখা হয়, হ্যামার কোনো রকম ছলচাতুরী করেন নি।[১৫]
২০০৩ সালে মানব ইতিহাসে দিগন্ত সৃষ্টিকারী হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট সম্পন্ন হয়। ২০০৭ সালে এই প্রজেক্টের হেড ফ্রান্সিস এস কলিন্সের সমকামিতা [১৬] নিয়ে বলেছেন, সমকামিতার জিন আছে, তবে শুধুমাত্র জিনই কোনো আচরণ প্রকাশের জন্য শতভাগ দায়ী তা ঠিক নয়।
২০১৪ এযাবৎকালে সমকামীদের উপর করা বৃহত্তর গবেষনায় [১৭] গবেষকরা দেখেন পুরুষ সমকামিতার জন্য ৮ নং ক্রমোজমের পেরিসেন্ট্রোমিক এলাকা আর এক্সকিউ২৮ দায়ী। এই ফলাফল কিন্তু ডিন হ্যামারের গবেষনাকে সমর্থন করেছে।
২০১৭ সালের নভেম্বরে করা এপ্রসঙ্গে সর্বশেষ গবেষনা, সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটায়। এই গবেষনা প্রতিবেদন ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সমকামিতার জন্য দায়ী এরকম স্বতন্ত্র দুইটি জিন প্রাপ্তির খবর[১৮]। ২০১৭ সালের এই গবেষনা সম্বন্ধে বিস্তারিত পরিসরে পড়তে বিজ্ঞানযাত্রায় প্রকাশিত আর্টিকেল টা পড়া যেতে পারে(গ)।
এই যে এত তথ্য এত উপাত্ত এরপরেও কী আপনার মনে হয়, সমকামিতার সাথে জিনগত কোনো সংযোগ নেই? ওয়েল তাহলে কী আপনার মনে হয় না, আপনার কোনো চিকিৎসক অথবা নিদেনপক্ষে কোনো মনস্তাত্ত্বিকের কাছে যাওয়া উচিত।
তথ্যসুত্র
১) https://link.springer.com/journal/10508/46/1/page/1
২) http://people.uleth.ca/~paul.vasey/PLV/Lab.html
৩) https://link.springer.com/article/10.1007/s10508-016-0917-x
৪) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/15302549
৫) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/28261795
৬) http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0191886914001779
৭) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/27987088
৮) http://www.simonandschuster.com/books/The-Nurture-Assumption/Judith-Rich-Harris/9781439101650
৯)http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19210806
১০) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/22231481
১১) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/25399360
১২) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19172387
১৩) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19588238
১৪) http://science.sciencemag.org/content/275/5304/1251.2
১৫) https://www.newscientist.com/article/dn26572-largest-study-of-gay-brothers-homes-in-on-gay-genes/
১৬) http://educateforlife.org/homosexuality-hardwired-concludes-dr-francis-s-collins-head-human-genome-project/
১৭) https://www.cambridge.org/core/journals/psychological-medicine/article/genomewide-scan-demonstrates-significant-linkage-for-male-sexual-
১৮) https://www.nature.com/articles/s41598-017-15736-4
ক) https://bigganjatra.org/fraternal-birth-order-effect/
খ) https://roopbaan.org/2018/05/11/সমকামিতার-বিবর্তনগত-কোনো/
গ) https://bigganjatra.org/genes-for-homosexuality/
অতিরিক্ত তথ্যসুত্রঃ
https://www.scientificamerican.com/article/cross-cultural-evidence-for-the-genetics-of-homosexuality/

শেষ নাই যার।

আমি ব্যাকরণবিদ নই। তবু ধারণা করি, জ্ঞাত হওয়া থেকে জ্ঞান শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। কোন কিছু জানাকে জ্ঞান বলে। সেটা ভাল হোক বা মন্দ হোক, সবই জ্ঞান। ব্যবহারিক পরিমণ্ডলে ভাল-মন্দের হিসাব নিকাশ আসে। জ্ঞান ভাল-মন্দ নিরপেক্ষ। কিভাবে এই জ্ঞানের জন্ম হয়? একজন দার্শনিক বা এপিষ্টেমোলজিস্ট তার জ্ঞানগর্ভ তত্ত্বালোচনার মাধ্যমে এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন। আমি দার্শনিকও নই। আমি এই প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করবো নিজস্ব পঠন, অধ্যয়ন, চিন্তন ও অভিজ্ঞতার আলোকে।
প্রকৃতি অসীম তথ্যের আধার। মানুষ যখন সেই তথ্যসমূহ নিজেদের জন্যে আহরণ করে কেবল তখনই তা জ্ঞানে পরিণত হয়। তারমানে সেই অর্থে প্রকৃতি জ্ঞানী নয়, শুধুমাত্র তথ্যের আধার। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কখন প্রকৃতির তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য আহরণ করে বা জ্ঞান আহরণ করে? মানুষের মস্তিষ্কে প্রকৃতি এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছে, যার ফলে তাকে জ্ঞান আহরণ করা লাগে। মানুষের কৌতূহল, প্রয়োজন ও প্যাশান বা প্রেমই হলো সেইসব প্রকৃতি প্রদত্ত গুণপনা, যার কারণে সে জ্ঞানার্জনে সক্রিয় হয়। শুধু জ্ঞান অর্জন করলে বা কাঁচা তথ্য সংগ্রহ করলেই তা কাজের উপযোগী বা পরিপক্ব জ্ঞান হয় না। সংগৃহীত জ্ঞানকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্যে প্রথম যে উপাদানটা লাগে তার নাম সংশয় বা সন্দেহ। যখনই তথ্যপ্রবাহ সংশয়ের ভিতর দিয়ে এগোতে থাকে, তখনই দরকার হয় মানুষের মনোদেহের আরেকটা অঙ্গের, যার নাম সুপারইগো বা র‍্যাশনালিজম। প্রস্তুত হয় দার্শনিক যুক্তিবাদীতার, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় জ্ঞান। প্রায়োগিক জ্ঞানের জন্যে আরও একধাপ এগিয়ে বাস্তব ইন্দ্রীয়গ্রাহ্যতার ভিতর দিয়ে জ্ঞানকে ভ্রমণ করা লাগে। এই ধাপের নাম বিজ্ঞান, যা বাস্তব ও পার্থিব পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও নিরীক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার হলো, পরিপক্ব জ্ঞান আসলে দুই রকমের- নান্দনিক, যার আপাততঃ ব্যবহার নেই, এবং প্রায়োগিক, যার ব্যবহার হবে বা হচ্ছে। তবে নান্দনিক জ্ঞানের ব্যবহার আজকে হচ্ছে না বলে আগামীতে হবে না সেটা হলফ করে বলা যায় না।
প্রায়োগিক ও নান্দনিক জ্ঞান যে উপায়ের মাধ্যমে নির্বাচিত ও প্রক্রিয়াজাত হয় তাকে ইণ্টিলিজেন্স বা বুদ্ধিমত্তা বলা যায়। এই বুদ্ধিমত্তাও শুধু শুধু কাজ করে না। এর জন্যেও দরকার হয় কিছু জ্বালানির। সেই জ্বালানি আসে কৌতূহল, প্রয়োজন ও প্যশান বা প্রেম থেকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মানুষের জ্ঞানার্জনের মূলে রয়েছে তার স্বার্থ। সেটা ভাল হতে পারে, মন্দও হতে পারে। স্বার্থও জ্ঞানের মতন ভাল-মন্দ নিরপেক্ষ। ব্যবহারিক পরিমণ্ডলে তার বিচার। রিচার্ড ডকিন্সের ‘সেলফিশ জিন’ শব্দগুচ্ছ এক্ষেত্রে মানুষের বেলায় সঠিক অর্থ বহন করে। জ্ঞানার্জনে প্যশান বা প্রেম একটা পরোক্ষ বা সেকেন্ডারি উপাদান। সব মানুষের ক্ষেত্রে এটা ক্রিয়াশীল নয়। প্রেম বা নেশাগ্রস্থতার অনেকাংশ জুড়ে থাকে সহজাত প্রবৃত্তি বা ইন্সটিংক্ট। সুক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রায়োগিক জ্ঞানের চেয়ে নান্দনিক জ্ঞান আহরণের ক্ষত্রে প্রেম বা প্যশান প্রাইমারি উপাদান হিসাবে আবির্ভূত হয় বেশী। তারপরেও প্রায়োগিক জ্ঞান আহরণে প্যশান বা প্রেম থাকতে হয় নির্দিষ্ট অনুপানে, সঠিক ও সুন্দরভাবে কার্য সমাধার জন্যে।

চিন্তাবিদগণ বুদ্ধিমত্তাকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন- গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা (Mathematical Intelligence), সঙ্গীতীয় বুদ্ধিমত্তা (Musical Intelligence) ও ভাষিক বুদ্ধিমত্তা (Linguistic Intelligence)। বিজ্ঞান, ও গণিতের যত শাখা প্রশাখা আছে, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, সবই গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা সিদ্ধ জ্ঞান। সাহিত্য, কলার যত প্রকারভেদ আছে, সব পড়ে লিঙ্গুইষ্টিক ইণ্টিলিজেন্সের অধীনে। সঙ্গীতীয় বুদ্ধিমত্তার ভিতরে পড়ে যত রকমের সঙ্গীত আছে পৃথিবীতে সব। মানুষের বুদ্ধিমত্তাগত অস্তিত্ব সরাসরি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়- আবেগ আর যুক্তি। বিশুদ্ধ লজিকের উপরে ভর করে যেসব প্রায়োগিক ও নান্দনিক জ্ঞান প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার মধ্যে গাণিতিক বুদ্ধিমত্তাজাত জ্ঞান সামনের সারিতে চলে আসে। আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে আমরা আবেগকে অকার্যকর একটা বিষয় হিসাবে বিবেচনা করি। আসলে বিষয়টা ঠিক তেমন নয়। আবেগও এক ধরণের লজিক বা যুক্তি অনুসরণ করে, যাকে বলা হয় ইমোশনাল লজিক বা আবেগীয় যুক্তি। আর যে বুদ্ধিমত্তার উপরে এই লজিক ভর করে প্রতিষ্ঠা পায় তার নাম আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইণ্টিলিজেন্স, সংক্ষেপে ই আই।

স্নায়ুবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের কাছে এই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। ধরা যাক, কোন কোন লোকের অগুনিত বন্ধু, বন্ধুরা আঠার মত লেগে থাকে তার সাথে, বড় কোন বৈষয়িক স্বার্থ ছাড়াই। কেন এমন হয়? ঐ লোকের দেহভাষায়, মুখের ভাষায় এমন কিছু আছে, যা অবচেতনভাবে মানুষকে কাছে টানে। এটা হতে পারে তার প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ অথবা সচেতনভাবে অর্জিত সম্পদ। একটা গান, একটা কবিতাও হতে পারে মানুষকে সাথে ধরে রাখার সার্থক উপাদান। চিন্তাবিদগণ তাই পুরা মিউজিকাল ইন্টেলিজেন্সকে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার শ্রেণিতে ফেলেছেন। উদাহরণ দেই, একটা সুপারহিট গানের লিরিক, তার ভিতরে এমন সব শব্দ, শব্দগুচ্ছ, ফ্রেজ রয়েছে যা মানুষের বিশেষ কোন আবেগের সর্বোচ্চ চুড়াকে স্পর্শ করেছে, যা শুনে শ্রোতা কেঁদেছে, হেসেছে, অথবা চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। এই গানের স্রষ্টার আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাই এই গান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, যা ছুঁয়ে গেছে শ্রোতার আবেগের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার আরও বহু প্রায়োগিক সাফল্য রয়েছে। আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা মানুষের সুখ, শান্তি ও আনন্দকে ম্যক্সিমাইজ বা সম্প্রসারিত করার ক্ষমতা রাখে, আবেগ বা ইমোশন যার কাঁচামাল। অনিয়ন্ত্রিত কাঁচা আবেগ ক্ষতিকর, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সুখ, সমৃদ্ধি ও সভ্যতা বিনির্মাণের অন্যতম উপাদান।
প্রায়োগিক বা নান্দনিক যে জ্ঞানই হোক, সেটা অর্জন করার পর জ্ঞানী মানুষটির ভিতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে সেই জ্ঞান অন্যের মস্তিষ্কে ঢেলে দেবার জন্যে। এমনও অনেক জ্ঞানীকে দেখেছি, প্রচুর সময়, গবেষণা ও শ্রম দিয়ে লেখা বই আশানুরূপ সাড়া না ফেলায় চরম হতাশায় তলিয়ে যেতে। কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন বিশ্বখ্যাত বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী জেফরি মিলার। তিনি বলছেন, মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনের পিছনে রয়েছে যৌন নির্বাচনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ও অনুপ্রেরণা। বাড়ির সামনে বড় একটা পাথর দাড়িয়ে থাকাটাই তো যথেষ্ট ছিল, কেন তাকে ঘষে মেজে একটা দর্শনীয় মূর্তিতে রূপ দেয়া হলো? এই কারণে তা করা হলো, যাতে এর মাধ্যমে মানুষ নিজেদের সুখ, আনন্দ, সমৃদ্ধি ও সভ্যতার উচ্চতাকে বাড়াতে পারে এবং সেই সাথে সাথে এর স্রষ্টার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যে আকর্ষণের মূলে কাজ করে যৌনতা। পরিশেষে এই যৌনতাই যৌন নির্বাচনের মাধ্যমে উন্নত প্রজাতি সৃষ্টিতে অবদান রাখে। প্রকৃতির মূল উদ্দেশ্য উন্নত প্রজাতি সৃষ্টি, যার মৌলিক উপাদানের নাম জ্ঞান।
জ্ঞান অর্জন করে বা সেই জ্ঞানকে প্রকাশ করে আশানুরূপ সাফল্য না পেয়ে হতাশার কিছু নেই। প্রিন্টিং মিডিয়া হোক, বা ইলেকট্রনিক বিশাল মিডিয়া হোক, ছেড়ে দিন আপনার অর্জিত জ্ঞান। কেউ না কেউ তার প্রয়োজন মত খুটে নেবে। জ্ঞান দ্বারে দ্বারে ফেরি করে না বেড়িয়ে, এটা করা অনেক ভাল। কেউ যখন জ্ঞানের মুখাপেক্ষী না হয়, তাকে জ্ঞান দিতে নেই, এটা আমার ব্যক্তিগত মত। ডিজিটাল সাইবার জগত কত যথার্থভাবে আমার সেই আইডিয়াকে রূপ দিয়েছে ভেবে অবাক হই।

এই ভাবে নিজের জ্ঞানকে ওপেন সোর্সের মাহফিজখানায় জমা দিয়ে আপনি নিজেও হতে পারেন পৃথিবীকে জ্ঞানদানকারী গর্বিত একজন। কি হবে অত নাম কাম দিয়ে? তারপরেও যদি কেউ আপনাকে খুঁজে পেয়ে কাছে আসে, প্রশংসা করে, বন্ধু হয়ে জেফরি মিলারের তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দেয় দিক, তাতে সেটা না হয় হবে উপরি পাওয়া। অনেকে বলেন, অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী। এই ধারণার সাথে আমি একমত নই। অল্পবিদ্যা যদি কাজের হয়, তবে তা অলস পড়ে থাকা বেশী বিদ্যার থেকে কল্যাণময়। অল্পবিদ্যার সমস্যাটা হলো, তা প্রকাশ হবার সময় বড্ড বিশ্রীভাবে প্রকাশ হয়। তার প্রকাশের শব্দটা বড় বেশী কানে বাজে। এছাড়া অল্পবিদ্যার আর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কেউ যখন স্বাধীন চিন্তার জগতে উড়তে শিখে যায়, সে তখন কিছুটা আন্দাজ করতে পারে জ্ঞানের সীমানা প্রাচীর আসলে কতদূর বিস্তৃত। সেই সাথে সাথে সে নিজে কতটা জানে না, সে বিষয়েও একটা ধারণা নিতে পারে। তখন সে চুপ হয়ে যায়। খালি কলস হয়ে বেশী বেশী না বেজে ভরা কলস হয়ে যায়। মুক্ত চিন্তার জগতে প্রবেশ করতে হলে অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই। যারা প্রকৃত জ্ঞানী তারা জ্ঞানার্জনের সাথে সাথে অন্যকেও এই মুক্ত চিন্তার আকাশে উড্ডয়নের পাঠ দেয় তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে। এটা তারা নিজেদের কর্তব্য বলে বিবেচনা করে।

Monday, June 4, 2018

ধর্মের প্রধান ধর্মপ্রবর্তক-ঈশ্বর ও শয়তান প্রধান স্তম্ভ!

-আরজ আলী (জুনয়ির)

ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝি, ধর্মের মূল উপাদান চারটি। যথাক্রমে- ১) ধর্মপ্রবর্তক, ২) ঈশ্বর, ৩) শয়তান এবং ৪) ঐশ্বী বাণী (গ্রন্থ)। ধর্মে বিশ্বাসী হতে হলে এ চারটি মূল উপাদানে সম্পূর্ণ ও প্রশ্নহীন বিশ্বাসী হলেই চলবে না, আমৃত্যু এবং অবশ্য-অবশ্যই হিমালয়ের ন্যায় অটল এবং গর্বিত থাকতে হবে। একবিন্দু দ্বিধা কিংবা সংশয় থাকলে স্বর্গপ্রাপ্তির আশা শেষ। যদিও সন্দেহ-সংশয়, যুক্তিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, অজানাকে জানার দুর্দমনীয় বাসনা… না থাকলে সত্য জানা সম্ভব না, ধর্মে যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জানি, তিন নম্বর (শয়তান) ছাড়া অন্য উপাদানগুলো নিয়ে ধার্মিকরা প্রশ্ন তুলবে না। তিন নম্বর নিয়ে উঠবে- “শয়তান কীভাবে ধর্মের উপাদন হলো?” মূলত শয়তান ছাড়া ঈশ্বর এবং ধর্ম দুটোই অসম্পূর্ণ, বরং এরা একে অপরের পরিপূরক। যেমন, শয়তান মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে, তা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ঈশ্বরকে ডাকে। ধর্মসৃষ্টিকারীরা হয়তো ভেবেছিলো, শয়তানের ভয়ে মানুষ ঈশ্বর এবং তাদেরকে বেশি বেশি ডাকবে! এজন্যই শয়তানকে তাদের খুব বেশি প্রয়োজন। না হলে শয়তান সৃষ্টি করতোই না। অতএব ঈশ্বর আছে, তাই শয়তানও আছে কিংবা শয়তান আছে, তাই ঈশ্বরও আছে। সেহেতু ঈশ্বর এবং শয়তান দুটোই ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কারণ (ধর্মানুসারে), এ দুটোই মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখে এবং প্রকৃতির উপর প্রভাব খাটানো ছাড়াও মানুষ দিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত যা খুশি করতে বা করাতে পারে। আবার, দু’জনেই মানুষকে নিজেদের বাধ্য রাখতে লোভ দেখায়। ঈশ্বর দেখায় স্বর্গের, শয়তান দেখায়- ধন-সম্পদ, নারী, বাড়ি, গাড়ি, ক্ষমতা, দুর্নীতি, লুটপাট… (ধর্মানুসারে নরকের)। মানুষকে লোভে ফেলতে ঈশ্বর ও শয়তানের যেন নিরন্তর যুদ্ধ চলছেই (ভালো বা খারাপ), এ থেকে মানুষের মুক্তির পথ দেখি না! জানি না, বিদ্বানগণ দেখতে বা জানতে পারছেন কিনা! এব্যাপারে ঈশ্বর ও শয়তানের ক্ষমতা প্রায় সমান সমান। যদিও ঈশ্বর এবং শয়তান দুটোই অদৃশ্য ও মারাত্মক ভাইরাস! একইসঙ্গে এ দুটো মানুষের হার্ডডিস্কের (মস্তিষ্কের) প্রচণ্ড ক্ষতি করছে!
যদিও ভালো কিংবা মন্দ, কোনটার জন্যই লোভ দেখানো অন্যায়। যেমন, ভালো ফলপ্রাপ্তির জন্য লোভ দেখানো হলেও কেউ যখন বারবার অকৃতকার্য হয়, তখন ভালোর জন্য লোভেও কাজ হয় না। উদাহরণস্বরূপ, চুরি করা মহাপাপ (নিঃসন্দেহে ভালো কথা)। কিংবা পাপ করলে স্বর্গলাভ হবে না। ধর্ম স্বর্গের লোভ দেখিয়ে চুরি বন্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু হায়! ধর্মের দেখানো লোভেই যদি চুরি বন্ধ হতো, তাহলে স্বর্গের কী প্রয়োজন ছিলো? পুরো পৃথিবীটাই তো স্বর্গ হয়ে যেতো। ভাগ্যিস পাপের ভয়ে বাঙালি চুরি বন্ধ রাখেনি, রাখলে লক্ষ লক্ষ নিরাপত্তা রক্ষি এবং তাদের পরিবারদের ভাতে মরতে হতো! যাহোক- চালাক, ধনী, পুঁজিবাদি, ক্ষমতাধর… চোরদের কথা নয়। বলছি, অতি দরিদ্ররা যখন দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে এবং বাধ্য হয়ে চুরি করে, তখনও কিন্তু স্বর্গলোভে কাজ হয় না। তেমনি কোনো জাতি যখন ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার লোভে মত্ত থাকে, তখন ধর্মের তথা স্বর্গের লোভে তা বন্ধ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং লোকদেখানো। তাছাড়া ধনাসক্তি, ক্ষমতাসক্তি… এসবের ফলাফল নগদ বা তাৎক্ষণিক আর স্বর্গের ফলাফল সম্পূর্ণটাই বাকি এবং অদৃশ্য ও অনিশ্চিত। অতএব, অদৃশ্য লোভের কারণে মানুষ কেনো নিশ্চিত প্রাপ্য ছেড়ে দেবে? যার প্রমাণ বাংলাদেশের মানুষ, এরা যেমন প্রায় শতভাগ ধার্মিক তথা স্বর্গলোভে মত্ত, তেমনি প্রায় শতভাগই দুর্নীতিপরায়ন অর্থাৎ নগদ প্রাপ্তির নেশায় মত্ত। ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ যেমনি মারাত্মক/ভয়ানক হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি ধর্মের লোভগুলোও কখনো কখনো মারাত্মক/ভয়ানক আকার ধারণ করে। ফলে ঈশ্বরের নামে যেমন ধর্মসন্ত্রাস হচ্ছে, শয়তানের নামেও (প্ররোচনায়ও) হচ্ছে। অর্থাৎ শয়তানের হুকুমে যেমন কেউ সন্ত্রাসী হয়, ঈশ্বরের হুকুমেও হয়। পরিপূরক হলেও, এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিও বটে। যদিও ধর্মানুসারে শয়তান মানুষকে দিয়ে শুধু খারাপ কাজই করায়, ঈশ্বর ভালো কাজ করায়! তথাপিও বহু খারাপ বা মানবতাবিরোধি কাজ আছে, যাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঈশ্বরেরও নির্দেশ থাকে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- শয়তান যদি ঈশ্বরের অনুসারীদের দিয়ে খারাপ কাজ করাতে পারে, তাহলে শয়তান কী ঈশ্বরের চাইতেও শক্তিশালী? অথবা ঈশ্বর যা চায়, এর বিপরীত কাজ শয়তান দ্বারা সাধিত হলে ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব থাকে কীভাবে?
যদিও ধর্মের একান্ত আবশ্যকীয় চরিত্র হলো- ধর্মসৃষ্টিকারী(রা)। তারাই শয়তান ও ঈশ্বরদের ধর্মের একান্ত ও অপরিহার্য অংশীদার বানিয়ে নিজেরা হয়েছে- সর্বাধিনায়ক। কারণ, ধর্মপ্রবর্তক ছাড়া কোনো ধর্ম আছে কী-না, জানা নেই। তাছাড়া ঈশ্বরের নামের সাথে, তাদের নাম স্মরণ করাও বাধ্যতামূলক। তবে জানি না, ধর্মসৃষ্টিকারীরা শয়তানবিহীন ধর্ম সৃষ্টি করেনি কেনো? শয়তান ছাড়া কেবল ঈশ্বর থাকলে এমন কী এমন ক্ষতি হতো? তাছাড়া ধর্মের এতো শত্রুই বা কেনো? এতো শত্রু নিয়ে কীভাবে ধর্ম অস্থির না হয়ে পারে? কারণ প্রতিটি ধর্মই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অন্য ধর্মগুলোকে শত্রু মনে করে এবং ধর্মানুসারীদের প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে শিক্ষা দেয়। শত্রু নিধনের জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে নিরন্তর প্রচারণা ও পরামর্শ দেয়। শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতেও পরামর্শ দেয়। ফলে স্ব-স্ব ধর্মশত্রু নিধনের জন্যই সৃষ্টি হচ্ছে নিত্য-নতুন ধর্মদানব কিংবা মহাদানব।
তাহলে কী ধর্মসৃষ্টিকারীদের নিজেদের এবং নিজেদের সৃষ্ট ঈশ্বরদের ক্ষমতার উপর পূর্ণ আস্থা নেই? থাকলে- ক্ষমতাময়, সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ… হয়েও মানব জাতিকে শাসন করতে এবং ভয় দেখাতে শয়তানের সাহায্য নিতে হচ্ছে কেনো? ধর্মানুসারে জগত ও জীব সৃষ্টি যদি সত্য ধরে নেই, বলতেই হয়- ধর্মসৃষ্টিকারীদের নিজেদের এবং ঈশ্বরদের কারো ক্ষমতার উপরই যেমন আস্থা নেই, তেমনি শুভবুদ্ধিও নেই। সুবুদ্ধি থাকলে অন্তত শয়তান সৃষ্টি করতো না। কেননা, ঈশ্বর সুবুদ্ধির কিংবা মঙ্গলময় এবং শয়তান কুবুদ্ধি বা অমঙ্গলের। অথচ যে মঙ্গলময়, সে নিশ্চয়ই অমঙ্গলকারীকে স্থান দেবে না। হয়তো ঈশ্বর শয়তানের কাছে পরাজিত হয়ে, ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে বা আপোষ করেছে! ফলে পৃথিবীতে কখনো শয়তানের, কখনো ঈশ্বরের রাজত্ব চলছে! নাকি ধর্মসৃষ্টিকারী কিংবা ঈশ্বর জেনেশুনে ও ইচ্ছা করেই শত্রু (শয়তান) সৃষ্টি করেছে, যেন নিজেদের দোষ শয়তানের উপর চাপাতে পারে? কারণ ধর্মানুসারে, ঈশ্বরের কথিত মঙ্গলজনক কাজ, শয়তানের অমঙ্গলজনক কাজের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত এবং বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। প্রকৃত পরোপকারী বা মঙ্গলময় কখনো শত্রু সৃষ্টি করবে না, ভুল করে করলেও চিরস্থায়ীভাবে জীবিত রাখবে না, যে/যারা কিনা তার সৃষ্টির ক্ষতি করে! তাহলে শয়তান সৃষ্টি কি, ধর্মসৃষ্টিকারীদের ইচ্ছাকৃত এবং মারাত্মক ভুল! যার খেসারত দিচ্ছে মানুষ।
তথাপিও, শয়তানকে মুক্ত রেখে অবিশ্বাসীদের জন্য নিশ্চিত নরক বানিয়েছে ধর্মসৃষ্টিকারীরা! বুঝলাম, কিন্তু অবিশ্বাসীরা কী শয়তানের চাইতেও বেশি ক্ষতিকর? তা না হলে- শয়তানকে মুক্ত রেখে অবিশ্বাসীদের নরকে পাঠানোর হুকুম এবং খুনের নির্দেশ কেনো? ধর্মসৃষ্টিকারী এবং ঈশ্বরেরা যদি খুনী হয়, এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কী আছে? শয়তানকে ভয় না করে অবিশ্বাসীদের এতো ভয়ই বা কেনো? শয়তানদের জন্য নরক নয় কেনো? মন্দ কাজ বা নিষিদ্ধ খাবার খেলে যদি মানুষের শাস্তি হয়, তাহলে- যে/যারা মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে, তাদের শাস্তি হবে না কোন যুক্তিতে? সুতরাং, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, দয়াময়, ন্যায় বিচারক ইত্যাদি উপাধির মর্যাদা কোথায়? সব মানুষের শ্রেষ্ঠ মানুষ- ধর্মসৃষ্টিকারীদের মর্যাদাই বা থাকে কীভাবে? কারণ তারা চাইলেই তো কেউই মন্দ কাজ করতে পারে না এবং অবিশ্বাসী/নাস্তিকরাও জন্ম নিতে পারে না। তাহলে? অবিশ্বাসীরা না থাকলে তো তাদের রাজত্ব আরো নিষ্কন্টক হতো- নয় কী? আর শয়তান না থাকলে তো পুরোপুরি নিরাপদে ও নিশ্চিন্তেই থাকতে পারতো। অথচ এক শয়তানই তাদের ঘুম হারাম করে চলেছে (যা আবার চিরস্থায়ী)! যাহোক, হয়তো অবিশ্বাসীদের ব্যাপারে ধর্মসৃষ্টিকারীদের জ্ঞানের অভাব আছে। তারা নাস্তিকদের ধ্বংস চাইলেও, নাস্তিকরা চায় তারা যেন নিজেদের ভুল শোধরায় এবং স্বীকার করে! কারণ ভুল স্বীকারের মধ্যে গৌরব আছে! অস্বীকার করা মানেই বহু ভুলের জন্ম দেয়া, যা তারা চিরকালই অত্যন্ত লজ্জাহীভাবে করেই চলেছে। কারণ তারা যেমন শয়তান সৃষ্টি করে নিজেদের এবং মানবজাতির মহাসর্বনাশ করছে, তেমনি অবিশ্বাসী জন্ম দিয়েও ঝঞ্জাট পোহাচ্ছে। এরূপ দ্বিচারিতার অর্থ কী? আবার অবিশ্বাসী হত্যার হুকুম দিয়েছে, শয়তানকে নয়, বরং ওগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট রাখার চিরস্থায়ী ব্যবস্থা! আর এসব বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে ধার্মিকরা (যদিও সবাই নয়), যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের সমর্থন ষ্পষ্ট। যা মারাত্মক অন্যায়। এজন্য ধর্মসৃষ্টিকারী এবং ঈশ্বরেরা নরহত্যার দায়ে দোষী। অতএব, এসব তাদের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ নয় বরং কাপুরুষতার লক্ষণ। তারা এতোই কাপুরুষ যে, অবিশ্বাসীদের সামান্যতম সমালোচনাও সহ্য হয় না, যুক্তি মানবেই না। সুতরাং যুক্তি ও ভুল স্বীকারে অবিশ্বাসীরা তাদের চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। মূলত এবিষয়ে ধর্মসৃষ্টিকারী এবং ঈশ্বরেরা সর্বশ্রেষ্ঠ স্বৈরাচার।
যাহোক, কতোজন ধার্মিকের মধ্যে আমরা নম্রতা ও শুচিতা দেখতে পাই? কতোজন আছেন, যারা শুচিশুভ্র চিত্তের? ঘরের ও শরীরের ময়লা বারবার পরিষ্কার করলেই শুচিশুভ্র হওয়া যায় না। ধর্মকর্মে বসার পূর্বে গোসল কিংবা হাতমুখ ধুয়ে ধর্মকর্ম করলেই শুচি হয়ে গেলাম… এমন দৃঢ় বিশ্বাস বোকামি ছাড়া কিছু নয়। যা বর্তমানের ধার্মিকদের মধ্যে খুবই স্পষ্ট।
যেমন কবিগুরু বলেছেন, “…পাওয়া এক জিনিস, আর সেই পাওয়া ব্যাপারটাকে বিশ্লেষণ করিয়া জানা আর এক জিনিস।” মানুষ যেমন ধর্ম, ধর্মবতার ও ঈশ্বরদের পায় বংশপরম্পরায়, মোটেও জানার মাধ্যমে নয়। পেয়েই খুশি, জানার চেষ্টা নেই, সংশয় নেই, প্রশ্ন নেই; আছে শুধু দাম্ভিকতা, গোড়ামি, পুলক, উম্মাদনা… ইত্যাদি। বিশ্লেষণ করে সত্যাসত্য খোঁজার প্রয়োজন মনে করে না। ফলে ধর্মকর্ম যেভাবে চলে, ঘুষ-দুর্নীতিও সমান তালে চলে। এর বহু উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন, পকেটে ঘুষের টাকা নিয়ে ধর্মালয়ে যেতে দেখেছি, ফিরে এসে আবার ঘুষের টাকা পকেটে পুরতে দেখেছি। অনর্গল মিথ্যা এবং ঘুরিয়ে-প্যাচিয়ে কথা বলার মানুষে সমাজ পূর্ণ। এরা ঠিক সময়মত ধর্মকর্ম করছে, অথচ ঘুষ-দুর্নীতিও সমানতালে চালাচ্ছে। এরা ধর্মের একবিন্দু-বিসর্গও ভুল করে না। তারপরেও সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও এরাই ভালো মানুষ, কারণ এরা ধার্মিক এবং ধর্মের জন্য প্রচুর খরচও করে! তাই মনে হয়, ভদ্রভাবে লুটেপুটে খাবার ও সম্মান বজায় রাখার প্রধান অস্ত্রটির নাম- ধর্ম।
জানি না, রাষ্ট্র ধার্মিক হলে মানুষের উপকার কী? হয়তো নিজেরা ধার্মিক, তাই রাষ্ট্রকেও ধার্মিক বানাতে ও রাখতে হবে! সম্ভবত, রাষ্ট্র ধার্মিক হলে- দুর্নীতিবাজ জাতির বদনাম না ঘুচলেও, আত্মগরিমা, অহংকার, মর্যাদা… ইত্যাদি বাড়ে! এবিষয়ে বিদ্বানরাই ভালো বলতে পারবেন! তবে এটা বুঝি, তখন রাষ্ট্রধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের বেশকিছু দায়িত্ব বেড়ে যায়। প্রধান দায়িত্ব- স্বধর্মের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বা সুরক্ষাসহ সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থানে রাখা। ফলে মানুষ যেমন ধর্মমাতাল, তেমনি রাষ্ট্রও ধর্মমাতাল হয়। এ রাষ্ট্রগুলো তখন স্বধর্ম রক্ষায় যতোটা আগ্রাসী, মানবাধিকার রক্ষায় ততোটা অনাগ্রহী (যা এদেশসহ বহু দেশেই বিধর্মী নির্যাতন, বিতাড়ন, জমি/বাড়ি দখল, ধর্ষণ, লুটপাটে… প্রমাণিত)। এছাড়াও পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সর্বত্রই ধর্ম ঢুকিয়ে বিধর্মীদের তা শুনতে/জানতে বাধ্য করে। রাষ্ট্র তার ধর্মের প্রতি একপেশে সমর্থন, প্রয়োজনে কঠিন আইন প্রয়োগ করে, যাতে বিধর্মী/নাস্তিকরা কোণঠাসা হতে বাধ্য। ফলে সংখ্যাগুরু সমপ্রদায়ের অশিক্ষিত, শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, পণ্ডিত… পর্যন্ত প্রায় সকলেই অন্যরকম এক অনুভূতিতে মত্ত থাকে, যার নাম দেয়া যেতে পারে- ধর্মোম্মাদনা বা ধর্মমাতাল। কথিত এ উম্মাদনায় সামান্যতম আঘাত লাগলেই উগ্রতা হিমালয় ছাড়িয়ে যায়। আর যদি বিশেষ কেউ (ধর্মব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সমাজপতি…) তা উষ্কে দেয় তাহলে তো কথাই নেই, প্রলয়ংকারী তান্ডব শুরু হয় পুরো রাষ্ট্র জুড়ে (যার অজস্র ছোট-বড় প্রমাণ আছে এবং যা চলমান)। বেশি বড় রকমের অপবাদ কিংবা আঘাত লাগলে, তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য স্বধর্মী রাষ্ট্র্রগুলোতেও। দুঃখের বিষয়, মানবানুভূতিতে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আঘাত লাগলেও কিন্তু এরা উম্মাদ কেনো, বেশিরভাগই সাধারণ প্রতিবাদটুকুও করে না। তথাপিও রাষ্ট্র ও সমাজ ওইসব পুরানো বিশ্বাসকেই বাঁচিয়ে রাখতে মরিয়া। কারণ শুধুমাত্র ধর্মজীবিরাই নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের নেতারা ধর্মের কাছ থেকে যেসব বৈধ-অবৈধ এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুযোগ-সুবিধা পায়, তা অন্য কোনো কিছু থেকে পায় না। যদিও ধর্মরাষ্ট্রের নাগরিকরা নীতি-নৈতিকতায় পৃথিবীর সবচাইতে বেশি সৎ তথা সুনাগরিক হওয়ার কথা! কিন্তু ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে এর ১% সুফলও কী দেখতে পাই? নাকি উল্টা কিছু দেখতে পাই?
অথচ অতি অল্পসংখ্যক যারা ধর্ম বিশ্বাস করে না, ধর্মরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে, কুসংষ্কারের প্রতিবাদ করে… তারাই বরং ছলেছুতায় আক্রান্ত হয়। যেহেতু ধর্মের দোহাই দিয়ে আক্রমণ করার চেয়ে মারাত্মক আক্রমণ আর যে হতেই পারে না। কারণ ধর্মের আক্রমণের কাছে পরমাণু বোমাও পরাজিত হতে বাধ্য হবে। অথচ যারা ধর্ম মানে, তারা চরম থেকে চরমতর দুর্নীতি করলেও সাচ্ছন্দ্যে ও বিলাসী জীবনযাপন করছে। এর কারণ, ধার্মিক এবং ধর্মরাষ্ট্রগুলোর মূল শক্তি বহু পুরানো কিছু বিভ্রান্তে ভরা পুস্তক, যা সঠিকভাবে পড়লে গোমড় ফাঁস হওয়ার কথা কিন্তু প্রায় সকলেই তা না পড়েই পবিত্র ও মহান মানছেন! মূলত মতলবাজ ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরাই নিজেদের দুর্বলতা, চাতুরি, নানাবিধ অপরাধ ঢাকতে ধর্মকে সুরক্ষিত রাখে, বিশেষ করে এর উগ্রতা (কথিত ধর্মানুভূতি) কাজে লাগায়। ফলে দেশ যেভাবে ধর্মালয়ে ভরে উঠছে, যেভাবে ধার্মিকদের সংখ্যা বাড়ছে, সেইহারে সৎ লোক বা সততা বাড়ছে না বরং কমছে! তাহলে কী ধর্ম সৎ মানুষ বানাতে ব্যর্থ? কারণ ধর্মানুসারে ধার্মিকতা বাড়লে সততাও বাড়ার কথা, কিন্তু বাস্তব কী সেকথা বলে?
তবে বুঝি না, মানুষ কেনো ধর্ম রক্ষার জন্য এতো নৃশংস্য হয়? কারণ দেখা যাচ্ছে, ধর্মদানবরা হত্যাযজ্ঞের ধরণ পাল্টিয়ে নৃশংস্য থেকে নৃশংস্যতর হচ্ছে এবং বিরামহীনভাবে দানবীয়তা ঘটিয়েই চলেছে। অন্যদিকে প্রতিটি হত্যাযজ্ঞের পর জ্ঞানীগুণিরা ধর্মরক্ষার জন্য উঠেপড়ে লাগে। একই সুরে একই গান গায়- হত্যাকারীদের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই, এরা খাঁটি ধামির্ক নয়, এরা প্রকৃত ধর্ম জানে না, ধর্মে এসব নেই, ধর্ম এসব বলে না…! প্রশ্ন- তাহলে ধর্মে আছেটা কী? বলেই বা কী? খাঁটি ধার্মিকই বা কী? যুগযুগ ধরে একই প্যাঁচাল না পেড়ে, যুক্তিসহকারে ব্যাখ্যা করে বলুন তো, কথিত পবিত্র(!) শাস্ত্রের কোন কোন আদেশ-নির্দেশ ধর্মদানবরা লংঘন করছে এবং আপনারা কথিত খাঁটি ধার্মিকেরা কী কী পালন করে খাঁটি(!) ধার্মিক হয়েছেন? জানি না, মহাসত্য(!) ধর্ম পালন করে কীভাবে একজন খাঁটি ধার্মিক হয়, আর একজন খাঁটি দানব হয়! আপনার উভয়পক্ষ (ধর্মজঙ্গি ও কথিত খাঁটি ধার্মিক) কী একই ধর্মপুস্তক, একই ঈশ্বর, একই ধর্মপ্রবর্তকের অনুসারী নন? তাহলে কেনো ধর্মের বাণী ও নিয়ম-কানুনগুলো নিয়ে একমত হতে পারছেন না? যা মহাসত্য(!) তা কেনো সার্বজননীন বা সর্বত্র একই কর্মকাণ্ডে বিশ্বাসী নয়? কেনো একটি সুনির্দিষ্ট মত মেনে চলতে পারছেন না? অর্থাৎ কেউ কারোটা নিয়ে সমালোচনা করবে না, দাঙ্গা বাধাবে না, কেউ কাউকে মারার জন্য চাপাতি হাতে ঘুমাতে যাবে না, কোনো গোষ্ঠি, অন্য গোষ্ঠিকে অতর্কিতে আক্রমণ করবে না (যদিও এগুলো ঐতিহাসিক সত্য এবং ধর্ম সমর্থিত), ধর্মযুদ্ধগুলো পাঠ্যপুস্তকের কিংবা ধর্মশিক্ষার অংশ হবে না (কারণ যুদ্ধ যে কারণেই হোক, তা মঙ্গলজনক নয়)…। অর্থাৎ যে ধর্মমত হবে অত্যন্ত মানবিক ও সকলের কাছে সমানভাবে প্রিয়। বিধর্মীদের ধর্মের সাথে একমত হওয়ার কথা বলছি না, কেবলমাত্র স্বধর্মীদের মধ্যে এই কাজটি করতে পারবেন কী? চ্যালেঞ্জ দিলাম, কোনোদিনও পারবেন না। যদি পারেন, পিতা-মাতার দিব্যি রইলো, অবশ্যই ধর্মদানবদের তরবারির নিচে মাথা পেতে দেবো। পারবেন না কারণ- যে বিশ্বাস সত্য নয়, তার ফলাফলও সত্য-সুন্দর হতেই পারে না এবং তাতে হাজার হাজার বিভ্রান্তিকর ব্যবস্থা, প্রথা, ব্যাখ্যা, বিতর্ক তথা কুসংস্কার থাকে; যা নিয়ে কোনো বিশ্বনেতা কিংবা কথিত মহামানব অথবা কথিত বিশ্বসেরা ধর্মগুরুরাও একমত হতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও সম্ভব না। অতএব ধর্মগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত দানব ও মহাদানব সৃষ্টির পথও কখনোই বন্ধ হবে না।
যদিও যুদ্ধ-দাঙ্গা পৃথিবীর জঘন্যতম কাজ অথচ এ নিয়েই ধর্মগুলো যখন গর্বিত হয়, মহিমা-গৌরব করে, উৎসাহ দেয়; তখন নিশ্চয়ই এর আদেশদাতাগণের (ধর্মপ্রবর্তক ও ঈশ্বর) ধৈর্য-সহ্য ও ক্ষমতার বিষয়গুলো পরিষ্কার। কোনো তারা কথিত ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধের বিকল্প খুঁজে পায়নি? এতো বিশাল ক্ষমতাধর, সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বমহান ধর্মপ্রবর্তক ও ঈশ্বরদের কিনা অস্ত্র ধরতে হয়েছে, বানর পিটিয়ে মানুষ করার জন্য? অর্থাৎ মানুষদের বিধর্ম থেকে স্বধর্মে আনতে এবং পাপমুক্ত রাখতে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামতে হচ্ছে কিংবা শাস্তির ভয় দেখাতে হচ্ছে! এর চেয়ে লজ্জার, অপমানের, অসহায়েত্বর, কাপুরুষতার… আর কী হতে পারে? সুতরাং ঈশ্বর ও ধর্মনির্মাতা এবং বর্তমানের ধর্মজীবি, যারা ধর্ম রক্ষার উছিলায় যুদ্ধ-দাঙ্গা বাঁধায়, সমর্থন করে, ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে গর্বিত হয়, প্রশংসা করে, প্রচার করে… এরা সকলেই মানবতাবিরোধি অপরাধে দোষী! না হলে- কেনো নয়? অথচ মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের আইনে যুদ্ধবাজ খুনিরা অপরাধী হলেও, ধর্মযুদ্ধ-দাঙ্গা সৃষ্টিকারীরা (ঈশ্বর-ধর্মপ্রবর্তক) নিরাপরাধ কীভাবে? কেউ তাদের বিচার চাওয়া দূরে থাক, বরং প্রশংসা করে। যদিও যুদ্ধ মানেই খুন করা, নয় খুন হওয়া। তাই যারা যুদ্ধ করে (সৈনিক) তাদের চেয়ে আদেশদানকারীরাই জঘন্যতম অন্যায়কারী তথা পাপী। কারণ, যাদের দেখে মানুষ অনুপ্রাণিত হয়, তারাই যদি যুদ্ধাংদেহী হয়, যুদ্ধের আদেশ-নির্দেশ দেয়, তাহলে মানুষের দোষ কী? রাজপ্রাসাদে মহাবিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত রাজা (বর্তমানের শাসকরা), যারা যুদ্ধের হুমকি দেয় ও বাঁধায় তারাও একই রকমের পাপী। কারণ ধর্মযুদ্ধকারীরা যুদ্ধে জয়ী হলে যেমন ঈশ্বরের প্রশংসা করে, তেমনি যুদ্ধবাজ রাজনৈতিক নেতারাও জয়ী হলে ঈশ্বরদের ধন্যবাদ দেয়, আর জীবিতদের কথিত বীর উপাধি দিয়ে গর্বিত করে! কিন্তু যুদ্ধ মানেই বহু খুন ও বহু কান্না। অথচ এ খুনে কারো মনেই কোনো পাববোধ হয় না, কেনো? কারণ সব ধর্মেই তো নরহত্যা মহাপাপ! তাহলে? যুদ্ধে কী শুধু কথিত শত্রু হত্যা করা হয়, নাকি সাধারণ মানুষই বেশি হত্যা করা হয়? তর্ক এড়াতে ধরে নিলাম- যুদ্ধে শুধু শত্রু (বয়ষ্ক যোদ্ধা) খুন করার আদেশ-নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু তা তো নয়, এতে বরং বেশিরভাগই নিরাপরাধ শিশু ও নারী খুন হচ্ছে। বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ মানুষই। অতএব, কথিত ন্যায়ের যুদ্ধ বলে কিছু নেই, যুদ্ধ মানেই মহা অন্যায়, মহাপাপ। হোক তা কথিত ধর্মের জন্য বা রাষ্ট্রের জন্য। বিশেষ করে ধর্মযুদ্ধকে যারা ‘ন্যায়ের যুদ্ধ’ বলেন, তারা নিকৃষ্টতম মনমানসিকতার অধিকারী তথা ইতর প্রবৃত্তির। অতএব, নরহত্যার জন্য যুদ্ধবাজ শাসক যেমন দোষী, তেমনি যুদ্ধবাজ ঈশ্বর এবং ধর্মসৃষ্টিকারীরাও দোষী। মানুষের পাপমুক্তি ও অন্যায়ের কথা এরা যতোই বলুক, নিজেদেরই পাপবোধ নেই। তা না হলে- কথিত মঙ্গলময়, দয়াময়, শান্তিময়, প্রেমময়… ঈশ্বর ও ধর্মসৃষ্টিকারীই কখনোই, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধের আদেশ দিতো না।
তাছাড়া, ঐতিহাসিক বহু যুদ্ধ-দাঙ্গার কাহিনী পড়ে মনে হয়, এসব ধর্মের অপরিহার্য অঙ্গ; যা নিয়ে ধর্মপ্রতর্ক এবং অনুসারীদের গর্বের সীমা-পরিসীমা নেই। কী চমৎকার! এক ধর্ম, অন্য ধর্মের সাথে যুদ্ধ করে রাজ্য জয় করেছে, সব পুরুষ খুন করেছে, তাদের গরু-ছাগল, ধন-সম্পদ এমনকি নারী ও শিশু লুটে নিয়ে ভাগবণ্টন করে নিয়েছে… স্বধর্ম অর্থাৎ খাঁটি ধর্ম, সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম, মহাধর্ম… প্রতিষ্ঠা করেছে (যা এখনো চলমান)! কী করে যে এমন যুদ্ধ-দাঙ্গার ইতিহাস মহান ও গৌরবের হলো, সুখপাঠ্য হলো, শিক্ষার অন্যতম বিষয় হলো- একদমই বোধগম্য নয়। ফলশ্রুতিতে, ধর্মে-ধর্মে প্রকাশ্যে যে ঐক্য তা সাময়িক এবং লোকদেখানো কিন্তু যুদ্ধ, বিবাদ, সংঘর্ষ, লুটপাট, ধর্ষণ, সামপ্রদায়িকতা, ঘৃণা… চিরস্থায়ী (ঐতিহাসিক বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে)। আবার এসব যুদ্ধের কাহিনী পড়েই অনেকে ডিগ্রি লাভ করে। আগেও বলেছি, যুদ্ধ কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না, যুদ্ধ মানেই রক্তপাত, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ…। অথচ দেবতা থেকে শুরু করে বিশেষ বিশেষ ধর্মের প্রায় প্রতিটি ঈশ্বর এবং ধর্মপ্রবর্তকই যুদ্ধের নির্দেশদাতা অথবা সমর্থক। অর্থাৎ তারা মুখে যা-ই বলুক, যুদ্ধ করে শান্তি আনায় বিশ্বাসী, শান্তির পথে শান্তি আনায় বিশ্বাসী নয়। অনেক দেবতা ও ধর্মপ্রবর্তক শুধু হুকুম দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, নিজেরাও সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। ঈশ্বরেরাও কথিত স্বর্গদূত পাঠিয়ে সাহায্য করেছে! যা ধার্মিকরা অত্যন্ত গৌরবের বিষয় বলে গর্ব করেন, প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাসই শুধু নয়, বুক ফুলিয়ে প্রচারও করেন। অতএব, ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস তথা যুদ্ধ বিজয়ের কাহিনী নিয়ে ধার্মিকরা যেভাবে গর্বিত, এতে মনে হয়- যুদ্ধ যেন ধর্মরক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। যেন যুদ্ধ করেই ধর্ম রক্ষা ও বিস্তার ঘটানো সম্ভব (যা চলমান), অন্য কোনো উপায় তাদের হাতে নেই! এটাই যদি সত্য হয়, তাহলে- এরা কীসের সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ?
ফলে ধার্মিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, দেবতা ও ধর্মপ্রবর্তকরা যেহেতু যুদ্ধ করেছে, সেহেতু তাদেরকেও এরকম একটি নৃশংস্যতম, মানবতাবিরোধি প্রথার সমর্থন ও প্রশংসা করতে হবে এবং ধর্মের ব্যাপারে সদাই যুদ্ধাংদেহী থাকতে হবে, নতুবা ঈশ্বর আশির্বাদ করবে না, ধার্মিক থাকা যাবে না… ইত্যাদি। সুতরাং এক ধর্মের অনুসারীরা যখন অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে কীভাবে, কখন, কোথায়, কতো অল্প সৈনিক নিয়ে ঐতিহাসিক যুদ্ধ জয়ের কাহিনী শোনায়, টিটকারী মারে… তখন পুনরায় নতুন করে যুদ্ধ-দাঙ্গা লেগে যাওয়ার শতভাগ সম্ভবনা থাকে। কেননা মানুষের মন থেকে অনেক পুরানো ক্ষত (দুঃখ-ব্যাথা…) চিরতরে বিলীন হতে পারে কিন্তু ধর্মের ক্ষত কখনোই শুকায় না, মৃত্যু পর্যন্ত জ্বলন্ত থাকে। অথচ ধর্মজীবিদের অন্যতম প্রধান কাজ হলো- ওইসব যুদ্ধ-দাঙ্গার ঘটনাগুলো বারবার এবং গর্বভরে শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হিসেবে জনগণকে জানান দেয়া। অর্থাৎ শত-সহস্র বছরের পুরানো যুদ্ধ-দাঙ্গার কাহিনী শুনিয়ে সাধারণ মানুষদের স্বধর্ম রক্ষায় উজ্জিবীত রাখা। শুধু তাই-ই নয়, ধর্মপুস্তকেও এর গৌরবগাঁথা রয়েছে, যা পড়ে বহু মানুষই মনে মনে যুদ্ধ-দাঙ্গার জন্য তৈরি থাকতে কিংবা দানবও হতে পারে। এর ফলে যখন-তখন যেকোনো সময় সামপ্রদায়িকতার বিস্ফোরণ অতি সহজ (যা নির্ভুল, প্রামাণিত ও চিরস্থায়ী সত্য)। ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝি, এর থেকে মুক্তি পেতে হলে, কথিত ‘পবিত্র যুদ্ধের’(!) সব ইতিহাস ধর্মপুস্তক ও পাঠ্যপুস্তক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে হবে এবং ধর্মজীবিরা কখনোই এসব প্রচার করতে পারবে না অর্থাৎ বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে এসব শেখানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে।
যদিও উচ্চশিক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিদ্বানগণ এবং ধর্মজীবিসহ সাধারণ জ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, সন্তান যেন জঙ্গি না হয় সেজন্য পিতামাতাকে সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু তারা একথা বলেন না যে, ধর্মের মধ্যে যেসব কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি এবং যুদ্ধ-দাঙ্গার ইতিহাস রয়েছে, যেসব দৃষ্টান্ত অতি গৌরবের সাথে সন্তানকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। ধর্মপুস্তক সংশোধনসহ যাবতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এসব নিষিদ্ধ করা হোক! কারণ ওখানেই সন্তান জঙ্গি হবার সর্বোত্তম শিক্ষা রয়েছে। তারা বলেন না, ধর্মের মধ্যে শয়তান রয়েছে (যে/যারা মানুষকে বিপথে চালায়), সেই শতয়ানকে ধর্ম থেকে বহিষ্কার করা হোক! অর্থাৎ ঈশ্বরের কথিত পবিত্র(!) বাণীগুলোও সংশেধন করা হোক। যেসব তথাকথিত ঐশ্বী বাণী শুনে এক ধর্মালম্বীরা অন্য ধর্মালম্বীদের অধার্মিক ভাবে, ছোট ভাবে, হীন কিংবা জঘন্য ভাবে, ঘৃণা করে, শত্রু ভাবে… ধর্ম থেকে ওইসব বাক্য/শব্দ সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হোক! না হলে, সন্তানকে আপনি যতো ভালো শিক্ষাই দিন, যতো ভালো স্কুল-কলেজে পাঠান, চোখে-চোখে রাখেন… এক সময় না এক সময় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। তারা যখন স্বাধীনভাবে সমাজে মিশবে, তখন যে পরিবেশ ও পরিস্থিতির শিকার হবে না, এমন গ্যারান্টি কোথায়? কারণ যে সমাজে সব শিক্ষার মূল শিক্ষা- ধর্ম, যে সমাজে শিশু বয়স থেকে ধার্মিক বানানো হয় এবং আজীবন ধার্মিক রাখা হয়, সেই সমাজে সন্তানকে চোখে-চোখে রাখলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা আশা করা আর উম্মাদের সঙ্গে থাকা সমান। তবে ধর্মশিক্ষার পরিবর্তন না করে, সন্তানকে চোখে-চোখে রেখে জঙ্গি হবার সম্ভাবনা কমানো কিংবা দমানো গেলেও নির্মূল করা কিংবা সুন্দর মনমানসিকতার সন্তান তথা জাতি গঠন করা অসম্ভব। কারণ বীজ এবং শিকড় থেকে গেলে চারা তো গজাবেই।
যাহোক, নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে হলে- কাউকে তো লাগবেই। হয়তো তাই ধর্মসৃষ্টিকারীরা শয়তান বানিয়ে সব দোষ ওটার ঘাড়ে চিরস্থায় এবং চিরদিনের জন্য চাপিয়ে দিয়েছে। যেমন শয়তান রোগ-শোক ছড়ায়, যুদ্ধ বাধায়, ঝড়-বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী… ইত্যাদি সৃষ্টি করে। অথচ এটাও বিশ্বাস করা হয়, ঈশ্বর না চাইলে শয়তান কিছুই করতে পারে না! তাহলে কী শয়তান যখন মানুষের বিরুদ্ধে এসব করে, তখন ঈশ্বর নাকে ঘি মেখে ঘুমায়? নাকি শয়তান ও ঈশ্বরের সাথে বোঝাপড়া হয়েছে, তুই যখন কাজ করবি আমি বাধা দেবো না, আমি যখন করবো তুই বাধা দিবি না…! কী চমৎকার বোঝাপড়া তাই না? অন্যদিকে, ঈশ্বরেরা যেমন নিজেদের দোষ চাপানোর জন্য শয়তান সৃষ্টি করেছে, মানুষও তেমনি স্বধর্মের দোষ, অন্য ধর্মের উপর চাপিয়ে নিজেরটা জায়েজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, এক ধর্মের কুসংস্কার প্রশ্নে অন্য ধর্মের তুলনা টেনে বলা হয়- অন্য ধর্মে দাসত্ববাদ আছে, যুদ্ধ-দাঙ্গা আছে, বিভক্তি-বিভ্রান্তি-বিতর্ক আছে, নারী ও সংখ্যালঘু নির্যাতন আছে, ভুল ব্যাখ্যা, কুসংস্কার রয়েছে… তাহলে শুধু আমারটার সমালোচনা হচ্ছে কেনো? অন্যগুলোকে ধরা হচ্ছে না কেনো? ওগুলো দোষের না হলে, আমারটা দোষের নয়… ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো- অন্য ধর্মে যা আছে, তা যদি আপনার ধর্মে থাকে, তাহলে আপনারটা সর্বোত্তম হলো কীভাবে? যেহেতু ধর্মে-ধর্মে মতোবিরোধ চিরস্থায়ী, অখণ্ডণীয়, অলঙ্ঘনীয়… তবু তা মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক কিংবা শান্তির হলো- কীভাবে?
জানি না, পরকালে সুখে থাকার জন্য ধর্ম পালন, নাকি এ পৃথিবীতে ভালো মানুষ হওয়ার জন্য ধর্ম পালন, কোনটা হওয়া উচিত? তবে এটা জানি, ধর্মজঙ্গি দমন নয়, এর কারখানা তথা ধর্ম দমন করলেই তা নির্মূল হবে, এর আগে নয়। কিন্তু তা হবার নয় কারণ, ধূর্ত ধর্মপ্রবর্তকদের কল্পিত ধর্ম শোষকদের (রাজনীতিবিদদের) প্রধান হাতিয়ার। মূলত শোষিত জনগণকে অধীনে রাখতে এর আধ্যাত্মিক মন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অসামান্য।

মাদ্রাসা শিক্ষকের মাথায় মলমূত্র ও গণঅপমান.

প্রতিদিন সারাদেশে শত শত মানুষ সংঘবদ্ধ কোন গ্রুপ দ্বারা কানে ধরা, জুতার মালা, মাথায় ঘোল, মাথা ন‍্যাড়া করে দেয়া, নাকে খতসহ বিভিন্ন লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকেন। প্রতিবাদের নামেতো হয়ই, কাউকে ফাঁসিয়ে তারপর সালিশের নামে এই ঘটনাগুলো সবচে বেশি ঘটে।
এখন মোবাইল ফোনের কল‍্যাণে কিছু কিছু ঘটনা ফেসবুকে আসছে। সামনে আরো আসবে। যেমন, মাদ্রাসার হুজুরের মাথায় মলমূত্র ঢালার ভিডিওটি। একবার দেখুন। একটা মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায় ওই সময়! চেহারার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখুন, এমন অন্ধকার আপনি জীবনেও দেখেননি।
ক’দিন আগে একটা ঘটনা জানতে পারলাম। এক ছেলের নাস্তিকতা তার পরিবার জেনে যায়। ভাইয়ের মাধ‍্যমে বিষয়টা এলাকায় জানাজানি হয়। তারপর বাড়িতে লোকজন জড়ো হয়। কেউ বলে জুতার মালা পরাও, কেউ বলে পেটাও, কেউ বলে মাথায় বিষ্ঠা লেপে দাও…। যতটা না পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন‍্য, তারচে বেশি পাপমুক্ত হওয়ার আশায় ওই ছেলের বাবা মা মসজিদ থেকে হুজুর এনে ছেলেকে তওবা করায়। তওবা করানোর সময় ছেলেটি রাজি হচ্ছিলো না। তখন তার বাপ ভাইসহ উপস্থিত এমন কেউ বাকি ছিলো না, যে পেছন থেকে মাথায়, পিঠে, ঘাড়ে দুই চার ঘা লাগায়নি। এমনকি শিশুদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছিলো তাকে চটকোনা দেয়ার জন‍্য।
সেই রাতে ছেলেটি এলাকা ছেড়ে, পরে দেশ ছেড়ে চলে যায়।
মাদ্রাসার শিক্ষক বৃদ্ধ মানুষ। হয়তো তিনিও এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন। হয়তো অন‍্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ‍্য নেই। কিন্তু এই ঘটনায় মানুষটির মনে ভাঙন ধরেছে। তার ভেতরটা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে। তার পরিবারকে সারাজীবন এই স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হবে।
এভাবে দেশের অধিকাংশ মানুষ কোন না কোন অপমান, কোন না কোন ক্ষত বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে। অসংখ‍্য প্রাণোচ্ছ্বাসহীন মনুষ, সেসব মানুষ নিয়ে সমাজ, এই দেশ। ক্ষত ঢাকতে উপরে বার্ণিশ করা, ভেতরটা খালি। সাহস নেই, উৎসাহ নেই, উদ্যম নেই। এগিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সুযোগ পেলেই কোন কোন অপমানের স্মৃতি রাশ টেরে ধরে। তাই মানুষে চাওয়া ছোট হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ্য খাটো হচ্ছে, স্বপ্ন মরে যাচ্ছে। কোনভাবে বেঁচে থাকাটাই বাধ‍্যগত জীবনের লক্ষ্য হয়ে যাচ্ছে।
একটু চেষ্টা করলেই অনুভব করতে পারবেন আপনার চারপাশ কত বিষন্ন, কত অন্ধকার, কতটা স্থবির। মানুষ হাসে না, হাসার চেষ্টা করে। মানুষ আনন্দে নাচে না, শরীরটাকে টেনে উপরে তুলে আবার মাটিতে ফেলে। একটু মনযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করুন কয়টা হাসি, কয়টা আনন্দ মেকি নয়, বুঝতে পারবেন।
শুরুটা হয় পরিবার থেকে। শহর ও গ্রামভেদে একেক ধরণের অপমান। কানে ধরানো, অতিথির সামনে বকাঝকা, পরিবারের সবাই মিলে অপমান করা, খাবার বন্ধ করে দেয়া, রাতে ঘরে ঢুকতে না দেয়াসহ আরো অনেক কিছু। এরপর স্কুলে। কানে ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখা, বাদবাকি সব ছাত্রছাত্রীদের সাথে নিয়ে শিক্ষকের নেতৃত্বে নির্দিষ্ট একজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে হাসিতামাশা করা, স্কুলের মাঠে কপালে চক/ইটের টুকরো রেখে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ‍্য করাসহ আরো অনেক রকমের শাস্তি। এভাবে কলেজ বিশ্ববিদ‍্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের নামে অপমান, তথাকথিত ভাইয়া আপুদের দ্বারা মানসিক নির্যাতন। তারপর কর্মস্থলে কলিগদের সংঘবদ্ধ হাসি তামাশার শিকার। আর সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠী কর্তৃক নানান ধরণের লাঞ্ছনার ঘটনাতো আছেই।
কোথাও দুই জন মিলে কাউকে লাঞ্ছিত করতে থাকলে চারজন, দশজন করে শ’খানেক লোক জমে যাওয়া কয়েক মিনিটের ব‍্যাপার। মানুষ এটা খুব উপভোগ করে। ন‍্যায় বিচার, বা প্রতিশোধ নেয়ার জন‍্য কেউ কারো সাথে এমনটা করে না। তারা হয়তো জানেও না, এমন আচরণ করে কারণ তারা এটা উপভোগ করে।
এসব থেকে মুক্তির কী উপায় আছে জানি না। তবে প্রতিবাদের নামে যারা অপরাধীকে এভাবে লাঞ্ছিত করে, প্রথমে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। তাহলে কাউকে ফাঁসিয়ে সালিশের নামে লাঞ্ছিত করাও ঠেকাতে পারবেন।
প্রতিবাদের নামে গণঅপমানের সবচে খারাপ দিক হচ্ছে ন‍্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাধাগ্রস্থ হওয়া। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা ছবি দেখলাম এক ধর্ষকের গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামে ঘুরানো হচ্ছে। যিনি শেয়ার করেছেন তিনি জুতার মালা পরা ধর্ষককে দেখে খুব খুশি হয়েছেন এবং যারা এই কাজ করেছে, তাদেরকে স‍্যালুট দিয়েছেন। এর পরের ক’দিন মিডিয়ায় চোখ রেখেছি, ওই ধর্ষণের ঘটনায় কোন মামলা হওয়ার খবর চোখে পড়েনি। ধর্ষককে জুতার মালা পরিয়ে গ্রামে হাঁটানোর পর ওই এলাকার বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন হয়। কোন একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ, যারা উদ‍্যোগী হয়ে গণঅপমানের আয়োজন করে, তাদের বিনোদনের ব‍্যবস্থা হয়। উৎসাহী জনতা হাসতে হাসতে ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় বলেছে “উচিত শিক্ষা হয়েছে!” কেউ আর বিচারের কথা বলেনি, কারণ উৎসাহী বিনোদনলোভী মানুষের তৃপ্তি পাওয়ার মাধ‍্যমে বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ধারণা জন্ম নেয় এবং হয়তো ধর্ষিত শিশুটির বাবা মাও প্রতিশোধ নেয়ার স্বাদ পেয়ে যান। ফলে বিচারের দাবিটি আর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিচারের দাবি মাঠে মারা গেছে এটা একটা বিপদ। তারচে বড় বিপদ এলাকার লোকজনের বিনোদিত হওয়া। তো, এর পরের বিনোদন কী হবে? আরেকটা ইভেন্টের অপেক্ষা। আবার সবাই মিলে কাউকে হেনস্থা করা হবে। হতে পারে সে ধর্ষক, হতে পারে কলাচোর, হতে পারে মসজিদের জুতা চোর। আবার হতে পারে নিরপরাধ কোন ব্যক্তি। হয়তো সেদিনের সেই হেনস্থায় এই ধর্ষকও অংশ নিবে, মজা নিবে। এর আগ পর্যন্ত বিনোদনের জন‍্য ধর্ষিত শিশুটিতো আছেই। এবার তাকে নিয়ে মুখরোচক কথাবার্তা, তার পরিবারের লোকজনের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানো, নিজেদের আড্ডায় ওই ধর্ষককে ডেকে তার ইন্টারভিউ নেয়া, কিভাবে কী করেছে তার প্রতিটি সেকেন্ডের বর্ণনা শোনাসহ কিছু খুচরা বিনোদনের সুযোগ বহাল আছে।
ক’দিন আগে আরেকটি ছবি দেখেছি মুহম্মদ অবমাননার অভিযোগে একজন হিন্দু ধর্মালম্বী যুবককে জুতার মালা পরিয়ে মারধর করা হচ্ছে। এখানে উৎসুক জনতার আনন্দ ধর্ষকের ছবির উৎসুক জনতার চেয়ে বেশি। এখানে দ্বিগুন আনন্দ। প্রথমত লাঞ্ছিত যুবকটিকে মুহম্মদ অবমাননাকারী বলে ফাঁসানো হয়েছে, দ্বিতীয়ত লোকটি হিন্দু। তার মানে একই সাথে একজন নাস্তিক ও একজন হিন্দু নামধারীকে অপমান করার সুযোগ পাওয়া গেলো! আনন্দের সীমা নাই।
ধর্মান্ধ ওই মানুষগুলো আসলে তাদের নবী অবমাননার বিচার করেনি। এর বিচার তারা চায়ও না। পুলিশ নিজ উদ্যোগে গ্রেফতার করে না আনলে ওই বিক্ষুব্ধ জনতা হয়তো কয়েকদিন ধরে একের পর এক নির্যাতন করে যেত, হয়তো পিটিয়ে মেরেও ফেলতো। অথচ সরকার নবী অবমাননার বিরুদ্ধে শাস্তির ব‍্যবস্থা রেখে আইন করেছে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ/উৎসুক জনতা আসলে বিচার চায় না। তারা গণধোলাই, গণঅপমানে অংশ নিয়ে কিছুটা সময় তৃপ্তিসহকারে জমজমাটভাবে বেঁচে থাকতে চায়। কাউকে অপদস্থ করার আনন্দস্মৃতি রোমন্থন করতে চায়, এসব নিয়ে গল্প করে সময় কাটাতে চায়।
ধর্ষকের ছবিতে যে মজায় মজে থাকা পরিতৃপ্ত উৎসুক জনতা দেখেছি, তারা প্রতিবাদের নামে এই কাজ করেছে। হিন্দু যুবকের ছবিতে যাদের দেখেছি, তারা একজন নিরপরাধ মানুষকে নিয়ে খেলে মজা নিচ্ছে। যেভাবেই হোক, উভপক্ষ আনন্দিত।
এটা অসুস্থতা। বদ অভ‍্যাস। এটা সামাজিক আচার আচারণের অংশ হয়ে যাওয়া একটা ব‍্যাধি। একটা সমাধান অথবা একটা ইতিটানার চেষ্টা। যারা প্রতিবাদের নামে সত‍্যিকারের অপরাধীকে নিয়ে এমন মজায় মেতে উঠে, তাদের যুক্তি আছে। বিচারহীনতার যুক্তি। এই যুক্তিতে এমন গণঅপমানের ঘটনা ঘটিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। অথচ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এত সহজ কাজ নয়। টানা কয়েক প্রজন্মকে এর জন‍্য নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম করতে হয়। তারপর হয়তো কিছু একটা সুফল পাওয়া যায়। কিন্তু নিজেকে ন‍্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে সরিয়ে নিলে সুফল পুরোপুরি অধরা থেকে যাবে।
এ ধরণের অপমান বা অপদস্থ করার পদ্ধতি একেকটি ভয়ানক অস্ত্র। প্রথমত এই অস্ত্র যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ব‍্যবহার করা যায়, দ্বিতীয়ত ঠিক তেমনকি ব‍্যক্তিগত শত্রুতা কোন নিরপরাধ ব‍্যক্তির বিরুদ্ধেও ব‍্যবহার করা যেতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে ন‍্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, দ্বিতীয়টাতে জেনে শুনে বুঝে মারাত্মক অপরাধ করা হয়েছে। কিন্তু এক জায়গায় দু’টোতেই মিল আছে। দু’টাতেই খুব এনজয় হয়েছে! মজা হয়েছে!! এবং দু’টোতেই একই অস্ত্র ব‍্যবহৃত হয়েছে।
সমাজে যা বদঅভ‍্যাস, যা অন‍্যায়ানন্দ, তা নানানভাবে ব‍্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আজ যা প্রতিবাদের নামে করছেন, কাল তা আপনাকে ফাঁসানোর জন‍্য করা হবে। বিনোদনলোভী মানুষের সামনে অসহায়ভাবে অপমান সহ‍্য করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
মাদ্রাসা শিক্ষকের মাথায় যারা মলমূত্র ঢেলছে, তারা প্রভাবশালী। স্কুল শিক্ষককে যারা কানে ধরিয়েছে, তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লোকজন। বাউলদের চুল দাড়ি যারা কেটেছে, তারা একই সাথে প্রভাবশালী ও সংখ‍্যাগরিষ্ঠ। ওই নাস্তিককে যারা অপমান করেছে, তারা হয়তো রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান নয়, কিন্তু তারচেও বেশি ক্ষমতাবান। কারণ তারা অপরাধ সংঘটিত করার জন‍্য সংগঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী।
এরকম প্রত্যেকটি ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক শক্তি, প্রভাব, গোষ্ঠীবদ্ধ ক্ষমতা ও সংখাগরিষ্ঠতার বল কাজ করে। এই যে প্রভাব ও সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা, এটা একেকসময় একেকরূপ নেয়। আজ আপনি হয়তো মুসলমান পরিচয়ে সংখ‍্যাগরিষ্ঠ গ্রুপে পড়েছেন, কিন্তু কাল উত্তরপাড়ার মুসলমান হিসেবে সংখ‍্যালঘু হয়ে যাবেন। তখন দক্ষিণপাড়ার সংখ‍্যাগরিষ্ঠরা আপনাকে নিয়ে অপমানের আনন্দের মেতে উঠবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার চর্চা ভালো না। ক্ষমতার চর্চা ভালো না। অন‍্যের লাঞ্ছিত হওয়া উপভোগ করা ভালো না।
অপমানের পাহাড় ঘাড়ে নিয়ে মাথা নিচু করে ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকা অসহায় ব‍্যক্তিটি পাথরের মূর্তি বা হাতে আঁকা ছবি নয়, যে বছরের পর বছর শুধু ওই একটি লোককেই লাঞ্চিত হতে দেখা যাবে। বরং একেক ঘটনায় একেক লোককে দেখা যাবে। কোথাও নাস্তিক, কোথাও শিক্ষক, কোথাও বাউল, কোথাও হুজুর। কোথাও আপনি, কোথাও আমি।
হাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যম আছে। গণঅপমানের মত অসভ্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

যেভাবে জীবনের শুরুঃ পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি

পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে আজ প্রাণ প্রতিষ্ঠিত কিন্তু পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয় তখন পৃথিবী ছিল মৃত উষর গলিত পাথর। তাহলে কীভাবে জীবনের শুরু? সচারচার এমন প্রশ্ন খুবই কম লোকেই জিজ্ঞেস করে থাকে। মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ পাতা জুড়ে লেখা আছে এবং প্রায় সবাই বিশ্বাস করে কোন না কোন ঈশ্বর আমাদের অতিপ্রিয় জীবনটা এক ফুঁৎকারে বানিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন আগেও ঈশ্বরব্যতীত অন্যকোন ব্যাখ্যা ছিল মানুষের চিন্তারও বাইরে।
ঈশ্বর জীবনের জন্ম দিয়েছেন কথাটা এখন আর সত্য নয়। বিগত শতাব্দীধরে কিছু বিজ্ঞানী কীভাবে প্রথম প্রাণের বিকাশ হয়েছিল খুঁজতে নিরন্তর গবেষণা করে গেছেন এবং গবেষণা বর্তমানেও চলছে। এমনকি বিজ্ঞানীগণ পরীক্ষাগারে সৃষ্টির আদিতে যেমন পরিবেশ ছিল কৃত্রিমভাবে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে নিঃস্ব অবস্থা থেকে সম্পুর্ণ নতুন প্রাণের জন্ম দিয়েছেন।
যাকিছু অগ্রগতি হয়েছে সেটা কোন একক প্রচেষ্টা নয় কিন্তু আমরা দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এসেছি। আজকে অনেক বিজ্ঞানীই প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে অধ্যয়ন করছেন এবং তারা আত্মবিশ্বাসী যে তারা সঠিক পথেই আছেন এবং তাদের আত্মবিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে বহুদিনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে। এটা হলো আমাদের উৎপত্তির প্রকৃত উৎস আবিস্কারের কাহিনী। আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কারকে ঘিরে আবর্তিত প্রাণের সৃষ্টি রহস্য গল্পটি মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ, সংগ্রাম এবং অসাধারণ সৃষ্টিশীলতায় পরিপূর্ণ। প্রাণের সৃষ্টিলগ্ন খুঁজতে মানব মানবীকে যেতে হয়েছে আমাদের পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় কোনায় এবং সহ্য করতে হয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট। কিছু বিজ্ঞানী নিযুক্ত ছিলেন অতি দানবীয় গবেষণা এবং পরিশ্রমে, পক্ষান্তরে কোন কোন বিজ্ঞানীকে কাজ করতে হয়েছে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী সরকারের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে।  
পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির গল্পঃ
Dinosaurs actually lived quite recently (Credit: Oleksiy Maksymenko/Alamy)
প্রাণ অনেক পুরনো। ডায়নোসর সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত বিলুপ্ত প্রাণী এবং প্রায় ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে তারা দোর্দণ্ড প্রতাপে টিকে ছিল। কিন্তু প্রাণের জন্ম খুঁজতে আরও সুদূর অতীতে যেতে হবে। আমাদের চেনাজানা সবচেয়ে পুরনো জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর যা কিনা সবচেয়ে পুরনো ডায়নোসরের থেকেও ১৪ গুণ বেশি পুরনো। কিন্তু জীবাশ্মের প্রাপ্ত বয়স হয়ত আরও অতীতের হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ২০১৬ সালের আগস্টে গবেষকগণ ৩.৭ বিলিয়ন বছর আগের আণুবীক্ষণিক অনুজীবের ফসিলের সন্ধান পেয়েছেন।
পৃথিবী নিজে এত বেশি পুরনো নয়, এইতো গঠিত হয়েছিল ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে। যদি আমরা ধারণা করি প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিল এই পৃথিবীতেই তাহলে সেটা যুক্তিপূর্ণ এবং অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। আমাদের জানামতে আমরা অন্যকোথাও প্রাণের অস্তিত্ব পাইনি। সংরক্ষিত পুরনো জীবাশ্ম পরীক্ষা করে বোঝা যায় যা কিছু ঘটেছে সেটা পৃথিবী গঠনের পরে এবং ৪.৫ বিলিয়ন বছরের মধ্যে। একই সাথে আমরা যদি প্রাণের বিকাশ মুহুর্তের কাছাকাছি চলে যাই তাহলে প্রকৃতপক্ষেই সৃষ্টিলগ্নে কেমন ছিল তার আধুনিক ধারণা পাবো।
The tree of life: most of the branches are bacteria (Credit: Hug, Banfield et al, Nature Microbiology)
১৯ শতক থেকেই জীববিজ্ঞানীগণ জানেন সব ধরণের জীবিতস্বত্বাই ‘কোষ’ দ্বারা গঠিত যা মূলত বিভিন্ন রকম এবং আকারের অতি ক্ষুদ্র জীবিত বস্তুকণার সমষ্টি। ১৭ শতকে আধুনিক অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পরে প্রথম কোষের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু কোষ থেকেই জীবনের উৎপত্তি সেটা বুঝতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লেগেছে। বিজ্ঞানীগণ জানতে পেরেছেন আমাদেরকে একটা কোষ সৃষ্টি করতে হলে ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর পরিবেশগত অবস্থা এবং উপাদান লাগবে।
একজন মানুষ হয়ত দেখতে একটা কইমাছ বা টাইরানোসোরাস রেক্স এর মত নয় কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্রের গভীর পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাবো সবপ্রাণীর দেহ প্রায় একই রকম কোষদ্বারা গঠিত। এমনকি বৃক্ষলতা, অণুজীব বা মাশরুম ইত্যাদি একই উপাদানে তৈরি। প্রাণীজগতের বেশিরভাগ প্রাণীই আণুবীক্ষণিক যাদের প্রায় সবাই একটা মাত্র কোষ দিয়ে গঠিত। ব্যাকটেরিয়া এককোষী প্রাণীদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত অতিপ্রজ এবং পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায়।
২০১৬ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞানীগণ একটা সেমিনারে ‘প্রাণের বংশলতিকা’র’ সর্বশেষ আধুনিক সংস্করণ উপস্থাপন করেন যেখানে সব ধরণের জীবিত প্রাণীকে বংশলতিকায় পর্বের মাধ্যমে দেখানো হয়। প্রাণীপর্বের প্রায় সব শাখাতেই ব্যাকটেরিয়ার আধিক্য। তদুপরি, প্রাণীর বংশলতিকা দেখে মনে হয় সব জীবের আদিপিতা হলো ব্যাকটেরিয়া। অন্যভাবে বলা প্রতিটি জীবিত প্রাণ এমনকি আপনি নিজেও প্রকৃতপক্ষে ব্যাকটেরিয়ার বংশধর। অর্থাৎ, আমরা এখন জীবনের উৎস কোথায় এই প্রশ্নের আরও যথাযথা উত্তর নিশ্চিত করতে পারবো। একটা কোষ তৈরি করতে আমাদের প্রয়োজন হবে ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগেকার পৃথিবীর উপাদান এবং প্রাণ বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। তাহলে, প্রাণ সৃষ্টি কত দুরূহ ব্যাপার হবে?
A complete living cell (Credit: Equinox Graphics Ltd)
প্রথম অধ্যায়ঃ প্রথম গবেষণামূলক পরীক্ষা 
সমগ্র ইতিহাসজুড়ে, প্রাণের বিকাশ কীভাবে শুরু হয়েছিল এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনীয়তা কখনো বিবেচিত হয়নি। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উত্তর তো আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট। ১৮০০ শতকের আগে মানুষ বিশ্বাস করতো, প্রাণের উৎস এবং বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে তার পুর্ব শারীরিক এবং রাসায়নিক শক্তির মিথস্ক্রিয়া। এটি ছিল মানুষের সহজাত ধারণা যে সমস্ত জীবন্ত অস্তিত্ব সর্বশক্তিমানের একটি বিশেষ উপহার এবং অলৌকিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিল যা তৈরি হয়েছিল কোন প্রাণহীন পদার্থ থেকে। জীবন সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদানগুলো সবই সরল রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়াতে জন্ম নিলেও জীবনের সাথে সেই রাসায়নিক উপাদানগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। অলৌকিকভাবে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে এই বিশ্বাস ধর্মবিশ্বাসের সাথে মিলে মিশে ফুলে ফলে পল্লবে শাখায় শাখায় বিকশিত হয়েছে। বাইবেলে বলা হয়েছে প্রথম মানবকে জীবন দান করতে ঈশ্বর তার মুখে ফুঁ দিয়েছিলেন এবং চির অজর অমর আত্মা প্রাণীর দেহে অলৌকিকভাবে বিরাজিত থাকে।
ধর্মীয় তত্ত্বের একটাই সমস্যা ছিল। অলৌকিকতা হলো নির্জলা ভুল ধারণা। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীগণ এমন কিছু বস্তুর সন্ধান পেলেন যেগুলো মনে হচ্ছিল জীবনের জন্য অনন্য উপাদান। সেইসব উপাদানের মধ্যে ইউরিয়া অন্যতম যা পাওয়া গিয়েছিল মূত্রের মধ্যে এবং ১৭৯৯ সালে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানের যা কিছু অর্জন ছিল সেটা অলৌকিকতার সাথে বেশি মানানসই। শুধু জীবিত প্রাণই এই ধরণের রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন করতে পারে সুতরাং ধারণা করা হয় ইউরিয়ার মধ্যে জীবনের শক্তি সঞ্চিত ছিল এবং এই কারণেই সেই বস্তুগুলো ছিল অন্যদের তুলনায় বিশেষ কিছু।
The German chemist Friedrich Wöhler, in a lithograph by Rudolf Hoffmann from 1856

কিন্তু ১৮২৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ ভোলার একটা সাধারণ রাসায়নিক দ্রব্য আমোনিয়াম সায়ানেট থেকে ইউরিয়া উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন যার সাথে জীবিত প্রাণের কোন যোগসূত্রতাই ছিল না। অন্যান্য বিজ্ঞানীগণও এগিয়ে এলেন ফ্রেডরিখ ভোলারের পথ অনুসরণ করে এবং কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানীগণ বুঝতে পারলেন, প্রাণের সাথে কোন সম্পর্ক নাই এমন সাধারণ নিরীহ রাসায়নিক দ্রব্য দিয়েও রসায়নে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাণ বিকাশে অলৌকিকতার স্থান এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু মানুষ মনের গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রাণ বিকাশের ঐশ্বরিক ধারণা এত সহজে দূর করতে পারে না। অনেকেই বলতে থাকে, রসায়ন থেকে প্রাণ সৃষ্টির মধ্যে বিশেষত্ব কিছু নেই বরং তাদের কাছে মনে হয় রোবটে প্রাণের মত ইন্দ্রজাল যা আমাদেরকে আসতে আসতে যন্ত্রে পরিণত করছে। এবং এটা অবশ্যই বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক।
দশকের পর দশক জীবনের উৎস কোথায় এই রহস্য অবহেলিত থেকে গেছে। এমনকি বিজ্ঞানীগণ পর্যন্ত প্রাণ সৃষ্টির অলৌকিকত্বকে রক্ষা করতে রীতিমত মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। যেমন ১৯১৩ সালের শেষ নাগাদ ব্রিটিশ জৈবরসায়নবিদ বেঞ্জামিন মূর ‘জৈব শক্তি’ নামে একটা তত্ত্বের অবতারণা করেন যেটা আসলে নতুন মোড়কে অলৌকিকতা প্রচারের প্রবল চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। বেঞ্জামিন মূরের ‘জৈব শক্তি’ তত্ত্বে আবেগের প্রাধান্যও যথেষ্ট ছিল। বর্তমানে মূরের ‘জৈব শক্তি’ তত্ত্ব অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন বহু বহু বিজ্ঞানের কল্প-গল্পে দেখা যায় একজন মানুষের জীবনী শক্তি বাড়ানো সম্ভব অথবা জীবনী শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের একটা টিভি সিরিয়াল ‘ডক্টর হু’ এর মধ্যে একটা চরিত্র টাইম লর্ডস জীবনী শক্তি নবায়নের চিন্তা করেন যেখানে দেখা যায় শক্তি বাড়ানো হচ্ছে, যদি ধীরেও প্রবাহিত হয় তবুও সে শীর্ষে পৌঁছে যাবে। বৈজ্ঞানিক কল্প-গল্পটিকে অভিনব মনে হলেও বাস্তবে এটা অতিপুরনো একটা অলিক ধারণা মাত্র।
তারপরেও ১৮২৮ সালের পর থেকেই দেবত্ববিহীন প্রাণের বিকাশ প্রথম কীভাবে ঘটেছিলে তার যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজতে থাকেন বিজ্ঞানীগণ। কিন্তু তারা কোন উপায় অন্তর খুঁজে পাননা। যদিও প্রাণ বিকাশের উৎস রহস্যে ঢাকা কিন্তু দশকের পর দশক অবহেলিত ছিল, তবুও তখন বিজ্ঞানীদের মনে হতে লাগল প্রাণের বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল তা অবশ্যই আবিষ্কার করার বিষয়। সম্ভবত তখনকার প্রায় সবাই সৃষ্টিতত্ত্বের প্রশ্নে অলৌকিকতাবাদে আবেগের আতিশয্যে এমনভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িত ছিল যে তারা আবিষ্কারের পরবর্তী পদক্ষেপ শুরুই করতে পারছিল না।
Charles Darwin showed that all life has evolved from a simple common ancestor

পূর্বের অচলাবস্থার পরিবর্তে ১৯ শতকে চার্লস ডারউইন এবং সহযোগীদের চেষ্টায় গড়ে তোলা বিবর্তন তত্ত্বের সুবাদে  জীববিজ্ঞানে নব নব আবিষ্কারের হাতছানি দেখা দেয়। চার্লস ডারউইন জানতেন কীভাবে প্রাণের বিকাশ হয়েছে এটা খুবই গভীর চিন্তা ও আবেগ মেশানো প্রশ্ন। চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের সূচনা হয় ১৮৫৯ সালে পৃথিবী তোলপাড় করা ‘অন দ্য ওরিজিন অফ স্পিসিজ’ বইটি প্রকাশের মাধ্যমে। বিবর্তনবাদে তিনি ব্যাখ্যা করে দেখান কীভাবে এই বিপুলা পৃথিবীর ততোধিক বিপুল পরিমাণ বিচিত্র প্রাণী জগতের উদ্ভব হয়েছে একটা সাধারণ এককোষের আদিপিতা থেকে। এই প্রথম কেউ বললেন ঈশ্বর প্রতিটি জীবকে আলাদা আলাদা করে সৃষ্টি করেননি। প্রাণিজগৎ সৃষ্টি হয়েছে কোটি কোটি বছর আগেকার পৃথিবীর প্রাথমিক জৈব উপাদান থেকে। প্রাণী জগতের সবাই সেই এককোষী আদিপিতার বংশধর।
চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ চারিদিকে বিতর্কের হৈচৈ ফেলে দিলো এবং বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক তত্ত্বের জন্য বিতর্কিত হয়। বিশেষত উগ্র ধর্মান্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে ডারউইন এবং তার বিবর্তনবাদ ভয়ানক হিংস্র আক্রমণের শিকার হলো। কিন্তু বিবর্তনবাদের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি কীভাবে প্রথম প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়।
Darwin wondered if life began in a “warm little pond” (Credit: Linda Reinink-Smith/Alamy)

ডারউইন জানতেন প্রশ্নটা অতীব গুরুতর, কিন্তু তিনি যথাসম্ভব সতর্কভাবে শুরু করেছিলেন তবুও চার্চের সাথে দ্বন্দ্ব এড়ানো সম্ভব হলো না। ১৮৭১ সালে লেখা এক চিঠিতে তিনি বিবর্তনবাদ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। আবেগমথিত ভাষায় তিনি বলতে চেয়েছিলেন, প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তিনি জানেন। প্রাণ বিকাশের প্রথম অনুকল্পটি উদ্ভূত হয়েছিল একটি সর্বগ্রাসী বাকস্বাধীনতাহীন দেশে। কিন্তু যদি (ওহহ কী বিশাল একটা যদি) আমরা বুঝতে পারি তবে দেখতে পাবো একটা ছোট উষ্ণ পুকুরে থাকে পর্যাপ্ত এমোনিয়া এবং ফসফরাস লবণ সেই সাথে আলো, উত্তাপ, বিদ্যুৎ এবং রাসায়নিকভাবে স্বয়ং উদ্ভূত আমিষের জটিলযৌগ আরও জটিল পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ভিন্নভাবে বলা যেতে পারে, কী ঘটেছিল যখন দীর্ঘদিন সাধারণ জৈব উপাদান একটা ছোট জলাভূমিতে সূর্যালোকে নিমজ্জিত ছিল। কিছু জৈব উপাদান হয়ত মিলেমিশে প্রাণের সদৃশ কোন বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছিল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল আমিষ এবং আমিষ আরও জটিল কোন বস্তুতে পরিণত হচ্ছিল। হতে পারে অস্পষ্ট ধারণামাত্র। কিন্তু ভবিষ্যতে এই অস্পষ্ট ধারণার উপর ভিত্তি করে অনুমান করা সম্ভব প্রথম কীভাবে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিল।
এই ধারণার আত্মপ্রকাশ ঘটে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানে। আপনি হয়ত ভাবতে পারেন ঈশ্বরবিহীন প্রাণ বিকাশের মত সাহসী চিন্তা বিকশিত হয়েছে একটা গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে মানুষের বাক স্বাধীনতা সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ। হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? কিন্তু না, বাস্তব ঘটনা হলো অলৌকিকতাকে পাশ কাটিয়ে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে প্রথম অনুমান করেন নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে যেখানে মুক্তিচিন্তা নিষিদ্ধ। তখন স্ট্যালিনের রাশিয়াতে সবকিছু রাস্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। মানুষের চিন্তা, এমনকি পঠন পাঠনের বিষয় যা কিছু কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয় সেটাও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। ওপারিন কল্পনা করতেন কেমন ছিল পৃথিবী যখন সবেমাত্র সৃষ্টি হলো?
সবথেকে আলোচিত ঘটনা ছিল স্ট্যালিন জীনতত্ত্বের প্রচলিত পঠন পাঠনের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের আরেক জীববিজ্ঞানী এবং কৃষিবিদ ট্রোফিম ডেনিশোভিচ লিসেঙ্কো জোসেফ মেন্ডেলের জিনতত্ত্ব এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদকে বাতিল করে বংশপরম্পরার উপর জোর দেন। তিনি মনে করতেন প্রাণী তার জীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত করে যায়। লিসেঙ্কো দেখালেন উন্নতজাতের গম থেকে উন্নত এবং অধিকফলনশীল কিভাবে উৎপাদন করা যায়। স্ট্যালিন কমিউনিস্ট ভাবধারার সাথে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ ট্রোফিম ডেনিশোভিচ লিসেঙ্কোর মতবাদকে চাপিয়ে দেন। জীনতত্ত্ব নিয়ে যেসব বিজ্ঞানীরা কাজ করছিলেন তাদেরকে জনসাধারণের কাছে লিসেঙ্কোর মতবাদকে সমর্থন এবং প্রচার করতে বাধ্য করা হয়। অন্যথায় তাদের স্থান হতো লেবার ক্যাম্পে।
Alexander Oparin lived and worked in the USSR (Credit: Sputnik/Science Photo Library)

স্ট্যালিনের দমন নিপীড়নের শাসনের মধ্যেই আলেক্সান্ডার ওপারিন চালিয়ে যেতে লাগলেন তার জৈবরাসায়নিক গবেষণা। ওপারিন নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন কারণ তার কমিউনিজমের প্রতি সন্দেহাতীত আনুগত্য। ওপারিন লিসেঙ্কোর তত্ত্বকে সমর্থন দিলেন এবং দেশের সেবা করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের “অর্ডার অফ লেনিন” সর্বোচ্চ পুরষ্কারে ভূষিত হন।
১৯২৪ ওপারিন প্রকাশ করলেন “দ্য ওরিজিন অফ লাইফ” তার অমর গ্রন্থখানি। দ্য ওরিজিন অফ লাইফ বইতে ওপারিন প্রাণের বিকাশ অন্বেষণে যে প্রস্তবনা করেন সেটা ডারউইনের বিবর্তনবাদের “একটি ছোট উষ্ণ পুকুর” ধারণার সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ওপারিন চিন্তা কল্পনা করেছিলেন কেমন ছিল সদ্য গঠিত পৃথিবীর চেহারা। পৃথিবীর উপরিভাগ ছিল কল্পনাতীত গরম, মহাকাশ থেকে খসে পড়া জ্বলন্ত পাথরের খণ্ড। পৃথিবী তখন ছিল বিভিন্ন ধরণের বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থমিশ্রিত অর্ধগলিত পাথরের বিশৃঙ্খল স্তুপ। পদার্থগুলোর মধ্যে কার্বনের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশী।
Oceans formed once Earth had cooled down (Credit: Richard Bizley/Science Photo Library)

যদি আমরা অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচে কোয়াসারভেটিভ (জৈব রাসায়নিক দ্রবণ) পরীক্ষা করে দেখি তাহলে দেখব দ্রবণটি জীবিত কোষের মত আচরণ করছে। ধীরে ধীরে উত্তপ্ত পৃথিবী ঠাণ্ডা হচ্ছে, জলীয় বাস্প ঘনীভূত হয়ে প্রথম বৃষ্টি নামল পৃথিবীর বুকে, তরল পানিতে তলিয়ে গেল চরাচর। বৃষ্টি পড়ার আগেও সমুদ্র ছিল তবে সেটা প্রচণ্ড উত্তাপে গলিত কার্বননির্ভর ঘন তরল। এমতাবস্থায় দুইটা জিনিস ঘটতে পারে।
প্রথমত, বিভিন্ন রাসায়নিক নিজেদের মাঝে বিক্রিয়া করে অসংখ্য নতুন জটিল যৌগ সৃষ্টি করতে পারে। তাদের মধ্যে কিছু যৌগ আরও জটিল যৌগে পরিণত হবে। আলেক্সান্ডার ওপারিন ধারণা করেন রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষুদ্র মৌলগুলি প্রাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চিনি এবং এমাইনো এসিড পৃথিবীর পানি থেকেই উৎপত্তি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কিছু রাসায়নিক দ্রব্য নতুন আণুবীক্ষণিক অণুজীবের কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। কিছু অণুজীবের জৈবরাসায়নিক উপাদান পানিতে দ্রবীভূত হয় না। যেমন তেল পানির উপর আস্তরণ সৃষ্টি করে ভেসে থাকে। কিন্তু যখন কিছু জৈবরাসায়নিক উপাদান পানির সাথে মিশে যায় তখন গোলাকার “কোয়াসারভেটিভ” বস্তুর রূপ ধারণ করে যেগুলো আয়তনে .০১ সেমি বা (.০০৪) ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। অণুজীব বেড়ে ওঠে, তারা অবয়ব পরিবর্তন করে এমনকি মাঝেমাঝে তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তারা চারপাশের পানির রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। এভাবেই জীবনসদৃশ রাসায়নিক উপাদান নিজেদের মাঝে সংগঠিত হতে থাকে। ওপারিন প্রস্তাব করেন কোয়াসারভেটিভ হলো আধুনিক জীবিত কোষের পূর্বপুরুষ।
ওপারিনের মতবাদে দেখা যাচ্ছে জীবিত অনুজীবের জন্ম হয়েছে পুরোপুরি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এখানে কোন ঈশ্বরের হাত নেই। এমনকি অলৌকিকভাবে জীবনী শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে এমন চিন্তাও প্রথাগত যার কোন ভিত্তি নেই।
পাঁচ বছর পরে ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী জন বারডন স্যান্ডারসন হালডেন একই মতবাদ নিয়ে র‍্যাশনালিস্ট অ্যানুয়াল জার্নালে একটা ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। হালডেন ইতিমধ্যেই বিবর্তনবাদে প্রভূত অবদান রেখে ফেলেছেন। তিনি ডারউইনের মতবাদকে বিকাশমান জীনতত্ত্বের আলোকে আরও সংহত করে।
রঙ্গমঞ্চে হালডেন তার জীবনের থেকেও বড় চরিত্র। একবার তিনি কানের পর্দায় ছিদ্রের চিকিৎসায় ডিকম্প্রেসন চেম্বারের অভিজ্ঞতার জন্য ডাক্তারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। কিন্তু পরে তিনি রম্য করে লিখেছিলেন, “কানের পর্দা সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ হয়ে যায়। যদি পর্দায় ছিদ্র থেকেই যায় এবং তারফলে কেউ যদি বধির হয়ে যায় তাহলে সে কারো ভ্রূক্ষেপ না করেই বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে পারবে যেটা হবে একটা সামাজিক অর্জন”।
ওপারিনের মত হালডেনও মতবাদ প্রচার করলেন, সমুদ্র প্রাথমিক অবস্থা থেকে স্থিতিশীল গরম ঘন তরলে পরিণত হলে কিভাবে সেখানের পানিতে রাসায়নিক অনুজীব নিজে থেকেই সৃষ্ট হতে পারে। পৃথিবীর এরকম পরিবেশে প্রথম জন্ম নেয় জীবনের অণুজীব অথবা অর্ধজীবন্ত বস্তু আর এরপরের স্তরে সৃষ্টি হয় স্বচ্ছ তেলতেলে জেলির মত থকথকে বস্তু।
কথিত আছে ওপারিন এবং হালডেন যে তত্ত্বের অবতারণা করেন পৃথিবীর সমস্ত জীববিজ্ঞানী সেগুলো ব্যক্ত করেন মাত্র। প্রাণের প্রথম বিকাশ ঘটেছে পুরোপুরি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এখানে কোন ঈশ্বরের হাত নেই। ডারউইনের বিবর্তনবাদের আগেও পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। ডারউইন সেটাকে যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছেন কিন্তু এই তত্ত্ব খ্রিস্টবাদের ভিত্তিমূলে চরম কুঠারাঘাত।
ডারউইনের বিবর্তনবাদের একটাই সমস্যা ছিল। তার প্রচারিত বিবর্তনবাদকে নির্ভুল প্রমাণ করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নিরিখে কোন প্রমাণ নাই। ঈশ্বরবিহীন সৃষ্টিতত্ত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নে কোন সমস্যা নয় কারণ কমিউনিস্ট শাসিত সোভিয়েত রাষ্ট্রীয়ভাবেই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। সেজন্যই কমিউনিস্ট নেতারা প্রাণের উৎপত্তি গবেষণায় বস্তবাদী ব্যাখ্যাকে অকুন্ঠ সমর্থন জানায়। হাল্ডেন নিজেও ছিলেন একজন নাস্তিক এবং কমিউনিজমের কড়া সমর্থক।
তখনকার সময়ে বিবর্তনবাদ গৃহীত হবে নাকি বাতিল করবে সেটা নির্ভর করত প্রধানত ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের উপর। জীবনের উৎস অনুসন্ধান করা বিশেষজ্ঞ জীববিজ্ঞানী জার্মানির ওসনাব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আরমেন মালকিদজানিয়ান বলেন, বিবর্তনবাদ গৃহীত হবে কি হবে না নির্ভর করে মানুষেরা কি ধর্মে বিশ্বাস করে নাকি বাম ধারার কমিউনিজম সমর্থন করে সেটার উপর। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিবর্তনবাদ সাদরে গৃহীত হয়েছে কারণ সেখানে ঈশ্বরের প্রয়োজন ছিল না। যদি পশ্চিমাবিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব সেখানের মানুষেরা অনেক বস্তুবাদী। তাদের চিন্তা বাম ঘেঁষা কমিউনিস্ট বা উদারপন্থার দিকে ধাবিত।
প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে আদিম জৈবরাসায়নিক ঘন তরল সহযোগে এই ধারণাটি ওপারিন-হালডেন তত্ত্ব বলে ব্যাপক পরিচিত পেয়ে গেল। ওপারিন-হালডেন তত্ত্ব যুক্তির বিচারে গ্রহণযোগ্য হলেও তত্ত্বটির একটা সমস্যা ছিল। ওপারিন-হালডেন তত্ত্বকেও নির্ভুল করার স্বপক্ষে কোন গবেষণালব্ধ প্রমাণ নেই। পচিশ বছর পার হয়ে গেলেও তত্ত্বটির স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দাড় করানো যায়নি।
The English geneticist J. B. S. Haldane (Credit: Science Photo Library)
সময়ের সাথে প্রাণের উদ্ভব গবেষণায় যোগ দেন ১৯৩৪ সালে রসায়নে নোবেল বিজয়ী আমেরিকান রসায়নবিদ। হ্যারল্ড উরে পারমাণবিক বোমা বানানোর দলেও কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ম্যানহাটান প্রকল্পে পারমাণবিক বোমার অতি প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম ২৩৫ সমৃদ্ধ করতেন। যুদ্ধের পরে তিনি নিউক্লিয়ার প্রযুক্তিকে সুশীল সমাজের নিয়ন্ত্রণে দেয়ার জন্য আন্দোলন করেন। প্রফেসর উরে ধারণা করেছিলেন, আমদের পৃথিবী আদিম অবস্থায় সম্ভবত অ্যামোনিয়া, মিথেন এবং হাইড্রোজেনের মিশেলে পিণ্ডাকৃতির ছিল। এই মিশ্রণকে যদি বৈদ্যুতিক বিস্ফোরণ এবং পানির সংস্পর্শে আনা যায় তাহলে অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করা সম্ভব। এটা সর্বজন বিদিত যে, অ্যামাইনো এসিড হলো জীবনের প্রথম উপাদান।
উরে এই সময়ে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ এবং মহাকাশের ভাসমান বস্তুকণার রসায়ন নিয়ে আগ্রহী হন বিশেষকরে দেখতে চেয়েছিলেন সৌরজগৎ যখন সবে সৃষ্টি হলো তখন ঠিক কী ঘটছিল। একদিন তিনি ক্লাসে বললেন সৃষ্টিলগ্নে পৃথিবীর বায়ুস্তরে সম্ভবত অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল না। রাসায়নিক বিক্রিয়ার সংস্পর্শে অক্সিজেন হয়ত ধ্বংস হয়ে গেছে। উরের ক্লাস লেকচারের প্রস্তাবিত ‘অক্সিজেনবিহীন পৃথিবী’ ওপারিন এবং হালডেনের আদিম জৈবরাসায়নিক ঘন তরল ধারণাকে আরও বেগবান করে। প্রফেসর হ্যারল্ড উরের ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন পিএইচডি’র গবেষণারত ছাত্র স্ট্যানলি মিলার। মিলার প্রফেসর উরেকে প্রস্তাব দেন পরীক্ষা করে দেখার আসলেই কেমন ছিল সেদিনের সৌরজগতের পরিবেশ। উরে নিজের ক্লাস লেকচারের উপর কিছুটা সন্দেহ পোষণ করলেও মিলার অক্সিজেনবিহীন পৃথিবীর চিন্তায় মনোনিবেশ করলেন। তাদের মাঝে বিস্তর আলোচনার পরে ১৯৫২ সালে প্রফেসর উরে এবং তার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র স্ট্যানলি লয়েড মিলার যৌথভাবে প্রথমবারের মত প্রাণের খোঁজে বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিখ্যাত ‘উরে-মিলার এক্সপেরিমেন্ট’ পরীক্ষা শুরু করলেন।
The Miller-Urey experiment (Credit: Francis Leroy, Biocosmos/Science Photo Library)
পরীক্ষার যন্ত্রপাতি খুব সাধারণ। মিলার পূর্বের আলোচিত ধারণা অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্নের চারটি রাসায়নিক উপাদান গরম পানি, হাইড্রোজেন গ্যাস, অ্যামোনিয়া এবং মিথেন চারটি কাঁচের জারে পূর্ণ করে তাদের মাঝে সংযোগ করে দিলেন। কাঁচের গ্লাসের মাঝে মিলার বারবার তড়িৎপ্রবাহ দিতে লাগলেন যাতে বজ্রপাত ঘটে। আদিকালে পৃথিবীতে বজ্রপাতের ঘটনা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক।  এই পরীক্ষার মাধ্যমে খুব সাধারন পরিবেশেই প্রচুর পরিমাণ জৈব অনু উৎপাদন সম্ভব। মিলার দেখতে পেলেন প্রথমদিনেই কাঁচের জারের মধ্যকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গোলাপী আভা ধারন করেছে এবং সপ্তাহ শেষে ঘন তরল দ্রবণটি গাঢ় লাল হয়ে গেল। পরিষ্কার বোঝা গেল জারে জৈব রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ তৈরি হয়েছে।
মিলার পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে মিশ্রণটিতে গ্লাইসিন এবং আলানাইন নামে দুইটা অ্যামাইনো এসিড পেলেন। অ্যামাইনো এসিডকে জীবন সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অ্যামাইনো এসিড আমিষ সৃষ্টিতে সাহায্য করে। আমিষ আমাদের শরীরের শারীরবৃত্তিক এবং জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মিলার গবেষণাগারে জন্ম দিলেন প্রাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  মিলারের গবেষণার ফলাফল বিখ্যাত সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হলো ১৯৫৩ সালে। প্রাণের বিকাশ অভিযানে ‘উরে-মিলার এক্সপেরিমেন্ট’ স্মরণীয় ঘটনা। উদার প্রফেসর উরে এই গবেষণার সমুদয় কৃতিত্ব মিলারকে দিয়ে আর্টিকেল থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিজ্ঞানের গবেষক জন সাদারল্যান্ড বলেন, “উরে-মিলার পরীক্ষার শক্তি এখানেই যে, আপনি সাধারণ পরিবেশে প্রচুর অণুজীব সৃষ্টি করতে পারবেন”। জীবন আরও জটিল যা আমরা চিন্তা করি তার থেকেও বেশি।
পরবর্তীতে আরও গবেষণায় পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে অন্যান্য গ্যাসের মিশ্রণও ছিল আবিষ্কারের কারণে আগের গবেষণা ভুল প্রমানিত হয়। কিন্তু সেটা নিয়ে সম্পূরক আলোচনা হতে পারে। জন সাদারল্যান্ড বলেন, “উরে-মিলার পরীক্ষা ছিল দৃষ্টান্ত, তারা মানুষের কল্পনা জাগাতে পেরেছিলেন এবং প্রাণের উৎস সন্ধানে ব্যাপকভাবে চর্চা করতে থাকে”। মিলারের পরীক্ষার প্রভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও এগিয়ে এলেন ভিন্ন ভিন্ন মৌল থেকে অনুজীব সৃষ্টির গবেষণা করে প্রাণের উৎস সন্ধানে। প্রাণের রহস্য উন্মোচনের হাতছানি মনে হয় সন্নিকটে। এতদিনে পরিষ্কার হওয়া গেছে জীবন এত জটিল যে আমাদের চিন্তাকে বিহ্বল করে দেয়। অবশেষে জানা গেল জীবন্ত কোষ শুধুমাত্র কিছু রসায়নের জটিল যৌগ নয় জীবন হলো সূক্ষ্ম শিল্পিত যন্ত্রবিশেষ। হঠাৎ করে সম্পর্কহীন বস্তু থেকে নিজেকে সৃষ্টি করে নিজেই আবার বড় বাধা অতিক্রম করে ছুটে যায় নতুন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীদের বুঝে ওঠার আগেই।
The machinery inside cells is unbelievably intricate (Credit: Equinox Graphics Ltd)
দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ বিজ্ঞান সভায় বিভাজন
১৯৫০ সালের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীগণ আমাদের জীবন ঈশ্বরের দান বহুদিনের পুরনো বাসি ধারণা থেকে সরে আসতে থাকে। তার পরিবর্তে তারা সম্ভাবনাময় জীবন কীভাবে নিজে নিজেই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হলো সেই রহস্য উন্মোচনে আগ্রহী হয়ে উঠল। এবং যুগান্তকারী পরীক্ষার জন্য অবশ্যই স্ট্যানলি মিলারকে ধন্যবাদ। বিজ্ঞানীগণ জীবন অন্বেষণে মিলারের পরীক্ষা থেকে ভবিষ্যৎ গবেষণার রশদ পেয়ে গেলেন।
মিলার যখন ভিন্ন ভিন্ন বস্তু থেকে জীবনের উপাদান বানাতে ব্যস্ত তখন কিছু বিজ্ঞানী জীন  কিসের তৈরি খুঁজতে গবেষণারত। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীগণ অনেকগুলো অনুজীবকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। চিনি, চর্বি, আমিষ, নিউক্লিক এসিড যেমন ডিঅক্সিরিবোনিউক্লিক এসিড বা সংক্ষেপে ডিএনএ আবিষ্কার হয়ে গেছে এতদিনে। ২০শতক হলো আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলো এই শতাব্দীতেই ঘটেছে।
আজকে আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি ডিএনএ আমাদের জীন বহন করে। কিন্তু ডিএনএ আবিষ্কার ১৯৫০ দশকের বিজ্ঞানীদের জন্য একটা আঘাত কারণ আমিষের জটিল গঠন দেখে তারা আমিষকেই জীন ভেবেছিলেন। ১৯৫২ সালে আলফ্রেড হারশে এবং মার্থা চেস বিজ্ঞানীদের ভুল ভেঙ্গে দেন। তারা ওয়াশিংটনের কার্নেজি ইনস্টিটিউটে শুধু প্রোটিন আর ডিএনএ বহনকারী ক্ষুদ্র ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন। পুনোরুৎপাদনের জন্য ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মাঝে সংক্রামিত হয়। পরীক্ষায় আলফ্রেড হারশে এবং মার্থা চেস জানতে পারলেন সংক্রামক ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেছে কিন্তু প্রোটিন বাইরেই রয়ে গেল। পরিষ্কার বুঝা গেল, ডিএনএ হলো জীনের উপাদান।
হারশে এবং মার্থা চেস’র পরীক্ষার ফলাফল ডিএনএ কীভাবে কাজ করে এবং কেমন তার গঠন আবিষ্কারের গবেষণায় তোলপাড় সৃষ্টি করে দিলো। পরের বছর ডিএনএ রহস্যের সমাধান করে ফেললেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ফ্রান্সিস ক্রিক এবং জেমট ওয়াটসন। দীর্ঘ পরিশ্রমসাধ্য গবেষণায় তাদেরকে সাহায্য করে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। ২০শতকের আবিষ্কারগুলো জীবনের উৎস অন্বেষণের পথে নতুন মাত্রা যোগ করে। আবিষ্কৃত হতে থাকে জীবন্ত কোষের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস্য জটিলতা।
James Watson and Francis Crick with their model of DNA (Credit: A. Barrington-Brown/Gonville and Caius College/Science Photo Library)
ক্রিক এবং ওয়াটসন বুঝতে পেরেছিলেন ডিএনএ হলো দুইটা প্যাচানো মইয়ের সদৃশ বস্তু যারা আবার নিজেদের মধ্যেও সর্পিল আকৃতিতে জড়িয়ে থাকে। প্যাচানো মইয়ের দুই প্রান্ত নিউক্লিওটাইড নামের মলিকিউল দ্বারা গঠিত। আমার আপনার এবং আমাদের সবার জীন এসেছে ব্যাকটেরিয়া নামের আদিপিতা থেকে। ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করে কিভাবে আমাদেরকে কোষ ডিএনএকে অনুসরণ করে। অন্যভাবে বলা যায়, ডিএনএ উন্মোচন করে কিভাবে বাবা-মা তাদের জীনের প্রতিলিপি তৈরি করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এখানের মূল আলোচ্য বিষয় হলো, এখন প্যাচানো দুই সর্পিল মইয়ের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। তখন আমরা জানতে পারি জীবের বংশগতির ধারা যা তৈরি হয়েছে জীবের বংশপরম্পরায়। বংশগতির ধারাকে আমরা এ, টি সি এবং জি দিয়ে চিহ্নিত করতে পারি। বংশগতির ভিত্তি সাধারণত ডিএনএ’র সর্পিল মইয়ের মধ্যে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে এবং প্রতিলিপি তৈরির প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
এই একই প্রক্রিয়ায় বংশগতি জীবনের শুরু থেকেই বাবা-মা তাদের সন্তানদের মাঝে জীবনের বৈশিষ্ট্য প্রবাহিত করতে থাকে। ক্রিক এবং ওয়াটসন আবিষ্কার করেন ব্যাকটেরিয়া থেকে কিভাবে ধাপে ধাপে বংশগতির প্রতিলিপি তৈরি করে প্রাণী আজকের অবস্থানে চলে এসেছে।
ক্রিক এবং ওয়াটসন ১৯৫৩ সালে তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান “নেচার”বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। ক্রিক এবং ওয়াটসনের আবিষ্কারের ফলে পরের বছরগুলোতে জৈবরাসায়নিক বিজ্ঞানীগণ ডিএনএ ঠিক কী তথ্য বহন করে সেটার আদ্যপান্ত খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারা দেখতে চাইলেন কীভাবে DNA তে সংরক্ষিত তথ্য জীবন্ত কোষে ব্যবহৃত হয়। জীবনের অভ্যন্তরে লুকায়িত গোপন খবর প্রথমবারের মত প্রকাশের পথে। তখন হঠাৎ করে বিজ্ঞানীদের কাছে ওপারিনের ধারণাকে মামুলি সাদাসিধা।
আবিষ্কার হয়ে গেল DNA ’র মাত্র একটাই কাজ। আপনার ডিএনএ আপনার কোষদেরকে বলে দেয় কীভাবে প্রোটিন তৈরি করতে হবে। প্রোটিন সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে মলিকিউল। প্রোটিন ছাড়া আপনি খাদ্য হজম করতে পারবেন না, আপনার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে এবং আপনি নিশ্বাস নিতে পারবেন না।
DNA থেকে প্রোটিন উৎপন্নের জটিল প্রক্রিয়া দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। যে কারো পক্ষে জীবনের উৎস কী ব্যাখ্যা করতে যাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ল কারণ এত জটিল প্রক্রিয়া কীভাবে একা একা শুরু হয়েছিল সেটা বিজ্ঞানীগণের চিন্তার জন্যও দুরূহ। প্রতিটি প্রোটিনই মূলত অ্যামাইনো এসিডের বিশাল শিকল একটা বিশেষ শৃঙ্খলার বাঁধনে তারা পারস্পারিক আবদ্ধ। অ্যামাইনো এসিডের ক্রম নির্ধারণ করে দেয় প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক আকার এবং এভাবেই প্রোটিন কাজ করে। সর্পিল DNA’র অভ্যন্তরে প্রাণের প্রয়োজনীয় তথ্য সাংকেতিক আকারে লিপিবদ্ধ থাকে। সুতরাং যখন একটা কোষকে কোন নির্দিষ্ট প্রোটিন সৃষ্টি করতে হয় তখন সে অ্যামাইনো এসিডের শিকলের নাগাল পেতে DNA’র মধ্যে সংরক্ষিত জীন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বিশ্লেষণ করতে শুরু করে।
কিন্তু এখানেও একটা প্যাচ আছে। DNA জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোষ DNA কে সংরক্ষণ করতে নিরাপদে জমিয়ে রাখে। এই কারণে কোষ DNA’র তথ্যকে প্রতিলিপি করে RNA (রাইবোনিউক্লিক এসিড) মলিকিউলে স্থানান্তর করে। DNA যদি পাঠাগারের বই ধরি তাহলে RNA  হবে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ লেখা ছেঁড়া কাগজের সমষ্টি। DNA’র তুলনায় RNA ছোট। সর্পিল মইতে RNA’র একটামাত্র সুতোর মত প্রান্ত। এপর্যায়ে RNA’র মধ্যে সংরক্ষিত তথ্য প্রোটিনে পরিণত হয় এবং প্রচুর পরিমাণ ‘রাইবোসোম’ মলিকিউল গঠন করে।
প্রতিটি জীবিত কোষে এই সৃষ্টি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এমনকি অতি সাধারণ ব্যাকটেরিয়াও এই প্রক্রিয়ার বাইরে নয়। খাদ্যগ্রহণ এবং অবিরাম নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চালিয়ে যাওয়া জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণের উৎস ব্যাখ্যা করতে গেলে আমাদের অবশ্যই DNA, RNA, রাইবোসোম এই তিন প্রোটিনের জটিল মিথস্ক্রিয়া বুঝতে হবে। কীভাবে তাদের উৎপত্তি হলো, কেমন করেই বা তারা পরস্পর কাজ শুরু করে।
Cells can become enormously intricate (Credit: Russell Kightley/Science Photo Library)
হঠাৎ করেই ওপারিন এবং হালডেনের ধারণা নিতান্ত সাদামাটা প্রতীয়মান হয়ে গেল। একই সাথে মিলারের যে যুগান্তকারী পরীক্ষার মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছিল অ্যামাইনো এসিড যা দিয়ে প্রোটিন সৃষ্টি সম্ভব সেটাকেও মনে হলো অসম্পূর্ণ এবং ভাসাভাসা। কীভাবে জীবন সৃষ্টি হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর থেকে এখনো আমরা অনেক দূরে। মিলারের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ছিল সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনের দীর্ঘ যাত্রাপথের সূচনামাত্র। জীবন গঠিত হয়েছিল RNA দিয়ে এই ধারণা এখন প্রভূত প্রমাণিত এবং বিজ্ঞানে খুব প্রভাবশালী তত্ত্ব।
জন সাদারল্যান্ড বলেন, “DNA সৃষ্টি করে RNA এবং RNA সৃষ্টি করে প্রোটিন যা লিপিড হিসেবে মুখ আটকানো রসায়নের থলের মধ্যে থাকে। আপনি যদি DNA, RNA এবং লিপিডের দিকে তাকাই তাহলে এর জটিলতা দেখে বিস্ময়ে আপনার মুখ হা হয়ে যাবে। কীভাবে আমরা খুঁজে পাবো
অন্যান্য বিজ্ঞানীগণকে যদি ধরি প্রাণের উৎস গবেষণার রাস্তা তৈরি করেছেন তাহলে ব্রিটিশ রসায়নবিদ লেজলি ওরগেলকে বলতে হবে প্রথম বিজ্ঞানী যিনি সেই রাস্তায় যাত্রা শুরু করেন। লেজলি ওরগেলই প্রথম ক্রিক এবং ওয়াটসনের DNA’র মডেল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরে তিনি মঙ্গলগ্রহে রোবটিক যান পাঠাতে নাসা’র ভাইকিং প্রোগ্রামে সাহায্য করেছিলেন। ওরগেল প্রাণের উৎস কী এই বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসাকে চিহ্নিত করলেন। ১৯৬৮ সালে লিখিত এক গবেষণাপত্রে তিনি দাবি করেন জীবনের শুরুতে প্রোটিন বা DNA কিছুই ছিলনা। জীবন সৃষ্টি হয়েছিল পুরোপুরি RNA দিয়ে এবং ফ্রান্সিস ক্রিক ওরগেলের এই দাবীকে সমর্থন দেন।
ওরগেলের দাবী যদি সঠিক হয় তাহলে আদিম RNA মলিকিউলকে অবশ্যই অভিযোজন ক্ষমতা থাকতে হবে এবং তারা নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করবে। ধারণা করা হচ্ছে সম্ভবত DNA  একই প্রক্রিয়া কাজ করে।
জীবন গঠিত হয়েছিল RNA দিয়ে এই ধারণা এখন প্রভূত প্রমাণিত হয়েছে এবং বিজ্ঞানে খুব প্রভাবশালী তত্ত্ব। কিন্তু জন্ম দিয়েছে বৈজ্ঞানিক তর্কযুদ্ধের যা অবধি চলছে।
জীবন শুরু হয়েছিল RNA দিয়ে দাবী করেই ওরগেল ক্ষান্ত হননি, তিনিই সবার আগে প্রস্তাব করেন RNA নিজেকে নিজেই পুনরুৎপাদন করতে পারে যা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। অন্যভাবে বলা যায় তিনি শুধু জীবন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল সেটাই বলেননি, জীবন কী এই প্রশ্নেরই সমাধান তিনি করে ফেলেছেন। এ পর্যায়ে বিজ্ঞানীগন প্রাণের জন্ম রহস্য নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেলেন।
DNA is at the heart of almost every living thing (Credit: Equinox Graphics Ltd)
অনেক জীববিজ্ঞানী ওরগেলের ‘প্রাণ নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে’ দাবীর সাথে সহমত পোষণ করলেন। ডারউইনের বিবর্তনবাদের সারাংশ ছিল নিজের অসংখ্য প্রতিলিপি বা সন্তান জন্মদানের মাধ্যমেই শুধু প্রাণী নিজের বংশ রক্ষা করতে পারে। কিন্তু জীবনের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো যেমন জীবন বেঁচে থাকার জন্য একটি জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে ঘটতে থাকা রাসায়নিক প্রক্রিয়া। বেঁচে থাকতে হলে চারিপাশের পরিবেশ থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়। অনেক জীববিজ্ঞানী মনে করেন জীবনের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো জীবনের অভ্যন্তরীণ চলমান রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং জীবের নিজের প্রতিলিপি উদ্ভব হয়েছে অনেক পরে। এখানেই বিতর্কের শুরু। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীগণ জীবনের উত্থান গবেষণায় দুই সলে বিভক্ত। সাদারল্যান্ড বলেন, “জীবনের অভ্যন্তরীণ চলমান রাসায়নিক প্রক্রিয়া নাকি বংশগতি প্রথম” প্রশ্নই বিজ্ঞানীগণের নতুন দুই প্রান্তে বিভাজন। তাই বিজ্ঞান সভা মাঝে মাঝেই দ্বিধা বিভাজনের তর্কে পর্যবসিত হয়। ততদিনে তৃতীয় একদল বিজ্ঞানী প্রচার করলেন প্রথমে মলিকিউলের ধারকের জন্ম হয়েছে কারণ তারা ছিল তখন ভাসমান। জীবন সৃষ্টিতে কোষের উপাদানগুলোকে জড়ো করতে হয়েছে। কোষের উপাদানগুলো ছাড়া অভ্যন্তরীণ চলমান রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব নয়। সাদারল্যান্ড বলেন, প্রাণ সৃষ্টিতে কোষের প্রয়োজন যে কথা ওপারিন এবং হালডেন কয়েক দশক আগেই জোরালোভাবে বলে গেছেন। সম্ভবত জীবনের প্রথম কোষ চর্বি জাতীয় স্বচ্ছ তরল পর্দায় আবৃত ছিল।
জীবন বিকাশের এই তিনটা গবেষণা এবং তর্কালোচনার স্বপক্ষে বিপক্ষে অনেক বিজ্ঞানী আছেন এবং অদ্যাবধি আলোচনা চলছে। বিজ্ঞানীগণ নিজেদের ধারণার স্বপক্ষে নিরন্তর গবেষণা করেছেন এমনকি অনেক সময় অন্ধভাবে স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করছে। প্রায়ই দেখা যায় একদন বিজ্ঞানী আত্মপক্ষ সমর্থন করে অন্য বিজ্ঞানীগণকে নির্বোধ বলতেও দ্বিধা করছে না। ফলে জীবনের উৎস নিয়ে বিজ্ঞান সভার বিতর্ক সাংবাদিকদের পত্রিকার চটকদার কলাম আর সাধারণ পাঠকদের মুখরোচক গল্পে পরিণত হয়েছে। ওরগেলকে ধন্যবাদ। তিনি প্রথম ধারণা দিলেন বংশগতি নয় বরং জীবন গঠিত হয়েছিল RNA দিয়ে। তারপর এলো ১৯৮০ দশক, বিজ্ঞানের চমক লাগানো আবিষ্কারের যুগ এবং পাওয়া হওয়া গেল কীভাবে জীবনের জন্ম প্রশ্নের অমীমাংসিত উত্তর।
RNA could be the key to life’s beginning (Credit: Equinox Graphics Ltd)

Saturday, June 2, 2018

মিথ্যা কিভাবে বলবেন কিংবা কিভাবে সফলভাবে মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করবেন?

 লিখেছেন: সরকার আশেক মাহমুদ
 আমি দু একজন মনোবিজ্ঞানীদের বক্তব্যের প্রায় সরাসরি অনুবাদের ভিত্তিতে লেখাটা লিখতে চাচ্ছি।
অনলাইন পাঠকদের মনোযোগ ধরে রাখার কথা বিবেচনা করে লেখাটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
শুরুতে বলে রাখা দরকার প্রতারণা কেবল মাত্র মানুষের জন্য কোনো বিশেষ ব্যাপার ভেবে বসলে ভুল করবেন। সমুদ্রে নিচের প্রাণীরাও একে অন্যকে শিকার করার জন্য ছদ্দবেশী বা প্রতারণার আশ্রয় নেয় । কেউ শিম্পাঞ্জিকে যখন হুমকি দেয় তখন নিজের শরীর প্রশস্ত করে দাঁড়ায় যাতে অন্যরা তাকে বড় বা শক্তিশালী ভেবে ভয় পেয়ে যায়। বিবর্তনের পরিক্রমায় তাদের অস্তিত্ত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এই ভনিতা তাদের সাহায্য করছে বলেই হয়তো এগুলো টিকে আছে।
তবে মানুষের প্রতারণা বা deception এর তরিকা এবং মাত্রা উচ্চ পর্যায়ের। দীর্ঘ বিবর্তন পরিক্রমায় অস্তিত্ত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মানুষ নামক সামাজিক জীব বা প্রজাতিটি একই সঙ্গে দুইটি ক্ষমতাই সুদৃঢ় হয়েছে - মূলত সমাজে টিকে থাকার জন্য ই।
ক.-সফল ভাবে মিথ্যা বলতে পারা
খ.-মিথ্যা বলা ধরতে পারা।
প্রতারণা প্রক্রিয়ায় আমাদের অবচেতন মন বিশেষ ভাবে সাহায্য করে। সবচেয়ে সফল মিথ্যা হইল যে মিথ্যা আমরা নিজেদেরকে বলি। আপনি সবেচেয়ে ভাল ভাবে মিথ্যা বলতে পারবেন যদি আপনি যে মিথ্যাটি বলবেন তা নিজে বিশ্বাস করতে পারেন।
১।
হলিউডের একজন বিখ্যাত ফিল্ম ডিরেক্টর ছিলেন আলফ্রেড হিজকক। তিনি শিশু অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করতে বিরক্ত বোধ করতেন। কারণ তাদের প্রায়শই যা অভিনয় করতে বলা হয়তো তা তারা পারতোনা। একবার একটা দৃশ্যে একটা শিশু অভিনেতার কান্নাকাটি করার কথা যদিও সে কিছুতেই কাঁদবার অভিনয় করতে পারছিলনা। তারপর হিজকক উপায়ন্তর না দেখে ঐ শিশুর কানে এসে বিড়বিড় করে বললেন
- “তোমার মা বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছেন, তারা আর তোমাকে নিতে আসবেনা। ”
সাথে সাথেই শিশু অভিনেতাটি কাঁদতে শুরু করলো- অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। ডিরেক্টর সাহেব ক্যামেরামেনকে নির্দেশ করলেন রেকর্ড করে নিতে। আপনি যদি তখন ঐ শিশু অভিনেতাটিকে দেখতেন আপনার মনে হইত যেন সে অভিনয় করছেনা বাস্তবেই কাঁদছে।
-বলা বাহুল্য শিশুটি আসলেই কাঁদছিল ।
২।
আমি যদি একটা প্রতিযোগিতা আয়োজন করি যেখানে এক লাখ ডলার পুরুষ্কার দিবো তাকেই যে এমন মুখভঙ্গি দেখাতে পারবে যে সে আসলেই কষ্টে আছে-
আমার মনে হয় খুব ভাল হবে আপনি আপনার কলমটি নিয়ে জোড়ে নিজেই নিজের রানের মধ্যে বিঁধিয়ে দিন। এরফলে আপনি হয়ত অন্য সবার চেয়ে ভাল কষ্ট পাবার অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভনিতা প্রকাশ করে পুরষ্কার জিতে নিতে পারবেন।
৩।
আপনি যদি কাউকে বিশ্বাস করাতে চান যে আপনি তাকে ভালবাসেন, আপনি তাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না কিংবা সে আপনাকে সর্বস্ব দিয়ে আস্থা করতে পারবে তাহলে সবচেয়ে ভাল কৌশল হবে আপনি যদি নিজে সত্যিকার অর্থে তা বিশ্বাস করেন।
অবচেতন মনের এই বর্ননাটা থেকে আমরা বোঝতে পারি যে কিছু কিছু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য - বিশেষ করে অশোভ গুলো অবচেতন রাখাই শ্রেয় যাতে প্রতারক নিজেও যেন অনুভব করেন যেন সে জানে না যে তার এই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য আছে।
স্টিভেন পিঙ্করের মতে পৃথিবীর সব জায়গার (আদিবাসী সমাজ সহ) বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতারা কতটা আন্তরিক বিশ্বাসী বা কতটুকু সিনিকাল হয় তা বোঝবার জন্য গবেষণামূলক নৃবেজ্ঞানীদের ইম্পিরিকাল টেস্ট চালানো উচিৎ। এমনও হতে পারে তারা তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যের স্তর থেকে আন্তরিক কিন্তু বিবর্তনমূলক উদ্দেশ্যের স্তর থেকে সিনিকাল। কারন আন্তরিকতা মানুষকে বোকা বানাবার খুবি ভাল একটি তরিকা।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের থিউরি অফ সেল্ফ ডিসেপশন বা আত্মবিভ্রমের মতবাদ অনুযায়ী বিবর্তন বাদী অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিযোগিতায় যেখানে প্রতারণা করা কিংবা প্রতারণা ধরতে পারার প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ প্রতারণাকারী হবে সে যে এক অর্থে নিজেই নিজের মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে যাতে সে তার ভয়াবহ সত্য মনের ভূলে, স্ব-বিরোধিতা (self contradiction) বা অসতর্ক নার্ভাসনেস ইংগিতকারক (যেমন ধরুন ঘামতে শুরু করা ইত্যাদি ) ঘটনার কারনে কোন ভয়াবহ সত্য প্রকাশ করে না ফেলে।
বড় বড় নেতারা যদি সিনিকাল হতেন বা নিজেদের মিথ্যায় নিজেরা বিশ্বাস না করতেন তাহলে কেউ তাদের বিশ্বাস করতোনা। কিংবা তাদের সিনিসিজম তাদের আচরণ থেকে ধরা পরে যেত ।

Thursday, May 31, 2018

একজন ঈশ্বর বিশ্বাসী নাস্তিকের কথা ।

আমি একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি এবং তিনি সত্যিকার অর্থে সর্বশক্তিমান । একজন একাধিক না এবং পরকালে তার কাছ থেকে ভাল কাজের প্রতিদান আশা করছি। তবে আমি কি বিশ্বাস করি তা বলার আগে আমি কি বিশ্বাস করি না এবং কেন তা বিশ্বাস করিনা তা বলা প্রয়োজন় ।
আমি বিশ্বাস করিনা ইহুদীদের গির্জা থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (ইহুদি ধর্ম),
রোমান গির্জা থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (খ্রিস্টান ধর্ম) কিংবা
মুসলিম (Turkish church*) থেকে প্রচারিত ধর্মীয় বিশ্বাস (ইসলাম ধর্ম ) ।
কিংবা অন্য যত গির্জার কথা আমি শুনেছি।
আমার নিজের মনই (বিবেকই) আমার গির্জা, মন্দির বা মসজিদ ।
আমি এই ঘোষণা দিতে গিয়ে বলতে চাচ্ছিনা যে, যারা অন্য কিছু বিশ্বাস করে তাদেরকে আমি নিন্দা করছি। আমার যেমন নিজের বিশ্বাসের উপর আস্থা করার অধিকার আছে তেমনি তাদেরও অধিকার আছে নিজেদের বিশ্বাস ধরে রাখার।
ধর্মের বিশ্বাসের সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের যেখানে ব্যাভিচার মূলক সম্পর্কটি হয়েছে- সেখানেই মানুষকে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম গুলোর সমালোচনাকে হুমকি, ভয় আর অত্যাচারের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রতিটা ধর্ম তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক ধরনের ঐশ্বরিক দায়িত্ব পালনের ভনিতা করে- বলে কিনা কোন একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে তা ঈশ্বর একান্ত গোপনে অর্পণ করেছিল রেভেলেশন (Revelation) বা ঐশ্বরিক বাণীর মাধ্যমে।
ইহুদীদের আছে মুসা নবী।
খ্রিস্টানধর্মাবলম্বীদের আছে ইসা মাসীহ, তার এপাসল এবং পরবর্তীতে সেইন্ট সমূহ।
মুসলিমদের আছে হজরত মোহাম্মদ সা:।
সংগঠিত ধর্ম গুলোর দাবি এমন যে ঈশ্বরের দিকে যাবার বা ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের রাস্তা সব মানুষের জন্য সমান ভাবে খোলা নাই কিংবা যেমন ঈশ্বর সবার সাথে যোগাযোগ করতে অক্ষম।
প্রতিটা গির্জা একটা করে নির্দিষ্ট বইয়ের কথা বলে এবং বলে যে এইটা ঈশ্বরের বাণী (বা রেভেলেশন/ উন্মোচন)
ইহুদিরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী ঈশ্বর নিজে মুসাকে সামনাসামনি এসে দিয়ে গিয়েছিল।
খ্রিস্টানরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী এসেছিল ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণার (divine inspiration) মাধ্যমে।
আর মোসলমানরা বলে তাদের ঈশ্বরের বাণী কোরআন মোহাম্মদের কাছে নিয়ে এসেছিল একজন ফেরেস্তা স্বর্গপুরী থেকে নেমে এসে। এদের প্রত্যেকে একে অন্যেকে অবিশ্বাসের দোষে দোষারোপ করে। আর আমি অবিশ্বাস করি এদের সবাইকে।
বাকি আলাপে যাবার আগে আমাকে বলে নিতে হচ্ছে ঐশ্বরিক বাণী বা রিভেলেশন কে ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে বোঝানো হয় এমন কিছু যা ঈশ্বর থেকে সরাসরি মানুষের কাছে দেয়া হবে। কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এইভাবে যোগাযোগ করবার ক্ষমতার আছে এবং যদি চান এভাবে যোগাযোগ করতে উনি তা পারবেন - কারণ উনি সর্বশক্তিমান।
এখন আপনারা যদি বলেন একটা নির্দিষ্ট ঐশ্বরিক বাণী শুধু একজন ব্যাক্তির কাছে উন্মোচন করা হয় এবং অন্য কারো কাছে তা উন্মোচন না করা হয়, তাহলে ঐ ঐশ্বরিক বাণী শুধু ঐ ব্যক্তি জন্যে প্রযোজ্য- কারণ তার কাছেই শুধু এই ঐশ্বরিক বাণী উন্মোচন করা হয়েছে । কিন্তু এই তথাকথিত ঐশ্বরিক বাণী যখন সে দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে বলবে বা দ্বিতীয় ব্যক্তির থেকে কথাটা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে লিখিত বা মৌখিক ভাবে পৌঁছাবে তাহলে তা আর তাদের কাছে ঐশ্বরিক বাণী থাকেনা । এটা একটা রিভলেশন বা ঐশ্বরিক বাণী হিসেবে থাকে শুধু মাত্র প্রথম ব্যক্তিটি কাছে কারণ সে নিজে তা পেয়েছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে এইটা হয়ে যায় শোনা কথা- যে প্রথম ব্যক্তি দাবি করছে তার উপর নাকি ঐশ্বরিক বাণী নাজিল হয়েছে । (তাই সে প্রথম ব্যক্তি নিজে হয়তো ঐ বাণীতে বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হবে ন ) তবে তার কাছে কি নাজিল হয়েছে তার কাছ থেকে শোনে কেউ তা বিশ্বাস করতে অন্যরা বাধ্য নয় কারণ তা তাদের উপরে নাজিল হয়নি । তা লিখিত বা মৌখিক ভাবে হোকনা কেন সেকেন্ড হ্যান্ড সোর্স থেকে আসা কোনো কিছুকে ঐশ্বরিক বাণী বলার কোনো যৌক্তিকতা নাই।
যখন মুসা ইসরাইলের সন্তানদের বলল যে সেই ঈশ্বরের হাত থেকে দুইটি টেবিলে লিপিবদ্ধ ঐশ্বরিক বাণী / কমান্ডমেন্ট পেয়েছেন তা ওদের বিশ্বাস করবার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলনা কারণ মুসার মুখের কথা ছাড়া তাদের কাছে এমন কোন কর্তৃত্ব ছিলনা যে এটা বিশ্বাস করবে। এমনিভাবে আমার পক্ষেও এমন কোন কর্তৃত্ব নাই যে আমি ঐতিহাসিকদের কাছ থেকে শোনা এই ধরনের ভিত্তিহীন দাবির কথা মেনে নেব।
কমান্ডমেন্ট গুলো তে তেমন বিশাল কিছু ছিলনা যা ঈশ্বর থেকে আসতে হবে । হ্যাঁ তার মধ্যে কিছু কিছু নৈতিক আদেশ ছিল যা কিনা যে কোন আইন প্রণয়নকারী সে সময় নিজেই ঈশ্বরের পরামর্শ ব্যতীত তা প্রস্তুত করতে পারত।
একই রকমভাবে আমাকে যখন বলা হয় যে কোরআন স্বর্গের রচিত হয়েছিল এবং ফেরেশতার মাধ্যমে মোহাম্মদের কাছে আনা হয়েছিল তখন আমার কাছে তো একই রকমই শোনা কথা বলে মনে হবে - আমি নিজের চোখে যেহেতু ফেরেশতাকে দেখি নাই আমার বিশ্বাস না করার অধিকার বলবৎ আছে।
একই যুক্তিতে আমাকে যখন বলা হয় যে কুমারী মেরি নামক একজন নারী একটি শিশুকে জন্ম দিয়েছে কোনো প্রকার পুরুষ এর সাথে মেলামেশা ছাড়া এবং তার স্বামী জোসেফ তা জানতে পেরেছে কোন ফেরেস্তার কাছ থেকে আমি এই দাবি মেনে নিতে বাধ্য নই। এই ধরনের দাবি মেনে নেওয়ার পেছনে মুখের কথার চেয়ে বেশি কোন concrete যৌক্তিক প্রমাণ থাকা দরকার আছে। আর আমরা কোনভাবেই মেরি এবং জোসেফের নিকটবর্তী কেউ নই আর এবং এই প্রসঙ্গে জোসেফ কিংবা মেরি কেউই কিছু লেখে যায়নি একজনের থেকে আরেকজন শুনে শুনে গুজবের পড়ে গুজবের ভিত্তিতে এই কথা গুলো আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে সুতরাং এতে বিশ্বাস করবার কোনো যৌক্তিকতা নাই।
কোন অলৌকিক দাবি যদি আমার চোখের সামনে ঘটে তখন আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য তানাহলে আমাকে বিশ্বাস করবে প্রয়োজন দেখছি না। কারণ এটা হবে শোনা কথায় বিশ্বাস স্থাপন।
তারচেয়ে বড় কথা যিশুখ্রিস্টে ঈশ্বরের পুত্র ছিল এই দাবি করা হয়েছিল এমন একটা সময়ে যখন হিথেণ (heathen) মিথলজির ঈশ্বর রা এসে নারীদের সাথে sex করে যেত- তখন মুখে মুখে এরকম অনেকগুলো গুজব প্রচলিত ছিল যে ঈশ্বর নারীদের সাথে যৌন সম্পর্ক করে এবং সন্তান জন্ম দেয়। তাদের বর্ণনায় জুপিটার এসে শত শত নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে গেছে। এইরকম উর্বর গুজব চর্চার যুগে যিশুর গল্প প্রতিষ্ঠা বিশাল কোন কৃতিত্ব ছিল না লেখকের ভাষায়
“the story, therefore, had nothing in it either new, wonderful, or obscene; it was conformable to the opinions that then prevailed among the people called Gentiles, or Mythologists,”
( Thomas paine তার Age of Reason 1794 বইটির আংশিক বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে এই লেখাটা লিখলাম। লেখক তারপর সাংগঠনিক ধর্মগুরুর উপর বিশ্বাস না রাখার পক্ষে আরো অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। বিজ্ঞ পাঠকদের অনেকেই স্ববিরোধী টাইটেলটা দেবার জন্য আমার সমালোচনা করবেন । কথা ঠিক, পেইন একজন ডিইস্ট ছিলেন । তবে যাদের ডিইজম এই সম্পর্কে ধারনা নেই তাদের বোঝার জন্য এভাবে ব্লগের টাইটেলটা দিয়েছি - কারন অনেকেই এটাকে সাত পাঁচ টা ধর্মের মত ভেবে বসে। পশ্চিমা বোধোদয় enlightenment আমেরিকান-ফরাসি বিপ্লব সময় নেতৃত্ব প্রদানকারী অনেক ব্যক্তিবর্গের ঈশ্বর সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এইধরনের ছিল এবং তারা সংগঠিত গির্জার ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করেছিল কঠোরভাবে।
এখানে বিশেষভাবে দর্শনীয় যে এই বইটি যখন লেখা হয়েছিল তখন তুর্কিশ ottoman empire অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং * থমাস পেইন ইসলামকে তুর্কিদের গির্জার ধর্ম বলেছেন। আমি পাঠকদের জটিলতায় না ফেলবার জন্য ইসলাম শব্দটা ব্যবহার করেছি। খুব সম্ভবত ইসলাম শব্দটি তখনও ততটা সুপরিচিত ছিলনা। আপনাদের কারো এই সম্পর্কে কিছু জানা থাকলে মন্তব্য আশা করছি।)
সরকার আশেক মাহমুদ