Thursday, August 31, 2017

নির্যাতিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মিথ

সেই ছোটবেলা থেকেই মসজিদে কিংবা ওয়াজ মাহফিলে শুনে এসেছি, মুসলমানরা নাকি সারা পৃথিবীতে খুবই নির্যাতিত। শুনে খুব খারাপ লাগে, আহারে বেচারা মুসলমানরা। সবাই মিলে মিশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কত শত্রুতাই না করছে। কত ষড়যন্ত্রই না করছে। ছোটবেলা ওয়াজ মাহফিলে হুজুরেরা ওয়াজ করতো, কেঁদে কেটে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাত, হে আল্লাহ, মুসলমানদের তুমি এই সব জালিমের হাত থেকে রক্ষা করো। শুনে শুধু যে কষ্ট পেতাম তাই নয়, ভেতরে জিহাদের জোশ জেগে উঠতো। কারা এই সব জালিম, যারা মুসলমানদের শত শত বছর ধরে নির্যাতন করে যাচ্ছে? একবার সামনে পেলে একদম দেখিয়ে দিতাম! কিন্তু তাদের দেখতে পেতাম না। চারপাশে সব দিকেই মুসলমান দেখতাম। কারণ বাঙলাদেশ তো মুসলমানদেরই দেশ। এই দেশে কারা ঠিক মুসলমানদের অত্যাচার করছে ঠিক বুঝতাম না। হিন্দুরা? বৌদ্ধরা? নাকি খ্রিস্টান বা ইহুদীরা? নাকি ভুত?
ছোটবেলা শুনতাম ইউরোপে নাকি মুসলমানদের ওপর অনেক অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়। তারপরেও নাকি ইউরোপে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার অমুসলিম ইসলামের ছায়াতলে চলে আসার খবর পেতাম, আমাদের এলাকার হুজুর, মসজিদের বড় ভাইয়েরা সেগুলো বেশ গর্ব করেই বলতো। কিন্তু সেখানে মুসলমানদের ওপর সীমাহীন নির্যাতনের খবর পেতাম। আমেরিকা আর ইসরাইলে নাকি রাস্তায় মুসলমানদের ধরে ধরে হত্যা করা হতো। কথাগুলো এলাকার যেই বড় ভাই বলতো, ডিভি লটারি সে কিন্তু প্রতিবছরই পূরণ করতো। একবারও মিস হয় নি। শেষমেশ অন্য আরেকজনার ডিভি লটারি টাকা দিয়ে কিনে সে আমেরিকা চলে গেল। এখন শুনেছি বউ বাচ্চা নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতেই আছে। কিন্তু মুসলমানদের ওপর যেখানে এত অত্যাচার হয়, সেই দেশে সে কেন গেল আজও বুঝলাম না। তার তো সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। যেখানে মুসলমানরা সুখে শান্তিতে বসবাস করে। সে যাইহোক। সেইসব কথা তুললে এখন তিনি ক্ষিপ্ত হন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি, গত একশ বছরে অমুসলিমদের হাতে যত মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে, তার তিনগুন মুসলিমরাই মুসলিমদের হত্যা করেছে। শিয়া সুন্নী কোন্দল, ইরাকে গ্যাস দিয়ে হত্যা, তালেবানদের দ্বারা হত্যা, পাকিস্তানীদের দ্বারা বাঙালি নিধন, দরফুরসহ গোটা আফ্রিকায় অসংখ্য মুসলিমকে মুসলিমরাই হত্যা করেছে। অথচ নিজেদের দোষ তাদের চোখে পরে না, তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বামপন্থীদের সাথে গলা মিলিয়ে পাশ্চাত্যকে গালাগালি করেই নিজেদের কর্তব্য শেষ করে।
নিজেদের ব্যার্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করে আত্মতুষ্টির এই মনস্তত্ব বেশ জটিল। একটা সময় ইউরোপের অনেকটা মুসলিমদের দখলে ছিল, যেই স্মৃতি রোমন্থন করে আজও তারা সুখ পায়। এবং তারা মনে করে ইউরোপ আসলে তাদেরই, চক্রান্ত করে তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তাই আজও তারা খেলাফতের স্বপ্নদোষে বিভোর হয়, অথচ শিক্ষা বিস্তারে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
আফ্রিকার অধিকাংশ মুসলিম প্রধান দেশে শিক্ষার হার ২৫% এর কম। আরবের ধনী দেশ গুলোর শিক্ষা প্রযুক্তি বিজ্ঞানে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। পাকিস্তান আফগানিস্তানে মাদ্রাসাগুলো গনিত ও বিজ্ঞানের চাইতে আত্মঘাতি বোমা হামলার প্রশিক্ষণ দিতে বেশি আগ্রহী। তারা মনে করে, ইসলামের খেলাফত আমলের মত এখনও তারা নাঙ্গা তলোয়ার হাতে নিয়ে ছুটে ছুটে কল্লা কেটে দেশ দখল করে চানতারা মার্কা পতাকা উড়াবে। কিন্তু আহাম্মকগুলো বোঝে না, সেই দিন আর নাই। ইউরোপ এগিয়ে গেছে জ্ঞান বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে, এবং এটা ছাড়া কোন সম্প্রদায়ই মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না। আর আল্লা যে আকাশ থেকে কিছু কেরামতি করে মুসলিমদের জাতে তুলে দেবে, সেই আশাতে থাকলে মার খেয়ে কেঁদেই যেতে হবে। আর অন্যকে দোষ দিয়ে নিজের দোষ শাক দিয়ে ঢাকতে হবে।
ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের গল্প শুনে। বড় হওয়ার পরে তাই এই পর্যন্ত দেশে দেশে মুসলমানদের ওপর কী পরিমাণ নির্যাতন হয়েছে তা যাচাই করতে বসে গেলাম। অদ্ভুত তথ্য পেলাম। কয়েকটা উদাহরণ দেই।
যেমন ধরুন, ১৯৭১ সালে বাঙলাদেশে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়ে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে। যার অধিকাংশই ছিল মুসলমান। যারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল তারাও মুসলমানই। আবার ধরুন, মাওলানা মওদুদীর নির্দেশে এবং উস্কানিতে পাকিস্তানে প্রায় ১০ লক্ষ আহমদিয়াকে হত্যা করা হয়। তারা মুসলমানই ছিল। এবারে আরও কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক। পরিসংখ্যানগুলো গণহত্যার অল্পবিস্তর পরিসংখ্যান।
  1. সাদ্দাম হোসেন- ৬ লক্ষ (১৯৭০-২০০৩ )
  2. সুহার্ত- ৫ লক্ষ ( ১৯৬৫-৬৬, ১৯৬৯-বর্তমান)
  3. মোল্লা ওমর/ তালিবান- ৪ লক্ষ (১৯৮৬ – ২০০১)
  4. হাসান তারাবি – ১ লক্ষ (১৯৮৯ – ১৯৯৯)
  5. ইরাক ইরান যুদ্ধ – ১০ লক্ষ (১৯৮০-১৯৮৮)
  6. কুয়েত যুদ্ধ – ১.৪০ লক্ষ (১৯৯০-১৯৯১)
  7. আলজেরিয়া – ৭ লক্ষ ( ১৯৫৪-১৯৬২)
  8. আলজেরিয়া – ২ লক্ষ (১৯৯১ – বর্তমান)
  9. সোমালিয়া – ৪ লক্ষ (১৯৯১- বর্তমান)
  10. নাইজেরিয়া – ১১ লক্ষ (১৯৯৩ – বর্তমান)
  11. লেবানন – ১.৫ লক্ষ ( ১৯৭৫ – বর্তমান)
  12. ইথোওপিয়া – ১৫ লক্ষ ( ১৯৭৫ -১৯৭৯)
  13. সিয়েরালিয়ন – ২ লক্ষ (১৯৯১ – বর্তমান)
  14. আই এস – বাশার – ২.২ লক্ষ ( ২০১১ – চলছে)
এগুলো ছাড়া পাকিস্তানে রোজ বাচ্চাদের স্কুলে বোমা হামলা, এবং মুসলমানদের হাতে খ্রিস্টান ইহুদী বৌদ্ধ হিন্দুদের মৃত্যুর আরেকটি বড় পরিসংখ্যান দেয়া যেতে পারে। সেগুলো না হয় বাদই দিচ্ছি। উপরের সবগুলো যুদ্ধেই কোন না কোন ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, চীন ইত্যাদি দেশগুলো জড়িত ছিল। ঠিক যেমনটা ছিল বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও। কিন্তু বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ইসলামপন্থীরা ভারত রাশিয়ার চক্রান্ত বলে চালাবার যত চেষ্টাই করুক না কেন, পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান দুই ভাইয়ের মধ্যে গণ্ডগোল লাগিয়ে দেয়ার কথা যতই বলুক না কেন, সত্যি হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানের অপশাসনে অতিষ্ট হয়েই বাঙলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। আর হত্যার পেছনে দায়ী ছিল পাকিস্তানের ইসলামপন্থী সামরিক শাসকই।
সব সময় বলতে শুনি, সবই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারত ইসরাইল ইত্যাদির চক্রান্ত। কিন্তু অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের অস্ত্র বিক্রি করবে সব জায়গায়, সেটাই স্বাভাবিক। তারা দুই পক্ষের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করবে। কিন্তু যদি বলা হয়, দুই পাকিস্তান একসাথে সুখে শান্তিতে ছিল, ভারত মাঝখান দিয়ে ঢুকে চক্রান্ত করে দুই ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়েছে, তা হবে ডাহা মিথ্যা কথা। যখন এই পশ্চিমা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করা হয়, তখন সব চাইতে বড় সত্য, পশ্চিম পাকিস্তানের গণহত্যা এবং তাদের অত্যাচারকে কৌশলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাই করা হয়। যারা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করে, তারা আসলে অসৎ উদ্দেশ্যেই করে।
এসব নিহতদের প্রায় সকলেই মুসলমান। এছাড়া কোটি কোটি মুসলমান আহত হয়েছে, গৃহহীন উদ্বাস্তু হয়েছে, নারী এবং শিশুরা হয়েছে ধর্ষিত, লাঞ্ছিত। তাদের আর কোন ভবিষ্যৎ নেই, কোন আশা নেই। অনেকেই ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন, সুন্দর জীবনের আশায়। এই সকল হত্যাকান্ড,অপকর্ম কিন্তু মুসলমান মুসলমানদের সাথে করেছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের পর থেকে প্রায় দেড়কোটি মুসলমানদের হত্যা করা হয়, যার প্রায় ৮৫ ভাগই করেছে কোন না কোন মুসলিম শাসক, বা অন্য মুসলমানরা। শিয়ারা সুন্নিদের মেরেছে, সুন্নিরা শিয়াদের মেরেছে। আবার দুই পক্ষ মিলে মিশে আহমদিয়াদের মেরেছে। এ ওকে মেরেছে সে তাকে মেরেছে। এভাবেই চলে যাচ্ছে। বাঙলাদেশের মত দেশে প্রতি মাসেই হিন্দু বৌদ্ধ আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের কথা না হয় বাদই দিলাম, পাকিস্তানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার কথাও না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু মুসলমানদেরই আসলে কারা হত্যা করছে? কারা নির্যাতন করছে? মামদো ভুত?
এবারে ধরুন, গত এক’শ বছরে ইসলামের সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি কে বা কারা? একটি লিস্ট করি।
  • সাইয়েদ কুতুব – আধুনিক ইসলামী সন্ত্রাসবাদের জনক। মুসলিম ব্রাদারহুড এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মিশরের ইসলামী আন্দোলনের প্রধান সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন দলের মুখপত্র ইখওয়ানুল মুসলিমিন’এর সম্পাদক ছিলেন। তাকে তৎকালীন সরকার ফাঁসির আদেশ দেয় এবং এভাবেই তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

  • হাসান আল বান্না – ১৯৩০-এর শুরুতে হিটলার যখন জার্মানির ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন হাসান আল বান্নার সাথে নাৎসীদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি হিটলারকে ওয়াদা করেন এই বলে যে, জেনারেল রোমেলের প্যাঞ্জার ডিভিশন যখন কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করবে, তখন ব্রিটিশ বাহিনী যাতে সম্পূর্ণ নির্মূল হয় তা মুসলিম ব্রাদারহুড নিশ্চিত করবে। তিনি হিটলারের মাইন কাম্ফ অনুবাদ করে আমার জিহাদ নামে সমগ্র মিশরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

  • মাওলানা মওদুদী – জামাতে ইসেলামীর প্রতিষ্ঠাতা এবং আধুনিক ইসলামী সন্ত্রাসবাদের আরেকজন জনক। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ – ২২ সেপ্টেম্বের ১৯৭৯), যিনি মাওলানা মওদুদী, বা শাইখ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন মুসলিম গবেষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিংশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি ছিলেন ২০ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম স্কলারদের মধ্যে একজন। তিনি ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ব্যক্তি যাহার গায়েবানা জানাজার নামাজ কাবাতে পড়া হয়।


  • গোলাম আজম – জামাত ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক আমীর







উপরে যাদের ছবি এবং নাম দিলাম, তারা আধুনিক ইসলামের সবচাইতে প্রখ্যাত আলেম, প্রখ্যাত ব্যাখ্যাকারী, প্রখ্যাত স্কলার। এরা প্রায় প্রতিটি লোকই সাজাপ্রাপ্ত আসামী, এমনকি, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত খুনী। এদের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মুসলিম নির্যাতিত হয়েছে। প্রায়শই বলা হয়, ইসলামের পক্ষের লোকদের নাকি সবাই খালি নির্যাতন করে। আচ্ছা, এদের বিচার করে কী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে? নাকি এরা নির্যাতন করেছে লক্ষ কোটি মুসলিমকে? তাহলে ইসলামের শত্রু কে? কারা আসলে মুসলিমদের নির্যাতনের জন্য দায়ী?
ইহুদীরা? হিন্দুরা? খ্রিস্টানরা? ইউরোপ আমেরিকা? ইসরাইল?
নাকি খোদ আল্লাহ?

শিয়া; তাদের উৎপত্তি, দল-উপদল, আকীদা-বিশ্বাস, রেফারেন্স-গ্রন্থ ও লিংকসমূহ

by

 

#শিয়া; তাদের উৎপত্তি, দল-উপদল, আকীদা-বিশ্বাস, রেফারেন্স-গ্রন্থ ও লিংকসমূহ, স্বভাব প্রকৃতি, হাকীকত উন্মোচন, কিছু টীকা ও সতর্কবাণী, কয়েকটি সংশয় নিরসন এবং শেষে তাদের প্রতি বিনীত আহ্বান… সহ অনেক কিছু :
(#এক.)
আরবি শিয়া শব্দের অর্থই হলো গোষ্ঠী।
শিয়ারাই হলো আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণে মুসলিমদের মূল জামা’আত থেকে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রথম গোষ্ঠী, যারা পরবর্তীতে নিজেদের মনগড়া ভ্রান্ত আকিদা গড়ে নিয়েছে। শিয়া মতবাদ উদ্ভাবনকারী মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা একজন ইহুদীর সন্তান। মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতেই সে ইসলাম গ্রহহণের অভিনয় করেছিল।
শিয়াদের মধ্যেও ভাগ আছে। ইমামিয়্যাহ, ইসনে আশারিয়্যাহ, ইসমাইলি, নুসাইরিয়্যাহ প্রভৃতি। এদেরকেই ‘রাফেজি’ও বলা হয়।
শুধুমাত্র যায়িদিয়া সম্প্রদায় ছাড়া বাকি শাখাগুলোর আকিদা কুফরে পরিপূর্ণ।
(#দুই.)
প্রায় পুরো দুনিয়ার উলামায়ে ইসলামের ঐক্যবদ্ধ ফায়সালা ও ফতোয়া হল- শিয়াদের ৯০ পার্সেন্টই কাফের, বিশেষ করে বর্তমান ইরানের যারা আছে, এবং যারা ইসনা আশারিয়্যা, নুসাইরিয়া… মতবাদের অনুসারী।
তাই তাদের বাহ্যিক উন্নতিতে মুসলমানদের খুশি হওয়ার কোন কারণ নেই। তারা সুযোগ পেলে ইহুদী – খৃষ্টানদের আগে সুন্নীদেরকে খতম করবে! সর্ব যুগের ইতিহাস এমনই।
আর তলে তলে ইহুদীদের সাথে ও আমেরিকার সাথে যে শিয়াদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সবসময়ই থাকে, সেটা তো এখন আশা করি তাদের কাছে মোটেও অস্পষ্ট নয়, বিশেষ করে যারা বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনার সাথে একটু বিস্তারিত খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করেন।
কেবলই ইহুদী নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার উপর ভরসা করেন না।
——————————
(তিন.)
#তাদের_ভয়াবহ_কিছু_আকীদা :
1. কুরআন বিকৃত এবং এর ১ চতুর্থাংশ ফেলে দেয়া হয়েছে!
2. ৩/৪ জন সাহাবা ছাড়া তিন খুলাফায়ে রাশেদ সহ সকল সাহাবী (নাঊযুবিল্লাহ) কাফের, মুরতাদ, গাদ্দার!
তাদের নাপাক যবান থেকে ৪/৫ জন সাহাবী বাদে প্রথম ৩ খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে কেউই রক্ষা পায় নি!
3. মুতআ’ (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি ভিত্তিক বিয়ে। তারা এক রাতের জন্য পতিতাদের বিয়ে করাও হালাল মনে করে!)
4. তাকিয়্যা (একজন মনেপ্রাণে যা বিশ্বাস
করে, তার ঠিক বিপরীত বলা বা করার ভান
করা) বৈধ। (তারা মুখে মুসলিম ভ্রাতৃত্তের কথা বলে, কিন্তু সুযোগ পেলেই মুসলিমদের হত্যা করে
(মিথ্যা বলা খুবই ভাল এবং সাওয়াবের
কাজ। নিজের বিশ্বাসকে গোপন রাখা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ!! প্রতারণা এবং প্রবঞ্চনা একটি মহৎ কাজ।)
মুতআ’ ও তাকিয়্যা মত নিকৃষ্ট আকীদা সম্ভবত দুনিয়ার আর কোন জাতি গোষ্ঠীর মাঝে নেই। এর মাধ্যমে তারা মিথ্যা এবং বেশ্যাবৃত্তি ও অবাধ যৌনাচারের বৈধতার সার্টিফিকেটই কেবল দেয় না, মহা সওয়াবের গ্যারান্টি দিয়ে উৎসাহও দিয়ে থাকে।
5. রাজআত ()
6. ইমামত (তাদের দৃষ্টিতে তাদের ইমামগণ নবীদের সমতুল্য, বরং তার চেয়ে বেশি )
7. বাদা’ (আল্লাহ তায়ালারও মাঝে মাঝে ভুল হয়ে থাকে, নাঊযু বিল্লাহ )
8. শিয়াদের কালিমা মুসলিমদের শাহাদাহ
থেকে ভিন্ন। তাদের কালিমা হলো – লা
ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহি
‘আলিউন ওয়ালিউল্লাহি ওয়াসিয়্যু
রাসুলুল্লাহি ওয়া খালিফাতুহু বিলা
ফাসলিন।
শিয়ারা তাদের আযানে “আশহাদু আন্না
‘আলিউন ওয়ালিউল্লাহ” ও “হুজ্জাতুল্লাহ”
এবং “হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল” যুক্ত
করেছে।
সহ আরো বিকৃত ও জঘন্য সব কুফরী আকীদা।
“““““““““““`
(#চার.)
তাদের কারো সাথে কথা বলে তো লাভ নাই, কারণ সেই তাকিয়্যা!
যারা বলে, এগুলো শিয়াদের বিশ্বাস নয়, হয় তারা তাকিয়্যা করে, না হয় তারা তাদের ধর্ম সম্পর্কে জানেই না। যেমন অনেক নামকেওয়াস্তে মুসলমানের ইসলাম সম্পর্কে সামান্যই জানা থাকে।
তাই তাদের কথা নয়, তাদের বড়দের কিতাবসমূহের রেফারেন্স ধর্তব্য হবে:
#তাই এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তাদের বড়দের কিতাবসমূহ থেকেই রেফারেন্স জানতে দেখুন-
#শিয়া_মতবাদ_বিষয়ে_কয়েকটি_গ্রন্থ :
১.ইরানী ইনকিলাব ইমাম খোমেনী ও শিয়া মতবাদ, আল্লামা মনযুর নোমানী, মদীনা পাবলিকেশন্স, বাংলাবাজার, ঢাকা।
২. علماء دين كا فيصله-حبيب الرحمن قاسمي
৩. اختلاف امت اور صراط مستقيم- حضرت یوسف لدھیانوی شہید رح
https://goo.gl/sPrsgi
৪. شیعہ سنی اختلاف اور صراط مستقيم – حضرت یوسف لدھیانوی شہید رح
https://goo.gl/sY4iB4
৫. ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, মাওলানা হেমায়েতুদ্দীন, মাকতাবাতুল আবরার, ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার ঢাকা।
৬. تحفہ اثنا عشريہ – شاہ عبد العزیز رح
https://goo.gl/AlSBqu
৭. مجمل عقائد الشيعة
http://files.pdf-ebooks.download/elebda3.net-wq-5075.pdf
৮. ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মুআবিয়া রাযি. – মাওলানা তাকী উসমানী, ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা।
https://goo.gl/Y8Q6fu
” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ” ”
(#পাঁচ.)
নিম্নে উল্লিখিত লিংকসমূহেও শিয়াদের মুখোশ উন্মোচন সহ কিছু কিছু বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাবেন-
#বেশকিছু_গুরুত্বপূর্ণ_লিংক:
1.
শিয়ারা কি মুসলিম??!
উ: না.! সপক্ষে প্রমাণ ও যুক্তি ->
ধারাবাহিক পর্ব – ১
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=359739011090061&id=300199090377387
1.
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1794229740866205&id=1629238320698682
2.
#শীআকথনatikullahatik
3.
https://m.facebook.com/groups/1566266773700865?view=permalink&id=1722383078089233
4.
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=867589866703419&id=196608060468273
5.
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1837093659843502&id=100006286573206
https://en.wikipedia.org/wiki/Iran%E2%80%93Israel_relations
6.
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1642192836070787&substory_index=0&id=1631946583762079
7. তাদের জনক:
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1365933586768430&id=100000554058678
8.
http://islamhouse.com/bn/books/735785/
http://islamhouse.com/bn/books/434032/
http://islamhouse.com/bn/books/430747/
http://islamhouse.com/bn/books/409011/
http://islamhouse.com/bn/books/395670/
http://islamhouse.com/bn/books/393768/
http://islamhouse.com/bn/books/392816/
http://islamhouse.com/bn/books/386814/
http://islamhouse.com/bn/books/373484/
http://islamhouse.com/bn/books/364836/
http://islamhouse.com/bn/books/370147/
http://islamhouse.com/bn/books/353681/
http://islamhouse.com/bn/books/340530/
http://islamhouse.com/bn/books/324697/
http://islamhouse.com/bn/books/735787/
http://www.mediafire.com/?izd11egtci3ei3j
9. শিয়াদের কুখ্যাত ইতিহাস
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=258037807952869&id=100012399545987
10. শিয়া সম্প্রদায় ও তাদের কুফরি আকিদা:১
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=231244057298911&id=100012399545987
সিয়াদের কুফুরি আক্বিদা-২
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=231247010631949&id=100012399545987
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
#সতর্কবাণী
শিয়াদের বিষয় বড় স্পর্শকাতর !
বহু বিষয়ে প্রচুর বানোয়াট বর্ণনা ছড়ানো হয়েছে। তাই সতর্ক থাকা উচিত। বহু বানোয়াট ও আজগুবি কেচ্ছা কাহিনী শিয়ারা বাজারে ছেড়েছে, শিয়া ধর্মটাকে সাজানোর জন্য। কারণ এছাড়া যে তাদের ‘কাম’ চলবেনা!
তাই ওগুলো পড়ে ধোকা খাওয়ার কোন কারণ দেখছি না।
এখানে সংক্ষেপে বোঝানো সম্ভব নয়, তাই ঠাণ্ডা মাথায় বইগুলো পড়ুন, জবাব পেয়ে যাবেন-
এসবের হাকীকত জানা, ও নিজের ঈমান রক্ষার তাগিদেই বইগুলো পড়তে জোর আহ্বান জানাচ্ছি।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
(সাত.)
#কিছু_টিকা:
১. ৯০ পার্সেন্ট শিয়ারা তো মুসলমানই নয়। তাই এর কারণে মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলা ঠিক নয়।
নিজেদের সাধারণ মুসলমানদেরকে বাতিল আকীদা-বিশ্বাস থেকে রক্ষা করার জন্য এবং সতর্ক করার জন্য কোন বিষয় খোলাসা করলে এটাকে বিভেদ সৃষ্টি বলে না।
২.ইসলাম আর কুফরের মাঝে কি সন্ধি হতে পারে? দুটো তো দুই মেরুর জিনিস! যতক্ষণ না শিয়াগণ সকল কুফরী আকীদা থেকে তাওবা করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কোলে ফিরে আসে।
(#আট.)
১৪০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, যুগে যুগে ইহুদী খৃষ্টান মুশরিক শিয়া সহ সমস্ত কুফরী শক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে বহু অপচেষ্টা চালিয়েছে। তারীখে ইসলামের সবচে’ মযলূম শহীদ খলীফায়ে রাশেদ হযরত উসমান রাযি. এবং হযরত হুসাইন রাযি. এর সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে মু’তাযিলা ও গ্রিক দর্শনের ফিতনা, ক্রুসেড ও ভয়াবহ তাতারী আক্রমণ গণহত্যা সহ এমন বহু ভয়ংকর সব ট্রাজেডি ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত হয়েছে, সাময়িক ভাবে তখন মনে হয়েছিল- দুনিয়ার বুক থেকে ইসলাম এবার নিশ্চহ্ন হয়েই যাবে! কারণ এমন পরিস্থিতিতে সাধারণভাবে টিকে থাকার কথা নয়।
এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ খৃস্টধর্ম, হযরত ঈসা আ. এর প্রকৃত শিক্ষাকে ইহুদী পৌল বিকৃত করতে সমর্থ হয়।
অবশ্য ইহুদী আব্দুল্লাহ বিন সাবা শিয়া গ্রুপ সৃষ্টিই করেছিল ইসলামকে বিকৃত করার জন্য, সে সুর তো শিয়াদের কণ্ঠে বাজতেই থাকবে। যেমন ইহুদী পৌল খৃষ্টধর্মের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
.
কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের এক চুল পরিমাণও ক্ষতি কিংবা এক হরফ বিকৃতি সাধনে কেউই সমর্থ হয়নি।
হবে কিভাবে? এ যে মহান আল্লাহর দৃপ্ত ঘোষণা –
انا نحن نزلنا الذكرى و انا له لحافظون!
‘আমি নিজেই এ কুরআন নাযিল করেছি, আমি নিজেই এর সংরক্ষক !’, সূরা হিজর, আয়াত নম্বর ৯
এটা ইসলামের মু’জিযা এবং সত্যতার প্রমাণও বটে!
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
(#নয়.)
মুতা, তাকিয়্যা, গালিগালাজ এগুলো তো শিয়াদের আইকন। এটা থেকে লোভ সামলানো তাদের জন্য তো বড়ই কঠিন, করবেই!
তাদের নাপাক যবান থেকে ৪/৫ জন সাহাবী বাদে প্রথম ৩ খোলাফায়ে রাশেদীন থেকে শুরু করে কেউই রক্ষা পায় নি।
কুকুর কামড় দিলে আমরা মানুষ তো জবাবে কুকুরকে কামড় দিতে পারি না।
আমরা তাদের জবাবে শুধু হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কয়েকটি হাদীস পেশ করতে পারি, এবং দোয়া করতে পারি-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ((لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ)). قَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ. وَمَعْنَى قَوْلِهِ: ((نَصِيفَهُ)) يَعْنِي نِصْفَ الْمُدِّ.
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ((اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي لاَ تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا بَعْدِي فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّي أَحَبَّهُمْ وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِي أَبْغَضَهُمْ وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذَانِي وَمَنْ آذَانِي فَقَدْ آذَى اللَّهَ وَمَنْ آذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ)).
যার সারমর্ম হলো – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘আমার সাহাবাকে গালি দিওনা, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণও স্বর্ণ দান করে ফেলে, তবু তাদের একজনের এক মুদ পরিমাণ কিংবা এর অর্ধেকেরও কাছে যেতে পারবে না।
আমার সাহাবীদের ব্যাপারে সাবধান! আমার সাহাবীদের ব্যাপারে সাবধান! যে তাদেরকে ভালবাসবে সে তো আমার ভালবাসার তাগিদেই তাদেরকে ভালবাসবে, আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে সে যেন আমার প্রতি বিদ্বেষ এর কারণেই করল। যে তাদেরকে কষ্ট দিবে সে আমাকেই কষ্ট দিল, আর যে আমাকে কষ্ট দিল সে আল্লাহকে কষ্ট দিল, আর যে আল্লাহকে কষ্ট দিল, আশংকা হয় আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন! ‘
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হিফাযত করুন, হিদায়াত দান করুন, আমীন!
_____________________
#শেষ_কথা:
আমি স্পষ্টভাবেই বলছি, শুনুন-
আমরাও এ দন্দ্বের অবসান চাই, এক হতে চাই। তবে একটাই শর্ত-
শিয়াদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং প্রধান নেতা জনাব ইমাম খোমেনী সাহেবকে বলুন, সকল কুফরী আকীদা থেকে নিজেদের বারাআত যাহির করে (সম্পর্কচ্ছেদ ও দায়মুক্তি) জনসম্মুখে এবং মিডিয়ার সামনে ঘোষণা দিতে।
তখনই দেখবেন পুরো বিশ্বের সকল উলামায়ে কেরাম তাদেরকে বুকে টেনে নিতে একটুও দ্বিধা করবে না। আমরা এ জন্য সর্বদা প্রস্তুত। আমাদের সাথে তো শিয়াদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ নেই!
#.
আর আমরা সবাই সবসময় আল্লাহর কাছে এ দোয়া করতে থাকি-
اللهـم أرنا الحق حقا وارزقنا اتباعه و أرنا الباطل باطلا و ارزقنا اجتنابه!
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সত্য দেখান এবং সত্যের অনুসরণের তাওফীক দান করুন, এবং আমাদের সামনে বাতিল স্পষ্ট করে দিন ও এর থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন!”
আমীন!! ইয়া রব্বাল আলামীন!!!

নবী মুহাম্মদের সমস্ত জীবনীই তাহলে নিষিদ্ধ করা হোক

লিখেছেন

ভারতীয় পিকে সিনেমায় দেবদেবীকে মানহানী করা হয়েছে এই মর্মে অভিযোগ করে আদালতে গিয়েছিল কিছু দেবদেবী প্রেমি হিন্দু ধার্মীক। ভারতীয় আদালত অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো যে, তারা সিনেমায় মানহানীকর বা আপত্তিকর কিছু দেখতে পাননি। ভারতীয় আদালত সম্ভবত ধর্মীয় অনুভূতি দ্বারা প্রভাবিত হয় না। বা পাবলিক সেন্টিমেন্ট দ্বারাও প্রভাবিত হয় না। পিকে ইস্যুতে অবশ্য পাবলিক সেন্টিমেন্ট সিনেমাটির পক্ষেই ছিল। প্রমাণ স্বরূপ শেষপর্যন্ত ৬০০ কোটি রুপি ব্যবসা করে ফেলেছে ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিয়ে কমেডি করা এই সিনেমাটি! তার মানে দর্শকদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগেনি সিনেমাটি দেখে। আমাদের ধর্মীয় মৌলবাদী নেতাদের অভিজ্ঞতা বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানী’র পিকের প্রশংসা করাকে বিস্মিত করেছে! ভারতে পিকের মত সিনেমা হিন্দু ধর্মানুভূতিতে কোন রূপ আঘাত লাগার ঘটনা তো ঘটেইনি উল্টো ছবিটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসা সফল ছবির মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশে পিকে’র মত ছবি তৈরি (মুসলিম বিশ্বাস নিয়ে কমেডি) আগামী দুইশো বছরেও সম্ভব হবে না। ইসলাম স্যাটায়ার করার জিনিস না। ইসলাম বাকী দুনিয়াকে নিয়ে স্যাটায়ার করতে পারবে কিন্তু ইসলাম নিয়ে স্যাটায়ার ইসলাম কোনদিন মেনে নিবে না। এসব আমাদের সবারই জানা কথা। আমরা সেভাবেই চলি। আমাদের সিনেমা, নাটক, গল্প, উপন্যাস সব সময় ইসলাম, নবী, সাহাবী ইত্যাদি বিষয়ে ভুলেও “মজা” করার কথা ভাবতেই পারি না। ধর্ম নিয়ে স্যাটায়ার মুসলিম বোধের বাইরে। পুরো বিশ্ব জেনে গেছে ইসলাম নিয়ে স্যাটায়ার মুসলিমদের কতটা ক্ষুব্ধ করে। এর ফল কতটা ভয়াবহন হতে পারে গোটা বিশ্বের অজানা নয়। ইসলাম নিয়ে রশিকতার বদলা নিতে খুন করতে দ্বিধা করে না ইসলাম ও নবী প্রেমি জিহাদীরা। বাকী মুসলিম সমাজ সেই খুনের সমর্থন করতে প্রকাশ্যে দাঁড়ায়। আর আছে কিছু ভদ্রগোছের আধুনিক লেবাসের মুসলিম, তারা “স্যাটায়ার করাও খারাপ হয়েছে, খুন করাটাও খারাপ হয়েছে” বলে ইসলামকেই ডিফেন্স করে। কাজেই আপনাকে মানতেই হবে ইসলাম নিয়ে হাস্যরস করলে তার পরিণতিটা আপনাকে আগেই ভেবে নিতে হবে। আপনি কি দাঙ্গা চান? আপনি কি এই রিস্ক নিবেন যে আপনার ঠাট্টা-তামাশার বলি হোক কিছু নিরহ মানুষ? একটা দাঙ্গায় প্রাণ যাক অগুণতি সাধারণ মানুষের যারা হয়ত নবী মুহাম্মদ সর্বমোট কয়টি বিয়ে করেছেন সেই তথ্যটিই জানেন না! তাই, আমরাও চাই না এই মুহূর্তে “পিকে” তৈরি হোক আমাদের এখানে। ভারতে হিন্দুরা সিনেমা হলে বসে পিকে দেখতে বসে হাসতে হাসতে পপকনের বাটিই উলটে ফেলে দিয়েছে। একবার দেখে বন্ধুকে নিয়ে দু’বার দেখতে গেছে। আমরা আমাদের সিনেমা হলে এরকম কোন স্যাটায়ার তিন ঘন্টা ধরে সহ্য করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মাইনি। পর্দায় আগুন দিয়ে, সিনেমা হলকে পুড়িয়ে, প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতাদেরকে মেরেধরে, ফাঁসি চেয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করেই তবে ক্ষ্যান্ত হবো! তাই অনুভূতির জ্বালা আর শান্তির স্বার্থে আমরাও আপাতত চাই না ইসলাম নিয়ে কোন স্যাটায়ার, কমেডি, বিদ্রুপ, ঠাট্টা, রসিকতা হোক…।
কিন্তু নবী জীবনী কি নবীকে নিয়ে স্যাটায়ার? দুনিয়ার সমস্ত ইসলামী স্কলার, যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত শ্রদ্ধা আর সম্মানের সঙ্গে যাদের স্মরণ করা হয় নবী জীবনীকার হিসেবে, কুরআনের সঠিক ও সর্বসম্মত ব্যাখ্যাকারী হিসেবে “ইবনে হিশাম”, “ইবনে ইসহাক”, “ইবনে কাথির”…প্রমুখদের কি নবী কুৎসা রটনাকারী বলতে হবে? আজ তাদের লিখিত নবী জীবনের কোন অধ্যায়কে যদি নিজের ভাষা শৈলীতে প্রকাশ করা হয়- কেন তা “নবী অবমাননা” হবে? এতগুলো বছর, এতগুলো যুগ চলে গেলো কখনো কোন ইসলামী স্কলার এই সমস্ত বইগুলোকে নিষিদ্ধ করার দাবী করেননি। মুসলিমদের বইগুলো এড়িয়ে যাবারও আহ্বান জানাননি। বলেননি গ্রন্থগুলো দুর্বল বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং তারা নিজেরা বার বার নবী মুহাম্মদকে জানতে ইবনে হিশাম, ইবনে ইসহাককে পড়তে পরামর্শ দিয়েছেন। আজ নবী মুহাম্মদকে জানতে আমাদের হাদিস, সিরাত ছাড়া আর কোন উৎস আছে কি? একজন মুসলিম কেমন করে তার প্রিয় নবীজিকে জানার কৌতূহলকে মেটাবে? ইরানী লেখক আলি দস্তির “টুয়েন্টি থ্রি ইয়ারসঃ এ স্টাডি অফ দ্যা প্রফেটিক ক্যারিয়ার অফ মুহাম্মদ” পড়ে যদি আমাদের মনে হয় যে একজন মুসলিম তার নবীকে খারাপ হিসেবে ভাবতে পারে তাহলে ইবনে ইসহাক পড়ে একজন বিশ্বাসী মুসলিমের তার নবী সম্পর্কে কি ধারনা জন্মাবে? আজকের যুগের একজন বোধ সম্পন্ন শিক্ষিত ভদ্র মানবিক মুসলিম তার নবীকে কি চোখে দেখবে?
শুধুমাত্র নিম্নাঙ্গের চুল গজিয়েছে এরকম বালকদেরকে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে হাত পিঠ মুড়া পরিখা খনন করে হত্যা করা হচ্ছে নবীর নেতৃত্বে! রায়ের বাজার বধ্যভূমির ছবি দেখে আমরা শিউরে উঠি। ইবনে ইসহাক বর্ণিত এই নবীজির ছবি কি কিছুতেই “ইহুদীদের হাতে অত্যাচারিত নবী মুহাম্মদকে” মেলানো যায়? আমাদের শেখানো হয়েছে নবী কাফেরদের কাছে মার খেয়ে তাদের জন্যই দোয়া করছেন “প্রভু এরা জানে না এর কি করছে, এদের তুমি ক্ষমতা করো”! আমাদের শেখানো হয়েছে কল্পিত ইহুদী বুড়ির কাঁটা পুঁতে রেখে নবীকে কষ্ট দেয়া আর নবীর সেই বুড়িকে প্রতিশোধ না নিয়ে উল্টো তার সেবা করা! “নবী মুহাম্মদের ২৩ বছর” আসলেই অস্বস্তিকর। অন্তত মদিনা গমনের পরেরটুকু। বাল্যকাল থেকে দেখা আসা মুহাম্মদ যেন পাল্টে গিয়েছিল আরবদের কাছে! তার প্রমাণ কুরআনের মক্কী আর মাদানী সুরার সুর পাল্টে যাওয়া। কুরআন তাই কোথাও উদার, সহনশীলতার বাণী, আবার সেই একই বিষয়ে প্রতিশোধ, হত্যা, রক্ত, লোভ, লালসা আর লাম্পট্যের ফ্রি লাইসেন্স দেয়ার ঘোষণা!
রোজকার মুসলিমদের ধর্মকর্ম, একজন মুসলিমের লেবাস-ছুরত, চিন্তা-চেতনা সমস্ত কিছু নির্ভর করে হাদিসগ্রন্থগুলোর উপর। প্রত্যহ মুসলিমরা যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে সেই উঠবস, যে নির্দিষ্ট শারীরিক কসরত তার সমস্তটাই হাদিস থেকে, কুরআনে এসবের কোন বর্ণনা নেই। সবচেয়ে সহি আর গ্রহণযোগ্য ইমাম বুখারী সংগ্রহকৃত হাদিসগুলোকে ধরা হয়। সেই ইমাম বুখারীর হাদিস থেকে নবী মুহাম্মদকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহিৃত করা যা অতি সহজে! দেখতে পাই কেমন করে নবী সাফিয়াকে যুদ্ধে (আসলে আক্রমণ) তার স্বামী-ভাইদের হত্যা করে সেইদিনেই তাকে গণিমতের লুটের মাল হিসেবে বিছানায় তুলে নিয়ে “বাসরঘর” সম্পন্ন করেন! হাজার বছর ধরে ইমাম বুখারীর এইসব সহি হাদিস “নবীর বিরুদ্ধে কুৎসা” রটনা হিসেবে দেখা হয়নি। আজতকও পবিত্র হিসেবে যে সব গ্রন্থ চুম্বিত মুসলিমদের কাছে সেই গ্রন্থেগুলোর সহায়তা নিয়েই লেখা বইকে কেন নিষিদ্ধ করতে হবে “নবীর বিরুদ্ধে অবমাননা” অভিযোগে? আলি দস্তির “টুয়েন্টি থ্রি ইয়ারসঃ এ স্টাডি অফ দ্যা প্রফেটিক ক্যারিয়ার অফ মুহাম্মদ”-এর বঙ্গানুবাদ “নবী মুহাম্মদের ২৩ বছর” আবুল কাশেম আর সৈকত চৌধুরী অনুবাদ করেছেন। হযরত মুহাম্মদের ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই। হাদিস, সিরাত কোনটাই ইতিহাসের বই নয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে আসা গল্পের মধ্য দিয়েই নবী মুহাম্মদকে জানার একমাত্র উৎস। আলি দস্তির তার উৎস এর বাইরে থেকে গ্রহণ করেনি কারণ সেটা সম্ভব নয়। ইসলামের কোন ইতিহাস নেই বা রাখা হয়নি। আবুল কাশেম আর সৈকত চৌধুরী সেই ইংরেজি বইটিকে শুধুই অনুবাদ করেছেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য। রোদেলা প্রকাশনী সেই বইটিকেই প্রকাশ করেছেন পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। নবী মুহাম্মদের জীবনীর উৎস যেখানে সহি হাদিস আর সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত সিরাত গ্রন্থগুলো- সেখানে এসবকে রেফারেন্স করে লিখিত কোন ইংরেজি বইকে অনুবাদ করে ছাপার অপরাধে কেন একজন প্রকাশককে আজ মৃত্যুর ভয়ে আত্মগোপন করে থাকতে হবে? কেন তার প্রকাশনী সংস্থাকে বন্ধ করে দেয়া হবে? কেন পুস্তক প্রকাশনি সমিতি রোদেলা প্রকাশনীকে বহিস্কার করবে? কেন জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি রোদেলা’র স্টলকে বন্ধ করে দিয়ে বইমেলায় দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করবে? “নবী মুহাম্মদের ২৩ বছর” বইটি কোন স্যাটায়ার নয়, এটি একটি নবী জীবনী গ্রন্থ। এমনকি এটি কোন উপন্যাস নয়। যীশুকে নিয়ে সারামাগো’র লিখিত “যীশু খ্রিস্টের একান্ত সুসমাচার”-মত কোন কল্পনার আশ্রয়ের কোন সুযোগ এখানে নেই যা একজন উপন্যাসিক ভোগ করে থাকেন। একজন জীবনীকার চান একজন রক্তমাংসের মানুষকে তুলে ধরতে। একজন সৎ জীবনীকার ভক্তি বা বিদ্বেষ থেকে কারুর জীবনী লিখেন না। আলী দস্তির লিখিত নবী জীবনী যদি কারুর কাছে বিদ্বেষময় মনে হয় তাহলে তারা এতদিন হাদিস আর সিরাতগ্রন্থগুলোকে টিকিয়ে রেখেছেন কেন? বাংলা একাডেমি যেহেতু এতবড় নবী কুৎসাপূর্ণ বইকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে তাদের ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছে তারা কি এই মেলাতে খুঁজে দেখবে ইবনে হিশাম বা ইবনে ইসহাকের কোন বাংলা অনুবাদ আছে কিনা? বুখারী হাদিস তো অবশ্যই পুরো ভলিউম পাওয়া যাবে। বাংলা একাডেমির তো আজই উচিত খুঁজে খুঁজে সেইসব স্টলগুলোকে বন্ধ করা! ইসলামী ফাউন্ডেশন কি হাদিস গ্রন্থগুলো নিষিদ্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করবে? আমরা হাদিস থেকে নবীকে বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক, গণহত্যাকারী, আক্রমণকারী হিসেবে দেখালে তার দায় আমাদের নয়- হাদিস গ্রন্থের। নবীকে আমরা জানতে পেরেছি হাদিস আর সিরাত গ্রন্থ থেকে।
মানতে যতই আপত্তি থাকুক তবু এটাই সত্য যে বাংলাদেশে হাটহাজারী ঠিক করে দিবে এখানে কতটুকু বলা যাবে আর কতটুকু বলা যাবে না। রকমারি যখন অভিজিৎ রায়ের বইকে হিযবুর তাহরির এক জঙ্গির হুমকির মুখে তাদের সাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছিল- সেই আত্মসমর্পন থেকে বাংলা একাডেমির আত্মসমর্পন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। বাংলা একাডেমি যখন ইসলামী অনুভূতিকে ভয় পেয়ে একটি পুরোনো, বহুল পঠিত গ্রন্থকে নিষিদ্ধ করে দেয় তখন বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল, মননশীল আর সৃজনশীলতার চর্চার কেন্দ্র যে মৌলবাদীদের দয়ায় বেঁচেবর্তে আছে সেটা দিন-দুপুরের মত পরিস্কার হয়ে যায়। এখন বাংলা একাডেমির মনোগ্রামে উপরে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” লিখে নিজেকে সমস্ত রকম ধর্ম বিরোধী জ্ঞান চর্চার বিপক্ষে বলে দাবী করে আগে থেকেই নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে। গোটা দেশটা যখন হাটহাজারী হয়ে উঠবে তখন প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে। রোদেলা প্রকাশনী নিয়ে আর কি কি হবে ভাবতে পারছি না। বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে প্রকাশককে নিয়ে। ওমর ফারুক লুক্স ভাইয়ের একটা ফেইসবুক পোস্ট পড়েছিলাম। তিনি লিখেছিলেন, ফেইসবুকের প্রথম দিকে তিনি কোন রকম মন্তব্য না জুড়ে শুধুমাত্র হাদিস হুবহু কপি-পেস্ট করেও বিস্তর গালাগালি খেয়েছেন! এই হিসেবে রোদেলা প্রকাশনীর ও দুই অনুবাদক (আবুল কাশেম ও সৈকত চৌধুরী) তো বিরাট অপরাধ করেছেন! এর কাফফারা গালাগালি দিয়ে শেষ হবে আশা করা যায় না। এ যে নবী জীবনী! শুনকে যতই অদ্ভূত লাগুক, একজন মুসলিমকে সবচেয়ে বেশি ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিতে পারে তাদের নবী জীবনীই! প্রকাশক আর অনুবাদকরা ইসলাম নিয়ে স্যাটায়ার করেনি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেনি- কিন্তু তারচেয়েও ভয়ংকর অপরাধ করেছেন, তারা নবীজির জীবনীর অনুবাদ করেছেন!

কারবালার যুদ্ধ– ইতিহাস নাকি বানানো কাহিনী?

লিখেছেন

মুসলিম ইতিহাস প্রথম ইমাম তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ খ্রীঃ) দ্বারা লিখিত হয় হিজরী তৃতীয়ের শেষ দিকে ও চতুর্থ শতক শুরুর দিকে। ইমাম তাবারী ৩১০ হিজরীতে মৃত্যূ বরন করেন। তার ইতিহাসের নথিপত্র বলতে কিছুই ছিল না। তার পুরো ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তির শোনা কথার উপর ভিত্তি করে। আর এই ব্যক্তিগণও কেউ কোন ঘটনার সাক্ষী ছিলেননা। পুরোটাই শোনা কথা হিসেবে এসেছ তার পূর্ববর্তী এবং তারও পূর্ববর্তী এমন করে ছয় বা সাত পুরুষ আগের কারো কাছ থেকে। এমনকি তাবারী তার বইয়ের শুরুতে বলেছেন যে, যে সব অসংগত ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন তার জন্য তিনি দায়ী নন বরং যারা তাকে বলেছেন তারাই দায়ী। তিনি আরও লিখেছিলেন তার পারসিক পুরোহিতমন্ডলীগণ (Magian) তাকে যে ভাবে উপদেশ দিতেন এবং তার রাজকীয় নিয়োগ-কর্তাদের আদেশ অনুযায়ী তিনি তার বই লিখেছেন। এগুলো ছাড়াও, তিনি আরো উল্লেখ করেছেন তার এসব ঘটনা বর্ণনার উৎস হারমুযান, জাফীনা এবং সা’বা বিন শামি’উন (এরা সবাই খলীফা বা ইমাম হত্যার সাথে জড়িত ছিলো) বংশধরদের কাছ থেকে এসেছে। ইমাম তাবারী একজন কাহিনীকার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার ১৩ খন্ডের ইতিহাস এবং ৩০ খন্ডের কোরানের ব্যাখ্যা তাকে ইমামদের মধে অন্যতম হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তার এই ইতিহাস ও কোরানের ব্যাখ্যা আব্বাসীয় রাজাদের কাজ-কর্মের সাথে সামঞ্জস্য করে লিখিত। তাই সহজেই তার লেখা রাজকীয় সমর্থন পায়। তার ইতিহাস-রচনা এবং কোরানের ব্যাখ্যা রাজকীয় ভাবধারাকে আইনসিদ্ধ করে ভোগ-বিলাস, ঐশ্বর্য, দাস-দাসী, হারেমের প্রথাকে উৎসাহিত করে। তাবারী তাদেরকে ধর্মের বৈধতা দান করে নিজে অর্থ-বিত্ত ও ধর্মের ধ্বজাধারী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তীতে মুহম্মদ বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক আল-কালীনীও একই পথের পথিক হন। তিনিও হিজরী চার শতকের শেষের দিকে এসে ইতিহাস লেখেন কোন নথিপত্র ছাড়াই শুধু শোনা কথার উপর ভিত্তি করে।
উল্লেখযোগ্য যে ইসলামের ইতিহাসের পরিচিত ইতিহাসবিসগণের প্রায় সবাই তাবারী-কালীনী পরবর্তী যুগের। তাদের আগে কি কেউ ছিল না!! মুসলিম ইতিহাসের যে সময়টাকে স্বর্ণ-যুগ বলা হয় সে সময়ের প্রমাণ-পত্র সব কোথায়? ১৬৫ আল-হিজরীতে আব্বাসীয় বংশের খলীফা হারুন-আর-রশীদ যখন ইমাম আহমাদ বিন হানবালকে তার তথ্যের সত্যতা প্রমানের নথি-পত্র দেখাতে বলেন তার কিছুই তিনি দখাতে পারেননি। এমনকি মামুন আর-রশীদের সাথে ‘কোরান আল্লাহর বাণী না অন্য কিছু’ এই নিয়ে বিতর্কে অংশ গহণ করে বেত্রঘাত পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছিল। ঐ সময় অন্য কোন ইমাম তার পাশে রাজ-তন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেনি যে-এই আচরন অইসলামিক। ফলে, সময়ের সাথে সাথে শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতা শক্তি অর্জন করতে থাকে।
ইমাম আবু হানিফার শিষ্য/ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ যেমন খলীফা মো’তামিদের (২৭০ হিজরী) রাজকীয় বিচার বিভাগের একজন বিচারক ছিলেন, ইমাম তাবারীও তেমনি একজন সেসময়ের বিচারক ছিলেন। ইমাম তাবারী, খলীফা আল-মুক্তাদার বিল্লাহর ইচ্ছার অন্যতম দোসর ছিলেন। বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে জানা যায় যে ইমাম তাবারী তার পারসীয়ান পরিচয় গোপন করার জন্য নিজ নাম ইবন জরীর বিন রুস্তম ইবন তাবারী (Ibn Jareer bin Rustam Ibn Tabar) থেকে ইবন জরীর বিন ইয়াজিদ তাবারী (Imam Ibn Jareer bin Yazeed Tabari) নামে পরিচয় দিতেন। তার সম্বন্ধে অনেক বিতর্কিত খবর আছে, অর্থাৎ ইসলামের কোন দল কে (শিয়া/সুন্নী, খারীজি/অথবা জরোয়াস্ট্রিয়ান)তিনি অনুসরন করতেন। প্রচলিত আছে যে ইমাম তাবারী বিন ইয়াজিদ এবং ইমাম তাবারী বিন রুস্তম দু’জন ভিন্ন ব্যক্তি, যদিও তারা দু’জনেই জন্মেছেন একই দিনে, দু’জনেই ইতিহাসবিদ, একই শহরে বাস করতেন, একই রকম দেখতে, একই রকম পোশাক পরিধান করতেন এবং এমনকি একই দিন মৃত্যূ বরন করেন। এই ধরনের সমাপতন সত্যি বিস্ময়কর!!
কারবালা যুদ্ধের যে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় তার সম্পূর্ণটাই তাবারী কর্তৃক রচিত এবং তা উল্লেখিত কারবালা যুদ্ধের ২৩৯ বছর পর লিখিত; এবং এখানেও সেই একই ভাবে শুরু করেছেন,”আবু মুকনিফ বলেছিল এটা, আবু মুকনিফ বলেছিল ওটা—“। স্কলার শাহ আব্দুল আজিজ, আল্লামা তামান্না ইমাদি, এবং মওলানা হাবিবুর রহমান খানদালবী এক গবেষণার পর মতামত দেন যে ‘আবু মুকনিফ’ একটা কাল্পনিক চরিত্র। অন্যান্য স্কলারগণ এ প্রসঙ্গে বলেন যে আবু মুকনিফ বলে যদি কেউ রক্ত-মাংসের থেকেও থাকে, তিনি মৃত্যূ বরন করেছিলেন তাবারী জন্মেরও ৫০ বছর পূর্বে। তাদের মতে তাবারী নিজেই কাহিণী লিখেছিলেন আবু মুকনিফের নামে। এমনকি তাবারী কখনো উল্লেখ করেনি যে তার সাথে আবু মুকনিফের দেখা হয়েছিল কিনা। আরও একটি উল্লেখ্য বিষয় যে, যেহেতু ঘটনা ঘটার প্রায় ২৩৯ বছর পর তাবারী বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন; এর মধ্যবর্তী সময়ে আর কেউ কি এ বিষয়ে জানতেন না? এ রকম ঘটনা ঘটার পর প্রায় কয়েকশ’ লেখা খুঁজে পাবার কথা; কিন্তু শুধু তাবারীর মাধ্যমেই আমরা এটা জানতে পারলাম!! কিছু স্কলার তাদের এ বিষয়ে গবেষণার পর মনে করেন যে, আবু মুকনিফ ছাড়াও লুত বিন ইয়াহিয়া, মুহম্মদ বিন সায়েব কলবী চরিত্রগুলো কাল্পনিক। ইতিহাসবিদগণ প্রয়োজন অনুযায়ী চরিত্রগুলো সৃস্টি করেছেন। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন যে, ইয়াজিদ যদি সত্যি এতই ঘৃনিত ব্যক্তি হতেন, তা হলে হযরত হাসান-হুসেনের বংশধর কেন ইয়াজিদের আত্মীয় স্বজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন বা পরবর্তীতে উল্লখে যোগ্য ব্যক্তিত্ব এবং খলীফাগণ তাদের নাম ইয়াজিদ রেখেছিলেন?
অনেক ইউরোপীয়ান গবেষকগণ বলেছেন যে প্রাচ্যের ইতিহাসের বর্ণনায় অনেক অতিরঞ্জিত বিষয় থাকে। যেমন, মোল্লা দরবান্দী তার ‘আসরার আল-সাহাদাহ’ বইতে লিখেছেন যে কারবালার যুদ্ধে উমর ইবন সা’দের বাহিনীতে প্রায় ৬০০,০০০ অশ্বারোহী, ২০ মিলিয়ন পদাতিক বাহিনী একত্রিত হয়েছিল। সেই সময় পুরো আরব এবং ইরাকে কি সত্যি এত লোক বাস করত? এ ছাড়াও কুফা থেকে ১ মিলিয়ন ৬০০,০০০ অর্থাৎ কুফার সকল জনগন যোগ দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন, কত বড় শহর ছিল কুফা? কুফা খুব একটা পুরনো শহর না; উমর বিন খাত্তাবের সময় কুফা মিলিটারী ঘাঁটি(outpost) হিসেবে গড়ে উঠে। এছাড়া, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না এই রকম নতুন একটা নগরীতে কত লোক বাস করত। কুফা বাহিনীত এত লোক জড়ো হওয়া এবং ইমাম হুসেনের ৩০০,০০০ হাজার লোক হত্যা করা মোটেও যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। এই ধরনের হিসাব পুরো ঘটনার উপরেই একটা সন্দেহের বীজ বপন করে। ইবনে জযির মতে শত্রুপক্ষে মোট সৈন্য সংখ্যা ৬ হাজার, সৈয়দ বিন তুসির মতে ২০ হাজার, আবি ফারাস বলেন ৫০ হাজার, আর আবি নাহাফ আজওয়ির মতে ৮০ হাজার। অন্যদিকে, ইমাম হুসেনের বাহিনীতে আবি ফারাসির মতে ১ হাজার, শেইখ মুফীদের মতে ৭২ জন (৩২ জন অশ্বারোহী এবং ৪০ জন পদাতিক সৈন্য), ইমাম বাকীর বলেন ১৪৫ জন।
কারবালার ঘটনার এমন অসম্ভব ও অবাস্তবপূর্ণ বর্ণনা যে, পুরো ঘটনাটাই বিভিন্ন প্রশ্ন-উত্তরের দাবী রাখে। সম্পূর্ণ ঘটনাটি এখানে আলোচনা সম্ভব নয়, তাই সামান্য কিছু অংশ উল্লেখ করা হলো। উদাহরণ সরুপ, — –ইবন জিয়াদ ইমাম হুসেনকে বলেন যে সে নরম বালিশে মাথা রাখতে পারবে না বা ভাল খাদ্য গ্রহণ করতে পারবেনা যতক্ষন না সে ইমামকে হত্যা করতে পারে। এর উত্তরে ইমাম বলেন যে কুফা নগর বাসী তার কাছে চিঠি লিখেছিল তাই সে এসেছে। এখন সে যদি এটা পছন্দ না করে তবে তাকে চলে যেতে দেয়া হোক। এমন কি ইমাম হুসেন, উমর বিন সা’দকে অনুরোধ করে ছিলেন যে তাকে চলে যেতে দেয়া হোক যেহেতু পৃথিবীটা অনেক বিস্তৃত। কিন্তু মুজতাহিদ লেখকের মতে ইমাম হুসেন সেখানে গিয়েছিলেন জিহাদের উদ্দেশ্যে; তাহলে কেন তিনি চলে যেতে দেবার জন্য অনুরোধ করবেন? কথিত আছে পারসীয়ানদের তখন ঘৃণা বা হিংসা ছিল হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াকাসের উপর; কারণ তিনি ৫০ বছর পূর্বে অর্ধেক পারস্য জয় করেছিলেন। তাই উমর বিন সা’দের নাম এখানে লাগানো হয়েছে। কিন্তু হিসাব মতে উমর বিন সা’দ তখন সিরিয়ায় তার বাহিনীকে নির্দেশনা দিচ্ছিল।(Ref. Al-Milil Wanhil by Imam Sheristani)
আশুরার দিনে (১০ই মুহররম)ইমাম হুসেন ইয়াজিদকে বলেছিলেন, “Yazeed the bastard, son of a bastard has forced me to choose between death and disgrace.” কিন্তু ঘটনা বর্ণনার অন্য জায়াগায় বলা আছে ইমাম নিজের ইচ্ছাতেই কুফায় এসেছিলেন, এমনকি বিভিন্ন ব্যক্তি প্রধানের কুফাতে না যাবার উপদেশ সত্ত্বেও। তার ১৫ ভাইয়ের মাত্র ৪ জন সঙ্গী হয়েছিলেন, আর বাকী সবাই তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তাহলে আর গালি-গালাজ কেন? আর একজন নেতৃত্ব স্হানীয় ব্যক্তির ভাষা কি এমন হতে পারে?
ইমাম জয়নুল আবেদিন বলেন যে যখন ইমাম হুসেন তার মৃত্যূ সম্বন্ধে শ্লোক আওড়াচ্ছিলেন, তা শুনে জয়নব তার নিজ মুখ-মন্ডলে আঘাত করছিলেন এবং প্রায় কাপড় ছিঁড়ে ফেলছিলেন; এক সময় অজ্ঞান হয়ে যান। ইমাম হুসেন তার বোনকে বলেন যে তাকে (জয়নব) ওয়াদা করতে হবে যে তার মৃত্যূর পর সে নিজেকে আঘাতে জর্জরিত করতে পারবে না বা কাপড় ছিঁড়ে শোক প্রকাশ করতে পারবেনা। কিন্তু কেউ কি ইমামের এই উপদেশ বা শেষ ইচ্ছার মর্যাদা দিয়েছে? নাকি ইচ্ছে মতো যে যেমন পেরেছে চরিত্রগুলোর মুখে কথা দিয়ে ঘটনা এগিয়ে নিয়ে গেছে! ইমাম তাবারী তার এই বই ‘Sa’aadatuddarain fi Qatlil Husain’ বইতে শুধু ঘটনার বর্ণনাই নয়, কি ভাবে ইমাম হুসেনের স্মৃতি উৎসব পালন করতে হবে তারও নির্দেশনা বর্ণনা করেছেন। এখন কথা হচ্ছে, এই নিয়ম তিনি কোথা থেকে পেলেন?
শুধু এখানেই থেমে নেই, আরো বর্ণনা আছে যে একটা পাখি ইমাম হুসেনের মাথার উপর পাখা ছড়িয়ে বলে যে আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাকে বিজয় দিতে পারে; এরপর ৪ হাজার ফেরেশ্তা তাকে যুদ্ধে সাহায্য করতে চায় কিন্তু তিনি কোন সাহায্যই চান না। এমনকি জ্বীনরা এসেও তাকে সাহায্যর কথা বলেন , কিন্তু কারও সাহায্য তিনি গ্রহণ করেন না। কোন সাহায্যই যদি কাম্য নয় তবে জিহাদে বা কুফা নগরীর লোকেদের কি ভাবে সাহায্য করবেন; যীশুর মতো নিজের জীবন উৎসর্গ করে কিভাবে জনগনের সেবা করা হলো? যখন শত্রুপক্ষ হাজার হাজার তীর ছোঁড়া শুরু করলো, ইমাম হুসেন ও তার দল পালটা আঘাত শুরু করল। যুদ্ধ প্রায় এক ঘন্টা চলে। এত হাজার হাজার তীরের বিরুদ্ধে কি ৭২ জনের বা ১৪৫ জনের একঘন্টাও টিকে থাকা সম্বম্ভ? শুধু ঘটনার পূংঙ্খানু্পূংঙ্খ বর্ণনাই নয়, সেই সাথে ইতিহাসবিদগণ যেভাবে শত্রু-মিত্র পক্ষের প্রতক্ষ কথোপোকথন বর্ণনা করেছেন, মনে হয় তারা সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন অথবা অডিও-ভিডিওতে ধারন করা হয়েছে।
ইমাম তার দুধের শিশু আলি আসগরকে তাবুর বাইরে পানি খাওয়ানোর জন্য নিয়ে এসে একটু পানি দেবার অনুরোধ করেন, পরিবর্তে শত্রুপক্ষের লোক তীর ছুঁড়ে মারে যার আঘাতে আলি আসগর মারা যায়। কিন্তু তার এক ফোঁটা রক্ত ইমাম হুসেন মাটি পড়তে না দিয়ে নিজের হাতের তালুতে ধারন করেন এবং আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারেন এবং এক ফোঁটা রক্তও মাটিতে ফিরে আসে না। একই ভাবে ইমাম হুসেন যখন হাজার হাজার তীর (১,৯৫০ টা তীর- কিন্তু কেউ বলেনি কে গুনল বা কিভাবে তখন হিসাব করা সম্ভব!) দ্বারা আক্রান্ত হন, তার নিজের রক্তও এভাবে আকাশে ছুঁড়ে মারেন এবং এক ফোঁটাও মাটিতে ফিরে আসে না। পরবর্তী তিন দিন এই রক্তই রক্ত-বৃস্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এই ইতিহাসবইগুলোতে বলা আছে যে তিন দিন যাবৎ এরকম রক্ত-বৃস্টি দেখে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় লোকজন ভাবতে শুরু করল যে কেয়ামত চলে এসেছে। কিন্তু এমন ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা রোমান, মিশরীয়, গ্রীক, ভারত বা অন্যান্য দেশের ইতিহাসে লেখা নেই বা কেউ জানল না যতদিন না তাবারী তার কারবালার কাহিণী লিখল।
এবার সময়ের হিসাবটা করা যাক।
৬৮০ খ্রীঃ উল্লেখিত কারবালার ঘটনা সংঘটিত(??)
৭০০ খ্রীঃ ইমাম হুসেনের পুত্র ইমাম যয়নুল আবেদিন দু’টো বই লেখেন (মুনাজাত-ই-যয়নুল আবেদিন ও সহীফা সাজ্জাদিয়া) যাতে কারবালার ঘটনার কোন উল্লেখ নেই; বরং ইয়াজিদের প্রশংসা করা হয়েছে। ইয়াজিদ ছিলেন দ্বিতীয় বনি উমায়াদ খলীফা, যিনি সুরা কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হন এবং সিরিয়া, ইসরাঈল, ইরাক, মক্কা, মদীনা, মিশর, ইয়েমেন, ইরান এবং অন্যান্য কাছের অংশে যেখানে উট দ্বারা যাওয়া-আসা সম্বম্ভ সেখানে তাকে খলীফা হিসেবে মেনে নেয়।
৭৫৮ খ্রীঃ ইমাম মালিকের বই ‘মুওয়াত্তা’ লেখেন, তাতে কারবালার কোন উল্লেখ নেই
৮৬০ খ্রীঃ হাদিস বইগুলো লেখা শুরু হয়, সেখানেও কারবালার ঘটনা নেই
৯০০ খ্রীঃ ইমাম তাবারী কারবালার যুদ্ধের বর্ণনা করেন, তবে তার লেখার পক্ষে কোন প্রমাণ বা নথি-পত্র নেই
৯১০ খ্রীঃ এরপর থেকে আজ পর্যন্ত নিত্য-নতুন ঘটনা সংযোজিত হয়ে ঘটিনাটি সমাজে আশুরা হিসেব প্রতিষ্ঠা পেয়ে পালন হয়ে আসছে।
‘Rawdat al-shuhada’ নামে মোল্লা হুসাইন কাশিফি একটি বই লেখেন। বইটি পারস্য ভাষায় লিখিত। মোল্লা হুসাইন কাশিফি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু তার সম্বন্ধেও অনেক বিতর্কিত তথ্য আছে। তাকে হাজী নুরী বহুরূপী গিরগিটির(chameleon) সাথে তুলনা করেছেন ; অর্থাৎ শিয়াদের সাথে একজন শিয়া হিসেবে মিশেছেন আবার সুন্নীদের কাছে নিজেকে হানাফী হিসাবে পরিচয় দিতেন। তিনি Sabzawar অঞ্চলের লোক ছিলেন, যেখানকার লোকজন প্রায় সবাই শিয়া ছিলো। এই নিজ অঞ্চলেই তিনি কারবালার ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি প্রায় ৯১০ হিজরীর দিকে মৃত্যূ বরন করেন। তার এই বই পড়ে হাজী নুরী বলেন যে, এই বইয়ে ইমাম হুসেনের সঙ্গীদের নামগুলো বানানো; এমনকি শত্রু পক্ষের নামগুলোও বানানো। বেশীরভাগ লোকজনই ছিল অশিক্ষিত এবং আরবী পড়তে জানত না। যেহেতু, এই বইটা পারস্য ভাষায় লেখা প্রথম বই এবং ইমাম হুসেন স্মরণে তাই তারা এই বই থেকে ঘটনা একত্রিত হওয়া জনগণকে পড়ে শোনাত। এই ভাবে একত্রিত হয়ে ইমাম হুসেনের জন্য শোক করাকে বলে rawdeh-khwani; কিন্তু radeh-khwani ইমাম সাদিক বা ইমাম হাসান আসকারীর সময়ে ছিলনা, বা সাঈদ মুরতাদা (হিজরী ৪৩৬) বা খাজা নাসির আল-দিন আল তুসির (হিজরী ৬৭২) সময়ে পরিলক্ষিত হয়নি। আর radeh-khwani মানে হচ্ছে Rawdat al-shuhada বই থেকে পড়ে শোনানো। হাজী নুরী এই বইকে –“a pack of lies” বলে উল্লেখ করেছেন। যখন থেকে সাধারন জনগণ এই বইটা অনুসরন করা শুরু করল, তখন থেকে আর কেউ ইমাম হুসেনের জীবনী নিয়ে অনুধ্যান করার চেষ্টা করলোনা। এরপর মাঠে এলেন মোল্লা দরবান্দী; যিনি Rawdat al-shuhadaর বিষয়বস্তু নিয়ে লিখে ফেললেন একটি বই, নাম ‘আসরার আল-সাহাদাহ’। এই বইটিই তখন থেকে ইসলামের ভাগ্যে অন্যতম শোকগাঁথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।
কারবালার ঘটনার বর্ণনা এবং সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে আসলে ইমাম হুসেনকেই অসন্মান করা হয়েছে; এবং এর সাথে সাথে মানুষের সাধারন বুদ্ধি, বিবেচনা, প্রকৃতির নিয়ম কানুন, সর্বপরি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেই হেয় করা হয়েছে। আশুরার দিনে একজন আরেকজনের দাঁড়িতে ধূলা ছুঁড়ে দেয়া মুহম্মদ (সাঃ) সময়কার নিয়ম। (Tirmizi Shareef, vol ii Pg 218, Delhi Edition) কিন্তু লেখক ভুলে গেছেন যে মুহম্মদ (সাঃ) মৃত্যূবরন করেছিলেন কারবালার ঘটনার ৫০ বছর পূর্বে। তাহলে এটা নবীর সময়কার রীতি হলো কি করে? ইসলামের ইতিহাসবিদগণ ইচ্ছেমতো বিষয় নিয়ে লিখেছেন; শুধুমাত্র তারাই নয় হাদিস লেখকরাও সময় ও ঘটনার বিন্যাসের তোয়াক্কাও করেনি। যার ফলে হাদিস ও ইতিহাস মিলেমিশে এমন অসঙ্গতিপূর্ণ ও বৈপরিত্য অবস্হার সৃস্টি করেছে যে এর থেকে বের হওয়া বেশ কস্টসাধ্য ব্যাপার।
এখন কথা হচ্ছে, কেন একদল লোক আশুরা পালনের মাধ্যমে ইমাম হুসেনকে স্মরনীয় রাখতে চায়? ইমাম হুসেনের আগে হযরত ওমর, উসমান বা আলীর মৃত্যূ নিয়ে তো কোন মাতামাতি হয়নি!! ইমাম হুসেনের মাজার জিয়ারত, তাকে নিয়ে শোক পালন করার জন্য শিয়াদের উৎসাহিত বা জোর দেয়া হয় কেন ??
তথ্য সূত্রঃ
Ashura-History and Popular Legend, Second Sermon Martyr Murtada Mutahhari; Tanslated from the Persian by ‘Ali Quli Qara’I , Vol XIII No.3 (Fall 1996)
Karbala—Fact or Fiction? by Shabbir Ahmed, M.D.

কে কোরবানী হয়েছিল, ইসমাইল নাকি ইসহাক?

লিখেছেন

কোরবানীর সময় সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে পশু হত্যার ধুম পড়ে। আর কয়দিন বাদেই কোরবানী , মুমিন বান্দারা এখন ব্যস্ত কোরবানীর পশু যোগাড়ে- সৎ বা অসৎ যে কোন ভাবে উপার্জিত পয়সায়।কোরবানীর রক্ত নাকি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, আর আল্লার সন্তুষ্টির জন্য মুমিন বান্দারা সব পশু হত্যা করে কোরবানী দেয়। আল্লাহ সন্তুষ্ট হলে মরার পর বেহেস্তে যাওয়া যাবে যেখানে আছে অসংখ্য চির যৌবনা হুর, যাদের সাথে অনন্তকাল আনন্দ করা যাবে। দুনিয়ার জীবন ও আনন্দ অতি সাময়িক, অনন্ত কালের তুলনায় তা নিতান্তই একটা মুহুর্ত মাত্র। তাই অনন্তকাল ধরে চির যৌবনা হুরদের সাথে ফুর্তি করার মানসে মুমিন বান্দারা তাদের সাধ্য মতো কোরবানী দেয়। শুধু মুসলমানরা নয়, হিন্দুরাও তাদের দেবী কালী বা মনসার উদ্দেশ্যে ছাগল বলী দেয়, উদ্দেশ্য কি তা অজানা। হয়ত ইহকাল বা পরকাল উভয় কালেই মজা ফুর্তির কামনা বাসনা। বাইবেলের ওল্ড টেষ্টামেন্টে দেখেছি মুসার অনুসারী তথা ইহুদীরাও কোরবানী দিত। যাহোক, ধর্মের নামে , আল্লাহ বা দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে একটা পশুকে নির্মমভাবে হত্যা করলে সত্যিকার অর্থে আল্লাহ বা দেবতা কতটা সন্তুষ্ট হয় তা কিন্তু সব সময়ই প্রশ্ন সাপেক্ষ থেকেছে। একটা পশুকে নির্মম ভাবে আস্তে আস্তে ( যা মুসলমানরা করে) পোচ দিয়ে বা এক কোপে ( যা হিন্দুরা করে) হত্যা করলে চারদিকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকলে , আর নিহত পশুটি ছট ফট করতে থাকলে আল্লাহ বা ঈশ্বর বা দেবতা বা দেবী যদি সত্যিকার অর্থেই সন্তুষ্ট হয় তাহলে বলতে হবে এ আল্লাহ বা দেব দেবী দারুন রকম নিষ্ঠুর।এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক আলোচনাই হতে পারে। তবে এখানের আলোচ্য বিষয় সেটা নয় বরং সেটা হলো- কোরবানী বিষয়টা যে ঘটনা থেকে উদ্ভুত সেটা কতটা সত্য।
ইসলাম ধর্মের কিচ্ছা অনুযায়ী- নবী ইব্রাহীম আল্লাহকে কতটা ভালবাসে তার একটা পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আল্লাহ। এটা একটা ভাল দিক। কারন পরীক্ষা ছাড়া কোন বিষয়কে স্বীকার করে নেয়া মূর্খতা বা অজ্ঞতা। আল্লাহ স্বপ্নে ইব্রাহীমকে বলল- তোমার সবচাইতে প্রিয় জিনিসটি আমাকে উৎসর্গ কর। পর পর তিন রাত ইব্রাহীম একই স্বপ্ন দেখল। এ স্বপ্ন দেখার পর ইব্রাহীম চিন্তা করল এটা একটা পরীক্ষা। একই সাথে চিন্তা করতে লাগল তার সবচাইতে প্রিয় জিনিস কি। আর বলা বাহুল্য, তার সবচাইতে প্রিয় জিনিস ছিল তার একমাত্র পূত্র ইসমাইল কারন তাকে সে তার অতি বৃদ্ধ বয়েসে আল্লাহর অনুগ্রহে প্রাপ্ত হয়েছে। একই কিচ্ছা অনুযায়ী – ইব্রাহীমের বয়স যখন ৮৫, তখনও তার কোন সন্তান জন্ম গ্রহন করেনি। এর জন্য সে আল্লাহর কাছে কম কান্না কাটি করে নি। অবশেষে আল্লাহর করুণা হলো-সেই ৮৫ বছর বয়েসেই তার স্ত্রী হাজেরা তার জন্য একটা পূত্র সন্তান প্রসব করল যা ছিল ইব্রাহীমের সবচাইতে প্রিয় জিনিস। তো এবার ইব্রাহীম তার একমাত্র সন্তান ইসমাইলকে আল্লাহর নামে কোরবানী দিতে উদ্যত হলো। আল্লাহর কি অপার মহিমা! কোরবানী দেয়ার পর দেখা গেল ইসমাইলের যায়গায় একটা দুম্বা (মতান্তরে ছাগল) কোরবানী হয়ে পড়ে আছে। এর পর থেকে ইব্রাহীমের অনুসারীরা এ ঘটনার স্মরনে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য চান্দ্র বছরের উক্ত দিনে পশু কোরবানী দেয়া চালু করে আর যার জের ধরে মুসলমানরাও সেটা পালন করে আসছে।
কিন্তু গোল বাধাল মোহাম্মদের প্রথম যুগের ইহুদীরা, একই সাথে খৃষ্টানরাও। তাদের দাবী- ইব্রাহীম ইসমাইলকে কোরবানী দেয় নি , দিয়েছিল তার বৈধ পূত্র বিবি সারাহ থেকে জাত ইসহাক কে। তারা আরও দাবী করল- হাজেরার গর্ভে ইসমাইল জন্মেছিল ঠিকই তবে হাজেরা ছিল দাসী, আর ইসমাইল সেকারনে কোন বৈধ পূত্র নয়। তারা ব্যখ্যা দিল- ইব্রাহীমের থেকে আল্লাহ এমন একটা জাতি সৃষ্টি করবে যারা হবে আল্লাহর পছন্দনীয় জাতি । অত:পর সে পছন্দনীয় জাতি থেকে এমন একজন নবী সৃষ্টি করবে যে সমগ্র দুনিয়ায় রাজত্ব করবে, সে হবে দুনিয়ার সমস্ত রাজার রাজা। আর আল্লাহ কখনই একজন দাসীর গর্ভজাত অবৈধ সন্তান থেকে সে পছন্দনীয় জাতি করতে পারেন না। আর বলা বাহুল্য, বাইবেলের পূরাতণ নিয়মে হাজেরাকে বিবাহিত স্ত্রী নয়, একজন দাসী হিসাবেই বলা হয়েছে আর বৈধ স্ত্রী হিসাবে সারাহকেই বলা হয়েছে। এখানে আর একটা ঘটনা ঘটে। হাজেরা ইসমাইলকে জন্মদান করার পর নানা কারনে সারাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয় ও তার স্বামী ইব্রাহীমকে চাপ দিতে থাকে তাদেরকে পরিত্যাগ করতে। অত:পর নানা ঘটনার পর, ইব্রাহীম হাজেরা ও শিশুপূত্র ইসমাইলকে তার নিজ বাসস্থান থেকে অনেক দুরে আজকের মক্কায় নির্জনে ফেলে রেখে যায়। অত:পর সেখানেই ইসমাইল বড় হয়, বিয়ে করে ঘর সংসার করে। আর তার থেকেই মূলত সৃষ্টি হয় আরব জাতির। অন্য দিকে হাজেরাকে নির্বাসন দেয়ার পর সারাহ ও গর্ভবতী হয়ে একটা পূত্র সন্তানের জন্ম দেয় যার নাম ইসহাক। ইসহাকের পূত্র ইয়াকুব যাকে বাইবেলে ইসরাইলও বলা হয় আর তার থেকেই পত্তন ঘটে ইসরাইল তথা ইহুদী জাতির। সুতরাং ইহুদীদের দাবী অনুযায়ী- আরবরা হলো ইব্রাহীমের অবৈধ সন্তান ইসমাইলের বংশধর আর ইসহাক হলো বৈধ সন্তান যার বংশধর থেকে সৃষ্টি হয়েছে ইসরাইলি বা ইহুদীরা ও পরবর্তীতে তাদের এক অংশ যীশু খৃষ্টের অনুসারী হয়ে খৃষ্টান নামে অভিহিত হয়েছে। তাই ইহুদী ও খৃষ্টান উভয় ধর্মাবলম্বীদের বক্তব্য হলো- অবৈধ সন্তান ইসমাইলের বংশধর থেকে আল্লাহ তার পছন্দনীয় জাতি সৃষ্টি করতে পারে না আর সে কারনে তাদের মধ্যে কোন নবীর আগমনও ঘটবে না। ঠিক এই পয়েন্টে এসে ইহুদী ও খৃষ্টান উভয়ই মোহাম্মদকে নবী হিসাবে বিশ্বাস করে না, তারা মোহাম্মদকে একজন ভন্ড নবী বা ভূয়া নবী হিসাবে গণ্য করে। এমন কি অনেক সময় তারা তাকে শয়তানের মানব রূপ হিসাবেও প্রচার করে থাকে।মক্কা মদীনাতে যখন মোহাম্মদ নিজেকে নবী দাবী ক’রে ইসলাম প্রচার শুরু করে, ঠিক পূর্বে উল্লেখিত কারনেই ইহুদীরা এর ঘোর আপত্তি করে এবং তাকে একজন ভন্ড হিসাবে অভিহিত করে ও নানা ভাবে অপমান করতে থাকে। আর খৃষ্টানরাও তাদের সাথে তাল মিলায়। অন্য দিকে- খৃষ্টাণদের দাবী বাইবেলের পুরাতন নিয়মে ইসরাইলি জাতির মধ্য হতে যে নবীর আগমনের কথা বলা হয়েছে তা হলো যীশু খৃষ্ট এবং যীশু খৃষ্ট ইসরাইলের বংশধর তথা ইহুদী জাতির মধ্য থেকেই আগমন করেছে যে ইসরাইল ছিল ইব্রাহীমের বৈধ স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান ইসহাকের পূত্র। কিন্তু অধিকাংশ ইহুদীরা নানা কারনে তা মানতে অস্বীকার করে, যদিও যীশু খৃষ্টের প্রাথমিক অনুসারীর সবাই ইহুদিই ছিল। সে যাহোক, ইহুদী ও খৃষ্টানরা উভয়ই বাইবেলের পুরাতণ নিয়মের ধারা অনুযায়ী মোহাম্মদকে নবী মানতে অস্বীকার করে। মোহাম্মদের সময়কার ইতিহাস থেকে দেখা যায়, খৃষ্টানরা কেউ কেউ মোহাম্মদ প্রচারিত ধর্মের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিল, কিন্তু ইহুদীরা মোটেও তা ছিল না আর তারা সেই প্রাথমিক যুগ থেকেই মোহাম্মদ ও তার প্রচারিত ইসলামের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। এর অন্যতম কারন ছিল তারা বিশ্বাস করত – তারাই হলো ঈশ্বরের সেই পছন্দনীয় জাতি যারা একদিন সারা দুনিয়ায় রাজত্ব করবে, আরবরা নয়। ঠিক একারনেই দেখা যায়- মোহাম্মদ কখনও কখনও খৃষ্টানদের প্রতি সহানুভুতিশীল হলেও ইহুদীদের প্রতি ছিল প্রচন্ড নির্মম ও নিষ্ঠুর। সেই নিষ্ঠুরতা , নির্মমতা মোহাম্মদ মক্কায় থাকতে দেখাতে পারেনি কারন তখন সে ছিল ভীষণ দুর্বল , নিজের জীবন বাঁচানোতেই ছিল ব্যস্ত। মোহাম্মদ যখন মদীনায় শক্তিশালী শাসক হয়ে ওঠে- তখন সে তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ইহুদী নিধনে, যাতে তাদেরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া যায়। এর পর মক্কা বিজয়ের পর ইহুদী নিধন কার্য আরেও বেগবান হয়। ইহুদীদের বনু কুরাইজা গোত্রের মানুষদেরকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা , খায়বারে নিরস্ত্র ইহুদীদের হত্যা এসবের অন্যতম নিদর্শন। এত নির্যাতন অত্যাচার সহ্য করার পরও কেন ইহুদীরা মোহাম্মদের ইসলাম গ্রহন করে নি , সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ? তার একটাই মাত্র কারন- মোহাম্মদ দাবী করছে ইব্রাহীম, মূসা, ইসা এদের ধারাবাহিকতায় সে শেষ নবী, অথচ বাইবেলে ভবিষ্যদ্বানী করা আছে মূসার পর মাত্র একজন নবীর আগমন ঘটবে আর সে আবির্ভুত হবে ইসরাইলি তথা ইহুদীদের মধ্যে। অথচ মোহাম্মদের জন্ম অইহুদি আরব দেশে। তাই তাদের কিতাব মতে মোহাম্মদ নবী হতেই পারে না। ধর্মভীরু ইহুদীরা তাই মোহাম্মদকে নবী মানা তো দুরের কথা তাকে ভন্ড নবী বলে নানা ভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করত। তারা মোহাম্মদকে ভন্ড বলত একারনে যে- মোহাম্মদ তৌরাত কে আল্লাহর কিতাব হিসাবে স্বীকার করছে যা মুসা নবীর নিকট অবতীর্ণ হয়েছিল অথচ একই সাথে জোর করে বানিয়ে বানিয়ে অভিযোগ করছে ইহুদী ও খৃষ্টানরা নাকি তা বিকৃত করে ফেলেছে। অথচ তারা তা করেনি। আর সেকারনেই তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে থাকে যে মোহাম্মদ সত্যি সত্যি একজন ভন্ড বা ভূয়া নবী।
এবারে আসা যাক, কাদের দাবী সত্য সেটার বিশ্লেষণে। এ ব্যপারে নিচের হাদিসটি দেখা যেতে পারে-
ইবনে আব্বাস বর্নিত: তিনি বলেন যখন ইব্রাহীম ও তাঁহার স্ত্রী( সারাহ) এর যা হইবার তা হইয়া গেল অর্থাৎ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইল, তখন ইব্রাহীম শিশুপূত্র ইসমাইল ও ইসমাইলের মাতা হাজেরাকে লইয়া বাহির হইয়া গেলেন। তাহাদের সাথে একটি মশক ছিল আর তাতে পানি ছিল। ইসমাইলের মাতা মশক হইতে পানি পান করিতেন আর শিশুপূত্রের জন্য তাহার দুগ্ধে প্রাচুর্য আসিত। শেষ পর্যন্ত ইব্রাহীম মক্কায় আসিয়া গেলেন এবং হাজেরাকে তার শিশুপূত্র সহ একটি বৃক্ষমূলে বসাইয়া রাখিলেন। তারপর তিনি তার নিজ স্ত্রী সারাহ এর নিকট ফিরিয়া চলিলেন। তখন ইসমাইলের মাতা তাহাকে অনুসরণ করিয়া কিছুদুর গেলেন ও ইব্রাহীমকে জিজ্ঞাসা করিলেন- হে ইব্রাহীম আমাদিগকে কাহার নিকট রাখিয়া যাইতেছেন? ইব্রাহীম বলিলেন- আল্লাহর নিকট। হাজেরা বলিলেন- আমি আল্লাহর নিকট থাকিতেই রাজি। ——————————————————————————————————————————–
ইবনে আব্বাস বলেন, জুরহুম গোত্রের একদল লোক প্রান্তরের মধ্য দিয়া পথ অতিক্রম করিতেছিল, হঠাৎ তাহারা দেখিল, একদল পাখী উড়িতেছে। তাহারা যেন তাহা বিশ্বাসই করিতে পারিতেছিল না।তাহারা বলিল, যেখানে পানি থাকে সেখানেই তো এইসব পাখি উড়িতে দেখা যায়। তখন তাহারা পাখী উড়িবার স্থলে তাহাদের একজন লোক পাঠাইল। সে তথায় গিয়া দেখিল সেখানে পানি মৌজুদ আছে। তখন সে দলের লোকদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া তাহাদিগকে পানির খবর দিল। তারপর তহারা সকলেই হাজেরার নিকট আসিল এবং তাহাকে বলিল, হে ইসমাইল জননী! আপনি কি আমাদিগকে আপনার প্রতিবেশী হওয়ার বা আপনার সাথে বসবাস করিবার অনুমতি দিবেন ?হাজেরা তাহাদিগকে বসবাসের অনুমতি দিলেন এবং এইভাবে অনেক দিন চলিয়া গেল। তারপর হাজেরার শিশুপূত্র প্রাপ্ত বয়স্ক হইলেন, তখন তিনি জুরহুম গোত্রেরই এক কন্যাকে বিবাহ করিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন, অত:পর নির্বাসিত পরিজনের কথা ইব্রাহীম এর মনে উদয় হইল। তিনি তাহার স্ত্রী সারাহ কে বলিলেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিজনের কথা জানিতে চাই। ইবনে আব্বাস বলেন, অত:পর ইব্রাহীম তাহাদের নিকট আসিলেন এবং সালাম দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন- ইসমাইল কোথায় ?ইসমাইলের স্ত্রী বলিল- তিনি শিকারে গিয়াছেন।————— সহী বুখারী, বই-৫৫, হাদিস নং-৫৮৪

উপরোক্ত হাদিসে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে- ইব্রাহীম হাজেরা ও ইসমাইলকে নির্বাসনে দেয়ার পর দীর্ঘদিন আর তাদের সাথে দেখা করেনি। দেখা করেছে তখন যখন ইসমাইল প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে বিয়ে করে সংসার শুরু করে দিয়েছে। আরও উল্লেখ্য, উক্ত হাদিসে দেখা যাচ্ছে- বর্ননাকারী বার বার সারাহ কে ইব্রাহীমের স্ত্রী বলছে, কিন্তু হাজেরাকে শুধুমাত্র ইসমাইলের মাতা বলছে। একবারও কিন্তু দেখা যাচ্ছে না যে হাজেরাকে ইব্রাহীমের স্ত্রী বলা হচ্ছে। ইব্রাহীমের সময়ে যে কেউ দাসীদের গর্ভে সন্তান জন্ম দিতে পারত , এটা দোষণীয় কিছু ছিল না। এমনকি মোহাম্মদের সময়েও এটা দোষণীয় ছিল না। খোদ মোহাম্মদের নিজের এক পূত্র ইব্রাহিমও ছিল তার দাসী মারিয়ার(মিশরের সম্রাট থেকে উপহার পাওয়া) সন্তান। পরে অবশ্য মোহাম্মদ তাকে বিয়ে করে তবে যখন ইব্রাহীম মারিয়ার পেটে আসে তখন তাদের বিয়ে হয়নি।বিষয়টাও আসলে তাই। হাজেরা ছিল ইব্রাহীমের দাসী। বিবাহিতা স্ত্রী নয়। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে সেরকমই বলা আছে। ইব্রাহিম এক সময় মিশর গমন করে, তখন তার সাথে তার স্ত্রী সারাহ ছিল। নানা ঘটনার পর সারাহ সেখানকার বাদশার রাজপ্রাসাদে স্থান পায়, পরে যখন সেখান থেকে চলে আসে তখন বাদশাহ তাকে একটা দাসী উপহার দেয় আর সেই দাসীই হলো হাজেরা। বাইবেলে আরও বর্ননা করা আছে-ইব্রাহীম ও সারাহ যখন অতিশয় বৃদ্ধ হয়ে গেছিল কিন্তু সন্তান জন্ম নিচ্ছিল না , তখন সারাহই ইব্রাহীমকে তার দাসী হাজেরার সাথে সহবাস করতে বলে ও সন্তান উৎপাদনের জন্য অনুরোধ করে। সেখানেও বিয়ের কথা নেই। কিন্তু যখন হাজেরা ইসমাইলকে প্রসব করে তখন সারাহও আল্লাহর কাছ থেকে অবগত হয় যে সে নিজেও মা হতে চলেছে বা হবে। তখন সারাহ আর হাজেরাকে সহ্য করতে পারে না। কারন দাসীর গর্ভের এক অবৈধ সন্তান তার স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে বা অন্য সব কিছুতে ভাগ বসাবে তা সারাহ মানতে রাজী হয়নি। সেকারনে সে হাজেরাকে বাড়ী থেকে নির্বাসন দেয়ার জন্য ইব্রাহীমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ঠিক এ প্রচলিত ঘটনাটাকেই ( যা মোহাম্মদের আমলে বাইবেলে লিখিত ও প্রচলিত ছিল) হাদিসে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে- তিনি বলেন যখন ইব্রাহীম ও তাঁহার স্ত্রী( সারাহ) এর যা হইবার তা হইয়া গেল অর্থাৎ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইল । অর্থাৎ সারাহ ও ইব্রাহীমের মধ্যে ব্যপক মনোমালিন্যের উদ্ভব ঘটে হাজেরা ও তার সন্তান ইসমাইলকে নিয়ে। উল্লেখ্য, হাজেরা ইব্রাহীমের বৈধ স্ত্রী হলে সারাহ কখনই এ ধরনের আচরন করতে পারত না , বা হাজেরা ও ইসমাইলকে নির্বাসন দিতে ইব্রাহীমকে বাধ্য করাতে পারত না।
তাহলে উপরোক্ত হাদিস যে বিষয়গুলি পরিস্কার তা হলো- ইসমাইল প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে করে সংসার করার আগ পর্যন্ত তার সাথে ইব্রাহীমের দেখা হয় নি। হাজেরা ইব্রাহীমের দাসী ছিল, বিবাহিতা স্ত্রী ছিল না।
এবার দেখা যাক, এ বিষয়ে কোরান কি বলছে-
হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললামঃ হে ইব্রাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে, ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের একজন। কোরান, সূরা আস সাফাত-৩৭:আয়াত ৯৯-১১১
উপরোক্ত আয়াতে ইব্রাহীম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে একজন সৎপূত্র দান করার জন্য। অত:পর ৯৯ থেকে ১১১ পর্যন্ত আয়াতে দেখা যাচ্ছে সে পূত্র যখন চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো তখনই ইব্রাহীম তাকে কোরবানী করতে নিয়ে যায়। এ চলাফেরা করার বয়স মানে বিয়ে করার মত প্রাপ্ত বয়স্ক না নিশ্চয়ই। বড়জোর শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরে পদার্পন পর্যন্ত বুঝানো যেতে পারে। এছাড়াও এ আয়াত গুলোর কোথাও ইসমাইলের নাম গন্ধও নেই। আর পূর্বোক্ত হাদিস থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে- ইব্রাহীম যখন ইসমাইলের সাথে নির্বাসনের পর প্রথম দেখা করে তখন সে কৈশোর উত্তীর্ন হয়ে যৌবনে পদার্পন করেছে এবং বিয়ে করে সংসার করছে। সহী বোখারী, বই-৫৫ এর ৫৮৩ নং হাদিসও হুবহু একই কথা বলে। এছাড়াও ইসমাইল কিভাবে ইব্রাহীমের সব চাইতে প্রিয় কিভাবে হয় সেটাও প্রনিধানযোগ্য। কারন জন্মের কিছুদিন পরই হাজেরা সহ তাকে ইব্রাহীম ত্যাগ করে চলে গেছে। এর পর সারাহ এর গর্ভে ইসহাক এর জন্ম হয়েছে। সারাহ এর গর্ভে সন্তান এসেছিল বলেই তো সারাহ হাজেরা ও তার সন্তানকে আর ইব্রাহীমের সাথে থাকতে দিতে রাজী হয়নি। হাজেরা যদি সত্যি সত্যি ইব্রাহীমের বিয়ে করা বউ হতো, তাহলে কি সারাহ ইব্রাহীমকে বাধ্য করাতে পারত নির্বাসন দিতে? তখন দুইটা কেন শতটা বিয়ে করলেও কোন স্ত্রীর কিছু করার ছিল না, সেটাই ছিল প্রচলিত রীতি। তাই সেক্ষেত্রে ইসহাকই হবে ইব্রাহীমের সবচাইতে প্রিয় পাত্র কারন সেই সব সময় তার সাথে থাকত। একজন পিতার কাছে কোন সন্তান বেশী প্রিয় হয়? যে সন্তানকে পিতা জন্মের কিছুদিন পর থেকে দীর্ঘদিন দেখতে পারে না সে , নাকি যে সন্তান পিতার সাথে সব সময় থাকে সে ? সুতরাং ইসমাইলকে কোরবানী দেয়ার যে কাহিনী আমরা এতকাল শুনে এসেছি, তার ভিত্তি খুব দুর্বল। বরং ইসহাককেই কোরবানী দেয়ার বিষয়টিই উক্ত কিচ্ছা কাহিনী অনুযায়ী সঠিক হওয়াই বেশী যুক্তি সঙ্গত।
আমি দেখেছি ইসলামী চিন্তাবিদরা নানা ভাবে এর একটা ব্যখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। বলে যে ইসমাইল যখন জন্মায় তখন ইব্রাহীমের বয়স ছিল ৮৬ আর ইসহাক যখন জন্মায় তখন তার বয়স ছিল ৯৯। কিন্তু এসব কথা না আছে কোরানে, না আছে হাদিসে। এ সময় তারা বাইবেলের রেফারেন্স দেয়। বাইবেলে নাকি সেরকম বলা আছে। আমি জানিনা আসলে তা আছে কি না। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য। বাইবেলে বলা হচ্ছে- ইসহাককে কোরবানী দেয়া হয়েছিল, সেটা তারা গ্রহন করছে না , বলছে বিকৃত। আবার বাইবেলে বলা আছে ইসরাইলি জাতি থেকে নবী আগমন করবে, সেটাও তাদের মনপূত: না তখনও বলছে বাইবেল বিকৃত। অথচ এসব কথা বাইবেলে লেখা আছে মোহাম্মদের জন্মানোরও শত শত বছর পূর্বে। কি অদ্ভুত আব্দার, যে বাইবেলকে বলছে বিকৃত অথচ সেই বাইবেলের তথ্যকে তারা ব্যবহার করছে প্রামান্য হিসাবে। ইদানিং ইসলামী পন্ডিতরা এ ধরনের উদ্ভট যুক্তি হর হামেশাই প্রয়োগ করে থাকে।তারা বলে ইসলাম হলো একমাত্র সত্য ধর্ম, অন্য সব ধর্ম বিকৃত বা মিথ্যা আর তাদের কিতাব সমূহও সব বিকৃত, অথচ একই সাথে তারা সেসব কিতাবে কোথায় মোহাম্মদ আসবে লেখা আছে তা বের করে উল্লসিত হচ্ছে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত। তার মানে খৃষ্টান আর ইহুদীরা মোহাম্মদের আবির্ভাবের খবর শত শত বছর আগেই পেয়ে তারা বাইবেল বিকৃত করেছিল? মোহাম্মদ যখন আরব দেশে ছিল সেই ৭ম শতাব্দীতে, তখন বাইবেলের শত শত কপি গোটা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়েছিল,কারন তখনই ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ খৃষ্টান ধর্মকে গ্রহন করে ফেলেছিল। যদি বিকৃত করতে হয়, তাহলে সেসব গুলিকে জড় করে ধ্বংস করে তারপর নতুন করে একটা সংকলন বের করে সেটা করতে হবে। যেমনটা করেছিল খলিফা ওসমান তার শাসনামলে কোরান সংকলন করার জন্য। কিন্তু এমন কোন নজীর পাওয়া যায়নি মোহাম্মদের পর ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ কাজটি করেছে। পরিশেষে, যদি মোহাম্মদকে নবী মানতে অস্বীকার করার জন্যই তারা বাইবেলকে বিকৃত করে থাকে তাহলে তারা সেই বাইবেলে ইসমাইল ও ইসহাকের জন্মের সময় ইব্রাহীমের বয়স কত ছিল সেটা লিখতে যাবে কোন আহাম্মকিতে ? সেটাও তো তারা বিকৃত করে রাখবে যাতে ভবিষ্যতে কোনদিন কেউ ধরতে না পারে। ইসলামী পন্ডিতরা আরও নানা ভাবে বের করার চেষ্টা করে বাইবেলে নাকি মোহাম্মদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা আছে।
আর ইসমাইল তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুমিন বান্দারা আর তাদের পন্ডিতরা তারস্বরে প্রচার করে যে বাইবেল বিকৃত করা হয়েছে। কারন বাইবেলের পুরাতন নিয়মে পরিস্কার বলা আছে যে ইসহাককেই কোরবানী দিয়েছিল ইব্রাহীম। অথচ বিকৃতির স্বপক্ষে কোন প্রমান তারা দাখিল করতে পারে না। কেউ যদি বলে যে বাইবেল বিকৃত হয়েছে, তাহলে তাকেই আসল একটা বাইবেল হাজির করে প্রমান করতে হবে যে বর্তমানে যে বাইবেল তা বিকৃত। এখন আসল বাইবেলও হাজির করতে পারবে না , আবার বলবে বাইবেল বিকৃত হয়েছে- এ ধরনের যুক্তি যারা প্রচার করে বেড়ায় তারা মানসিকভাবে সুস্থ কিনা তা ভাববার যথেষ্ট কারন আছে। তবে বাইবেলের কিছু ভার্শন আছে যাদের মধ্যে সামান্য তারতম্য দেখা যায়। কিন্তু সে তারতম্যটা কেমন? সেটা প্রকাশ ভঙ্গীর তারতম্য। এটা অনেকটা একই বিষয়ে বিভিন্ন হাদিস বয়ানকারীদের বর্ননার ভিন্নতা যা খুবই নগন্য অথচ মূল বিষয়বস্তু এক। উদাহরন- উপরোক্ত হাদিস ৫৮৪, ঠিক একই ঘটনার বর্ননা দেয়া আছে হাদিস ৫৮৩ তেও। এখানে মূল ঘটনা হুবহু একই , শুধুমাত্র বর্ননা সামান্য ভিন্ন। বাইবেলের বিভিন্ন ভার্শনের পার্থক্য ঠিক এরকমই। আর এই যে পার্থক্য এটা মূলত: বাইবেলের নূতন নিয়মে যাকে গসপেলও বলা হয়। বাইবেলের পূরাতন নিয়ম যাকে তৌরাতও বলা হয় তার সংরক্ষন নিয়ে কোন সমস্যা নেই। বাইবেল যে বিকৃত তা দেখা যায় কোরানের নীচের আয়াতে-
অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে।সূরা বাকারা ২: ৭৯
খেয়াল করতে হবে , মোহাম্মদ যতদিন মক্কাতে ইসলাম প্রচার করত ততদিন কিন্তু বলে নি যে বাইবেল বিকৃত। মদিনায় গিয়ে ক্ষমতা লাভ করে যখন সে ইহুদীদেরকে কচুকাটা করার মত ক্ষমতা অর্জন করেছে তখনই কোরানের মাধ্যমে বলা শুরু করেছে যে বাইবেল মনুষ্যরচিত বা বিকৃত। প্রসঙ্গত: সূরা বাকারা মদীনায় অবতীর্ণ।
বিষয়টা আরও বিশেষ প্রনিধানযোগ্য। ইসহাকের জন্ম বন্ধ্যা সারাহ এর বৃদ্ধাবস্থায় যা একটা অলৌকিক ঘটনা, কিন্তু ইসমাইলের জন্ম স্বাভাবিক ঘটনা প্রায় যুবতী দাসী হাজেরার গর্ভে। বাইবেলে তো বটেই কোরানে বার বার ইসহাককে আল্লাহর বিশেষ সম্মানিত ব্যাক্তি ও নবী হিসাবে বর্ননা করা হয়েছে। অথচ ইসমাইলকে তা করা হয় নি।কেন করা হয় নি ? কারন যখন মক্কায় বসে মোহাম্মদ এসব কোরানের সূরা তৈরী করত, তখন তার অত মনে হয়নি যে ভবিষ্যতে এটা একটা বড় ইস্যূ হয়ে দাড়াবে। অথচ তখন অনেক সূরা সে তৈরী করে ফেলেছে যা অনেক সাহাবী মুখস্তও করে ফেলেছে, তাই তা আর পাল্টানও সম্ভব না, পালটালে তো মিথ্যাবাদী সাজতে হবে। যাহোক, একারনে ইসহাকের বংশজাত ইহুদীরা নিজেদেরকে মহান জাতি মনে করে অথচ সে তুলনায় অবৈধ সন্তান ইসমাইলের বংশধরগন তেমন কোন মর্যাদা দাবী করতে পারে না বা তা নেই ও । মুসলমানরা ঠিক এটাকেই বরদাস্ত করতে পারে না। যেকারনে ইসমাইলকে কোরবানী করা হয়েছিল বলে প্রচার করে তার বংশধর ও ইসলামের অনুসারীদেরকে মর্যাদাবান করতে চায়। দেখা যাক কেমন ভাবে কোরানে ইসহাককে মর্যাদাশীল করা হয়েছে।
তাকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুমকারী। মক্কায় অবতীর্ন, সূরা- আস সাফফাত ৩৭: ১১২
অতঃপর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হলঃ তারা বললঃ ভীত হবেন না। তারা তাঁকে একট জ্ঞানীগুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল অতঃপর তাঁর স্ত্রী চীৎকার করতে করতে সামনে এল এবং মুখ চাপড়িয়ে বললঃ আমি তো বৃদ্ধা, বন্ধ্যা।। মক্কায় অবতীর্ণ, সূরা আয যাযিরাত ৫১: ২৮-২৯
তাঁর স্ত্রীও নিকটেই দাড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরের ইয়াকুবেরও।। মক্কায় অবতীর্ণ, সূরা-হুদ ১১; ৭১

এখন প্রশ্ন হলো-ইসমাইলকে এত মর্যাদাশীল না দেখিয়ে কোরানে ইসহাককে কেন দেখানো হলো ? একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে উপরোক্ত প্রতিটি সূরাই মক্কায় অবতীর্ণ যেখানে মোহাম্মদ ছিল ভীষণ রকম দুর্বল। ইসহাককে এত মর্যাদাপূর্ণ দেখানোর একটাই উদ্দেশ্য ছিল , তা হলো খৃষ্টান ও ইহুদিদেরকে আকৃষ্ট করা যাতে তারা তার কাছে আত্মসমর্পন করে ও তাকে নবী হিসাবে মেনে নেয়। মদীনায় রচিত কোন সূরাতে ইসহাককে এত মর্যাদাশীল হিসাবে দেখা যাবে না। এটা ছিল মোহাম্মদের অত্যন্ত দুরদর্শী একটা কৌশল মাত্র। এ কৌশলে সম্পূর্ন কাজ না হলেও মোটামুটি বেশ কাজ হয়েছিল। মক্কায় তার ইসলাম প্রচারের জন্য অন্তত ইহুদি খৃষ্টানদের কাছ থেকে কিছু ঠাট্টা ও উপহাস ছাড়া আর তেমন কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয় নি। তাকে মূলত: কুরাইশদের কাছ থেকেই প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ইসহাককে মর্যাদাশীল দেখিয়ে মোহাম্মদ যুদ্ধ ক্ষেত্রের দুইটা ফ্রন্টকে ( ইহুদি ও খৃষ্টান) প্রায় নিরপেক্ষ করে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু মদিনায় যাওয়ার পর যখন সে শক্তিশালী হয়ে গেল তখন আর এসবের বালাই থাকল না। তখন থেকে শুরু হলো মার মার কাট কাট, ধর মার , হত্যা কর, ইহুদী খৃষ্টানদের বসতি আক্রমন কর, তাদের সম্পদ লুঠ কর, লোকজনদেরকে বন্দী করে দাস দাসী বানাও।তখন বানী হলো- মোহাম্মদ ছাড়া আর কেউ নেই, থাকবে না। সুতরাং এখন গলায় জোর দিয়ে বলা যেতে লাগল যে – ইহদী ও খৃষ্টানরা তাদের কিতাবকে বিকৃত করেছে হাতে কোন প্রমান না থাকা সত্ত্বেও। কারন সেটা না করলে মোহাম্মদের মর্যাদা বাড়ে না, তার নবুয়ত্ব টেকে না, টেকে না তার ইসলাম। আর তাই শুরু হলো ইসমাইলের কোরবানী তত্ত্ব। এটা সেই প্রক্রিয়া যা হিটলার জার্মানীতে শুরু করেছিল তার প্রচার মন্ত্রী গোয়েবলসের মাধ্যমে। সত্যকে মিথ্যা , মিথ্যাকে সত্য শত বার প্রচার করে তারা তাদের ইচ্ছামত সত্য তৈরী করে জার্মান জাতিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী করে তুলে অত:পর প্রলয়ংকরী বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল। হিটলার যেন মোহাম্মদের কাছ থেকেই টেকনিক টা রপ্ত করেছিল। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, নিরক্ষর মোহাম্মদ বাইবেলের এত সব কাহিনী জানল কেমনে ? উত্তর অত্যন্ত সোজা। ৪০ বছর বয়েসের আগে সে ইসলাম প্রচার শুরু করে নি। আর তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও স্মরনশক্তির অধিকারী মোহাম্মদ দীর্ঘ সময় ধরে আশপাশে থাকা ইহুদী ও খৃষ্টানদের কাছ থেকে তাদের কিতাবের কাহিনী শুনেছে আর মুখস্ত করেছে আর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিভাবে তার নিজের কিতাব রচনা শুরু করবে।
আসলে বিষয়টা হলো অন্যত্র। বাইবেলকে বিশ্বাস করলে ইসলাম এর কোন ভিত্তি থাকে না। কারন বাইবেল অনুযায়ী, নবী আসার কথা ইসরাইলি বংশধর থেকে যা বার বার তাতে বলা আছে। কিন্তু মোহাম্মদ এসেছে ইসমাইলের বংশধর থেকে যারা ইসরাইলিয় নয়, বরং আরবীয়। সুতরাং বাইবেল অনুযায়ী, মোহাম্মদ অবশ্যই ভূয়া নবী ও তার ইসলামও ভূয়া। ঠিক এ বিষয়টি ইসলামী পন্ডিতরা খুব ভালভাবেই জানে বলে- জোর করে প্রচার করতে হবে বাইবেল বিকৃত। অথচ খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে সংকলিত বাইবেলের পান্ডুলিপি এখনও যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বিশেষ করে বাইবেলের পুরাতন নিয়ম নবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানীর বিষয়টি যাতে আছে, তা যীশুর জন্মেরও আগে সংকলন করা হয় আর যা তখন থেকেই হুবহু এক আছে আর তা ইহুদীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন গ্রন্থ। একে তৌরাতও বলা হয়। ইহুদীরা ভালমতোই জানে যে মোহাম্মদ আসার আগেই তাদের তৌরাত সংরক্ষিত করা হয়েছিল যা মোহাম্মদের সময় সেই মক্কা বা মদিনার ইহুদীদের কাছেও ছিল, এমন কি ইহুদীদের কোন কোন বিবাদ মোহাম্মদ তৌরাতের পাতা খুলে সমাধানও দিয়েছে, সে কারনে ইহুদীরা খুব ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে তাদের কিতাব অনুযায়ী মোহাম্মদ কোন ক্রমেই নবী হতে পারে না। অথচ মোহাম্মদ দাবী করছে সে নবী। মোহাম্মদও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে ইহুদীদেরকেই প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে আর সেকারনেই কোরান ও হাদিসের পাতায় পাতায় ইহুদীদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, খোদ মোহাম্মদ ক্ষমতা হাতে পেয়ে নিজ হাতেই তা সমাধা করার চেষ্টা করেছে, তারপর তার অনুসারীরাও তা চালিয়ে গেছে তার মৃত্যুর পর। কিন্তু ইহুদীরা শেষ হয়ে যায় নি, ধ্বংস হয়নি তাদের তৌরাত। আর তাই তো সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ছে ক্রমশ:।

কোরান কি অলৌকিক গ্রন্থ? – ১,২

লিখেছেন |

মুসলমানদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কোরান। তারা বিশ্বাস করেন এটি স্বয়ং আল্লাহ নবী মুহাম্মদের কাছে বিভিন্ন পদ্ধতিতে নাযিল করেছেন। প্রায় সকল মুসলমানই বিশ্বাস করেন যে কোরান অবতরণের পর থেকে তাতে আজ পর্যন্ত কোনো বিকৃতি ঘটে নাই এবং তা লওহে মাহফুজে যেমন রয়েছে ঠিক সেই অবস্থায় বর্তমানে রয়েছে – এসব বিশ্বাসের সমর্থনে কোরানে অজস্র আয়াত রয়েছে। এটা হল কোরানের অলৌকিকতায় বিশ্বাসীদের কথা। এবার কোরানের অলৌকিকতার দাবি কতটা যৌক্তিক সে আলোচনায় আসা যাক।
কোরানের অলৌকিকতাঃ প্রমাণের দায়িত্ব কার
ধরুন, আকমল সাহেবের কাছে একশ’টি বই আছে। এবার তিনি এর মধ্য থেকে একটি বই বের করে বললেন, ‘এই বইটি আল্লাহ দ্বারা রচিত আর বাদবাকি নিরানব্বইটি মানুষের দ্বারা রচিত’। এখন একটু ভাবুন- এর প্রত্যুত্তরে আকমল সাহেবকে কি বলা যেতে পারে। একজন যুক্তিবাদী প্রথমেই তার কাছ থেকে জানতে চাইবেন তিনি কিভাবে ওটা আল্লাহ প্রদত্ত বলে নিশ্চিত হলেন। এটা জানতে চাইলে আকমল সাহেব বলতে পারেন ‘আপনিই বরং প্রমাণ করুন ওটা আল্লাহ রচিত নয়’। আমরা প্রায়ই ধর্মবিশ্বাসীদের কাছ থেকে এধরণের হাস্যকর উদ্ভট কথাবার্তা শুনে থাকি। তাদের কথা হলো আমরা নাস্তিকরা যেহেতু আল্লাহতে বিশ্বাস করি না, ধর্মে বিশ্বাস করি না তাই আমাদেরকেই এগুলো অপ্রমাণ করতে হবে। কিন্তু যা প্রমাণ করা যায় নি তা তো এমনিতেই অগ্রহণযোগ্য, একে কি আলাদাভাবে অপ্রমাণ করার প্রয়োজন আছে?
এবার কোরানের ক্ষেত্রে আসি। বই মানুষ লিখবে এটাই স্বাভাবিক। এখন কেউ যদি কোনো বই কো্নো অলৌকিক সত্তার দ্বারা রচিত বলে দাবি করেন তবে স্বাভাবিকভাবেই তা প্রমাণ করার দায়িত্ব ঐ দাবিকারকের। একজন আকমল সাহেব বা অন্য কেউ কোনো একটা গ্রন্থকে আল্লাহ প্রদত্ত বলে দাবি করলে তা অপ্রমাণের দায়িত্ব অন্য কারো উপর পড়ে না এবং তিনি যদি তার দাবি প্রমাণে ব্যর্থ হোন বা তার দেয়া প্রমাণ ভুল বলে প্রমাণিত হয় তবেই তার দাবি অগ্রহণযোগ্য – এ সহজ কথাটি বুঝার জন্য যদিও গভীর চিন্তার প্রয়োজন নেই তারপরেও ধর্মবাদীরা বরাবরই তা না বুঝার ভান করেন এবং নিজের প্রমাণের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চেপে দিয়ে নিরাপদ থাকতে চান। আপনিই বরং প্রমাণ করুন ওটা আল্লাহ প্রদত্ত নয়- এ ধরণের অজুহাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় কেননা এতে করে যে কেউ নিজের রচিত বই বা অন্য কারো লেখা বইকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা অন্য কোনো কারণে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে দাবি করতে পারেন এবং তা প্রমাণ করতে না পেরে এ ধরণের ছুঁতো ধরতে পারেন এবং সবচেয়ে বড় কথা – কোনো ধর্মগ্রন্থ আল্লাহ প্রদত্ত নয় তা প্রমাণ করা যুক্তিবাদীদের দায়িত্ব নয়; যুক্তিবাদীদের দায়িত্ব হলো এ পর্যন্ত ঐ গ্রন্থকে আল্লাহ প্রেরিত বলে প্রমাণের জন্য প্রদত্ত যুক্তিগুলো খণ্ডন। তবে কোরানের যেহেতু বস্তুগত অস্তিত্ব আছে তাই যুক্তিবাদীদের কাছে কোরানকে আল্লাহ প্রদত্ত নয় বলে প্রমাণের পন্থা উন্মুক্ত রয়েছে।
মোট কথা, কেউ যদি কোরানকে আল্লাহর দ্বারা রচিত বলে দাবি করেন তবে-
১। এ দাবি প্রমাণ করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তারই। তাকে কোরানের সব বাক্য ও শব্দ আল্লাহ রচিত এবং কোরানের সাথে অন্য কিছুর সামান্যতম মিশ্রণও ঘটে নি বলে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে।
২। যেহেতু তিনি কোরানকে আল্লাহর রচিত বলে দাবি করছেন তাই সর্বাগ্রে তাকে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে, বলা বাহুল্য এ পর্যন্ত আল্লার আস্তিত্বের স্বপক্ষে যেসব যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে তার সবগুলোই খণ্ডিত হয়েছে। এ নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করা যাবে।
৩। আল্লাহ ঠিক কোন্ প্রক্রিয়ায়, কখন, কিভাবে কোরান মানুষের কাছে পাঠালেন এবং কেন পাঠালেন, তা যে উদ্দেশ্যে পাঠালেন তা কতটা সফল হয়েছে এগুলোর উপযুক্ত ব্যাখ্যা তাকে দিতে হবে।
৪। মানুষ নবী ও রাসূল হতে পারে আর মুহাম্মদ নবী ও রাসূল ছিলেন –এ বিষয়টিও তাকে প্রমাণ করতে হবে। আরো প্রমাণ করতে হবে- মুহাম্মদ দীর্ঘ ২৩ বছর পুরো মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন এবং কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে বা বাধ্য হয়ে বা পরিস্থিতির শিকার হয়েও নিজের বা অন্য কারো রচনাকে ওহী বা প্রত্যাদেশ বলে ঘোষণা দেন নি।
৫। যেহেতু কোরান অবতীর্ণ হওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা তাই অলৌকিক ঘটনা বাস্তবে ঘটতে পারে তা তাকে প্রমাণ করতে হবে।
এছাড়া মুসলমানরা বিশ্বাস করেন জিবরাইল ফেরেশতা আল্লার কাছ থেকে মুহাম্মদের কাছে ওহী নিয়ে আসতেন। তাই জিবরাইলের অস্তিত্বও তাদেরকেই প্রমাণ করতে হবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোসহ কোরানের অলৌকিকতা সম্পর্কিত সবগুলো বিষয় যতক্ষণ কোরানের অলৌকিকতার দাবিদাররা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারছেন ততক্ষণ একজন যুক্তিবাদীর কোরআনকে অলৌকিক বলে মেনে নেয়ার কোন সংগত কারণ নেই।
ওহী অবতরণ পদ্ধতি ও কিছু কথা
কোরান আল্লার বাণী? ভালো কথা, ওটা তবে মুহাম্মদের কাছে এলো কিভাবে? এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর কিভাবে কোরানের অলৌকিকতায় বিশ্বাসীরা দিতে চেয়েছেন তা আলোচনা প্রয়োজন।
কোরান নাকি পুরো ২৩ বছরে মুহাম্মদের উপর অবতীর্ণ(?) হয়েছে। কিভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তার বিচিত্র বিবরণ রয়েছে ইসলামে। এগুলো এতই উদ্ভট যে একজন যুক্তিবোধ সম্পন্ন মানুষের কাছে তা ‘ফেয়ারি টেল’ ব্যতীত আর কিছু মনে হওয়ার অবকাশ নেই। আমরা এখন কোরান নাযিলের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে জানব। এখানে এ, বি, এম, আব্দুল মান্নান মিয়া ও আহমদ আবুল কালামের লেখা “উচ্চ মাধ্যমিক ইসলাম শিক্ষা, দ্বিতীয় পত্র” – এ বর্ণিত বিভিন্ন প্রকার ওহী অবতরণ পদ্ধতি ও তার ব্যাখ্যা নিচে হুবহু তুলে দেয়া হলো-
১।সত্য স্বপ্ন
নবী রাসূলগণের স্বপ্নও ওহী। বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহর অনেক প্রত্যাদেশ বা ওহী লাভ করেছেন স্বপ্নের মাধ্যমে। এই স্বপ্নকে বলা হয় সত্য বা বাস্তব স্বপ্ন। এ এমনই স্বপ্ন যা অবাস্তব হয় না বা বিফলে যায় না। হযরত আয়েশা (রা) ইরশাদ করেন, রাসুলুল্লাহ (স) এর উপর ওহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তাঁর জাগতিক পর্যায়ের স্বপ্ন দ্বারা তিনি অবহিত হতে পারেন যে যথাশীঘ্র তার উপর আল্লাহর প্রত্যক্ষ ওহী কুরআন অবতীর্ণ হবে। রাসূলুল্লাহ (স) মাদানী জীবনে যে স্বপ্ন দেখেন তা কুরআনে এসেছে এভাবেঃ
আল্লাহ তার রাসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন যে তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে……(সূরা আল ফাতহ)
হযরত ইব্রাহিম (আ) তার পুত্র ইসমাঈল (আ) কে কুরবানী করার আদেশও লাভ করেছিলেন স্বপ্নের মাধ্যমে। আরো অনেক নবী স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী লাভ করেছেন বলে জানা যায়।
২। ঘণ্টা ধ্বনি পদ্ধতি
ঘণ্টা ধ্বনি পদ্ধতিতে মহানবী (স)- এর উপর ওহী নাযিল হত। ওহী নাযিল হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত হতে তাঁর কানে এ ঘন্টা ধ্বনি বাজতে থাকত। তাঁর কাছে উপস্থিত কোন কোন সাহাবীও এ ঘন্টা ধ্বনি শুনেছেন বলে জানা যায়। হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিছ ইবনে হিশাম রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করেন-
হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট কিভাবে ওহী আসে? এর উত্তরে তিনি বলেন-
কখনও কখনও আমার নিকট ওহী আসে ঘন্টা ধ্বনির মত। এ প্রকার ওহী আমার খুবই কষ্টকর মনে হয়। তবুও সে (জিবরাঈল আ) যা বলে আমি তা তাৎক্ষণিক আয়ত্ত করি।
এই ঘন্টা ধ্বনি কিসের ধ্বনি সে বিষয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, এটি আল্লাহর কথা বলার ধ্বনি। কেউ বলেছেন, এটি জিবরাঈল (আ)- এর পা বা ডানার ধ্বনি ইত্যাদি। শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ) বলেছেন, মানুষের বাহ্য ইন্দ্রীয় পার্থিব জীবন হতে পৃথক করা হলে নৈসর্গিকভাবেই উক্তরূপ ঘন্টা ধ্বনি শোনা যেতে পারে।
৩। অন্তর্লোকে ঢেলে দেওয়া পদ্ধতি
রাসুলুল্লাহ (সা)- এর ‘ইলক্বায়ি ফিল ক্বালব’ বা অন্তরে ওহী সঞ্চারণ পদ্ধতি নামেও অভিহিত করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এ বিষয়ে ইরশাদ করেন,
রুহুল কুদুস জিবরাঈল (আ) আমার অন্তর্লোকে ঢেলে দিয়েছেন বা সঞ্চারিত করেছেন বা ফুঁকে দিয়েছেন।
এক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা)- এর অন্তরে তার ওহী সরাসরি সঞ্চার করেন নিজ ক্ষমতা বলে। যেভাবেই হোক রাসূল (সা) খুবই কম কসরতে এ প্রকার ওহী তার অন্তর্লোকে আপনা আপনি প্রস্তুতভাবে লাভ করে থাকেন।
৪।ফেরেশতার মানবাকৃতিতে আগমন
ফেরেশতাগণের নিজ নিজ আকৃতি রয়েছে। হযরত জিবরাঈল নিজ আকৃতিতে প্রকাশিত হন আবার কখনও কখনও মানব আকৃতিতেও প্রকাশিত হন রাসূল (সা)এর নিকট। সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় হযরত জিবরাঈল (আ) মানুষরূপে রাসূলুল্লাহ (সা) –এর নিকট এসে আল্লাহর ওহী পৌঁছে দিতেন। সিংহভাগ ক্ষেত্রে সাহাবিগণ উক্ত মানুষটি দেখতে পেতেন কিন্তু বুঝতে পারতেন যে উক্ত মানুষটি আসলে মানুষ নয় ফেরেশতা। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (রা) এর আকৃতিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফেরেশতে ওহী নিয়ে আসতেন। অন্য সাহাবী বা অপরিচত লোকের আকৃতিতেও ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসতেন।
৫। নিজ আকৃতিতে ফেরেশতার আগমন
আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈল (আ) –কে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছে সে আকৃতিতেও তিনি রাসূল (সা) –এর নিকট ওহী নিয়ে আসতেন বলে জানা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা) কুরআনের প্রথম ওহী যখন গারে হেরায় লাভ করেন তখন হযরত জিবরাঈল (আ) নিজ আকৃতিতে আগমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) দুবার বা তিন বার তাঁকে তাঁর নিজ আকৃতিতে দেখেছেন বলে জানা যায় (১) একবার গারে হেরায় (২) একবার মিরাজকালে সিদরাতুল মুনতাহায় (৩) আরেক বার ওহী বন্ধের পরে পুনঃ ওহী চালুর সময়।
৬। পর্দার অন্তরাল হতে
মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স) –এর প্রতি তার জাগ্রতকালে পর্দার আড়াল হতে সরাসরি ওহী করেছেন। পর্দার অন্তরালে আল্লাহ কথা বলেছেন পর্দার বাইরে মুহাম্মদ (স) –এর সংগে। মিরাজ রজনীতে আল্লাহ এরূপ রাসূল (স) –এর সংগে কথা বলেছেন বলে জানা যায় এবং এ পদ্ধতিতেই তার প্রতি প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত এবং পরবর্তী পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান অবতীর্ণ ও ফরজ হয় এই মিরাজ রজনীতে।
৭। তন্দ্রাকালে ওহী লাভ
রাসুলুল্লাহ (স) যেমন জাগ্রত অবস্থায় ওহী পেয়েছেন তেমন পেয়েছেন নিদ্রিত অবস্থায়। একটি রিওয়ায়াত হতে জানা যায় যে রাসূল (স) এ পদ্ধতিতে সাতবার ওহী পেয়েছেন।
৮। হযরত ইসরাফীল (আ) –এর মাধ্যমে ওহী লাভ
আল্লাহ তাআলা কখনও কখনও হযরত ইসরাফীল (আ) –এর মাধ্যমে রাসূল (স)-এর নিকটে ওহী পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। খুব কমই তিনি ওহী নিয়ে এসেছেন।
ওহী অবতরণ পদ্ধতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে আল্লাহ তার সংগে বাক্যালাপ করবেন সরাসরী ওহী ব্যতীত কিংবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত কিংবা দূত প্রেরণ ব্যতীত অতঃপর উক্ত দূত (মানুষের নিকট) তাঁর ইঁচ্ছা মাফিক তার প্রত্যাদেশ পৌছে দিবে তার অনুমতিক্রমে। হযরত হারিছ ইবন হিশাম (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) –এর নিকট ওহী আসার পদ্ধতি জিজ্ঞাসা করলে রাসূল (স) বলেনঃ
কখনও আমার নিকট ওহী আসত ঘন্টা ধ্বনির মত। এটি আমার উপর অত্যন্ত কষ্টকর মনে হয়। এতে আমার ঘাম বেরিয়ে যায়। তবুও ফেরেশতা যা বলে আমি তা তাৎক্ষণিকভাবে আয়ত্ত করে লই। কখনও কখনও ফেরেশতা আগমন করে পুরুষের আকৃতিতে। অতঃপর সে আমার সংগে বাক্যালাপ করে। সে যা বলে আমি তা তাৎক্ষণিকভাবে আয়ত্ত করে লই। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি দেখেছি যে তাঁর (রাসূল (স)-এর) উপর ওহী আসে কঠিন শীতের দিনে, এতে তাঁর কষ্ট ও উষ্ণতাপ অনুভূত হয় আর তখন তাঁর ললাট হতে টপ টপ করে ঘাম ঝরে পড়ে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)”
(পৃষ্টা ২৬-২৮; চতুর্থ সংস্করণঃ জুন,২০০৫; প্রকাশকঃ হাসান বুক হাউসের পক্ষে ডঃ মোহাম্মদ আবুল হাসান, ৬৫, প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০)
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থ ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ এর ওহী অবতরণ সম্পর্কিত অংশ –

ওহী অবতরণের উক্ত পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। উপরের বর্ণনায় দেখলাম মুহাম্মদ স্বপ্নকেও ওহী বা প্রত্যাদেশ বলে মনে করেছেন বা চালিয়ে দিয়েছেন। এটি অবশ্য খুব নিরাপদ একটা পদ্ধতি – কেউ কোন প্রশ্ন করার অবকাশ নেই। কেউ যদি নিজে কিছু রচনা করে তা স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী হিসেবে পেয়েছেন বলে দাবী করেন তবে তা প্রমাণিত হবে কিভাবে? (আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কবিরাজ যারা স্বপ্নে পাওয়া গাছ-গাছড়ার সাহায্যে চিকিৎসা করেন তাদের কাছে গেলে হয়ত বিষয়টি বোধগম্য হয়ে উঠত!)
ঘণ্টা ধ্বনি পদ্ধতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা মানসিকভাবে অসুস্থ, মৃগী রোগী বা হিস্টিরিয়াগ্রস্থ তাদের এরকম হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। তখনকার সময়ে মৃগী রোগকে পবিত্র বলে মনে করা হত। তাই মুহাম্মদ যদি মৃগী রোগ বা এ ধরণের কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তবে তা তাকে নবী হওয়ার ক্ষেত্রে এবং কোরানকে অলৌকিক বলে প্রচার করতে সহায়ক হয়েছিল। আরো কিছু বিষয় মুহাম্মদের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে, যেমন- সিনা সাকের ঘটনা- ফেরেশতারা তার বুকের রক্ত যা শয়তানি প্রণোদনার উৎস তা নাকি বুক চিরে কয়েকবার পানি দিয়ে ধুয়ে দিয়েছিলেন(বলাবাহুল্য ধারণাটি হাস্যকর, সিনাসাক করে পাপচিন্তা দূর করা অসম্ভব, এর জন্য প্রয়োজন ব্রেন সাক!!), কথিত ওহী নাযিলের সময়ে অস্বাভাবিক আচরণ- অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া তারপর সবাই তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিত ইত্যাদি। এছাড়া ওহী নাযিল পদ্ধতিটি যদি আল্লাহ নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে তাতে মুহাম্মদের কষ্ট বা বিভিন্ন ধরণের বিপত্তি হওয়ার কারণ কি? দেখেন ঘণ্টা ধ্বনি পদ্ধতিটি তার কাছে নাকি খুব কষ্টকর ছিল। কোরান যেহেতু বরকতময় এবং প্রশান্তিদায়ক তাহলে ওটা নাযিল হলে মুহাম্মদের আরাম অনুভব হওয়াই যৌক্তিক ছিল। শোনা যায়, কোরান যদি পাহাড়ে নাযিল হত তবে তা নাকি ধ্বংস হয়ে যেত আর কোরান নাযিল হওয়ার সময় মুহাম্মদ উটের উপরে থাকলে তা নাকি ভারের আধিক্যে অস্থির হয়ে উঠত। কোন গ্রন্থকে মহিমান্বিত করতে এত বিচিত্র প্রচার আসলেই অনন্য। উপরের বর্ণনায় ঘণ্টা ধ্বনিটি কিসের তার যে বিবরণ বিভিন্ন বুজুর্গ দিয়েছেন তা বড়ই মনোরম। কোরান অবতরণের ঘণ্টা ধ্বনি পদ্ধতিটি শুরু থেকেই অমুসলিমদের হাসির খোরাক যোগিয়ে আসছে।
অন্তর্লোকে ঢেলে দেয়া পদ্ধতিটি আরো চমৎকার। কারো যদি হঠাৎ কিছু মনে আসে আর তারপর তিনি মনে করেন তা আল্লাহর ওহী এবং তা পরবর্তীতে কাব্যে রূপ দিয়ে উপস্থাপন করে একে ওহী বলে দাবী করেন তবে তা নিয়ে কিছু বলার নেই। এ পদ্ধতিটিও পরম সুবিধাজনক। কারণ সত্যি সত্যি ওহী নাযিল হয়েছে কি না তা প্রমাণ করার কোনো ঝামেলা আর রইল না।
আরেকটি উদ্ভট পদ্ধতি হল ‘ফেরেশতার মানবাকৃতিতে আগমন’। ফেরেশতারা মানবাকৃতি ধারণ করে নাকি মুহাম্মদকে বিভিন্ন মেসেজ দিতেন। আমাদেরকে দেখতে হবে এ মানুষগুলো কারা ছিল। একজন সম্পর্কে জানলাম যার নাম ছিল দাহিয়াতুল কালবী। লোকটির সাথে মুহাম্মদের কি বিশেষ সম্পর্ক ছিল? ফেরেশতার মানবাকৃতিতে আসার প্রয়োজনটাই বা কি ছিল আর মাঝে মাঝে দাহিয়ান কালবী এর রূপ ধারণের কারণ কি ছিল তা কিছুটা ভাবলেই আঁচ করা সম্ভব।
এবার নিজ আকৃতিতে ফেরেশতার আগমন। ফেরেশতাদের নাকি নিজস্ব আকৃতি রয়েছে যদিও তারা যেকোন কিছুর আকৃতি ধারণ করতে পারেন। ফেরেশতাদের নিজস্ব আকৃতির রকমারি বর্ণনা শুনতে পাওয়া যায়। কারো কারো আকার নাকি এত বড় যে পৃথিবীর সব জল ঢেলে দিলেও একফোটা জল দেহ থেকে বেয়ে পড়বে না, কারো কারো রয়েছে হাজার হাজার ডানা, কারো আবার প্রতিটি পশমেই মাথা, হাত, পা সংযুক্ত ইত্যাদি। ফেরেশতারা ডানা দিয়ে কি করে তা বুঝা বেশ মুশকিল, কারণ বায়ুমণ্ডলের পরেই তো আর বাতাস নেই। বলাবাহুল্য ইসলামে এত অতি উদ্ভট ‘ফেরেশতা’ ধারণাটি কিভাবে আসল তা জানতে খুব একটা গবেষণা প্রয়োজন নেই; জ্বিন, ভুত, ফেরেশতা – এগুলোর ধারণা আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ’ বছর আগে আরবে বহুল প্রচলিত ছিল।
জিবরাইলকে রেখে ইসরাফিল ওহী নিয়ে কেন আসত তা বুঝা দুষ্কর। ইসরাফিল তার শিঙ্গার ডিউটি রেখে ওহী নিয়ে আসলেন –বিষয়টি কি অস্বাভাবিক নয়?
পর্দার অন্তরাল হতে কেনো ওহী নাযিল করতে হয় ওটাও বোধগম্য নয়। মুহাম্মদের সম্মুখে আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করলে সমস্যা কি ছিল? অনেকে হয়ত বলবেন মুহাম্মদ তা সহ্য করতে পারবেন না। কিন্তু কথা হলো –আল্লাহ তো ইচ্ছে করলেই সে ক্ষমতা মুহাম্মদকে দিতে পারতেন। আরেকটি ব্যাপার ঠিক পরিষ্কার হলো না- এ পর্দাটি কিসের পর্দা? আর পর্দার অন্তরাল হতে আল্লাহ যদি ওহী পাঠাতে পারেন তবে জিবরাইলকে দিয়ে পাঠালেন কেন? আল্লাহ যদি সব জায়গায় আছেন তবে মুহাম্মদকে কেন মেরাজে রজনীতে উর্ধ্বলোকে নিয়ে গিয়ে আল্লাহ পর্দার অন্তরাল হতে তার সাথে আলাপ করলেন তা বুঝা একদম অসাধ্য ব্যাপার!(মেরাজ কিন্তু রাতের বেলায়ই হয়, দিনের বেলায় যদি হয় আর মানুষ দেখে ফেলে তবে তার আর মাহাত্ম্য থাকল কোথায়?)
তন্দ্রাকালে ওহী লাভ? মাঝে মাঝে জটিল চিন্তায় আচ্ছন্ন হলে যদি তন্দ্রা ভাব আসে আর তখন যদি কিছু নতুন আইডিয়া মাথায় আসে তাহলে এগুলোকে কি ওহী বলতে হবে?
আরো বেশ কিছু প্রশ্ন মাথায় এসে ভর করে। যেমন- আল্লাহ সরাসরি বা জিবরাইলের মাধ্যমে নবী-রাসূলদের সাথে যেমন যোগাযোগ করতেন সেরকমভাবে সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ করলে সমস্যা কোথায়? অনেকে বলবেন, তাতে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করার যে ব্যবস্থা নিয়েছেন তা ব্যাহত হবে। আমরা বলব, তাতে বরং মানুষের পরীক্ষা নেয়া বাস্তবসম্মত হত কেননা এতে করে মানুষ আল্লার সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ধর্মসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর সমাধান পেত ও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার একটা উপায় খূঁজে পেত এবং এতে করে ধর্ম না মানার জন্য পরকালের অবর্ণনীয় শাস্তির কিছুটা হলেও যৌক্তিকতা থাকত।
(ওহী অবতরণ সম্পর্কিত বেশ কিছু হাদিস পাবেন প্রধান হাদিসগ্রন্থ বোখারিতে; লিংক-
http://www.usc.edu/org/cmje/religious-texts/hadith/bukhari/
বোখারি এর ওহী অবতরণ সম্পর্কিত হাদিসগুলোঃ
Volume 1, Book 1, Number 2; Volume 1, Book 1, Number 3; Volume 1, Book 1, Number 4; Volume 4, Book 52, Number 95; Volume 4, Book 54, Number 438; Volume 4, Book 54, Number 458; Volume 4, Book 54, Number 461; Volume 5, Book 59, Number 618; Volume 5, Book 59, Number 659; Volume 6, Book 60, Number 447; Volume 6, Book 60, Number 448; Volume 6, Book 60, Number 478; Volume 6, Book 60, Number 481; Volume 6, Book 61, Number 508;
এগুলো ভিন্ন ওহী অবতরণ সম্পর্কিত আরো অনেক হাদীস বোখারি সহ সিহাহ সিত্তাহ এর অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে পাওয়া যাবে।
অন্যান্য হাদিসগ্রন্থ পাবেন- http://www.usc.edu/org/cmje/religious-texts/hadith/
বোখারি এর বাংলা অনুবাদ – http://www.banglakitab.com/BukhariShareef.htm



কোরান কি অলৌকিক গ্রন্থ? -২

কোরানের অলৌকিকতা প্রমাণে প্রদত্ত যুক্তিগুলো খণ্ডনঃ
কোরানকে বিশ্বাসীরা নানাভাবে অলৌকিক বলে প্রমাণ করতে চান। তাদের দেয়া যুক্তিগুলো এখানে উপস্থাপন করে খণ্ডন করা হলো।
১। কোরান সর্বশ্রেষ্ট গ্রন্থ। আজ পর্যন্ত কেউ কোরানের মত কোনো গ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম হয় নাই। সুতরাং এটা আল্লাহর রচিত।
এ যুক্তিটি কোরান থেকে আহরিত। নিম্নোক্ত আয়াত তিনটি মনোযোগ সহকারে পড়ি-
“তারা যদি (তাদের দাবিতে) সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে কোরানের মত কোনো গ্রন্থ তারা রচনা করুক”(সূরা তূরঃ ৩৪)
“আপনি বলে দিন, “কোরানের অনুরূপ কোন কিছু রচনা করার জন্য যদি সকল মানুষ ও জিন একত্রিত হয় ও তারা পরস্পর সহযোগিতা করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কোন কিছু রচনা করতে পারবে না”(সূরা বনি ইসরাঈলঃ৮৮)
“আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তার অনূরুপ কোন সূরা আনয়ন কর এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহবান কর। যদি তোমরা আনয়ন না কর এবং কখনই পারবে না, তবে ভয় কর সেই আগুনকে, মানুষ ও পাথর হবে যার ইন্ধন, কাফিরদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে”(সূরা বাকারাঃ ২৩, ২৪)
এবার মূল আলোচনায় আসি। কোরানের শ্রেষ্টত্বের এই দাবি কতটা হাস্যকর তা যেকোনো যুক্তিবাদিই উপলব্ধি করতে পারবেন। আসলে আমার গ্রন্থই শ্রেষ্ট, এর মত গ্রন্থ রচনা সম্ভব নয় এ ধরণের দাবির কোনো অর্থই হয় না। যখন কোরানেই এধরণের দাবি থাকে তখন তা একে কতটা নিম্নমানের দিকে নিয়ে যায় তা ভাববার বিষয়। কোরান শ্রেষ্ট গ্রন্থ- এর মত কোনো গ্রন্থ রচনা অসম্ভব এরকম দাবী কেউ করলে যে প্রশ্ন সর্বাগ্রে চলে আসে তাহলো কোন দিক থেকে কোরান শ্রেষ্ট? কিসের দিক থেকে কোরান অনন্য? আর কে কিভাবে কোরানের এই শ্রেষ্টত্ব নিরুপণ করেছেন ?
বিষয়বস্তুর দিক থেকে কোরান আন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোর মতই খেলো। কিছু বিষয় আমরা বিবেচনা করি-
>ছন্দ- কোরানকে খু-উ-ব ছন্দময় গ্রন্থ বলতে শুনি অনেককে। এই ছন্দময়তার বিষয়টি কোরানের বেলায় একেবারেই খাটে না। সূরা নাসে আমরা দেখতে পাই প্রতিটি আয়াতের শেষে “স” রয়েছে, এটি উন্নতমানের কোনো ছন্দ বলা যায় না কারণ এই ধরণের ছন্দ একঘেয়েমির সৃষ্টি করে এবং তা একে নিছক নিম্নমানের পদ্য বা ছন্দবন্ধ ছড়ার মত করে তোলে। এছাড়া কোরানের বেশির ভাগ আয়াতে এই ছন্দ-বদ্ধতাটাও নেই। আর ছন্দ থাকা অলৌকিকতার প্রমাণ নয়- মানুষ অজস্র ছন্দময় কবিতা-ছড়া-গান রচনা করেছে। আমাদের সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দের জাদুকর হিসাবে বিখ্যাত, তিনি কখনো তার এই ছন্দ বা ছন্দ প্রতিভা অলৌকিক ভাবে পেয়েছেন বলে দাবি করেন নাই।
> সুরেলা- কোরান নাকি খুব সুরেলা গ্রন্থ। কোরান যেহেতু একটা গ্রন্থ এবং “সুর” বিষয়টি কৃত্রিম বা মানুষ আরোপিত তাই এটি কোরানের মৌলিক ধর্ম নয়। কোরান যখন সুর করে পড়া হয় তখন তা বিশ্বাসীদের আবেগে সুড়সুড়ি দেয় তাই তারা আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন। কোরানের সুরে ইচ্ছে করলে আরবি গালিও পাঠ করা সম্ভব এবং বলাবাহুল্য আমি নিজেই পরীক্ষা করে দেখেছি যিনি কোরানের অলৌকিকতায় বিশ্বাসী অথচ জানেন না ইহা কোরানের অংশ নয় তিনি এতে কোরান পাঠ শোনার সময়ের মতই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। আর কোনো কিছু সুরেলা হওয়াটা পাঠক বা গায়কের অবদান। এটা তো ঐশ্বরিক না বা আল্লা কোরানকে অডিও আকারে মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন এমনও তো না। এছাড়া কেউ যদি হেড়ে গলায় কোরান পাঠ করে তবে তা যতই শুদ্ধ হোক না কেন বিরক্তির উদ্রেক করে। তাই “কোরান তেলওয়াত শুনলেই মনে হয় তা অলৌকিক গ্রন্থ” এরকম দাবিরও কোনো অর্থই হয় না। এছাড়া কোরান শুনলেই বা পড়লেই যদি কারো একে অলৌকিক বলে মনে হয় তবে তাও একে অলৌকিক বলে প্রমাণ করে না। এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির কাছে ঠিক কোন কারণে একে অলৌকিক বলে মনে হচ্ছে তা-ই গবেষণার বিষয়।
কেউ যদি আপনাকে ওমর খৈয়ামের কবিতার মত কবিতা লেখতে বলে আপনি তাকে কি বলবেন? কেউ যদি চর্যাপদকে অলৌকিক বলে দাবি করে তবে এর জবাবে কি কেউ এ ধরণের কোনো গ্রন্থ রচনা করবে বা করতে যাবে? আল্লার যুক্তিবোধের এই নমুনা দেখে যে কেউ ভড়কে যেতে পারে। উপরের এক আয়াতে আল্লা বলছেন মানুষ ও জ্বীন সবাই মিলেও কোরানের মত কিছু রচনা করতে পারবে না। এ ধরনের কথার অর্থ উদ্ধারও একজন বোধ সম্পন্ন মানুষের জন্য দূরহ বঠে। আচ্ছা, মানুষ আর জ্বীন জাতি কিভাবে একত্রিত হবে আর কে তাদের একত্রিত করবে? কোরান রচনার জন্য সকল মানুষই বা এক হবে কেন? সকল মানুষের তো একসাথে মতিভ্রম হতে পারে না। আর কোরানে এমন কি আহামরি আছে যে ওটা নিয়ে এরকম উদ্ধত ও একগুঁয়ে দম্ভোক্তি করতে হবে? আর কোরানে সন্দেহকারীদের কি বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে দেখেন, “যদি তোমরা(সূরা রচনা করে তা) আনয়ন না কর এবং কখনই পারবে না, তবে ভয় কর সেই আগুনকে, মানুষ ও পাথর হবে যার ইন্ধন, কাফিরদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে”(উপরে আয়াতটি উল্লেখিত হয়েছে)। এই হলো পরম করুণাময়ের করুণাময়তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সন্দেহ করার প্রতি মানুষকে এভাবে হুমকি কোনো সভ্য সত্ত্বার কাছ থেকে আসতে আরে না। সন্দেহ করা মানুষের অনেক বড় গুণ, মানুষ যদি সন্দেহ করতে না পারত বা না করত তবে সভ্যতা কখনো এ পর্যায়ে আসতে পারত না, মানুষ সন্দেহ করতে পারে বলেই সে সত্যের কাছাকাছি পৌছতে পারে।
কেউ কোরানের মত কোনো গ্রন্থ রচনায় অক্ষম হলে তা কোরানকে অলৌকিক প্রমাণ করে না। যদি কেউ কোরানের মত কোনো গ্রন্থ রচনা করতে না পারে তবে হয়ত বলা যাবে কোরান “অনন্য” , এর লেখকরা সর্ব শ্রেষ্ট লেখক ইত্যাদি- কিন্তু এটা অলৌকিকতার প্রমাণ তো হতে পারে না।
কোরানের মত গ্রন্থ রচনা সম্ভব নয় বলে যারা দাবি করেন তাদেরকে উপযুক্ত জবাব দেয়া হয়েছে এই ভিডিওতে
httpv://www.youtube.com/watch?v=1fOIXwbVfVs
স্ক্রিপ্ট
Produce a Sura like it
২। কোরান সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস। আর তা আল্লার বাণী বা অলৌকিক গ্রন্থ বলেই সম্ভব।

এ ধরণের দাবি শুধু হাস্যকর নয় নির্বুদ্ধিতার পরিচায়কও বটে। কোরান যদি সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস তবে মানুষ কেন যুগ-যুগ ধরে জ্ঞান অর্জনের নেশায় এত শ্রম দিচ্ছে এমনকি জীবন পর্যন্তও দিয়ে দিচ্ছে। তাহলে তো সব কিছু বাদ দিয়ে একখান কোরান খুলে বসলেই যে কেউ সর্ব-জ্ঞানী হয়ে উঠত। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মুসলমান জাতিই সবার চেয়ে পিছিয়ে।
বিজ্ঞান কিছু আবিষ্কারের পর পরই আমাদের ধর্মগ্রন্থে ওটা আগে থেকেই ছিল এ ধরণের দাবি অনেক ধর্মাবলম্বীরাই করে থাকেন তবে মুসলমানরা এ বিষয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। খ্রিস্টানরা যতই বাইবেলের সায়েন্স অথবা হিন্দুরা বেদিক সায়েন্স নিয়ে লাফালাফি করুক না কেন মুসলমানদের কাছে সবাই এ বিষয়ে হার না মেনে উপায় নেই। বিজ্ঞান কোনো কিছু আবিষ্কারের পর পরই তা তারা কোরান থেকে অভিনব উপায়ে আবিষ্কার করেন কিন্তু তাদেরকে যদি আপনি শত অনুরোধ করেন যে বিজ্ঞান আজ যেসব বিষয় আবিষ্কার করতে পারছে না বা দূর ভবিষ্যতে যেসব বিষয় আবিষ্কার হবে তা কোরান থেকে আগেই খুঁজে বের করে দিতে তবে তা তারা পারবেন না।
যারা মনে করেন কোরান জ্ঞানের উৎস তাদের অনেককে আমি অনুরোধ করেছি কিছু উদাহরণ দেয়ার জন্য যে জ্ঞান তারা কোরান থেকে পেয়েছেন এবং যা অন্য কোনো উৎস থেকে জানা সম্ভব নয়, কিন্তু কেউ একটিও দেখাতে পারেন নি।
এছাড়া ধর্মগ্রন্থগুলোতে আদৌ কোনো জ্ঞান রয়েছে কি না তাও প্রশ্ন সাপেক্ষ কেননা যেকোনো জ্ঞানের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও দলিল যা ধর্মগ্রন্থগুলো সরবরাহে অক্ষম।
আরেকটি কথা, এমনকি কোনো শাস্ত্র যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস হয়ে যায় তবে তাও একে অলৌকিক বলে প্রমাণ করে না। বরং তা একে “জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস” বলেই প্রমাণ করে ।
সমস্যার বিষয় হল অধিকাংশ মুসলিমই ইসলাম পূর্ব মানুষের অগ্রগতি সম্পর্কে খুব কম জানে বা একেবারেই জানে না আর কোরান পরবর্তী সকল আগ্রগতিতে কোনো না কোনো ভাবে কোরানের অবদান রয়েছে বলে মনে করে। তারা আয়নীয় দার্শনিকদের কথা জানে না, তারা সক্রেটিস-এরিস্টটল-প্লেটোর অবদানের খবর রাখে না, ফিরাউনীয় সভ্যতার নামও শুনে নি, হিব্রু সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি তাদের কাছে অজানা কিছু ।
৩। কোরান যদি অলৌকিক গ্রন্থ না হত তবে তাতে অনেক পরস্পর-বিরোধী কথা বা অসঙ্গতি থাকত। কোরান যদি অলৌকিক গ্রন্থ না হত তবে তা বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হত না। যেহেতু কোরানে বিজ্ঞানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছুই পাওয়া যায় নি তাই এটি অলৌকিক গ্রন্থ।
এ কথাটিও কোরান থেকে উৎসরিত। কোরানে আছে,
“তারা কি কোরান অনুধাবন করে না? তা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষ থেকে নাজিল হত তবে তারা এতে বহু অসঙ্গতি পেত”। (সূরা-নিসাঃ৮২)
আবারো আল্লার যুক্তিবোধ দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। কোনো গ্রন্থ যদি আল্লা না লেখে তবে তাতে অসঙ্গতি পেতে হবে কেন? আল্লা ছাড়া যারাই বই লেখেছে তাদের বইতে কি নানা রকম অসঙ্গতি রয়েছে? আর কোনো গ্রন্থে অসঙ্গতি পেতে হলে ঐ গ্রন্থ সম্পর্কে নির্মোহ থাকতে হয়। যে গ্রন্থকে আপনি আল্লাহ প্রেরিত গ্রন্থ বলে গভীর ভাবে বিশ্বাস করেন এতে অসঙ্গতিপূর্ণ কিছু আছে বলে আপনি কি মনে করবেন বা মেনে নিবেন? একটা গল্প বলি- “এক লোক একবার বলেছিল সে কোনো একদিন সারা দিন ঘুমিয়েছিল। পরে দেখা গেল সে ঐ দিনে মোটেও ঘুমায় নি, রাত্রে ঘুমিয়েছিল। পরে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, আরে দিন তো সূর্যের আলো যুক্ত রাত। আমি দিনে ঘুমাই নি তো কি হয়েছে রাতে ঘুমিয়েছি। আর দুটোই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আমার কথার সত্যতা বুঝতে হলে তা বুঝার মত জ্ঞান থাকতে হবে”। এ ধরণের কথা শুনলে কি বলবেন? বস্তুত কোরানে অনেক পরস্পর বিরোধি কথা রয়েছে কিন্তু এগুলোকে ঐ গল্পের মত করে ব্যাখ্যা দেয়া হয়। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের সাথে একদল খোদার খাসী কোরানের বিভিন্ন শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে বিজ্ঞানময় করার মহান কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে রেখেছেন। এরা এতই নির্লজ্জ যে বিজ্ঞানের কোনো কিছু কোরানের সাথে সংঘাত তৈরী করলে সাথে সাথে শব্দের অর্থ-ব্যাখ্যা পরিবর্তন করবেন, নতুন অভিধান তৈরী করবেন, আধুনিক তফসির বানাবেন আর অবশেষে দাবি করবেন তাদের কোরানে সবই ছিল ঐ বিষয়টি বিজ্ঞান খোঁজে পাবার আগেই।
কোরানে প্রচুর অসংগতিপূর্ণ আয়াত আছে। কিন্তু এগুলো ধরলে ঈমানদাররা বলবেন, ‘ঊহা রুপক’, নতুবা বলবেন, ‘এই হুকুম রহিত করা হয়েছে ‘। রহিত বা মনসুখ আয়াত সম্পর্কে আপত্তি তোলা যায় এই বলে যে – এ হুকুম পরবর্তীতে রহিত হয়ে যাবে জেনেও আল্লা কেন এই আয়াত নাজিল করলেন, যেহেতু কোরান কিয়ামতের আগ পর্যন্ত সর্ব কালের জন্য অনুসরণ যোগ্য গ্রন্থ। আর কোরানে রুপকের এত প্রাদুর্ভাব কেন, কেন আল্লার সাহিত্যরস কোরান রচনার সময় এভাবে উছলে পড়ে বিরুপ হয়ে দাড়াল যে একে রুপক না বললে ইমান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে? আর দিনদিন কোরানের আয়াতগুলোকে যে হারে রুপক বানানোর হিড়িক পড়েছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে স্বয়ং আল্লার অস্তিত্বই রুপক হয়ে যায় কিনা কে জানে।
কোনো শাস্ত্রের অলৌকিকতায় অতিমাত্রায় বিশ্বাসে কারো যদি বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায় তাহলে আসলেই সমস্যা বটে। কেউ যদি কোনো পুঁথি শাস্ত্রে বিজ্ঞান রয়েছে বলে মাত্রাতিরিক্ত বিশ্বাস করেন তবে তা থেকেও বিজ্ঞান উদ্ধার করতে পারবেন।
এই আয়াতটি দেখেন-
আর আমি পাঠাইলাম নূহকে তাহার ক্বওমের প্রতি, অতঃপর তিনি উহাদের মধ্যে অবস্থান করিলেন পঞ্চাশ বৎসর কম এক হাজার বৎসর, অনন্তর প্লাবন আসিয়া তাহাদিগকে পাকড়াও করিল, বস্তুত তাহারা বড়ই অনাচারী লোক ছিল। (সূরা আনকাবুত, ২৯: আয়াত ১৪)
আয়াতটির “আলফা সানাতিন ইল্লা খামছিনা আ’মা” মানে হল –“পঞ্চাশ বৎসর কম এক হাজার বৎসর”। অর্থাৎ নূহ নূন্যতম ৯৫০ বৎসর বেচেছিলেন। (এই সানাতুন শব্দ থেকে বাংলা “সন” শব্দটি এসেছে)
আজ আমরা জানি মানুষ কখনো এত বৎসর বেচে থাকতে পারে না এবং ব্যাপারটা রীতিমত উদ্ভট। ইমানের জোরে কেউ যদি এ আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে চান যে নূহের উম্মতেরা ১২ মাসে বছর হওয়াটা জানত না, তারা অপেক্ষাকৃত কম দিনকে বছর বলে মনে করত তবুও এই ব্যাখ্যাটা ধোপে টিকে না। কারণ এখানে আল্লা বক্তা, তিনি তো ১২ মাসে বছর হওয়ার ব্যাপারটা জানতেন। আর তিনি এটাও জানতেন যে, তিনি যদি বলেন নূহ নূন্যতম ৯৫০ বছর বেচে থাকেন তবে আরবের মানুষেরা এর মানে কি বুঝবে, আরবের মানুষেরা ঠিকই ১২ মাসেই বছর পরিমাপ করত। ধরেন আমি কোনো এক দ্বীপে ৩ বছর কাঠিয়ে এলাম যা ওই দ্বীপের পশ্চাদ পদ বাসিন্দাদের হিসাবে ৫ বছর। এখন আমি কি ফিরে এসে সকলকে বলে বেড়াব যে, আমি ঐ দ্বীপে ৫ বছর ছিলাম? এছাড়া নূহের উম্মতেরা কম দিনে বছর পরিমাপ করত এ কথার একেবারেই কোনো প্রমাণ নেই এবং কোরানে কোথাও এ কথার উল্লেখ নেই।
আরেকটি আয়াত দেখেন-
আর তিনি এমন যে, সমস্ত আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করিয়াছেন ছয় দিনে, তখন তার আরশ(সিংহাসন) ছিল পানির উপরে(সূরা হূদ,১১: আয়াত ৭)
আয়াতটি একেবারেই সরল। এই আয়াতে “সিত্তাতি আইয়্যাম” বলতে সরলভাবেই ছয় দিন বুঝাচ্ছে আর “মাউন” মানে পানি। এবার প্রশ্ন, সৃষ্টির পূর্বে দিন এলো কোথা থেকে, পানিই বা এলো কোথা থেকে? আর সিংহাসন ছিল পানির উপরে শুনেই তো হাসতে হাসতে হাসপাতালে যাবার যোগাড়। আবার ধর্মবাদিরা তাদের ইমান ঠিকিয়ে রাখতে এই আয়াতের যেসব ব্যাখ্যা দেন তা এই আয়াতটি থেকে কম উপভোগ্য নয়।
আরো কিছু আয়াত বলি-
“আর তিনিই প্রতিরোধ করিয়া রাখিতেছেন আসমান সমূহকে পড়িয়া যাওয়া হইতে” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২: আয়াত ৬৫)
>>এত বড় নীল আকাশ কিভাবে উপরে কিভাবে ঠিকে থাকে তা তখনকার মানুষের জন্য একটা বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা ছিল। আল্লাহ চমৎকার ভাবে তাদের এ জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন। আবার কোরানে অন্যত্র বলেছেন –
“লোকদের উপর প্রতিষ্টিত আকাশমণ্ডলের প্রতি কি ওরা কখনও তাকিয়ে দেখে নি, কিভাবে আমরা সেটি নির্মাণ করেছি এবং সেটিকে চাকচিক্যময় বানিয়েছি এবং তাতে কোন ফাটল নেই(সূরা ক্বাফ, ৫০: আয়াত ৬)
>>হুম, কোনোই ফাটল নাই! এ জন্যই তো তিনি সর্বজ্ঞ আর মহান!
“তোমরা কি জাননা আল্লাহ কেমন ভাবে সাত আসমানকে স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (সূরা নূহ, ৭১: আয়াত ১৫)
>> আল্লা যে স্তরে স্তরে সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন তা আমরা জানব না কেন? আমরা না আল্ল্যা সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার গর্বিত ব্যান্দা।
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই উপযোগী যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা যিনি ফেরেশতাকে সংবাদবাহী বানান যাহাদের দুই দুইটি, তিন তিনটি ও চার চারটি পালক বিশিষ্ট ডানা আছে। (চারিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে) বরং তিনি সৃষ্টিতে যত ইচ্ছা অধিক করিয়া থাকেন(হাদিসে বর্ণীত আছে, জিবরাইলের ছয় শত ডানা রয়েছে), (সূরা ফাতির,৩৫: আয়াত১)
>>অতি উত্তম! তিনি সৃষ্টিতে যত ইচ্ছা অধিক করিয়া থাকেন!! ফেরেশতা সেমেটিক উর্বর মস্তিষ্কের বাজে চিন্তার ফসল। রাজাধিরাজ আল্লার মানুষের সাথে যোগাযোগের জন্য তো দূত প্রয়োজন!! তাই এই ফেরেশতার ব্যবস্থা। আর আল্লা কেন পাইক পেয়াদা ছাড়া সরাসরি মানুষের সাথে যোগাযোগ করেন না সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই, আর আল্লার যদি এক পাল ফেরেশতা রয়েছে তবে তাদের মাধ্যমেই অন্তত মানুষের সাথে যোগাযোগ করে মানুষের আধুনিক যত সমস্যা তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ কেন নেন না সর্ব-শক্তিমান ও অসীম করুণাময় তাও এক প্রশ্ন বঠে। যাই হোক, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পরেই যে সব শূন্য, সেখানে ডানার সাহায্যে উড়া সম্ভব নয় তা যদি সর্বজ্ঞ আল্লার জানা থাকত তাহলে নিশ্চয় তিনি ফেরেশতার ডানার কথা বলতেন না। আর তা জানতেন না বলেই তো, “সমস্ত প্রশংসা তার জন্যই” !!
বেশি না বলে কোরানের অসংগতি একটা তালিকা দেই Quranic contradictions
আর আগেই বলেছি, এটা কোনো যুক্তি নয়। কোনো গ্রন্থে যদি কোনো অসংগতি না থাকে তবেই তা আল্লা কতৃক রচিত গ্রন্থ হয়ে যায় না যদিও আল্লার মত কোনো মহা মহা জ্ঞানী এমন দাবী করে থাকেন( উপরোল্লিখিত সূরা নিসার৮২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)।
৪। বিশ্বের কোটি কোটি লোক কোরানকে আল্লাহ রচিত বলে রায় দিয়েছে।
এটা কোনো প্রমাণ নয়। সত্যতা ভোট দ্বারা নির্বাচিত হয় না। বিশ্বের কোটি কোটি লোক কোরানকে অলৌকিক মনে করে বলেই যদি তা অলৌকিক হয়ে যায় তবে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ যেগুলোও কোটি কোটি লোক অলৌকিক বলে মনে করে সেগুলো অলৌকিক হবে না কেন? আবার, কোরানকে যত লোক অলৌকিক বলে মনে করে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষ একে অলৌকিক বলে মনে করে না, তাহলে এই যুক্তিতে কোরানকে অলৌকিক নয় বলে কেউ যদি মনে করে তবে সমস্যা কোথায়? এক সময় বিশ্বের প্রায় সকল লোকই বিশ্বাস করত সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে, তাই বলে কি তা সত্য হয়ে গিয়েছিল? অনেক লোক কোনো কিছু বললেই বা বিশ্বাস করলেই তা সত্য হয়ে যায় এ ধরণের আর্গুমেন্টকে বলে Argumentum ad populum যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
৫। যেহেতু আল্লা আছেন তাই তিনি অবশ্যই মানুষের জন্য একটা গাইডলাইন দিবেন আর এটাই আসমানী কিতাব আল-কোরান।
ঈশ্বর যে মানুষের কল্পনার সৃষ্টি তা এই ধরণের দাবি থেকে উপলব্ধি করা সহজ। আল্লা যে মানুষের জন্য গাইড লাইন দিবেন বা এর প্রয়োজন অনুভব করবেন তা নিশ্চিত হলেন কিভাবে? মানুষ ঈশ্বরকে নিজের মত কল্পনা করে- ফলে মনে করে মানুষের সকল বৈশিষ্ট্য যেমন খুশি হওয়া, রাগ করা, সৃষ্টি হিসাবে মানুষের খোঁজখবর নেয়া ইত্যাদি মনুষ্যসুলভ বৈশিষ্ট্য তার রয়েছে এবং সে ইবাদত করলেই তিনি খুশি হয়ে যাবেন।
আরো সমস্যা হল, আল্লা বলি আর ঈশ্বর বলি সে যে খুব একটা শুভকর কিছু সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হলাম কিভাবে? আমরা যদি আমাদের আনন্দে থাকাটাকে ঈশ্বরের অবদান বলে মনেও করি তাহলেও তাকে শুভকর কিছু বলে মেনে নিতে আমার আপত্তি আছে, কেননা অশুভ কিছু কি মানুষকে আনন্দ দিতে পারে না? এখানে যুগের পর যুগ মানুষের অফুরন্ত দুর্দশার কথা নাইবা বললাম যা ঈশ্বরের দ্বারা এক মূহুর্তে সমাধান যোগ্য। এছাড়া ঈশ্বর অধিকাংশ মানুষকে অনন্ত কাল নরক বাসের জন্যই সৃষ্টি করেছেন (কারণ কে কি করবে তা জেনেও তাকে সৃষ্টি করেছেন আর মানুষকে পাপ প্রবণ করে তৈরী না করলে তো সে পাপ করত না। অনেকে বলবেন তাহলে আল্লা তাদের পরীক্ষা করবে কিভাবে? আমি বলব, আল্লার পরীক্ষা করার দরকারটা কি? তার কিসের অভাব? মানুষকে সে যদি ইবাদত/স্তুতি পাবার জন্য সৃষ্টি করে তবে তো বলব সে সফল না, কারণ বেশির ভাগ মানুষ তার ইবাদত করা তো দূরে থাক বিশ্বাসও করে নি। এছাড়া আল্লার ইবাদত পাবার অভিলাষটা তাকে নিদারুণ খাটো করে তোলে।) ঈশ্বর যদি মানুষের জন্য অনন্ত কাল নরক বাসের শাস্তি দিতে চান তবে আমি নির্দ্বিধায় বলব সে অসীম অশুভকর ও চরম নিন্দনীয় সত্ত্বা এবং সেই সাথে তাকে না মানাটাও নিদারুন গর্বের বিষয় বলে মনে করব। আর যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ঈশ্বর ও ঈশ্বরের গুণাবলি ঐ ধর্মের প্রচারকের বুজরুকি হয় তবে আমি বলব ওই ধর্মপ্রচারকটা তার কল্পিত ঈশ্বরের মতই নিন্দনীয়। এই ধরনের একটা ঈশ্বর যে নাকি মানুষকে অনন্তকাল( এর কম হলে সমস্যা কি ছিল?) আগুনে পোড়াতে চায় সে আবার মানুষের ভালোর জন্য নবী-রচুল পাঠায়, কোরান পাঠায়। তিনি যদি মানুষের এত ভাল চান তবে চরম বিপদ গ্রস্ত মানুষকে একটু সাহায্য করলে সমস্যা কি ছিল? যদিও সাহায্য করলে তার কোনো ক্ষতি নেই এবং তিনি যদি চাইতেন তবে নাকি মানুষ এই ধরণের বিপদেও পড়ত না। দেখি মানুষ হজে গিয়ে একেবারে পদপিষ্ট হয়ে মারা গেলেও আল্লার কোনো খুঁজ নাই!! লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে আছে, মারা যাচ্ছে অহরহ কিন্তু আল্লা কারো ডাক শুনেনি, অথচ মানুষের জন্য তার কি দরদ, নবি-রচুল-কোরান পাঠাচ্ছেন হেদায়াতের জন্য। কেন, মানুষ কোরানের আইন না মেনে কি খুব খারাপ অবস্থায় আছে- উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে কি কোরানের আইন চলে?
আরো সমস্যা আছে। মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা আছে মানেই ধর্মবাদীরা মনে করেন তিনি কোনো একটি ধর্মের বর্ণিত ঈশ্বর হবেন আর ঐ ধর্ম তাদের-ই ধর্ম। অন্য ধর্মে জোর করে হলেও বা যত মত তত পথ জাতীয় বুলি আউড়িয়ে হলেও মানুষকে কিছুটা শান্ত রাখা সম্ভব কিন্তু মুসলমানরা এ ব্যাপারে একেবারেই নাছোড়বান্দা। তাদের ধর্মের বাইরে যে ঈশ্বর থাকতে পারে তা তাদের চিন্তারও বাইরে। তাদের কথা হল- ঈশ্বর আছে, তিনি ধর্মের জগতের বাইরের কেউ নন এবং তিনিই আল্লা , আল্লা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই। অনেককে দেখেছি আল্লার পরিবর্তে ঈশ্বর শব্দটার ব্যবহার নিয়েও আপত্তি তুলতে আবার আল্লা শব্দটি ব্যবহার করে এ নামে মন্দ কিছু বললে মাথা নিয়ে ঠিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে।
৬। কোরান রচনায় মুহাম্মদের স্বার্থ কি ছিল? তিনি যদি কোরানকে নিজের রচিত বলে প্রচার করতেন তবে যুগ শ্রেষ্ট কবি হতে পারতেন।
মুহাম্মদ “মুহাম্মদ” হতে পেরেছিলেন কোরানকে আল্লার বাণী বলে প্রচারের মাধ্যমে। আজ থেকে ১৪০০ বছরের অধিক সময় আগে এরকম প্রচার ও তাতে বিশ্বাস করার মত লোকের অভাব ছিল না যেখানে আজকের যুগেও এমন উদ্ভট বিষয়ে বিশ্বাসের মত মানুষের সংখ্যা কম নয়। এখনো অনেক ভণ্ড পীরের হাজার হাজার মুরিদের খোঁজ পাবেন একটু খবর নিলেই। মুহাম্মদ একজন নারীর(খাদিজা) ব্যবসা দেখাশুনাকারী থেকে একটা জাতির নেতা হতে পেরেছিলেন কোরানকে অলৌকিক বলে প্রচারের মাধ্যমে। মুহাম্মদের যা কিছু অর্জন সব এর মাধ্যমেই। নিচের কয়েকটি আয়াত লক্ষ্য করি-
“হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে”। (৩৩:৪৫-৪৬)
“হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ্ আপনার করায়ত্ব করে দেন এবং বিবাহের জন্য বৈধ করেছি আপনার চাচাতো ভগ্নি, ফুফাতো ভগ্নি, মামাতো ভগ্নি, খালাতো ভগ্নিকে যারা আপনার সাথে হিজরত করেছে। কোন মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করে,নবী তাকে বিবাহ করতে চাইলে সেও হালাল। এটা বিশেষ করে আপনারই জন্য-অন্য মুমিনদের জন্য নয়। আপনার অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে। মুমিনগণের স্ত্রী ও দাসীদের ব্যাপারে যা নির্ধারিত করেছি আমার জানা আছে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল,দয়ালু”।(৩৩:৫০)
“আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর”।(৩৩:৫৬ )
স্বীয় পোষ্যপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করলে তা জায়েজ করার জন্য নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল করানো হল-
“অতঃপর জায়েদ যখন জয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে”। (সূরা আহযাব,৩৩:৩৭)
(এই আয়াতটি নিয়ে পরে বলছি)
অবশ্যই বিদ্যমান আছে রসুলুল্লার মধ্যে সর্বোত্তম আদর্শ (সূরা আহযাব, ৩৩:২১)
কী অবস্থা ভেবে দেখেন। এভাবে নিজেকে মহিমান্বিত করতে, সুবিধা আদায় করতে এমনকি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যায় পড়লেও তা সমাধানের জন্য মুহাম্মদ নিজের ইচ্ছেমত আয়াত নাজিল করে নিয়েছেন।
কোরান যে খুব একটা ভাল কাব্যগুণ রয়েছে তা কোনো নিরপেক্ষ বিচারে নির্ধারিত করা যায় নি। বরং কোরানের কাব্যগুণকে ফেলনা বলে প্রত্যাখ্যাত হতে দেখি প্রায়ই। কোরানের উপর অলৌকিকতা আরোপ ছাড়া কোরানের প্রতি মানুষের এত সমীহ আনা সম্ভব ছিল না কোনোকালেই।
৭। মুহাম্মদ উম্মী বা নিরক্ষর ছিলেন। তার মত একজন মানুষের পক্ষে কোরানের মত অসাধারণ একটা গ্রন্থ রচনা সম্ভব নয়। সুতরাং উহা অলৌকিক গ্রন্থ।
এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। এর সমস্যা অনেক-
– ১) মুহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন তার স্বপক্ষে নিশ্চিত হবার মত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অনেকেই মনে করেন তিনি অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ছিলেন। তিনি প্রথম জীবনে সফলভাবে খাদিজার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন যা তার দক্ষতা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ।
– ২) কোরান রচনার জন্য অক্ষর জ্ঞান থাকতে হবে কেন? কোরান লেখার জন্য সব সময় কাতিবে ওহী বা ওহী লেখকরা প্রস্তুত ছিলেন।
– ৩) আমাদের দেশের বাউলদের কথা ধরেন। এদের প্রায় সবাই নিরক্ষর বা একেবারেই শিক্ষা-দীক্ষা নেই। কিন্তু লালন শাহ, আব্দুল করিম এঁরা এমন অনেক কিছু রচনা করে গেছেন যেগুলো কোরানের যেকোনো আয়াতের চেয়ে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ও মানবিক।
– ৪) কোরান অতি এলোমেলো ভাবে সংকলিত হয়েছে। যা প্রথমে রচিত হয়েছে তা গেছে শেষে আবার যা শেষে তার অনেক কিছু প্রথম দিকে, এভাবে এলোমেলো ভাবে জোড়াতালি দেয়া এক অদ্ভুত গ্রন্থ এই কোরান। একে অসাধারণ বলার কোনো কারণ নেই।
– ৫) ধারণা করা যায় যে মুহাম্মদ তার মাথায় কোনো ভাবনা আসলে তিনি সর্বদা নিযুক্ত থাকা ওহী লেখকদের তা বলতেন আর ওরাই তা কাব্যে রুপ দিত। হয়ত ওহী লেখকদের বলতেন যে তিনি ওই ধারণা বা মত বা আদেশ আল্লার কাছ থেকে পেয়েছেন। পরবর্তীতে মানুষ মনে করতে লাগল যে কোরান যেভাবে তারা দেখতে পাচ্ছে অবিকল সেভাবেই আল্লা মুহাম্মদের কাছে তা নাজিল করেছেন।
৮। মুহাম্মদ এতই সৎ ছিলেন যে কাফিরেরা পর্যন্ত থাকে আল-আমিন বা বিশ্বাসী বলত। তার মত একজন মানুষ কোরান নিজে রচনা করে আল্লার নামে চালিয়ে দেয়ার মত প্রতারণা করতে পারেন না।

আসলে তথাকথিত এই সব নবি-রচুলদের নিয়ে সমস্যা বঠে। ওরা কে ছিলেন, কি রকম ছিলেন তা নির্ধারণ করা বেশ জটিল। মুহাম্মদকে নিয়ে আরো সমস্যার বিষয় হল তিনি মক্কা বিজয়ের পর সেখানে রাজার মতই ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলেন। প্রকাশ্যে তার নিন্দা করার মত সাহস কারো ছিল না। এছাড়া যারাই মুহাম্মদের জীবন ইতিহাস লিখেছে ও সংরক্ষণ করেছে তারা সবাই মুসলমান ছিল অর্থাৎ মুহাম্মদকে আল্লা প্রেরিত রসুল বলে বিশ্বাস করত। (পরবর্তীতে মুসলিম-অমুসলিম সকলেই এই সব উৎসকে ব্যবহার করেই মুহাম্মদকে জেনেছে।) একজন মানুষ যিনি কাউকে নবী-রসুল বলে বিশ্বাস করেন তিনি কি পারবেন ওর জীবন ইতিহাস লিখতে? স্বাভাবিক ভাবেই তিনি যা লিখবেন তা হবে নবি-প্রশস্তি। আমরা দেখেছি মুহাম্মদের জন্মের সময়কালকে আইয়্যামে জাহেলিয়াত বলে প্রচার করে মুহাম্মদের আগমনকে আবশ্যক ছিল বলে প্রচার করতে। আরো দেখেছি মুহাম্মদের নামে অনেক আজেবাজে কাহিনী প্রচার করতে যেমন মেরাজের ঘটনা, কেউ দেখেনি অথচ সকালে উঠে মুহাম্মদ বললেন বলেই তা বিশ্বাস যোগ্য হয়ে গেল? আমরা জেনেছি অনেকেই তা মেনে নেয় নি, অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করেছে, অবিশ্বাস করেছে। আজো মানুষ প্রশ্ন তুলছে মুহাম্মদ যদি মেরাজে যাবেন তো সবার সামনে গেলে সমস্যা কি ছিল? কেন শুধু রাতের বেলাতেই আর গোপনে চুপিচুপি তিনি আল্লার সাথে কারবার করেন?
যাই হোক, যা বলতে চাচ্ছি- মুহাম্মদ যে একজন সৎ মানুষ ছিলেন আর কাফিররা পর্যন্ত তাকে আল-আমিন বা বিশ্বাসী বলত তা আমরা জানতে পারছি তার অনুসারীদের কাছ থেকে যারা নাকি তাকে নবি-রসুল বলে বিশ্বাস করে।
এছাড়া মুহাম্মদের সততা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোরান বা ইসলামের অভ্রান্ততা একটা অনিবার্য বিষয়- এটি সার্কুলার লজিকের মত একটা অবস্থার সৃষ্টি করে-“যেহেতু মুহাম্মদ সৎ ছিলেন সুতরাং কোরান আল্লার বাণী “ আবার, “যেহেতু কোরান আল্লার বাণী সুতরাং মুহাম্মদ সৎ ছিলেন”। তাই এর কোনো গুরুত্ব নেই। এছাড়া ২৫ বছর বয়সে খাদিজাকে বিয়ে করার পর মুহাম্মদের অর্থের অভাব ছিল না। নিন্দুকরা বলে, তিনি নবুয়তি দাবীর আগ পর্যন্ত খাদিজার অঢেল সম্পদ বসে বসে ভোগ করেছেন আর নবুয়তির স্বপ্নে দিন গুজরান করেছেন(খাদিজাকে বিয়ে করার পর থেকে তার আর কোনো পেশা ছিল বলে জানা যায় নি)।
মুহাম্মদ সৎ ছিলেন কিনা তা নিয়ে অনেক কিছুই বলা সম্ভব। এখানে শুধু কোরানের একটা আয়াত দেই-
“ইহারা আপনাকে গণিমতের মাল(যুদ্ধলব্ধ মালের) বিধান জিজ্ঞাসা করিতেছে, আপনি বলিয়া দিন এই গণিমতসমূহ আল্লাহর ও রসূলের। অতএব, আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সংস্কার কর, আর আল্লাহ ও তার রসূলের আদেশ মানিয়া চল যদি তোমরা মুমিন হও”।(সূরা আনফাল,৮:আয়াত ১)
এখানে আল্লাহ তো মাল নিতে আসবেন না, তাহলে সব মাল কার হল?
নিজ (পালক)পুত্রবধূ জয়নবকে যে কৌশল অবলম্বন করে তিনি বিয়ে করেছেন তাকে সততা বলা সম্ভব নয়। মুহাম্মদ বিষয়টাকে এমন করে তুললেন যেন তার পালক পুত্র যায়েদ নিজেই তার স্ত্রীকে স্বেচ্ছায় তালাক দিচ্ছে তার সাথে বিয়ে হওয়ার জন্য যদিও মুহাম্মদের ঘরে একাধিক স্ত্রী ছিল তখন। অথচ মুহাম্মদ যায়েদের স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি সৎ থাকার জন্য আদেশ করতে পারতেন । কিন্তু তা না করে আয়াত নাজিল করিয়ে নিলেন যেখানে সরাসরি মুহাম্মদকে (যায়েদের স্ত্রী) জয়নবের সাথে বিয়ের বৈধতা দেয়া হচ্ছে। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, পালক পুত্রের স্ত্রী বিয়ে করার ব্যাপারে মুসলমানদের যাতে কোনো সংকীর্ণতা না থাকে সে জন্যই নাকি জয়নবের স্ত্রীর সাথে মুহাম্মদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে( ভণ্ডামির সীমা নেই?)। আয়াতটি দেখি,
“অতঃপর জায়েদ যখন জয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে”। (সূরা আহযাব, ৩৩:৩৭)
এ আয়াত থেকে জানতে পারলাম, মুমিন-মুসলমানরা তদের পালক পুত্রের স্ত্রী বিয়ে করতে পারছে না তা আল্লার নিকট অনেক বড় সমস্যা!!
মোটকথা, মুহাম্মদ ব্যক্তিগত জীবনে খুব সৎ ছিলেন বলেই কোরান আল্লার বাণী এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় , কারণ
– ১) মুহাম্মদ সৎ ছিলেন তা নিরপেক্ষ উৎস থেকে যাচাই করা সম্ভব নয়।
– ২) মুহাম্মদের সততা আর কোরান আল্লার বাণী হওয়া ভিন্ন দুটি ব্যাপার। কেউ সৎ ছিলেন তার মানেই তিনি সব কাজেই সৎ ছিলেন তা না। আর মুহাম্মদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি হল ইসলাম প্রচার যার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন ২৩ বছর। এখন ইসলাম প্রচারের বিষয়টাকে বাদ দিয়ে তাকে সৎ বা অসৎ বলে প্রমাণ করে কি লাভ?
– ৩) তার জীবনে তিনি এমন অনেক কাজ করেছেন যেগুলোকে সততা বলা অসম্ভব।
– ৪) অনেকে মনে করেন মুহাম্মদের মানসিক বা মনোদৈহিক রোগ ছিল, তিনি প্রায়ই কল্পনা আর বাস্তবতার পার্থক্য্ বুঝতে অক্ষম হয়ে পরতেন। এখন মুহাম্মদ যদি অসচেতন ভাবে কোরানকে আল্লা কর্তৃক প্রেরিত বলে মনে করেন ও তা প্রচার করেন তবে অবশ্য ভিন্ন বিষয়।
– ৫) মুহাম্মদ নবুয়তির এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ রেখে যান নি যার জন্য আমরা আজো তাকে নবী বলে মেনে নেব অথচ তার নবুয়তীর প্রমাণের দায়িত্ব তার উপরই ছিল। কারো নবী হয়ে যাওয়ার দাবী নিঃসন্দেহে অতি হাস্যকর আর এরকম উদ্ভট একটা দাবীকে কেন আমরা মেনে নেব সততার দোহাই দিয়ে?
– ৬) ভিন্ন ধর্মের অনেকেই বিভিন্ন অশুভ সত্তা যেমন শয়তানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। এখন তাদের কেউ যদি কোরানকে শয়তানের বাণী বা ধোঁকা বলে দাবী করেন তবে এর প্রত্যুত্তরে কি বলা যেতে পারে যেখানে স্বয়ং কোরানও এরকম অশুভ সত্তার অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়। অনেকেই বলে, কোরান শয়তানের বাণী এবং মুহাম্মদের সাথে শয়তান লেগেছিল এবং তাকে বিভ্রান্তিতে ফেলেছিল, এরকম দাবী মুহাম্মদের সময়ও অনেকে করত।
– ৭) মুহাম্মদ যদি এতটা সৎ ছিলেন যে তার কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়া যায় তবে তার সময় কালেই লোকেরা তাকে বিশ্বাস করে নি কেন? কেন অনেকে তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত? মুহাম্মদের সময়কালেই যেখানে লোকেরা তার নবুয়তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেখানে আমরা মুহাম্মদের মৃত্যুর এতকাল পরে এসে কিভাবে তা বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করব?
৯। কোরান দুর্বোধ্য। আল্লার বাণী তো দুর্বোধ্য হবেই। এছাড়া কোরান অনুবাদ পড়ে বুঝা সম্ভব হয় না। আর এর ফলে মানুষ তা আল্লার কিতাব বলে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়।
আল্লা যদি মানুষের সাথে কোনো বিষয়ে কথা বলেন তবে নিশ্চয়ই তা মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলার দায়িত্ব তারই। কেননা মানুষ কি বুঝবে, আর কি বুঝবে না, কোন বিষয়টা কতটুকু বুঝবে তা আল্লা জানেন(কারণ তিনি সর্বজ্ঞ)। সুতরাং তিনি যদি মানুষকে এমন ভাষায় উপদেশ বা আদেশ দেন যা মানুষ বুঝতেই পারল না বা ভুল বুঝল তবে সে দোষ নিঃসন্দেহে আল্লারই এবং এ ধরণের কাজ আল্লার মহানত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। কোরানেও অনেক আয়াতে কোরানকে সহজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কোরান দুর্বোধ্য এ দাবিটা তখনই শুনি যখন কেউ কোরান নিয়ে কোনো বিরুপ প্রশ্ন করে ফেলেন। আর ধর্ম-ব্যবসায়ী মোল্লারা চায় না মানুষ কোরান ভাল করে বুঝুক, তারা মানুষকে কোরান পাঠ শিক্ষা দিলেও আরবি ভাষাটা কাউকে শিখাতে চায় না কারণ এতে করে তাদের ব্যবসা লাটে উঠবে।
আচ্ছা, কোরান দুর্বোধ্য, মানলাম কিন্তু তা কি সবার কাছেই দুর্বোধ্য? যিনি তা বুঝতে পারেন তিনি ব্যাখ্যা করে সকলকে বুঝিয়ে দিলেও সবাই কি তা বুঝবে না? আর যেটা বললাম, কোরানের দুর্বোধ্যতার জন্য কেউ যদি কোরান পড়ে এটা অনুধাবন করতে অক্ষম হয় যে কোরান আল্লার গ্রন্থ তবে তার দায় তো আল্লারই, তাই না?
অনেকে আবার দাবি তোলেন তাদের কোরান নাকি অনুবাদ পড়ে বুঝা সম্ভব না। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান মানুষ বিনিময় করেছে, অর্জন করেছে অনুবাদের সাহায্যে কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছে বলে শোনা গেল না, শুধু কোরানের বেলায়ই যত বিপত্তি। আর মহা-সর্বজ্ঞ আল্লা এমনভাবে কেন কোরান নাজিল করবেন যে তা আর কোনো ভাষায় সঠিক অনুবাদ সম্ভব নয়! এখন শুধু কোরান বুঝার জন্যই নতুন একটা ভাষা শিখতে হবে! একটি ভাষা শিখা নিঃসন্দেহে একটা জটিল কাজ। এভাবে একেকটি ধর্ম যাচাই করার জন্য যদি শুধু একেকটা ভাষা শিখতে হয় তাহলে ভাষা শিখতে শিখতেই জীবন পার হয়ে যাবে। কোরান বুঝার জন্য যেমন আরবি শিখছি তেমনি বেদ বুঝার জন্য এবার সংস্কৃত শিখি, ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ বুঝার জন্য হিব্রু শিখি এভাবে চলুক।
আর কোরান যদি জ্ঞানের ভাণ্ডার হয় তাহলে তো যাদের মাতৃভাষা আরবি বা যারা আরবি জানে তারা আরবিতে কোরান পড়ে জ্ঞানের সেই ভাণ্ডার আত্মস্থ করে টাইটুম্বুর হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু আমরা কি তা দেখতে পাচ্ছি? আর কোরানের অনুবাদ পড়ে কোরান ঠিকমত বুঝা হয় নি যারা দাবী করেন তারা কি অন্য ধর্মগুলোকে যাচাই করেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন? আর যাচাই করতে গিয়ে ঐসব ধর্মগ্রন্থ মূল ভাষায় পড়েছেন নাকি অনুবাদ পড়েছেন? অবশ্য আদৌ কিছু যাচাই-বাছাই না করে পারিবারিক সূত্রে পাওয়া ইমান নিয়ে লম্ফ-ঝম্প করলে ভিন্ন কথা।
আমরা দেখেছি আরবি ভাষাভাষি বা আরবি ভাষা জানে এমন অনেক অমুসলিম আছে। মুহাম্মদের সময় তার প্রতিবেশিরা নিশ্চয় আরবি জানত বা অন্তত কোরান বুঝত। তাবে তাদের কাছে কোরানকে আল্লার বাণী বলে মনে হয় নি কেন? তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি কোরানে এমন কোনো গুণ নেই যে কোরান বুঝলেই মনে হবে তা আল্লার প্রেরিত গ্রন্থ।
কোরানে অনেকগুলো আয়াতে কোরানকে সহজ-সরল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-
নিশ্চয় আমি এ কোরানকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (৪৪, সূরা দুখান:আয়াত ৫৮)
আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে। (১৪, সূরা ইব্রাহিম:আয়াত ৪)
নিশ্চয় আমি কোরানকে আরবি ভাষায় নাজিল করেছি, যাতে তোমরা সহজে বুঝতে পার। (১২, সূরা ইউসুফ:আয়াত ২)
আমি কোরানকে আপনার ভাষায় এই জন্য সহজবোধ্য করিয়াছি যেন আপনি উহার সাহায্যে খোদাভীরুগণকে সুসংবাদ দিতে পারেন। (১৯, সূরা মারইয়ামঃ ৯৭)
আর আমি সহজ করিয়া দিয়াছি কোরানকে উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব, কেহ উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি। (৫৪, সূরা ক্বামারঃ আয়াত ১৭)
এরপর আর কোরানকে দুর্বোধ্য, অনুবাদ পড়ে বুঝা সম্ভব নয় ইত্যাদি বলা কি চলে?
১০। কোরানের সাংখ্যিক মাহাত্ম রয়েছে। সুতরাং কোরান অলৌকিক গ্রন্থ।
এই অভিনব দাবীর জবাব এখানে দেয়া হয়েছে- কোরানের ‘মিরাকল ১৯’-এর উনিশ-বিশ! । তাই নতুন করে আর কিছু না বলে এই লেখাটা একটু পড়ে দেখার জন্য অনুরোধ করছি।
আরেকটি প্রাসঙ্গিক লেখা পড়ার জন্য সকলকে অনুরোধ- আল্লাহ, মুহম্মদ সা এবং আল-কোরআন বিষয়ক কিছু আলোচনার জবাবে..