Saturday, May 14, 2016

আপেক্ষিকতাবাদের কাহিনি; পর্ব – এক: বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ

আপেক্ষিকতাবাদের কাহিনি; পর্ব – এক: বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ


১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের আবিষ্কার সংক্রান্ত বিজ্ঞানপত্রটি দুনিয়ার সামনে প্রকাশিত হয়। এই বছর সেই দুনিয়া কাঁপানো আবিষ্কারের একশ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে বিশ্বের নানা জায়গায় নানা ভাবে। সেই উপলক্ষে আমি এখানে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের দুই পর্ব সংক্ষেপে সকলের বোধগম্য ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রথম পর্বে আলোচনা করা হবে বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। পরের বার সাধারণ আপেক্ষিকতা।
আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বললেই সকলের মনে ভেসে আসে এরকম একটা সর্বত্র প্রচলিত কথা: “দুনিয়ার সব কিছুই আপেক্ষিক।” স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনকেও যখন কেউ প্রশ্ন করতেন, “আপনি কি দু এক কথায় আপেক্ষিকতার মূল ধারণাটা আমাদের বুঝিয়ে দিতে পারবেন?” আইনস্টাইন তাঁদের খুশি করার জন্য বলতেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারব। এই ধরুন, আপনি আপনার প্রেমিকার জন্য কাফেয় একলা বসে অপেক্ষা করছেন, তাঁরও আসতে কোনো কারণে হয়ত দেরি হচ্ছে; তখন আপনার মনে হচ্ছে, সময় যেন আর কাটতেই চায় না। আর যেই তিনি এসে গেলেন, আপনাদের গল্পটল্প শুরু হল, আপনার খালি মনে হবে, সময় কী তাড়াতাড়িই না বয়ে যাচ্ছে।” অনেকে এইভাবেও বলে থাকেন, “ধরা যাক, আপনি আর আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আপনার যেদিকটা ডান দিক, আমার ডান দিক সেদিকে নয়। আমার সেটা হল বাঁ দিক। আর আমার যেটা ডান দিক, আপনার জন্য সেদিকটাই হবে বাঁ দিক। সামনে বা পেছনে, উপরে বা নীচে—সেও এইভাবেই আপেক্ষিক, এক এক জনের জন্য এক এক রকম। এই অর্থে সব কিছুই আপেক্ষিক, কোনো কিছুই পরম বা শাশ্বত নয়, সকলের জন্য বা চিরকালের জন্য সত্য নয় . . .।” কিংবা, আপনি হয়ত পছন্দ করেন লাল রঙের গোলাপ ফুল; আর আমার আবার ভীষণ পছন্দ নীল অপরাজিতা। এইসব পছন্দ অপছন্দও আপেক্ষিক কিনা! ইত্যাদি।
একটু মন দিয়ে ভাবলে সকলেই বুঝবেন, এই জাতীয় কথার সঙ্গে আপেক্ষিকতার আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই। থাকার কথা নয়। উপরের কথাগুলো ভুল নয়। কিন্তু তা বুঝবার জন্য মানবজাতিকে আইনস্টাইন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, তাঁর আগে পর্যন্ত কেউ, এমনকি নিউটনও এসব জিনিস বুঝতে পারেননি, ভাবলে মানুষের বোধবুদ্ধির মাত্রাকে খুবই খারাপ চোখে দেখতে হয়। আইনস্টাইন যে জাতীয় আপেক্ষিকতার সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, তা এর চাইতে সামান্য কিছুটা কঠিন!
এবং সত্যি কথা বলতে গেলে, পদার্থবিজ্ঞানে আপেক্ষিকতার বিষয়টা এরকম কোনো গল্পকথার বিষয় নয়, কোনো কল্প কাহিনিও নয়, একেবারে বাস্তব প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু এই বিষয়টিকে বোঝার চাইতে না বোঝার বা ভুল বোঝার কাহিনি এত বেশি যে মাঝে মাঝেই আমাদের মুখ দিয়ে গল্প শব্দটি বেরিয়ে পড়ে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এমনকি শুধু সাহিত্যিক বা সাংবাদিকরাও নয়, বহু বিজ্ঞানীও আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে বোঝাতে গিয়ে এমন সব কথা বলেছেন যার সাথে আসলে এই তত্ত্বের কোনো সম্পর্কই নেই। আর এই কারণে অধিকাংশ লোকপ্রিয় লেখক এই বিষয়ে লিখবার সময় দাবি করেছেন, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নাকি বিজ্ঞানের একটি ভীষণ দুরূহ জিনিস। একে বুঝে ওঠা সকলের কম্ম নয়! এও শোনা যায়, উনিশশ তিরিশের দশকে ইংল্যান্ডে আর্থার স্ট্যানলি এডিংটনকে তাঁর এক ছাত্র এসে বলেন, “স্যর, অনেকে বলছে, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব নাকি পৃথিবীতে তিনজন মাত্র বিজ্ঞানী বোঝেন?” এডিংটন সঙ্গে সঙ্গে জানতে চান, “হুঁ, তাই নাকি? তা তোমার এই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে বৎস?” [Cited, Kuznetsov 1965, 207-08]
অনেক বছর বাদে, ১৯৬৭ সালে রিচার্ড ফাইনম্যান তাঁর এক রচনায় অবশ্য আর একটু বেশি লোকজনকে তত্ত্বটি বোঝার অনুমোদন দেন। বলেন যে বিজ্ঞানীদের মধ্যে জন বারো এটা বুঝতে পেরেছেন। [Feynman 1992, 129]
এই শুচিবাইয়ের অবশ্য একটা কারণ আছে।
বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের বক্তব্য কাউকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে দেখলে দুঃখ পান। পাওয়ারই কথা। তার ফলে কিছু কিছু পদার্থবিজ্ঞানী লোকপ্রিয় ভাষ্যের খুব বিরোধী হয়ে থাকেন। আবদুস সালাম নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর ইলেকট্রো-উইক ক্ষেত্রতত্ত্ব কেন্দ্রিক গবেষণার বিষয় নিয়ে আমি একবার একটা সহজভাষ্য মূলক প্রবন্ধ লিখে ১৯৭৮ সালে (তখনকার) প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের স্বনামখ্যাত অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরীকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। যাতে খুঁটিনাটি বিষয়ে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করে নেওয়া যায়। প্রফেসর রায়চৌধুরী প্রবল আপত্তি নিয়ে পৃষ্ঠা চারেক মাত্র দেখে দেন। তাঁর মতে, “বিজ্ঞানকে লোকপ্রিয় করা যায় না। তুমি হয় বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে পার, অথবা লোকপ্রিয় প্রবন্ধ রচনা করতে পার। লোকপ্রিয় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে পারবে না।”
এত সব কথা বলবার উদ্দেশ্য একটাই। বিজ্ঞানীদের শুচিবাইকে সম্মান জানিয়ে একটা সতর্ক বাণী উচ্চারণ করে রাখা। আমার এই নিবন্ধটিও একটি লোকপ্রিয় রচনা। এতেও অতএব ভুল ধারণা ঢুকে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাঁরা পড়বেন, তাঁরা সাবধান থাকবেন, সম্ভব হলে অন্য উৎস থেকে যাচাই করে নেবেন।

গোড়ার কথা

আমরা শুরু করব সেই সরল জায়গা থেকে যেখানে বৈজ্ঞানিক ধারণা হিসাবে সমস্যাটার প্রথম জন্ম হয়েছিল।
আরিস্ততল। প্লাতোর ছাত্র। দার্শনিক। নৈয়ামিক তর্কশাস্ত্র (formal logic)-এর জন্মদাতা। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিস দেশের এই সুপণ্ডিত মনীষী বৈজ্ঞানিক প্রণালীবদ্ধ জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করেছিলেন। বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বহু শাখার নামকরণও তাঁর হাত দিয়েই হয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানেরও। তিনিই প্রথম বস্তুর গতির সমস্যা, বল প্রয়োগের সাথে তার সম্পর্ক—ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একটা সূত্রবদ্ধ ধারণা দেবার চেষ্টা করেছিলেন।
আমাদের মনে অনেক এরকম প্রশ্ন ওঠে; অন্তত সেই কালে উঠত: ধনুকের তির কখন ভীম বেগে ধেয়ে যায়? বল্লম জোরে ছুঁড়বার উপায় কী? এই ভারি প্রস্তরখণ্ডকে কীভাবে দূরে সরানো যাবে? গরুর গাড়ি কখন চলতে শুরু করে? নদী থেকে জল বয়ে আনব কী করে? নৌকা কেন চলে? এমনকি স্রোতের বিপরীতেও?
আরিস্ততল বললেন, এই সবের পেছনে আসলে একটাই মূল প্রশ্ন: অচল বস্তু কেন বা কীভাবে গতিশীল হয়? আসুন, ভাবনাচিন্তা করে তার উত্তর খোঁজা যাক। সেই উত্তর হল: যে কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল করতে হলে তার উপরে বল প্রয়োগ করতে হবে। ঠেলা, ধাক্কা, টানা, তোলা, হ্যাঁচকা-টান, গুঁতো, খোঁচা, কাটা, মারপিট—এই জাতীয় সব কাজই সেই বল প্রয়োগের বিচিত্র উদাহরণ। বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করলেই স্থির বস্তু চলতে শুরু করবে। যত বেশি বল প্রয়োগ করবেন, তত জোরে সে চলবে, তত দূরে সে চলে যাবে। বল দেওয়া বন্ধ করলেই সে ধীরে ধীরে থেমে যাবে।
মনে রাখবেন, বিজ্ঞানে সাধারণীকৃত সংজ্ঞার আকারে বল সম্পর্কে এই ধারণাটি আরিস্ততলের একটি অক্ষয় মূল্যবান অবদান।
পরবর্তী প্রায় দু হাজার বছর যাবত মানব জাতি এই কথাটাকে ধরে গতির রহস্য বুঝেছিল: বাহ্যিক বলই গতির সৃষ্টি করে। গতি মানেই তা সেই দৃষ্ট বস্তুর প্রকৃত গতি। বা পরম গতি। সেকালে অবশ্য এই গতি পরম না আপেক্ষিক তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাননি। ধরেই নিয়েছেন পরম বলে। আর তাতে অসুবিধাও কিছুই হয়নি। মানুষের দৈনন্দিন কাজ এতেই দিব্যি চলে গেছে। ধনুকের ছিলা যত শক্তিশালী হবে, তত জোরে শর নিক্ষেপ করা যাবে। গরুকে বেশি করে খড় খেতে দাও, তবেই না সে গাড়িটাকে ভালোভাবে টানতে পারবে। নদী থেকে জল আনতে যাচ্ছ, আচ্ছা যাও; তবে বেশি বড় বালতি বা কলসি নিও না। বয়ে আনতে কষ্ট হবে। খুঁটিটাকে মাটিতে আরও ঢোকানোর জন্য হাতুড়ি দিয়ে জোরে ঘাই মারো। ইত্যাদি।
শুধু তাই নয়, এই যে পৃথিবীর চার দিকে সূর্য চন্দ্র অন্যান্য গ্রহ এবং তারাগুলো ঘুরছে, তারাই বা এই ঘুরবার গতি পেল কোথায়? তারও উত্তর দিয়ে গেলেন এই বহুদর্শী দার্শনিক। একটা খুব সহজ উত্তর। ওরা থামবে কী করে? ঈশ্বর ওদের চালিয়ে দিচ্ছেন বল প্রয়োগ করে। প্রথম থেকেই। তিনিই এই বিশ্ব সংসারের প্রধান চালক (Prime Mover)। অবশ্য তখন ব্রহ্মাণ্ডের যেটুকু মানুষ জানতে পেরেছিল তাতে ভগবানের খুব বেশি খাটালি ছিল না এই জগতকে চলমান রাখতে। কটাই বা আর গ্রহ নক্ষত্রকে সেকালে চালাতে হত? দশ বিশটার বেশি তো নয়! তাই কখনও খুব একটা কারোর এতটুকুও সন্দেহ হয়নি এই সুশৃঙ্খল জগত-ব্যাপারে। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব নিশ্চিন্ত মনে এই ধারণাকে তাদের চিন্তাকাঠামোয় ঢুকিয়ে নিয়েছিল। এর ভিত্তিতেই প্রথম শতাব্দে ক্লদিউস তলেমি তাঁর ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের রূপ দান করে ফেলেন। আর দ্বাদশ শতকে সন্ত তমাস আকুইনাস বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রধান চালকের এই ধারণাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে একটি প্রধান যুক্তি হিসাবে স্থাপন করে যান!
কিন্তু “চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়”—কবি ঠিকই বলেছেন। এই সুখের সংসারে বাধ সাধলেন কোপারনিকাস। ১৫৪৩ সালে তাঁর প্রকাশিত ও লাতিন ভাষায় লিখিত “খ-গোলকদের আবর্তন প্রসঙ্গে” (De Revolutionibus Orbium Coelestium) বইতে নানা রকম অঙ্ক কষে নকশা এঁকে তিনি দাবি করে বসলেন, পৃথিবী সহ গ্রহগুলি সূর্যের চারদিকে ঘোরে, আমরা খালি চোখে যা দেখি বলে ভাবি, তা সত্য নয়। সেই প্রথম আরিস্ততলের গতিতত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠল। তার মানে, আমরা প্রতিদিন সূর্যকে যে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে দেখছি, তা সত্য নয়? বছর শেষে সূর্যকে যে ডান দিক বাঁ দিক করে শেষে একই জায়গায় ফিরে আসতে দেখি, তাও বুঝি মিথ্যা? বাস্তবে পৃথিবী ঘুরছে বলেই আমরা সূর্যকে ঘুরতে দেখি। এটা তাহলে তার সত্যিকারের গতি নয়, আপাত গতি। আপেক্ষিক গতি।
প্রথম প্রথম প্রচুর আপত্তি ছিল মানুষের। সমকালীন জ্ঞানীগুণীদেরও অনেকেই মানতে চাননি। তারপর এলেন গ্যালিলেও গ্যালিলেই (ব্রুনোর কথাটা এখানে খুব বেশি প্রয়োজন নেই বলে তুললাম না)। গতির ব্যাপারটাকে খোলসা করে তুলতে অনেক গবেষণা, অনেক পরিশ্রম করলেন। দেখালেন, কোনো বস্তুর তথাকথিত প্রকৃত গতি যে কী জিনিস তা আমরা কখনই জানতে পারব না। আমরা শুধু একটা বস্তুর সাপেক্ষে অন্য বস্তুর গতির কথাই বলতে পারি। তুলনামূলক বা আপেক্ষিক গতির কথাই জানা যায়। পরম গতি আছে কি নেই জানি না, থাকলেও তা জানবার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। বরং এই আপেক্ষিক গতিকেই বস্তুর প্রকৃত গতি হিসাবে মেনে নেওয়া ভালো।
সাধারণ মানুষকে বোঝাবার জন্য তিনি এক চমৎকার গল্পই ফেঁদে বসলেন। মনে কর, তুমি কোনো দিন শান্ত সমুদ্রে এক জাহাজের ভেতর বসে আছ। বাইরের তটভূমি বা আকাশের গ্রহ নক্ষত্র কিছুই দেখতে পাচ্ছ না। এই অবস্থায় মনে মনে জাহাজের মাস্তুলের ডগাটার দিকে তাকিয়ে বল তো, জাহাজ চলছে না থেমে আছে? বুঝতে পারছ তো, এটা বলা শুধু তোমার পক্ষে নয়, কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা, হাতে একটা বল নিয়ে জাহাজে বসেই উপরে ছুঁড়ে দাও। দেখ, সেটা তোমার হাতেই পড়ছে। সেই জাহাজে বসে তুমি যা কিছু করবে, তীরের সাপেক্ষে থেমে থাকলে যা হবে, যা দেখবে, জাহাজ একই গতিবেগে চলতে থাকলেও একই জিনিস ঘটতে দেখা যাবে। (প্রিয় পাঠক! এই কথাটা কিন্তু খুব জরুরি! স্মৃতিতে ধরে রাখুন। পরেও বারবার প্রয়োজন পড়বে!)
তার মানে শুধু গতি নয়, স্থিতিও আপেক্ষিক। যে থেমে আছে বলে বলছি, সে একটা কিছুর সাপেক্ষে থেমে আছে। যে চলছে, সেও অন্য কারোর সাপেক্ষে চলছে বলে বোঝা যাবে। এই দুটো অবস্থার মধ্যে বাস্তবত কোনো পার্থক্য নেই।
আইনস্টাইন আরিস্ততলের চিন্তা থেকে গ্যালিলেওর এই উত্তরণ প্রসঙ্গেই বলেছিলেন: “অন্তর্বোধ থেকে প্রাপ্ত যুক্তির পদ্ধতিগত কারণেই গতি সম্পর্কে সেই ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়েছিল; এবং তা শত শত বছর ধরে প্রচলিত ছিল। . . . গ্যালিলেও যে বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্কের জন্ম দিলেন এবং কাজে লাগালেন তা মানব জাতির বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের ইতিহাসে এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এখান থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হল।” [Einstein and Infeld 1938, 6-7]
নিউটনের প্রথম গতিসূত্রের মধ্যে এই কথাটাকেই আর একটু গম্ভীর চালে বলা হল। বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করা না হলে স্থির বস্তু আপেক্ষিক অর্থে স্থির থাকবে, গতিশীল বস্তু আপেক্ষিক সমবেগে চলতে থাকবে। এভাবেই আমরা বইতে পড়ি সূত্রটাকে। সেখানেও যে আপেক্ষিক শব্দটা আছে সেটা প্রায় খেয়ালই করি না। করলে বুঝতে পারতাম, বলবিদ্যায় আপেক্ষিকতার ধারণাটা আইনস্টাইনেরই প্রথম ব্যবহার নয়। অনেক দিন ধরেই বিজ্ঞানে ছিল।
শুধু তাই নয়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এই ঘটনা যে আমরা লক্ষই করি না, নিউটন আসলে সেই সূত্রে আপেক্ষিক অর্থে স্থির বস্তু আর গতিশীল বস্তুর দুই অবস্থার মধ্যে কোনো তারতম্য করেননি। অর্থাৎ, প্রথম সূত্রকে তিনি এইভাবেও বলতে পারতেন, বলবিদ্যার নিয়মগুলি পরস্পর সমবেগে চলমান সমস্ত নির্দেশাক্ষে একইভাবে প্রযোজ্য। তাতেও কোনো ভুল হত না।
সে কি মশাই? আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, না হয় মেনেই নিলাম, যে বস্তু চলছে বা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—তার দুটো অবস্থাই কারোর না কারোর সাপেক্ষে দেখা হচ্ছে; কিন্তু তাই বলে দু জায়গাতে নিয়মগুলি একই থাকে কী করে?
নিউটন সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। নির্দেশাক্ষ (frame of reference)-এর ধারণা তুলে ধরে (পার্শ্বটীকা-১ দ্রষ্টব্য)। যার সাপেক্ষে তুলনা করে গতির রহস্য বুঝতে চাইছেন তাকেই বলা হচ্ছে নির্দেশাক্ষ। সমুদ্র তীরের সাপেক্ষে জাহাজ থেমে আছে। তীর হচ্ছে এখানে জাহাজের গতি নির্ধারণের নির্দেশাক্ষ। বেশ। এবার জাহাজের মধ্যে আপনি যখন কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের কাজ করছেন, জাহাজকেই তার জন্য নির্দেশাক্ষ ধরে নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে হল কি, জাহাজ চলতে শুরু করে দিল। সমুদ্র শান্ত থাকায়, হাওয়ার ধাক্কা নেই বলে, ঢেউ উঠছে না বলে, জাহাজের গতি আপনি বুঝতে পারছেন না। যা যেমন দেখছিলেন বা করছিলেন, দেখে এবং করে যাচ্ছেন।
এর মানে কি জানেন?
এর মানে হল, আপনার কাজের জন্য যে নির্দেশাক্ষ আপনি নিয়েছিলেন, সে আবার সমুদ্র তীরের সাপেক্ষে চলমান। আর আপনি তীরকে নির্দেশাক্ষ ধরলে তার সাপেক্ষে আপনি চলমান এবং জাহাজকে ধরলে তার তুলনায় স্থির। একথার অর্থ দাঁড়াল যে, তীরের নির্দেশাক্ষ সাপেক্ষেই দেখুন, অথবা তার সাপেক্ষে সমবেগে চলমান জাহাজের নির্দেশাক্ষ ধরেই দেখুন, বলবিদ্যার নিয়মগুলি সমানভাবে খাটছে। আপনি (আপেক্ষিক অর্থে) স্থির বা চলমান দুই নির্দেশাক্ষর মধ্যে পার্থক্য দেখতে পাবেন না।
_________________________________________________________________________
পার্শ্বটীকা-১
নির্দেশাক্ষ ধরে কীভাবে নিউটনের এই ধারণাগুলিকে বোঝা যাবে দেখে নিই (চিত্র নং – ১)। যদি একটি নির্দেশাক্ষ (x-y-z) সাপেক্ষে কোনো বস্তু x-অক্ষ বরাবর অনুভূমিক অভিমুখে u সমবেগে গতিশীল হয়, এবং অন্য একটি নির্দেশাক্ষ (X-Y-Z) প্রথম নির্দেশাক্ষের সাপেক্ষে সেই অভিমুখে একই অর্থাৎ, u সমবেগে গতিশীল হয়, তবে দ্বিতীয় নির্দেশাক্ষ সাপেক্ষে সেই বস্তুটির আপেক্ষিক গতি হবে শূন্য = ০। এখন t একক সময় পরে বস্তুটির অবস্থা বোঝানোর জন্য দুই নির্দেশাক্ষে যে স্থানাঙ্কগুলি ব্যবহার করা হবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে এই রকম:
x' = x-ut,
y' = y,
z' = z,
t' = t.
MM
চিত্র-১
এখানে চতুর্থ স্থানাঙ্ক দিয়ে উভয় নির্দেশাক্ষে সময়ের সমপ্রবাহ বোঝানো হয়েছে। নিউটনীয় বলবিদ্যায় এর কোনো প্রয়োগ ছিল না। কেন না, সমস্ত নির্দেশাক্ষেই সময়ের চলন ছিল একই প্রকার। তবে ১৯০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানী ফিলিপ ফ্রাঙ্ক যখন এই স্থানাঙ্ক বদলের সম্পর্কগুলিকে গ্যালিলেও পরিপাতন (Galilean Transformation) হিসাবে নামাঙ্কিত করে দেখালেন, তিনি পরবর্তীকালের আপেক্ষিকতার নিয়মের সাথে সাযুজ্য রাখার জন্য এটিকেও জুড়ে দেন।
_________________________________________________________________________
এর থেকে দুটো জিনিস স্পষ্টভাবে বোঝা গেল: এক, পারস্পরিক সমবেগে চলমান নির্দেশাক্ষগুলির মধ্যে আপনি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবেন না। কাউকে বেশি ভালো, কাউকে একটু খারাপ, এ ওর চাইতে সুবিধাজনক—এইভাবে বলতে পারা যাবে না। বলবিদ্যার চোখে তারা সকলেই তুল্যমূল্য। আর দুই, সমবেগে চলমান কোনো বস্তুর প্রকৃত বা পরম বেগ কত বা কেমন তাও আপনি বলতে পারবেন না। আপনি শুধু কোনো বিশেষ একটা নির্দেশাক্ষ ধরে নিয়ে তার সাপেক্ষে সেটি কী আপেক্ষিক বেগ নিয়ে চলছে তা বলতে পারেন। এর বেশি কিছু বলতে গেলেই বিপদে পড়ে যেতে পারেন কিন্তু। বিজ্ঞানীরা এমনিতে যথেষ্ট ভদ্রলোক। কিন্তু আমি দেখেছি, খেয়াল-খুশি মতো, অর্থাৎ, চলতি সাধারণ বুদ্ধির পরামর্শে প্রাকৃতিক নিয়ম-টিয়ম নিয়ে একটুও কচলাকচলি করতে গেলে তাঁরা বেজায় ক্ষেপে যান। আপনাকে তখন ওনারা অর্বাচীন, মূর্খ, মূঢ়, নির্বোধ, পামর, জ্ঞানদ্রোহী, সত্যদ্বেষী, ইত্যাদি অনেক কিছু কড়া কথা বলে দিতে পারেন! অন্তত মনে মনে!!

অথঃ ত্বরণ-রহস্য

নিউটনের গতিসূত্র কিন্তু একটি নয়, তিনটি। আমরা এযাবত একটার কথাই বলেছি। যেটার ধারণা তিনি গ্যালিলেওর থেকে নিয়ে গাণিতিক পরিভাষায় লিখে ফেললেন। এবার দ্বিতীয়টাতে যাওয়া যাক। প্রথম সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল, বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করলে বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন হয় না। দ্বিতীয় সূত্র থেকে জানা গেল, বল প্রয়োগ করলে ঠিক কী হয়। নিউটনের কথায়, বাহ্যিক বলের ঠেলায় পড়ে বস্তুর আপেক্ষিক বেগের পরিবর্তন হয় (বাড়ে বা কমে, এবং/অথবা, অভিমুখ বদল করে) এবং এই পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। এই পরিবর্তন শব্দটা খুব জরুরি। এইখানেই যে আরিস্ততলের থেকে আধুনিক বলবিদ্যার ধ্যান-ধারণা আলাদা হয়ে গিয়েছিল তা অনেকে ধরতেই পারেননি। আরিস্ততল মনে করতেন, বল প্রয়োগ করলে গতির সৃষ্টি হয়; আর গ্যালিলেওকে অনুসরণ করে নিউটন জানালেন, “না দাদা, বল প্রয়োগ করলে গতিবেগের পরিবর্তন হয়। গতি সৃষ্টি করার আপনি আমি কেউ নই। দুনিয়া এমনিতেই গতিময় হয়ে আছে। আমরা শুধু এখানে ওখানে এর বদল করতেই পারি। কমাতে বা বাড়াতে পারি। তাও যেগুলো হাতের সামনে রয়েছে।”
যাঁরা গাড়ি চালাতে জানেন, হয়ত ঝপ করে বলে বসবেন, “কেন মশাই, আমরা কি ব্রেক কষে গাড়ি থামাই না? আমরা কি রাস্তা ফাঁকা পেলে এবং তাড়া থাকলে গাড়ির গতিবেগ বাড়াই না? গিয়ারের কাজই তো হল গিয়ে . . ., যাক গে, ওসব বাজে কথা ছাড়ুন। গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা, জাহাজ, ইত্যাদির অ্যাক্সিলারেটর এবং ব্রেক-টেক বলে কিছু ছিল না বলেই নিউটন ওই সব আজগুবি কথা বলেছিলেন।”
আবার আমাকে বলতেই হচ্ছে, অত সহজে নিউটনের ভুল ধরতে যাবেন না। খুব সাবধানে ভাবুন। আপনি প্রকৃতই স্থির বস্তু বলে কিছু যে পাননি, সেটা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবেন না। যাকে স্থির বলে দেখেছেন, সে কারোর সাপেক্ষে স্থির, অন্য কারোর সাপেক্ষে আবার চলমান। কোনো বস্তুকেই আপনি স্থির বলে ধরে নিতে পারছেন না। সুতরাং দুনিয়ার সমস্ত বস্তুকেই আপেক্ষিক ভাবে চলমান ধরে নেওয়াই সুবিধাজনক। কেন না, স্থিরতা আর গতিশীলতার মধ্যে বলবিদ্যার দিক থেকে কোনো পার্থক্যই নেই। আর, সব কিছুই যখন (আপেক্ষিক অর্থে) চলমান, আপনি বল প্রয়োগ করে আবার কী করে তাকে চলমান করবেন? গতিশীল বস্তুর মধ্যে আবার নতুন করে গতি সৃষ্টি করার কথা ওঠে কীভাবে? আপনি বল প্রয়োগ করে শুধু তার গতির কম বেশিই করতে পারেন। অ্যাক্সিলারেটর মানে যে গতি বাড়ায়, আর ব্রেক মানে হচ্ছে যে গতি কমায়—অর্থাৎ, প্রথমটা যদি হয় ধনাত্মক ত্বারক, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঋণাত্মক ত্বারক। উভয়েরই কাজ বল প্রয়োগ করে ত্বরণ (acceleration) সৃষ্টি করা। গতির অভিমুখ বরাবর, অথবা, তার বিপরীত দিকে।
সময়ের সঙ্গে গতিবেগ পরিবর্তনের হারকে বলা হয় ত্বরণ। বস্তুর আসল অর্থাৎ নির্দেশাক্ষ-নিরপেক্ষ বেগ জানা না গেলেও নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর উপর প্রযুক্ত বলের পরিমাণ অনুযায়ী উৎপন্ন ত্বরণ কিন্তু সঠিকভাবে জানা যায়। বিজ্ঞানীরা একে মাপজোক করে জানতে পারেন। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র এই ব্যাপারে তাঁদের খুবই সাহায্য করে থাকে। সাধারণ মানুষও ত্বরণের অস্তিত্ব যে কোনো যানবাহনের গতির ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন। স্টেশনে থেমে থাকা গাড়ি চলতে শুরু করলে আমরা সামান্য পেছনে হেলে যাই। গাড়ি খুব দ্রুত চলতে চলতে ঝট করে থেমে গেলে আমরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। গাড়ি এক দিকে বাঁক নিলে আমরা উলটো দিকে কাত হয়ে যাই একটু। এই সব ঘটনা আমাদের সকলেরই জানা আছে। কিন্তু এর ব্যাখ্যা যে এই ত্বরণের ধারণা থেকে পাওয়া যায় সেটা আমাদের অনেকের খেয়াল থাকে না। স্থিতিজাড্য (inertia of rest) আর গতিজাড্য (inertia of motion) দিয়ে ব্যাখ্যা করার ফলে ত্বরণের প্রশ্নটা অনেকেরই মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। অথচ, গাড়ির ক্ষেত্রে ত্বরণ আর যাত্রীর ক্ষেত্রে যে এটা জাড্যের বিষয়—এইভাবে এই সব ঘটনাকে বোঝা দরকার। কিংবা, জাড্য মানে হল সমবেগে চলবার আগ্রহ, এবং ত্বরণে অনীহা—এইভাবেও বুঝতে পারেন।
আবার আইনস্টাইনের কথায় ফিরে যাই: “বাইরে থেকে বল প্রয়োগের ফলে বেগের পরিবর্তন হয়। টানা বা ঠেলার ফল হিসাবে বেগ সৃষ্টি হয় না, বেগের পরিবর্তন হয়। বেগের একই অভিমুখে অথবা বিপরীত অভিমুখে ক্রিয়া করছে দেখে বুঝতে হবে, বেগ বাড়বে না কমবে। . . . এই সঠিক রাস্তা ধরে আমরা গতি সম্বন্ধে গভীরতর ধারণা লাভ করি। আমাদের স্বজ্ঞান বলের সাথে বেগের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দেখালেও বলের সঙ্গে বেগের পরিবর্তনের যে সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়েছিল সেটাই নিউটন প্রবর্তিত সাবেকি বলবিদ্যার ভিত্তি।” [Ibid]
আইনস্টাইনের তত্ত্বকে বোঝার জন্য এই ত্বরণের প্রশ্নে আমাদের আবার পরে ফিরে যেতে হবে। আপাতত আর দু একটা সাধারণ জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে।
আরিস্ততলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে গ্যালিলেও-নিউটনের তত্ত্বের পার্থক্যের মাত্রাটা আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার। এখনকার গাণিতিক পরিভাষায় দেখলে আরিস্ততলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতিবেগ হচ্ছে প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক; আর নিউটনের সূত্র অনুসারে গতিবেগ পরিবর্তনের হার (বা ত্বরণ) হচ্ছে প্রযুক্ত বলের সঙ্গে সমানুপাতিক (পার্শ্বটীকা-২ দ্রষ্টব্য)। দ্বিতীয়ত, আরিস্ততলের মতে, বল প্রয়োগ না করলে সচল বস্তু থেমে যাবে; আর গ্যালিলেও এবং নিউটন দেখালেন, বল প্রয়োগ না করলে সমবেগে সচল বস্তু চলতেই থাকবে। অর্থাৎ, বল-শূন্য অবস্থায় স্থির কিংবা সমবেগে গতিশীল বস্তুর মধ্যে বলবিদ্যার নিয়মের দিক থেকে তফাত করা যায় না। তৃতীয়ত, আরিস্ততলের সিদ্ধান্তটা মোটামুটি সঠিক হিসাব দেবে যদি একটা বস্তুকে কোনো (থকথকে কাদা, গাঢ় আঠা বা জেলির মতো) সান্দ্র মাধ্যম (viscous medium)-এ রেখে তার উপর বল প্রয়োগ করা হয় এবং সেখানে সেই বস্তুর বেগের সঙ্গে প্রযুক্ত বলের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, একটা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও বিশেষ পরিস্থিতিতে আরিস্ততলের সূত্রও সঠিক। একেবারে সবটাই ভুল ছিল না। কিন্তু সাধারণভাবে গতির সূত্র হিসাবে অবশ্যই ভ্রান্ত ছিল।
_________________________________________________________________________
পার্শ্বটীকা-২
আরিস্ততলের ধারণাকে গ্রহণ করলে বলের সঙ্গে বেগের সম্পর্ক আমাদের এই সমীকরণ দিয়ে লিখতে হবে:
F = m.v = m.ds/dt,
আর, পক্ষান্তরে নিউটনের ধারণাকে গ্রহণ করে বলের সঙ্গে বেগের পরিবর্তনের হার কীভাবে যুক্ত তা আমাদের এই সমীকরণ দিয়ে লিখতে হবে:
F = ma = m.dv/dt = m.d^2s/dt^2.
F=ma =m.dv/dt
অঙ্কের জগতে এই দুই ধারণার মধ্যে পার্থক্য বিরাট। অনেককেই দেখেছি, এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে না পেরে, বা এমনকি চেষ্টাও না করে, আরিস্ততলের চিন্তাগুলিকেই নিউটনের বলবিদ্যার ধারণা বলে চালাতে।
[এখানে F = প্রযুক্ত বল, m = ভর, s = সরণ, এবং t = সময়; ds/dt এবং d^2s/dt^2 দ্বারা যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের অবকলন বোঝানো হয়েছে।]
_________________________________________________________________________

পরম বেগ কোথায় পাব?

নিউটনের বলবিদ্যার সাফল্য এক কথায় বলতে গেলে বিরাট। অন্তত দুশ বছর (১৬৮৭-১৮৮৭) এর রাজত্ব ছিল অবিসম্বাদিত। কেউ এর বিরুদ্ধে ট্যাঁ-ফো করতে পারেনি। কয়েকটা খুব ছোটখাটো সূত্রের সাহায্যে যেভাবে পার্থিব বস্তু থেকে শুরু করে গ্রহ নক্ষত্র পর্যন্ত সব কিছুর গতির রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছিল তা এক কথায় প্রচণ্ড বিস্ময়কর। এই সূত্রের সাহায্যে এডমন্ড হ্যালি একটা ধূমকেতুর কক্ষপথ ও আবর্তন কাল অঙ্ক কষে বের করে বললেন, সে ৭৫-৭৬ বছর পরে পরে পৃথিবীর আকাশে ফিরে ফিরে দেখা দেবে, এবং হ্যালি ততদিন বেঁচে না থাকলেও সত্যিই নির্দিষ্ট সময়ে সে দেখা দিল, বোঝা গেল এই তত্ত্বের শক্তি কেমন!
এই তত্ত্বের সাহায্যেই কিছু আকাশ পর্যবেক্ষকের সন্দেহ হল, শনির পরেও হয়ত আর একটা গ্রহ আছে যাকে খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না। টেলিস্কোপ তাক করে বসে থাকতে থাকতে আবিষ্কার হল ইউরেনাস। তারপর এক শতক বাদে নেপচুন। আরও বছর পঞ্চাশেক বাদে পাওয়া গেল প্লূটোকে। এইভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল বহু ধূমকেতুকে, মঙ্গল আর বৃহস্পতির মধ্যেকার সদা ঘুর্ণায়মান গ্রহচূর্ণরাশিকে। তারপর . . .
মজার কথা হল, নিউটন তাঁর সমগ্র তত্ত্বকাঠামোয় বিশ্ব চরাচরের সমস্ত বস্তুর আপেক্ষিক স্থিতি ও গতি নিয়ে কাজ করলেও আরিস্ততলের সেই পরম স্থিতি ও গতির ধারণাকে একেবারে ছাড়তে পারলেন না। বেগ = দূরত্ব/সময়। বেগ যদি আপেক্ষিক হয়, দূরত্বের মাপ বা সময়কেই বা পরম বলা যায় কীভাবে? আবার এটাও ঠিক যে একটা বস্তুর দৈর্ঘ্য কিংবা একটা ঘটনার প্রবাহকাল নির্দেশাক্ষ নির্বিশেষে একই থাকে। আমি যে জামা পরে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি, গাড়িতে উঠলে সে তো আর ছোট-বড় হয়ে যায় না। হাতঘড়িতে সময় দেখে গ্যালোপিং ট্রেনেও স্টেশনের ঘড়ির সাথে মেলাতে পারি। তার মানে এই মাপগুলি পরম বলাই যায়। অতএব, এমনিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও পরম গতির দেখা না পেলেও তিনি ধরে নিলেন, কোনো এক সুদূর অতীতে এই বিশ্বজগত একদম স্থির ছিল। খুব দূরের কোনো প্রান্তে নিশ্চয়ই এখনও তার চিহ্ন থেকে গেছে, যা হয়ত একদিন আবিষ্কার হবে। তার সাপেক্ষে অন্য সমস্ত বস্তুর গতিই পরম গতি হিসাবে চিহ্নিত করা যাবে।
তখন নিউটনের সামনেও এই প্রশ্ন এসে গেল, তাহলে প্রথম গতির উৎস কী ছিল? পরম স্থিতি থেকে প্রথম দিনের সেই পরম গতির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল? উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনিও শেষ পর্যন্ত সন্ত আকুইনাস হয়ে আরিস্ততলের দ্বারস্থ হলেন। বা বলা ভালো, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের।
তবে তখন বিশ্ব ধারণার ব্যাপ্তি বেড়েছে। আবার জ্ঞানও বেড়েছে। অতএব নিউটন ভগবানের কাজের বোঝা যথেষ্ট কমিয়ে দিলেন। রোজ রোজ ঠেলাঠেলি করতে হচ্ছে না। সেই অতীতের চরম স্থির বিশ্বকে তিনি শুধু একবার এক রামধাক্কা দিয়ে চালু করে দিয়েছিলেন। ব্যস! তারপর থেকে আর কিছু করতে হচ্ছে না ওনাকে। এই বিশ্বজগত সেই থেকে সেই ঐশ্বরিক প্রথম ধাক্কা (First Impulse)-এর ঠেলায় নিউটনের বাতলানো গতি সূত্র মেনে ঘুরে চলেছে তো চলেছেই। সেরকম একটাও যদি পরম স্থির জায়গা খুঁজে পাওয়া যায়, তার সাপেক্ষে অন্য সব কিছুরই গতি হবে পরম।
বোঝাই যাচ্ছে, বিজ্ঞানের তরফে এখানে একটা ফাঁকি রয়ে গেল!
সে যাই হোক, উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে এসে প্রথম বিজ্ঞানীদের সন্দেহ হল, দুনিয়ার সমস্ত সমস্যা নিউটনের তত্ত্বের আওতায় বোধ হয় আসে না। বা আনা যাবে না। মাইকেল ফ্যারাডে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ এবং চুম্বক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যে সমস্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার হতে শুরু করল, এদের ব্যাপারস্যাপার ঠিক নিউটনীয় গতিবিদ্যার নিয়ম মেনে চলতে রাজী নয়। তারপর ১৮৬০-এর দশকে জেম্‌স ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎ এবং চুম্বকের বিভিন্ন ধর্মগুলোকে সংযোজিত করে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে এক দারুণ জিনিস আবিষ্কার করে বসলেন। তিনি দেখলেন, বিদ্যুৎ আর চুম্বকের মৌল বৈশিষ্ট্যগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং গভীরভাবে অন্বিষ্ট। চৌম্বক ক্ষেত্রে একটা তড়িৎ পরিবাহীকে দ্রুত চালিত করলে তার মধ্যে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র উৎপন্ন হয়; আবার বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে একটা লোহার রডকে নাড়ালে তাতে চুম্বকত্ব দেখা যায়। তার মানে এরা কেউ একে অপরের থেকে একেবারে আলাদা কিছু নয়। শুধু তাই নয়, চুম্বক এবং বিদ্যুতের প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়াকে একই রকম সমীকরণের সাহায্যে একই সঙ্গে প্রকাশ করা যাচ্ছে।
এর পর ম্যাক্সওয়েল যা দেখলেন তা আরও বিস্ময়কর। তাঁর সমীকরণগুচ্ছ থেকে তিনি তড়িচ্চৌম্বক তরঙ্গের যে গতিবেগ পেলেন তা আলোকের গতিবেগের সমান। এবং এই সব তরঙ্গ কোনো মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যেমন যেতে পারে, তেমনই শূন্য মাধ্যমেও চলাচল করতে পারে। তিনি দাবি করলেন, আলোও নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বিস্তারের সীমানার মধ্যে এক রকম তড়িচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি এই তরঙ্গের যে গতিবেগ নির্ধারণ করার একটি সরল সূত্র পেলেন তা হল নিম্নরূপ:
MM
এইবার এক বড় সমস্যার সামনে পড়া গেল। নিউটনের গতিসূত্র এবং আপেক্ষিকতা অনুযায়ী কোনো কিছুর গতিবেগ তার নির্দেশাক্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধরা যাক, নদীতে নৌকায় করে আপনি কোথাও যাচ্ছেন। সকলেই জানেন, নৌকা যদি জলের স্রোতের সঙ্গে একই দিকে যায়, দুটো বেগ যুক্ত হয়ে নৌকা জোরে ছুটবে। আর বিপরীত দিকে গেলে আস্তে আস্তে চলবে। এমনকি এও জানা আছে যে নদী আড়াআড়িভাবে পার হতে হলে নৌকাকে স্রোতের বিপরীত দিকে একটু কোনাকুনি করে যাত্রা করতে হবে। তার মানে হল, বস্তুর গতিবেগ তার মাধ্যমের গতিবেগের সাথে ভীষণভাবে যুক্ত। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সূত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে তড়িচ্চৌম্বক তরঙ্গের বিস্তার সে যে মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে তার অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল নয়। শূন্য মাধ্যমেও সে বিস্তার লাভ করতে পারে। আর এদের গতিবেগ মাধ্যমের গতিবেগের সাথে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নয়। বরং উল্টোদিকে, নির্দেশতন্ত্র বদলে দিলে ম্যাক্সওয়েল সমীকরণের চেহারাই বদলে যায়, যা এমনকি গ্যালিলীয় আপেক্ষিকতার ধারণার সাথেও খাপ খায় না। অর্থাৎ, আমরা যে আশা করেছিলাম, গতিসূত্রের নিয়মগুলি নির্দেশতন্ত্রের উপর নির্ভর করা উচিত না, সেখানেই সমস্যা দেখা দিল।
এইখানে এসে নিউটনের গতিবিদ্যার সাথে ম্যাক্সওয়েলের সূত্রের ব্যাপক বিরোধ হয়ে গেল। মুশকিল হচ্ছে, কাউকেই ছাড়া যাচ্ছে না। নিউটনের সূত্রগুলো এতভাবে এত জায়গায় প্রযুক্ত ও পরীক্ষিত হয়ে উঠে এসেছে যে তাকে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার ম্যাক্সওয়েলের সূত্রগুলিও একদিকে অন্য ধরনের বহু পরীক্ষার ফসল এবং তার পেছনেও রয়েছে এক নিশ্ছিদ্র তাত্ত্বিক ও গাণিতিক বিজ্ঞানের বিকাশ। তাকেই বা অস্বীকার করার উপায় কী?
অধিকাংশ বিজ্ঞানীই নিউটনকে বাঁচিয়ে সমস্যাটার সমাধান খুঁজতে চাইলেন। তাঁরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চারদিকে একটা কোনো মাধ্যম আছে যা অদৃশ্যভাবে পরিব্যাপ্ত বলে আমরা তার অস্তিত্ব টের পাই না। ইথার। কত গুণ যে তার উপর আরোপিত হল: টানলে বাড়ে আবার ছেড়ে দিলেই যে কে সেই। স্থির, নিঃশব্দ, সর্বভেদী, নিখুঁতভাবে স্থিতিস্থাপক, ইত্যাদি। (দেশে দেশে কত ধর্মতাত্ত্বিক তখন সরল বিশ্বাসে ইথারের সাথে আত্মার ধারণাকে মেলাতে পেরে পুলকিত!) তখন ভাবা হল, আচ্ছা, এমন একটা পরীক্ষার আয়োজন করা যাক, যাতে ইথার মাধ্যমে বিভিন্ন দিকে আলোকের গতিবেগ মাপার চেষ্টা করা হবে। যদি দুদিকে দুরকম মান পাওয়া যায়, তাহলেই কেল্লা ফতে। নিউটনকে বাঁচিয়েই ম্যাক্সওয়েলকে মেনে নেওয়া যাবে। ১৮৮১ সালে এডওয়ার্ড মাইকেলসন, ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন ও অ্যালবার্ট মর্লি দু দুবার খুব সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি সাজিয়ে পরীক্ষা করলেন। কিন্তু কোথায় কী? আলোকে যেদিকেই মাপা হচ্ছে, বেগ একই দেখাচ্ছে।
কী দুঃসংবাদ ভেবে দেখুন একবার। সেই একটা পরম বেগ হাতের কাছেই খুঁজে পাওয়া গেল, কিন্তু যিনি এর কথা কত আগে ভেবে রেখেছিলেন, তাঁর এযাবতকালের বিপুলভাবে সফল তত্ত্বের সাথেই সে অসহযোগিতা করবে বলে পণ করেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দ তখন সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। ১৮৭৮ সালে একদিন প্রথিতযশা পদার্থবিজ্ঞানী জোহান ফিলিপ ফন জোলির কাছে যুবক মাক্স প্লাঙ্ক গিয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণার ব্যাপারে পরামর্শ নিতে। জোলি তাঁকে বোঝালেন, “দেখ বৎস, সত্যি কথা বলতে কি, পদার্থবিজ্ঞানে আর বিশেষ নতুন কিছু করার নেই। দুনিয়ার প্রায় সমস্ত দুর্জ্ঞেয় রহস্য উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় মাপজোক এখনও বাকি আছে। তুমি বরং রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের কিছু ভালো সমস্যা নিয়ে ভাবতে পার।” সেরকম সময়ে নিউটন-ম্যাক্সওয়েল তত্ত্বের এই ঝামেলা মেটাতে হেন্ড্রিক আন্টুন লোরেঞ্জ, জর্জ ফ্র্যান্সিস ফিটজেরাল্ড, হ্বোলডেমার ফয়েগট, প্রমুখ বললেন, এক কাজ করা যাক, ধরে নেওয়া যাক, ইথারের মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে বস্তুর দৈর্ঘ্য কমে যায় আর সময় মন্থর হয়ে পড়তে থাকে। তাতে সব দিকই বজায় থাকে। অঙ্কগুলো মিলে যায়। অঁরি পোয়াকার বললেন, “আরে বাবা, দৈর্ঘ্য বল আর প্রস্থ, সে সবই তো আমাদেরই হিসাব নিকাশ। তাতে সামান্য এদিক ওদিক করলে কী-ই-বা এসে যায়? সময়কেও না হয় সেভাবেই মাপা যাবে!”
নিউটনের রেখে যাওয়া সেই ফাঁকিকে কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানের এলাকা থেকে হঠানো যাবে তা নিয়ে তখনও কেউ ভাবতে শুরু করেননি। পরম স্থিতি, পরম গতি আর ইথার! ফাঁকির উপরে ফাঁকি!!
শতাব্দের শেষটা তাঁদের কিন্তু ভালো কাটল না।
আপেক্ষিকতার নতুন বেশ: সমকালিকতা
এর কিছু কাল পরেই আইনস্টাইনের মঞ্চে প্রবেশ। তিনি তখন ভালো কোনো চাকরি পাননি। একে তাকে ধরে জুরিখের পেটেন্ট অফিসে একটা টেকনিক্যাল পোস্টে কাজ পেয়েছেন। বিকেলে বিজ্ঞান পাঠরত বা গবেষণারত বন্ধুদের সঙ্গে কাফেতে বসে আড্ডা দেন। সন্ধেবেলায় বাড়ি এসে নিজের মতো করে বিজ্ঞানের কিছু কিছু সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামান।
সেই তিনি ১৯০৫ সালে তিন চার মাসের মধ্যে এক বিজ্ঞান পত্রিকায় পরপর এমন পাঁচখানা গবেষণাপত্র পাঠালেন, যার প্রত্যেকটাই এক একটা যুগান্তকারী কাজ। তারই একটার জন্য তিনি আঠের বছর বাদে নোবেল পুরস্কার পাবেন, কিন্তু সব কটার জন্যও পেতে পারতেন অন্তত পাঁচটা নোবেল। কারোর তাতে মন খারাপ হত না! আমরা এখানে অন্যগুলো নিয়ে মাথা ঘামাব না। শুধু একটা দুটো পত্রের কথাই বেশি করে আলোচনা করব; তবে পাঠকদের বলব, সময় সুযোগ পেলে বাকিগুলোর সম্বন্ধেও জেনে নেবেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এরকম কাণ্ড আর কখনও ঘটেনি, এর আগেও না, পরেও না। অন্তত আজ অবধি।
আপেক্ষিকতার পত্রের নিরীহ শিরোনাম দেখে প্রথমটায় কেউ বুঝতেই পারেননি তাতে কী সাংঘাতিক একখানা টাইমবোমা পুরে দেওয়া আছে। ভারি সহজ সরল সব অঙ্ক। যুক্তির ধার খুব সাদামাটা। কিন্তু . . .
প্রথমেই এ কী বলেছেন তিনি? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বস্তুর গতির রহস্য পুরোপুরি বুঝতে হলে আমাদের মেনে নিতে হবে দুটো খুব সরল বিবৃতি: (১) পারস্পরিকভাবে সমবেগে গতিশীল সমস্ত নির্দেশাক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলি সিদ্ধ; (২) অতএব, ম্যাক্সওয়েলের আবিষ্কৃত নিয়মটিও এরকম যে কোনো নির্দেশাক্ষেই সমানভাবে সত্য, অর্থাৎ, যে কোনো নির্দেশাক্ষের সাপেক্ষেই আলোকের গতিবেগ ধ্রুবক।
তার মানে কী?
প্রথমত, নিউটনের সময়ে মূলত বলবিদ্যাতে যান্ত্রিক শক্তি ও গতির বিষয় নিয়ে চর্চা হলেও এখন তার পাশাপাশি তড়িচ্চুম্বকীয় গতিও সমান গুরুত্ব অর্জন করেছে; সুতরাং তাকেও গতি সংক্রান্ত বিচার বিবেচনায় আমাদের ধরতে হচ্ছে। তাই শুধু বলবিদ্যার নিয়ম নয়, সমগ্র পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলির কথা মাথায় রেখেই এগোতে হবে। দ্বিতীয়ত, তারই ফল স্বরূপ, গ্যালিলেওর আবিষ্কৃত মৌল নিয়ম, অর্থাৎ, কোনো নির্দেশাক্ষে বসেই বস্তুর গতি বা স্থিতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করা যায় না, তেমনই আলোকের গতিবেগ যে মাধ্যমের গতিবেগ নিরপেক্ষ, সেই তথ্যটিকেও মাথায় রেখেই গতির প্রশ্নের মীমাংসা করা উচিত। যদি দেখা যায়, পুরনো নির্দেশাক্ষ ধরে এগোতে গেলে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, তাহলে নির্দেশাক্ষের সমীকরণগুলোকেই বরং পালটে ফেলার সময় হয়েছে।
তার আরও মানে হল, আমরা এযাবত যেভাবে ধরে নিয়েছিলাম, (ক) দৈর্ঘ্যের মাপ নির্দেশাক্ষ নিরপেক্ষ, (খ) সময়ের মাপও নির্দেশাক্ষের উপর নির্ভর করে না, (গ) দেশ ও কাল পরস্পর নিরপেক্ষভাবে অস্তিত্বশীল, ইত্যাদি, সেই ধারণাগুলো আমাদের এখন বদলাতে হবে। একমাত্র তাহলেই সব দিক বজায় থাকবে। সমস্ত ফাঁকিগুলো ফুকে যাবে। ইথার-ফিথার সব (এ মাঃ, এবার তাহলে আত্মাকে কার ঘাড়ে চাপাব?)!
আইনস্টাইন একেবারে মূলে চলে গেলেন। বললেন, এতদিন আমরা সময়কে সর্বত্র ধ্রুবক ভেবে এসেছি। আর তার ফলে বলের ক্রিয়া বোঝার সময় সময়ের প্রশ্নটাকে কার্যত বাদ দিয়ে রেখেছি। কিন্তু না। এখন আলোকের গতিবেগ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই ধ্রুবক ভাবা চলবে না। দরকারও নেই। আর সময়ের ব্যাপারটাকে ভালো করে বুঝে নিতে হবে। কেন না, আমরা দৈর্ঘ্যই মাপি আর সময়, আসলে সব জায়গাতেই সময় দিয়েই মাপতে হয়। আর, আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, সময়ের সমকালিকতা (simultaneity)–ই হচ্ছে সব রকম মাপনের আসল চাবিকাঠি।
কথাটা নিশ্চয়ই স্পষ্ট হল না। ভয়ের কিছু নেই। কারোর কাছেই হয়নি। আইনস্টাইন বুঝিয়ে দেবার পর অবশ্য খুব সহজ মনে হয়েছে। আমরা যখন বলি ঘড়িতে সাতটা বেজেছে, এর মানে কী? ভেবে দেখুন, এর মানে দাঁড় করাতে হলে একটা নয়, কম পক্ষে দুটো ঘটনার উল্লেখ করতে হবে। যেমন, ঘড়ির ছোট কাঁটা সাতের ঘরে পৌঁছেছে, বড় কাঁটা বারোর ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। মানে এই দুটো ঘটনা এক সাথে, বা, যুগপৎ, ঘটেছে। এইভাবে বলা ছাড়া ঘড়িতে সময় বলার অন্য কোনো উপায় আছে কিনা ভেবে দেখতে পারেন। কিংবা যদি বলা হয়, হাওড়া দিল্লি কালকা মেল দিল্লি জংশনে সাড়ে সাতটায় পৌঁছল—এই কথারই বা মানে কী? এরও মানে হল, ট্রেনটির দিল্লি জংশনের কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে ঢোকা আর স্টেশনের ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজা—এই দুটো ঘটনা এক সঙ্গেই ঘটল। যে কোনো ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে আমাদের এইভাবে বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
বেশ। এটা বোঝা যাচ্ছে। সত্যিই সহজ সরল কথা।
কিন্তু দৈর্ঘ্য মাপার সঙ্গে সময়ের সমকালিকতার সম্পর্ক কী?
আছে, আছে। ধৈর্য ধরে ভাবুন। মনে করুন, আপনি জলের মধ্যে ছুটে বেড়ানো অবস্থায় একটা কাতলা মাছের দৈর্ঘ্য মাপতে চাইছেন। কী করবেন? একটা মাপন যন্ত্র (যেমন, জ্যামিতির বাক্সের কাঁটা-কম্পাস, শুদ্ধ বাংলায় যাকে বলে ডিভাইডার) নিয়ে তার দুই প্রান্ত মাছের লেজ এবং মুড়োর পাশে ধরে সেই ফাঁকটা স্কেলের সাথে তুলনা করে নেবেন। তাই না? কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, আপনাকে সেই দুই প্রান্ত অতি অবশ্য এক সাথে (অর্থাৎ, যুগপৎ) ঠেকাতে হবে মাছের লেজের ধারে এবং মাথার প্রান্তে। যদি আগে-পরে হয়ে যায় মাপেরও পুরো গণ্ডগোল হয়ে যাবে। কেন না, মাছটা জলের মধ্যে চলাফেরা করছে যে!
আপনি বলতে পারেন, মাছটা এক জায়গায় স্থির থাকলে তো আমাদের এইভাবে যুগপৎ ব্যবহার করতে হত না। ধীরে সুস্থে প্রথমে এই প্রান্তে একটা কাঁটা পরে আর এক প্রান্তে অন্যটা ঠেকালেই হত। তা ঠিক। কিন্তু দুনিয়ায় কে আর এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছে আপনার মাপার অপেক্ষায়? সকলেই তো কোনো না কোনোভাবে চলছে। জায়গা বদলাচ্ছে। তাছাড়া আমরা তো আর পৃথিবীর বুকে হালকা চালের গতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বুকে গতি স্থিতির সমস্যা বুঝতে চাইছি। সেখানে কে কার সাপেক্ষে স্থির হয়ে বসে আছে আমার বা আপনার জন্য? তার থেকে আইনস্টাইনের এই সমকালিকতার ব্যবস্থাপনা মেনে নেওয়াই ঢের বেশি সহজ এবং স্বাভাবিক।
MM
চিত্র নং – ২: মাছের দৈর্ঘ্য মাপছেন
এর পর আইনস্টাইন আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তুললেন, দুটো ঘটনার সমকালিকতা কি সকল দর্শক একই রকম দেখবেন? যে কোনো নির্দেশাক্ষ থেকে যে দেখবে সেই কি যুগপৎ ঘটতে দেখবে?
এবার একটা কাল্পনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন তিনি, যাতে সমস্যাটা সবাই বুঝতে পারে।
ধরা যাক, একটা বড় গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার কোনো কামরার দুই প্রান্তে দুটো আলোক উৎস লাগানো আছে। কামরাটির ঠিক মাঝখানে একজন নিরীহ যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। এবার ধরা যাক, দুটো বাল্ব থেকে এক সঙ্গে আলোর ঝলক বেরল। স্বভাবতই গাড়ির যাত্রীর কাছে সেই দুদিকের আলো (দূরত্ব এবং আলোকের গতিবেগ সমান হওয়ার কারণে) এক সঙ্গেই এসে পৌঁছবে (চিত্র নং – ৩ক)। তিনি সিদ্ধান্ত করবেন, এই বাল্বদুটির ঝলক যুগপৎ ঘটেছে।
এইবার ভাবা যাক, গাড়িটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেখানে দাঁড়িয়ে অন্য এক দর্শকও সেই দুদিকের আলোর ঝলকানি দেখলেন। নিশ্চয়ই তিনিও দেখতে পাবেন যে দুই বাল্বের আলোর ঝলকানি একই সময়ে সেই যাত্রীর গায়ে এসে পড়েছে। কেন না, তাঁরা দুজনে কার্যত একই নির্দেশাক্ষ সাপেক্ষে ঘটনাটি দেখছেন (চিত্র নং – ৩খ)।
আচ্ছা, তারপর মনে করুন, গাড়িটি সমবেগে চলতে শুরু করল। তখন কী হবে? তখনও কামরার দুই প্রান্ত থেকে আলোর ঝলকানি আসছে। দুজনে কি এবারেও একই দৃশ্য দেখবেন?
MM
চিত্র নং – ৩ক
MM
চিত্র নং – ৩খ
না, গাড়িটি সমবেগে চলতে শুরু করলেও গ্যালিলেওর সূত্র অনুসারে যাত্রীর কাছে উপরোক্ত ঘটনার কোনো হেরফের হবে না। (হে পাঠক! সেই যে কথাটা কিছুক্ষণ আগে মনে রাখতে বলেছিলাম, সেটাকে এখানে স্মরণ করুন!) তিনি আগের মতোই দুদিক থেকে ঝলকানির যুগপত্তা দেখতে থাকবেন। কেন না, গাড়ির সাপেক্ষে তিনি এখনও একই নির্দেশাক্ষে অবস্থান করছেন। এই জাতীয় পরীক্ষা/পর্যবেক্ষণ করার সময় গাড়িটি থেমে আছে না সমবেগে চলমান—তাঁর কাছে তার কোনো গুরুত্ব নেই, বা বোঝার কোনো উপায়ও নেই। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের ব্যক্তির কাছে ঘটনাটা আর আগের মতন নয়। কারণ, এখন যাত্রীর তুলনায় তিনি এক ভিন্ন নির্দেশাক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দেখবেন, চলমান অবস্থায় এগিয়ে যাওয়ার কারণে দূরত্ব কমে যাওয়ার ফলে সম্মুখের বাল্ব থেকে আলোর ঝলকানি যাত্রীর কাছে একটু আগে পৌঁছে যাবে। আর পেছনের বাল্ব থেকে আলো যেহেতু বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে যাত্রীর কাছে পৌঁছবে, তার আসতে সামান্য হলেও বেশি সময় লাগবে (চিত্র নং ৩গ)। কেন না, উভয় দিকেই আলোর গতিবেগ একই। গাড়ির গতিবেগ তার সাথে যোগ করাও যাচ্ছে না, বিয়োগ করাও যাচ্ছে না। তিনি আর অতএব যাত্রীর গায়ে দুদিকের আলোর যুগপৎ ঝলকানি দেখতে পাবেন না। সামনের আলোর ঝলক যাত্রীর কাছে পৌঁছানোর একটু পরে দ্বিতীয় ঝলক আসতে দেখবেন।
MM
চিত্র নং – ৩গ
এই জায়গাটা আইনস্টাইন চমৎকার করে বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর সেই পত্রে। সমকালিকতা যদি নির্দেশাক্ষ নির্ভর হয়, আর মাপজোক যদি সমকালিকতা ভিত্তিক হয়, তার মানে হল, পারস্পরিক সাপেক্ষে সমবেগে চলমান দুটো ভিন্ন নির্দেশাক্ষে সময় এবং দৈর্ঘ্যের মাপ এক হবে না। সামান্য হলেও উনিশ বিশ হয়ে যাবে। কতটা আলাদা হবে, সেটা নির্ভর করবে আলোর গতিবেগের তুলনায় সেই পারস্পরিক বেগ কতটা তার উপর। যদি আলোর তুলনায় গতিবেগ সামান্য হয়, তাহলে নিউটনের সূত্রে কোনো ভুল ধরা পড়বে না। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা সূত্রের দরকার পড়বে না। সেই কারণেই আমরা এতকাল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত ঘটনাবলির ক্ষেত্রে নিউটনের গতিসূত্র নিয়ে কাজ করতে কখনও কোনো অসুবিধায় পড়িনি।
কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে বস্তুর গতিবেগ খুব বেশি এবং আলোর গতিবেগের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে ওঠে, সেই সব জায়গায় আর নিউটনের সূত্র দিয়ে কাজ করা যাবে না। আইনস্টাইনের সাহায্য নিতেই হবে। যেমন পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনের গতিকে বুঝতে গেলে আর নিউটনীয় ফরমুলা দিয়ে কাজ হয় না। সেখানে এই আইনস্টাইনীয় ফরমুলাই কাজ করবে। কিংবা অনেক দূরের মহাজাগতিক ঘটনাবলি বোঝার ক্ষেত্রে।
আপেক্ষিকতার শিকার: সময় দৈর্ঘ্য ভর
ও হো, দুঃখিত, একটু বেশি এগিয়ে গেছি আমরা। মাপগুলো কীভাবে আলাদা হবে সেটা এখনও বলাই হয়নি। ঠিক আছে, সময় দিয়েই শুরু করি।
সেই যাত্রীকে এবার আমরা বসিয়ে দিচ্ছি গাড়ির ভেতরেই একটা ঘড়ির সামনে। ঘড়িটা একটু বিশেষ ধরনের। যে কোনো ঘড়ি হলেই কাজ হত, কিন্তু ব্যাপারটাকে নাটকীয় করে তোলার জন্য এই আয়োজনটা করতে হচ্ছে। মেঝেয় একটা আলোকের উৎস রয়েছে; তার থেকে উৎসারিত রঙিন আলোর ঝিলিক গাড়ির ছাদের নীচেতে রাখা একটা দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে আবার নীচে ফিরে আসছে এবং সেখানে রাখা আর একটা দর্পণ থেকে একইভাবে আবার উপরে চলে যাচ্ছে। একবার উপরে গিয়ে প্রতিফলিত রশ্মি নীচে নেমে এলে পাশে রাখা মনিটরে সময় দেখাচ্ছে—ধরা যাক, ৪-২৬-০৫, ৪-২৬-১০, ৪-২৬-১৫, . . ., এইভাবে। মানে, একবার উঠে নীচে নেমে আসতে সেই ঝিলিকের সময় লাগছে (ধরে নিন) পাঁচ ন্যানোসেকেন্ড।
প্ল্যাটফর্মেও এরকমই একটা ঘড়ি রাখা আছে। দুটো ঘড়ি পরীক্ষার আগে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেখাও যাচ্ছে, গাড়ির যাত্রী গাড়িতে যে সময় দেখতে পাচ্ছেন, বাইরের প্ল্যাটফর্মের দর্শকও তাঁর সামনের ঘড়িতে সেই একই সময় দেখছেন। ব্যাপারটা হল, দুজনে একই নির্দেশাক্ষে আছেন, বা পরস্পর আপেক্ষিকভাবে গতিহীন দুই নির্দেশাক্ষে অবস্থান করছেন বলেই দুজনের ঘড়ি একই রকম সময় দেখাছে (চিত্র নং ৪ক)।
এইবার গাড়িটি চলতে শুরু করল।
MM
চিত্র নং – ৪ ক (বাম) ও খ (ডান)
এখন কী হবে? এখনও কি দুজনে একই সময় দেখতে থাকবেন দুই ঘড়িতে?
না।
চিত্র নং ৪খ-তে লক্ষ করুন, প্ল্যাটফর্ম থেকে দর্শক দেখছেন, চলমান অবস্থায় গাড়ির আলোর ঝিলিক নীচ থেকে উপরে যাওয়ার সময় তির্যক পথে ভ্রমণ করছে বলে আগের তুলনায় উপরে উঠতে সময় বেশি নিচ্ছে, আবার নেমে আসার বেলায়ও তাই। ফলে নেমে আসার পর গাড়ির ঘড়ি সময়ের অঙ্কটা একই দেখালেও প্ল্যাটফর্মের ঘড়ির তুলনায় সেই অঙ্কটা কিন্তু একটু পরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
সরল জ্যামিতি আর কি। (এই যাঃ! একটা খুব দরকারি কথা ফস্‌ করে আগেই বলে ফেললাম। জমি তৈরি না করেই। ঠিক আছে, আব্বুলিশ দিয়ে রাখছি। এটা পরের অধ্যায়ে বলার কথা ছিল। আপাতত ভুলে যান।)
অর্থাৎ, প্ল্যাটফর্মের ঘড়ির পাঁচ ন্যানোসেকেন্ডের তুলনায় গাড়ির ঘড়িতে পাঁচ ন্যানোসেকেন্ড একটু দেরিতে বাজবে। গাড়ির গতিবেগ যত বাড়বে, সেই ঘড়ির পিছিয়ে পড়াও ততই বেশি হবে। সেই হিসাব কষবার জন্য আইনস্টাইন একটা নতুন আপেক্ষিকতার সমীকরণও বের করে ফেললেন।
এবার দৈর্ঘ্য।
সেও খুব সহজ হিসাব। ধরুন, সেই দর্শক প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য বের করে নিলেন। তিনি গাড়িটির পেছনের দিক প্ল্যাটফর্ম পার হতে কত সময় নিল নিজের ঘড়িতে দেখে নিলেন। এর থেকে প্ল্যাটফর্ম সাপেক্ষে গাড়ির গতিবেগ বের করে ফেলা গেল। এবার গাড়িটির ভেতরের ঘড়ি অনুযায়ী কত সময় লাগল সেটাও যদি তিনি দেখে নিতে পারেন, তাহলে গাড়ির নির্দেশাক্ষ সাপেক্ষে প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য কত হবে তাও তিনি পেয়ে যাবেন। গতিবেগকে সময় দিয়ে গুণ করে। অর্থাৎ, গতিবেগ যত বাড়বে, গাড়ির সাপেক্ষে প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য সেই অনুযায়ী কম দেখাবে (পার্শ্বটীকা-৩ দ্রষ্টব্য)।
_________________________________________________________________________
পার্শ্বটীকা-৩
আপেক্ষিকতার নতুন ধারণার ভিত্তিতে দুই নির্দেশাক্ষের মধ্যে পরিপাতন সম্পর্কগুলিকেও নতুন করে লিখতে হল। ইতিমধ্যেই ফয়েগট, ফিটজেরাল্ড এবং লোরেঞ্জ আলাদা আলাদা ভাবে গতির সঙ্গে দৈর্ঘ্য ও সময়ের পরিবর্তন কী রকম হতে পারে তার একটা সম্ভাব্য গাণিতিক পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে তা ছিল নেহাতই অঙ্ক মেলানোর অঙ্ক। আর আইনস্টাইন সেই সম্পর্কগুলিকেই নতুন পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবে দৈর্ঘ্য ও সময়ের মাপ কেন পরিবর্তিত হয় দেখিয়ে স্বতন্ত্রভাবে লিখে ফেললেন:
MM
[এখানে xyzt এবং x'y'z't' দ্বারা যথাক্রমে একটি (আপেক্ষিক অর্থে) স্থির ও তার সংগে v সমবেগে চলমান অপর একটি নির্দেশাক্ষ সাপেক্ষে একটি বস্তুর স্থানাঙ্কগুলিকে সূচিত করা হচ্ছে। শেষের সমীকরণগুলি যথাক্রমে সময়ের অলসন, দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ও ভরের বৃদ্ধি সূচিত করছে।]

হ্যাঁ, এই অবধি পড়ে কারোর কারোর মনে হতে পারে, আমরা না হয় কায়দা করে একটা ডিজিটাল ঘড়ির বন্দোবস্ত করে ব্যাপারটা দিব্যি সহজভাবে বুঝিয়ে দিলাম। আইনস্টাইনের হাতে তো সেকালে এরকম ঘড়ি নিশ্চয়ই ছিল না। তাঁকে তো সেই পুরনো আমলের গোল ডায়াল আর তাতে ঘন্টা-মিনিটের কাঁটা লাগানো যান্ত্রিক ঘড়ি দিয়েই এই সব ঘটনার ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল।
তিনি সেটা কীভাবে করেছিলেন?
বেশ, সেই চেষ্টাও করে দেখা যাক। উপরের ছবিতে দেখুন স্টেশন ও গাড়িতে রাখা দুটো যান্ত্রিক ঘড়ি। আপাতত আমরা শুধু ছোট (এখানে ন্যানোসেকেন্ডের) কাঁটাটির চলার পথের উপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখব। যখন গাড়ি থেমে আছে, অর্থাৎ, যাত্রী এবং দর্শক পরস্পর সাপেক্ষে স্থির দুই নির্দেশাক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন, দুজনের (আগে থেকে মেলানো) ঘড়ির কাঁটার চলার মধ্যে কোনো রকম অসামঞ্জস্য দেখা যাবে না (চিত্র নং ৫ক)। কিন্তু যেই গাড়িটা চলতে শুরু করল, এইবার ভালো করে খেয়াল করে দেখুন, স্টেশনের ঘড়িতে যখন ছোট কাঁটার মুণ্ড বৃত্তচাপ ধরে চলে ছবিতে দেখানো জায়গায় এসে যাবে, প্ল্যাটফর্ম থেকে দর্শক দেখবেন, গাড়ির অনুরূপ কাঁটার মুণ্ড তখনও অনুরূপ অবস্থানে এসে পৌঁছায়নি। সেটির সেই অবস্থানে এসে পড়তে একটু বেশি সময় লাগছে। কেন না, সে আর তখন বৃত্তচাপ ধরে এগোচ্ছে না, ট্রেনের গতির দরুন তাকে যেতে হচ্ছে একটা যেন লম্বাটে উপবৃত্তাকার চাপ বরাবর, যার দৈর্ঘ্য পূর্বোক্ত বৃত্তচাপের তুলনায় সামান্য হলেও বেশি (চিত্র নং ৫খ)। অতএব বুঝতেই পারছেন, ঘড়ির ডিজাইন কেমন তার উপর আপেক্ষিকতার বিষয়টা নির্ভর করছে না।
MM
তাহলে এটা বোঝা গেল, দৈর্ঘ্য আর সময়ের মাপ যে কোনো অবস্থায়, যে কোনো নির্দেশাক্ষে এক হবে না। যাকে মাপা হচ্ছে আর যেখান থেকে মাপা হচ্ছে, এই দুইয়ের মধ্যে পারস্পরিক সমবেগ থাকলে গতির অভিমুখ বরাবর দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে যাবে আর সময় মন্থর হয়ে পড়বে।
আইনস্টাইন যদিও দর্শক দিয়ে বিষয়টা বুঝিয়েছিলেন, আমরাও এখানে তাই করেছি, তথাপি এটা মনে রাখতে হবে: এই দৈর্ঘ্য আর সময়ের মাপের আপেক্ষিকতার ব্যাপারটা কিন্তু দর্শক নির্ভর ব্যাপার নয়; কেউ দেখছে বলে ঘটছে, এমন নয়। কেউ না দেখলে, এমনকি দেখার কেউ না থাকলেও, এইভাবেই ঘটবে সব কিছু। কেউ না দেখলে কি ঘড়ির কাঁটা অন্যভাবে চলবে? আবার পরমাণু বিজ্ঞান কিছু দূর এগোনোর পর দেখা গেল, মহাবিশ্বের সুদূর প্রান্ত থেকে এমন সব কণা পৃথিবীর বুকে প্রবল বেগে এসে আছড়ে পড়ছে, যাদের অর্ধায়ুষ্কাল (half-life period) এত কম যে পার্থিব সময়ের মাপে অত দূর থেকে এখানে পৌঁছানোর অনেক আগেই তাদের মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। হচ্ছে না কেন? কারণ, প্রায় আলোকের গতিবেগে চলার জন্য ওদের নিজস্ব সময়ের ঘড়ি প্রায় স্থির হয়ে থাকে; ভীষণ আস্তে আস্তে চলে। পৃথিবী থেকে কেউ যে তা দেখতে পায় তা কিন্তু নয়। তবুও। ফলে পৃথিবীর বুকে এসে পৌঁছনো পর্যন্ত সেই ঘড়ি অনুযায়ী ওদের অর্ধায়ুষ্কাল শেষ হয় না। ওরা দিব্যি জ্যান্ত অবস্থাতেই কাছাকাছি এসে পড়ে। তারপর অবশ্য বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে এবং অন্যান্য পারমাণবিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার ঠেলায় ওদের গতিবেগ একেবারে কমে যায়, ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির সঙ্গে মিলে যেতে থাকে, ওদের অর্ধায়ুষ্কালও শেষ হয়ে ওরা মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই বলছিলাম, ভাগ্যিস আপেক্ষিকতাবাদ ছিল, তাই তো ওদের সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হল।
আর একটা ছোট খবর দিলেই আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত এই পর্ব আমাদের মোটামুটি চুকে যাবে। আপেক্ষিকতার এই পত্রটি প্রকাশিত হওয়ার তিন চার মাস পরে আইনস্টাইন আবার একখনা পত্র লিখে পাঠালেন। তাতে তিনি দেখালেন বস্তুর ভরের আপেক্ষিকতা। এতদিন জানা ছিল ভর হচ্ছে যে কোনো বস্তুতে পদার্থের মোট পরিমাণ, যা তার একটা নিজস্ব পরম বৈশিষ্ট্য। নির্দিষ্ট বস্তুর ভরও নির্দিষ্ট। সুকুমার রায়ের অনবদ্য ভাষা চুরি করে বলা যেত: “ভরের আমি ভরের তুমি, ভর দিয়ে যায় চেনা!” আইনস্টাইন বললেন, এযাবত যা বলে এসেছ ভুলে যাও; এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে শিখতে হবে। গতি যে বস্তুকে কত ভাবে বদলে দেয় তোমরা ধারণাই করতে পারনি। এবার দেখ। সাধারণ গতিবেগে চলার সময় একটা বস্তু যে শক্তি অর্জন করে তাকে বলে গতিশক্তি। কিন্তু গতিবেগ বাড়তে বাড়তে যখন তা আলোকের গতিবেগের সঙ্গে তুলনীয় মাত্রায় পৌঁছে যায়, তখন গতিশক্তির কিছু অংশ বাড়তি ভর হিসাবে যুক্ত হয়ে যায়। এই বিষয়টিকেই তিনি তাঁর বিখ্যাত সেই $latex E = mc^2& সূত্রে লিপিবদ্ধ করেন। ফলে ভর আর শক্তি মিলিয়েই বস্তুতে পদার্থের পরিমাণ ভাবতে হবে। সংরক্ষণ সূত্রকেও নতুন ভাবে বলতে হবে। আলাদা আলাদা ভর ও শক্তির দুটো সংরক্ষণ সূত্র নয়; এক সংরক্ষণ সূত্রেই ভর এবং শক্তি—উভয়কে বাঁধতে হবে।
অঙ্কে মিলে গেলেও অনেকেরই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। কোথায় ভর আর কোথায় শক্তি? কিন্তু চল্লিশের দশকে যখন কণা ত্বারক যন্ত্র উদ্ভাবিত হল, তাতে পরীক্ষা করে একেবারে নিঃসন্দেহ হওয়া গেল। দেখা গেল, দশ মিলিয়ন-ভোল্ট বিভব প্রভেদ প্রয়োগ করলে ইলেকট্রনের গতিবেগ আলোকের বেগের ৯৯.৮৮ শতাংশ অর্জন করে। এবার বিভব প্রভেদ যদি বাড়িয়ে ৪০ মিলিয়ন ভোল্ট করে দেওয়া হয়, গতিবেগ কিন্তু গতিশক্তির সাবেকি ফরমুলা (Ke = 1/2mv^2) অনুযায়ী দ্বিগুণ হয় না। সামান্য বেড়ে হয় আলোকের গতিবেগের ৯৯.৯৯ শতাংশ। বাকি শক্তি তখন কোথায় চলে যায়? সে তখন সেই ইলেকট্রনের ভর বাড়িয়ে দেয় আরও খানিকটা। আইনস্টাইনের ফরমুলা অনুসারে। না করে যাবেই বা কোথায়? ইলেকট্রন বলে আলোকের গতিবেগকে তো আর সে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। অতএব প্রদত্ত বাড়তি শক্তি তখন গতিশক্তি আর ভরের মধ্যেই ভাগাভাগি হয়ে যায়।
এই কারণেই আধুনিক কালে কণা পদার্থবিজ্ঞানে কোনো কণার ভরই আর সাবেকি এককে বলা হয় না। শক্তির মাপকাঠিতেই তাকে প্রকাশ করা হয়। তাতে আর আলাদা করে একবার ভর আর একবার শক্তি মাপতে আর বলতে হয় না। বিজ্ঞানীদের কাজ কমে গেছে, সুবিধাও হয়েছে। খালি আমাদের মতো সাধারণ বিজ্ঞান পাঠকদের বুঝতে একটু যা বেশি সময় লাগে—এই যা!
তাহলে কী দাঁড়াল?
তাহলে এই পর্যন্ত পড়ে আমরা বোধ হয় এটুকু বুঝেছি বলে দাবি করতে পারি, দৈর্ঘ্য সময় আর ভর আর আগের মতো বস্তুর কোনো শাশ্বত গুণ বা বৈশিষ্ট্য নয়। বস্তুর গতির অবস্থার সাথে তার এই সব বৈশিষ্ট্যও সংযুক্ত। সেই অনুযায়ী পরিবর্তনশীল ও আপেক্ষিক। তার মানে আমি বা আপনি যা খুশি দেখব বা পাব—এমন নয় বিষয়টা। এক একটা নির্দিষ্ট নির্দেশাক্ষ বরাবর কে কী দেখব তা কিন্তু নির্দিষ্টভাবেই ঠিক হয়ে থাকে। যেই দেখুক, বা কেউ আদৌ যদি না দেখে, পরিমাপগুলো একই রকম হবে।
এই হল সংক্ষেপে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।◙

গ্রন্থপঞ্জি

Einstein, Albert and Infeld, Leopold (1938), The Evolution of Physics; Cambridge University Press, Cambridge.
Feynman, Richard (1992), The Character of Physical Law; Penguin Books, London.
Kuznetsov, B. (1965), Einstein; Progress Publishers, Moscow.
Ashoke Mukhopadhyay (2009), The Science and Philosophy of Einstein’s Theory of Relativity; Bodhoday Mancha, Kolkata.

একাত্তরে তুরস্কের সাথে যুদ্ধ হলে শহীদের সংখ্যা হতো ৯৭ লক্ষ…

একাত্তরে তুরস্কের সাথে যুদ্ধ হলে শহীদের সংখ্যা হতো ৯৭ লক্ষ…

arm1915
প্রত্যেক ঘটনার দুটো দিক থাকে। নিজামীর ফাঁসির পর তুরস্কের মন্তব্য সামনে নিয়ে আসছে তুরস্কের গনহত্যার কথা। যেই গনহত্যা ছাড়িয়ে যায় ১৯৭১ সালে পাক আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চালানো গনহত্যাকেও।
remember1915
১৯১৫ সালে তুরস্ক আর্মেনিয়ানদের ওপর যে গনহত্যা পরিচালনা করা হয়েছিলো তার ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে গত বছর। আর্মেনিয়ানরা এখনো স্বীকৃতি পায়নি ঘাতক তুর্কিদের কাছ থেকে, আমরাও স্বীকৃতি পাইনি পাকিস্তানের কাছে। এখনো আর্মেনিয়ানরা লড়ছে তাদের কাঙ্ক্ষিত গনহত্যার স্বীকৃতির জন্য। তুরস্কই সম্ভবত পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসে এক মাত্র জাতি যারা লাগাতার ১০০ বছর একটা জাতির আর্মেনিয়ার ওপর চালানো নির্মম গণহত্যাকে অস্বীকার করে আসছে। আর্মেনিয়ানর মানুষও লাগাতার বিগত ১০০ বছর ধরে ১৯১৫ সালে তাদের ওপর চালানো গনহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে আসছে তুরস্কের কাছে।
armnia100birdwhit
সে হিসেবে পাকিস্তান তো নবীন।
পাকিস্তান তো মাত্র ৪৫ বছর ধরে অস্বীকার করছে নিজেদের অপরাধ…
deadhead
তুরস্ক আর পাকিস্তান একই কোম্পানির একই প্রোডাক্ট, খালি মোড়কটা আলাদা- এই যা। নিপীড়ক তুরস্কের কাছ থেকে কিছু শেখার না থাকলেও আমাদের নিপীড়িত বন্ধু আর্মেনিয়ার কাছে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। অন্তত দুইটা জিনিস আর্জেন্ট শেখা দরকার আমাদেরঃ
১) আর্মেনিয়া আমাদের মত স্বজাতির গনহত্যা লুকায় না।
২) আর্মেনিয়ায় জেনোসাইড ডিনায়াল’ল আছে।
hargor
পৃথিবীর যে কোন মানুষ যদি গনহত্যা নিয়ে একাডেমিক পড়ালেখা করতে চায়, যদি তারা গনহত্যা পরিচালনাকারী প্রথম পাঁচটা দেশের নাম খোঁজ করে পড়ালেখা করে তাহলে তাদের পাকিস্তানের আগে তুরস্কের নাম পড়তে হয়। দুটো দেশই গনহত্যার ভয়াবহতায় লিস্টের প্রথম দিকে স্থান করে নিয়েছে।
আর্মেনিয়া জর্জিয়া ও আজারবাইজানের সাথে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের স্থলযোজকের উপর অবস্থিত। ইয়েরেভান আর্মেনিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের “হায়” বলে থাকে। আর্মেনিয়ার ৯০% লোক এই “হায়ঃ জাতির লোক। দেশটি ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কিরা আর্মেনিয়াদের ওপর নির্বিচারে গনহত্যা চালায়।
vaskorjo
একটি রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ধরে নিলে তাদের ওপর গনহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হয়। ১৯১৫ সালের আর্মেনিয় গনহত্যা তারই উজ্জ্বল প্রমান। ষাটের দশকে আমারাও ছিলাম পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠীর চোখে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সামরিক রাষ্ট্র অটোমানদের সঙ্গে পাকিস্থানের অনেক অনেক মিল। তিন বছরে ধরে চলমান এই গনহত্যায় সেই দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ মারা যায়। সে সময় সেই গণহত্যায় আর্মেনিয়ার প্রায় ৪৩% থেকে ৫৮% জনগোষ্ঠী নিঃশেষে হয়ে যায় মাত্র তিন বছরে।
armenia1.5
একটু লক্ষ্য করলে আমরা দেখি একটা দিক দিয়ে কিন্তু আর্মেনিয়ানরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। সেটা হচ্ছে তারা অন্তত তাদের নিজের দেশের ওপর চলা গনহত্যাকে অস্বীকার করে না, আমরা করি। তারা পনেরো লাখ শহীদ কে দেড় লাখ বলে না যেমন আমরা অনেকে ১৯৭১ সালের শহীদের সংখ্যা তিরিশ লাখ থেকে তিন লাখে নামিয়ে আনতে কুণ্ঠা বোধ করি না।
মূলত আর্মেনিয়ার গনহত্যার নিয়ে তিনটা বয়ান শোনা যায়- ৮ লাখ, ১৫ লাখ, ২০ লাখ।
তবে সবাই মিলে সংখ্যাটা ১৫ লক্ষ বলে মেনে নিয়েছে।
এটা সেখানে একটা আইকনিক ফিগার।
এই ১৫ লাখ শহীদদের নিয়ে অসংখ্য সাহিত্য রচনা করা হয়েছে।
কেউ এটা নিয়ে বিতর্ক করে না।
armgenoblk
গণহত্যা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য আর্মেনিয়ার গনহত্যা থেকে একটা শিক্ষাও নেয়ার আছে।
এই গনহত্যায় তাদের জনসংখ্যার ৪৩%-৫৮%কে হত্যা করেছিলো।
১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখে শুরু হয়ে চলতে থাকে ১১ নভেম্বর ১৯১৮
অর্থাৎ প্রথম বিশ্ব-যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই গনহত্যা চলতে থাকে।
অর্থাৎ এই গণহত্যা চলেছে ৪০ মাস ১৮ দিন ধরে।
58prc
আসুন হিসেব করে দেখা যাক যদি ৪০ মাসে যদি আর্মেনিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৪৩%-৫৮% কে মেরে ফেলতে পারে তুর্কিরা,
তাহলে একই অনুপাতে তারা ৯ মাসে কত বাঙালীকে হত্যা করতে পারতো?
হিসাব করে দেখা যায় সংখ্যাটা ১৩% এর উপরে।
পাকিস্তানীরা নয় মাসে হত্যা করেছিলো আমাদের জনগোষ্ঠীর ৪%।
অর্থাৎ আর্মেনিয়ার গনহত্যা আমাদের তুলনায় ৩ গুণের বেশি ভয়াবহ ছিলো।
অথচ এই ৪%- অর্থাৎ তিরিশ লক্ষ শহীদকে মেনে নিতেই আমাদের এত সমস্যা এত প্রশ্ন!!!
এই হিসাবে চিন্তা করলে ১৯৭১ সালে যদি তুরস্ক বাংলাদেশে আক্রমণ করতো তাহলে শহীদের সংখ্যা হত ৯৭ লক্ষ ৫০ হাজার কিংবা তার চেয়েও বেশি। দেখা যাচ্ছে তুরস্কের নিজামীর ফাঁসি নিয়ে বাড়াবাড়ি আমাদের একটা উপকার করেছে- মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতাকে নিয়ে যারা সন্দেহ করে তাদের ধরে ধরে দেখানো যাচ্ছে বিশ্বময় গনহত্যার খতিয়ান।
remember1915

বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্বে ও পরে অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ।

বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্বে ও পরে অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ---

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
-জীবনানন্দ
৯০ সালের আগে ও নব্বই দশকে ভারতের বাবরি মসজিদের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অমুসলিমদের উপর বয়ে যায় সাম্প্রদায়িক ঝড়। সেই ঝড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়, কেউবা রাতের আধারে সাম্প্রদায়িক আমলার শিকার হোন,কেউবা হোন-পুলিশের উপস্থিতিতে নির্যাতিত। মিডিয়ার কল্যাণে এতো বছর পরও বাবরি মসজিদের ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের মন থেকে বিস্মৃতি হয় নি। কিন্তু মুছে গেছে বাবরি মসজিদ ভাঙার সাথে বাংলাদেশের সেই সব মানুষগুলোর কথা,যারা কোনভাবে এই ভাঙার সাথে যুক্ত না হয়েও বাবরি মসজিদ ভাঙার খেসারত দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি পুরোপুরি চেপে যায়। এই ইন্টারনেটের যুগেও আপনি গুগল করে দেখলে আশ্চর্য হবেন যে,বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশে কী হয়েছিল তার কোন বিশদ উল্লেখ নেই। যদি উল্লেখ থাকেও তাও এক দুই লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বলা যায়, এই বিষয়ে লেখা-লেখি কিংবা জানতে চাওয়াও বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এক ধরণের অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ১৯৮৮ সালে এরশাদ যখন রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করল, এর সাথে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক হামলা। বাবরি মসজিদে ভাঙ্গার আগেও অনেক ভাবে বাবরি মসজিদভাষার বিষয়ে গুজব রটিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করা হয়। এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার আগে সারা দেশে হিন্দুদের উপর কয়েক দফা হামলা শুরু হয়। বাংলাদেশে তিনটি সম্প্রদায়ের উপর নিয়মিত নির্যাতন চলে আসছে।–হিন্দু সম্প্রদায়, আদিবাসী সম্প্রদায় (যারা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, আহমদিয়া সম্প্রদায় (যারা কয়েক লাখ থেকে কয়েক হাজারে নেমে এসেছে, ধর্ম পালন করতে হয় গোপনে)।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোন সীমারেখা নেই। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মানুষ মঙ্গল গ্রহে বসবাস করার সাহস দেখাচ্ছে। হয়তো একদিন মানুষ সেখানে মানব বসতিও গড়বে। ধারণা করি, সেখানে কোন সাম্প্রদায়িক ঘটনা হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে! ভারতে কংগ্রেসের ব্যর্থতায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ধর্মীয় ফ্যাসিজম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানকার অনেক মানুষ এর প্রতিবাদ করছে। যেমন-লেখকরা জাতীয় পুরষ্কার বর্জন করছেন, পরিচালকরা পুরষ্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে আমরা কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের উপর সাধারণ মানুষের চাপ প্রয়োগ তা দেখতে পাই। অথচ একই বিষয় বাংলাদেশে হলেও এখানে রাষ্ট্রে ভিন্ন-সম্প্রদায়ের উপর হামলার কথা স্বীকার করছে না, সংসদে এই নিয়ে কোন আলোচনাও করছে না, লেখক-বুদ্ধিজীবী সবাই বালুতে মাখা গুজে বসে আছেন। কবির পংক্তি বলতে হয়-
“আজ ধর্ষণের দিন, কৃষ্ণ গেছে দূর পরবাসে।
ইতিহাস মাথা গোঁজে মৌলবাদী শিশ্নসমাবেশে।”
বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার শুরু বাবরি মসজিদ থেকে নয় বরং স্বাধীনতার পরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে হামলা হয়ে আসছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এসে দেখল তাদের বাড়ি দখল করে পেরেছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। এছাড়াও পাকিস্তান আমল থেকে শত্রুর সম্পত্তি নামক একটি কালো আইন বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলে সহায়তা করছে। বাংলাদেশের ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের সম্পত্তি কতোটুকু নিরাপদে রাখতে পারছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঢাকার জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কিছু জমি এখনও দখল হয়ে আছে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে যেখানে জাতীয় মন্দিরের জমি দখল হয়ে যায় সেখানে সামগ্রিক পরিস্থিতি কতোটা নাজুক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (নিউজ লিংক-এখানে)
১৯৭৩ সালে সাভারে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানদার কাগজ দিয়ে বিড়ি বানাচ্ছিলেন। সেই কাগজের ভিড়ে আরবি লেখা কাগজও ছিল। কে বা করা এলাকায় রটিয়ে দিলে যে, এই দোকানে কোরানের পাতা ছিঁড়ে বিড়ি বানানো হচ্ছে। মুহূর্তে শতশত লোক ঐ দোকানে হামলা করে দোকানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে দোকানদার আগেই পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর বড় হামলা শুরু হয় ৯০ দশক থেকে। বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ মানুষকে দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়। এর পর বড় হামলা আসে ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা আসার পর। সেই সময় পূর্ণিমা নামের একটি বাচ্চা মেয়েকে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে। মেয়ের জীবন বাঁচাতে অসহায় মা ধর্ষকদের পা’চেয়ে ধরে বলেছিল; আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে যাও! ২০০১-এর পর ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিচার একমাত্র পূর্ণিমা পেয়েছে তাও ১০ বছর পর ৪ মে ২০১১ তে! এরকম হাজারো পূর্ণিমা নির্যাতিত হয়েছেন, নীরবে দেশ ত্যাগ করেছেন। বাবরি মসজিদের সময় বাংলাদেশের পত্রিকা ও সরকার যেহেতু ধামা-চাপা দিয়ে দিয়েছে সেহেতু সেই সময়টা বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে ২০০১ সালের ঘটনাগুলি। ২০০১ সালের পর কী হয়েছিল নিম্মে ছবির মাধ্যমে তার ক্ষুদ্র একটি অংশ তুলে ধরা হলা।
Purnima
ঈ
রা
c
2001
20000
20001
200001
Ramshil
chott
এরপর বাংলাদেশে বড় হামলা হয় কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ১ অক্টোবর। ফেসবুকের কথিত একটি ছবিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শত বছরের পুরাতন রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষগুলোর উপর হামলা চালানো হয়। সেই হামলায় অংশ নেয়-মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে স্থানীয় মুসলমানরা। যারা সবাই ছিল আওয়ামী,বিএনপি,জামাত থেকে শুরু করে সকল দলের নেতাকর্মী! তৎকালীন রামু থানার ওসি বলে-পুলিশের পোশাক পরা না থাকলে আমি নিজেও হামলায় অংশ নিতাম। এই ঘটনায় যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে যায়। এবং সেই জামিনের ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। বাবরি মসজিদে হামলার ২০ বছর ২৫ বছর স্মরণে বাংলাদেশের পেপার পত্রিকায় বিভিন্ন সম্পাদকীয় লেখা হলেও বাবরি মসজিদের কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর উপর কী দিয়ে বয়ে গেছে তা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ তারা করে না। ফলে বাবরি মসজিদের ঘটনার পর বাংলাদেশে যে নির্যাতন হয়েছে তা আমাদের মিডিয়া ও সরকার সফল ভাবে চেপে যেতে সক্ষম হয়েছে।
কক্সবাজারের রামু
কক্সবাজারের রামু
জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও এরশাদের হাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের খৎনা হয়ে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সংবিধানে যুক্ত করে অঘোষিতভাবে অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরশাদ সংবিধানের সংশোধনী করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ তাদের ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালের সরকার আমলে তা বাতিল না করে আজ পর্যন্ত বহাল রেখেছে! এছাড়া ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানি আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ বাতিল না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার নাম রেখেছিল ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। এসবই হচ্ছে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। বর্তমান সরকার যেহেতু মদিনা সনদে দেশ চালাচ্ছে সেহেতু এটি স্পষ্টত যে ১৯৭২ এর সংবিধানে আওয়ামীলীগ নিজেও ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলা হয় ৯০ সালে,এরশাদের উস্কানিতে। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। এছাড়াও পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। ১৯৭১ সালে মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল হিন্দু, ১৯৮১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১২.১ শতাংশে,১৯৯১ সালে ১১ ও ২০০১ সালে ৯ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশে এসে ঠেকেছে। তারপরও রাষ্ট্র বিবৃতি দিচ্ছে দেশে অমুসলিমরা নিরাপদে আছে!
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘গণ-তদন্ত কমিশন’ ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সাত দফা সুপারিশ পেশ করেছে।
দফাগুলো হচ্ছে :
১. বাংলাদেশ একটি বহু-ধর্মীয় ও একাধিক জাতিসত্তা-ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সে কারণেই ধর্মনিরপেক্ষতা হলো জনসাধারণের সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নতির পূর্বশর্ত_এ বিশ্বাসে সরকারকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং জনগণের মধ্যে তার এই নৈতিক অবস্থান ও তার কার্যকারণ স্পষ্টাকারে তুলে ধরতে ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে প্রশাসনিক, নিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সব রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমঅধিকার-নীতির প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘু নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা নিরোধকল্পে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে জনপ্রশাসনে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীতে পুলিশ, বিডিআর, আনসার, সেনাবাহিনী ইত্যাদিতে ক্রমবর্ধমান হারে নিয়োগ করে এ উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে।
২. সংবিধানে পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি-কোন থেকে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী যেসব বাতিল করে সংবিধানকে ১৯৭২ সালের আদিরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সরকারকে।
৩. রাষ্ট্র-দর্শনে ধর্ম সম্পর্কে কোন একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটানো ও তদনুযায়ী প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করা যাবে না। কারণ, রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিতে সব ধর্ম সমান।
৪. (ক) সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও উপজাতিসহ সব ধর্মীয়, ভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে জাতির মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন-কারী ও বৈষম্যমূলক যেসব আইন বা সরকারি বিধিনিষেধ প্রণীত হয়েছে, যা তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে সংকুচিত করেছে (যেমন অর্পিত সম্পত্তি আইন, উত্তরাধিকার আইন) সেগুলো বাতিল করতে হবে।
(খ) ১৯৯৭ সালে স্বীকৃত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’র সব প্রস্তাব যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে দৃঢ় ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সেখানকার পার্বত্য সংখ্যালঘুদের মনে আস্থা ও শান্তি ফিরে আসে এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
(গ) দেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোন নাগরিকের দেশের যে কোন অঞ্চলে বাস করার অধিকার স্বীকৃত হলেও, সরকার এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না, যাতে কোন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আদিবাসী-অধ্যুষিত জেলাগুলোয়, সিলেটে মনিপুরী ও খাসিয়া জন-অধ্যুষিত অঞ্চলে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো এলাকায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় জন-তাত্ত্বিক অনুপাতে দৃশ্যমান বৈষম্যের সৃষ্টি না হয় এবং স্থানীয় ও বহিরাগত সংকট দেখা না দেয়।
(ঘ) ১৯৯২ সালে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত (৪৭/১৩৫ নং প্রস্তাবনা) ‘জাতিগত অথবা নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় অথবা ভাষা-গত সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের অধিকারের ঘোষণায়’ তাদের অধিকার রক্ষায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যেসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ১-৮), বাংলাদেশ সরকারকে সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গৃহীত ব্যবস্থাদি সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।
(ঙ) সংখ্যালঘুদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহাসিক, পারিবারিক ও উত্তরাধিকার নিয়ম-কানুন গুলোর স্বীকৃতিকে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত করে এই জনগোষ্ঠীভুক্ত জনমানুষের জাতীয় মূল স্রোতের অঙ্গীভূত করা, নিজেদের স্বকীয়তাকে বিসর্জন না দিয়ে_এই লক্ষ্যে সরকারকে নিশ্চিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
(চ) জাতিসংঘ মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণা কোন রাষ্ট্রের জাতিধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকের যেসব অধিকার (বিশেষ করে ধারা-৩ থেকে ৭, ১২, ১৬, ২০, ২১খ ধারায় বর্ণিত অধিকারগুলো) নিশ্চিত করা হয়েছে, তা রক্ষা করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
৫. (ক) সংখ্যালঘু জনগণের ওপর যে আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে, প্রকাশ্যে তার নিন্দা জ্ঞাপন করতে হবে।
(খ) অবিলম্বে সব শ্রেণীর সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোন ধরনের নির্যাতন বন্ধ করা ও উপদ্রুত এলাকার নির্যাতনকারীদের, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নির্বিশেষে উপযুক্ত বিচারের সম্মুখীন করাতে হবে।
(গ) সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন রোধ ও নিরাপত্তা-দানের জন্য পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে দৃঢ় ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করাতে হবে।
(ঘ) সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা-দানে ব্যর্থ হয়েছে, তার বা তাদের বিরুদ্ধে কর্তব্য-চ্যুতির দায়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা।
(ঙ) ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ-দান সুনিশ্চিত করা।
৬. (ক) দেশের অভ্যন্তরে বাস্তু-চ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
(খ) দেশত্যাগীদের সুষ্ঠু পরিবেশে দেশে প্রত্যাগমন করিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৭. অনতিবিলম্বে বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠন সম্পূর্ণ-করণ। এ কমিশনের অবশ্যই ‘সংখ্যালঘু, নারী, শিশু-বিষয়ক’ পরিচ্ছেদগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে এবং সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে।
তবে এসব দফা কাগজে কলমেই থেকে যায়। কোন সরকার এসব দফা কার্যকর করতে উৎসাহী নয়। আশি ও নব্বরই দশকের বাবরি মসজিদের ঘটনার আগেও পরে বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের উপর সাম্প্রদায়িক ঝড় বয়ে গেলে এর উপর ‘গ্লানি (Glani)’ নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করা হয় হিন্দু-বৌদ্ধ-ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে। বইটি নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সরকার এবং বইয়ের সাথে যারা জড়িত তাদের নাম কালো তালিকায় অর্ন্তুভুক্ত করে। অদ্ভুত বিষয় হল এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা উঠলে সবাই বলতে চেষ্টা করে যেহেতু ঘটনাগুলো এরশাদ ও বিএনপির আমলে ঘটেছে সেহেতু দায়টা তাদের। কিন্তু কেউ একটি বার প্রশ্ন করে না, হামলা থামানোর জন্যে কিংবা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগ কী তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নিয়েছে? ইংরেজ শাসন আমলে আমরা দেখেছি; হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা থামানোর জন্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। গান্ধী নোয়াখালী’তে ভয়াবহ দাঙা থামানোর জন্যে এবং দাঙা পরিস্থিতি দেখার জন্য নোয়াখালীতে এসে হাজির হোন। আবুল কালাম আজাদ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখন যদি প্রশ্ন করি; সেই সময় কোন কোন নেতা-নেত্রী দাঙ্গা থামানোর জন্য মাঠে নেমেছেন কিংবা কর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন তাহলে কী অন্যায় হবে? উল্টো আমরা বিভিন্ন সময় আমরা দেখতে পাই এসব হামলার সরকারী-বিরোধী দল সবাই মিলে-মিশেই হামলায় অংশ নেয়। কেউবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্যে হামলার তীব্রতার বাড়ানোর জন্যে নেতা-কর্মীদের হুকুম দেন। এসব হামলার করার মূল লক্ষ্য হল ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সুযোগ। কয়েক বছর আগে প্রথম আলো পত্রিকা খবর প্রকাশ করে। সেখানে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে; ‘সিলেটে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাদের জমিতে মসজিদ তুলে দেওয়া।’ মসজিদ বানান হলে কেউ আর মসজিদ স্থানান্তরিত করার সাহস পায় না। ফলে প্রথমে মসজিদ, তারপর মাদ্রাসা এভাবেই ধীরে ধীরে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রর চরিত্র সবসময় পাকিস্তান-মুখী ছিল। দ্বি-জাতী তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের আরেকটি অংশ হিসেবে পাকিস্তানের অধীনে স্বাধীন হয় বর্তমান বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে সালে পাকিস্তানের থেকে মুক্ত করে নিজেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এই তিন দেশের মধ্যে ভারত-বাদে দুই দেশের ক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক শাসক গোষ্ঠী। পাকিস্তান আমলে ‘আহমদিয়া সমস্যা’ নামে মওদুদী একটি বই লেখেন। পাকিস্তান সরকার বইটি নিষিদ্ধ করার আগেই ১৮ দিনে বইটির ৬০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবে মওদুদী আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে লাহোরে হামলা শুরু করলেন। এর ফলে কয়েক হাজার আহমদিয়া হত্যার শিকার হয়। এর জন্য মওদুদীকে গ্রেফতার করে বিচার হোল এবং ফাঁসির আদেশ দেয়া হোল। পরে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপে তার ফাঁসি রদ করা হয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল; ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একজন আহমদিয়ার করব দেওয়াকে কেন্দ্র করে আহমদিয়াদের উপর অত্যাচারের সূত্রপাত হয় এবং আহমদিয়াদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে লুটপাটের মতো ভয়াবহ রূপ লাভ করলে ৪ মার্চ পাকিস্তানে প্রথম আঞ্চলিক মার্শাল ল জারি হয়। মূলত এই দাঙ্গার কারণেই পাকিস্তানের সেনা বাহিনী প্রথম দেশ শাসনের স্বাদ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে সামরিক শাসকরা ক্ষমতার স্বাদ পায় ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত ১৫ অগাস্টের পর। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে ডানপন্থীদের বড় আকারে আবার আগমন ঘটে। ১৫ অগাস্টের পর থেকে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন উপায়ে রাষ্ট্রের ঘাড়ে সেনা বাহিনী ভর করতে শুরু করে। সাবেক সেনা বাহিনীর প্রধান এরশাদের স্বৈরাচারী জমানায়ও সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা পাহাড়ে আদিবাসীদের উপর হামলা থেমে থাকে নি।
বাবরি মসজিদের ভাঙার গুজবে এবং বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ঠিক কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, খুন হয়েছেন কিংবা কতো নারী নির্যাতিত হয়েছেন তার হিসেব বলা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে সারা বাংলাদেশে কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এর কোন পরিসংখ্যান বের করা হয় নি। ফলে এখনে যা হাজির করব তা সামগ্রিক হামলার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ভারতের ডানপন্থী গ্রুপ আর.এস.এস-এর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বারবি মসজিদ ধ্বংস আগেও বাংলাদেশে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার গুজব রটিয়ে অ-মুসলিমদের উপর হামলা করা হয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর সারা দেশে বড় আকারে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ হিন্দু নারী-পুরুষ খুন হয়, ২৬০০ উপর নারী ধর্ষিতা হয়, ১০ হাজার মানুষ আহত হয়, ২ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়, ৩৬০০ অধিক মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ৪০ হাজার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও দখল করা হয় এবং দশ হাজারের উপর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু ১০ দিনের চিত্র। এর মানে এই নয় যে দশ দিন পর সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে কিংবা আর কোন সাম্প্রদায়িক হামলার হয় নি। পরবর্তীতে হামলা হয়েছে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নভাবে। ঢাকা শহরে বড় আকারে হামলা হয় ৬ ডিসেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর। ডানপন্থী ইনকিলাব পত্রিকা একটি নিউজ করে; ‘বাবরি মসজিদ ঘটনায় ঢাকার হিন্দুদের মিষ্টি বিতরণ!’ পরের দিন ভুল সংবাদের জন্য তারা ক্ষমা চায় কিন্তু যা হওয়ার এবং যে উদ্দেশ্যে এই সংবাদ করা হয়েছিল তা ঐ রাতেই সফল হয়। রাতের মধ্যে সকল হিন্দু পল্লীগুলো’তে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভুল সংবাদের জন্য ইনকিলাব পত্রিকার কোন বিচার কিংবা সরকার থেকে কোন মামলা কোনটাই হয়নি। বাংলাদেশে মিরসরাই, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, মানিকগঞ্জ, চিটাগাং, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় বড় হামলার ঘটনা ঘটে। অদ্ভুত বিষয় হল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টিভি’তে ভাষণ দেওয়ার সময় ভারতের বাবরি মসজিদ পুনরায় তৈরি করার আহবান জানালেও নিজ রাষ্ট্রের মানুষগুলোর অত্যাচারের কথা ও নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা চেপে যান। বরং ভাষণে পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে; এসব হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে গ্রেফতার কিংবা মামলা হবে না। তাই পরবর্তীতে অমুসলিমদের উপর হামলার তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়েও বাঙালি সেল্টারা হামলা শুরু করে। সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী না থাকলেও তারা বৌদ্ধদের উপর হামলা করে। যেমনটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনা বাহিনী সাঁওতালদের হিন্দু বিবেচনা করে গণহত্যা চালিয়েছিল সেই সম্প্রদায়ের উপর। সাম্প্রদায়িক হামলার গুজব রটিয়ে ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে পাহাড়ে বাঙালি মুসলিমদের হামলায় ৬০০ আদিবাসী মারা পড়ে, ৪৫০০০ বৌদ্ধ আদিবাসী চট্টগ্রাম পাহাড় ছেড়ে ভারতের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। মজার বিষয় হলে মুসলিম সম্প্রদায় থেকে হামলার ঘটনায় আবার রাষ্ট্র-পক্ষ আসামী হিসেবে অমুসলিমদেরই গ্রেফতার করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি চেপে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ হয় নি।
২০০৭ সালের ভারতের গুজরাট হামলার ঘটনা আমরা জানি। সেই গুজরাট মতন হামলা ও হামলার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলেও মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে বাবরি মসজিদ, গুজরাট ইস্যু প্রতিবছর স্মরণ করা হলেও সাধারণ মানুষকে জানতে দেওয়া হয় নি কী হয়েছি বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস।! রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে অনেক সময় ইতিহাস জানতেও দেওয়া হয় না। তারপরও ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠায় সামান্য কিছু দলিল সংগহ করতে পেরেছি। সংগ্রহ করা ক্ষুদ্র অংশটি’র কিছু ছবি সবার সাথে শেয়ার করছি। ভবিষ্যতে যদি আরও কিছু দলিল পত্র পাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে পোস্টটি আপডেট করা হবে।
১৯৮৮ সালে পাহাড়িতে নিয়ে  রির্পোট। ২৮৭০ মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে মারা যায়।
১৯৮৮ সালে পাহাড়িতে নিয়ে রির্পোট। ২৮৭০ মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে মারা যায়।
 রিফিউজি সমস্যা। ৪৫ হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
রিফিউজি সমস্যা। ৪৫ হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
এক বছরে ২.৫ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
এক বছরে ২.৫ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।
চট্টগ্রামে হামলা
চট্টগ্রামে হামলা
মিরসরাইতে হামলা।
মিরসরাইতে হামলা।
সরকারী চাকুরীতে কী পরিমাণ ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তার রির্পোট
সরকারী চাকুরীতে কী পরিমাণ ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তার রির্পোট
সিলেটে ধ্বংস হওয়া একটি মন্দির।
সিলেটে ধ্বংস হওয়া একটি মন্দির।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৯২ সালে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৯২ সালে।
পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ি। ভোলা ১৯৯২।
পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ি। ভোলা ১৯৯২।
সিলেটে অমুসলিমদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি।
সিলেটে অমুসলিমদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি।
খুলনা ইমাম পরিষদ থেকে খুলনায় মন্দির আক্রমণের ছবি।
খুলনা ইমাম পরিষদ থেকে খুলনায় মন্দির আক্রমণের ছবি।
৪০ হাজার বাড়ির একটি যা সাম্প্রদায়িক হামলার আগুনে পুড়ে যায়।
৪০ হাজার বাড়ির একটি যা সাম্প্রদায়িক হামলার আগুনে পুড়ে যায়।
গান্ধী আশ্রয়। কুমিল্লা ১৯৯২।
গান্ধী আশ্রয়। কুমিল্লা ১৯৯২।
BM14
ঢাকার একটি ধ্বংস হওয়া  মন্দির।
ঢাকার একটি ধ্বংস হওয়া মন্দির।
ধ্বংস হওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দির। নভেম্বর ১৯৯০।
ধ্বংস হওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দির। নভেম্বর ১৯৯০।
তথ্যসহায়তায়-
সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আমাদের করণীয়
-বিধ্বস্ত মানবতা (বইটি ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা নিয়ে)

Thursday, May 12, 2016

যৌক্তিকতা কি ?



বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আলহামদুলিল্লাহ! সাতচল্লিশের দ্বিজাতি তত্ত্বকে অনেকেই মনে হয় দায়মুক্তি দিয়ে ফেলেছেনঅবশ্য এমনিতেই এতো এতো ঝামেলা, তার মধ্যে পুরনো কাসুন্দি টেনে এনে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করার কোনো মানেই হয়নাতাইতো 'জয় বাংলা বলে আগে বাড়ো' অবশ্য অচিরেই এটার নয়া ভার্সন 'নারায়ে তাক্ববির জপতে জপতে আগে বাড়ো' চলে আসার ব্যাপারে আমরা মাশাল্লাহ আশাবাদী
বর্তমান ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ ১৯৩৮ সালে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়পূর্ব পাকিস্তানের জবানপ্রবন্ধে উল্লেখ করেন,
"বাঙলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাঙলা হবে কি উর্দু হবে এ তর্ক খুব জোরেশোরেই একবার উঠেছিলোমুসলিম বাঙলার শক্তিশালী নেতাদের বেশিরভাগ উর্দুর দিকে নজর দিয়েছিলেন নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আবদুর রহিম, মোঃ ফজলুল হক, ডাঃ আবদুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, মৌলভী আবদুল কাশেম মরহুম প্রমুখ প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেনকিন্তু মুসলিম বাঙলার সৌভাগ্য এই যে, উর্দুর প্রতি যাদের বেশি সমর্থন থাকার কথা, সেই আলেম সমাজই এই অপচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেনবাঙলার আলেম সমাজের মাথার মণি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহেল বাকি, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী উর্দু-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেনএঁদের প্রয়াসে শক্তি যুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেবসেই লড়াইয়ে এঁরাই জয়লাভ করেছিলেনবাঙলার উপর উর্দু চাপাবার সে চেষ্টা তখনকার মত ব্যর্থ হয়কিন্তু নির্মূল হয় নিবাঙলার বিভিন্ন শহরে, বিশেষতঃ কোলকাতায় মাঝে মাঝে উর্দুওয়ালারা নিজেদের আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিলেনসম্প্রতি পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ তাদের আদর্শের বুনিয়াদে পরিণত হওয়ায় উর্দুওয়ালারা আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছেনসম্প্রতি মর্নিং নিউজস্টার অব ইন্ডিয়াএই ব্যাপারে কলম ধরেছেনজনকতক প্রবন্ধ লেখকও তাতে জুটেছেনএরা বলেছেনঃ পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা স্বভাবতই উর্দু হবে
“ "চট্টগ্রামের জে এম সেন স্কুলের আরবী-ফারসীর শিক্ষক মাওলানা জুলফিকার আলী ভারতবর্ষ ভাগের পূর্ব থেকেই আরবী হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ গ্রহন করেনএই প্রয়াসের অংশ হিসেবে তিনি কয়েকটি বই লেখা , 'হরূফুল কোরআন' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ ও 'হরূফুল কোরআন' সমিতি গঠন করেনতারই উদ্যোগে ১৯৩৯ সালের ২৯-৩১ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত 'All India Muslim Educational Conference' -এ আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব গৃহীত হয়।" (এ প্যারাটুকুর জন্য কৃতজ্ঞতা মাহমুদুল হক মুন্সি)
আমার বুঝে আসেনা এমন বড় বড় মাপের নেতাদের চাওয়া কী করে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারেরা জলাঞ্জলি দিলোঅন্তত অারবি হরফে বাংলা লেখা প্রকাশ করবার নীতিটা বেশ ভালো ছিলোকে জানে ঝান্নাতি হরফ আরবিতে লেখার কারণে আমাদের জজবা আরো বেড়ে যেতো সৌদি আরব তথা আল্লাহর কাছেআমাদের মিসকিন বাঙাল বলার আগে দুইবার ভাবতো তারা পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় আমাদের চাইতে কম হলেও তাদের কিন্তু মিসকিন পাকি বলা হয় না তবে যাই হোক না কেনো, আমরা ভাষাশহীদদের রক্তের মূল্য চুকাবো ইনশাল্লাহকারো সাথে দেখা হলে সালাম-মুসাফাহ, কথার শেষে পরম করুনাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ কিংবা মাশাল্লাহ বলতে কসুর করবো না
এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, সেই দশকের আলেম সমাজের নিকট পেট্রোডলারে মোড়ানো "আসল ইসলাম" এর দাওয়াত পৌঁছোয়নি বিধায় এহেন কামেল কাজে তারা বাধা দিয়েছিলোকিন্তু মাশাল্লাহ বিগত দুই সামরিক শাসক আল্লামা মরহুম শহীদ জিয়া ও তার যোগ্য উত্তরসূরী পীরে কামেল ও ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী এরশাদ ছাহেবের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে এতো বেশি পরিমাণ পেট্রোডলারসমৃদ্ধ "আসল ইসলাম" এদেশে প্রবেশ করেছে যে এখানকার চল্লিশ লাখেরও বেশি ক্বাতাবুল ইলম উর্দুভাষায় লিখিত কিতাব অধ্যয়ন করছেএ সংখ্যাটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে আমরা ভাষাশহীদদের রক্তের মূল্য চুকাবো ইনশাল্লাহ
মাতৃ ভাষা অধিকারের প্রথম রক্ত ও জীবন দাতা আমরা এই আমরাই দৈনন্দিন জীবনে সালাম, ইনশাল্লাহ, সুভানাল্লাহ, আলহামদুলিলাহ সহ নানান ধরনের আরবি বা উর্দু শব্দ ব্যবহার করছি যার প্রতিবাদ করলেই আবার উস্কানী দেওয়া বা অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার মত অপরাধ হয়ে যায় যারা ভালবাসা দিবস, মা দিবস ইত্যাদি নিয়ে চুলকানী আছে তারাও কি আজ এই দিনে মাতৃ ভাষা দিবস হিসাবে পালন করতেও কুন্ঠিত হবেন ( যেহেতু তারা সারা জীবন মাতৃ ভাষাতেই কথা বলেন ) ? তাইলে খামাখা লোক দেখানো এই মাতৃভাষা দিবস না শহীদ দিবস পালনের যৌক্তিকতা কি ? খোদা হাফেজ (নাউজুবিল্লাহ), আল্লাহ হাফেজ

অশ্লীলতা কি ও কোথায় থাকে !

অশ্লীলতা কি ও কোথায় থাকে !!



অশ্লীলতা আমাদের দেশে অন্যতম চর্চিত শব্দ । আমার মতো মূর্খ চাষার পক্ষে আসলে এতো কঠিন শব্দ বোধগম্য করা কঠিন। তাই দ্বারস্থ হলাম বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের। সেখানে পেলাম অশ্লীলতা হলো অশ্লীল বিশেষণ পদটির বিশেষ্য রূপ। অশ্লীল শব্দটির তিনটি আলাদা আলাদা অর্থ দেয়া আছে।
১. কুৎসিত; জঘন্য ২. অশালীন; অশিষ্ট ৩. কুরুচিপূর্ণ; কদর্যরুচি আবার প্যাঁচ লাগলো অশালীন শব্দ নিয়ে। আরেকটু ঘাঁটতেই দেখলাম "শালীন" শব্দের অর্থ- সলজ্জ; লজ্জাশীল; নম্র; ভদ্র; রুচিকর; বিনয়ী; সুন্দর; শোভন। তার মানে মুটামুটি বুঝতে পারলাম লজ্জাহীনতা, রুচিহীনতা, অসুন্দর, অশোভন- এসবের সামষ্টিক রূপই হলো অশ্লীলতা। আসুন তাহলে দেখি আমাদের দেশে এই অশ্লীলতা কোথায় কোথায় থাকে/ থাকেনা ।
* ঘুস খাওয়াতে অশ্লীলতা নাই ।
* মিথ্যা বলাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* একাধিক বিয়া করাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* খাদ্যে, শিক্ষায় ও ঔষধে সাধ্যমত ভেজাল দেওয়ার মধ্যেও কোন অশ্লীলতা নাই ।
* ক্ষমতার অহংকারে যা খুশি বলা ও করাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* ক্ষমতাবানকে নির্লজ্জের মত তেল দেওয়ার মধ্যেও অশ্লীলতা নাই ।
* পাওনাদারকে চরকির মতো ঘোরানোর মধ্যে তো অশ্লীলতা নাইই, এমনকি এই ঘুরাঘুরির জন্য উল্টো ঝারি মারার মধ্যেও অশ্লীলতা অনুপস্থিত ।
* ঈমানদার তথা বিশ্বাসী তকমা সেঁটে কথায় ও কাজে নিরন্তর বিশ্বাস ভাঙার মধ্যেও অশ্লীলতা নাই ।
* ধর্ষণে তো অশ্লীলতা নাইই উপরন্তু বিশেষ ধর্মে বিধর্মী ধর্ষণে পুরষ্কার পাওয়ার গ্যারান্টি আছে; সেটা শিশু হলেও সমস্যা নাই ।
* কারো ধন সম্পত্তি ছলে বলে কৌশলে কিংবা শক্তির জোরে ভোগ দখল করাতেও অশ্লীলতা নাই; এমনকি বিশেষ একটি ধর্মের উত্থান ঘটেছেই বিধর্মীদের ধন-সম্পত্তি জবরদখল করার মাধ্যমে ।
* ধর্ম প্রচারের নামে শব্দ দুষণেও অশ্লীলতা নাই ।
* কুলুফের নামে লুংগীর মধ্যে হাত ঢূকিয়ে প্রকাশ্য লোকালয়ে লাফালাফি করার মধ্যেও কোন অশ্লিলতা খুজে পেলাম না ।
* শিশু ধর্ষনেও অশ্লিলতা নাই ।
* নিজের বাচ্চাদের পথ শিশু বানাতেও অশ্লীলতা নাই ।
* আল্লাহু আকবর বলে ভিন্ন মতের কারো কল্লা কাটার মধ্যেও কোনো অশ্লীলতা নাই ।
* সংঘবদ্ধ হয়ে ধর্ষণের মধ্যেও অশ্লীলতা পাইলাম না ।
হায় ! হায় !! অশ্লীলতা তাইলে আছে কোথায়, যা দেখে আমাদের সূর্য সন্তানরা লজ্জা পায় ? অশ্লীলতা তুমি কোথায় ? আমার মতো আপনারাও কি হতাশ হইছেন ? পাইছি !! পাইছি !! হতাশ হইয়েন না । অশ্লীলতা আছে শুধু মেয়েদের বোরকাহীন শরীরে ও শ্রেষ্ঠ মহা মানবের শ্রেষ্ঠ আইন ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব হওয়ার ইতিহাস প্রকাশে । হে অশ্লীলতা! সত্যিই তুমিই আমাদেরকে করেছো মহান ! তোমার জন্যই আজ আমরা সভ্য ও উন্নত জাতি !! অশ্লীলতা জিন্দাবাদ ।

বই রিভিউ লিখার পদ্ধতি

বই রিভিউ লিখার পদ্ধতি

এটা কাউকে শেখানোর জন্য লিখি নি। শুধুমাত্র
ব্যক্তিগত ধারণা শেয়ার করেছি।

বই রিভিউ লেখার জন্য প্রকৃতপক্ষে কোন
ব্যাকরণ নেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে লিখলে
রিভিউটা সকলের জন্য পড়া ও বোঝা সহজ হয় এবং
সাজানো- গোছানো হয়।
শুরুতে বইয়ের একটা ছবি দিতে পারেন। এরপর শুরু
করতে পারেন আপনার পছন্দমত উক্তি বা বই
সম্পর্কে কোন তথ্য দিয়ে।এটা ঠিক কোন
অনুষ্ঠান শুরু করার আগে সম্ভাষণ বা বইয়ের ভুমিকার
সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তারপর প্রথমে
বইয়ের ও লেখকের নাম দিতে হবে

বইয়ের নামঃ

লেখকের নামঃ

এরপর সেটি কোন ঘরানার(Genre) তা উল্লেখ করা
জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে পাঠকরা বুঝতে পারে তারা
যেই লেখকের বই সম্পর্কে রিভিউ পড়তে
যাচ্ছেন সেটি রহস্য, নাকি রোম্যান্টিক নাকি ফ্যান্টাসি
নাকি শিশুতোষ নাকি কথাসাহিত্য । তার মানে বইয়ের ও
লেখকের নামের পর আসবে,

ঘরানারঃ
এরপর যেটা দেওয়া যায় সেটি হল রেটিং । রেটিং এর
নাম্বার দেখে পাঠকরা সহজেই বুঝতে পারবেন
বইটা কতটা জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে পাঠকদের মনে
বই সম্পর্কে সুন্দরভাবে আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।
বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে বই রেটিং এর কোন
ওয়েবসাইট নেই। তবে ইংরেজি বইয়ের গুডরিডস্
নামে একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইট রয়েছে। তাই
ইংরেজি বইয়ের ক্ষেত্রে সেখান থেকে রেটিং
লিঙ্ক সহ দেওয়া যেতে পারে। বাংলা বইয়ের
ক্ষেত্রে নিজস্ব রেটিং ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নাই।
ইংরেজি বইয়ের ক্ষেত্রেও নিজস্ব রেটিং দেওয়া
যায়। সেক্ষেত্রে “ব্যক্তিগত রেটিং” এই কথাটা
উল্লেখ করা উচিত। তাহলে আমরা পরবর্তী
পয়েন্ট পেলাম,

রেটিং/ ব্যক্তিগত রেটিং:
এরপর আমরা দিব রিভিউ । রিভিউতে যদি পুরাপুরি ফ্লাপের
লেখা হুবহু তুলে দেই তবে সেটাকে বলা হবে
প্রিভিউ । তাই রিভিউ না প্রিভিউ তা এখানে শুরুতেই বলে
দেওয়া ভাল। রিভিউ লেখার সময় সম্পূর্ণ কাহিনী
তুলে দেওয়া উচিৎ না। এতে পাঠকের ঐ বই
সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাবে। যদি দিতেই হয়
তবে সবার উপরে তা লিখে দেবেন। যেমন,
spoiler alart. রিভিউ লেখার সময় মাথায় রাখবেন যে
আপনি পুরা কাহিনী লিখছেন না, লিখছেন কাহিনীর
সারমর্ম। তাই তা যত ছোট আর তথ্যসমৃদ্ধ হয় তা ততই
পাঠকের কাছে ভাল লাগবে। লিখতে হবে যথেষ্ট
রহস্যময়টা নিয়ে যাতে পাঠকদের মনে বইটা
সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। যদি রিভিউ পড়ে
পাঠকের মনে আগ্রহই তৈরি না হয় তবে সেই
বুঝতে হবে রিভিউ আসলে রিভিউই হয় নি।
রিভিউয়ের পরে বই সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রিকায়
প্রকাশিত উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। দিতে
পারলে সেটা প্লাস পয়েন্ট কিন্তু না দিতে পারলেও
বিশেষ কোন ক্ষতি নেই।

পত্রিকার উদ্ধৃতিঃ
এরপর দিতে হবে লেখক পরিচিতি। লেখকের
জন্ম-মৃত্যু, পড়াশুনা, পেশা, আর কি কি বই লিখেছেন,
কতটা জনপ্রিয়, এখন কি করছেন, সামনে আর কি
লেখা আসবে ইত্যাদি তথ্য দেওয়া যেতে পারে।

লেখক পরিচিতিঃ
বইটি যদি অনূদিত হয় তবে লেখকের পরিচিতির পর
অনুবাদকের পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে।

অনুবাদকের পরিচিতিঃ
এরপর বইটি সম্পর্কে একনজরে কিছু তথ্য দিতে
হবে।

ক্যাটাগরিঃ বইটি অনুবাদকৃত নাকি মূল তা লিখতে হবে।

বইয়ের নামঃ

লেখকের নামঃ

অনুবাদকের নামঃ (অনুবাদিত হলে)

প্রকাশনীঃ কোন প্রকাশনী থেকে বের
হয়েছে তা উল্লেখ করতে হবে।

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখ করলে পাঠক
বইয়ের আকার আর ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারনা পাবে।

মূল্যঃ এটা উল্লেখ করা জরুরি। কেননা এর মাধ্যমে
পাঠক বুঝতে পারবেন বইটি তার বাজেটের মধ্যে
কিনা বা কত টাকা লাগবে তা জানলে কিনতে যাওয়ার
আগে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে পারবেন।

প্রাপ্তিস্থানঃ অনলাইন প্রাপ্তিস্থানের লিঙ্ক দেওয়া
যেতে পারে আর সম্ভাব্য প্রাপ্তিস্থানের ঠিকানা
দিলে পাঠকদের ভোগান্তি কম হয়।

উইকিপিডিয়া লিঙ্কঃ এরপর বই সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায়
কোন নিবন্ধ থাকলে সেটার লিঙ্ক দিয়ে দেওয়া
যেতে পারে।

মূল বইয়ের ওয়েবসাইটঃ মূল বইয়ের কোন
ওয়েবসাইট থাকলে সেটার লিঙ্ক উল্লেখ করা
যেতে পারে।

লেখকের ওয়েবসাইটঃ লেখকের ওয়েবসাইট
আর সোশ্যাল সাইটের লিঙ্ক দেওয়া যেতে
পারে।

সফটকপির লিঙ্কঃ বইয়ের কোন সফট কপির লিঙ্ক
পাওয়া গেলে দিতে পারেন।

ব্যক্তিগত মতামতঃ সবশেষে বই সম্পর্কে আপনার
দিয়ে শেষ করতে পারেন।



একনজরে রিভিউ লেখার ফর্মটিঃ
বইয়ের নামঃ
লেখকের নামঃ
ঘরানারঃ
রেটিং/ ব্যক্তিগত রেটিংঃ
রিভিউ/প্রিভিউঃ
পত্রিকার উদ্ধৃতিঃ(Optional)
লেখক পরিচিতিঃ
অনুবাদকের পরিচিতিঃ (যদি অনুবাদিত হয়
সেক্ষেত্রে)(Optional)
ক্যাটাগরিঃ
লেখকঃ
অনুবাদকঃ (যদি অনুবাদিত হয় সেক্ষেত্রে)
প্রকাশনীঃ
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ
অধ্যায়ঃ (যদি থাকে)
মূল্যঃ
অনলাইন প্রাপ্তিস্থানঃ (যদি থাকে)
প্রাপ্তিস্থানঃ
উইকিপিডিয়া লিঙ্কঃ যদি থাকে (Optional)
বইয়ের ওয়েবসাইটঃ যদি থাকে (Optional)
লেখকের ওয়েবসাইটঃ যদি থাকে (Optional)
সোশ্যাল সাইটঃ যদি থাকে (Optional)
সফট কপির লিঙ্কঃ যদি পাওয়া যায়(Optional)
ব্যক্তিগত মতামতঃ (Optional)



সবশেষে একটি কথা, শুরুতেই বলেছি বই
রিভিউয়ের কোন ব্যাকরণ নেই। আমি যা দিয়েছি তা
একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে
দিয়েছি। যেভাবেই লিখুন না কেন তাতে যেন প্রান
থাকে, পাঠকরা যেন রিভিউটা পড়ে বইটা পড়তে
আগ্রহ বোধ করে।


সংকলনেঃ সায়েম মাহামুদ,'
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
Sayemkajal@gmail.com

সোনালী অনুপাত(golden ratio) নিয়ে ব্যস্ত

-" শুভ তোমাকে একটি প্রশ্ন করি!"

- "জি স্যার,করুন"

-"তুমি কি জানো তোমার চেহেরা সুন্দর কেন? শুধু তোমার না পৃথিবীর যত চেহেরা সুন্দর ওয়ালা মানুষ আছে তাদের চেহেরা সুন্দর কেন?"

-" হ্যাঁ স্যার , আসলে যার যার চেহেরা ভালো লাগে তার জন্য তার চেহেরা সুন্দর। আপনার হইতো আমার চেহেরা ভালো লাগে তাই আপনার জন্য আমি সুন্দর।"

-" কিন্তু কি এমন কারণ যে একজনের মানুষের চেহেরা অন্য জনের সাথে মিলেনা?"

-আমি চুপচাপ

- "বিজ্ঞানীদের মতে, সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে চোখ, মুখ ও কানের মাঝামাঝি অংশের ডায়মেনশন এর মধ্যে।
অতঃপর তারা মাপজোক করে বললেন কারণ সোনালী অনুপাত! সোনালী অনুপাত(Golden Ratio) কি জিনিস জানো???"

আমি স্যারকে কোন সাঁয় দিলাম না, শুধু চুপচাপ স্যারের কথায় ডুবে আছি। কিছু মানুষের আছে যাদের কথা শুনার মধ্যে আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে, মজা আছে।নান্টু স্যার তাদের মধ্য অন্যতম। উনার কথা আমি যত শুনি তৃপ্তি সহায়ক আনন্দ টা সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। জানিনা এটাকে বিজ্ঞান কি বলে??

- "শুভ, তুমি কি জানো প্রকৃতি সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্ক কি ? "

-" আসলে স্যার, প্রকৃতিরর মাঝে আমরা বিজ্ঞান কে বিশেষ করে গণিত কে খুজে পাই, আর বিজ্ঞানের অন্যতম উৎস হল প্রকৃতি "

-" তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের গাঢ় রহস্য হল গণিত তথা সোনালী অনুপাত(Golden Ratio) প্রকৃতির সৌন্দর্যের সব কিছু এর মধ্যে নিহিত। সোনালী অনুপাত বা Golden ratio নিয়ে গণিতপ্রেমীদের মাতামাতির শেষ নেই। আর মাতামাতি হবেই বা না কেন , এই দুষ্টু (অমূলদ ) সংখ্যার এত মাহাত্ম্য কিসে্র? আসলে এই সংখ্যাতেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টিজগতের অনেক রহস্যের সমাধান , একটু গভীর ভাবে দৃষ্টি দিলেই আমরা একে খুঁজে পাব আমাদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে , গোটা জীব জগতে , পদার্থ কিংবা রসায়নে , পাব আমাদের সৌরজগতে , আমাদের গ্যালাক্সিতে ; খুঁজে পাব অ্যাপল ,মার্সিডিজ এর মত বিখ্যাত কোম্পানীর লোগোতে । এই সংখ্যাই আমাদের বলে দিবে কেন পিরামিড কিংবা তাজমহল এত মনোমুগ্ধকর ? কেন ভিঞ্চির মোনালিসা
জগতখ্যাত ? কেন আমাদের বান্ধবীর চেয়ে ক্যাটরিনা কাইফ বেশি সুন্দরী ? কে বেশি আকর্ষণীয়,
আঞ্জেলিনা জোলি নাকি অনন্ত জলিল ? কে বেশি
ঠাণ্ডা (Cool), টম ক্রুজ নাকি শাকিব খান ? এ সব
প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে এই সংখ্যা থেকে।
হইতো এটি সৃষ্টিকর্তার সুন্দর এক কৌশল যা কিনা প্রকৃতির সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন এই সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে মানুষ বিভিন্ন কৃত্রিম কিছু সৃষ্টিতে তে ব্যবহার করছেন সোনালী অনুপাত "

এই বলে স্যার মুখে আরেকটি পান দিলেন। স্যারের কথায় বেশ মজা আছে। যাকে বলা যায় খাঁটি মজা।

"- রহস্যময়তা কিংবা প্রায়োগিক দিক অথবা প্রকৃতির মাঝে খুঁজতে চাইলে সবচেয়ে বেশি এবং প্রকটভাবে ধরা পরবে গোল্ডেন রেশিও; এবং বার বার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিবে তার শ্রেষ্ঠত্ব। একারনেই সর্বাধিক গবেষণা হয়েছে এই সংখ্যাটিকে নিয়ে।
যাকে নিয়ে এতো গবেষণা সেই Golden Ratio টা
আসলে কি? এটা আসলে আর কিছুই নয়, একটা গাণিতিক অনুপাত মাত্র যার মান 1.618033988……।
হ্যা ব্যাপারটা নির্মম হলেও সত্য যে এই Golden Ratio অন্য দুই বিখ্যাত সংখ্যার মতই দুষ্টু (অমূলদ সংখ্যা)।

Golden Ratio বা সোনালী অনুপাতকে প্রকাশ করা হয় ল্যাটিন অক্ষর Φ (PHI/ ফাই ) দ্বারা। ১৫৯৭ সালে Michael Maestlin এই Φ (PHI/ ফাই ) আবিষ্কার করেন। এর মান ১.৬১৮০৩৩৯৮৯ (প্রায়)। এটি একটি অমূলদ সংখ্যা । ফিবোনাচ্চি রাশিমালার সাথে এর পিতা পুত্রের সম্পর্ক রয়েছে।

-"শুভ, তুমি তো ফিবোনাচ্চির ইতিহাস জানো, হুম?"

- "জ্বি স্যার, ফিবোনাচ্চি রাশিমালার আবিষ্কারক ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ Leonardo Da Pisa. উনার ডাকনাম ফিবোনাচ্চি। ১২০২ সালে Liber Abaci নামক পুস্তকটির মাধ্যমে তিনি পশ্চিম ইউরোপীয় গণিতকে “ফিবোনাচ্চি সিরিজের” সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যদিও এই পরিচয় করিয়ে দেবার অনেক আগেই ভারতীয় গণিতে এই রকম একটা সিরিজের কথা বলা হয়েছিল। ফিবোনাচ্চি সিরিজ নিয়ে ফিবোনাচ্চি সাহেব বলেছিলেন- “প্রকৃতির মূল রহস্য রাশিমালাতে আছে”।

-"হুম, ভালো বলছ। মিস্টার ফিবোনাচ্চি ঠিকই বলছেন প্রকৃতির মূল রহস্য ফিবোনাচ্চি রাশিমালাতে আছে তার অকাট্য একটি দলিল সোনালী অনুপাত। ফিবোনাচ্চি রাশিমালার সাথে সোনালী অনুপাতের পিতা-পুত্রের সম্পর্ক টা একটু বুঝায় বলি।
0, 1, 1, 2, 3, 5, 8, 13, 21, 34, 55……
এইটাই ফিবোনাচ্চি সিরিজ। কিভাবে আসলো এইটা??? এই সিরিজের যে কোন সংখ্যা তার পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফলের সমান। যেমনঃ 0+1=1, 1+1=2, 2+1=3,
3+2=5, 5+3 =8..........ইত্যাদি। গণিতের ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়- f(0)=0, f(1)=1…… হলে f(n)= f(n-1)+f(n-2). ( ফিবোনাচ্চি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসুন " নান্টু স্যার & আরেকটু ফিবোনাচ্চি science-ahmedshuvo969.blogspot.com/2016/01/blog-post.html?m=1 ) ফিবনোচ্চি সিরিজের যেকোন পদকে আগের পদ দিয়ে ভাগ করলে সেই সংখ্যাটাই PHI । প্রথম কয়েকটা পদের জন্য হিসেব কিছুটা বিদঘুটে মনে হলেও ফিবনোচ্চি সিরিজ ধরে যত সামনে যাওয়া হবে তত ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত PHI এর দিকে এগবে এবং ৩৯ তম পদ থেকে ক্রমিক সংখ্যাদ্বয়ের অনুপাত প্রায় ধ্রুব হয়ে যাবে।
যেমন
2/1=2,
3/2=1.5,
5/3=1.665,
8/5=1.6,
13/8=1.625,
21/13=1.615
.....................
এখানে প্রথম দুটি ভাগফল বাদ দিলে বাকি ভাগফলগুলোর মান প্রায় সমান বা ধ্রুবক। Luca Pacioli’s এর বই De divina proportione এ
প্রথম গোল্ডেন রেশিও এর ব্যাপারে প্রকাশিত হয়।
এরপর Mathematician Euclid তার Elements (Greek:Στοιχεῖα) গ্রন্থে প্রথম PHI এর জ্যামেতিক ব্যখ্যা দেন।

অথবা উল্টো করে বললে এই অনুপাতকে আমরা 1 : 1.6180… = 0.6180… ও বলতে পারি । এই 0.6180… কেও কিন্তু গোল্ডেন রেশিও বলা হয় । এবং একে ছোট হাতের ফাই ( φ) দ্বারা প্রকাশ করা হয় । তার মানে সম্পর্কটা হচ্ছে এরকম : Φ=1/ φ
PHI কে কিন্তু আরো অনেকভাবে প্রকাশ করা যায় ;
দেখতো এটা পরিচিত মনে হয় কিনা :
Φ=1+1/(1+1/(1+…))
এই PHI ই হল একমাত্র সংখ্যা যা এই ধরনের অদ্ভুত আচরণ করে :

ধর, a এবং b দুইটি সংখ্যার মধ্যে সোনালী অনুপাত বজায় তাহলে লিখা যায়
(a+b)/a = a/b = Φ
or, ((a/b)+1)/(a/b) = a/b
যেহেতু a/b = Φ
সুতরাং, (Φ+1)/ Φ = Φ
or, Φ+1 = Φ^2
or, Φ^ 2= Φ+ 1
ot, Φ^2 - Φ-1 = 0
উপোরোক্ত সমীকরণটি একটি দ্বিঘাত সমীকরণ যার
সমাধান হচ্ছে :
Φ = (1+ √5)/2 = 1.68033.....
এখন বুঝলে কিভাবে সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়?

আমি চুপচাপ মন দিয়ে স্যারের কথা শুনছিলাম
-"শুভ "
-" জ্বি স্যার"
-"গণিতের আবিজাবি দেখে কি বিরক্ত? "
-"না, স্যার তবে বাস্তব উদাহরণ ফেলে ভালো লাগবে, আরো মজা করে গিলতে পারব"

স্যার আমার দিকে একটু তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলেন।

-" লিওনার্দো দাদকে তো চিন?"
- "হ্যাঁ স্যার,"
_"লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি দাদা ভাইকে– Golden Ratio এর মাস্টার বলা হয় আর সে দাদা ভাই সোনালী অনুপাত কে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘The Divine Proportion’ বা ‘ স্বর্গীয় অনুপাত’ নামে । কারণ
তিনিই প্রথম মানবদেহে PHI এর উপস্থিতি লক্ষ করেন ;
বুঝতে পারেন এর মর্ম। তিনি মৃত মানুষের দেহের বহিঃস্থ ও ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে অনেক গবেষণা করতেন ; ময়নাতদন্ত যাকে বলে আর কি । আমরা ডাক্তারের চেম্বারে কিংবা মেডিকেল কলেজে যেসব মানুষের অঙ্গের ছবি দেখি সেগুলো প্রথম দাদা ভাই ডিজাইন করেছিলেন। আর এত ভালো ডিজাইনের রহস্য হল মানব দেহে PHI, বুঝা যায় দাদা ভাইয়ের মাথায় ভালো পুষ্টি ছিল।
স্যার কে থামিয়ে আমি প্রশ্ন না তুলে পারলাম না
-"মানব দেহে PHI ? সেটা আবার কি রকম স্যার?"
-" ভালো প্রশ্ন, তুমি একটু সোজা হয়ে দাঁড়াও"
স্যারের কথা মত আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, স্যার আমার শরীলের মাপজোপ শুরু করে দিল। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না স্যার কি করছেন। প্রথমে আমার কাঁধ থেকে হাটু পর্যন্ত এবং হাটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত ডিসটেন্স নিয়ে খাতায় টুকে রাখললেন ৪৩ এবং ২৬.৭।
-"শুভ, ৪৩ কে ২৬.৭ দিয়ে ভাগ দাও, কত হয়?"
- " ১.৬১০ স্যার, স্যার এটি তো একটি সোনালী অনুপাত "
-" তোমাকে বাস্তব উদাহরণ দিলাম হইতো এই জিনিসটিকে মাথায় রেখে ফরাসিরা আইফেল টাওয়ার বানাইলেন
শুধু কাঁধ থেকে হাটু পর্যন্ত এবং হাটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত দূরত্বের অনুপাত PHI না, ছেলে/মেয়ে সকল বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই , দেহের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য : নাভির নিচ থেকে বাকি অংশের দৈর্ঘ্য = 1.6180…(PHI) ; আবার ; মানুষের বাহু (বাইসেপ্স) এর সাথে সম্পূর্ণ হাত এর অনুপাতের মান হল 1.6180…(PHI); মানুষের আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে কনুই এর দৈর্ঘ্য এবং কবজি থেকে কনুই এর দৈর্ঘ্যের অনুপাত 1.6180…(PHI) ; মানুষের মুখমণ্ডলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত 1.6180…(PHI) ; ঠোঁটের দৈর্ঘ্য ও নাকের প্রস্থের অনুপাত , চোখের ২ প্রান্তের দুরুত্ব ও চুল থেকে চোখের মনির দুরুত্ব ও 1.6180…(PHI) ।সারা মুখমন্ডলের সবকিছুতে , শরীরের গিঁটে গিঁটে , মেরুদন্ডে, অভ্যন্তরের অঙ্গেপ্রত্যঙ্গে সবখানে এই PHI খুঁজে পাওয়া যাবে । গোটা মানবদেহে প্রায় ৩ শতাধিক Golden Ratio (PHI) খুঁজে পাওয়া যায় ; মুখমণ্ডলেই পাওয়া যায় ৩০ টিরও বেশি । , মানুষের চেহারায় Golden Rectangle এবং Golden Spiral পুরো খাপে খাপে বসে যায় । এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই ।
এদিকে আমাদের লিওনার্দো ভিঞ্চি সাহেব কিন্তু
শুধু মানুষের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়েই বসে
ছিলেন না । তিনি নির্দ্বিধায় (অথবা অবচেতন মনে )
সমানে প্রয়োগ করতে লাগলেন এই Golden Ratio (PHI) । কোথায় ? তার শিল্পকর্মে । তার বেশির ভাগ
শিল্পকর্মতেই PHI খুঁজে পাওয়া যায় ; The last Supper , Merry Magdalin , Monalisa সবগুলোই PHI এর কারিশমা । এবং এজন্যই এগুলো জগতখ্যাত , মানুষের মন জয় করে নিয়েছে । তিনি সবচাইতে বেশি খ্যাত হয়েছেন Monalisa শিল্পকলাটির জন্য; (তারপরও একটা জিনিস কিন্তু Monalisa ’র নাই !!! ভ্রু নাই … এছাড়াও Monalisa ‘র ছবির আরো অনেক রহস্যময় দিক আছে ) ।
শুধু মানবদেহই নয় , গোটা প্রানীকুলে-উদ্ভিদকুলে সব কিছুতেই মাত্রাগত ভাবে PHI বিদ্যমান । সকল উদ্ভিদ– প্রানীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গও PHI অনুপাতে বিভক্ত ।
এমনকি যে প্রানীর কোন হাত-পা-মাথা কিছুই নেই যেমন শামুক-ঝিনুক-সী-শেল এসবেও কোন-না-
কোনভাবে PHI রয়েছে !! তারপর ধরুন একটা মৌচাকে স্ত্রী মৌমাছি ও পুরুষ মৌমাছির সংখ্যার অনুপাত PHI । ফুলের ভেতর প্রতি স্তরের রেনুর সাথে পরের স্তরের রেনুর অনুপাত PHI । গাছের প্রতি স্তরে স্তরে পাতা বৃদ্ধির অনুপাত PHI । তারপর ধরুন মৌমাছি সহ আরো অনেক ধরণের মাছি ,কীট, ওয়াইল্ড ডগ ইত্যাদির চলাফেরার পথ কিংবা আক্রমনের পথ হয় Golden Spiral অনুযায়ী (মানে PHI )।
আমাদের DNA তেও আমরা যদি বৃহৎ খাঁজ(Major Groove) ও ক্ষুদ্র খাঁজের (Minor Groove ) অনুপাত নেই সেটাও হবে PHI । এমনকি মুরগীর ডিমেও Golden Spiral খাপে খাপে বসে যায়!
পদার্থবিজ্ঞানের চৌম্বকক্ষেত্র কিংবা বিদ্যুৎক্ষেত্রে ,সরল ছন্দিত স্পন্দনে , তাপবিজ্ঞানে সবখানেই পাওয়া যায় PHI । কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকে আমরা যদি ইলেকট্রন কিংবা প্রোটনের g-factor ব্যখ্যা করতে চাই , সেখানেও PHI : g-factor of electron = -2sin(PHI)।
আমরা যদি পোলারাইজড হাইড্রোজেন বন্ড ও
সাধারন হাইড্রোজেন বন্ডের অনুপাত নেই সেটাও হবে
PHI।
বর্তামান বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিখ্যাতরা এর অনেক ব্যবহার করেছেন এমনকি বর্তমানে মার্কেটিং এ এর ব্যবহার হচ্ছে । আড্রিয়ান বেজান এর মতে , মানুষের চোখ অন্য ইমেজের চেয়ে, যেসব ইমেজ Golden Ratio কে অনুসরণ করে তাকে খুব সহজে উপভোগ্য হিসেবে নিতে পারে। আর যেসব ইমেজকে চোখ সহজে নিতে পারে সেগুলোকেই আমরা বলি, আহা কি সৌন্দর্য! সে জন্যই বিখ্যাত অনেক শিল্পীরাই তাদের কাজে PHI প্রয়োগ করেছেন যেমন মিসরের পিরামিডে , আগ্রার তাজমহলে ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারে , নটরডেমে, পারথেননে , ইউনাইটেড নেশন বিল্ডিং সহ আরও অজস্র স্থাপত্যে PHI ব্যবহৃত হয়েছে।PHI থাকার কারণেই এগুলো এত বেশি দৃষ্টিনন্দন ।
:
সঙ্গীতের নোটের ক্ষেত্রেওও PHI বিদ্যমান ।
ভায়োলিনসহ আরো অনেক বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়েছে
PHI দিয়ে। বিখ্যাত কোম্পানির লোগো যেমন Apple, Adidas, Honda, Toyota, Mercedes-Benz, CocaCola, Pepsi, National Geography ইত্যাদি আরো অনেক বড় বড় কোম্পানি PHI ব্যবহার করেছে।
হারিকেন ,ঘূর্ণিঝড় , ধোঁয়ার কুণ্ডলী সবসময়ই Golden
Spiral অনুসরন করে বৃদ্ধি পায়। এমনকি গ্যালাক্সি
গুলোও Golden Spiral অনুসরন করে বিস্তৃত হয় ।
আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর সূর্যের চারপাশে
আবর্তনকালও PHI এর সাথে সম্পর্কিত । তারা পৃথিবীর
আবর্তনকালের সাথে PHI এর সুচক আকারে পরিবর্তিত
হয় ।


পৃথিবীর আবর্তনকালের সাথে গ্রহগুলো PHI এর সুচক আকারে পরিবর্তিত হয়। কো-অরডিনেট পদ্ধতিতে পুর্ব দাগ্রিমাংশ +৩৯.৮২ এবং উত্তর অক্ষাংশ +২১.৪২ । যা দ্বারা প্রমানিত হয় পৃথিবীর গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে পবিত্র কাবা । ৯০+৩৯.৮২ = ১১১.৪২ সুতরাং ১১১.৮২ / ১৮০= 0.৬১… এবং ১৮০+৩৯.৮২ = ২১৯.৮২ সুতরাং ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১…. তাই গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট Φএর মান অনুযায়ী মক্কা এবং ক্বাবাই হচ্ছে পৃথিবীর
গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট ।

এরকম আরো অসংখ্য PHI খুঁজে পাওয়া গিয়েছে
সৌরজগতে , মহাবিশ্বে , আমাদের পৃথিবীর আনাচে
কানাচে । মহাবিশ্বের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও PHI
(Golden Ratio) বজায় রেখেছে তার শৃঙ্খলা । সবকিছুর ভেতরে এক অপার মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে । সবকিছুতেই একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই PHI খুঁজে পাওয়া যাবে। এজন্যই একে বলা হয় The number of life , The divine proportion ( স্বর্গীয় অনুপাত ) । "

স্যার একটানা বলেন গেলেন আর আমি মনোযোগী হয়ে আনন্দ গিলছি, মনে হচ্ছে অনেক সহজ একটি অনুপাত অথচ আমাদের চারপাশ তার থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আমি নান্টু স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি উনি মিটমিট হাসি ফুটাচ্ছেন, পৃথিবী তে মানুষের বৈচিত্র্যময় ঢল দেখা যায় তবে স্যারের মত কাউকে আগে কখনো দেখিনি, স্যার কাউকে বুঝিয়ে সব চাইতে শান্তি পান, বিজ্ঞান প্রেমিকরা এরকমি হই।

বেশ কিছু সময় পর, আমি আনন্দে ২ ফুটের একটি লাফ দিতে দেরি করলাম না।
-"স্যার পেয়ে গেছি"
স্যার অবাক হয়ে প্রশ্ন তুলল
-"কি পেলে? "
-"I love you"
স্যার আরো অবাক হয়ে
-"কি??"
-" I love you এর মধ্যে স্যার ফিবোনাচ্চি আর সোনালী অনুপাত আছে। যেমন I love you বাক্যে i love একজন ব্যক্তির অংশ আর you আরেকজন ব্যক্তির অংশ। তাহলে ২য় জন ব্যক্তির you এর ফিবোনাচ্চি ৩ আর প্রথম জনের i love এর ফিবোনাচ্চি ৫ তাহলে গোল্ডেন রেশিও ৫/৩"

হাহাহাহা আমরা দু-জনে হাসছি।জানিনা এই হাসির মধ্যে কোন অনুপাত আছে কিনা


___আহমেদ শুভ৯৬৯