Sunday, March 20, 2016

কেমন করে সব শূন্য থেকে শূন্যে মিলে যায়

বিশ্বসংসার শূন্য, আমি তুমি সব শূন্য, শূন্য একক ভাবে একটি সংখ্যা ও অস্তিত্বহীন তাকে বুঝায়, যার ব্যুৎপত্তিগত নৃতাত্ত্বিক যায়গা থেকে বিচার করলে শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ ‘সাফাইর’ থেকে যার অর্থ ”সেখানে কিছু ছিল না” । আমাদের সমাজের প্রচলিত কিছু শব্দ -সত্য, মিথ্যা, ভাল, খারাপ, পাপ, পুণ্য, সুন্দর, অসুন্দর, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবে নানান সময়ে নানান ভবে ব্যবহার করে থাকি এবং এমতাবস্থায় খুব প্রভাব বিস্তার করে আছে । প্রচলিত এই শব্দ গুলো একটা একটার সাথে খুব অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, ভাল মিশ্রিত মিথ্যা অথবা ভাল খারাপ মিশ্রিত সত্য এই সব চলমান প্রচলিত কথার বাহিরে বস্তুবাদী নৃতাত্ত্বিক যায়গা থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই সব শব্দের প্রধান মানদণ্ড কি তা নিয়ে দার্শনিক মহলে নানা রকমের প্রশ্ন রয়েছে । এরিস্টটল সবসময় মধ্যপন্থার উপর জোর দিতেন,মনে করতেন সত্য বা মিথ্যা অতিচরম বা অতিনরমে নয় বরং মাঝামাঝি কোথাও থাকে । এই শব্দগুলোর ভিত্তি বুঝতে গেলে আগে জ্ঞানের প্রচলিত সংজ্ঞায় যেতে হবে-
প্লেটোর পর থেকে জ্ঞানের সার্বজনীন সংজ্ঞা হচ্ছে ‘কোন ব্যক্তি কিছু একটা জানে এর অর্থ হচ্ছে সে সেই কিছু একটা সম্পর্কে একটি সত্য এবং ন্যায্য প্রতিপাদিত বিশ্বাস পোষণ করে । এখানে তিনটি ধারনা আছে -সত্যতা, ন্যায্যতা ও বিশ্বাস আর এই তিনটি ধারণা সঠিক ভাবে একত্রিত হলেই জ্ঞান তৈরি হয় । এই মতানুসারী জ্ঞান একটি বিশ্বাস আবার কেবল-ই বিশ্বাস নয় একটি সত্য বিশ্বাস আবার কেবলই সত্য বিশ্বাস নয় বরং একটি ন্যায্য প্রতিপাদিত সত্য বিশ্বাস । জ্ঞান অনেকটা ধূম্রজালের মতো খেলা করে, তার চেয়ে সুস্পষ্ট সত্য, যেমন মানুষের রক্ত লাল এইটা ন্যায্যতা মানে নির্ভরযোগ্যতা ও প্রমাণের উপর দাড়িয়ে আছে । এই বাক্যটাকে আমরা সত্য বলতে পারি না,
ঠিক তেমনি আমরা ছোটবেলায় পড়ে এসেছি সূর্য পূর্ব দিকে উঠে পশ্চিম দিকে অস্ত যায় যা সার্বজনীন চিরন্তন সত্য কিন্তু আদ্যতে সূর্য অস্ত ও যায় না বা পূর্ব দিকে উঠেও না । তাকে আমরা সত্য বা মিথ্যা কিছুই বলতে পারি না শুধু নিতান্তই নিয়মতান্ত্রিক ক্রমবর্ধমান ধারা ।
কোন কিছুকে আমরা ভাল খারাপ কিছুই বলতে পারি না, যেমন আপনি একটা মানুষকে ভাল ও বলতে পারবেন না বা খারাপ ও বলতে পারবেন না, যেই কারণে আপনি লোকটিকে ভালো বলছে ঠিক তার বিপরীতে অন্য কেও সেই কারণেই তাকে খারাপ বলছে, সংখ্যা গরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে যদি বলেন লোকটি সব মিলিয়ে ভালো বা সব মিলিয়ে খারাপ তাহলেও ভালো খারাপের হিসেব মিলছে না, যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে বলছে ভালো খারাপ সেই সংখ্যা গরিষ্ঠতা কিছুক্ষণের মধ্যে সংখ্যালঘিষ্ঠ হতে কতদূর । এখানে একপ্রকারের মধ্যস্থতা চলে আসছে । এর জন্য আপনি লোকটিকে ন্যায্যতার উপর বিচার করে চলতে পারে তার জন্য ভালো খারাপের
মধ্যে ফেলে দেয়া নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ।
এই বার আসি পাপ-পূর্ণতা নিয়ে । একটু সহজ করে বলতে গেলে আপনে পাপ না করলে আরেকজন পূণ্য করার সামর্থ্য রাখে না, আপনে পাপ করছেন বলেই আরেকজন পূণ্য করতে পারছে । যেমন একটা পাখি ধরে খাঁচায় বন্ধী করে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে গেলো যেকোনো এক ব্যক্তি, অন্য কোন এক ব্যক্তি সেই পাখিটিকে কিনে ছেরে দিলো, আপনার দৃষ্টিতে নিশ্চয় প্রথম ব্যক্তি পাপ করছে পাখি শিকার করে ও খাঁচায় বন্ধী করে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে আসার জন্য, তেমনি দ্বিতীয় ব্যক্তিটি পাখিটিকে কিনে ছেরে
দেওয়াতে সে পূণ্য করেছে । প্রকৃতপক্ষে প্রথম ব্যক্তি পাপ করার জন্য দ্বিতীয় ব্যক্তি পুণ্য করার অধিকার পেয়েছে । এই সমাজে সব নষ্টের দানব মুঠোতে বিনষ্ট হবে প্রতিনিয়ত আবার তার বিপরীতে কেও তিলে তিলে নিপুণ হাতে গরে তুলবে সব কিছু । প্রকৃতি তার রহস্যময় ধুম্রজালের নিপুণ ভারসাম্যতায় কিছু দাড়িয়ে আছে আর অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে অসীম শূন্যতায়, একটা সময় তার অপার ভারসাম্যতা খসে খসে বিনষ্ট হবে, তখন সব কিছু ধ্বংসের শেষ পতন থেকে আবার সৃষ্টি হবে সেই ছোট্ট অংকুর গাছের চারার মতো, মেলে ধরবে সর্বাঙ্গে তার রূপ বিচিত্রতা নিয়ে ।
সুন্দর বা অসুন্দর । সুন্দরকে চলমান দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে না ফেলে নৃতাত্ত্বিক জায়গা থেকে বিচার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি । আমরা কখন একটা কিছুকে সুন্দর বা অসুন্দর বলে আখ্যায়িত করি ? দার্শনিকদের মতে আমাদের চোখে কোন কিছু যখন তার নির্দিষ্ট উপাদান সমূহে পরিপূর্ণতা পায় তখন সেটি সুন্দর হয়, আবার অনেক দার্শনিক যুক্তি তর্কের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন সুন্দর যে কোন রকম আনন্দ ও দক্ষতা শিল্পমূল্যের অন্তর্গত,সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা হচ্ছে ব্যক্তির অনুভূতির তীব্রতা ও আনন্দসহ যা বিকশিত মনের অংশ । সৌন্দর্য একটা অভিযোজিত পরিণতি যা আমরা প্রসারিত বা তীব্র করি সৃষ্টি, কাজ, শিল্প ও বিনোদনের মধ্যমে । সৌন্দর্য হল দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রাকৃতিক উপায় । আমরা নিশ্চয়ই আমাদের শিশু, প্রেমিক অথবা কোন একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য খেয়ে ফেলার চেষ্টা করি না, বিবর্তনের কৌশল হল আমাদের চোখে তাদের এরকম আকর্ষণীয় করে তোলা, যাতে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগে ।
দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মানুষের মন ও মস্তিষ্ক আর তা নিয়ে দশকের পর দশকব্যাপী গবেষণা ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সাইকো-নিউরো-ইমিউনলজি নামে বিজ্ঞানের নতুন শাখা । তারা বলছে মস্তিষ্ক হচ্ছে হার্ডওয়ার আর মন হচ্ছে সফটওয়্যার । নতুন তথ্য ও নতুন বিশ্বাস মস্তিষ্কের নিউরনে নতুন ডেনড্রাইট সৃষ্টি করে । নতুন সন্যাপসের মাধ্যমে তৈরি হয় সংযোগের নতুন রাস্তা । বদলে যায় মস্তিষ্কের কর্ম প্রবাহের প্যাটার্ন । তখন মস্তিষ্ক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন বাস্তবতা উপহার দেয় । তাছাড়া প্রো-একটিভ ও
রি-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব প্রাত্যহিক ভাবেই লক্ষণীয় ।
সর্বশেষে কেমন যেন সব কিছু শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে, জীবন অনর্থক, তাকে প্রতিনিয়ত অর্থবোধক করে তুলার চেষ্টা করে যাচ্ছি । খুব ভালোভাবে জীবনের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন ”এসে এক্সিস্টেনসিয়াল নিহিলসাম” মতে – মানুষের জীবনের কোন অর্থ বা মূল্য নেই । প্রতিটি মানুষ এমনকি সমগ্র মানবজাতি অপ্রয়োজনীয়, উদ্দেশ্যবিহীন ।
মানুষকে পৃথিবীতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে প্রকৃতিগত ভাবে । আর মানুষ নিজেই জানে না, সেটা কেন । অস্তিত্ববাদের মতে, ব্যক্তিসত্তা সার্বিক সত্তার পূর্বগামী এবং নৈতিকতা বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অস্তিত্ববাদীরা অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক । সুতরাং জীবনের অর্থ হল শুধুমাত্র একক ব্যক্তির জন্য । সেটা হতে পারে নিরীশ্বরবাদী হয়ে কিংবা পরকাল এবং নিজের কর্মফলে বিশ্বাস করার মধ্যমে । আদিকাল থেকেই ধর্মও পুঁজি করে নিজস্ব ধারণা তৈরি করে নিয়েছে ।
জীবনের অর্থ নিয়ে সবচেয়ে ভাল উক্তিটি হয়ত Colorado State University এর দর্শনের প্রখ্যাত প্রফেসর Donald A. Crosby এর দেয়া এই উক্তিটি,
“There is no justification for life,
but also no reason not to live.
Those who claim to find meaning in
their lives are either dishonest or deluded.
In either case, they fail to face up to the
harsh reality of the human situation”.
“জীবনের কোন অর্থ বা যৌক্তিকতা নেই। তাই বলে জীবন উপভোগ না করারও কোন কারণ নেই। যারা জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে বলে দাবী করে তারা হয় মিথ্যা বলছে অথবা কোন মিথ্যা বিষয়ে বিশ্বাস করছে। দু’টো ক্ষেত্রেই তারা মানব জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মোকাবেলা করতে বিফল হয়।”

তোমাদের ঘৃণা করতেও ঘৃণা হয় আমার

১.
একটু একটু করে বেঁচে ওঠার চেষ্টা করছি প্রতিদিন। শরীরের ক্ষত তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, জীবনের ক্ষত নিয়ে ভাবার ইচ্ছে হয়না এখনো। একটু একটু করে গড়ে তোলা বহু বছরের জীবনটাকে ফেলে এসেছি ঢাকার বইমেলার ফুটপাতে। এখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে চোখের সামনে দেখতে পাই ফুটপাতের উপর পরে থাকা অভিজিৎ এর রক্তাক্ত দেহ, ভরদুপুরের নিস্তবদ্ধতায় শুনতে পাই হাসপাতালে আমার পাশেই শুইয়ে রাখা ক্ষতবিক্ষত অর্দ্ধচেতন অভিজিৎ এর মুখ থেকে ভেসে আসা অস্ফুট আওয়াজ। ডাক্তার যখন আমার কপালের, মাথার চাপাতির কোপগুলোর সেলাই খোলে তখনও আঁতকে উঠি, বুড়ো আঙ্গুলহীন বাম হাতটা দেখে প্রায়শঃ চমকেও উঠি, আয়নায় নিজের চেহারাটাও ঠিকমত চিনতে পারিনা আর। আহত মস্তিষ্ক উত্তর খোঁজে, খোঁজে কারণ আর পারম্পর্য। তারপর বুকের খুব গভীরের সেই অপূরনীয় শূণ্যতা থেকে জন্ম নিতে থাকে এক অদ্ভূত অনভূতি। চোখে ভাসতে থাকে মানুষের চেহারায় মানুষ্যেতর সেই প্রাণীদের কথা, যারা ঢাকার রাজপথে উন্মুক্ত চাপাতি হাতে বেরিয়ে আসে অন্ধকার মধ্যযুগীয় মূল্যবোধের গুহা থেকে, যাদের হুঙ্কারে ক্রমশঃ আজ চাপা পড়ে যাচ্ছে সভ্যতার স্বর। লেখাটা লিখতে লিখতেই দেখলাম ঢাকা শহরে আবারো নাকি চাপাতির উল্লাসে ফেটে পড়েছে তাদের বিজয়গর্জন। একমাস যেতে না যেতেই তারা আবার অভিজিতের হত্যা উদযাপন করেছে আরেকটি হত্যা দিয়ে। বাংলার মাটি ভিজতেই থাকে ধর্মোন্মাদ কূপমন্ডুকদের নবীন উল্লাসে।
কিন্তু ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তারপরেই মনে পড়ে যায় যে, তোমরা তো সব সময়েই ছিলে। তোমাদের মত ধর্মোন্মাদ অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই তো এগিয়েছে মানবসভ্যতা। তোমাদের মত হায়েনার দলতো সব সময়েই প্রগতিকে খুবলে খুবলে খাওয়ার চেষ্টা করেছে; বুদ্ধিবৃত্তি, বিজ্ঞান্মনষ্কতা, প্রগতিশীল শিল্প সাহিত্য সংষ্কৃতি সবইতো তোমাদের আতঙ্কিত করেছে যুগে যুগে। তোমরাইতো প্রতিবার জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রগতিকে আটকাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছো। কিন্তু সামান্য কলমের আঁচড়ে তোমাদের কাঁচের ঘর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। তোমাদের দুর্বল ধর্মবিশ্বাস মুক্তচিন্তার হাওয়ায় নড়ে ওঠে, তলোয়ার নিয়ে, চাপাতি নিয়ে ছুটে আসো, কল্লা ফেলেই শুধু তোমাদের ঈমান রক্ষা হয়। তোমরা তো সবসময়েই ছিলে… হাইপেশিয়ার শরীরের মাংস তো তোমরাই নিজের হাতে চিরে চিরে উঠিয়েছিলে, অসংখ্য নির্দোষ ‘ডাইনি’ পুড়িয়েছো তোমরা, সতীদাহতে মেতেছো, ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে দানবীয় আনন্দ পেয়েছো, কূপমণ্ডুকের মত গ্যালিলিওকে শাস্তি দিয়ে স্বস্তির ঢেকু্র তুলে ভেবেছো, এই বুঝি পৃথিবীর ঘোরা চিরতরে বন্ধ করে দিতে সক্ষম হলে।
অভিজিৎ হাইপেশিয়াকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলো অনেক আগে। সামান্য অক্ষরজ্ঞান থাকলে পড়ে দেখো, দেড় হাজার বছর আগের ধর্মোন্মাদ ফ্যানাটিকদের সাথে আজকের তোমাদের কোনোই পার্থক্য নেই। সময়, পটভূমি এবং ঘাতকদের অস্ত্রগুলো শুধু একটু বদলে দিলেই দেখবে যে, তোমাদের নিজেদের চেহারাই দেখা যাচ্ছে ওদের মধ্যে। হাজার বছরেও কাল, দেশ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে তোমাদের কোনই পরিবর্তন হয়নি।
“৭১ এ বাঙালী বুদ্ধিজীবী হত্যার মতই সিরিল(পোপ-পূরবর্তী সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ার ক্রিশ্চান ধর্মগুরু) যেমনিভবে বেছে বেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নব্যতান্ত্রিক’ নিও-প্লেটোনিস্টদের ধরে ধরে হত্যার মহোৎসবে মত্ত ছিলেন,এমনি এক দিন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে হাইপেশিয়া মৌলবাদী আক্রোশের শিকার হলেন,অনেকটা আজকের দিনের হুমায়ুন আজাদের মতোই। তবে হাইপেশিয়ার ক্ষেত্রে বীভৎসতা ছিলো আরও ব্যাপক। হাইপেশিয়া-হত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায় পনের শতকে সক্রেটিস স্কলাসটিকাসের রচনা হতে:
‘পিটার নামের এক আক্রোশী ব্যক্তি অনেকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলো,শেষমেষ সে হাইপেশিয়াকে কোন এক জায়গা হতে ফিরবার পথে কব্জা করে ফেলে। সে তার দলবল নিয়ে হাইপেশিয়াকে তার ঘোড়ার গাড়ী থেকে টেনে হিঁচড়ে কেসারিয়াম (Caesarium) নামের একটি চার্চে নিয়ে যায়। সেখানে তারা হাইপেশিয়ার কাপড়-চোপড় খুলে একেবারে নগ্ন করে ফেলে,তারপর ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে তাঁর চামড়া চেঁছে ফেলে,তার শরীরের মাংস চিরে ফেলে,আর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত হাইপেশিয়ার উপর তাদের অকথ্য অত্যাচার চলতে থাকে। এখানেই শেষ নয়;মারা যাবার পর হাইপেশিয়ার মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে সিনারন (Cinaron) নামের একটি জায়গায় জড় করা হয় আর তারপর পুড়িয়ে তা ছাই করে দেয়া হয়’। হাইপেশিয়াকে হত্যা করা হয় ৪১৫ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে। হাইপেশিয়ার হত্যাকারীদের তালিকায় ছিলো মূলতঃ সিরিলের জেরুজালেমের চার্চের প্যারাবোলানস,মৌলবাদী সন্ন্যাসী,নিটৃয়ান খ্রীষ্টীয় ধর্মবাদীরা।“
ভুল করেও ভেবোনা যে, আমরা ভাবছি তোমরা শুধু ইতিহাসের পাতা জুড়েই আবদ্ধ হয়ে আছো। তোমরা যে এই একুশ শতকে আরো শক্তিশালী হয়ে আহত হিংশ্র পশুর মত দক্ষযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছো, সেটা তো ইচ্ছে করলেও কা্রো চোখ এড়াতে পারবে না। ঈমান রক্ষার জন্য আইসিসের জল্লাদেরা যখন কল্লা কাটে, বিধর্মী মেয়েদের যৌনদাসী হতে বাধ্য করে, বোকা হারাম যখন কয়েকশো তরুণীকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে মধ্যযুগীয় বাজারদড়ে বিক্রি করে বা তালিবানরা যখন একশো চল্লিশজন নিস্পাপ স্কুলছাত্রের উপর গণহত্যা চালায়, তখনো আমরা দেখতে পাই, তোমরা আগেও যেমন ছিলে, এখনো তেমনি আছো। বিশ্বজুড়ে তোমাদের ক্ষমতাধর পৃষ্ঠপোষকদেরও আমরা চিনি, যারা যুগে যুগে তোমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, ধর্মের ব্যবসা থেকে মুনাফা লুটেছে। তোমাদের মূর্খতা, কূপমণ্ডুকতা এবং পাশবিক নিষ্টুরতার নমুনা তো সারাক্ষণ চারপাশেই দেখেছি, এবার নিজের জীবনেও দেখলাম। আমার মাথার চাপাতির কোপগুলো এখনো পুরোপুরি সারেনি, আঙ্গুলবিহীন হাতটা এখনো অবাক করে, আর অভিজিৎ এর নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহটা তো চোখের সামনে ভেসেই থাকে। আর তখনই বুঝুতে পারি, না, তোমাদেরকে ঘৃণাও করিনা আমি, করতে পারিনা, বড্ড অরুচি হয় তোমাদের মত অমানুষদের ঘৃণা করতে। একজন মানুষকে ঘৃণা করার জন্য তাদের মধ্যে যতটুকু মনুষত্ব অবশিষ্ট থাকতে হয়, তার কণাটুকুও নেই তোমাদের মধ্যে। তোমরা আমার ঘৃণারও যোগ্য নও।
অভিজিৎ, আমি, বাবু এবং বর্তমান ও ইতিহাসের পাতা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমাদের মতো হাজারো মানুষেরা তোমাদের অপকর্মেরই সাক্ষী। তোমাদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলার সময় মানবসভ্যতা এই বর্বর উন্মাদনা দেখে ঘৃণায় শিউরে উঠবে, এ থেকেই সামনে এগিয়ে যাবার প্রতিজ্ঞা নেবে।
২.
এবার একটু অন্য প্রসংগে আসি। মাঝে মাঝেই ভেবে অবাক হই যে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ প্রসঙ্গে আমরা এখনও একটা রা শব্দও শুনলামনা। যে দেশের ন্যচারা্লাইজড নাগরিক আমরা, তার সরকার যতোটুকু বললো, আমাদের জন্ম নেওয়া দেশের সরকার তার ধারে কাছেও কিছু বললো না। ভয়ে সিঁটকে থাকলো। বলুন তো, আপনাদের ভয়টা কোথায়? নাকি এ শুধুই রাজনীতির খেলা? অভিজিৎ এর বাবাকে নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী, দেখা করেছিলেন কয়েকজন মন্ত্রীসাহেব। সে খবরটা যেনো গোপন থাকে, সে সতর্কতাও নিয়েছিলেন তাঁরা। আমরা জন্মেছি যে দেশে, বড় হয়েছি যে দেশে, দেশের বাইরে এসে ভালো চাকরি, গাড়ি বাড়ি নিয়ে শুধু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার চিন্তা না করে লেখালেখি করেছি যে দেশের জন্য, বারবার ফিরে এসেছি যে দেশের মায়ায়, সে দেশের সরকারের কি কিছুই বলার ছিলো না? বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর আন্তর্জতিক বিভিন্ন মিডিয়া, ব্লগগুলো তীব্র প্রতিবাদ করেছে,অভিজিৎ রায়ের লেখাগুলো অনুবাদ এবং পুনঃপ্রচারে নেমেছে অনেকগুলো প্ল্যাটফর্ম। দেশের বিভিন্ন শহরে,আর দেশের বাইরে লন্ডন,ওয়াশিংটন ডিসি, ফ্লোরিডা, টরন্টো,নিউইয়র্ক,বার্লিন,সিডনি-তে মানববন্ধন থেকে শুরু অসংখ্য প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। অথচ বইমেলায় লোকে লোকারণ্য, আলোকিত ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার’ মধ্যে অভিজিৎ এর মতো একজন লেখককে কুপিয়ে কুপিয়ে মারা হলো, তার প্রতিবাদ জানিয়ে একটা কথাও কি বের হতে পারলো না আপনাদের মুখ থেকে? অথচ আপনারাই আপনাদের ধর্মোন্মাদ বন্ধুদের দাবিতে নাস্তিক ব্লগারদের ধরে ধরে জেলে পুরেছিলেন। তাদের ধরে জেলে পুড়তে যে তৎপরতা দেখিয়েছিলেন তার কণাটুকুও তো চোখে পড়লোনা আজ। অনেক সময় মৌনতাই অনেক কিছু বলে দেয়। আমরা কি ধরে নেবো যে অভিজিৎ বা বাবুর হত্যার পেছনে, আমাকে কোপানোর পেছনে, আপনাদেরও প্রচ্ছন্ন সম্মতি আছে? কলমের বিরুদ্ধে চাপাতির আঘাতকেই আপনারা এখন দেশের সংষ্কৃতি হিসেবে মেনে নিতে বলছেন?
এক মাস চলে গেলো। শুরুতে তদন্তের যাওবা কিছুটা তাগাদা দেখলাম, তাও আস্তে আস্তে মিইয়ে গেলো। আপনাদের কাছ থেকে সহানুভূতি আশা করি না আমরা, সমর্থনের আশা তো বাদ দিয়েছি সেই কোন কালেই। আপনাদের ভোটের রাজনীতি করতে হয়, মন জুগিয়ে চলতে হয় কতো ধরনের অপশক্তির, সেটা তো আমরা বুঝি। কিন্তু আপনাদের নিশ্চুপতার কারণটাও বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ যে ধীরে ধীরে আঁটি গেড়ে বসেছে, তার খবর তো আমরা সবাই জানি। তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেশবিদেশ জুড়ে কারা কাজ করছে তাও তো আমাদের অজানা নয়। অভিজিৎ এর হত্যা তো একজন দুজন লোকের হাতে হয় নি। এর পিছনে সংগঠিত ইসলামী মৌলবাদী সন্ত্রাসী দলের হাত রয়েছে, তার প্রমান তো আমরা সাথে সাথেই পেয়েছি। না হলে এতো তাড়াতাড়ি আনসার বাংলা ৭ এর মতো দল হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করতে পারতো না। এদেরকে যদি সমূলে উৎপাটন করার ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা কি ভেবে দেখা দরকার নয় এখন? আইসিস, বোকা হারাম, আল কায়দার পথে জাতিকে ঠেলে দেওয়াটাই কি ভবিতব্য?
৩.
মানব সভ্যতা যখন আজ মঙ্গলগ্রহে বসতি বানানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন আমরা মধ্যযুগীয় উদ্ভট এক উটের পিঠে চড়ে পিছনের দিকে যাত্রা শুরু করেছি। ক্ষমতাশালীরা সবসময়ই ধর্মকে, ধর্মীয় মৌলবাদকে লালন করেছে প্রগতির গলা চেপে ধরার অস্ত্র হিসেবে। তারা জয়ীও হয়েছে কখনো কখনো, কিন্তু যতো সময়ই লাগুক না কেনো, মানবসভ্যতা তাকে হারিয়ে দিয়ে আবার এগিয়েও গিয়েছে। অভিজিৎ তো শুধু লেখালেখিই করে নি, দেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক দৃঢ় প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টাও করে গেছে সে সারাজীবন ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন আমাকে এক ব্যক্তিগত ম্যাসেজে লিখেছেন, ‘জানি, লেখার প্রতিবাদে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাটাই আমাদের এখন আমাদের দেশের আইনি সংষ্কৃতিতে পরিণত গেছে। তবে অভিজিতের মৃত্যুর পর একজন নাস্তিক এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীর পক্ষে দাড়ানোর ব্যাপারে আমাদের যে ট্যাবুটা ছিল তা ভেঙ্গে পড়েছে। চারিদিকে মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই প্রায় এ নিয়ে লেখালেখি, মিটিং মিছিল চলছে।‘ অভিজিৎকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যার বিনিময়ে এই অর্জনটা কতোটা যুক্তিযুক্ত সেই বিতর্কে না গিয়েই বলছি সমাজ সরলরেখায় এগোয় না, কখনো হোঁচট খেয়ে, কখনো হাঁটি হাঁটি পা পা করে, কখনো বা জনগনের প্রবল শক্তিতে বলিয়ান হয়ে তীব্র গতিতে সামনে এগিয়ে চলে। আজ অগুনতি অন্যায়, হত্যা, অরাজকতা, দুর্নীতি দেখতে দেখতে যে মানুষেরা মনুষ্যত্বহীন হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ফুটপাতে পড়ে থাকা চাপাতিতে কুপানো নিথর শরীরের দিকে, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার কথাও ভাবতে পারে না, তারাই হয়তো একদিন জাগবে। ইতিহাস বলে, আমরাও এগুবো, তবে দুপা আগানোর আগে য়ার কত পা পিছাতে হবে সেটা হয়তো সময়েই বলে দেবে।

আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী (১,২,৩,৪ )

আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী (১)

শিরোনাম পড়ে অনেকে নিশ্চয়ই ভাবছেন, আরজ আলীর রচনায় নারীর অবস্থান খোঁজা কেন? তিনি তো বিজ্ঞান, বিশ্বাস,আধ্যাত্মিকতা,লৌকিক জীবন ইত্যাদি নিয়ে ভেবেছেন,লিখেছেন। তাঁর লেখায় আস্তিক্যবাদ আর নাস্তিক্যবাদ নিয়ে আলোচনা না করে নারী বিষয় কেন? কিন্তু এসব বিষয়ের সাথে তো মানব জীবনকে টেনেছেন আর মানবের একটা অংশ তো নারী। নারী অবস্থান তার চেতনার কোথায় নাড়া দিয়েছিল সে কৌতূহল মেটাতেই আরজ আলী মাতুব্বর পুনঃপাঠ। আর পুনঃপাঠের প্রকাশই এ লেখা।
প্রথমে নারীপ্রেম থেকেই আরজ আলী মাতুব্বরের গতানুগতিক পথের বাইরে বিকল্প পথের সন্ধান। সে নারী তার মা। তার মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার অপরাধে (?) মৃতদেহ দাফন সহ জানাযায় নিজ বাড়ির লোকজন ছাড়া অন্য কেউ আসতে রাজি হয়নি।
জন্মদাত্রী মা নামক নারীর মুখচ্ছবি ধরে রাখতে গিয়ে সামাজিকভাবে তাকে বিপর্যয়ের সন্মুখীন হতে হলেও মানসিকভাবে তার বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা শুরু। শুরু আলোর পথে যাত্রা। তার চেতনায় লাগে নতুন মাত্রা।
কথায় আছে জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে। এ তিনটি বিষয় বিধাতা নির্ভর বলে বিধাতা একই ধর্মের নারী পুরুষে বিয়ে হওয়া ভালবাসেন। এমন বিধানও দিয়েছেন। আরজ আলী মা্তুব্বর নির্দ্বিধায় স্বামী স্ত্রীর ভিন্ন ধর্মের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তিনি ‘সত্যের সন্ধান” নামক বইয়ে বলেছেন,“ এই কল্পিত ধর্মের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিল উহাতে মতভেদ। ফলে পিতা-পুত্রে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, এমনকি স্বামী-স্ত্রীতেও এই কল্পিত ধর্ম নিয়া মতভেদের কথা শোনা যায়। শেষ পর্যন্ত যে কত রক্তপাত হইয়া গিয়াছে, ইতিহাসই তাহার সাক্ষী।”(মূল কথা/ প্রশ্নের কারণ)
তিনি ইঙ্গিতে ঘোষণা করেছেন যে, স্বামী ও স্ত্রী মাত্র একই ধর্মের হয় না, বা হওয়া লাগবেই এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এজন্য রক্তপাতের মত ঘটনাও ঐতিহাসিক সত্য। স্বামী স্ত্রীর যে ধর্ম নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে তা ধর্মপ্রাণ মানুষমাত্রই অস্বীকার করবেন। স্বামীর ধর্মই স্ত্রীর ধর্ম। ইসলাম ধর্মমতে,কোন মুসলিম নারীর স্বামী হতে হলে কোন পুরুষকে স্বামী হওয়ার আগে ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে হবে। আর মুসলিম পুরুষ আহলে কিতাব ( অর্থাৎ যাহারা বাইবেল, তোউরাত, এবং যবুর গ্রন্থে বিঃশ্বাসী) অনুসারী মহিলাকে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু এতে ধর্মপ্রাণ সমাজে বসবাস কঠিন হয়ে যায়। তা ছাড়া সন্তানদের ধর্ম নিয়ে তখন টানা হেঁচড়া করা লাগে বলে বিধর্মী প্রেমিক প্রমিকারা ধর্মান্তরিত হয়ে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীরও যে আলাদা ধর্ম হতে পারে তা বলার মত সততা ও সাহস আরজ আলী মাতুব্বরের ছিল।
স্বামী ও স্ত্রীর যে আলাদা ধর্ম থাকতে পারে এ তথ্যটি বলাও অনেক মৌলবাদীর কাছে গর্হিত অপরাধ। আরজ আলী মাতুব্বর এ সত্য প্রকাশে দ্বিধান্বিত নন। নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চা করতে গিয়ে রক্তপাতের ঘটনাও যে স্বাভাবিক তা তিনি অবলীলায় বলতে পারেন। এখানেই তার নারী প্রতি আধুনিকতম দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।
১৯২৯ সালের বাল্য বিবাহ আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের বিয়েকে বলে বাল্য বিবাহ। আর ইদানিংকালে আধুনিক চেতনার উন্নয়নবিদরা, উন্নয়নকর্মীরা বলে শিশু বিয়ে। বাল্য বিয়ে আর শিশু বিয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে কি? আছে। বাল্য বিয়ে ইংরেজি early marriage আর শিশু বিয়ে ইংরেজি child marriage. সমাজের চেতনাকে নাড়া দিতে শিশু বিয়ে শব্দটি বেশি লাগসই। বাল্য বিয়ে আইনগত ভিত্তি আর শিশু বিয়ে সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক আবেদন।
তাছাড়া, আইনে ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের বিয়েকে বাল্য বিয়ে বললেও আধুনিক চেতনায় বিশ্বাসী অনেকেই লেখাপড়া শেষ না করে বা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে বিয়ে করাকে বলে বাল্য বিয়ে। আর সমাজের আবেগকে নাড়া দিতে ১৮ বছরের নীচের বয়সী মেয়ের বিয়েকে বলে শিশু বিয়ে। এ নিয়ে ইউনিসেফ এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রকল্পও রয়েছে। যে প্রকল্প 3C নিয়ে কাজ করছে। C তিনটি হল child marriage, child labour ও corporal punishment.
আরজ আলী মাতুব্বর কিন্তু বহু বছর আগে বাল্য নয়, শিশু বিয়ে শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ‘সত্যের সন্ধান” নামক বইয়ে ‘মূলকথা’ পরিচ্ছেদে বলেছেন, “আমাদের দেশে জন্মহার অত্যধিক। জনসংখ্যা অস্বাভাবিকরূপে বৃদ্ধি পাইতেছে —-শিশু, বিধবা ও বহুবিবাহে।” ”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ)
অনায়াসে বাল্য বিবাহ শব্দটি ব্যবহার করতে পারতেন। সচেতনভাবেই অনুপ্রাস সৃষ্টির সুযোগ এড়িয়ে গেছেন। কারণ শিশু বিবাহের সাথে নারী অধিকার সম্পর্কিত, শিশু অধিকার তো বটেই। তিনি অনেক আগেই শিশু বিয়ে ও বহু বিয়ের কুফল নিয়ে লিখেছেন যা নিয়ে বাংলাদেশের নারীবাদীরা এখনও আন্দোলন করছে ।
যদিও তিনি সবশেষে বলেছেন, “ সুখের বিষয় এই যে, সরকারী নির্দেশে শিশু-বিবাহ বর্তমানে কমিয়াছে।’ ”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ)তবে কমে যাওয়ার গতি খুবই ধীর। নারীর যাপিত জীবনের জাগতিক যন্ত্রণায় শিশু বিয়ে ও বহু বিয়ের মত দুটো প্রথারই নেতিবাচক প্রভাব যে অসহণীয় তা তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন।
যুক্তি দেখাতে বাস্তব জীবন থেকে উদাহরণ লাগে। চাক্ষুষ ঘটনার উপস্থাপন যুক্তিকে শাণিত করে। বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে নির্ভরশীলতা, আস্থা ও জীবনরক্ষাকারী পথ হিসেবে মানুষ বিজ্ঞানকেই বেছে নেয়। তবে বিশ্বাসের বলি তো সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীরাই হয়ে আসছে। আর আরজ আলী মাতুব্বর তা জানেন ও মানেন বলেই উদাহরণ এনেছেন গর্ভবতী নারীর সন্তান জন্মদানের মত ঘটনাকে। “গর্ভিনীর সন্তান প্রসব যখন অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে, তখন পানি পড়ার চেয়ে লোকে বেবী ক্লিনিকের (baby clinic) উপর ভরসা রাখে বেশী।”(মূলকথা/প্রশ্নের কারণ। এ তার চারপাশের নারীর জীবন চক্র পর্যবেক্ষণের ফল।
নারী পুরুষ বিভাজন নিয়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আপত্তিকর, বিভ্রান্তিকর, বৈষম্যমূলক, বিসদৃশ্য এবং জেন্ডার অসংবেদনশীল বক্তব্য আছে। তাই ধর্মীয় প্রভাবে প্রভাবিত সমাজে ও পরিবারে নারীমুক্তি বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।ধর্মের মূলসুর ইহজগতকে গৌণ করে পরকালের জীবনকে মূখ্য করে তোলা; নারী পুরুষের লিঙ্গজ, জৈবিক, প্রাকৃতিকভাবে দৈহিক পার্থক্যকে বড় করে দেখিয়ে নারীকে সামাজিকভাবে অধঃস্তন করে রাখায় ধর্মের ভূমিকা ও অবদান প্রত্যক্ষভাবেই দায়ী। বিষয়টি নিয়ে নারীবাদীরা সংগ্রাম করছেন। নারীর দৈহিক কাঠমোকে ভিত্তি করে সমাজ ও রাষ্ট্র তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আর নারীর এ অধঃস্তন অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই নারী আন্দোলন। আর নারী পুরুষের মধ্যে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পার্থক্য নিয়ে উন্নয়ন জগতে gender নামে বহুল আলোচিত একটি ক্ষেত্র রয়েছে।
পরকালে নারীর অবস্থান অধঃস্তন ও কোথাও কোথাও অস্পষ্ট বলে ইহজাগতিক জীবনে নারী বৈষম্যের শিকার হয়। কিন্তু পরকালে নারী পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক অস্তিত্ব নিয়েই আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্ন যা নারী পুরুষের বৈষম্যের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। তিনি প্রাণের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন,“কেঁচো ও শামুকাদি ভিন্ন যাবতীয় উন্নত জীবেরই নারী-পুরুষ ভেদ আছে, কৃচিৎ নপুংসকও দেখা যায়। কিন্তু জীবজগতে নারী ও পুরুষ, এই দুই জাতিই প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। প্রতিটি জীব বা মানুষ জন্মিবার পূর্বেই যদি তাহার স্বতন্ত্র সত্ত্বাবিশিষ্ট প্রাণ সৃষ্টি হইয়া থাকে, তাহা সেই প্রাণেও লিঙ্গভেদ আছে কি? যদি থাকেই, তাহা হইলে অশরীরী নিরাকার প্রাণের নারী, পুরুষ এবং ক্লীবের চিহ্ন কি? আর যদি প্রাণের কোন লিঙ্গভেদ না থাকে, তাহা হইলে এক জাতীয় প্রাণ হইতে ত্রিজাতীয় প্রাণী জন্মে কিরূপে? লিঙ্গভেদ কি শুধু জীবের দৈহিক রূপায়ণ মাত্র? তাহাই যদি হয়, তবে পরলোকে মাতা-পিতা, ভাই-ভগিনী ইত্যাদি নারী-পুরুষভেদ থাকিবে কিরূপে?পরলাকেও কি লিঙ্গজ দেহ থাকিবে?”(প্রথম প্রস্তাব/ আত্মা বিষয়ক)।
কাজেই ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে ভিত্তি করে নারীর প্রতি যে বৈষম্য তা এ প্রশ্নের কাছে খড়কুটোর মতই উড়ে যায়। আর এখানেই তিনি নারী মুক্তি আন্দোলনের একজন সহযোগী হিসেবে স্বীকৃত হন।

আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী (২)

নারীর যৌন জীবন ও যৌন অধিকার নিয়ে নারীবাদীরা সোচ্চার।‘শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার’ স্লোগান নারীর শরীরের ওপর নিজের অধিকারের দাবি। নারীর যৌন জীবন ও অধিকার কোন ধর্মেই স্বীকৃত তো নয়ই, বরং জগণ্য শব্দ ব্যবহারে ধিকৃত।নারী সংসারে পুতুলের মত। পরিবার তথা সমাজ আরোপিত কর্মই তার কর্তব্য। সে একই শরীরে বিভিন্ন সময়ে অনেক সময় একই ব্যক্তির কাছে বিভিন্নরূপে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য বাধ্য। কখনও কন্যা, কখনও মাতা আর শয্যায় ভার্যা। ভার্যা হিসেবে তার কোন চাহিদা নেই। সে পুতুল। স্বামীর মনোরঞ্জনই ভার্যার একমাত্র চাওয়া, ধর্ম, কর্ম। যদিও marital rape বিষয়টি আলোচিত। অনেক দেশে এটি অপরাধ এবং এ নিয়ে আদালতে যাওয়া যায়। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসনে পরিচালিত সমাজে এ নিয়ে কথা বলাই অপরাধ।
আরজ আলী মাতুব্বর নারীর যৌন জীবন ও যৌন অধিকারের বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষন করতেন। ‘হেজরল আসোয়াদ” নামে একটি কালো পাথর কাবাগৃহের দেওয়ালে গাঁথা আছে। হজ্বের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হাজীগণকে অন্য অনেক নিয়মের মত ঐ পাথরে চুমা দিতে হয়। উনি তার প্রশ্ন করেছেন,‘হাজীগণকে ঐ পাথরখানায় সম্মানের সাথে চুম্বন করিতে হয়। পিতা-মাতা স্নেহবশে শিশুদের মুখ চুম্বন করে এবং প্রেমাসক্তিবশে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মুখ চুম্বন করিয়ে থাকে। যাহাকে চুম্বন করা হয়, তাহার মমতাবোধ বা সুখানুভূতি থাকা আবশ্যক। যাহার মমতাবোধ বা সুখানুভূতি নাই, তাহাকে চুম্বন করার কোন মূল্য থাকিতে পারে না।‘হেজরল আসোয়াদ”চেতনাবিহীন একখন্ড নিরেট পাথর মাত্র। উহাকে চুম্বন করিবার উপকারিতা কি?” (চতুর্থ প্রস্তাব/ধর্ম বিষয়ক)।
এখানে উনি স্বামী-স্ত্রীর চুম্বন করার কথা উদাহরণ হিসেবে টানতে গিয়ে পরস্পর বিষয়টির ওপরে গুরুত্ব দিয়ে নারীর যৌন অধিকারের বিষয়টিকেই সমর্থন করেছেন। আর হেজরল আসোয়াদ নামে চেতনাবিহীন একখন্ড নিরেট পাথর প্রসঙ্গে স্বামী স্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে নারীকে যে সমাজ ও ধর্ম চেতনাবিহীন পাথর মনে করে এরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নারীকে সতী আর অসতী হিসেবে আখ্যায়িত করা মানবতা বিরোধী ও নারী বিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এতে নারীকে অসম্মান করা হয়। অপমান করা হয়। সতী আর অসতী নারীর ধারণা যে খেলো ব্যাপার তা আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর লেখায় ব্যক্ত করেছেন। পৌরাণিক কাহিনীর নারী চরিত্র সীতা সতী বলে আগুনে পুড়েনি এমন কাহিনী রয়েছে। শুধু মানবীই না, বা মানব দেহ মাত্রই না, দাহ্য বস্তু মাত্রই আগুনে পুড়বে।তা সতী, সৎ, অসতী বা অসৎ, জীব, জড় যা ই হোক না কেন। কাজেই নারীকে অসতী বলে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার ছল চাতুরির দিন শেষ। আগুনের কাছে যেমন সতী অসতী ভেদাভেদ নেই তেমন সমাজেরও এ নিয়ে বিভাজন করা বা সংজ্ঞায়িত যে উপহাসেরই কাজ তা আরজ আলী মাতুব্বরের ভাবনায় প্রস্ফুটিত। তিনি লিখেছেন,“সেকালে হিন্দুদের ধারণা ছিল যে, সতী নারী অগ্নিদগ্ধ হয় ন। তাই রাম-জায়া সীতা দেবীকে অগ্নিপরীক্ষা করা হইয়াছিল। সীতা দীর্ঘকাল রাবণের হাতে একাকিনী বন্দিনী থাকায় তাঁহার সতীত্বে সন্দেহবশত তাঁহাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু উহাতে নাকি তাঁহার কেশাগ্রও দগ্ধ হয় নাই। আর আজকাল দেখা যায় যে সতী বা অসতী, সকল রমণীই দগ্ধ হয়। ইহাতে মনে হয় যে, অগ্নিদেব দাহ্য পদার্থমাত্রেই দহন করে, সতী বা অসতী কাহাকেও খাতির করে না, নতুবা বর্তমানকালে সতী নারী একটিও নাই।” (পঞ্চম প্রস্তাব/‘প্রকৃতি বিষয়ক’)
সত্যের সন্ধান বইয়ে ষষ্ঠ প্রস্তাব পরিচ্ছেদের ‘বিবিধ’ নামক প্রবন্ধে আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন রেখেছেন যীশুখ্রীষ্টের পিতা কে এবং এর উত্তরও খুঁজেছেন। নিঃসন্তান সখরিয়ার ছিল অতি বৃদ্ধা স্ত্রী ইলীশাবেত যে ফেরেস্তার বর পেয়ে পুত্রের মা হন এবং পরে সখরিয়ার পালিতা ১৬ বছর বয়সী কুমারী মরিয়মও গর্ভবতী হন। আরজ আলী নির্মোহভাবে বিভিন্ন ঘটনা, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সখরিয়াই যীশুখ্রীষ্টের জন্মদাতা। কিন্তু কোথাও একটি শব্দও মরিয়মের চরিত্রের প্রতি নেতিবাচকভাবে খরচ করেননি। তিনি শুধু অলৌকিক ঘটনার গিট্টু খুলেছেন। তিনি ব্যভিচারের অপরাধে সখরিয়ার প্রাণদন্ডের উল্লেখ করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে মহাভারতের মহর্ষি পরাশরের ঔরসে অবিবাহিতা মৎসগন্ধার গর্ভে ব্যাসদেবের জন্মের লৌকিক ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন।
আরজ আলী মাতুব্বরের নারী চরিত্রের প্রাসঙ্গিকতায় যে নির্মোহ ভাব তা নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। সাধারণত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যস্থায় পরিপক্ক হওয়া মানসিকতা নারীর চরিত্র হননের সুযোগ হাতছাড়া করে না। কুমারী মাতার মত তথাকথিত রসঘন বিষয় পেয়েও তিনি কুমারী মাতার পুত্রের পিতার অনুসন্ধান করেছেন যা আমাদের এখনকার সমাজ ব্যবস্থায় অতীব প্রয়োজন।কুমারীর মায়ের দায়ের চেয়ে, তার চরিত্র বিশ্লেষণের চেয়ে অঘটনপটিয়সীর সন্ধান জরুরী।নারী আন্দোলন ঘটনার শিকার নারীর চেয়ে অঘটনগপটিয়সী পুরুষটির পরিচয় জনসন্মুখে প্রকাশের দাবি করে। আর যীশুখ্রীষ্টের জন্ম ইতিহাসের আলোচনায় আরজ আলী মাতব্বর এ কাজটিই করেছেন।
হজরত আদমের বাম পাজর থেকে বিবি হাওয়া সৃষ্টি বলে স্ত্রীকে স্বামীর অঙ্গজ বলা হয়। স্ত্রী স্বামীর অঙ্গজ হিসেবে অঙ্গিনী একটি বহুল বির্তকিত বিষয়।সচেতন নারী মাত্রই এ নিয়ে প্রতিবাদমুখর। আরজ আলী মাতুব্বরও এ নিয়ে রসিকতা করেছেন।“মানুষের হস্তপদাদি কোন অঙ্গ রুগ্ন হইলে উহার প্রতিকারের জন্য চিকিৎসা করান হয়।রোগ দুরারোগ্য হইলে ঐ রুগ্নাঙ্গ লইয়াই জীবন কাটাইতে হয়।রুগ্নাঙ্গ লইয়া জীবন কাটাইতে প্রাণহানির আশংকা না থাকিলে কেহ রুগ্নাঙ্গ ত্যাগ করে না। স্ত্রী যদি স্বামীর অঙ্গই হয়, তবে দূষিতা বলিয়া তাহাকে ত্যাগ করা হয় কেন? কোনরকম কায়ক্লেশে জীবনযাপন করা যায় না কি”?(ষষ্ঠ প্রস্তাব/বিবিধ)। তালাক আর বহু বিয়ের অজুহাতকে তিনি বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবেই উপস্থাপন করেছেন।
নারীর প্রতি এক জগণ্য অপরাধ হিল্লা প্রথা।এ প্রথা নারীর মন ও মর্যাদার ওপর আঘাত। তালাকের পর স্ত্রীকে অন্য কারও সাথে বিয়ে দিয়ে পরে ঐখান থেকে তালাক নিয়ে পুনঃবিবাহ করা হল হিল্লা প্রথার মূল বিষয়। ইসলামী এ প্রথা আইয়ূব খানের আমলে পরিবর্তন হলেও গ্রামে গঞ্জে এ বিষয়ক ফতোয়া এখনও চলমান। এ নিয়ে প্রায়শঃই পত্রিকার পাতায় খবর প্রকাশিত হয়। নারী আন্দোলন হিল্লা প্রথা নির্মূল ও প্রতিরোধে বদ্ধ পরিকর। আরজ আলী মাতুব্বরও এ ঘৃণিত প্রথাটির শিকার নারীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বলেছেন, “অথচ পুনঃগ্রণযোগ্যা নির্দোষ স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণে ‘হিল্লা’ প্রথার নিয়মে স্বামীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় সেই নির্দোষ স্ত্রীকেই।অপরাধী স্বামীর অর্থদন্ড, বেত্রাঘাত ইত্যাদি না-ই হউক, অন্তত তুওবা (পুনরায় পাপকর্ম না করিবার শপথ) পড়ারও বিধান নাই, আছে নিস্পাপিনী স্ত্রীর ইজ্জতহানির ব্যবস্থা। একের পাপে অন্যকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় কেন?”?(ষষ্ঠ প্রস্তাব/বিবিধ)।
তিনি এমন স্বামীকে বাগে পেলে যে নিদেন পক্ষে তওবা পড়িয়ে ছাড়তেন তা উপরের লাইনে প্রকাশিত।
নারীবাদী কে? আধুনিক মানুষ মাত্রই নারীবাদী। এ আমার নারীবাদ সম্পর্কিত সরল মন্তব্য। আধুনিক মানুষ মাত্রই নারীর প্রতি ইতিবচক মনোভাব পোষণ করে, নারী মুক্তি চায়,নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, নারীর সম ও ন্যায্য অধিকারে সহযোগী ভূমিকা পালন করে। আরজ আলী মা্তুব্বর একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন এবং নারীবাদী চেতনা লালনকারী ছিলেন।

আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী (৩)

‘সত্যের সন্ধান” বইয়ের নাম যুক্তিবাদ দিয়েও আরজ আলো মাতুব্বর তাঁর হাজতবাস ঠেকাতে পারেননি। তাই দ্বিতীয় বইয়ের নাম দিয়েছিলেন “অনুমান”, গ্রন্থটি সম্পর্কে নিজেই বলেছিলেন, “ তাই এবারে ‘সত্যের সন্ধান” না করে মিথ্যার সন্ধান করতে চেষ্টা করছি এবং “যুক্তিবাদ” এর আশ্রয় না নিয়ে আমি আশ্রয় নিচ্ছি “অনুমান”-এর। তাই এ পুস্তিকাখানার নামকরণ করা হলো– মিথ্যার সন্ধানে “অনুমান।”এতে যুক্তিবাদের কঠিন দেয়াল নেই, আছে স্বচ্ছ কাঁচের আবরণ।” তিনি স্বচ্ছ কাঁচের আবরণ দিয়ে প্রতিকী চরিত্র সৃষ্টি করে নারীর অধঃস্তন অসহায় অবস্থানকে উপস্থাপন করেছেন।
“অনুমান” গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধটির নাম ‘রাবণের প্রতিভা।’ রাবণ আর সীতার কাহিনীর মোড়কে রামকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বসবাসকারী গতানুগতিক একজন পুরুষ ও সীতাকে পুরুতান্ত্রিক সমাজের শিকার একজন অসহায় নারী হিসেবে এঁকেছেন।
কোন দম্পতির সন্তান না হলে সমাজ স্ত্রীকেই প্রথমে দায়ী করে।বাঁজা নামের অপবাদ নারীর প্রতিই সাধারণত ছোঁড়া হয়। আমাদের সমাজে নারীকে বন্ধ্যা বানিয়ে বহু বিবাহ প্রথা বহাল তবিয়তে বিরাজমান। কিন্তু রাম আর সীতার দাম্পত্য জীবনে বায়ান্ন বছর (পৌরাণিক কাহিনীর বছর)নিঃসন্তান থাকার জন্য আরজ আলী সীতাকে নয়, রামকে দায়ী করেছেন। তিনি লিখেছেন, “সীতাদেবী বন্ধ্যা ছিলেন না এবং উক্ত তেপান্ন বছরের মধ্যে বনবাসের দশ মাস(অশোককাননে রাবণের হাতে সীতা বন্দিনি ছিলেন ১০ মাস)ছাড়া বায়ান্ন বছর দু’মাস সীতা ছিলেন রামচন্দ্রের অঙ্কশায়িনী। তথাপি এ দীর্ঘকাল রতিবিরতি রামচন্দ্রের বীর্যহীনতারই পরিচয়,নয় কি?”
এটাকে আমরা তাঁর গ্রামের বা পরিচিত বলয়ের কোন প্রত্যক্ষ ঘটনার প্রতিবাদের জন্য লেখা বলে গণ্য করতেই পারি। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন যে স্বচ্ছ কাঁচের আবরণ দিয়ে তাঁর “অনুমান” বইটি লিখেছেন।
আর দাম্পত্য জীবনের বায়ান্ন বছর অর্থাৎ দীর্ঘ বছর কাটিয়ে দেয়ার পর রাম সীতার সন্তান হওয়াকে নিঃসন্তান স্বামীদের বহু বিবাহ না করে ধৈর্য ধরার ইঙ্গিত করেছেন যা নারীকে সতীনের ঘর করা থেকে রক্ষা করবে। কারণ প্রবাদ রয়েছে যে নারী স্বামীকে যমকে দিতে রাজি থাকলেও পরকে অর্থাৎ সতীনকে দিতে রাজি হয় না।
নারীর এ রাজি হওয়া আর না হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যে রয়েছে নারীর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ। নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া ও শ্রদ্ধা করা তো নারী আন্দোলনের দাবি। আরজ আলী মাতুব্বরের এ দাবির প্রতি সমর্থন ছিল বলেই সীতা ও রামের প্রতিকী কাহিনী বলে নারীকে সতীনের সাথে বসবাসের অসহায়তাকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন।
নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার জন্য সময় লাগে না। যখন তখন, যেভাবে মন চায় ইচ্ছে মত গুজব রটিয়ে দিলেই হয়। রাম হাস্যকরভাবে প্রজা মনোরঞ্জন বা প্রজা বিদ্রোহের অজুহাতে বনবাস থেকে ফেরার ২৭ বছর পর সীতাকে ত্যাগ করে বনবাসে পাঠিয়েছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “ … স্বতই মনে প্রশ্নের উদয় হয় যে, মরার দু’যুগের পরে কান্না কেন? বনবাসান্তে রামচন্দ্র স্ববাসে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁর বনবাসের বিবরণ তথা লঙ্কাকান্ড দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিলো। তাঁর দেশে ফেরার সংগে সংগেই এবং সীতা কলঙ্কের কানাকানিও চলছিলো দেশময় তখন থেকেই। আর গুজবের ভিত্তিতে সীতাদেবীকে নির্বাসিত করতে হলে তা করা তখনই দরকার ছিলো সঙ্গত। দীর্ঘ ২৭ বছর পর কেন?”
তাঁর প্রশ্ন থেকে আমাদের মনে উত্তর উদয় হয় যে নারীকে অপবাদ দিতে সাক্ষী লাগে না, প্রমাণ লাগে না, সময় লাগে না। স্বামী তথা পুরুষ নিজের ইচ্ছে ও সুবিধামত নারীকে যখন ত্যাগ করতে চাইবে তখনই উপযুক্ত সময়। চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে তা করার জন্য জনমত, সমাজ, রাষ্ট্র ও আইন পুরুষের পক্ষেই কাজ করে। তথাকথিত চরিত্রহীন নারী পরিত্যাজ্য ও পরিত্যক্ত।
আর আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্ন করে অচলায়তন সমাজকে নিংরে দেখানোর কৌশল প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন “……..আরজ আলী মাতুব্বর প্রথম ও নির্মম যে অন্ধকার সুচিরকাল ধরে স্থায়ী হয়ে আছে এই বাংলাদেশে, তার কথাই বলেছেন তাঁর বইতে। বর্ণনা করে নয় প্রশ্ন করে।’’
পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্রের আড়ালে আরজ আলী মাতুব্বর নারীর অসহায় অবস্থার জন্য দায়ী সমাজে বিরাজমান চরিত্র চিত্রণ করেছেন। প্রজা মনোরঞ্জন জন্য, নিজের সিংহাসন নিষ্কলুষ রাখার জন্য নিষ্কলঙ্ক পাঁচ মাসের অন্তঃসত্বা স্ত্রী সীতাকে রাম বনবাসে পাঠিয়েছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বরের ভাষায়, “রামচন্দ্র সীতাদেবীকে গৃহত্যাগী করেছিলেন শুধু জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য,স্বয়ং তাঁকে নাকি “নিষ্কলঙ্কা” বলেই জানতেন।এইরূপ পরের কথায় নিষ্ককলঙ্কা স্ত্রী ত্যাগ করার নজির জগতে আছে কি?”
ছিল। আছে। আর না থাকার জন্য নারী আন্দোলন। সমাজে এমন পুরুষ চরিত্রের ছড়াছড়ি যারা পরের কথায় ঘরের বউকে ত্যাগ করে, তালাক দেয়, শ্বশুর বাড়ির নামে বনবাসে পাঠায়। তথাকথিত লোক লজ্জার অপমানের আশংকায় নিজের স্ত্রীকে অপমান করে। নারী তার অধঃস্তন অবস্থা ও অবস্থানের জন্য তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। সীতার প্রতীকে তিনি বাংলাদেশের নারীর জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি প্রসঙ্গক্রমে গ্রেট বৃটেনের অষ্টম এডোয়ার্ড এর প্রেমের মহান উদাহরণ দিয়ে বলেছেন যে, “পার্লামেন্ট এডোয়ার্ডকে জানালো যে হয় মিসেস সিম্পসনকে ত্যাগ করতে হবে, নচেৎ তাঁকে ত্যাগ করতে হবে সিংহাসন।এতে এডোয়ার্ড সিংহাসন ত্যাগ করলান, কিন্তু প্রেয়সীকে ত্যাগ করলেন না। শুধু তা-ই নয়, তাঁর মেঝ ভাই ডিউক- অব-ইয়র্ককে সিংহাসন দিয়ে তিনি সস্ত্রীক রাজ্য ছেড়ে চলে গেলেন বিদেশে। রামচন্দ্রেরও তো মেঝ ভাই ছিলো।”
আরজ আলী মাতুব্বর নিজে নারী প্রেমের মর্যাদায় বিশ্বাস করতেন এবং নারীর প্রতি প্রখর মর্যাদাবোধ ধারণ করতেন বলেই রামকে সীতার জন্য রাজ্য ত্যাগের পরামর্শ দিতে কুন্ঠিত নন। অর্থাৎ স্ত্রীর জন্য স্বামীকে ত্যাগী হবার মন্ত্র ছড়িয়েছেন।
সমাজ সব সময়ই নারীর তথাকথিত সতীত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। নারী সতী না হলে হয় পতিতা। কিন্তু পুরুষ পতিত হয় না কোন কালেই। এ গতানুগতিক বিষয়টি বহুল আলোচিত। ‘রাবণের প্রতিভা’ প্রবন্ধে আরজ আলী মাতুব্বর সীতার সতীত্বের বিষয়টি উহ্য রেখে, তার দেবত্বের মহিমা দূরে রেখে তাকে সমাজের বিভিন্ন চরিত্রে বিভিন্নরুপে বসিয়েছেন। রামায়ণের রাম সীতা আর রাবণের কাহিনীর আভরণে তাঁর আশেপাশের নারীর জীবন কথা তুলে এনেছেন। ‘সত্যের সন্ধান” বইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে যে এটা তাঁর কৌশলী অবস্থান তা তিনি বইয়ের ভূমিকায় নিজেই প্রকাশ করেছিলেন।
আরজ আলী মাতুব্বর প্রথমে রামায়ণের কাহিনী ঠিক রেখে পরে “— ঘটনাগুলো হয়তো এরূপও ঘটে থাকতে পারে। যথা—’’ বলে তিনি প্রতিকী সীতাকে রাবণের সাথে স্বেচ্ছায় শুইয়েছেন, অন্তঃসত্ত্বা বানিয়েছেন, আবার সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণও করিয়েছেন।
হিন্দু সমাজে সাধারণত মেয়েদের নাম সীতা রাখা হয় না। প্রচলিত ধারণা সীতা নাম রাখলে মেয়েটির জীবন সীতার মতই দুঃখে পরিপূর্ণ হয়ে থাকবে। কদাচিৎ কারও নাম সীতা রাখা হলে দেখা যায় ওই মেয়েটির নবজাতক অবস্থায় তার মা মারা গেছে বা বাবা মারা গেছে, অথবা কোন পারিবারিক বিপর্যয় ঘটেছে। হয়ত এ ধারণাটিকে কাজে লাগিয়ে আরজ আলী মাতব্বর পৌরাণিক কাহিনী থেকে সীতা নামটিই বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের নারীর দুঃখ গাঁথা তুলে ধরার জন্য।বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী নির্যাতনের যে চিত্র তা সীতা নামের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।
দুঃখিনী সীতাদের সংসারে কিল চড় খাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। তিনি লিখেছেন,‘সীতাদেবীকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছলে লঙ্কাকান্ড প্রকাশ হওয়ায় সেখানে তখন সীতাকলঙ্কের ঝড় বইছিলো নিশ্চয়ই। হয়তো সীতার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য প্রথমত জেরা-জবানবন্দি, কটূক্তি, ধমকানি-শাসানি ও পরে মারপিট ইত্যাদি শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিলো তাঁর প্রতি। কিন্তু তিনি নীরবে সহ্য করেছিলেন সেসব নির্যাতন, ফাঁস করেননি কভূ আসল কথা। আর সেটাই হচ্ছে সীতার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া”।
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সর্বংসহা নারী তো এভাবেই বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না অবস্থায় মারপিট খেয়েও অবস্থান করছে। আর জেরা-জবানবন্দি, কটূক্তি, ধমকানি-শাসানি ও মারপিটসহ শারীরিক নির্যাতন পৃথিবীব্যপীই নারীর জীবনের অপরিহার্য লিখন। এজন্যই তো ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। । আর এ অভিজ্ঞতা থেকেই তো নারী আন্দোলনের স্লোগান—‘কিসের ঘর কিসের বর/ঘর যদি হয় মারধোর।’’
আরজ আলী মাতুব্বর বাস্তবতার নিরীখে দেবী সীতাকে মাটিতে এনে তথাকথিত অবতার রামকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যোগ্য উত্তরসূরী করে রাম ও সীতার সম্পর্ককে ও সংসারকে কিসের বর ও মারধোরের ঘর হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
রাম আর সীতার পুরো কাহিনিটিই রামায়ণ থেকে ভিন্নভাবে আরজ আলী মাতুব্বর উপস্থাপন করেছেন, যা বাংলাদেশের নারীর দুঃখে ভরা জীবন যাপনের সাথে একাত্ম। বাংলাদেশে সীতাদের স্বামীরা সন্তানদের রেখে স্ত্রীদের তালাক দিয়ে তাড়িয়ে দেবার ঘটনা অসংখ্য। আর তালাক প্রাপ্ত নিরুপায় নারী আত্মহত্যা ছাড়া বিকল্প উপায় খুঁজে পায় না। আরজ আলী মাতুব্বরের কাহিনীতে এরই প্রতিধ্বনি, “কুশ-লবকে গ্রহণ করলেও সীতাকে গ্রহণ করেননি রামচন্দ্র সেদিনও। সীতাদেবী হয়ত আশা করেছিলেন যে, বহু বছরান্তে পুত্ররত্ন-সহ রাজপুরীতে এসে এবার সমাদর পাবেন।কিন্তু তা তিনি পান নি,বিকল্পে পেয়েছিলেন যতো অনাদর-অবজ্ঞা। তাই তিনি ক্ষোভে দুঃখে হয়তো আত্মহত্যা করেছিলেন। নারী হত্যার অপবাদ লুকানোর উদ্দেশ্যে এবং ঘটনাটি বাইরে প্রকাশ পাবার ভয়ে শ্মশান দাহ করা হয়নি সীতার শবদেহটি, হয়তো লুকিয়ে প্রোথিত করা হয়েছিল মাটির গর্তে,পুরীর মধ্যেই। আর তা-ই প্রচারিত হয়েছে ‘স্বেচ্ছায় সীতাদেবীর ভূগর্ভে প্রবেশ’ বলে।”
নারী হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে অহরহ। পত্রিকার পাতাই এর সাক্ষী। আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় তা ঘা দিয়েছিল বলেই প্রতিকারের আশায় রাম সীতার কাহিনীর অবতারণা। এ অবতারণা আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী মুক্তি আন্দোলনের সাক্ষ্য বহন করে।

আরজ আলী মাতুব্বরের চেতনায় নারী (৪)

ভগ মানে স্ত্রী যোনি। গুরুপত্নী অহল্যার সতীত্ব নষ্ট করায় ইন্দ্রকে গুরুর অভিশপে সর্বাঙ্গে এক হাজার ভগ বা স্ত্রী যোনি ধারণ করতে হয় বলে তার নাম হয় ভগবান। এখানে স্ত্রী যোনিকে আরজ আলী মাতুব্বর অশ্লীল বা লজ্জাস্কর অথবা কদর্‍্যভাবে বর্ণনা না করে ইন্দ্রের শাস্তিটাকেই মুখ্য করে তুলেছেন। এখানে অহল্যা চরিত্রটিকে ধর্ষন করার পৌরাণিক কাহিনী সেঁচে তিনি যে উদাহরণ তুলে ধরেছেন তা যেন ইন্দ্রকে আজকালকার ধর্ষণকারীদের রূপে দেখতে পাই। নারীবাদীরা ধর্ষণের শিকার নারীর চেয়ে ধর্ষনকারীদের পরিচয় ও চরিত্র বিশ্লেষণে সচেষ্ট। অপরাধকে নির্মূল করতে এর শিকড়ের সন্ধান করতে হয়। অপরাধ ও অপরাধীর তথ্য বেশি প্রয়োজনীয়। তাই আরজ আলী মাতুব্বর নারী বিদ্বেষীদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে ইন্দ্রের ছদ্মবেশেদারী চরিত্রহীন এক পুরুষের আদ্যপ্রান্ত তুলে ধরেছেন “অনুমান” গ্রন্থের ‘ভগবানের মৃত্যু’ নামক নিবন্ধে। ভগবানের মৃত্যু নামক লেখাটিই হেঁয়ালি দিয়ে শুরু বলে এ যে পৌরাণিক ইন্দ্রের ছদ্মবেশে আমাদেরই চারপাশে বসবাসকারী ধর্ষনকারী তা সহজেই অনুমেয়। আর তার “অনুমান” গ্রন্থটির বিভিন্ন লেখা যে স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে সত্যকে ঢেকে রাখার কৌশল তা বইটির ভূমিকায় বলেই রেখেছিলেন।
ইন্দ্রের দুঃষ্কর্মের বর্ণনায় তিনি তার মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানসহ কুন্তীর সাথে অবৈধ যৌনাচার, কিষ্কিন্ধ্যার অধিপতি রক্ষরাজের পত্নীর গর্ভে বালী রাজের জন্মদান, গুরুপত্নীকে ধর্ষনসহ সবই তুলে ধরে যেন আমাদের সমাজেরই কোন পরিচিত পুরুষ চরিত্র চিত্রণ করেছেন। আমাদের সামাজিক বলয়ে দুঃশ্চরিত্র ব্যক্তি যৌন ব্যভিচারে লিপ্ত বলে তাঁর জ্ঞান, গরিমা, বুদ্ধি,যশ, প্রতিপত্তি সবই অর্থহীন । পুরুষের যৌন ব্যভিচারের শিকার যে নারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরজ আলী মাতুব্বর পুরুষ বা ইন্দ্র তথা ধর্ষনকারীর পরিচয়ে বলেছেন, “‘ভগবান’ হচ্ছে দেবরাজ ইন্দ্রের একটি কুখ্যাত উপাধি মাত্র।ইন্দ্র ছিলেন শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান- বিজ্ঞানে অতি উন্নত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। তাই তার একনাম ‘দেবরাজ’ । , কিন্তু দেবরাজ হলে কি হব্‌ তাঁর যৌন চরিত্র ছিলো নেহায়েত মন্দ।’’ এ মন্দ তো নারীকে শিকার করে বলেই। মন্দের এ সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি নারীর অবস্থানকেই তুলে ধরেছেন।
নারীরা পদবী তার বাবার থেকে নেয়। অনেকে বিয়ের পর স্বামীরটা নেয়। অনেকে আবার নামের পাশে স্ত্রী লিংগবাচক বেগম সুলতানা নিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে মায়ের নাম নিজের সাথে লাগানোর রেওয়াজ খুবই কম। তবে স্বামীর তার স্ত্রীর পদবী নেওয়ার চর্চা নেই।পদবী তো দূরের কথা, স্ত্রীর কথার গুরুত্ব দিলেই স্বামীকে স্ত্রৈণ হিসেবে সম্বোধন করে ঠাট্টা করা হয়। আরজ আলী মাতুব্বর কিন্তু গুরুত্বের সাথে স্ত্রীর নামে স্বামীর পরিচিতি পাবার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
আরজ আলী মাতুব্বরের ভাষায়, “সহস্র ভগ অঙ্গে থাকায় ইন্দ্রদেব ‘ভগবান’ আখ্যা পেয়েছিলেন। কিন্তু মহাদেব শিবকেও ‘ভগবান’ বলা হয়, অথচ তার দেহে ‘ভগ’ ছিল না একটিও। তত্রাচ তিনি ‘ভগবান’ আখ্যা প্রাপ্তির কারণ হয়তো এই যে তিনি ছিলেন ভগবতীর স্বামী। স্বয়ং ‘ভগযুক্তা’ বলেই দূর্গাদেবী হচ্ছেন ভগবতী এবং‘ভগবতী’- এর পুংরূপে হয়তো শিব বনেছেন ভগবান। যদি তা-ই হয় অর্থাৎ ভগযুক্তা বলে দূর্গাদেবী ভগবতী হন এবং ভগবতীর স্বামী বলে শিব ভগবান হয়ে থাকেন, তাহলে জগতের তাবৎ নারীরাই ভগবতী এবং তাদের স্বামীরা সব ভগবান।”
“হয়তো’ শব্দটি ব্যবহার করে তিনি নারীর তথা ভগবতীর পুংলিঙ্গ সৃষ্টি করেছেন, যেখানে সমাজ পুংলিঙ্গের স্ত্রীবাচক শব্দ সৃষ্টিতে তৎপর, ধর্ম যেখানে স্ত্রীকে পুরুষের অঙ্গ হতে সৃষ্ট বলে ব্যাখ্যায় ব্যপৃত, আরজ আলী মাতুব্বরের বর্ণনায় সেখানে ভগবান নয়, স্ত্রীর পরিচয়ে পরচিতি লাভ যেন ভাগ্যবানের ভাগ্য। এমন কথা পড়ে নারীবাদীদের হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে তালির শব্দ তুলে। ভগযুক্ত স্ত্রীর স্বামী হিসেবে ভগবান শব্দের ব্যাখ্যায় নারীর অধঃস্তন অবস্থানকে উপরের দিকে সজোড়ে ধাক্কা দেবার মন্ত্র বৈ কি!
বর্তমান বাংলাদেশের সমাজে যেখানে বাবা বা স্বামীর নাম বহনই নারীদের কপালে সমাজের লিখন সেখানে স্ত্রীর নামে শিব ভগবান হয় বলে তার যে ব্যাখ্যা তা নারীবাদের উলুধ্বনিই শোনা যায়।
অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান বলেছেন, “…আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনের জিজ্ঞাসার যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা পাঠকের মনে চিন্তার খোরাক যোগাতে সক্ষম।” এ চিন্তার খোরাক যোগানোতে আরজ আলী মাতব্বর পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্তমান প্রজন্মের কোন নারীবাদী পুরুষ স্ত্রীর পদবী গ্রহণ করলে নারীবাদের জয়ধ্বনির অংশীদার ও দাবিদার আরজ আলী মাতুব্বরকেই যে করতে হবে।

কালের অনুধ্যান, ছুঁয়ে দেখা হয়নি

কুসংস্কার থেকে না মুক্তচিন্তা থেকে ওয়াক আউট?
আমরা সবাই জানি যে, গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ থেকে বিরোধী সাংসদরা সরকারী দলের সাথে মতামতে না মিললে মাঝে মাঝে ওয়াক আউট করেন, আবার অংশগ্রহণ করেন, কখনও বর্জন করেন, আবার অংশগ্রহণ করেন। তবে লম্বা সময় ধরে সংসদের বাইরে থাকেন না। আমাদের দেশে নিজের সাংসদ পদ বহাল রাখার জন্য যে সময়টুকু আইনী প্যাঁচে থাকা দরকার এর বেশি সংসদে থাকেন না।
তেমনি, সংস্কার, কুসংস্কার,নাস্তিক ও আস্তিকের বিষয়টিও অনেকের মনে এমনই দোলাচলে দোলায়িত। স্বার্থ, সময় ও সুযোগ বুঝে মুক্তচিন্তায় প্রবেশ করেন, মুক্তচিন্তা থেকে ওয়াক আউট করেন, মুক্তচিন্তায় অংশগ্রহণ করেন।
অন্যভাবে বলা যায়, সময় বুঝে কুসংস্কার থেকে ওয়াক আউট করেন, কুসংস্কার বর্জন করেন, আবার কুসংস্কারে বুঁদ হয়ে থাকেন। এ বুঁদ হয়ে থাকার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে না কমছে তা আমার পর্যবেক্ষনের রাডারে ধরা পড়ছে না। কারণ আমাদের রঙ বদলানো চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। ওয়াক আউটের নীতিহীনতা। যেমন, বামপন্থীদের হজ্বব্রত পালন।
শৈশবে দেখতাম পঞ্জিকা দেখে যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করা হত । দিনে না মিললে বলা হইতো বুধবার যাত্রা শুভ। অথবা ডাকে পাখি না ছাড়ে বাসা সেই সমকে বলে উষা এবং নিদেনপক্ষে যে কোনদিন ঐ সময়ে যাত্রা করা শুভ। আর যাত্রা বলতে বড় জোর মামার বাড়ী যাওয়া। বউদের বাপের বাড়ি যাওয়া। শ্বশুর বাড়ি যাওয়া।। পড়তে শহরে যাওয়া।
আবার এক ঘর থেকে ছেলের বউ ও মেয়ে একদিনে যেতে দিত না। এখনও আমি আমার বাপের বাড়ি নরসিংদী গেলে কোন কোন পরিবারে দেখি বা শুনি, না আজ মেয়ের যাওয়া উচিত না। বউ গেল। কাজেই মেয়ে খুশিতে ডগমগ, কিন্তু মেয়ের জামাইয়ের রাগারাগি। এ নিয়ম মানতে ও মানাতে গিয়ে অশান্তি।জামাইয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে ওয়াক আউট করার ঘটনার অঢেল উদাহরণ বিরাজমান।
বা আজ মেয়ে গেল। কাজেই বউ কাল যাবে। এদিকে বউয়ের গাল ফোলা। একদিন আগে বাপের বাড়ি যেতে পারল না। অসন্তোষ।বিক্ষোভও হয়।পাতিল ভাঙ্গার ঘটনাও নজিরবিহীন না।
অন্যদিকে, ভিসা পেলে প্লেনের টিকিট কাট। টিকিট আবার সস্তাটা খোঁজো বা উপো্যগী রুট খোঁজ কিংবা ট্রানজিটে সময় কম লাগে খোঁজ। অথবা, এক দেশে যেতে ট্রানজিটে আরেক দেশ দেখার সুযোগ খোঁজ। ভর্তির বা ক্লাস শুরুর তারিখ বা চাকরিতে যোগদানের সময় দেখে যাবার তারিখ ঠিক কর। কোথায় গেল পঞ্জিকা আর কোথায়ই বা শুভ দিনের গণনা! এক্ষেত্রে আমার মায়ের যুক্তি ছিল–মাসের ত্রিশ দিনই ভগবানের। এটা কি আস্তিকতা থেকে নাস্তিকতার দিকে যাত্রা নয়? আর প্রয়োজন, সময়ের চাহিদা, সমসাময়িক পরিস্থিতি কি মানুষকে অলৌকিক শক্তির অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শক্তি যোগায় না? যোগায়।
এ অমোঘ সত্যটি আমরা কেউ কেউ মানি না। কেউ কেউ নিজে তো মানি ই না, অন্যে যাতে না মানে এর জন্য চাপাতি নিয়ে সদা প্রস্তুত। দিনে পাঁচবার অলৌকিক শক্তির অস্তিত্বকে জানান দেয়। আবার অন্য গোষ্ঠি তাদের বিশ্বস্ত অলৌকিক শক্তির কথা বলতে গেলে এরা আগুনে তাদের ঘর পোড়ায়। এ সদা প্রস্তুত মূর্খদের নিয়ে সরকার ভীত বা রাজনৈতিক খেলায় মত্ত, সাধারণ জনপদ সন্ত্রস্ত, মডারেটরা আহ্বলাদিত, পরহেজগাররা গর্বিত। আর? আর! নাস্তিকেরা তাদের মোকাবেলায় প্রস্তুত। তবে তীক্ষ্ণ যুক্তি নিয়ে। অকাট্য প্রমান দিয়ে। চাপাতি পার্টির সে ক্ষমতা নেই। তাদের যুক্তির ধার নেই, তবে চাপাতির ধার আছে।
২০১৪ সালে আমার চট্টগ্রামের বাসার রান্না ঘরে পাখির পায়খানাসহ খড়কুটোর আবর্জনায় ভরপুর। ঢাকা থেকে লম্বা ছুটি কাটিয়ে ভোরবেলা ঘরে ঢুকে তো এক মহা অস্বস্তিতে। বুঝতে পারছি না কোত্থেকে এসব এলো। পরে আবিষ্কার করলাম রান্না ঘরের এক্সজস্টেড পাখার নিচে জালালী কবুতরের বাসা।
বিল্ডিং এর কেয়ার টেকারকে বললাম একটা ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এটা নাকি সৌভাগ্যের লক্ষণ।গৃহকর্মী ও কেয়ার টেকার আমার সৌভাগ্য নিয়ে আপ্লুত।ছোটবালায় দেখেছি দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কাঠের দোতালার বারান্দায় জালালী কবুতরের বাসা। পায়খানা করে বারান্দা ভরিয়ে রাখত তবুও তাড়াতো না। এ জাতের কবুতরের বাচ্চা খাওয়াও যায় না। অথচ তাদের জন্য আমার ঠাকুমা, বোন ও কাকারা খাবার ছড়িয়ে রাখতেন।
আমার চট্টগ্রামের বাসা থেকে যেন না তাড়াই সে জন্য গৃহকর্মী ও কেয়ার টেকারের বলিষ্ঠ্য অনুরোধ ও পরামর্শ। এক্সজস্টেড পাখার ফাঁকে আমার সৌভাগ্যের স্থায়িত্বের জন্য নয়, কবুতরের দুটো বাচ্চা হয়েছে জেনে তাড়াইনি।পরে পর পর কয়েকদিন রান্না ঘরে ময়লা আবর্জনা সইতে না পেরে কবুতরের বাচ্চা দুটোকে বারান্দায় স্থানান্তরিত করি।। অবশেষে কবুতর নিজেই অন্যত্র স্থানান্তরিত হয় আমার তথাকথিত সৌভাগ্যের পাখায় ভর করে। কারণ, জালালী কবুতর অন্যত্র চলে যাওয়াতেই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছে। বাসায় ফিরে কবুতরের পায়খানাসহ আবর্জনার জঞ্জাল পরিস্কারের দায় থেকে মুক্তি মিলেছিলো।

ছুঁয়ে দেখা হয়নি:
(লেখাটি লিখতে শুরু করেছিলাম অভিজিৎ রায়ের ২০১৫ সালের জন্মদিনে মুক্তমনা ব্লগের আয়োজনে দেওয়ার জন্য। লেখাটি শেষ করতে এত সময় নেওয়ার পেছনে আলস্যের চেয়েও বেশি যে ভাবনাটা কাজ করেছে তা হল লেখাটি লিখতে বলা হয়েছিলো অভিজিৎ রায়কে নিয়ে।)
আমার নাস্তিক হওয়া হঠাৎ করেই। তথাকথিত ‘শয়তানী’ বা ‘কুফরি’ বই পড়ে নাস্তিক হইনি। হঠাৎ একদিন বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার যাবতীয় অর্জনের দায় আমারই, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সর্বশক্তিমান কারো নয়। দোয়া-মোনাজাত-প্রার্থনা কোনোই কাজে আসে না।
নাস্তিকতা গোপন রাখিনি কারো কাছেই। পরিণামে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম পর্যায়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে অনবরত তর্ক-বিতর্ক এবং পরবর্তী পর্যায়ে সকলের কাছে পরকালবিষয়ক করুণা ও হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হই। শেষ পর্যন্ত উভয় পংতিতেই অপাংতেয় ও অগ্রহণযোগ্য এক সত্ত্বায় পরিণত হই।
সেসময় অভিজিৎ রায়কে খুঁজে পেলে বা তার লেখনী পড়তে পারলে নিজের কাছেই নিজেকে সন্তুষ্ট করে তুলতে পারতাম। কারণ কুসংস্কার, ধর্মীয় কুসংস্কার তো বটেই, যুক্তির ধার ধারে না। কিন্তু তবু কূটতর্কে বা ভ্রমাত্মক যুক্তির সঙ্গে পেরে ওঠা আমার জন্য কষ্টকর ছিল। এরকম বিজ্ঞানভিত্তিক লেখনীর অভাবে চেতনা ছিল অপুষ্ট। অবান্তর কথা বলে আমাকে রাগানোও সহজ, আজও।
এসময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে জড়িয়ে পড়লাম মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে, পরকালবিষয়ক করুণা ও হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হলাম আরেক দফা। নতুনত্বের মধ্যে এইই যে, ঠাট্টা ও করুণা করার জন্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি এবার বন্ধুতালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরাও যুক্ত হল। কিন্তু সমমনা কাউকে পাইনি খুঁজে।
আরজ আলী মাতুব্বর, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এদেরকে সঙ্গে নিয়ে এভাবেই কোণঠাসা জীবন চলছিল জীবনের নিজের মতো। দলের নেতাদের কর্মকান্ডে হতাশা পেয়ে বসতে শুরু করেছে তখন। সেই সময় ২০০৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অডিটোরিয়ামে শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চ আয়োজিত ‘আইনস্টাইনের পদার্থবিদ্যার জগৎ ও বিজ্ঞানের দর্শন’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারে এলাম। সেমিনারের বাইরে বিক্রয়ের জন্য কিছু বই রাখা ছিল। বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে চোখে আটকালো একটি বইয়ের নাম। চোখে আটকালো কারণ যেসব বইয়ের সঙ্গে বইটি ছিল সেসবের নামের সঙ্গে বইটির নামের ধরণে অমিল, যদিও প্রচ্ছদের ছবিটি ছিল অন্য বইগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ নামটির কারণেই বইটি উল্টে পালটে দেখার আগ্রহ হয়েছিলো সেদিন। বিষয়বস্তু ও সূচিপত্র দেখে বইটি কিনে নিতে দেরি করিনি সেদিন।
ব্রুনো, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও বা আইনস্টাইন আমার কাছে নতুন কেউ না হলেও স্ট্রিং থিওরির সঙ্গে অভিজিৎ রায়ের এই বইটি দিয়েই আমার প্রথম পরিচয়। বইটি আমাকে যেন কুয়া থেকে তুলে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল সেই সময়। আর বইটির সপ্তম পর্ব আমার অপুষ্ট চেতনাকে শক্তি দিয়েছিল সেদিন। কাঙ্ক্ষিত যুক্তিগুলো পেয়ে গিয়েছিলাম এই সপ্তম পর্বেই।
আমি জীবনটাকে সাধারণভাবেই নিয়েছি সবসময়। এই পৃথিবীতে জন্মানোর পেছনে ‘বিশেষ’ কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে ফিরিনি, নিজেকে প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্রে বিশেষ কোনো অবস্থানে ভাবিনি। আমিও মনে করি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য যাপন করে যাওয়া। আমি তাই করতে চেয়েছি সবসময়, আজও তাই চাই। ‘প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তি’র ইঁদুরদৌড়ে তাই আমি ছিলাম অনুপস্থিত। চাওয়ার মধ্যে ছিল শুধু সত্যকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা। অভিজিৎ রায় আমার হাতদুটো ধরে সত্যকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে শাহবাগে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে কিনলাম তার ও রায়হান আবীরের সম্মিলিত প্রয়াস ‘অবিশ্বাসের দর্শন’। বইটি যেন আমার জন্যই লেখা। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কান্ডজ্ঞানগুলো আরও পরিশীলিতভাবে জ্ঞান হয়ে উঠেছে এই বইয়ে। সমকালীন সমমনারূপী বর্ণচোরাদের মোকাবেলার রসদও পেয়ে গেলাম বইটিতে।
ততদিনে ব্লগ ব্লগার উভয়ই পরিণত হয়েছে অস্পৃশ্যে। ব্লগ পড়া আর ব্লগে লেখা দুটোই চরম ‘গুনাহ’র কাজ। আমি প্রস্তর যুগের মানুষ, শক্ত দুই মলাটে বাঁধা কাগজের বান্ডিলই তখনো আমার জ্ঞানের উৎস। কিন্তু আদম-ইভের সন্তান আমি, নিষিদ্ধ ফলের খোঁজ পেতেই সময় লেগেছে যা একটু, খেতে সময় লাগেনি। ব্লগে, ফেসবুকে পেয়ে গেলাম আসিফ মহিউদ্দীন, ওমর ফারুক লুক্স, সুষুপ্ত পাঠকসহ সমমনা আরও অনেকের অনেক অনেক লেখা। আমি আর একা নই।
২০১৪ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে উপহার পেলাম (সত্য হল আদায় করলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে) ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’। আমার কছে বইটির বিষয়বস্তু ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটির কাছাকাছি মনে হলেও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটি চিরসবুজ আর নতুন এই বইটি লেখা হয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে। ৭১এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন, ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে স্থপতি ও ব্লগার রাজিব হায়দারের করুণ মৃত্যু, পরবর্তীতে মুক্তচিন্তার চর্চাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াইয়ের পুরোধা ব্লগারদের প্রতি রাষ্ট্রীয় জুলুম-অন্যায়ও অভিজিৎ রায়ের লেখনী এড়ায়নি।
তারপর ফেসবুকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করি অভিজিৎ রায়কে। তখন আবার ফেক আইডির প্রাদুর্ভাব ফেসবুকজুড়ে। অভিজিৎ রায়ের নামেও একাধিক আইডি পেয়েছিলাম তখন। মিউচুয়াল ফ্রেন্ড দেখে নিশ্চিত হয়ে যোগাযোগ করতেই সাড়া দিলেন তিনি। একটু অবাকও হয়েছিলাম একদিনের মাথায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করায়। কারণ ফ্রেন্ড একসেপ্ট করার বিষয়ে ব্লগাররা তখন খুবই সাবধান। অভিজিৎ রায় বোধহয় সবসময়ই নিজের সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন।
‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ থেকেই ‘মুক্তমনা’ ব্লগের কথা জানলেও তা নানা কারণে ভুলে গিয়েছিলাম। অভিজিৎ রায়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেই ব্লগটি খুঁজে পাই।
আমি পারতপক্ষে অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে চ্যাট করতাম না, সংকোচ কাজ করত। তবে কথা বললে আন্তরিক জবাব পেয়েছি। মার্চ ২০১৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৫ অচেনা দূরের একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আমার পক্ষে অনেক কম সময়, তাই এর মাঝে উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো কথাও নেই আমাদের মাঝে।
‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইটির সূত্র ধরে ২০১৫র ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে কদিন টানা চ্যাট চলে আমার। নির্ধারিত সময়ের বেশ পরে বের হয় বইটি, ১৬ তারিখে। সেবার প্রতিদিনই বই মেলায় গেলেও আমি জানতাম না তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। বইটির কিছু পাতা পড়ে তিনি আমেরিকাতে আছেন এমন ভেবে নিয়েই ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে মেসেজে মতামত জানাই। বিকেলে চাকরির জন্য একটি সাক্ষাৎকার থাকায় সেদিন বই মেলায় গিয়েছিলাম রাত করেই। বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় একপাক ঘুরে ঘরে ফেরার জন্য যখন টিএসসির কাছে পৌঁছলাম, অস্বাভাবিক একটা ভিড় চোখে পড়ে আমার। একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে জানায়, একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে কারা যেন মেরেছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি সাধারণ ঘটনা, এরকম স্টেরিওটাইপ চিন্তায় ভর করেই এগিয়ে চলেছিলাম আমি। সিএনজি অটোরিকশাটাও দেখেছিলাম, বুঝেছিলাম আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভিড় ঠেলে ফুটপাত ঘরে এগিয়ে যাওয়ার সময় ফুটপাত কালো করে রাখা পুডিংয়ের মতো রক্ত দেখি, পাশে পড়েছিল চশমা। জমে থাকা রক্তের পরিমান মারামারির তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি মনে হলেও ‘একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে কারা যেন মেরেছে’ এই ভাবনা আমাকে বেশি কিছু ভাবতে দেয়নি, অভিজিৎ রায়ের কথা তো নয়ই। বাসায় ফিরে টিভিতে নিউজ ক্রলে দেখলাম আমি কার রক্তের উপর দিয়ে এসেছি। বন্ধুও বাসায় ফিরেই যা জানার জেনেছিল। আমাকে ফোন করে ও শুধু বলল, “সব শেষ হয়ে গেল রে ধ্রুব…”
Avijit 27 Feb 2015 2
Avijit 27 Feb 2015 3
পুরো লেখাটি পড়ে দেখলাম আমি নিজের কথাই লিখে গিয়েছি শুধু, এখানে অভিজিৎ রায়কে নিয়ে তেমন কোনো কথাই আমি লিখতে পারিনি। কারণ অভিজিৎ রায় সম্পর্কে আমি তো কিছুই জানি না। আমার কাছে অভিজিৎ রায় মানে মুক্তমনা ব্লগ। আমার কাছে অভিজিৎ রায় মানে ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ থেকে শুরু করে ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ পর্যন্ত কয়েকটি বই শুধু। অভিজিৎ রায়ের হাতের স্পর্শও এসব বইয়ে নেই।
অভিজিৎ রায়ের ডান হাতটি ধরে দেখতে কেমন লাগে তা আমার জানা নেই। কারণ আমি তার কফিন ছুঁয়ে দেখেছি শুধু। তাকে আমার ছুঁয়ে দেখা হয়নি।
মাল্টিভার্স সত্য হোক। দূরে বহুদূরে মৌলবাদহীন অন্য এক পৃথিবীতে বন্যা আহমেদকে নিয়ে আপনি অনেক অনেক ভাল থাকুন, অভিজিৎ রায়। আমরা আঁধারের যাত্রী, আমাদেরকে পথ পাড়ি দিতে হবে আরও হাজার বছর।

Saturday, March 5, 2016

গুগোল ব্লগস্পট’এ ফ্রি ব্লগ খোলা ও বেসিক কাস্টমাইজেশন

Google Blogger







ব্লগস্পট হচ্ছে গুগোলের নিজস্ব একটি ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম যার প্রায় পুরোটাই ফ্রিমিয়ামফ্রিমিয়াম মানে হচ্ছে, এখানে টাকা দিয়েও আপনি কোন বার্তি সুবধা পাবেন না যেখানে ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম তাদের ফ্রি ব্লগ সাইট এর পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে কিছু বার্তি সুবিধা প্রদান করে থাকেযেমন কাষ্টম ডোমেইন, বার্তি স্পেস ইত্যাদিকিন্তু, ব্লগারের পুরোটাই ফ্রিকিছু প্রিমিয়াম সুবিধা থাকলেও সেটা একাউন্ট সম্পর্কিত (যেমন স্পেস), শুধু ব্লগস্পটের সাথে সম্পর্কিত নাএছাড়াগুগোল ব্লগস্পটে কোন প্যামেন্ট ছাড়াই কাষ্টম ডোমেইন এড করা যায় শুধু ইচ্ছা করলেই, আর তাই অনলাইনে আয় করার জন্য ব্লগিং এর ক্ষেত্রে ফ্রি ব্লগ হিসাবে আমার প্রথম পছন্দ এই গুগোল ব্লগস্পট
গুগোল ব্লগস্পটএ একটি ফ্রি ব্লগ খোলার জন্য আলাদা করে কোন একাউন্ট খোলার দরকার নাই, একটি গুগোল একাউন্ট থাকলেই যথেষ্টআমি আশা করব সবার অন্তত একটি গুগোল একাউন্ট (বা জিমেইল একাউন্ট আছে)যদি না থেকে থাকে বা ব্লগিং এর জন্য আপনি অন্য কোন গুগোল একাউন্ট খুলতে চান, তবে নির্দিধায় খুনে নিনতারপর সরাসরি এখানে ক্লিক করুনআপনার একাউন্ট থেকে প্রথমবার ব্লগার এ প্রবেশ করে থাকলে, নিচের মত একটা পেজ আসতে পারে,
Google Blogger Continue Profile Page Screen Snap
১ম বার লগইন করলে এমন পেজ আসতে পারে ( আমি সবুজ মার্ক করা বাটন প্রিফার করি)
এই পেজে ২টা আপশন আছে, দুটোর পার্থক্য বর্ণনা না করে, আমি বলব সোজা সবুজ মার্ক করা বাটনে ক্লিক করেনবিশ্বাস করেন, এতে আপনার সংসার ভাঙবে না ব্যাস, মোটামোটি এখন আপনি ব্লগস্পট ব্লগ খোলার জন্য রেডী
নোটঃ কেউ কেউ কনফিউশনে ভূগতে পারেন যে, একবার ব্লগার বলচ্ছি আর আরেকবার ব্লগস্পট বলচ্ছি, আসলে সঠিক কোনটা বা ভুল কোনটাএখানে ব্যাপারটা হচ্ছে গুগোলের ব্লগিং প্ল্যাটফর্মের এডমিন এড্রেস বা লগইন এড্রেস হচ্ছে blogger.com এবং আপনার ফ্রি ব্লগের এড্রেস হবে  LabibTestBlog.blogspot.com আর তাই দুটো নামই ব্যাবহার করেন ব্যাবহারকারীরা,
আপনার সব যদি ঠিক থেকে থাকে, তাহলে নিচের মত একটা পেজ আসার কথাআর ব্রাউজারের এড্রেসবারে এড্রেস হওয়ার কথা blogger.com/home আর ভুলক্রমে এই একাউন্ট দিয়ে পূর্বে কোন ব্লগ খোলা হয়ে থাকলে তার সেগুলোর তালিকা আসবে
Google Blogspot Home
Google Blogspot Default Home
বাটন গুলা অলরেডি দেখা যাচ্ছে, আর কি বলার আছে? যাষ্ট নিউ বাটনে ক্লি করতে হবেক্লিক করলে নিচের মত একটি পপ-আপ বক্স আসবে
Blogspot Create Blog Page
Blogspot Create Blog Page/Popup
কমলা রঙ এর ঘর দুটোয় ব্লগের টাইটেল, পরের ঘরে ব্লগের ঠিকানা আর তার পরের নীল ঘর হচ্ছে টেমপ্লেট সিলেক্ট আর সবশেষ সবুজ বক্স দেখানো Create Blog! বাটনে চাপ দিলেই ব্লগ তৈরী হয়ে গেল labibtestblog.blogspot.com! এখন ব্লগ টাইটেল লিষ্টে দেখা যাচ্ছে,
Blogspot Blog List
Blogspot Blog List
এখানে,
  1. [১] New Blog বাটন তখনো বর্তমানআপনি চাইলে আরো ফ্রি ব্লগ তৈরী করতে পারবেন এখন বা পরে যে কোন সময়একটি গুগোল একাউন্ট দিয়ে প্রায় ১০০ টি ফ্রি ব্লগ তৈরী করা যায়!
  2. [২] টাইটেলে ক্লিক করলে, শুধু এই ব্লগটার সেটিং প্যানেল বা এডমিন প্যানেল ওপেন হবে
  3. [৩] সেটিং প্যানেলে ঢুকলে নিউ পোষ্ট বাটন পাওয়া যায়, তবে সরাসরি এই বাটনে চাপ দিয়েও নতুন পোষ্ট লেখা যায়
  4. [৪] ব্লগ সাইট টি ওপেন হবে
আমরা সরাসরি টাইটেল [২] এ ক্লিক করে, মাত্র তৈরীকৃত ব্লগটির কন্ট্রোল প্যানেল বা এডমিন প্যানেল বা সেটিং প্যানেলে যাবযেটা দেখতে নিচের ইমেজ এর হুবহু
Blogger Blog Setting Panel
Blogger Blog Setting Panel
উপরের ছবিটিতে, বাম পাশের নীল বক্সে মেনু আইটেম, মাঝে কমলা বক্সে হিট বা পেজভিউ সংক্ষ্যা আর ডানে বেগুনী বক্সে এই ব্লগটির স্ট্যাটিক্স দেখাচ্ছে আমি শুধু বামের মেনু গুলোর মধ্যে যেগুলো অবশ্যই দরকারী, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করব
  • Overview: বর্তমানে যেই পেজে আছি, সেটাই ওভারভিউ, তাই ওটা কমলা হয়ে আছে
  • Posts: এই মানুতে আগের সকল পোষ্ট (আর্টিকেল) গুলো লিষ্ট আকারে দেখাবে, ইচ্ছামত এডিট, ড্রাফট (আনপাবলিশ) করা, মার্ক করে অনেক গুলো পোষ্ট একই সাথে পাবলিশ করা বা ডিলিট, ইত্যাদি করা যায় এই মেনু থেকে আর, নতুন পোষ্ট লেখার অপশন টা আমরা একটু পরে দেখব, এখন মেনু আইটেম গুলা বুইঝা লই, না কি?
  • Pages: ব্লগের পেজ গুলো দেখাবেনতুন পেজ তৈরী করা যাবে ইত্যাদি
  • Comments: আপনার ভিজিটরদের রেখে যাওয়া ভাল/মন্দ কমেন্ট এখান থেকে মডারেট (ডিলিট/পাবলিশ/ব্লক) করা যাবে
  • Google+: আপনার ব্লগের পোষ্ট গুলো গুগোলের সোসাল নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম গুগোল প্লাস এ অটো শেয়ার হবে কিনা বা গুগোল প্লাসের সাথে আদৌ কোন যোগাযোগ থাকবে কিনা ইত্যাদি অপশন থাকেআমি অটো শেয়ার অন রাখাই সাজেষ্ট করবএতে পোষ্ট পাবলিশ করার সাথে সাথে লেখাটি আপনার গুগোল প্লাস একাউন্ট থেকে অটো শেয়ার হয়ে যাবে
  • Stats: আপনার ব্লগে কতজন ভিজিটর আসতেছে, কোথা থেকে আসতেছে, কোন দেশ, কখন, কোন পেজে আসল, কোণ ওয়েবসাইট থেকে আপনার ব্লগের খোঁজ পেল, কবে কট ভিজিট হয়েছিল ইত্যাদি দেখাবে এই অংশে
  • Earnings: এটা মূলত এডসেন্স থাকলে ব্লগের কোথায় কোথায় এডসেন্স বিজ্ঞাপন দেখাবে, এসব সেটাপ করা যায়
  • Campaigns: গুগোলকে টাকা দিয়ে আপনার সাইট প্রোমোট করার অপশনএই আপশন টা আপনার না গুতাইলেও চলবেকারণ, আপনি  টাকা নিতে আসছেন, দিতে আসেন নাই 😉
  • Layout: এটা অত্যান্ত দরকারীসাইটের কোথায় কি থাকবে তা এখান থেকেই নির্ধারণ করতে হবে 😉সো, এটা নিয়ে আমরা আরো বিস্তারিত আলোচনা করব
  • Template: সাইট টা দেখতে কেমন হবে, ইত্যাদি দেখা থার্ড পার্টি (৩য় পক্ষের তৈরী) ট্যাম্পলেট ব্যাবহার করতে গেলে এটা লাগবে বা, আপনি যদি আরো বেশি শিখতে চান, বা টেম্পলেট এর  ভেতরে কিছু চেঞ্জ করতে চান, তবে লাগবে এই মেনু টাআর ঠিক এই মুহূর্তে পশন টা অদরকারী, তাই স্কিপ করে যাচ্ছি
  • Settings: সেটিং দিয়া ভাত খায়, চা খায়! আর কিছু কওয়া লাগব?
বয়ানঃ আমি আশা করব, যারা শিখচ্ছেন, তারা সবাই প্রতিটা অপশনে ঢুকে ঢুকে ইচ্ছামত টেষ্ট করবেন, কোথায় কি আছেপ্রায় প্রতিটা মেনু/অপশনের ভেতরেই একাধিক সাবমেনু/সাব অপশন আছেকয়েকদিন ঘাটাঘাটি করলে নতুন নতুন অনেক বিষয়, ট্রিক্স সামনে চলে আসবে, আস্তে আস্তে প্যানেল টা পানি ভাতের মত সহজ হয়ে যাবেআর উলটাপালটা হয়ে গেলেও সমস্যা নাই শিখতে গেলে উল্টাপালটা করা টা অনেক অনেক বেশি জরুরী

পোষ্ট লেখা/New Post

প্রথমে নিচের ইমেজ টা দেখেন, নতুন পোষ্ট/আর্টিকেল লিখতে গেলে এই পেজ টা আসবে প্রতিবার,
Blogspot Post Writing
Blogspot Post Writing
ছবিটা দেখেই সব বুঝে যাওয়ার কথা, তবু বুঝতে সুবিধা হওয়ার স্বার্থে দাগ টেনে দিয়েছিতবে Labels Permalink নিয়ে কিছু বলার আছে লেবেল হচ্ছে মূলত ক্যাটাগরী বা মেনু আইটেমআপনার লেখাটি যেসব মেনু আইটেম এর অন্তর্গত, সেইসব আইটেম লেবেল হিসাবে দিবেন, লেবেল এর বানান ও বড়/ছোট অক্ষর খুব সাবধানে করতে হবেযেটা দিবেন সেটাই ফিক্সডপরে চেঞ্জ করা যায় কিন্তু প্যারা আছে!
আর পার্মালিঙ্ক হছে পোষ্ট এর URL অংশটুকুএই অংশটুকু এসইও (SEO) বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন এর জন্য দরকারী এবং পরে চেঞ্জ করলে সাইটে 404 ইরর দেখাবেতাই ভালভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেমনঃ LabibTestBlog.blogspot.com/2015/03/I-am-Very-Tired-Right-Now.html এখানে, সবুজ টুকু তো ব্লগ লিঙ্ক, পরে সাল তারিখ ইত্যাদি, নীল অংশ টুকু পার্মালিঙ্ক আর গোলাপী টা এক্সটেনশন

লেয়াউট/Layout

প্রথমে লেয়াউট মেনুটার একটা স্নেপ দেখাইতাহলেই সব বুঝে যাবেন, তবে Newbie দের জন্য ২/৩ টা কথা না বললেই না, তাই ইমেজ দিতে হচ্ছে

Blogspot Layout Settings
Blogspot Layout Settings
যারা শেখার জন্য পড়চ্ছেন, তাদেরকে বলব এই অংশটা নিজে নিজে চেষ্টা করার জন্যদেখাই বোঝা যাচ্ছে, সাইটের কোন জাগায় কি কি থাকবে, এগুলো লেয়াউট সেটিং এ মাইস দিয়ে ক্লিক করে এখান থেকে ওখানে নিয়ে দাওয়া যায় এবং সেই অনুযায়ী সাইটে দেখায়আপনাকে যা করতে হবে, নিজের পছন্দ মত Gadget এড করতে হবে, যেখানে যেখানে অপশন আছেতবে, দুটি স্থান আমি মার্ক করে দিয়েছি১টা হলো Navbar আর আরেকটা হলো Add a Gadget আর অনেক যাগায় Add a Gadget লেখা থাকলেও শুধু এক জাগায় ই মার্ক করেছি
Navbar: প্রথমে Edit এ ক্লিক করুন, সেখান থেকে ‘off’ সিলেক্ট করে সেভ করুনব্যাস! আপনার সাইটে ন্যাভিগেশন বার (bar) আর দেখাবে নান্যাভিগেশন বার (bar) হচ্ছে, গুগোলের ব্লগ সার্চ করার বা এক ব্লগ থেকে রেন্ডম আরেকটা ব্লগে যাওয়ার বার (bar)আমার কাছে, এই বার (bar) টা বন্ধ থাকলেই ভাল লাগে। (অনেকটা শুক্র বার এর মত 😛হা হা হা)
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু সাইটের মেনু বানাব কিভাবে?এইতো লাইনে আসছেনআগেই বলছি, আপনার পোষ্টের Labels গুলো  হচ্ছে আপনার মেনুযাষ্ট মার্ক করা Add a Gadget এ ক্লিক করুন এবং লিষ্ট থেকে Labels সিলেক্ট করুনব্যাস, আপনার সাইটে মেনু এড হয়ে গেল
আপনার ব্লগস্পট ব্লগ এখন মোটামোটি কমপ্লিট
ব্লগস্পটে একটা ব্লগ বানানো আসলে এতটাই সোজা৫/৭ মিনিট সময় লাগে কিন্তু আজকে আমার প্রায় ৫/৭ ঘন্টা লাগলো! কারণ, বানানো, স্নেপ নেয়া, এডিট করা, আপলোড করা তারপর লেখা! যাই হোক, লেখাগুলো যদি কারো কাজে আসে, তবেই এই পরিশ্রম স্বার্থককোন প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞাসা করতে ভুলবেন না, আমার ভুল হয়ে থাকলে ধরিয়ে দিতেও ভুলবেন না
অফটপিকঃ লেখার সময় ভাবী চা দিয়ে গেছিল! কখন দিছে টের ই পাই নাই   ঠান্ডা হয়ে গ্যাছে :/