Thursday, November 12, 2015

কাদিয়ানীদের আদি-অন্ত


কাদিয়ানী ধর্মমত : সমস্যা উপলব্ধি ও সমাধানের সহজ পথ

মাওলানা আহমদ মায়মূন

[ইসলামবিরোধী অমুসলিম কাদিয়ানী সম্প্রদায় তাদের পরিচয় দেয় ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’ বলে। এ মুখোশের আড়ালে তারা তাদের বর্ণচোরা ও প্রতারক চরিত্রতটিকে সক্রিয় রাখে। বাংলাদেশে কাদিয়ানী তৎপরতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় পাতাজুড়ে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে নিজেদের
কর্মকান্ড ও ‘কৃতিত্বের’ বর্ণনা তুলে ধরেছে। এতে নতুন করে সরলপ্রাণ বহু মুসলিমের প্রতারিত হওয়ার আশংকা তৈরি হচ্ছে। আমরা তাই কাদিয়ানীদের ধর্মবিশ্বাস, মিথ্যাচার ও প্রতারণার প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরতে মাসিক আলকাউসার-এর ২০০৫ সালের মে সংখ্যায় প্রকাশিত এ নিবন্ধটি পুনঃমুদ্রণ করছি।-সম্পাদক]

কাদিয়ানী মতবাদের সাথে ইসলামের বিরোধ কোথায় এবং কেন সচেতন মুসলিম সমাজ কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি করে-এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।

ইসলামের মৌলিক আকীদা

আল্লাহ তাআলা মানব জাতির যোগ্যতা ও উপযোগিতা হিসাবে কালক্রমে তাদের বিভিন্ন শরীয়ত দিয়েছেন। আর এর পূর্ণতা ও পরিসমাপ্তি বিধান করেছেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে। দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা লাভের পর যেহেতু এতে কোনোরূপ সংযোজন ও বিয়োজনের প্রয়োজন বা অবকাশ নেই তাই মানবজাতির জন্য নতুন শরীয়তেরও প্রয়োজন নেই। সুতরাং আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূল প্রেরণের ধারা চিরতরের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন। এটা ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, (অর্থ) ‘‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণতা দান করেছি, আর আমি তোমাদের জন্য আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি এবং দ্বীন হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছি।’’ (সূরা মায়েদা : ৩) পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, (অর্থ) ‘‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যকার কোনো বয়স্ক পুরুষের পিতা নন, তবে তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী।’’-সূরা আহযাব : ৪০

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অন্যান্য নবীর মুকাবিলায় আমাকে ছয়টি বিষয় দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করা হয়েছে, ১. আমাকে অল্প কথায় বেশি ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা দেওয়া হয়েছে, ২. আমাকে গাম্ভীর্যজনিত প্রতাপ-প্রতিপত্তি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, ৩. আমার জন্য গণীমতের মাল হালাল করে দেওয়া হয়েছে, ৪. সমগ্র ভূপৃষ্ঠকে আমার জন্য নামায পড়ার উপযোগী জায়গা ও পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ হিসেবে স্থির করা হয়েছে, ৫. আমাকে সমগ্র সৃষ্টি জগতের রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছে, ৬. আমার দ্বারা নবীদের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।’’ (সহীহ মুসলিম, মাসাজিদ, হাদীস : ৫২৩)

অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আমার ও নবীদের উদাহরণ এমন একটি প্রাসাদ, যা খুব সুন্দর করে নির্মাণ করা হয়েছে, তবে তাতে একটি ইটের জায়গা খালি রেখে দেওয়া হয়েছে। দর্শকবৃন্দ সে ঘর ঘুরে ফিরে দেখে, আর ঘরটির সুন্দর নির্মাণ সত্ত্বেও সেই একটি ইটের খালি জায়গা দেখে আশ্চর্য বোধ করে (যে, এতে একটি ইটের জায়গা কেন খালি রইল!) আমি সেই একটি ইটের খালি জায়গা পূর্ণ করেছি। আমার দ্বারা সেই প্রসাদের নির্মাণ পরিসমাপ্ত হয়েছে, আর আমার দ্বারা রাসূলদের সিলসিলা পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।’’ অপর এক রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, ‘‘আমি হলাম সেই খালি জায়গার পরিপূরক ইটখানি। আর আমি হলাম সর্বশেষ নবী।’’ (সহীহ বুখারী ১/৫০১; সহীহ মুসলিম, ২/২৪৮) অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, ‘‘বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের কর্মকান্ডে নেতৃত্ব ও দিক-নির্দেশনা দান করতেন। যখন তাদের এক নবী দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেন, তাঁর জায়গায় আর একজন নবী অধিষ্ঠিত হতেন। কিন্তু আমার পরে কোনো নবী আসবেন না। তবে আমার পরে খলীফা হবে এবং তারা সংখ্যায় অনেক হবে।’’-সহীহ মুসলিম, ইমারা, হাদীস : ১৮৪২; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫৮৭

এরূপ অগণিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকীদা এই যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জাতির হেদায়াতের জন্য প্রেরিত সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী প্রেরিত হবেন না।

গোলাম আহমদ কেন নবী নয়?

এ প্রশ্নের সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রথমত উল্লেখ্য যে, ইসলামের উপরিউক্ত মৌলিক ও অকাট্য আকীদার উপস্থিতিতে কেউ যদি নবী হওয়ার দাবি করে তবে সেটা মুসলিম সমাজের নিকট মিথ্যা বলে সাব্যস্ত হবে এবং তা

আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। শুধু তাই নয়, এরূপ দাবি পোষণকারী ব্যক্তি ইসলামের সর্ববাদী বিশ্বাস মুতাবিক মুসলিমই নয়; বরং সন্দেহাতীতভাবে কাফের। সুতরাং গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এরূপ দাবি করার কারণে সম্পূর্ণ মিথ্যাবাদী ও কাফের-এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদীর জন্ম হবে। তাদের প্রত্যেকে নিজেকে নবী বলে দাবি করবে। অথচ আমি হলাম সর্বশেষ নবী, আমার পরে কোনো নবীর আগমন হবে না।’’-আবু দাউদ, ফিতান, পৃ. ৫৮৪; তিরিমিযী, খন্ড ২, পৃ.৪৫

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করা মুসলমানের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যার এ বিশ্বাসে ত্রুটি রয়েছে, তার ঈমান বহাল থাকার কোনো অবকাশ নেই।

দ্বিতীয়ত ধরে নেওয়া যাক যে, যদি আল্লাহ তাআলা মানব জাতির প্রতি নবী প্রেরণের সিলসিলা বন্ধ না করে অব্যহত রাখতেন তবু কুরআন, হাদীস ও পূর্ববর্তী নবীগণের জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করলে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তাতে গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বা তার মত স্বভাব-চরিত্রের কোনো লোক নবী হওয়ার জন্য অযোগ্য প্রমাণিত হয়। এ বিষয়টি সহজে বোধগম্য করার জন্য এখানে চারটি মৌলিক নীতিমালা পেশ করা হচ্ছে। এ নীতিগুলো ‘‘দুয়ে দুয়ে চার’’-এর মত সতত সিদ্ধ ও স্বীকৃত সত্য।

প্রথম মৌলিক নীতিটি এই যে, প্রত্যেক সত্যবাদী নবী তাঁর পূর্ববর্তী সকল নবীর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখেন এবং অন্যদেরও সকল নবীর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি যত্নশীল থাকতে শিক্ষা দেন। কেননা, প্রত্যেক নবী হলেন আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। তাই কোনো মুসলমান কোনো নবী-রাসূলের প্রতি এরূপ কোনো আচরণ করতে পারে না, যা নবীর জন্য অসম্মানজনক ও অমর্যাদাকর। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী আল্লাহ তাআলার একজন সত্যবাদী মহান নবী হযরই ঈসা আ. সম্পর্কে অত্যন্ত অশোভনীয় কটূক্তি করেছে। এখানে তার একটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে। সে তার ‘দাফেউল বালা’ নামক বইতে বলেছে, ‘‘মাসীহের সততা তার সময়কার অন্যান্য সৎ লোকের চেয়ে বেশি বলে প্রমাণিত হয় না; বরং তার চেয়ে ইয়াহইয়া নবীর মর্যাদা এক গুণ বেশি। কেননা, সে মদপান করত না এবং কোনো ব্যভিচারিণী নারী নিজের ব্যভিচার থেকে উপার্জিত অর্থ দ্বারা সুগন্ধি ক্রয় করে তার মাথায় মালিশ করেছে এমন কোনো কথা তার ব্যাপারে শোনা যায় নি। অথবা এমনও জানা যায়নি যে, এরূপ কোনো নারী নিজের হাত বা মাথার চুল দ্বারা তার শরীর স্পর্শ করেছিল অথবা কোনো আনাত্মীয় যুবতী নারী তার সেবা করত।

এ কারণে আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইয়াহইয়াকে হাসূর (নারী বিরাগী) বলেছেন। কিন্তু মাসীহের এ নামকরণ করা হয়নি। কেননা, উক্তরূপ ঘটনাবলী এরূপ নামকরণের অন্তরায় ছিল।’’

উপরোক্ত উদ্ধৃতিটুকুতে গোলাম আহমদ কায়িদানী হযরত মাসীহ ইবনে মরিয়ম আ.-এর প্রতি কয়েকটি অপবাদ দিয়েছে। তারমধ্যে একটি হল, তিনি মদ পান করতেন। দ্বিতীয় হল, তিনি ব্যভিচারিণী নারীদের অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত সুগন্ধি তাদের দ্বারা মাথায় লাগাতেন এবং তাদের হাত ও চুল দ্বারা তার নিজের শরীর স্পর্শ করাতেন। তৃতীয় হল, অনাত্মীয় যুবতী নারীদের সেবা নিতেন।

হযরত ঈসা আ.-এর মত একজন মহান নবীর প্রতি এসব অশ্লীল ও কদর্য অপবাদ আরোপ করার পর সে এ রায়ও দিয়েছে যে, এসব ঘটনার কারণেই আল্লাহ তাআলা তাকে পবিত্র কুরআনে ‘হাসূর’ (নারী বিরাগী) বিশেষণ দ্বারা বিশষায়িত করেননি।

যে কোনো নবীর মর্যাদা তো অনেক উর্দ্ধে, একজন সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র মানুষের প্রতি এরূপ অপবাদ আরোপ করা নিশ্চয় তাঁর জন্য অতি অপমানকর। যার মধ্যে অণুপরিমাণও ঈমান আছে, এমন কোনো ব্যক্তি কোনো নবী সম্পর্কে এরূপ অশ্লীল অপবাদ দিতে পারেন না।

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে যে, মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এসব কথা নাকি খৃস্টান পাদ্রীদের জবাবে তাদের উপর চাপ প্রয়োগার্থে লিখেছে। এটা তাদের নিছক মিথ্যা প্রলাপ ও প্রতারণা। কেননা, ‘দাফেউল বালা’ নামক বইটি মুসলমান আলেমদের উদ্দেশ্যে রচিত। যার ইচ্ছা বইটি যাচাই করে দেখতে পারে। এছাড়াও সে ‘যমীমায়ে আঞ্জামে আথম’ নামক বইতে লিখেছে, ‘‘তার (ঈসা আ.এর) খান্দানও ছিল অতি পূত পবিত্র (?)। তার তিনজন দাদী-নানী ছিল ব্যভিচারিণী ও পেশাদার পতিতা। তাদের রক্ত থেকে সে জন্ম লাভ করেছে। হয়ত এটাও খোদা হওয়ার একটি পূর্বশর্ত হবে! পতিতাদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ও দহরম-মহরম সম্ভবত তাঁর উত্তরাধিকারের রক্তের টানেই হয়ে থাকবে। অন্যথা কোনো সৎ পুরুষ একজন যুবতী পতিতাকে এ সুযোগ দিতে পারে না যে, সে নিজের নাপাক হাত তার মাথায় লাগাবে এবং পতিতাবৃত্তি থেকে উপার্জিত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত অপবিত্র সুগন্ধি তার মাথায় মালিশ করবে, আর নিজের মাথার চুল তার পায়ে ঘষবে। সুধীজন বুঝে নিন, এরূপ লোক কোন চরিত্রের!’’ (যমীমায়ে আঞ্জামে আথম, পৃ. ৭)

উপরে উদ্ধৃত অংশটুকুতেও মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সেই বক্তব্যই পেশ করেছে, যা সে তার ‘দাফেউল বালা’ নামক বইতে বলেছে। ‘যামীমায়ে আঞ্জামে আথম’ বইটি যদিও খ্রিস্টান পাদ্রীদের জবাবে লেখা বটে, তবে তার পূর্বোক্ত বক্তব্যের সাথে এটাকে সংযুক্ত করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এসব বক্তব্য কেবলই কারও মুখ বন্ধ করার জন্য বলা হয়নি; বরং এটা তার মনের কথা। কেননা, সে ‘দাফেউল বালা’র এক জায়গায় বলেছে, ইবনে মরিয়মের আলোচনা ছাড়, গোলাম আহমদ তার চেয়ে উৎকৃষ্ট।’’ (পৃ. ২)

দ্বিতীয় মৌলিক নীতি এই যে, আল্লাহ তাআলার প্রেরিত কোনো নবী নিজের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারেন না। তাঁরা সব সময় সত্যের উপর অটল-অবিচল থাকেন। কিন্তু মির্জা গোলম আহমদ কাদিয়ানী এক্ষেত্রে অবলীলাক্রমে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। এর অগণিত উদাহরণ রয়েছে। এখানে প্রবন্ধের কলেবরের প্রতি লক্ষ্য করে একটি মাত্র উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে। মির্জা গোলাম আহমদ তার ‘আরবাঈন-৩’ নামক বইতে লিখেছে, ‘‘মৌলবী গোলাম দস্তগীর কাসূরী ও মৌলবী ইসমাঈল আলীগড়ী নিজ নিজ বইতে আমার (গোলাম আহমদের) ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে যে, আমি যদি মিথ্যাবাদী হই, তবে তাদের আগে মারা যাব। তাদের দাবি মতে আমি যেহেতু মিথ্যাবাদী তাই আমি অবশ্যই আগে মারা যাব। তাদের এ বইগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর অতি দ্রুত তারা মারা গেছে।’’ (আরবাঈন-৩, পৃ. ১১) উপরে উদ্ধৃত অংশে মরহুম মৌলবী গোলাম দস্তগীর কাসূরী ও মৌলবী ইসামঈল আলীগড়ী সম্পর্কে মির্জা গোলাম আহম কাদিয়ানী যে বক্তব্য পেশ করেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এতে সত্যের বিন্দু-বিসর্গও নেই। তারা এ ধরনের কোনো কথা তাদের বইতে বলেননি। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর জীবদ্দশায় স্বয়ং তাকে এবং তার প্রয়াণের পর তার অনুসারীদেরকে বহুবার এ চ্যালেঞ্জ পেশ করা হয়েছে যে, যদি উক্ত আলিমদ্বয় এরূপ কোনো কথা তাদের কোনো বইতে লিখেছেন বলে কোনো প্রমাণ তোমাদের কাছে থেকে থাকে তবে পেশ কর। কিন্ত তারা আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্তও দেখাতে পারবে না। (কাযিবাতে মির্জা পৃ. ৭৩)

মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর এরূপ মিথ্যাচার প্রচুর। পাঠক জেনে হয়ত আশ্চর্যবোধ করবেন যে, তার বিভিন্ন রচনাবলী থেকে তার মিথ্যাচারগুলো সংকলিত করা হলে বেশ বড়সড় একটি বই হতে পারে। এটা শুধু মুখের কথা নয়; বাস্তবেও যথাযথ উদ্ধৃতিসহ মির্জার মিথ্যাচারের একাধিক সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে উর্দূ ভাষায় সংকলিত ‘কাযিবাতে মির্জা’ বইটি বেশ প্রসিদ্ধ। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৭৯; সংকলক মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহিদ মাখদূম।

তৃতীয় মৌলিক নীতি এই যে, মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে এবং সে দাবি করেছে যে, সে সত্যবাদী নবী। এটা প্রমাণ করার জন্য তার ভবিষ্যদ্বাণীগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে। আর তার ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যদি সত্যে পরিণত না হয় তবে সে মিথ্যবাদী বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ তাআলার বিশেষ ফজল ও করম যে, তিনি তার ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে মিথ্যা প্রমাণিত করে তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য যে, যেখানে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অসংখ্য হাদীসে এ ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেছেন আর এ থেকে প্রমাণিত আকীদার উপর মুসলিম সমাজের ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে যে-ই নবী হওয়ার দাবি করুক এবং তার হাতে যত অলৌকিক ঘটনাই প্রকাশ পাক, তাকে কোনো মুসলিম সত্যবাদী নবীরূপে বিশ্বাস করতে পারে না, বরং সে এরূপ যে কোনো অলৌকিক কর্মকান্ডকে দাজ্জালের অলৌকিক কর্মকান্ডের মতই মনে করবে। এ ছাড়া জাদুকরদের কাছেও এ অলৌকিক কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয়, তাতে কেউ তাদের নবী বলে স্বীকার করে না। তেমনি মির্জা গোলাম আহমদের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যদি সত্যও হত তবু সে নবী বলে প্রমাণিত হত না। তবু আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি তার সত্য-অসত্যের মাপকাঠিরূপে উপস্থাপিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে অসত্য প্রমাণিত করে তাঁর দুর্বল ঈমানের অধিকারী বান্দাদেরকে এ পরীক্ষা থেকে রক্ষা করেছেন। এখানে আমি কেবল তার দুটি ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করব, যেগুলোর মাধ্যমে সে অকাট্যরূপে মিথ্যাবাদী সাবস্ত্য হয়েছে। একটি হল, ডেপুটি আবদুল্লাহ আথম নামক জনৈক খ্রিস্টানের মৃত্যু সংক্রান্ত। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বলেছে যে, ‘‘আথম ৫ জুন ১৮৯৩ঈ. থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ঈ. পর্যন্ত অর্থাৎ পনেরো মাস সময়ের মধ্যে মারা যাবে।’’ তারপর পুনরায় ১৮৯৩ ঈ. সালের সেপ্টেম্বরে এ ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘‘তার বেঁধে দেওয়া সময় সীমা অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবশ্যই মারা যাবে।’’

উল্লেখ্য যে, তখন আথমের বয়স ছিল সত্তরের কাছাকাছি। এসময় তার মারা যাওয়া বিচিত্র কিছু ছিল না। সে ভরসা করেই হয়ত মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এরূপ উক্তি করার সাহস পেয়েছিল কিন্তু আল্লাহ তাআলার মর্জি ছিল ভিন্ন রকম, মির্জা গোলাম আহমদকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা, তাই সে বয়ঃবৃদ্ধ আবদুল্লাহ আথম গোলাম আহমদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে মারা যায়নি; বরং তার পরও প্রায় দু’বছর বেঁচে থেকে ২৭ জুলাই ১৮৯৬ঈ. মারা যায়। মির্জা গোলাম আহমদ যেহেতু উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীটিকে তার সত্য ও অসত্য হওয়ার মাপকাঠিরূপে পেশ করেছে, তাই তার বেঁধে দেওয়া সময়সীমার পরে আথম যতদিন জীবিত ছিল, তার প্রতিটি মুহূর্ত গোলাম আহমদকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার সাক্ষ্য বহন করেছিল।

আর তার একটি ভবিষ্যদ্বাণী হল মুহাম্মাদী বেগমের বিবাহ সংক্রান্ত। এটি তার সবচেয় প্রসিদ্ধ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী। এটাকে সে তার বইপত্রে নিজের সত্যতার মাপকাঠি হিসেবে পেশ করেছে। মির্জা গোলাম আহমদের এক আত্মীয় ছিল মির্জা আহমদ বেগ। ভারতের হুশিয়ারপুরের অধিবাসী। অনিন্দ্য সুন্দরী মোহাম্মাদী বেগম তারই কন্যা। মির্জা গোলাম আহমদের মনে তাকে বিয়ে করার আগ্রহ জাগে। একদিন সে কন্যার পিতার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু আহমদ বেগ সম্মত হননি। মির্জা গোলাম আহমদ মির্জা আহমদ বেগকে প্রভাবিত করার জন্য জোরে শোরে দুটি কথা ঘোষণা করতে থাকে। একটি হল, মুহাম্মাদী বেগম তার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, এটা সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী ও ইলহাম দ্বারা জানতে পেরেছে। দ্বিতীয়টি হল, কন্যার পরিবার যদি এতে অমত পোষণ করে তবে তারা নানা রকম বিপদ-আপদে আক্রান্ত হবে। মুহাম্মাদী বেগমের উপরও বিপদ আসবে। মির্জা গোলাম আহমদ এসব কথা তার চিঠিপত্রে, বইপুস্তকে ও প্রচারপত্রে এত জোরে শোরে লিখতে শুরু করল যে, আহমদ বেগ যদি কোনো কাঁচা মানুষ হতেন তবে ভয়ে কন্যা দান করেই বসতেন। কিন্তু তিনি এসবে প্রভাবিত হননি; বরং তিনি নিজের অমতের উপর অবিচল থাকলেন। এভাবে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে যায়, আর মির্জা গোলাম আহমদ মুহাম্মাদী বেগমকে বিয়ে করার জন্য নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এক পর্যায়ে লাহোরের অধিবাসী সুলতান মুহাম্মাদ নামক এক লোকের সাথে মুহাম্মাদী বেগমের বিবাহ ঠিক হয়ে গেলে এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য মির্জা গোলাম আহমদ অনেক আশ্চর্য রকমের চেষ্টা-তদবির শুরু করে। যখন তার সকল চেষ্টা-তদবির ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন সে তার পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী আল্লাহর ইলহামের বরাত দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুরু করে। তাতে সে বলে যে, যদি সুলতান মুহাম্মাদের সাথে মুহাম্মাদী বেগমের বিয়ে হয় তবে বিয়ের পর আড়াই বছরের মধ্যে মুহাম্মাদী বেগমের পিতা মির্জা আহমদ বেগ মারা যাবে। আর মুহাম্মাদী বেগম বিধবা হয়ে তার বিবাহ বন্ধনে আসবে। আল্লাহর লীলা, সুলতান মুহাম্মাদের সাথে মুহাম্মাদী বেগমের বিবাহ হয়ে যাওয়ার পরও মির্জা গোলাম আহমদের পূর্ব ভবিষ্যদ্বাণী আরো জোরে চলতে থাকে। সে বলতে থাকে যে, এটা অদৃষ্টের অলঙ্ঘনীয় লেখা, কেউ এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। সুলতান মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার পর অবশ্যই মুহাম্মাদী বেগম তার স্ত্রী হবে। যদি এটা না হয় তবে সে মিথ্যাবাদী ও নিকৃষ্টতম জীব বলে সাব্যস্ত হবে। (আঞ্জামে আথম ও তার যমীমা) কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার এসব ধোঁকাবাজিকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং তার দম্ভ, অহঙ্কার ও দাবিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। ফলে ১৯০৮ ঈ. সালে যখন মির্জা গোলাম আহমদ মারা যায় তখনও সুলতান মুহাম্মদ ও তার স্ত্রী মুহাম্মাদী বেগম জীবিত থেকে অতি সুখে জীবন যাপন করছিলেন। এমনকি তার প্রয়াণের পর সুলতান মুহাম্মাদ প্রায় ৪০ বছর জীবিত ছিলেন। যার পরবর্তী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতিটি দিন মির্জা গোলাম আহমদকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার সাক্ষ্য বহন করেছিল। সুলতান মুহাম্মাদ ১৯৪৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

চতুর্থ মৌলিক নীতিটি হল এই যে, আল্লাহর কোনো নবী তার সমকালীন এমন কোনো ধর্মদ্রোহী শাসকবর্গ বা ক্ষমতাধর লোকের চাটুকারিতা, পদলেহন বা তল্পীবহন করতে পারেন না, যাদের প্রত্যক্ষ্য সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় কুফর ও ধর্মহীনতা বিস্তার লাভ করে।

উল্লেখ্য যে, ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী মানুষের মধ্যে ধর্মহীনতা, ধর্মদ্রোহিতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় বিস্তারে যে ভূমিকা রেখেছে, পৃথিবীর মানবেতিহাসে তার নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এমনি একটি দুষ্কর্মের পৃষ্ঠপোষক ইংরেজ সরকারের চাটুকারিতা করতে গিয়ে গোলাম আহমদ কোনোরূপ ত্রুটি করেনি। স্বয়ং গোলাম আহমদ তার ‘শাহাদাতুল কুরআন’ নামক বইয়ের পরিশিষ্টে ‘গভর্নমেণ্টের দৃষ্টি আকর্ষণ’ শিরোনামের অধীনে এক জায়গায় বলেছেন, ‘‘এই (ইংরেজ) সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রীকে আবিষ্ট করে রেখেছে।’’ তারপর সে লেখে, ‘‘আমি মাননীয় (ইংরেজ) সরকারকে এ নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমি এমনই আজ্ঞাবহ ও হিতাকাঙ্খী রয়েছি, যেমন আমার পূর্বসূরীরা ছিল।... আমি কামনা করি, আল্লাহ তাআলা এ সরকারকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।’’ (পৃ. ৩)

উপরিউক্ত চারটি মূলনীতি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আল্লাহ তাআলা যদি নবী প্রেরণের সিলসিলা বন্ধ না-ও করতেন তবু গোলাম আহমদের মত চরিত্রের ব্যক্তি নবী হওয়ার জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত বলে বিবেচিত হত না। (কায়িদানিয়াত পর গাওর করনেকা সীধা রাস্তা, মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নোমানী রাহ.)

কাদিয়ানীরা অমুসলিম কেন?

কোনো কোনো সাধারণ মানুষ মনে করে যে, কাদিয়ানীদের সাথে মুসলিম সমাজের বিরোধটা হানাফী-শাফেয়ী বা হানাফী-আহলে হাদীস অথবা কেয়ামী-বেকেয়ামীদের মতবিরোধের মত। আসলে বিষয়টি তা নয়, বরং কাদিয়ানীদের সাথে মুসলিম সমাজের বিরোধ এমন একটি মৌলিক আকীদা নিয়ে, যার বিশ্বাস করা-না করার উপর মানুষের ঈমান থাকা-না থাকা নির্ভর করে। এ প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরআন পাকের অনেক আয়াত ও অগণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত মুসলিম সমাজের অন্যতম মৌলিক আকীদা হল, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী এবং তাঁর পরে কোনো নবীর আগমন হবে না। মুসলমানদের এমন একটি অকাট্য আকীদার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে নবী বলে দাবি করল। সুতরাং সে মুসলমানদের সর্বসম্মত আকীদা মুতাবিক কাফের তথা অমুসলিম। আর যে বা যারা তাকে নবী বলে বিশ্বাস করে সে বা তারা ইসলামের সর্বজন স্বীকৃত আকীদা মুতাবিক মুসলমান থাকতে পারে না। তারা কাফের অর্থাৎ অমুসলিম। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি সহজে বোধগম্য হতে পারে। দেখুন, বাংলাদেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের একটির নাম আওয়ামী লীগ, আর অপরটির নাম বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতায়তাবাদী দল। প্রতিটি দলের ভিন্ন ভিন্ন ম্যানিফেস্টো বা সংবিধান আছে। যে যেই দল করে তাকে সে দলের ম্যানিফেস্টো মেনে চলতে হয়। যদি কেউ দলের সংবিধান লঙ্ঘন করে বা তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে অস্বীকার করে সে তার দলের সদস্যপদ রক্ষার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। তখন তাকে হয় নিজের অপরাধ স্বীকার করে সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে দলে থাকতে হয়, নতুবা বহিস্কারের শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে দল থেকে বের হয়ে যেতে হয়। ধরুন, কেউ আওয়ামীলীগ করে, কিন্তু সে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা স্বীকার করে না, এরূপ ব্যক্তি আর যা-ই হোক, আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারে না। কোনো আওয়ামীলীগার তাকে আওয়ামী লীগের সদস্য মেনে নেবে না। এরূপই কেউ যদি বিএনপি করে, কিন্তু জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক স্বীকার করে না, এমন কাউকে বিএনপি’র লোকজন নিজেদের লোক বলে গ্রহণ করবে না। এ সহজ-সরল মোটা কথাটি যদি বোধগম্য হয়, যে ব্যক্তি ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকীদায় বিশ্বাসী নয়; বরং তার বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘নবী’ বলে দাবি করে, আর যারা তার এ দাবিকে বিশ্বাস করে তারাও মুসলমান নামের পরিচয় বহন করতে পারে না। তাদেরকেও হয় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে এবং তওবা করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী মেনে নিয়ে এবং ইসলামের অন্য সকল মৌলিক আকীদাকে মেনে নিয়ে মুসলমান হতে হবে, অথবা মুসলমানের পরিচয় বাদ দিয়ে নিজেদের ভিন্ন ধর্মের নামে পরিচিত হতে হবে। এ কথাটি আমাদের দেশের সাধারণ লোকজন থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠী পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ যত তাড়াতাড়ি বুঝে নিতে সক্ষম হবে ততই তাদের দুনিয়ার জীবনে হেদায়াত ও পরকালের শান্তি ও মুক্তির পথ বেছে নিতে সহায়ক হবে।

যৌক্তিক বিচারে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি

এদেশীয় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন বাংলাদেশের নাগরিক, তেমনি কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের লোকেরাও এ দেশের নাগরিক। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে সকল ধর্মের অনুসারী লোকেরা যতটুকু নাগরিক অধিকার ও সুবিধা ভোগ করে, কাদিয়ানীরাও ততটুকু পাক, এতে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়, তবে সেটা তাদের নিতে হবে নিজের স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয়ে-মুসলমান পরিচয়ে নয়। তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভিন্ন নামে সমাজে বেঁচে থাকুক, আর্থ-সামাজিক কার্যক্রমে তারা তাদের স^তন্ত্র পরিচয় নিয়ে অংশগ্রহণ করুক, তাতেও কোনো মুসলমানের মাথাব্যাথা নেই। তবে মুসলমানের মৌলিক আকীদায় বিশ্বাসী না হয়ে (উল্টো কুঠারাঘাত করে) তারা মুসলমান পরিচয় ধারণ করবে, এ অধিকার তাদের নেই। সুতরাং কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি মুসলিম সম্প্রদায়ের আকীদা রক্ষার আন্দোলন তো অবশ্যই, ধর্মীয় অধিকারের বিষয়ও বটে।

এখন দেখা যাক, কাদিয়ানীরা অমুসলিম রূপে ঘোষিত ও চিহ্নিত না হলে তাতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে কি কি সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, এমন একটি সম্প্রদায় যারা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে অমুসলিম, তারা যদি সরকারীভাবে অমুসলিম ঘোষিত হয়ে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল হিসাবে চিহ্নিত না হয় তাতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং হতে থাকবে। যেমন :

১. তাদের রচিত ও প্রকাশিত বইপত্রকে মুসলমানদের লেখা বই-পুস্তকের মত মনে করে পাঠ করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং ঈমান হারিয়ে বসে।

২. তাদের উপাসনালয়কে মসজিদ মনে করে সেখানে গিয়ে নামায পড়ে। এতে মুসলমানদের কাছে ঈমানের পরে সর্বোচ্চ যে ইবাদত নামায, তা নষ্ট হয়।

৩. কাদিয়ানী ধর্মমতের অনুসারী কোনো ব্যক্তি মুসলমানের ইমাম সেজে তাদের ঈমান-আমল নষ্ট করতে পারে।

৪. তারা মুসলমান পরিচয়ে নিজেদের মতবাদ-মতাদর্শ প্রচার করলে তাতে সাধারণ মুসলমান তাদেরকে মুসলমানেরই একটি দল মনে করে তাদের মতবাদ গ্রহণ করে নিজেদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ঈমান হারিয়ে ফেলে।

৫. তারা মুসলমান নামে পরিচিত হওয়ার কারণে তাদের সাথে মুসলনামানের মত আচার-আচরণ ও চলাফেরা করে। অথচ তাদের সাথে মুসলমানের সম্পর্ক হওয়া উচিত এমনই, যেমন কোনো অমুসলিমের সাথে হয়ে থাকে।

৬. অনেক সাধারণ মুসলমান তাদেরকে মুসলমান মনে করে নিজেদের বিবাহের উপযুক্তা মেয়েদের তাদের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে অমুসলিমদের হাতে নিজেদের কন্যা তুলে দেয় এবং মুসলিম পাত্রের জন্য কাদিয়ানী ধর্মাবলম্বী লোকের মেয়েকে মুসলমান না করে বধু হিসেবে বরণ করে। ফলে এরূপ দম্পতি আজীবন ব্যভিচারের গুনাহে লিপ্ত থাকে।

৭. কোনো সম্পদশালী মুসলমান কোনো কাদিয়ানী ধর্মাবলম্বী গরীবকে যাকাত দিলে তার ফরয যাকাত আদায় হবে না।

৮. যে কোনো কাফের তথা অমুসলিমের জন্য হারাম শরীফে ঢোকা নিষেধ। অথচ কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের লোকেরা মুসলিম পরিচয় দিয়ে হজ্ব ও চাকরি-বাকরির নামে সৌদি আরবে গিয়ে হারাম শরীফে প্রবেশ করে তার পবিত্রতা নষ্ট করার সুযোগ পায়।

সুতরাং কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে মুসলমান থেকে পৃথক একটি ধর্মের অনুসারী দল ঘোষণা করে ভিন্ন নামে চিহ্নিত না করা হলে এরূপ বহু সমস্যা সৃষ্টি হয়, হতে পারে এবং ভবিষ্যতে হতে থাকবে। এতে মুসলমান সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে তারা যদি উত্তেজিত হয়ে উঠে তবে এতে দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, যা কারও কাম্য নয়। কাজেই তাদেরকে অবিলম্বে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল ঘোষণা করে পৃথক নামে তাদেরকে একটি সংখ্যালঘু দল হিসাবে মর্যাদা দিলে এবং তাদের জন্য ইসলামী পরিভাষাসমূহ যেমন : নামায, রোযা, মসজিদ, হজ্ব ইত্যাদির ব্যবহার নিষিদ্ধ করলে তা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পক্ষে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি। এটাই সচেতন মুসলিম সমাজের প্রাণের দাবি।

কাদিয়ানী সম্প্রদায় সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের  রায়

কাদিয়ানী সম্প্রদায় যেহেতু ইসলামের মৌলিক আকীদার পরিপন্থী আকীদা পোষণ করে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী স্বীকার করে না; বরং তারা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে নবী মনে করে এবং তার মতবাদ অনুসরণ করে তাই কোনো আদালত বা পার্লামেন্ট তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করুক, আর নাই করুক, তারা সুস্পষ্ট কাফের অর্থাৎ অমুসলমান। এটা ইসলামের ফয়সালা। তবু ইসলামের দুশমন ও ইসলামের জন্য ক্ষতিকর এমন একটি সম্প্রদায়কে মুসলমানের মুখোশ পরে চলার প্রশ্রয় দেওয়া সচেতন মুসলিম সমাজের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই তাদেরকে সরকারীভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করে পৃথক একটি ধর্মাবলম্বী দল হিসাবে চিহ্নিত করা এবং ইসলামের পরিভাষাসমূহকে তাদের ধর্মীয় কর্মকান্ডের জন্য ব্যবহার করাকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা আবশ্যক। এটাই সচেতন মুসলিম সমাজের ঈমানী চেতনার দাবি। বহু ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বহু তর্ক-বহসের পর ১৯৭৪ঈ. সালে ভুট্টো সরকারের আমলে পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলী কাদিয়ানীদের ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণা করে এবং তাদের জন্য ইসলামী পরিভাষাসমূহ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তারপর লাহোর হাইকোর্ট ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯২ ইং সালে, সম্মিলিত শরয়ী আদলত ১৯৮৪, ১৯৯১ঈ. সালে, কোয়েটা হাইকোর্ট ১৯৮৭ঈ. সালে,

সুপ্রিম কোর্ট শরয়ী এপিলেট বেঞ্চ পাকিস্তান ১৯৮৮ঈ. সালে এবং

পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট ১৯৯৩ঈ. সালে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করে। এছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আফগানিস্তান, মুসলিম লীগ, আর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ওআইসির অন্যতম সদস্য দেশ।

বাংলাদেশ কোর্টের রায়

কাদিয়ানীরা ‘ইসলামেই নবুওয়াত’ নামক একটি বই রচনা করে তাতে কুরআন ও হাদীসের বিকৃত ও মনগড়া অর্থ করে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নতুন নবীর আগমনের পথ তৈরি করার চেষ্টা করে। বইটি মুসলিম সমাজের আকীদা-বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানার কারণে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ঈ. সালের আগস্ট মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কাদিয়ানীরা সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি জনাব সুলতান আহমদ খান ও বিচারপতি জনাব এম. মাহমুদুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে যথোপযুক্ত শুনানির পর কাদিয়ানীদের আবেদন নামঞ্জুর করেন। মাননীয় বিচারপতিগণ তাদের রায়ে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের পরে নবী আবির্ভূত হওয়ার আকীদাকে কুফরী বিশ্বাস বলে ঘোষণা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন আদালতের রায়ে কাদিয়ানীরা যে অমুসলিম ঘোষিত হয়েছে, এ শুনানির মাধ্যমে বাংলাদেশ হাইকোর্ট সে কথাই পুনঃব্যক্ত করেছেন। সংবাদটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ঈ. তারিখে প্রকাশিত হয়।

১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে অন্য একটি মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মাদ আব্দুল জলিল ও বিচারপতি মোহাম্মাদ ফজলুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আইনের দৃষ্টিতে কাদিয়ানীদের অমুসলিম বলে রায় প্রদান করেন। এর দ্বারা বাংলাদেশে হাইকোর্টের মতেও কাদিয়ানীরা অমুসলিম ঘোষিত হয়েছে। সরকার কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও কাদিয়ানীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার সুপারিশ করেছেন। (তথ্য সূত্র : মো : আব্দুল কাসেম ভূঞা, কাদিয়ানী ধর্মমত বনাম ইসলামী দুনিয়ার অবস্থান)

সুতরাং মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতসমূহের রায় এবং আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ ইসলামী সংস্থা ওআইসি’র সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওআইসি’র সদস্যদেশ হিসাবে বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত কাদিয়ানীদেরকে সরকারীভাবে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণা করা এবং তাদের জন্য ইসলামী পরিভাষাসমূহের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

সুত্রঃ মাসিক আল কাউসার  

কারা শিয়া ও সুন্নী

১৭ই এপ্রিল ১৯৪৬ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করা সিরিয়া ১৯৭১ সাল থেকে শাসন করে আসছে আসাদ ফ্যামিলি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ ছিলেন বিমানবাহিনীর প্রধান। ১৯৬৬ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বাথ পার্টি তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ১৯৭০ সালে হাফিজ আল আসাদ আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বাথ পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কারাগারে ঢুকান এবং নিজেকে ঘোষণা দেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে।
    হাফিজ আল আসাদ

আসাদের গোত্র অ্যালাওয়াইটরা বিশ্বাসের দিক থেকে শিয়া মতালম্বি। সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার(২২ মিলিয়ন) মধ্যে এই গোত্রের সদস্যরা ১২% হলেও আসাদ ফ্যামিলি ক্ষমতা দখল করার পর দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছে তারা। মেধা কিংবা যোগ্যতা নয়, সিরিয়ায় ভালো চাকরী পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এই গোত্রের সদস্য হলে কিংবা তাদের গোলামি করলে। রাষ্ট্রের এই বঞ্চনা ক্ষোভের জন্ম দেয় সিরিয়ার অন্যান্য সাধারণ মানুষদের মনে।
    সিরিয়ায় alawite গোত্রের অবস্থান

আজ যে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তার শুরুটা কিন্তু এখন নয়। বঞ্চনার বিরুদ্ধে সবসময়ই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে আসছিলেন সাধারণ নাগরিকরা। কিন্তু প্রতিবাদ করার কোন অধিকার যেন ছিল না তাদের। যদি কোন দল বা গোষ্ঠী বিক্ষোভ করার চেষ্টা করত, তা অন্ত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করতেন হাফিজ আল আসাদ। যার মধ্যে Hama massacre  খ্যাত ১৯৮২ সালের ঘটনাটি আজও মানুষ কষ্টের সাথে স্মরণ করে। যেই ঘটনায় হাফিজ আল আসাদের নির্দেশে হত্যা করা ৪০ হাজার বিক্ষোভকারীকে।
       হামার গণহত্যার একটি দৃশ্য

হাফিজ আল আসাদের মৃত্যুর পর ২০০০ সালে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু শোষণ-নিপীড়ন, নির্যাতনে বাবার চেয়েও কোন অংশে কম নয় বাশার। বাক অথবা ব্যক্তিস্বাধীনতার স্থান নেই সিরিয়ায়। বাশারকে সম্বোধন করতে হয় 'মি. প্রেসিডেন্ট' বলে, অন্যথায় জেল-জুলুল, শাস্তি নিশ্চিত।
    বাশার আল আসাদ

এক মহিলা ডাক্তারকে গ্রেফতারের ঘটনায় বুঝা যায় কতটা নিয়ন্ত্রিত সে দেশের নিউজ মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া। সেই ডাক্তারের অপরাধ তিনি গাদ্দাফির স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ায় লিবিয়াবাসিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। আর এতেই তাকে গ্রেফতার করে সিরিয় সরকার এবং মাথার চুল চেঁছে দিয়ে তাকে বন্দি করা হয় জেলে।

 সালটা ২০১১, আরব বসন্তে একের পর এক পতন ঘটছে স্বৈরচার শাসকদের। যাতে উজ্জিবিত হয়ে স্বৈরশাসক আসাদবিরোধী সিরিয়ার নাগরিকরা (alawite গোত্র ব্যতিত দেশের প্রায় সকল নাগরিক) বিক্ষোভ শুরু করে আসাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাবার মতই আসাদের নির্দেশে সরকারী বাহিনী গুলি চালায় বিক্ষোভকারীদের উপর। প্রায় এক মাস চলছিল এমনি, যখনি চেষ্টা করা হয়েছে বিক্ষোভের, আসাদ বাহিনী গুলি চালিয়েছে নির্বিচারে। আর তাতেই এই বিক্ষোভ এক সময় রূপ নেয় সশস্ত্র বিদ্রোহে।0
    আসাদবিরোধী বিক্ষোভের একটি দৃশ্য

এভাবে একের পর এক যখন বিক্ষোভকারীদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছিল আসাদ বাহিনী। তখনই এক দল সৈন্য আসাদের পক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে চলে আসে এবং ঘোষণা দেয় বিক্ষোভকারীদের রক্ষার। সাধারণ বিক্ষোভকারী যারা পূর্বে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক যোগ দেয় পক্ষ ত্যাগকারী এই আর্মিদের সাথে। যাদের সবার লক্ষ্য আসাদ ফ্যামিলিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা।
আসাদবিরোধী লড়াইয়ে অংশরত সবাই মিলে গঠন করে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বা FSA
    FSA এর প্রশিক্ষণের একটি দৃশ্য

আগস্ট, ২০১১ সালের দিকে সিরিয়ার সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল নামে সরকার গঠন করে। ধারনা করা হচ্ছিল সিরিয়ায় বোধহয় লিবিয়ার অনুরূপ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। প্রথমে কিছু সেনাদের বিদ্রোহ, তারপর বিদ্রোহীদের সরকার ঘটন, তারপর পশ্চিমাদের সহায়তায় ক্ষমতায় আসা। সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের আগমনের পর এমনটাই হওয়া ছিল স্বাভাবিক।
    তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের মিটিং

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুধু সিরিয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যদিও এটি কোন বিশ্বযুদ্ধের রূপ ধারন করেনি অথবা ধারন করার কোন সম্ভাবনা নেই তবু বিশ্বের প্রায় সকল শক্তিধর রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে। আসাদ গোত্র শিয়া হওয়ার সুবাদে তাদের পক্ষ নিয়েছে ইরান ও লেবাননের হিযবুল্লাহ গ্রুপ এবং ইরান ও আসাদের সাথে সুসম্পর্কের কারণে চিন ও রাশিয়াও আসাদকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। সিরিয়ার ৭২% লোক সুন্নি মুসলিম, আরবের সুন্নি রাজারা যদিও নিজেরা ধার্মিক নয়, তবু শিয়াদের বিরুদ্ধে সুন্নিদের এই সশস্ত্র বিদ্রোহকে নানাভাবে সহায়তা করছে। আর ইসরাইলের সাথে সিরিয়ার এবং হিজবুল্লার কয়েকটি যুদ্ধের ইতিহাস থাকায় পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো পক্ষ নিয়েছে আসাদবিরোধীদের।

ইরান ও হিজবুল্লাহ অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সরাসরি লড়াই করছে আসাদের পক্ষে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সহায়তা পাচ্ছে তারা চিন ও রাশিয়ার কাছ থেকে। ন্যাশনাল কাউন্সিল তাই কয়েক বার অস্ত্র সহযোগিতা চায় পশ্চিমাদের কাছ থেকে। কিন্তু পশ্চিমারা একটি ভয়ের কথা ব্যক্ত করে যে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের একটি অংশ কট্টর ইসলামপন্থী, তাই তারা ভীত যে অস্ত্র দিলে সেটা মুজাহিদিনদের হাতে চলে যাবে। সিরিয়ার জিহাদিরাও আমেরিকা থেকে অস্ত্র চায় না এবং প্রত্যাখ্যান করে বিদ্রোহী সরকারকে।
    নামাজরত সিরিয়ার মুজাহিদিনরা

USA এবং ইসরাইলসহ পশ্চিমা বিশ্বের ভয়ের কারণ, মুজাহিদিনদের এই লড়াই শুধু আসাদকে হটানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, তাদের টার্গেট সিরিয়ায় ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা এবং শরিয়াহ আইন চালু করা। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রায় ৬০% ভাগ এই মুজাহিদিনদের পক্ষে, তাছাড়া সুন্নি মুসলিমদের উপর আসাদের নির্যাতনের ঘটনা এবং ইসলামী খেলাফতের স্বপ্ন সারা বিশ্বের মুসলিম তরুণদের নিয়ে আসছে সিরিয়ায়। যার মধ্যে ইরাক, আফগান, সোমালিয়া, বসনিয়া  প্রভৃতি দেশসমুহের মুজাহিদীনরা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আরব এবং পশ্চিমা দেশসমূহের অনেক মুসলিম তরুণ, সিরিয়াতেই যাদের প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
    চেচেন মুজাহিদের নেতৃত্বে অংশরত বিভিন্ন দেশের মুজাহিদরা

সিরিয়ায় এই তিন দলের বাহিরেও আরেকটি দল লড়াই করছে যাদের কথা তেমন আলোচনায় আসে না। উপরের তিনটি দলের লড়াইয়ের মৌলিক লক্ষ্যের মধ্যে সিরিয়া বিভক্ত করার বিষয়টি নেই। কিন্তু কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর লক্ষ্য সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বিরাট অংশ দখলে নিয়ে স্বাধীন কুর্দিস্থান গঠন করা যে দেশের স্বাধিনতায় আর কোন আঘাত আসবে না। শুধু সিরিয়াতেই নয়, ইরাক, তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশেও স্বাধীন ভূমির জন্য লড়াই করছে কুর্দি বিদ্রোহীরা।
    স্বপ্নের স্বাধীন কুর্দিস্তান

দুই বছর সাত মাস পূর্বে সিরিয়ায় শুরু হওয়ায় যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে সোয়া লাখের উপর মানুষ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে প্রায় দুই লাখের বেশী শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া গৃহহীন মানুষের সংখ্যা সাত লাখ বলা হয়েছে। যদিও এগুলো পরিসংখ্যান, কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে ভয়াবহ।
    জর্ডানের শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে বিশ্রাম নিচ্ছে কয়েকটি সিরিয় পরিবার

সিরিয়ার যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই বাশার বাহিনী সিরিয়ার অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কিছুদিন পূর্বে ইরান বলেছিল, আমেরিকার সাথে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে আগ্রহী। অর্থাৎ, আমেরিকার সহায়তায় ইরান সিরিয়ার মুজাহিদিনদের হারিয়ে আসাদকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। যদি আমেরিকা তাতে সম্মত হয়, তবে ইরান, হিযবুল্লাহ, রাশিয়া, চিন, আমেরিকা, ইসরাইলসহ পশ্চিমা বিশ্বের সব দেশকে এক কাতারে দেখতে পাওয়া যাবে। যদিও আসাদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে, তবু তারা এখন আসাদের পক্ষ নেওয়া অস্বাভাবিক নয় কারণ, আসাদকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়ে দিলে সে পশ্চিমা বিশ্বের গোলাম হয়ে থাকবে এবং মুজাহিদিনরা যদি সিরিয়া দখল করে নেয় তবে সেই সিরিয়া হবে পশ্চিমাদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন আরব রাজাদের জন্য ইরান-আমেরিকার সুসম্পর্ক মেনে নেওয়াটা হবে কষ্টের।

অপরদিকে আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো সিরিয়ায় হামলা করে আসাদকে হটিয়ে তাদের অনুগত ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে ক্ষমতায় বসাবে এবং মুজাহিদীনদের সন্ত্রাস আখ্যায়িত করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসাবে সিরিয়ায় নিজেদের সৈন্য রাখতে চাইতে পারে।তখন অবশ্য শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। কারণ, একদিকে বাশার বাহিনী ও তাদের মিত্র হিজবুল্লাহ এই ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সরকারের উপর হামলা করবে, অপরদিকে মুজাহিদীনদের হামলা তো রয়েছেই। এই অবস্থায় আরব রাজারা থাকবে সবচেয়ে নির্ভাবনায় এবং নবগঠিত সরকারকে বিপুল অর্থ দিয়ে সহায়তা করবে এটা নিশ্চিতকরেই বলা যায়।

মুজাহিদীনরা এখন পর্যন্ত যেভাবে লড়ছে তাতে সমগ্র সিরিয়ায় তাদের বিজয় লাভ করা অসম্ভব নয়। কুর্দি বিদ্রোহীদের সাথে যদি শান্তিচুক্তি করে যে কুর্দিদের কোন নিপীড়ন করা হবে না, তাহলে হয়ত কুর্দিদেরও পাশে পাওয়া যাবে। কিছুদিন পূর্বে কুর্দিদের ছোট দুইটি বিদ্রোহী গ্রুপ শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুজাহিদীন দের সাথে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল, মুজাহিদিনদের পাশে আন্তর্জাতিক কোন সমর্থন নেই যা একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র গঠন ও সরকারের স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করবে। কিন্তু যদি আমেরিকা অথবা ইসরাইল সেই মুজাহিদিনদের হামলা করে, তবে সেটা আরেক আফগানস্থানের মত হতে পারে এবং যুদ্ধ পুরা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।

এই যুদ্ধের ফলাফল কি হবে? কে জয় লাভ করবে? কুর্দিরা কি পারবে তাদের স্বপ্নের স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করতে? সিরিয়ার শরণার্থীরা কবে তাদের নিজ গৃহে ফিরতে পারবে?
এমন শত প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও দীর্ঘ সময়ের।

শিয়া আর সুন্নি কারা? এদের মধ্যে পার্থক্য কী? কুর্দি কাদেরকে বলে? বিস্তারিত।

উত্তর-->
ইসলামের প্রধান ২ টি সেক্ট এই সুন্নি আর শিয়া। সুন্নিদের বলা হয় orthodox মুসলিম, অর্থাৎ মেইনস্ট্রিম মুসলিম বা প্রথাগত মুসলিম।
অনেকগুলো বই আর নেট ব্রাউজ করে এ পোস্টের তথ্যগুলো যোগাড় করা হয়েছে।
আর, পোস্টটি একটু বড়, তাই ধৈর্য নিয়ে পড়তে হবে।
শিয়া অরিজিনঃ
একদম প্রথম থেকে বলি। হিজরত এর ঘটনায় কুরাইশদের মধ্যে কেউ কেউ হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন, “আপদ গেল” বলে। কিন্তু কারা সবচেয়ে অখুশি হয় জানেন? মদিনার ইহুদীরা। তাদের নেতা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল। মদিনার নেতা হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় মুহাম্মাদ (সা) এর আগমনে। তখন থেকেই ইসলামের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র শুরু করা হয়। তাই, মুহাম্মাদ (সা) ষড়যন্ত্রকারী ইহুদিদের ইয়াস্রিব (মদিনার আগের নাম) থেকে বহিষ্কার করেন।
এবার, ঘটনা ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে উমার (রা) এর আমলে আসি। তাঁর সময় পারস্য জয় করে মুসলিমরা। তখনি সেই বিখ্যাত ঘটনা ঘটে, হরমুজান এর । এটা সবারই জানার কথা, আমরা সবাই ছোটো ক্লাস এ ধর্ম বই এ উমার (রা) এর মহানুভবতার কাহিনী পড়তে গিয়ে হরমুযান এর কাহিনী পড়েছি। পারস্য বাহিনীর কমান্ডার হরমুযান, যে কিনা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে ছলনার আশ্রয় নেয়। পানি চেয়ে বলে এটাই তাঁর শেষ ইচ্ছা যে, এ পানি পান না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হবে না, আর পরে সে এ পানি ফেলে দেয়। কিন্তু উমার (রা) তাঁকে হত্যা করেন নি। আমাদেরকে শেখান হয়েছিল, তাঁর মহানুভবতা দেখে হরমুজান ইসলাম “গ্রহণ” করে। আসলে, কিন্তু অতি দুঃখের ব্যাপার, সেটা লোকদেখানো ছিল।
মুক্তি পেয়ে হরমুজান বাস করতে থাকে মদিনায়। এবং, উমার (রা) কে হত্যা করার পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয় জাফিনা আলখালিল (খ্রিস্টান) আর সাবা ইবনে শামুন (ইহুদী)।
কেন তারা একসাথে হল? কারনঃ
১/ হরমুজানের পারস্য বাহিনীকে হারিয়েছে মুসলিমরা। প্রতিশোধ চাই।
২/ জাফিনার রোমান বাহিনীকে হারিয়েছে মুসলিমরা। প্রতিশোধ চাই।
৩/ সাবার ইহুদী গোষ্ঠীকে বহিষ্কার করেছে মুসলিমরা। প্রতিশোধ চাই।
আর নতুন ধর্ম ইসলামের প্রতি সম্মিলিত বিতৃষ্ণা তো আছেই। আর, গুপ্তহত্যা করার ব্যাপারে ইহুদিদের সর্বদাই খ্যাতি ছিল। তো, ৭ নভেম্বর ৬৪৪ সালে ফিরোজ নামের এক আততায়ীকে দিয়ে উমার (রা) কে হত্যা করা হয়। ফিরোজ ৬ বার মতান্তরে ৩ বার ছুরিকাঘাত করে। সাহিহ বুখারি মতে, ফিরোজ ধরা পড়ার পর আত্মহত্যা করে। কিন্তু, শিয়ারা তা মানে না।
উমার (রা) এর ছেলে উবাইদুল্লাহ হরমুযান আর জাফিনাকে হত্যা করেন। অবশ্যই, ইহুদী সাবা বেঁচে যায়। (আড়ালে কাজ করেছিল সাবা) পরে, উবাইদুল্লাহকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তাঁকে উপস্থিত করা হয় নতুন খলিফা উসমান (রা) এর সামনে। উযির আলি (রা) বললেন, উবাইদুল্লাহ বিনা প্রমাণে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেছে, যেটা ইসলাম মানে না। এটা তাঁর করা উচিত হয়নি। আলি(রা) এর পক্ষে সমর্থন দেন অনেকে। আবার উবাইদুল্লার প্রতিও অনেকে সমর্থন দেন। তখন তারা ২ ভাগ হয়ে যান। পরে, উসমান (রা) উবাইদুল্লাহ এর পক্ষ হতে জরিমানা প্রদান করেন।
কিন্তু, ততদিনে বিভেদ যা হবার হয়ে গেছে। ইহুদী পরিকল্পনা সফল হতে শুরু করেছে। ইহুদী সাবা তখন যেটা করলেন, তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে বললেন, মুসলিমদের দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে, যেন এরপর থেকে সহজেই ইহুদীরা মুসলিমদের গোপন খবর পেতে পারে। ভিতর থেকে বিভেদ সৃষ্টি করতে একজনকে দরকার ছিল।
পরিকল্পনামত, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তাই করলেন। তিনি নিজেকে অতীব ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে প্রকাশ করলেন। আর বললেন, মুহাম্মাদ (সা) এর আপন আত্মীয় হিসেবে খেলাফত সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য আলি (রা) এর। তিনি আলি (রা) এর পক্ষে প্রচারনা করা শুরু করলেন। আর, উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার। শুধু উসমানই নন, আবু বকর(রা), উমার(রা) এবং উসমান(রা) ৩ জনের নামের বিরুদ্ধেই তিনি কুৎসা ছড়াতে লাগলেন। জনতা ক্ষিপ্ত হতে লাগল উসমান (রা) এর উপর। ইবনে সাবা হয়ে উঠলেন জনপ্রিয়। ফল কী দাঁড়ালো? ১৭ জুলাই ৬৫৬ সালে উসমান (রা) কে হত্যা করা হল।
আর আলি(রা) এর অনুসারীরা দাবি করতে লাগল, আলি (রা) যেন খলিফা হন। তারা নিজেদের ‘শিয়া’ নামে পরিচয় দিতে লাগল। শিয়া মানে পরিবার বা অনুসারী। “শিয়াতু আলি” থেকে “শিয়া”, মানে, আলির পরিবার বা আলির অনুসারী।
যাই হোক, প্রথমে আলি (রা) রাজি হননি খলিফা হতে। পরে লোকজন গিয়ে সাদ (রা), তালহা (রা), জুবায়ের (রা) প্রমুখের কাছে গিয়ে খলিফা হবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তারাও রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত আলি (রা) এই বলে রাজি হলেন, সবাই তাঁকে মানলেই তিনি খলিফা হবেন। পরে সবাই তালহা (রা) আর জুবায়ের (রা) কে সভায় হাজির করল। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা আলি(রা) কে মানবেন? তারা নীরব রইলেন। পরে উপস্থিত একজন তরবারি বের করে হুমকি দিলে তারা শর্তসাপেক্ষে রাজি হলেন। বিস্তারিত কাহিনী এখানে উল্লেখ করলাম না। অন্যদিকে মুয়াবিয়া (রা) মানলেন না তাঁর খেলাফত। মুয়াবিয়ার দূত মদিনায় এলে সেই ইহুদী ইবনে সাবার লোক তাঁকে হত্যা করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু, মনে হল, আলি (রা) চেষ্টা করেছেন। ফলে আলি আর মুয়াবিয়ার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হল। তা দেখে এক পর্যায়ে, তালহা (রা) আর জুবায়ের (রা) মদিনা ত্যাগ করলেন।
অন্যদিকে আয়িশা (রা) হজ পালন শেষে মদিনা ফেরার পথে খবর পেলেন উসমান (রা) কেও গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর উটের উপর থেকে একটি উদ্দীপক ভাষণ দেন যে, উসমান (রা) হত্যার প্রতিশোধ নিতেই হবে। উপস্থিত মানুষজন তাঁর কথায় উদ্দীপ্ত হয়ে আন্দোলন সৃষ্টি করে। তালহা (রা) আর জুবায়ের(রা) মক্কা পৌঁছে আন্দোলনে যোগ দেন।
পরের ঘটনা, আলি (রা) আর আয়িশা (রা) এর বাহিনী মুখোমুখি হয়। কিন্তু আলি (রা) সংলাপে বসতে চাইলেন। ইবনে সাবা তখন প্রমাদ গুনলেন। কারণ, সন্ধি হলে বিভেদ হবে না, তাঁর উদ্দেশ্য সফল হবে না। চক্রান্ত শুরু করলেন তিনি। তো, সংলাপ সফল হল না। যুদ্ধ হবেই।
২ পক্ষই চাইল যুদ্ধ যেন না হয়। কিন্তু রাতের আঁধারে ইবনে সাবার দল আলির (রা) শিবিরে আক্রমন করে। কিন্ত মনে হল, প্রতিপক্ষ আয়িশা (রা) এর বাহিনী আক্রমন করেছে। তাই তারাও পাল্টা আক্রমণ চালাল। যুদ্ধ হলই। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আলি(রা) জুবায়ের (রা) এর কাছে গিয়ে বললেন, “মনে আছে? একদিন রাসুল বলেছিলেন তুমি ভবিষ্যতে অন্যায়ভাবে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?” জুবায়ের বললেন, “ও! হ্যাঁ! তাই তো!” সাথে সাথে জুবায়ের (রা) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে চলে গেলেন। ইবনে সাবার এক লোক জুবায়েরের পিছু নেয়। পরে জুবায়ের (রা) জোহোর এর নামায শুরু করতেই তাঁকে খুন করল। আনন্দের সাথে আলি (রা) এর কাছে এল খুনি, এরপর জুবায়েরের (রা) তরবারি, বর্ম পেশ করল। আলি(রা) তাঁকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিলেন। সাথে সাথে, সেই লোক পেটে তরবারি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। অন্যদিকে তালহা (রা) যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার সময় একটি তীরের আঘাতে মারা যান। আলি (রা) এ ২জনের মৃত্যুর কথা শুনে মনবেদনায় কাতর হয়ে পড়লেন।
আলি (রা) বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। যতক্ষণ আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিবেন, ততক্ষণ চলবে যুদ্ধ। ১০০০০ মুসলিম মারা যাবার পর আলির(রা) বাহিনীর একজন উট পর্যন্ত পৌঁছে পা কেটে ফেলেন। ফলে উট বসে পড়ল। আর আয়িশার (রা) বাহিনীর মন ভেঙ্গে গেল। পরে, আলি(রা) আয়িশার(রা) হাওদাটি অদুরে নিয়ে গিয়ে পর্দা দিয়ে ঘিরে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর সেখানে ঢুকে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তারা পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইলেন। যুদ্ধ বন্ধ হল। এ যুদ্ধ জামাল (উট) যুদ্ধ নামে পরিচিত। কারণ, আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন।
মুসলিমদের যতই ক্ষতি হোক, লাভ হল ইসলামের শত্রুদের। আলি (রা) ইবনে সাবা আর তাঁর অনুসারীদের নির্বাসিত করলেন। তারা নির্বাসনে গিয়েও একটি secret societyর অনুরুপ কাজ করতে লাগল, যার সমতুল্য বর্তমান FreeMasons, Illuminati ইত্যাদি। সাবায়িরা (ইবনে সাবার অনুসারী) আলি (রা) কে পরে হত্যা করে।
আর এরপরের কাহিনী মোটামুটি সবারই জানা। সেই যে মুয়াবিয়া (রা) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, পরে খিলাফত চাইলেন, এরপর, হাসান (রা), হুসাইন (রা), ইয়াজিদ(রা) এর কাহিনী... আর এরপর কারবালা। এ পর্যন্ত এবং এর পরেও যারা আলি (রা) আর তাঁর বংশকে অনুসরণ করেছে, তারাই হলো... আজকের শিয়া সম্প্রদায়।
সুন্নি আর শিয়া বিশ্বাসের কী পার্থক্য?
শিয়াদের অনেক ভাগ-উপবিভাগ আছে। এখানে তাদের মৌলিক বিশ্বাস এর সাথে সুন্নিদের বিশ্বাস তুলনা করা হলঃ
# সুন্নিঃ চার খলিফাতে বিশ্বাসী। আবু বকর (রা), উমার (রা), উসমান (রা), আলি(রা)
শিয়াঃ আবু বকর, উমার, উসমান খলিফা হয়েছিলেন অবৈধভাবে (নাউযুবিল্লাহ); কেউ কেউ তাঁদের কাফির বলে। উমার (রা) এর হত্যাকারী ফিরোজ এর কবর সযত্নে সংরক্ষণ করেছে তারা।
# সুন্নিঃ ইমাম প্রথার উপর তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় নি।
শিয়াঃ তাঁদের মূল বিশ্বাস এ ইমাম প্রথা। ১২ ইমামে বিশ্বাসী। প্রথম ইমাম আলি(রা)। এবং মনে করে ইমামরা মাসুম । তারা গায়েবের খবর জানেন । যেটা শিরক ( নাউযুবিল্লাহ ) ।
# সুন্নিঃ সুন্নীরা বিশ্বাস করে বিশ্বাসের সাথে সাক্ষ্য দিতে হবে।
শিয়াঃ আর শিয়ারা প্রয়োজনে বিশ্বাস গোপন রাখাকে জায়েজ মনে করে।যা তাকিয়া নামে পরিচিত।
# সুন্নিঃ মাহদি আসবেন মুসলিম জাতিকে নেতৃত্ব দিতে।
শিয়াঃ মাহদি হবেন ১২শ ইমাম। ইমাম মাহদি। (সুন্নিরা উপমহাদেশীয় শিয়াদের সংস্পর্শে এসে মাহদির আগে ইমাম বলে) তারা অতি সম্মানার্থে মাহদির পরে আলাইহিস সালামও বলে।
# সুন্নিঃ সাহিহ হাদিস বলতে সিহাহ সিত্তাহ কে বুঝান হয়।
শিয়াঃ তাঁদের হাদিস আলাদা। তারা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির হাদিস বর্জন করে। যেমন, আয়িশা (রা), আবু হুরাইরা (রা) প্রমুখ।
# সুন্নিঃ রাসুল (সা) মৃত্যুশয্যায় ইহুদীর বিষ যন্ত্রণা ভোগ করেন।
শিয়াঃ (সবার বিশ্বাস না) সেই বিষ খায়বারের ইহুদী নারীর না। এ বিষ নবী (সা) কে প্রয়োগ করেন আয়িশা (রা) আর হাফসা (রা) যারা যথাক্রমে, আবু বকর (রা) আর উমার (রা) এর মেয়ে। (নাউজুবিল্লাহ)
# সুন্নিঃ দুনিয়ার সর্বত্র নামাযের সিজদা করা যাবে।
শিয়াঃ সাধারনত কারবালার মাটিতে তৈরি বস্তু সামনে রেখে সেটার উপর সিজদার সময় কপাল রাখা হয়।
# সুন্নিঃ পাঁচ ওয়াক্তে নামাজ পড়া হয়।
শিয়াঃ তিন বারে পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করা যায়। ফযর, এরপর জোহর+আসর, এরপর মাগরিব+এশা ।
# সুন্নিঃ নামাযে হাত বেধে রাখা হয়। তবে, মালিকি মাযহাবের অনুসারীরা হাত ছেড়ে পড়ে। উভয়টিই গ্রহণযোগ্য।
শিয়াঃ হাত ছেড়ে নামাযে দাঁড়ায়।
# সুন্নিঃ হিজাবের ক্ষেত্রে ২টি মতবাদ আছে। মুখ খোলা রাখা, আর মুখ ঢাকা।
শিয়াঃ মুখ খোলা রাখা।
# সুন্নিঃ মুতাহ বিয়ে নিষিদ্ধ ।
শিয়াঃ মুতাহ বিয়েকে তারা জায়েজ বলে । ( কিছুদিনের চুক্তির বিয়ে )
এসব ছাড়াও আরও কিছু পার্থক্য এর কথা বলা হয়, যেগুলো প্রমানিত না। তাই ওগুলো বাদ দিলাম। আর এমনিতে আরও কিছু ছোটোখাটো পার্থক্য আছে।
এবার আপনার আরেক প্রশ্নে আসি।
কুর্দি কারা?
উত্তরঃ
পশ্চিম এশিয়ার একটি জাতি কুর্দি। ( کورد, Kurd)
ইরান ইরাক সিরিয়া আর তুরস্কের কিছু অঞ্চল মিলিয়ে কুরদিস্তান গঠিত, এ অঞ্চলের অধিবাসীকে কুর্দি বলে।
সারা বিশ্বে ৩ কোটি কুর্দি আছে। বেশির ভাগ থাকেন কুর্দিস্তানে। এছাড়াও তারা থাকেন পশ্চিম তুরস্ক, আরমেনিয়া, জর্জিয়া, ইসরাইল, আজেরবাইজান, রাশিয়া, লেবানন, কিছু ইউরোপীয় দেশ আর যুক্তরাষ্ট্রে।
তাদের ভাষা কুরদিশ।
বেশিরভাগ মুসলিম কুর্দিরা শাফিয়ি মাজহাবের সুন্নি মুসলিম। তবে কিছু শিয়াও আছে।
আর অন্যান্য ধর্মের অনুসারীও আছে, "আহলে হক" ধর্ম, ইয়াজিদি ধর্ম- এসব নবউদ্ভাবিত ধর্ম যেমন আছে তেমন আছে প্রাচীন ধর্মের অনুসারীও যেমন, ইহুদি আর খ্রিস্টান।
আশা করি আপনার উত্তর পেয়েছেন
আল্লাহ ভাল জানেন।


★ প্রথমবার্তা, ডেস্ক : আমার প্রশ্ন হলো সুন্নি-শিয়াদের মধ্যে কেন এত বিরোধ লেগে থাকে?

আর আমি অনেকের কাছেই শুনেছি- শিয়ারা রাসূল (সা.)কে নবী হিসেবে স্বীকার করেন না, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না? আল্লাহর পরেই তো রাসূলকে সম্মান করতে হবে? শিয়ারা কি আসলেই প্রকৃত মুসলিম? আসলে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনাগুলোর ব্যখ্যা নিয়ে মতভেদের কারণেই মুসলমানদের মধ্যে নানা মাজহাব বা মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে। এটি সব ধর্মের মধ্যেই দেখা যায়। এ জাতীয় মতভেদ কেবল তর্ক বা মত-বিনিময়ের পর্যায়ে সীমিত থাকলেই তা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু এ নিয়ে সহিংসতা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা সব পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর বলে এ ব্যাপারে মুসলমানদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশি বা রজ্জুকে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।

আসলে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও অনেক মৌলিক বিষয়েই রয়েছে মতের মিল। যেমন, উভয় মাজহাবই এক আল্লাহ, অভিন্ন ধর্মগ্রন্থ তথা পবিত্র কুরআন এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে মানেন। উভয় মাজহাবই পরকালের প্রতি তথা পুনরুত্থান ও বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ও নারীদের পর্দা করা ফরজ হওয়ার বিষয়সহ আরো অনেক বিষয়েই একমত। এইসব বিষয়ের খুঁটিনাটি দিকে কিছু মতভেদ রয়েছে যা সুন্নি ভাইদের চার মাজহাবের মধ্যেও রয়েছে ।
তবে শিয়া ও সুন্নি মাজহাবের মধ্যে মতবিরোধের একটা দিক হলো- বিশ্বনবী (সা.)’র পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত তথা খলিফা বা প্রতিনিধি নিয়োগ নিয়ে। সুন্নি ভাইয়েরা মনে করেন এ বিষয়টি আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল মুসলমানদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন এবং সাহাবাগণ নির্বাচন পদ্ধতিতে খলিফা নির্বাচন করেছেন। অন্যদিকে শিয়া মুসলমানরা মনে করেন, বিশ্বনবী (সা.)’র স্থলাভিষিক্ত তথা খলিফা বা প্রতিনিধি নিয়োগের বিষয়টি মহান আল্লাহই নির্ধারণ করেন ও তা রাসূল (সা.)-কে জানিয়ে দেন। আর এরই ভিত্তিতে হযরত আলী (আ.) এবং এরপর তাঁর বংশধরগণ ছিলেন মুসলমানদের প্রকৃত খলিফা। তবে শিয়াদের সম্পর্কে একটি মিথ্যা অভিযোগ তথা অপবাদ হলো তারা বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে  নবী বা শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করেন না। বরং শিয়া মুসলমানরাও সুন্নি ভাইদের মতই মনে করেন যে, বিশ্বনবী (সা.)’র পর আর কোনো নবী আসবেন না এবং যারাই এ বিশ্বাস পোষণ করবে না তারা মুসলমান হিসেবে স্বীকৃত হবে না।
আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)’র ভাষণ ও বক্তৃতামালার সংস্করণ ‘নাহজুল বালাগ্বা’ শিয়াদের জন্য শীর্ষস্থানীয় প্রামাণ্য বই। আল্লাহ ও বিশ্বনবী (সা.)’র বাণীর পরই এ বইকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তারা। আবার সুন্নি মুসলমানের কাছেও এটি একটি নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য বই। এ বইয়ে স্বয়ং আলী (আ.) থেকে বার বার বলা হয়েছে যে রাসূল (সা.) ছিলেন সর্বশেষ নবী। দৃষ্টান্ত হিসেবে এ বইয়ে উল্লেখিত আলী (আ.)’র ৭১ ও ২৩৩ নম্বর খোতবা দেখুন। তাই শিয়ারা রাসূল (সা.)-কে নবী ও রাসূল বলে মানেন না- এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে প্রচারিত একটি অপবাদ। শিয়া মুসলমানরা যে কোনো সমাবেশে কিংবা একা থাকলেও বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে দরুদ পাঠ করে সম্মান প্রদর্শন করেন তাঁকে ও এমনকি তাঁর আহলে বাইতকেও। এছাড়াও শিয়া মুসলমানরা বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওত প্রাপ্তির দিবসকে উৎসব হিসেবে পালন করে থাকেন।
শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে কোনো কোনো বিষয়ে মতভেদ থাকলেও তারা যুগ যুগ ধরে পরস্পরের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করে এসেছে। তাদের মধ্যে বড়জোর জ্ঞানগত তর্ক-বিতর্ক বা যুক্তি বিনিময় হতো। আসলে ইসলামের শত্রুরাই মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির জন্য শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সহিংস দাঙ্গা বাধানোর জন্য সুন্নি নামধারী একদল ওয়াহাবিকে উস্কে দিয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এই ওয়াহাবিদের দৃষ্টিতে সুন্নিদের চার মাজহাবের তিন মাজহাবের ইমামগণ এবং তাদের অনুসারীরাও কাফির ও হত্যার যোগ্য! আপনারা হয়তো জানেন যে ভারত বর্ষে মোঘল শাসকদের অনেকেই ছিলেন শিয়া মুসলমান। নবাব সিরাজউদদৌলাও ছিলেন শিয়া মুসলমান। দানবীর ও ভারত বর্ষে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্পদ ওয়াকফকারী মহান ব্যক্তিত্ব হাজি মুহাম্মাদ মুহসিন ছিলেন একজন শিয়া মুসলমান। ভারতবর্ষ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনসহ উপনিবেশবাদী কাফির শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
বর্তমান যুগে ইহুদিবাদী ইসরাইলের অপরাধযজ্ঞ থেকে মুসলমানদের দৃষ্টি আড়াল করতে এবং মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ উস্কে দিয়ে তাদেরকে সহজেই শোষণ করার জন্য দেশে দেশে শিয়া-সুন্নি বিভেদ উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে সাম্রাজ্যবাদীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক ও সিরিয়ায় এ ধরনের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে আলকায়দা বা আইএসআইএল-এর ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে। কিন্তু এই দুই দেশের শিয়া ও সুন্নি আলেমগণ ঐক্যবদ্ধভাবে ওয়াহাবি ও বিজাতীয় শক্তিকে মোকাবেলার আহ্বান জানানোর পর সন্ত্রাসীরা শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের সম্মিলিত শক্তির কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার ইমাম খোমেনী (র.)ও বলেছেন, যারা মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নির নামে অনৈক্য সৃষ্টি করে তারা শিয়াও নয়, সুন্নিও নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল।

Wednesday, November 11, 2015

স্বপ্ন কি ?


মানুষ জীবনের ৩৩% সময় ঘুমিয়ে কাটায়। স্বপ্ন মানুষের ঘুমন্ত জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। নিদ্রিত অবস্থায় ইন্দ্রিয়গণ স্তিমিত হয় কিন্তু সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয় না। তাই নিদ্রাকালে নানারূপ কল্পনাশ্রয়ী চিন্তা ও দৃশ্য উদিত হয়। এই সব দৃশ্য দেখাকে একরকমের “স্বপ্ন দেখা বলা হয়। নিদ্রিত অবস্থায় জাগ্রত অবস্থার ধারাবাহিকতাকেও স্বপ্ন বলা যেতে পারে। স্বপ্নে নিজের কাছে নিজের নানারকম আবেগ, তথ্য ও তত্ত্বের প্রকাশ ঘটে। স্বপ্নে দেখা দৃশ্য জাগ্রত প্রতক্ষ্যের মতোই স্পষ্ট। আমরা স্বপ্ন দেখি অর্থাৎ স্বপ্ন মূলত দর্শন-ইন্দ্রিয়ের কাজ। স্বপ্ন দেখা অনেকটা সিনেমা দেখার মতো। তবে স্বপ্নে অন্যান্য ইন্দ্রিয়েরও গৌণ ভূমিকা থাকে। জাগ্রত অবস্থায় প্রতক্ষ্যের মাধ্যমে যেমন শরীরে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তেমনি স্বপ্ন দেখাতেও কিছু না কিছু শারিরীক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

মানুষ স্বপ্ন দেখে কেন ?
ঘুমের মধ্যেও ইন্দ্রিয়গণ বাইরের জগত থেকে সংবেদন গ্রহণ করতে পারে। এ সব সংবেদন ইচ্ছামতো প্রতিরূপে রূপান্তরিত হয়ে স্বপ্নদৃশ্যের সৃষ্টি করতে পারে। তবে স্বপ্নের মূল উপাদান তৈরি হয় স্বপ্নদ্রষ্টার দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও কর্ম থেকে। এবং স্মৃতি থেকে।
মানুষ কতটা স্বপ্ন দেখে ?
জন্মমুহূর্ত থেকেই শিশু দর্শন প্রতিরূপ ব্যতিত অন্যান্য প্রতিরূপের সাহায্যে স্বপ্ন দেখে। জন্মের তিন চার মাস পর থেকেই শিশুরা স্বপ্ন “দেখা” শুরু করে। দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা ঘুম সময়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং কৈশোরে ঘুম সময়ের ২০ থেকে ২২ শতাংশ স্বপ্ন দেখে। চল্লিশের পর থেকে ঘুম সময়ের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ স্বপ্ন দেখা হয়। মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে স্বপ্ন দেখা তত কমতে থাকে। সুতরাং, প্রাকৃতিক প্রবণতা হচ্ছে মানুষ সর্বস্বপ্নহীন ভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।

মানুষ কখন স্বপ্ন দেখে ?
ক্লান্ত মানুষ প্রথম দুই ঘন্টা ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখে না। তখন শরীর পূর্ণ বিশ্রাম নেয়। স্বপ্ন দর্শন কালকে rapid eye movement period বলা হয়। নিদ্রাকালে যে সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে না সে সময়টাকে  non rapid eye movement period বলা হয়। ঘুমের মধ্যে প্রায় প্রত্যেক ৯০ মিনিটে,  প্রায় ১০ মিনিট সময় ধরে REM  নিদ্রা দেখা যায়। ঘুমের মধ্যে ৪/৫ বার REM নিদ্রা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন মানুষ অন্তত ৪/৫ টি স্বপ্ন দেখে।

স্বপ্নের প্রকারভেদঃ
চরক-সংহিতা সাত প্রকার স্বপ্নের কথা বলেছে। বৌদ্ধ দর্শনে বর্ণিত হয়েছে ছয় প্রকারের স্বপ্ন।
জীবন চলার পথে মানুষ ভয়,
দুঃস্বপ্ন,
অতীত স্মৃতি,
ইচ্ছাপূরণ,
ভবিষ্যতের বার্তা,
আধ্যাত্মিক নির্দেশনা,
মুর্শিদের উপদেশ,
জ্ঞান লাভ ইত্যাদি নানারকম স্বপ্ন দেখে।
আধ্যাত্মিক স্বপ্নঃ
স্বপ্নের সাথে আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক নিবিড়। স্বপ্ন হচ্ছে মুর্শিদের কাছে পৌঁছবার, মুর্শিদ থেকে নির্দেশনা লাভের মহাসড়ক। স্বপ্নে মুর্শিদের সাথে সংযোগ বহুজনের একটা পরীক্ষিত পদ্ধতি। মুর্শিদের সাথে প্রেম থাকলে শিষ্য তাকে স্বপ্নে দেখবে এবং তার কাছ থেকে প্রতিটা বিষয়ে নির্দেশনা প্রাপ্ত হবে,  এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। স্বপ্নে যে শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রাপ্তি ঘটে তা নয়, স্বপ্ন সমীক্ষণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রাপ্তি ঘটে তা নয়, স্বপ্ন সমীক্ষণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক তত্ত্বও বিকশিত হয়।

স্বপ্নে ভবিষ্যতের বার্তাঃ
স্বপ্ন ভবিষ্যতের বার্তা বহন করতে পারে। পতঙ্গের গুরুমস্তিষ্ক থাকে না কিন্তু পতঙ্গেরা নার্ভক্রিয়ার সাহায্যে ভূমিকম্প, সূর্যগ্রহণ, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুযোর্গের পূর্বাভাস পেয়ে থাকে। যন্ত্রের যন্ত্রনায় মানুষের মধ্যে ভবিষ্যতের পূর্বভাস পাবার শক্তিগুলো নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। ঘুমের সময় গুরু মস্তিষ্কের কর্মকান্ড স্তিমিত হয়ে গেলে স্বতন্ত্র নার্ভক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ভবিষ্যৎ বাণী পাঠায়। “বিভূতিযোগ” চর্চা করে যোগীরা স্বতন্ত্র নার্ভক্রিয়াকে সক্রিয় করতে পারেন।
স্বপ্নে ইচ্ছাপূরণঃ
স্বপ্নের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য – ইচ্ছাপূরণ । মানুষ অনেক কিছুই চায় কিন্তু পায় না। এমনও হয়, মানুষ আসলে কি চায় তাই সে জানে না। স্বপ্নে একদিকে চেয়ে না পাওয়া বস্তুগুলো পেয়ে তার ইচ্ছাপূরণ হয় অন্যদিকে স্বপ্ন দ্রষ্টা জানতে পারে আসলে সে কি চায়।
স্বপ্ন দেখার প্রয়োজনীয়তাঃ
স্বপ্ন দেখার জন্যই মানুষকে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হয়। তা না হলে মানুষের শারিরীক বিশ্রামের জন্য ২/৩ ঘন্টা ঘুমই যথেষ্ট। সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্ন দেখা ঘুমের মতোই প্রয়োজন। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনার একটা স্তরে উপনীত হলে স্বপ্ন দেখার কোন প্রয়োজন থাকে না বলে কোন কোন সাধক মন্তব্য করেছেন।
ঘটনা এবং স্বপ্ন একই সময়ে সংগঠিত হওয়াঃ
অনেক সময় এমন স্বপ্নও মানুষ দেখে থাকে যখন স্বপ্ন দেখার সময়ই ঘটনাটা ঘটছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে – ছেলে বিদেশে থাকে, যে সময়ে সে স্বপ্নে তার বাবার মৃত্যু দেখেছে ঠিক সে সময়েই বাস্তবে তার বাবা ইন্তেকাল করেছেন। টেলিপ্যাথি ছাড়া অন্য কোনভাবে এমন ঘটনার ব্যাখ্যা করা যায় না।
স্বপ্ন স্মরণঃ
ঘুম থেকে জেগে উঠার পর অধিকাংশ স্বপ্নই ঠিকঠাক মনে থাকে না। অনেক সময় ঘুম ভাঙ্গার পর পর স্বপ্ন মনে থাকে কিন্তু যতই সময় যেতে থাকে স্বপ্ন ততই বিষ্মৃতিতে চলে যায়। কিন্তু কিছু স্বপ্ন আছে যা বাস্তব ঘটনার চেয়েও বেশি স্পষ্ট এবং উজ্জ্বল। এসব স্বপ্ন জীবনে কখনোই ভুলা যায় না।
স্বপ্ন বর্ণনায় মিথ্যাচারঃ
ঘুম ভাঙ্গার পর দেখা স্বপ্ন মানুষ যখন অন্যের কাছে বর্ণনা করে তখন সাধারণত মানুষ মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়। কারণ, স্বপ্ন বর্ণনার সময় জাগ্রত অবস্থার মনোভাব দেখা স্বপ্নের উপর প্রভাব ফেলে।  স্বপ্ন এতটা সাজানো গোছানো থাকে না যতটা সাজিয়ে গোছিয়ে মানুষ তা বর্ণনা করে।
স্বপ্নব্যাখ্যাঃ
আদিকাল থেকেই স্বপ্নব্যাখ্যার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। আরটেমিডোরাস তার বিখ্যাত অনিরো ক্রিটিকন বইয়ে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে প্রথম স্বপ্ন ব্যাখ্যার রীতি লিপিবদ্ধ করেন। স্বপ্নের উৎস, প্রক্রিয়া, তাৎপর্য ও ব্যাখ্যার পদ্ধতি সম্বন্ধে ফ্রয়েডের আবিষ্কার মনঃসমীক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও খাবনামা জাতীয় বইয়ের কাটতি কম নয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যা কোন বইয়ে থাকতে পারে না। স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা কেবল জানতে পারে স্বপ্নদ্রষ্টা নিজে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ স্বপ্ন দ্রষ্টা এটাই জানে না যে সে সঠিক ব্যাখ্যাটা জানে। নিজেদের স্বপ্নকে নিজেরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে অনেক তথ্য ও তত্ত্ব আবিষকৃত হয়। কিন্তু এজন্য প্রথমে স্বপ্ন স্মরণ রাখার অনুশীলন করতে হয়।
স্বপ্ন স্মরণ রাখার অনুশীলনঃ
রাতে ঘুমাবার আগে ২১ বার বলতে হবে  – আজ রাতে আমি যে সব স্বপ্ন দেখবো তার প্রত্যেকটি স্বপ্ন মনে রাখবো এবং ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে তা লিখে রাখবো। এভাবে ২১ দিন চেষ্টা করলে সব স্বপ্ন মনে রাখা যায়। নিজেকে জানার জন্য স্বপ্নকে স্মরণ রাখার এবং স্বপ্ন বিশ্লেষণের গুরুত্ব অপরিসীম। যে জ্ঞান স্বপ্নদ্রষ্টার আছে কিন্তু যার অস্তিত্ব সম্পর্কে স্বপ্নদ্রষ্টা সচেতন নয় স্বপ্নে সেসব জ্ঞান প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বপ্নদ্রষ্টার সচেতন প্রচেষ্টা ব্যতিত তা সম্ভব নয়।
ইচ্ছা স্বপ্ন দেখাঃ
মানুষ ইচ্ছা স্বপ্নের সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে যাকে বা যে বিষয়ে স্বপ্ন দেখতে চায় সে বিষয়ে মনোনিবেশ করলে ইচ্ছা স্বপ্ন দেখা যায়।
স্বপ্নের তাৎপর্যঃ
যে যেমন মানুষ সে তেমন স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের তাৎপর্য নির্ভর করে স্বপ্নদ্রষ্টার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর। যে সব মানুষের জাগ্রত অবস্থায়ই কর্মকান্ডের কোন তাৎপর্য নেই তার স্বপ্নেরও কোন তাৎপর্য নেই। স্বপ্ন তাৎপর্যপূর্ণ হয় যখন জাগ্রত অবস্থায় মানুষ তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর রাজষির্ নাটকের কাহিনী স্বপ্নে পেয়েছেন, ইংরেজ কবি কোলরিজ তাঁর বিখ্যাত কোবলা খান কবিতাটি স্বপ্ন দেখে লিখেছেন, বিজ্ঞানী নিলস বোর পরমাণুর গঠন স্বপ্নে দেখেছেন, বিজ্ঞানী কেকুলে বেনজিনের গঠন-তত্ত্বটি স্বপ্নে দেখেন অর্থাৎ এক চিন্তা তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন সৃষ্টি করে।
স্বপ্ন প্রতীকঃ

আদি কাল থেকেই মানুষ স্বপ্ন প্রতীকের কথা ভেবে আসছে। লাঠি, সাপ, পিস্তল, গর্ত, ঘর, কাগজ, গহনা, ঘোড়ায় চড়া, চাবি, নদী, সমূদ্র ইত্যাদি নানা রকমের স্বপ্ন প্রতীকের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ওড়ার স্বপ্ন, পড়ে যাবার স্বপ্ন, নিজেকে উলঙ্গ দেখার স্বপ্ন, পরীক্ষার স্বপ্ন, চোর ডাকাতের স্বপ্ন, পানিতে পড়ে যাবার স্বপ্ন, প্রিয়জনের মৃত্যুর স্বপ্ন ইত্যাদি স্বপ্নও প্রতিকী। স্বপ্ন প্রতীকের অভিধান আছে। প্রথম অভিধানটি প্রকাশিত হয় মিশরে। মুসলিম রাজাদের দরবারে স্বপ্নব্যাখ্যাদাতাগণ একসময় খুব সমাদৃত ছিলেন। বাইবেলের সুবিখ্যাত স্বপ্নগুলোর ব্যাখ্যাদাতা জোসেফের কথা আমাদের সবারই জানা। বাইবেলে অধিকাংশ শব্দই কুমন্ত্রণাদাতার সৃষ্টি এ রকম একটা আয়াত আছে।
স্বপ্ন ও লক্ষ্যঃ
স্বপ্ন ও লক্ষ্য এক নয়।  লক্ষ্য, স্বপ্নের মতো কল্পনা আশ্রিত নয়। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট। স্বপ্ন স্পষ্ট হতে পারে কিন্তু সুনির্দিষ্ট নয়। লক্ষ্য সংক্ষিপ্ত। স্বপ্ন বিস্তারিত।
চিন্তা ও স্বপ্নঃ
চিন্তা স্বপ্নকে প্রভাবিত করে কিন্তু চিন্তার তুলনায় স্বপ্নের বিচরণ ক্ষেত্র অনেক বেশি প্রশস্ত। স্বপ্ন যুক্তির গন্ডিতে আবদ্ধ থাকে না কিন্তু চিন্তা যুক্তির গন্ডিতে আবদ্ধ থাকে। পরিবেশ, রীতি-নীতি, ভাল-মন্দ, বিবেক ইত্যাদি চিন্তার স্বাধীন গতিকে বাধাগ্রস্থ করে। স্বপ্নের জগতে এসব বাধা নেই। তাই জাগ্রত অবস্থায় কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার চাইতে স্বপ্নে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সিদ্ধান্তটি নির্ভুল হবে।
দিবাস্বপ্নঃ

ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের কল্পনা ও আকাঙ্খাকে দিবাস্বপ্ন বলা হয়। দিবাস্বপ্ন বস্তুগত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। বস্তুজীবনে সঠিক ব্যবহারে দিবাস্বপ্ন অতীতের পরিসমাপ্তি ঘটায়, বর্তমানকে সুগঠিত করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নতুন পথের সন্ধান দেয়। দিবাস্বপ্ন ভবিষ্যতের ছবি দেখিয়ে ব্যক্তিকে শক্তি ও সাহস যোগাতে পারে। সঠিক ব্যবহার জানলে দিবাস্বপ্ন শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নব নব আবিষ্কারের দ্বার উন্মোচন করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই দিবাস্বপ্নকে সৃষ্টিশীলতায় ব্যবহার করে না অথচ প্রায় সারাক্ষণই তাৎপর্যহীন দিবাস্বপ্ন দেখে। দিবাস্বপ্নকে দিবাস্বপ্ন বলা হয় কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে দিবাস্বপ্নের বিষয়বস্তুও বাস্তবের মতো বাস্তব নয়। আধ্যাত্মিক সাধনায় দিবাস্বপ্ন সহায়ক। মুর্শিদ স্মরণ, নিজেকে জানা এবং আমি’র মধ্যে থাকতে দিবাস্বপ্ন বাধা দেয় না। দিবাস্বপ্ন সাধারণ মানুষকে বর্তমানে থাকতে দেয় না। এজন্যই সাধকেরা সিদ্ধি লাভকে জীবনের স্বপ্ন থেকে জাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মানুষ সজাগ থাকলে স্বপ্ন দেখে না। একজন সিদ্ধ পুঁরুষ ঘুমন্ত অবস্থায়ও সজাগ থাকেন অথবা যিনি সব সময় সজাগ থাকেন তাঁকেই সিদ্ধ পুঁরুষ বলা হয়। তাই সিদ্ধ পুঁরুষদের স্বপ্ন দেখার কথা নয়।
ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যাঃ
সত্য স্বপ্ন নবুয়্যতের অংশ। রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেনঃ “সত্য স্বপ্ন নবুয়্যতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ।” (আল-বুখারীঃ ৬৪৭২; মুসলিম ৪২০১)
ওহী নাযিলের পূর্বে রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) স্বপ্ন দেখতেন যা দিবালোকের মত স্পষ্ট ছিল। (আল-বুখারী, ৩; মুসলিম, ২৩১)
স্বপ্ন দর্শনকারীর সততা ও আন্তরিকতার সাথে স্বপ্নের সত্যাসত্য সম্পর্কিত। যারা বেশী সত্যবাদী তাদের স্বপ্নও বেশী সত্য হয়। (মুসলিম, ৪২০০)
কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে খুব কম স্বপ্নই অসত্য হবে। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “এটা এজন্যই হবে যে সে সময়টা নবুয়্যতের সময় ও প্রভাব থেকে অনেক দূরবর্তী হবে। ফলে বিশ্বাসীদেরকে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে কিছুটা পুষিয়ে দেয়া হবে, যা তাদের কাছে সুসংবাদ বয়ে আনবে অথবা তাদেরকে তাদের ঈমানের ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে ও দৃঢ় থাকতে সাহায্য করবে।” (আল-বুখারী, ৬৪৯৯; মুসলিম ৪২০০)
একই কথা বলা যেতে পারে সে সমস্ত অলৌকিক ঘটনাবলী সম্পর্কে যা সাহাবীদের সময়ের পরে ঘটেছিল। এগুলো তাদের সময়ে সংঘটিত হয়নি কারন তাদের দৃঢ় ঈমানের কারনে তা তাদের প্রয়োজন ছিলনা। কিন্তু তাদের পরে আসা লোকদের সে অলৌকিক ঘটনাবলীর দরকার ছিল তাদের দূর্বল ঈমানের কারনে।
স্বপ্ন তিন প্রকারেরঃ রহমানী (যেগুলো আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে হয়), নফসানী (মনস্তাত্বিক, এগুলো ব্যক্তির নিজের পক্ষ থেকে হয়) এবং শয়তানী (যেগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে হয়)। রসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “স্বপ্ন তিন প্রকারেরঃ এক প্রকারের হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে, আরেক প্রকার যা মানুষকে ভারাক্রান্ত করে, আর তা হয় শয়তানের পক্ষ থেকে, আরেক প্রকারের স্বপ্ন সংঘটিত সে সমস্ত ব্যাপার থেকে যা ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থায় চিন্তা করেছে যা ঘুমের ঘোরে সে দেখতে পায়।” (আল-বুখারী, ৬৪৯৯; মুসলিম, ৪২০০)
নবীদের স্বপ্ন হল ওয়াহী কারন কারন তাঁরা শয়তান থেকে সুরক্ষিত। এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। এজন্যই ইব্রাহীম (আঃ) স্বপ্নে দেখেই তাঁর পুত্র ইসমাইলকে (আঃ) কুরবানী করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
নবীদের ছাড়া অন্য লোকদের স্বপ্নকে সুস্পষ্ট ওয়াহীর (কুর’আন ও সুন্নাহ্‌) আলোকে যাচাই করে দেখতে হবে। যদি সেগুলো কুর’আন ও সুন্নাহ্‌ সমর্থিত হয় তাহলেতো ভাল; নাহলে সে স্বপ্নের ভিত্তিতে কোন কাজ করা যাবেনা। এটা একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, কারন অনেক বিদ’আতপন্থী ও সূফীরা তাদের স্বপ্নের উপর নির্ভ্র করেই গোমরাহ হয়ে গিয়েছে।
কেউ যদি সত্য স্বপ্ন দেখার আশা করে তবে তার উচিৎ সত্য কথা বলার জন্য সদা সচেষ্ট থাকা, হালাল খাওয়া, শরীয়তের হুকুম আহকামগুলো মেনে চলা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা, সম্পূর্ণ পবিত্র অবস্থায় কিবলা মূখী হয়ে শয়ন করা এবং চক্ষু বুজে আসা পর্যন্ত আল্লাহর জিকরে লিপ্ত থাকা। যদি কেউ এমন করে তাহলে কদাচ তার স্বপ্ন অসত্য হতে পারে।

সবচেয়ে সত্য স্বপ্ন হচ্ছে যা সেহরীর সময়ে দেখা যায়, কারন এ সময়ে আল্লাহ্‌ তা‘আলা নেমে আসেন এবং তাঁর রহমত ও ক্ষমা আমাদের নিকটবর্তী থাকে। আরো ব্যাপার হচ্ছে এ সময়ে শয়তানরাও চুপ থাকে; অন্যদিকে সূর্যাস্তের পরে অন্ধকার নেমে আসলে শয়তানরা ও শয়তানী লোকেরা চারিদিকে ছড়িয়ে পরে।
[দ্রষ্টব্যঃ  ইবন আল-কায়্যিম, “মাদারিজ আস-সালিকীন” ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০-৫২]
ইমাম ইবন হাজার আল-আসক্বালানী বলেছেনঃ স্বপ্ন সাধারণত দু’ধরণের হয়ে থাকে।
প্রথম প্রকার হচ্ছে সত্য স্বপ্ন। এগুলো হচ্ছে নবীদের ও তাঁদের অনুসারী নেককার লোকদের স্বপ্ন। অন্যলোকদের ক্ষেত্রেও এগুলো ঘটতে পারে, তবে এটা বিরল, যেমন মিশরের কাফির বাদশার স্বপ্ন যা তার জন্য ইঊসুফ (আঃ) ব্যাখ্যা করেছিলেন। সত্য স্বপ্নগুলো বাস্তব জীবনেও সত্য হয়ে দেখা দেয় যেমন স্বপ্নে দেখা হয়েছে।
দ্বীতিয় প্রকার হল মিশ্র ধরণের মিথ্যা স্বপ্ন, যা কোন ব্যাপারে সতর্ক করে। এ গুলো আবার দু’ধরণের।
এক প্রকার হচ্ছে শয়তানের খেলা যা দিয়ে সে ব্যক্তিকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। যেমন সে দেখল যে তার মাথা কেটে ফেলা হয়েছে এবং সে সেই কাটা মাথার অনুসরণ করছে; অথবা সে এমন কোন সঙ্কটে পড়েছে যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কোন সাহায্যকারী সে পাচ্ছেনা।
অন্য প্রকার হল যখন সে দেখে যে ফেরেশতারা তাকে কোন হারাম কাজ করতে বলছে; অথবা এমন সব বিষয় যা সাধারণত অর্থহীন।
যখন কেউ দেখে এমন কিছু যা বাস্তব জীবনে ঘটছে, অথবা তা ঘটার আশা করে এবং সে তা বাস্তবতার মতই স্বপ্নে দেখে। এমনও হয় যে সে দেখে যা সাধারণত তার জীবনে ঘটে অথবা যা তার চিন্তায় থাকে। এ স্বপ্নগুলো সাধারণত বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা বলে, কদাচ অতীত সম্পর্কে।
[ফাতহ আল-বারী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫২-৩৫৪]
আবূসাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) বলেছেনঃ নবী (সঃ) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যদি এমন কোন স্বপ্ন দেখে যা সে পসন্দ করে, তাহলে তা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে। সুতরাং তার উচিৎ আল্লাহ্‌র প্রসংশা আদায় করা ও অন্যদেরকে স্বপ্ন সম্পর্কে বলা। কিন্তু সে যদি এমন স্বপ্ন দেখে যা সে অপসন্দ করে তাহলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং তার উচিৎ এর ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া এবং কাউকে এ স্বপ্ন সম্পর্কে না বলা। এরূপ করলে তার কোন ক্ষতি হবেনা।” [আল-বুখারী, ৬৫৮৪; মুসলিম ৫৮৬২]
আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন, “ভাল স্বপ্ন হয়ে থাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং খারাপ স্বপ্ন হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। কেউ যদি এমন কিছু দেখে যা সে অপসন্দ করে তাহলে সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। তাহলে এটা তার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। [আল-বুখারী ৬৫৯৪; মুসলিম ৫৮৬২] থুথু ফেলা বলতে এখানে এমন থুতু ফেলা বুঝানো হয়েছে যাতে মুখ থেকে শুষ্ক বাস্পাকারে বের হওয়া থুতু বুঝানো হয়েছে যাতে মুখের লালা মিশ্রিত থাকেনা।
জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) বলেছেন, “কেউ যদি এমন কিছু দেখে যা সে অপসন্দ করে তাহলে সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে তিনবার আশ্রয় চায়; যেন পাশ ফিরে শোয়। [মুসলিম ৫৮৬৪]
ইবন হাজার (রঃ) বলেছেনঃ ভাল স্বপ্ন সম্পর্কে সংক্ষেপে যা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে আমরা তিনটি বিষয় নির্দেশ করতে পারিঃ
1.    ভাল স্বপ্নের জন্য ব্যক্তির আল্লাহর প্রসংশা আদায় করা উচিৎ।
2.    স্বপ্ন দ্রষ্টার এ জন্য খুশী হওয়া উচিৎ।
3.    সে যাদেরকে ভালবাসে তাদের কাছে তার স্বপ্ন বর্ণনা করা উচিৎ; তাদের কাছে নয় যাদেরকে সে অপসন্দ করে।
ইবন হাজার (রঃ) আরো বলেছেনঃ খারাপ স্বপ্ন সম্পর্কে সংক্ষেপে যা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে আমরা চারটি বিষয় নির্দেশ করতে পারিঃ
1.    স্বপ্নদ্রষ্টার উচিৎ এর খারাবী থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া,
2.    শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লার আশ্রয় চাওয়া
3.    ঘুম থেকে জাগরিত হওয়ার পর নিজের বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলা; এবং
4.    কারো কাছেই তার এটা বর্ণনা না করা।

আল-বুখারীর বাব আল-ক্বায়দ ফী আল-মানামে পঞ্চম একটা বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে আবূ হুরায়রা  (রাঃ) থেকে; আর তাহল নামাজ পড়া। বর্ণনাটা নিম্নরূপঃ যদি কেউ কোন অপসন্দনীয় কিছু স্বপনে দেখে সে যেন তা কাউকে না বলে; বরং তার উচিৎ শোয়া থেকে উঠে নামাজ পড়া। ইমাম মুসলিমও তাঁর সহীহ্‌তে এটাকে মাউসূল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মুসলিম ষষ্ঠ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন; তা হল পার্শ্ব পরিবর্তন করে শোয়া।
উপসংহারে বলা যায় স্বপ্ন দেখলে উপরোক্ত ছয়টি বিষয়ে আমল করা উচিৎ।
[দেখুনঃ ফাতহ আল-বারী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭০]
তিরমিজী্তে আবূ রাজ়ীন থেকে বর্ণনা করা এক হাদীস মতে, স্বপ্ন দ্রষ্টার স্বপ্নের কথা কাউকেই বলা উচিত নয় শুধুমাত্র এমন অন্তরঙ্গ বন্ধুকে ছাড়া যে তাকে অত্যন্ত ভালবাসে এবং যে প্রজ্ঞাবানও। অন্য বর্ণনা মতে স্বপ্নের কথা কাউকেই বলা উচিৎ নয় শুধুমাত্র জ্ঞানী ও প্রিয়জন ছাড়া। অন্য আরেকটি বর্ণনা মতে স্বপ্নের কথা শুধু কোন আলেমকে বা এমন ব্যক্তি যে আন্তরিক সদুপদেশ দিতে পারে তাকে ছাড়া আর কাউকে বলা যাবেনা। কাজী আবূ বকর ইবন আল-আরাবী (রঃ) বলেছেনঃ আলেমের ব্যাপারটা হচ্ছে তিনি তাঁর জ্ঞানের আলোকে সাধ্যমত ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন; আর আন্তরিক উপদেশদানকারী হয়তো তাকে এমন কিছু শিখিয়ে দেবেন যা তার জন্য উপকারী প্রমাণিত হবে অথবা কাজটা করতে তাকে সাহায্য করবেন। যিনি প্রজ্ঞাবন তিনি জানবেন কীভাবে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে হয় এবং স্বপ্নদ্রষ্টাকে শুধু তাই বলবেন যা তার জন্য সাহায্যকারী হবে; নতুবা তিনি চুপ থাকবেন। তার প্রিয় ব্যক্তির অবস্থা হচ্ছে তিনি যদি ভাল কিছু জানেন তাহলে বলবেন; আর যদি না জানেন বা সন্দেহে থাকেন তাহলে তিনি চুপ থাকবেন। [দ্রষ্টব্যঃ ফাতহুল বারী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৯]
ইমাম বাগাওয়ী (বাগাভী) তাঁর শারহ্‌ আস—সুন্নাহতে (১২/২২২) উল্লেখ করেছেনঃ জেনে রেখ যে স্বপ্নের তাবীর বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা যায় কুর’আন অথবা সুন্নাহ্‌র আলোকে, অথবা জনগণের মধ্যে প্রচলিত বাগবিধির আলোকে অথবা বিভিন্ন নাম ও রূপকের মাধ্যমে অথবা বিপরীত কোন বিষয়ের আলোকে।
তিনি নিম্নরূপ উদাহরণ দিয়েছেনঃ
কুর’আনের আলোকে ব্যাখ্যাঃ রশিকে কৃত ওয়াদা বা চুক্তি হিসেবে গ্রহন করা যায়, কারণ আল্লাহ্‌ বলেছেন, “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে ধারণ কর।” [আলে ইমরান, ৩/১০৩]
সুন্নাহর আলোকে ব্যাখ্যাঃ দাড় কাক কোন পাপাচারী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করা, কারন রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) তাই বলেছেন।
বাগধারা/বাগবিধির আলোকে ব্যাখ্যাঃ কোন গর্ত খনন করা মানে কোন চক্রান্ত, কারন লোকেরা বলে থাকে, “যে কোন গর্ত খনন করে সে তাতে পতিত হয়।”
নামের আলোকে ব্যাখ্যাঃ কেউ যদি রাশেদ নামে কাউকে দেখে তার মানে হবে বুদ্ধিমত্তা।.
বিপরীত বিষয়ের আলোকে ব্যাখ্যাঃ ভয় দেখা মানে নিরাপত্তা, কারণ আল্লাহ্‌ বলেছেন (তর্জমা), “তিনি নিশ্চয়ই তাদের ভীতির পরে এর পরিবর্তে দান করবেন নিরাপত্তা।” [আন-নূর, ২৪/৫৫]
অন্যদিকে ইবন সীরীন (সঃ) এর স্বপ্নের তাবীর নামে যে বইটি বাজারে প্রচলিত অনেক গবেষকের মতে এটা আসলে এই মহান আলেম লিখেছেন বলে কোনভাবেই প্রমান করা যায় না।

‘নাস্তিকতা’ একটি অন্ধবিশ্বাস


ফিলোসফার অব সায়েন্স কার্ল পপারের সুন্দর একটি কথা আছে-

If a proposal or hypothesis cannot be tested in a way that could potentially falsify the proposal, then the proposer can offer any view without the possibility of its being contradicted. In that case, a proposal can offer any view without being disproved. [১]

এ হিসেবে নাস্তিকদের ‘ডেটারমিনিস্ট ম্যাটেরিয়ালিস্ট’ মতবাদটি একটি ‘বিশ্বাস ব্যবস্থা’ তথা একটি ‘ধর্ম’, নাস্তিকরা এই ডেটারমিনিস্ট ম্যাটেরিয়ালিস্ট ব্যবস্থার উপর ‘বিশ্বাস’ স্থাপন করে আল্লাহকে অস্বীকার করছে। লক্ষ্য করবেন, এদের সঙ্গে কথায় মাঝে মাঝে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠে। যেমন: এদেরকে ফাণ্ডামেন্টাল ফোর্সেস অব ইউনিভার্সের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বলবে তা এমনি এমনি উদ্ভব হয়েছে। তাদের এই উত্তরটি যেমন তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করতে পারবে না, তেমনি তাদের এই উত্তরটিকে ভুল প্রমাণও করা যাবে না। কারণ এটি একটি ‘বিশ্বাস’।

প্রশ্ন হল ‘বিশ্বাস’ হলে অসুবিধে কী? অসুবিধে আছে। মুসলিমরা বিশ্বাস করে এই ফোর্সগুলো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং মুসলিমরা কখনও দাবী করেনি যে এটা পরীক্ষা করে প্রমাণ করা যাবে। বরং মুসলিমরা এটাই বলছে যে ‘এই ফোর্সগুলো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন’ এই কথাটায় ‘বিশ্বাস’ করাটাই ইসলামের দাবী।

“এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ৷ এটি হিদায়াত সেই ‘মুত্তাকী’দের জন্যযারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে,  নামায কায়েম করে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২-৩)

কিন্তু তথাকথিত নাস্তিকরা তাদের ‘বিশ্বাস’কে একটি সায়েন্টিফিক ডিসগাইজ দিতে চাচ্ছে। তারা তাদের ‘বিশ্বাস’কে বৈধতা দিতে বিজ্ঞানকে অপব্যবহার করছে। তারা এমন ভাবে বিজ্ঞানের কথা বলছে যেন তাদের এই ‘বিশ্বাস’ প্রকৃতপক্ষে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাদের এই ‘বিশ্বাস’গুলোও প্রমাণযোগ্য নয়।

ঈশ্বরকে মেনে নেয়ার দাবীটি বিশ্বাসের। সুতরাং যাদের মেনে নেয়া প্রমাণের উপর নির্ভরশীল, যেমন সৈকত চৌধুরী নামক একজন নাস্তিক রাহাত খানকে প্রতিমন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন:

কিন্তু কেউ যদি ঈশ্বরকে এখানে নিয়ে আসেন তবে তিনি তা প্রমাণ করুক…

তাদেরই বরং ‘ঈশ্বর নেই’ এটা প্রমাণ করা জরুরী। কেননা বিজ্ঞানের দাবী তারাই তুলছে।

এই তথাকথিত নাস্তিকরা যে চরম পর্যায়ের অন্ধ বিশ্বাসী তার প্রমাণ বিভিন্ন ভাবে পাবেন। যেমন বিবর্তনের ব্যাপারে বলতে গিয়ে যদি বলেন যে ‘অসংখ্য’ মধ্যবর্তী প্রজাতির ফসিল কোথায়। তারা বলবে প্যালিওন্টোলজী এখনও শুরুর পর্যায়ে, ভবিষ্যতে আবিস্কার হবে। অথচ গত দেড়শ বছরে ১০০ মিলিয়নের উপর ফসিল আবিস্কৃত হয়েছে, যাতে একটিও মধ্যবর্তী প্রজাতি নেই। [২]

সুপরিচিত ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী ও জীবাশ্রমবিজ্ঞানী (প্যালেওন্টোলোজিস্ট) কলিন প্যাটারসন এই বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন-

No one has ever produced a species by mechanisms of natural selection. No one has ever got near it and most of the current argument in neo-Darwinism is about this question.

Natural selection is not a mechanism that produces anything new and thus causes species to change, nor does it work miracles such as causing a reptile to gradually turn into a bird. In the words of the well-known biologist D’Arcy Wentworth Thompson, “… we are entitled … to see in natural selection an inexorable force, whose function is not to create but to destroy—to weed, to prune, to cut down and to cast into the fire.” [৩]

কেন ফসিল রেকর্ডে বিবর্তনের প্রমাণ নেই তা বিখ্যাত নিওডারউইনবাদী প্যালেওন্টোলজিস্ট স্টিভেন জে. গোল্ড এভাবে ব্যাখ্যা করেন-

The history of most fossil species includes two features particularly inconsistent with gradualism: 1. Stasis. Most species exhibit no directional change during their tenure on earth. They appear in the fossil record looking much the same as when they disappear; morphological change is usually limited and directionless. 2. Sudden appearance. In any local area, a species does not arise gradually by the steady transformation of its ancestors; it appears all at once and ‘fully formed. [৪]

অন্যদিকে প্যালিওন্টোলজিস্ট নাইল্স এলড্রেজ জীবাশ্ম রেকর্ড দেখে বিবর্তনবাদীদের হতাশা ব্যক্ত করেন এভাবে:

No wonder paleontologists shied away from evolution for so long. It seems never to happen. Assiduous collecting up cliff faces yields zigzags, minor oscillations, and the very occasional slight accumulation of change over millions of years, at a rate too slow to really account for all the prodigious change that has occurred in evolutionary history. [৫]

সুতরাং তাদের দাবীটির ভিত্তি হল ‘অন্ধবিশ্বাস’।

তারা বলবে মিউটেশনের মধ্য দিয়ে বিবর্তন হচ্ছে। অথচ অসংখ্য পরীক্ষাগারে কোটি কোটি মিউটেশনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে, এখন পর্যন্ত একটি উদাহরণও নেই যে মিউটেশনের মাধ্যমে একটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি আরেকটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। অপেক্ষাকৃত বড় প্রাণীদের ব্যাপারে তারা বলবে যেহেতু বিবর্তন হতে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পার হতে হয়, ফলে আমাদের পক্ষে এই বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। (যে কথাটা লুকিয়ে আছে: ‘বিবর্তন’ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হলে কি হবে? আমরা ‘বিশ্বাস’ করে ধরেই নিয়েছি যে বিবর্তন হয়েছে) কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপারটাতে তাদের গল্পটি কী? ব্যাকটেরিয়ার ‘জেনারেশন টাইম’ তো খুব দ্রুত। (ব্যাকটেরিয়ার একটি নির্দিষ্ট কলোনী যে সময়ে সংখ্যায় ঠিক দ্বিগুন হয়ে যায় তাকে বলে জেনারেশন টাইম) পরীক্ষাগারে বিজ্ঞান জগতে খুব পরিচিত ব্যাকটেরিয়া E. coli এর জেনারেশন টাইম মাত্র বিশ মিনিট। অর্থাৎ যদি E. coli এর একটি ১০০ ব্যাকটেরিয়ার কলোনী নেয়া হয় তবে বিশ মিনিটের মধ্যে সেটি ২০০ ব্যাকটেরিয়ার কলোনীতে পরিণত হবে। [৬]

এখন পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া নিয়ে ডারউইনবাদী বিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি করেছেন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী রিচার্ড লেনস্কি। সেই ১৯৮৮ সাল থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে, এখনও চলছে। ২০১২ সাল নাগাদ E. coli-র ৫০০০০ জেনারেশন পার হয়েছে। এগুলো নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, প্রতি ৫০০ জেনারেশন পর E. coli-র স্ট্রেইনগুলো নিয়ে সেগুলোর জেনেটিক স্টাডি করা হয়েছে। অথচ, এখনও পর্যন্ত E. coli, E. coli-ই রয়ে গেছে! [৭]

তারপরও এই পরীক্ষা অব্যাহত রাখা হয়েছে, এই ‘বিশ্বাস’-এ যে ডারউইনবাদ প্রমাণিত হবেই। অথচ মিউটেশনের মধ্য দিয়ে আদৌ কি কোন ডারউইনবাদী বিবর্তন সম্ভব? বিজ্ঞানীরা খুব ভালমতই জানেন যে প্রাণীকোষে কোন ‘জেনেটিক ইরর’ হয়ে গেলে সেটা সংশোধনের জন্য প্রাণীকোষেই অত্যন্ত পরিকল্পিত সিস্টেম তৈরী করা আছে। ফলে কোন মিউটেশন হয়ে তা পরবর্তী জেনারেশনে সঞ্চালিত হওয়ার সম্ভবনা নগন্য। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ জ্বিনের মিউটেশনের হার হল প্রতি ১,০০,০০০-এ একটা এবং যে মিউটেশনগুলো হয় তার অধিকাংশই ক্ষতিকারক। [৮]

এরপরও যদি ধরে নেয়া হয় যে মিউটেশন উপকারী হতে পারে, তারপরও মিউটেশনের মাধ্যমে জ্বিন পরিবর্তন হয়ে একটি নতুন বৈশিষ্ট্য অভিযোজন হতে যে পরিমাণ সময় দরকার তা বিবর্তনবাদীদের কল্পনার জন্যও বেশী। অন্তত এম.আই.টি-র প্রফেসর মুরে এডেন এবং বিবর্তনবাদী জর্জ গেইলর্ড সিম্পসনের হিসেব থেকে সেটাই বোঝা যায়:

In a paper titled “The Inadequacy of Neo-Darwinian Evolution As a Scientific Theory,” Professor Murray Eden from the MIT (Massachusetts Institute of Technology) Faculty of Electrical Engineering showed that if it required a mere six mutations to bring about an adaptive change, this would occur by chance only once in a billion years – while, if two dozen genes were involved, it would require 10,000,000,000 years, which is much longer than the age of the Earth. [৯]

The evolutionist George G. Simpson has performed a calculation regarding the mutation claim in question. He admitted that in a community of 100 million individuals, which could hypothetically produce a new generation every day, a positive outcome from mutations would only take place once every 274 billion years. That number is many times greater than the age of the Earth, estimated to be at 4.5 billion years old. These, of course, are all calculations assuming that mutations have a positive effect on the generations which gave rise to them, and on subsequent generations; but no such assumption applies in the real world. [১০]

তথাপি নাস্তিকরা কেন মিউটশনকে বিবর্তন সংঘটনের ‘প্রভু’ মনে করে? উত্তর ‘অন্ধবিশ্বাস’; এছাড়া, বিলিয়ন বছরের ব্যবধানে কোন জীব মিউটেশনের মধ্য দিয়ে অন্য একটি জীবে পরিবর্তিত হয়নি তার প্রমাণ হল ৩.৫ বিলিয়ন বছর পুরোনো আর্কিয়া (বা আর্কিব্যাকটেরিয়া); বিলিয়ন বছর আগেও যেমন তাদের উত্তপ্ত ঝরণায় পাওয়া যেত, আজও তাদের গ্র্যাণ্ড প্রিজমেটিক লেকের মত উত্তপ্ত জলাশয়ে পাওয়া যায়। [১১]

বিবর্তনবাদীদের তথাকথিত প্রথম কোষটি কিভাবে উদ্ভব হল সে বিষয়ে তো এখনও প্রশ্ন করাই হয়নি। ‘কোষ’ বললে বিষয়টি অনেক জটিল হয়ে যায়, ১৫০ অ্যামাইনো এসিড সম্বলিত একটি মাঝারি আকৃতির প্রোটিন কিভাবে দৈবাৎ দূর্ঘটনার মধ্য দিয়ে এলো সেটাই না হয় ব্যাখ্যা করুক। অথচ,

ডগলাস এক্স যে বিষয়গুলো সম্ভাব্যতা কমাতে পারে সেগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে (অর্থাৎ বাদ দিয়ে) ১৫০টি অ্যামাইনো এসিডের একটি প্রোটিন তৈরী দূর্ঘটনাক্রমে হওয়ার সম্ভাব্যতা হিসেব করেছেন ১০ এর পরে ১৬৪টি শূন্য বসালে যে সংখ্যাটি হয় (তথা ১০১৬৪) এর মধ্যে ১ বার। বিল ডেম্ব্সকি হিসেব করে দেখিয়েছেন আমাদের দর্শনযোগ্য মহাবিশ্বে ১০৮০টি এলিমেন্টারি পার্টিকল আছে, বিগব্যাং থেকে এখন পর্যন্ত ১০১৬ সেকেণ্ড পার হয়েছে এবং দুটো বস্তুর মধ্যে যে কোন বিক্রিয়া প্ল্যাঙ্কটাইম ১০-৪৩ সেকেণ্ড এর চেয়ে কম সময়ে হতে পারে না। এ সবগুলো সংখ্যাকে একত্রিত করলে দাড়ায় ১০১৩৯; অর্থাৎ মহাবিশ্বের বয়স, মহাবিশ্বের গাঠনিক এলিমেন্টারি পার্টিকেলের সংখ্যা এবং পার্টিকেলের মধ্যে বিক্রিয়া হতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময়কে একত্রে বিবেচনার পরও উপর্যুক্ত প্রোটিনটি তৈরী হওয়ার সম্ভাব্যতা ট্রিলিয়ন ভাগ পিছিয়ে পড়ে। সহজ কথায় উক্ত প্রোটিনটি তৈরী হতে এখন বিলিয়ন ট্রিলিয়ন সেকেণ্ড (১০২৫বা ১০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ বা দশ লক্ষ কোটি কোটি সেকেণ্ড বা একত্রিশ কোটি বিলিয়ন বছর) অতিবাহিত হতে হবে। [১২, ১৩]

কিন্তু নাস্তিকরা বলে উঠবে ‘সম্ভাব্যতার বিষয়টা আপনি বুঝেননি’; কারণ, নাস্তিকদের অন্ধবিশ্বাস অনুযায়ী যে কোন অসম্ভব ঘটনা যা ঘটানোর জন্য সুপরিকল্পিত কাঠামো, ডিজাইন এবং জ্ঞান দরকার তা দূর্ঘটনাক্রমে (by chance) সম্ভব হয় (!)

রেজওয়ান আহমেদের সাথে ফেসবুকে আমার একটি তর্ক হয়েছিল বিবর্তনবাদ নিয়ে, শেষ পর্যায়ে এসে তার মন্তব্যটি এরকম:

Abdullah Saeed Khan: আপনি যতগুলো প্রানির নাম নিলেন, তাদের টিকে থাকার ইতিহাস খুজতে গেলে তো খবর আছে। আপনিয়েই বরং নিয়েন, তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে “survival the fittest” নিয়ামকটাই হয়ত এদের টিকে থাকার কারণ। আর আমি যা দেখছি আপনি বিবর্তনের সমালোচনা করতেছেন কিন্তু refuse করতেছেন না। বিজ্ঞানের মুল মজা তো যোগ্য সমালচনায়। যাই হোক আজকে আলোচনা করে ভাল লাগল। ভাল থাকিয়েন। [১৪]

সুতরাং কাদের বিশ্বাসটি যে ‘অন্ধবিশ্বাস’ সেটি স্পষ্ট বুঝা যায়। পরিশেষে নাস্তিকতা নামক অন্ধ বিশ্বাসের আরেকটি উদাহরণ দিয়ে পোস্টটি শেষ করছি:

In this philosophy (Determinist Materialist), observable matter is the only reality and everything, including thought, will, and feeling, can be explained only in terms of matter and the natural laws that govern matter. The eminent scientist Francis Crick (codiscoverer of the genetic molecular code) states this view elegantly (Crick and Koch, 1998): “You, your joys and your sorrows, your memories and your ambitions, your sense of personal identity and free will, are in fact no more than the behavior of a vast assembly of nerve cells and their associated molecules. As Lewis Carroll’s Alice might have phrased it: ‘You’re nothing but a pack of neurons (nerve cells).’” According to this determinist view, your awareness of yourself and the world around you is simply the by-product or epiphenomenon of neuronal activities, with no independent ability to affect or control neuronal activities.

Is this position a “proven” scientific theory? I shall state, straight out, that this determinist materialist view is a “belief system”; it is not a scientific theory that has been verified by direct tests. It is true that scientific discoveries have increasingly produced powerful evidence for the ways in which mental abilities, and even the nature of one’s personality, are dependent on, and can be controlled by, specific structures and functions of the brain. However, the nonphysical nature of subjective awareness including the feelings of spirituality, creativity, conscious will, and imagination, is not describable or explainable directly by the physical evidence alone. [১৫]

তথ্যসূত্র:

[১] Benjamin Libet, Mind Time: The Temporal Factors in Consciousness; page: 3
[২] http://www.harunyahya.com/en/Brief-Explanations/4793/FOSSILS-HAVE-DISCREDITED-EVOLUTION

[৩] Colin Patterson, “Cladistics”, Brian Leek ile Röportaj, Peter Franz, 4 Mart 1982, BBC;

Lee M. Spetner, Not By Chance, Shattering the Modern Theory of Evolution, The Judaica Press Inc., 1997, s. 175
Retrieved from: http://www.harunyahya.com/en/books/152365/Atlas-Of-Creation—Volume-4-/chapter/14297/Part-3—Darwinists-have-Deceived-the-Whole-World-with-Frauds—2


[৪] Stephen J. Gould, “Evolution’s Erratic Pace,” Natural History, Vol. 86, No. 5, May 1977, p. 14 [Emphasis added]

[৫] Niles Eldredge, Reinventing Darwin: The Great Evolutionary Debate, [1995], phoenix: London, 1996, p. 9; Retrieved from: http://www.living-fossils.com/2_1.php

[৬] http://textbookofbacteriology.net/growth_3.html

[৭] http://myxo.css.msu.edu/ecoli/overview.html

[৮] William A. Dembski, Jonathan Wells, The Design in Life, Page: 44

[৯] Gordon Rattray Taylor, The Great Evolution Mystery, Sphere Books Ltd., 1984, s. 4; Retrieved from: http://www.harunyahya.com/en/books/152365/Atlas-Of-Creation—Volume-4-/chapter/14297/Part-3—Darwinists-have-Deceived-the-Whole-World-with-Frauds—2

[১০] Nicholas Comninellis, Creative Defense, Evidence Against Evolution, Master Books, 2001, s. 81
Retrieved from: http://www.harunyahya.com/en/books/152365/Atlas-Of-Creation—Volume-4-/chapter/14297/Part-3—Darwinists-have-Deceived-the-Whole-World-with-Frauds—2 [Emphasis added]

[১১] আর্কিব্যাকটেরিয়া থেকে আর্কিঁয়া: বিবর্তনবাদীদের অস্বস্থি

[১২] Stephen C. Meyer, Signature in The Cell;

[১৩] পাভেল আহমেদ, বিবর্তনবাদ ও তার সমস্যা – ৭: সম্ভাবনার অসম্ভাব্যতা ২ বিবর্তনবাদ ও তার সমস্যা – ৮: সম্ভাবনার অসম্ভাব্যতা ৩ (ছক্কা বনাম প্রোটিন)

[১৪] প্রোটিনের গঠনে আল্লাহর নিদর্শণ

[১৫] Benjamin Libet, Mind Time: The Temporal Factors in Consciousness page: 4,5 [Emphasis added]

জীবজগতের ভাষা, বর্ণমালা ও তার উৎস


[বি.দ্র.: এই লেখাতে মূলত জীবজগতের গাঠনিক ভাষা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।]

ছোটবেলায় আমাদের অনেকের মা-বাবা আমাদের বর্ণমালা শেখানোর জন্য এক ধরণের খেলনা কিনে দিতেন। প্লাস্টিকের তৈরী চৌকা (বর্গক্ষেত্র) আকৃতির খেলনাগুলোতে বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষর লিখা থাকতো। উদ্দেশ্য, আমরা খেলাচ্ছলে বর্ণমালা শিখে নেবো। সাথে, বর্ণ ব্যবহার করে শব্দ গঠনও করতে পারবো।

ধরুন, আপনাকে এ ধরণের কয়েক সেট বর্ণমালা দেয়া হয়েছে। বর্ণমালায় স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জন বর্ণের পাশাপাশি ‘কার’ চিহ্নিত চৌকা আছে। এ অবস্থায় আপনি সবগুলো চৌকা হাতে নিয়ে যদি টেবিলে ফেলেন তাহলে কি অর্থপূর্ণ বাক্য গঠন হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে? অবশ্যই না। হ্যাঁ, হতে পারে অর্থপূর্ণ ছোট দু’একটি শব্দ হয়ে গেল। যেমন: বল, কলম ইত্যাদি। কিন্তু, শব্দে অক্ষরের এবং ‘কার’-এর সংখ্যা যতই বাড়বে ততই ‘বাই চান্স’ অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। যেমন: ‘আকাশ’ ও ‘হতবিহ্বল’ শব্দ দু’টিতে যথাক্রমে ৫টি ও ৭টি চৌকা লাগবে। অন্যদিকে, ‘বল’ ও ‘কলম’ শব্দ দু’টিতে যথাক্রমে ২টি ও ৩টি চৌকা লাগবে। ফলে, ‘আকাশ’ ও ‘হতবিহ্বল’ শব্দ দুটি বাই চান্স তথা র‍্যাণ্ডমলি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

আবার, চৌকাগুলো র‍্যাণ্ডমলি ফেললে যদি কতগুলো অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরী হয়েও যায়, তথাপি তা একটি অর্থপূর্ণ বাক্য গঠন করবে না। যেমন: মনে করি, টেবিলে দেখা গেলো ‘বল কলম আকাশ’, এটা কোন অর্থপূর্ণ বাক্য প্রকাশ করলো না। তবে, এক্ষেত্রেও ছোট ছোট অর্থপূর্ণ বাক্য প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে। যেমন: আমি যাই। কিন্তু বাক্য যতই বড় হবে ততই র‍্যাণ্ডমলি তৈরী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে চৌকাগুলো র‍্যাণ্ডমলি ফেলে রাখা হয়েছে তাতে দু’অক্ষরের একাধিক অর্থপূর্ণ শব্দ (যেমন: GO, TO) পাওয়া যাচ্ছে। ভালমত খুঁজলে দু-একটি তিন অক্ষরের অর্থপূর্ণ শব্দও পাওয়া যেতে পারে। তবে, চার অক্ষরের যে শব্দটি (LOVE) ওপরের দিকে আছে, তা দেখামাত্রই বলে দেয়া যায় যে কেউ একজন এগুলো এভাবে সাজিয়েছে, র‍্যাণ্ডমলি হয়নি। চার অক্ষরের দুটো শব্দ মিলে যে শব্দটি (HAND-MADE) তৈরী করেছে সেটি র‍্যাণ্ডমলি হওয়া যে প্রায় অসম্ভব, তা বলাই বাহুল্য।

এবার মনে করুন, আপনার চৌকাগুলোতে এক বিশেষ ধরণের চুম্বক লাগানো আছে, যাতে আপনার চৌকাগুলোর একটি আরেকটির সাথে সুনির্দিষ্ট তথা স্পেসিফিক নিয়মে লেগে যাওয়ার প্রবণতা আছে। ধরি, ‘ক’ চিহ্নিত চৌকার প্রবণতা হলো ‘ল’ এর সাথে পাশাপাশি লেগে যাওয়া। তাহলে, এ ধরণের বর্ণমালা দিয়ে ‘বাই চান্স’ তো দূরে থাক, আপনি নিজে থেকে কি কোন শব্দ লিখতে পারবেন? উত্তর: না। কারণ, ‘ক’-এর পরে ‘স’ যুক্ত করতে প্রয়োজন হলেও আপনি আটকে যাবেন। কিন্তু, চৌকাগুলোর প্রবণতা যদি এমন হতো যে একটির সাথে আরেকটি স্পেসিফিক ভাবে না লেগে পাশাপাশি যেকোন বর্ণের সাথে হালকা ভাবে লাগে, তাহলে আপনার যেকোন শব্দ তৈরী করতে কোন সমস্যা হতো না এবং র‍্যাণ্ডমলি যে ছোট শব্দ বা বাক্যগুলো হতো সেগুলোও সাধারণ চৌকার মত বিচ্ছিন্ন না থেকে একটু লেগে থাকতো, অর্থাৎ স্থায়ী হতো। তবে এক্ষেত্রে ‘বাই চান্স’ হওয়া মানে আরেক সমস্যা। কারণ, দেখা যেত, যখনই ‘কলম’ লেখাটা তেরী হয়েছে পরক্ষণেই ‘ব’ এবং ‘শ’ বা অন্য যেকোন অক্ষর পাশে এসে ‘বকলমশ’ বানিয়ে ফেলেছে, তথা অর্থহীন করে ফেলেছে। অর্থাৎ, এমতাবস্থায় অর্থপূর্ণ শব্দগুলোকে পাশাপাশি রাখার জন্য একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির সার্বক্ষণিক অবস্থান প্রয়োজন হয়ে পড়ত।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারলাম তা হলো:

১. আমরা যদি কোন প্রক্রিয়ায় কোন তথ্য সংরক্ষণ করতে চাই, সেই প্রক্রিয়াটিতে এমন কতিপয় পৃথক পৃথক অংশ থাকবে যেগুলোকে যেকোন ভাবে সাজানো যায়।

২. উক্ত অংশগুলোর পরস্পরের মধ্যে আকর্ষণ থাকতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ‘আকর্ষণ’ থাকা যাবে না।

৩. এ ধরণের পৃথক পৃথক অংশগুলো র‍্যাণ্ডমলি যুক্ত হয়ে অর্থপূর্ণ কোন শব্দ এবং বাক্য গঠন করার একটি সীমা আছে। তবে, সেই সীমা খুবই সংকীর্ণ তথা ছোট।

এবার আসুন এ ধরণের একটি তথ্যসংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানি যা প্রতিনিয়ত আমরা ব্যবহার করে চলেছি। তা হলো কম্পিউটার। হ্যাঁ, কম্পিউটারে ‘বাইনারী’ নাম্বার দিয়েই বিভিন্ন ধরণের তথ্য, যেমন: প্রোগ্রামের নির্দেশনা, ডকুমেন্ট, ইমেজ ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয়।

আমরা জানি, আমরা যে অংক ব্যবহার করে হিসেব নিকেশ করি সেটি হলো ‘দশমিক’ বা ‘ডেসিমাল’ সংখ্যা। অর্থাৎ, ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গিয়ে এরপর আবার ১,২,৩..  যোগ করে তথা ১১, ১২, ১৩… এভাবে সংখ্যা গননা করতে থাকি। কিন্তু সংখ্যা গননা ইচ্ছা করলে এভাবেও করা যায়, ১,১১,১১১,১১১১,…..,১১১১১১১১১১ (তথা ১,২,৩,৪,…….১০)। একে বলে ‘ইউনারী’ সংখ্যা। এভাবে একশ লিখতে গেলে পরপর একশটি ১ বসাতে হবে। অর্থাৎ এভাবে হিসেব করা সহজ হলেও স্থান অনেক বেশী দরকার হয়ে পড়ে। আবার, সংখ্যাকে ‘দ্বিমিক’ বা ‘বাইনারী’ আকারেও প্রকাশ করা যায়। অর্থাৎ, ০,১,১০,১১,১০০,….১০১০ (তথা, ০,১,২,৩,৪,….১০)। দেখা যাচ্ছে এভাবে সংখ্যা প্রকাশ করলে যায়গা তুলনামূলক কম লাগছে। ‘দশমিক’ সংখ্যাকে ‘দ্বিমিক’ সংখ্যায় রূপান্তর করা যায় আবার বিপরীতটাও করা যায়।

লক্ষ্যণীয়, বিদ্যুতের উপস্থিতি অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে আমরা ইচ্ছে করলে দ্বিমিক সংখ্যাকে সংরক্ষণ করতে পারি। সিলিকন ট্রানজিস্টরের মধ্যে এ ধরণের একটি পদ্ধতি তৈরী করা হয়। যেখানে বিদ্যুতের উপস্থিতি হচ্ছে ‘১’ এবং বিদ্যুতের অনুপস্থিতি ‘০’। এভাবে তৈরীকৃত অনেকগুলো ট্রানজিস্টরকে যদি একসাথে পাশাপাশি রাখা যায় তাহলে সেগুলোতে সংখ্যা সংরক্ষণ করা যাবে।

কিন্তু কতগুলো ট্রানজিস্টরকে একসাথে রেখে আমরা একটি ‘একক’ ধরবো? কারণ, যদি একটি ট্রানজিস্টরকে একক ধরি তাহলে মাত্র দুটো সংখ্যা সংরক্ষণ করা যাচ্ছে ০ এবং ১। কিন্তু যদি ৮টি ট্রানজিস্টরকে একত্রে রাখা যায় তাহলে সর্বোচ্চ যে সংখ্যাটি রাখা যাবে তা হলো: ১১১১১১১১, দশমিকে যার মান ২৫৫। তুলনামূলক বড় সংখ্যা। আরও বেশী ট্রানজিস্টরকে একত্রে রাখা সম্ভব, কিন্তু সেক্ষেত্রে জায়গা বেশী লেগে যাবে। ফলে, সাধারণত ৮টি ট্রানজিস্টরকে একত্রে রাখা হয়। এর প্রতিটিকে এক ‘বিট’ বলে এবং পুরো ৮টি বিটকে একত্রে বলে ‘বাইট’।


চিত্রে একটি ৮ বিট শিফট রেজিস্টার দেখা যাচ্ছে। ৮ বিটের মেমোরী আইসিগুলোও (ইন্টেগ্রেটেড সার্কিট) অনেকটা এভাবেই সাজানো হয়।

৮টি বিট দিয়ে না হয় সংখ্যা সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু, আমি যদি অক্ষর সংরক্ষণ করতে চাই? তা-ও সম্ভব। কীভাবে? এটা বুঝা যায়, সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের উদাহরণ থেকে। আমরা অনেকেই ছোট বেলায় এরকম খেলেছি যে, আমি একটি শব্দ লিখব তবে সে শব্দে ‘খ’ বলতে ‘ক’ বুঝাবো এবং এভাবে বর্ণমালার অক্ষরগুলোকে এক অক্ষর করে পিছিয়ে দেবো। এভাবে কোন শব্দ লিখলে আমি কী ধরণের নিয়ম ব্যবহার করেছি সেটি যে জানবে তার পক্ষে শব্দটির অর্থ বুঝা সহজ হবে। অর্থাৎ, আমরা ইচ্ছে করলে ‘ক’ বর্ণটিকে অন্য কিছু দিয়ে প্রকাশ করতে পারি। ঠিক একইভাবে, একটি বাইটের মধ্যে যদি বিভিন্নভাবে বর্ণমালাকে জুড়ে দেয়া যায় তাহলেও লেখা সংরক্ষণ করা যাবে। American Standard Code for Information Interchange, সংক্ষেপে ASCII হচ্ছে এ ধরণের একটি নীতিমালা যেটি অনুযায়ী কম্পিউটারের বিভিন্ন ইন্সট্রাকশনগুলো, যেমন: ‘কী-বোর্ডের’ বিভিন্ন ‘কী’-গুলো  বাইনারী নাম্বারের সাথে চিহ্নায়িত করা থাকে। (http://www.ascii-code.com/) অর্থাৎ, আপনি যখন কী-বোর্ডে ‘A’ লিখেন,  র‍্যামে তা ‘০১০০০০০১’ হিসেবে সংরক্ষিত হয়।

আমেরিকান স্ট্যাণ্ডার্ড কোড ফর ইনফরমেশন ইন্টারচেঞ্জ। লক্ষ্যণীয়, A-এর কোড হচ্ছে ‘1000001’। এখানে ৭টি বিট আছে। প্রথম বিটটিকে (তথা অষ্টম) রাখা হয় অংকের মাইনাস বা প্লাস বুঝানোর জন্য।

হার্ডডিস্কে কীভাবে সংরক্ষণ হয়? বিষয়টি খুবই মজার। আমরা জানি, চৌম্বক পদার্থগুলোর ভিতরে ডাইপোল থাকে। তড়িৎক্ষেত্র প্রবাহিত করে যেগুলোর পোলারিটি ঘুরিয়ে দেয়া যায়। এরকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘনকাকৃতির চৌম্বক পদার্থ (যেমন: হার্ডডিস্কে ব্যবহৃত কোবাল্ট ভিত্তিক সংকর ধাতু)-কে যদি পাশাপাশি সাজানো যায় তাহলেও বাইনারী ডিজিট সংরক্ষণ করা যাবে। সেক্ষেত্রে ধরুন: ‘>’-কে ‘এক’ এবং ‘<’ কে ‘শূণ্য’ ধরা হলো। সেক্ষেত্রে, ‘A’ লিখলে হার্ডডিস্কে তা ‘<><<<<<>’ এভাবে সংরক্ষিত থাকবে।


চিত্রে হার্ডডিস্কের কোবাল্ট বেজ্‌ড্‌ ম্যাগনেটিক অ্যালয় দিয়ে কীভাবে বাইনারী তথ্য রেকর্ড করা এবং পড়া হয় তা দেখা যাচ্ছে।

যাই হোক, এবার লক্ষ্য করুন, হার্ডডিস্কে কিংবা র‍্যামে আমরা ডাটা সংরক্ষণ করতে পারছি কারণ ডাটা সংরক্ষণের ক্ষুদ্র অংশগুলো পরস্পরের সাথে সুনিদিষ্ট আকর্ষণে আবদ্ধ নয়। স্পষ্টতই, হার্ডডিস্কের উপর দিয়ে যদি কোন র‍্যাণ্ডম ম্যাগনেটিক ঝড় বয়ে যায় সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য সংরক্ষণ হবে না। আবার, র‍্যাণ্ডম প্রক্রিয়ায় যদি একটি বিট পরিবর্তন হয়ে যায়, গুছানো তথ্য ধ্বংস হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সংক্ষিপ্ত সীমার বাইরে অর্থবহ তথ্য যুক্ত হবে না।

এবার চলুন আমরা এরকম আরও মজার একটি বর্ণমালা নিয়ে কথা বলি। হ্যাঁ, তা আর কিছু নয় জীবজগতের গাঠনিক ব্লুপ্রিন্ট সংরক্ষণকারী বর্ণমালা- ‘ডিএনএ’।

ডিএনএ-র বর্ণমালায় বর্ণ মাত্র চারটি এবং কোন যতি চিহ্ন নেই। এডেনিন (A), থায়ামিন (T), গুয়ানিন (G) এবং সাইটোসিন (C)। এই চারটি অণু এমন যে, এগুলো পরস্পর পাশাপাশি ফসফেট বন্ধনে যুক্ত হয়। কিন্তু, এই বন্ধনে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক স্পেসিফিক এফিনিটি কাজ করে না। স্পেসিফিক এফিনিটি কাজ করলে ডাটা সংরক্ষণ করা যায় না, উপরে আমরা তা দেখেছি। লক্ষ্যণীয় যে, উপরোক্ত প্রতিটি অনুকে বলে নাইট্রোজেন বেজ। উক্ত নাইট্রোজেন বেজগুলো ডিঅক্সিজেনেটেড রাইবোজ-এর সাথে সংযুক্ত থাকে, যাদেরকে বলে নিউক্লিওসাইড। প্রতিটি নিউক্লিওসাইডের রাইবোজ সুগারে ফসফেট যুক্ত হলে গঠিত হয় নিউক্লিওটাইড। মূলত এই নিউক্লিওটাইড-ই হলো ডি-অক্সিরাইবো-নিউক্লিইক-এসিড তথা  ডিএনএ-র গাঠনিক একক। অর্থাৎ, এরকম একেকটি নিউক্লিওটাইড অণু পাশাপাশি যুক্ত হয়ে যে পলিনিউক্লিওটাইড চেইন গঠন করে তাকেই বলে ডিএনএ।

আমরা চিত্রটির ডানদিকে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স-এর অংশ দেখতে পাচ্ছি। বামদিকে দেখানো হয়েছে যে, ডিএনএ-তে কীভাবে নিউক্লিওটাইডগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়। লক্ষ্যণীয়, ডাবল হেলিক্স গঠনের ক্ষেত্রে পাশাপাশি দুটো চেইনের একটির A অপরটির T এর সাথে এবং একটির C অপরটির G এর সাথে ও ভাইস ভারসা হাইড্রোজেন বন্ধন দিয়ে যুক্ত হয়।

প্রশ্ন হলো, ATGC বর্ণগুলোকে তো বিভিন্ন ভাবে সাজানো যেতে পারে, সেক্ষেত্রে আমরা তথ্য সংরক্ষণের একক হিসেবে কোনটি ঠিক করবো? এটি নির্ভর করছে আমি কী ধরণের তথ্য সংরক্ষণ করতে চাই এবং কী ধরণের ‘সংকেত’ চিহ্নিত করতে চাই তার উপর। উপরের কম্পিউটারের উদাহরণে আমরা দেখেছি, বাইনারী ডিজিটে বর্ণ দুটি, ‘০’ এবং ‘১’। আমি যদি দুটি নিয়ে একক করি তাহলে সাজানো যাবে এইভাবে: ০০,০১,১০,১১; তিনটি করে নিলে: ০০০,০০১,০১০,০১১,১০০,১০১,১১০,১১১; অর্থাৎ খুব বেশী সংকেত চিহ্নিত করা যাবে না। অন্যদিকে, আমি যেহেতু অনেকগুলো পৃথক নির্দেশনা বা অক্ষর চিহ্নিত করতে চাচ্ছি, সেহেতু ‘একক’টি এমন হলে ভাল হয় যে বেশী বড়ও না আবার এমন ছোটও না যে সবগুলো সংকেত সংরক্ষণ করা যাবে না। এ হিসেবে কম্পিউটারের একক হলো ‘০০০০০০০০’ তথা ‘৮’ বিট।

ডিএনএ-র ক্ষেত্রে আমার সংকেতগুলো হলো অ্যামাইনো এসিড। যদিও প্রকৃতিতে অনেক অ্যামাইনো এসিড আছে, আমি বিশটির বেশী ব্যবহার করবো না। এখন, ATGC থেকে যদি দুটো করে বর্ণ নিই, তাহলে মাত্র ষোল ভাবে সাজানো যায়: AA,AT,AG,AC,TA,TT,TG,TC,GA,GT,GG,GC,CA,CT,CG এবং CC। অর্থাৎ বিশটি অ্যামাইনো এসিডকে নির্দেশিত করতে পারছি না। চারটি করে নিলে সাজানো যাবে ২৫৬ ভাবে। এত বেশী একক আমার প্রয়োজন পড়ছে না। তদুপরি, চারটি করে সাজালে আমার জায়গা বেশী লেগে যাচ্ছে।  কিন্তু, তিনটি করে নিলে ৬৪ উপায়ে সাজানো যায়। এ প্রক্রিয়ায় ২০টি অ্যামাইনো এসিডকে খুব সহজেই চিহ্নায়িত করা যাচ্ছে। এছাড়াও, অনেকগুলো অ্যামাইনো এসিডকে আমি একাধিক ‘কোডন’ দিয়ে চিহ্নিত করতে পারছি। (লক্ষ্যণীয়, ডিএনএ-তে ৩টি অক্ষরের এই একককে কোডন বলে)।


প্রশ্ন হলো, আমি একটি অ্যামাইনো এসিডের বিপরীতে কোন্ কোডনকে চিহ্নায়িত করবো? যেমন: GGG কোড করে গ্লাইসিনকে, GAG কোড করে গ্লুটামিক এসিডকে। কিন্তু, GGG এলানিনকে কোড না করে গ্লাইসিনকে কোড করবে এটা কেন নির্ধারণ করবো?  ওয়েল, এক্ষেত্রে আমার পরিকল্পনা হবে কোষ বিভাজন হওয়াকালীন ডিএনএ কপি করার সময় যদি র‍্যাণ্ডমলি একটি অক্ষর পরিবর্তন হয়ে যায় (মিউটেশন) সেক্ষেত্রে অ্যামাইনো এসিড যেন পরিবর্তন না হয় (সাইলেন্ট মিউটেশন)। আবার, বিশ ধরণের অ্যামাইনো এসিডে কতগুলো পোলার, কতগুলো নন-পোলার, কতগুলো এসিডিক এবং কতগুলো বেসিক, কতগুলোতে ‘রিং’ আকৃতির সাইড চেইন আছে কতগুলোতে নেই। প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন নির্মাণ এবং ফাংশন নির্ধারণে এই বিভিন্ন ধরণের অ্যামাইনো এসিডগুলোর সুনির্দিষ্ট গাঠনিক ও রাসায়নিক ভূমিকা আছে। এ কারণে আমি চেষ্টা করবো কোডনগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করতে যেন মিউটেশনের কারণে যদি অ্যামাইনো এসিড পরিবর্তন হয়েও যায়, তথাপি যেন একই ধরণের অন্য একটি এমাইনো এসিডে পরিবর্তন হয়। মজার বিষয় হলো, জীবজগতে যে কোডন পাওয়া গেছে তা এই ধরণের বৈশিষ্ট্যগুলোকে মাথায় রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে। তদুপরি, জীবজগতের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এই কোডনের নীতিমালা সুনির্দিষ্ট অর্থাৎ ইউনিভার্সাল। কারণটা খুব সহজ- একাধিক ভাষা ব্যবহার করার চেয়ে একটি  ভাষা ব্যবহার করাই সুবিধাজনক।

উপরে আমরা ইউনিভার্সাল জেনেটিক কোডের চার্ট দেখতে পাচ্ছি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কোডন সিস্টেমটি এমনভাবে সিলেক্ট করা হয়েছে যেন মিউটেশনের ইফেক্ট সর্বোচ্চ মিনিমাইজ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ফিনাইল এলানিনকে (Phe) কোড করে UUU এবং UUC। অর্থাৎ UUU মিউটেশন হয়ে UUC হয়ে গেলেও এমাইনো এসিড একই থাকবে। আবার, যদি UUU পরিবর্তন হয়ে UAU হয়ে যায় তাহলে ফিনাইল এলানিন পরিবর্তন হয়ে টাইরোসিন (Tyr) হবে, যা কাছাকাছি গঠনযুক্ত। কিংবা, যদি CUU হয়ে যায় সেক্ষেত্রে হচ্ছে লিউসিন (Leu)। এটিও ত্রিমাত্রিক গঠনের দিক দিয়ে ফিনাইল এলানিনের কাছাকাছি।

এই যে একটি কোডনের সাথে একটি অ্যামাইনো এসিডকে আমি ‘অ্যাসাইন’ করছি, তা কি র‍্যাণ্ডমলি একা একা হতে পারবে? যে কোন সচেতন পাঠকের কাছে পরিস্কার যে তা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে, একটি বিষয়ের সাথে আরেকটি বিষয়কে এসাইন বা সম্পর্কযুক্ত করার তথা একটি বিষয়ে আরেকটি বিষয়ের অর্থ নির্ধারণ করে দেয়া ‘বুদ্ধিমান’ স্বত্তার কাজ। কোন অন্ধ প্রক্রিয়ায় তা কখনও হয় না। এর মধ্যে আবার তা যদি হয় ‘অপটিমাম’ বা ‘বেস্ট’ কোডন নির্ণয় করা, তাহলে তো আরও সম্ভব নয়।

এছাড়াও, এই বর্ণগুলো যদি পরস্পরের সাথে স্পেসিফিক এফিনিটি দেখাতো তাহলেও তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। অর্থাৎ, A কেবল G-এর পাশে বসতে পারবে, C কেবল T-এর পাশে বসতে পারবে, অণুগুলোর রাসায়নিক আসক্তি এমন হলে তা কোন অ্যামাইনো এসিডকে কোড করতে পারতো না।

এবারে আসি প্রোটিনের কথায়। প্রোটিনকেও আরেক ধরণের ভাষা বলা যায় যার বর্ণমালায় বর্ণ আছে ২০টি। পোলারিটি, অম্ল-ক্ষার বৈশিষ্ট্য, বেনজিন রিং-এর উপস্থিতি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের আলোকে প্রতিটি অ্যামাইনো এসিড বর্ণ বিভিন্ন অর্থ ধারণ করে। আর এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে তৈরী হয় একেকটি বাক্য তথা অ্যামাইনো এসিডের সরলরৈখিক সিকোয়েন্স। একে আবার প্রোটিনের প্রাইমারী স্ট্রাকচার বলা হয়। উক্ত সিকোয়েন্স, অ্যামাইনো এসিডের বিভিন্ন মাত্রার কেমিক্যাল এফিনিটির উপর ভিত্তি করে আলফা হেলিক্স, বিটা শিট ইত্যাদি বিশেষায়িত গঠন তৈরী করার মধ্য দিয়ে প্রোটিনের সেকেণ্ডারী স্ট্রাকচার তৈরী করে। এরপর, নির্দিষ্ট আকৃতিতে ভাঁজ (ফোল্ড) হয়ে তৈরী করে সুনির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক গঠন বা টারসিয়ারী স্ট্রাকচার। এ রকম দুটো বা ততোধিক প্রোটিন সমন্বয়ে তৈরী হয় কোয়ার্টারনারী স্ট্রাকচার। এনজাইমগুলো সাধারণত একটি প্রোটিন দিয়ে গঠিত হয়, আর বিভিন্ন গাঠনিক কাঠামো যেমন: আয়ন চ্যানেল তৈরী হয় একাধিক প্রোটিনের সমন্বয়ে।

ইলাস্ট্রেশনটিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি জীবজগতে প্রাপ্ত ২১ ধরণের এমাইনো এসিড। তন্মধ্যে, সেলেনোসিস্টিন অল্প কিছু বিশেষায়িত প্রোটিনে পাওয়া যায় বিধায় সাধারণভাবে প্রোটিনের গাঠনিক একক পড়ার সময় এর উল্লেখ দেখা যায় না।

লক্ষ্যণীয়, কম্পিউটারের ভাষার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি বাইনারী ভাষা দিয়ে ইংরেজী ভাষা সংরক্ষণ করা হয়। অন্যকথায়, একটি ভাষা দিয়ে আরেকটি ভাষা সংরক্ষণ করা যায়। তেমনি প্রোটিনের ভাষাকে সংরক্ষণ করে ডিএনএ-র ভাষা। আরও লক্ষ্যনীয়, প্রোটিনের ভাষায় বর্ণ ২০টি হওয়ায় এবং উক্ত বর্ণগুলোর আণবিক বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন হওয়ায় ভাব প্রকাশের সীমানা অনেক বেড়ে গেলো। অর্থাৎ প্রোটিনের ২০টি অণু দিয়ে অনেক বৈচিত্রপূর্ণ ত্রিমাত্রিক গঠন সম্ভব। ফলে, প্রোটিন এনজাইম থেকে শুরু করে কোষের বিভিন্ন গাঠনিক উপাদান তৈরীতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু, ডিএনএ-র বর্ণমালার বর্ণের আণবিক বৈশিষ্ট্য ও সংখ্যা সীমিত হওয়ায় ডিএনএ বৈচিত্রপূর্ণ ত্রিমাত্রিক গঠন তৈরী করতে পারে না।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে অ্যামাইনো এসিডগুলো একটার পাশে আরেকটা যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত ত্রিমাত্রিক প্রোটিন তৈরী করে। বিষয়টি যত সহজ শুনতে ততটাই কঠিন বাস্তবে, কী বলেন?

আমরা জানি, ডিএনএ-তে দুটি পলিনিউক্লিওটাইড চেইন পাশাপাশি থেকে প্যাঁচানো মই-এর মত গঠন তৈরী করে, যাকে ইংরেজীতে বলে ডাবল হেলিক্স। ডিএনএ থেকে প্রোটিন তৈরীর প্রক্রিয়ায় প্রথমে ডিএনএ থেকে সম্পূরক ম্যাসেঞ্জার আরএনএ তৈরী হয়। এ প্রক্রিয়ায় শুরুতে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স এর মধ্যে বন্ধন খুলে একটি চেইনকে পড়ার জন্য উন্মুক্ত করতে হয়। এ প্রক্রিয়াটি করে একটি বিশেষায়িত প্রোটিন তথা এনজাইম। এরপর আরেকটি বিশেষায়িত এনজাইম এসে উক্ত চেইনকে পড়ে সম্পূরক আরএনএ চেইন তৈরী করে। অতঃপর, একটি এনজাইম লাগে উন্মুক্ত করা অংশ পুনরায় জোড়া লাগাতে, একটি এনজাইম লাগে প্রুফ রিড করতে, দুটি লাগে জোড়া লাগানোর সময় বেশী পেঁচিয়ে গেলে প্যাঁচ খুলতে। প্রসঙ্গত, আরএনএ-এর সাথে ডিএনএ-র পার্থক্য হল- আরএনএ-এর নিউক্লিওটাইডে তথা আরএনএ-র বর্ণমালার অক্ষরগুলোতে একটি অক্সিজেন অণু বেশী থাকে এবং আরএনএ-তে থাইমিনের (T) পরিবর্তে ইউরাসিল (U) থাকে। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, তথ্য পরিবহন করে নেয়ার জন্য ডিএনএ-র পরিবর্তে আরএনএ-কে কেন বাছাই করা দরকার হলো? একটি উত্তর হলো, যে পদ্ধতিটির মধ্যে আমি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রাখতে চাই স্বাভাবিক ভাবেই তাকে আমি আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে চাইব। তদুপরি, আরএনএ-র আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি ডিএনএ-র চেয়ে একটু বেশী বৈচিত্রের গঠন তৈরী করতে পারে।

এক নজরে ডিএনএ থেকে প্রোটিন সংশ্লেষ পদ্ধতি। ছবিটিতে সংশ্লেষের কাজে অংশগ্রহণকারী এনজাইমগুলোকে দেখানো হয়নি।

এরপর, ম্যাসেঞ্জার আরএনএ থেকে রাইবোজোম নামক আণবিক মেশিনের সহায়তায় প্রোটিন সংশ্লেষ হয়। রাইবোজোম নামক মেশিনটি তৈরী হয় রাইবোজোমাল আরএনএ ও অনেকগুলো প্রোটিনের সমন্বয়ে। প্রোটিন তৈরীর প্রক্রিয়ায় আর এক ধরণের আরএনএ সাহায্য করে- ট্রান্সফার আরএনএ বা টি-আরএনএ । এদের কাজ হলো রাইবোজোমের কাছে অ্যামাইনো এসিড বহন করে নিয়ে যাওয়া। বিশটি অ্যামাইনো এসিডের জন্য এরকম বিশ ধরণের সুনির্দিষ্ট ট্রান্সফার আরএনএ থাকে। আবার, প্রত্যেক ধরণের টি-আরএনএ-র সাথে তৎসংশ্লিষ্ট অ্যামাইনো এসিড সংযুক্ত করার জন্য বিশটি সুনির্দিষ্ট ও পৃথক এনজাইম (অ্যামাইনো এসাইল ট্রান্সফারেজ) থাকে। এছাড়াও, রাইবোজোমে দুটো পাশাপাশি অ্যামাইনো এসিডের  বন্ধন তৈরী করার জন্য কাজ করে আলাদা এনজাইম।

উপরের বর্ণনা থেকে লক্ষ্যণীয়, ডিএনএ-তে প্রোটিন তৈরী তথ্য ধারণ করা থাকে। আবার, উক্ত তথ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রোটিন তৈরী করার জন্য দরকার অনেকগুলো আরএনএ এবং সুনির্দিষ্ট প্রোটিন (এনজাইম)।  যদি প্রশ্ন করা হয়, কীভাবে আদিম পরিবেশে কোষের উদ্ভব হল? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে, কোন্‌টা আগে আসলো- ডিএনএ নাকি প্রোটিন নাকি আরএনএ? আমরা দেখছি তিনটি জিনিস একসাথে ও পরস্পরজড়িতভাবে উদ্ভব না হলে এই সিস্টেমটি চালুই হচ্ছে না। ইনটুইটিভলি, কোন প্রকার র‍্যাণ্ডম অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব নয়।

প্রোটিন (তথা এনজাইম) আগে আসবে? রিডিং টেমপ্লেট (অর্থাৎ ডিএনএ) না থাকলে প্রোটিন কাজ করবে কার উপর? তদুপরী, ১৫০টি অ্যামাইনো এসিড দিয়ে নির্মিত একটি মাঝারি সাইজের সুনির্দিষ্ট প্রোটিন আসাও গাণিতিকভাবে অসম্ভব একটি ব্যাপার। ডগলাস এক্স-এর হিসেবে অনুযায়ী এর সম্ভাব্যতা ১০১৬৪। [১] অন্যদিকে, বিল ডেম্বস্কি দেখিয়েছেন বিশ্বজনীন সম্ভাব্যতার সীমা ১০১৫০। [২] অর্থাৎ, যে কোন র‍্যাণ্ডম ঘটনা এই সীমাকে ছাড়িয়ে গেলে আমাদের মহাবিশ্বে তা ঘটার সম্ভাবনা নেই। একটি মাঝারি সাইজের প্রোটিনের এই অবস্থা। অথচ, আরএনএ পলিমারেজ এনজাইম ১০০০-এর বেশী অ্যামাইনো এসিড যুক্ত তিনটি প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত হয়।

ডিএনএ আগে আসবে? ডিএনএ থেকে তথ্য পড়বে কে? যদি ডিএনএ অণু এমন কোন গঠন তৈরী করতে সক্ষম হত যা এনজাইমের মত কাজ করে তাহলেও চিন্তা করার সুযোগ থাকতো। কিন্তু, আমরা আগেই বলেছি ডিএনএ বৈচিত্রপূর্ণ গঠন তৈরী করতে পারে না। সুতরাং বাকী রইল আরএনএ। আরএনএ কি কেমিকেল এভল্যুশন তথা এবায়োজেনেসিসকে উদ্ধার করতে পারবে?

বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরীতে এমন এক ধরণের আরএনএ সংশ্লেষ করতে পেরেছেন যা নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট পরিবেশে এনজাইম হিসেবে কাজ কোরে আরএনএ পলিমারাইজেশনেকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, একটি সম্পূরক আরএনএ টেমপ্লেট-এর বিপরীতে নিউক্লিওটাইড (A এর বিপরীতে U, U এর বিপরীতে A, G এর বিপরীতে C, এবং C এর বিপরীতে G) যোগ করার মাধ্যমে নিজের একটি কপি তৈরী করতে পারে। এই বিশেষ ধরণের আরএনএকে বলে রাইবোজাইম। এর মাধ্যমে তারা বলতে চাচ্ছেন যে, আদিম পরিবেশে এ ধরণের একটি রাইবোজাইম আসার মাধ্যমে সেল্ফ-রেপ্লিকেশনের সূচনা হয়েছে এবং পরবর্তীতে ‘কোন একটি উপায়ে’ কোষের উপরোক্ত বর্ণিত বিষয়গুলো আবির্ভাব হয়েছে! যেকেউ একটু মাথা খাটালেই বুঝবে এ ধরণের চিন্তা কতখানি অ্যাবসার্ড! কিন্তু কেন?

এক, পৃথিবীর আদিম পরিবেশ ল্যাবরেটরীর মত নিয়ন্ত্রিত ছিলো না।

দুই, ‘রাইবোজাইম নিজের একটি কপি তৈরী করতে পারে’ এই অবস্থা থেকে ‘আরএনএ প্রোটিনের তথ্য ধারণ করে এবং তা প্রোটিন সংশ্লেষ করে’ এই অবস্থায় যাওয়ার কোন পথ নেই। কারণ, উপরে আমরা ডিএনএ-র ক্ষেত্রে যে রকম বলেছি ঠিক তেমনি কোন্ কোডনটি কোন্ অ্যামাইনো এসিডের জন্য নির্ধারিত হবে সেটি নির্বাচন করা একটি বুদ্ধিমান ‘মাইণ্ড’-এর কাজ। তদুপরি, যদি অপটিমাম ইউনিভার্সাল কোডনের জন্য র‍্যাণ্ডম অনুসন্ধান করা সম্ভবও হতো, সেক্ষেত্রে প্রতি সেকেণ্ডে ১০৫৫টি অনুসন্ধান চালাতে হতো। কিন্তু, বায়োফিজিসিস্ট হার্বাট ইওকি হিসেব করে দেখিয়েছেন র‍্যাণ্ডম অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় ১.৪০ x ১০৭০টি সম্ভাব্য কোডনের মধ্যে উক্ত অপটিমাম কোডন সিস্টেমকে খুঁজে বের করতে হবে এবং হাতে সময় পাওয়া যাবে ৬.৩ x ১০১৫ সেকেণ্ড। [৩] এছাড়াও, রাইবোজোমে যে প্রোটিন সিনথেসিস হয় তাতে অনেকগুলো সুনির্দিষ্ট প্রোটিন ও আর-আরএনএ-র নির্দিষ্ট অবস্থানগত ও তড়িৎ-রাসায়নিক ভূমিকা আছে। অথচ, আরএনএ প্রোটিনগুলোর মত বিভিন্ন ধরণের স্ট্রাকচার গঠন করতে পারে না। কারণ, আরএনএ-র বর্ণ সংখ্যা সীমিত এবং বর্ণের কেমিক্যাল স্ট্রাকচারও অ্যামাইনো এসিডের ন্যায় বৈচিত্রপূর্ণ নয়।

তিন, রাইবোজাইম নিজের কপি করতে পারে তখনই যখন তার সম্পূরক একটি টেমপ্লেট থাকে। অর্থাৎ, আদিম পরিবেশে সেল্ফ রেপ্লিকেটিং রাইবোজাইম আসতে হলে রাইবোজাইম ও তার সম্পূরক টেমপ্লেট দুটো অণুরই একসাথে আসতে হবে। জনসন ও তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে, আংশিকভাবে নিজের কপি তৈরী করতে পারে এরকম একটি রাইবোজাইমের নিউক্লিওটাইডের সংখ্যা ১৮৯। সুতরাং, উক্ত স্পেসিফিক রাইবোজাইম এবং তৎসংশ্লিষ্ট সম্পূরক ও সুনির্দিষ্ট টেমপ্লেট-এর একসাথে আসার সম্ভাব্যতা ৪১৮৯ x ৪১৮৯ তথা ৪(১৮৯+১৮৯=৩৭৮) তথা প্রায় ১০২৭৭, যা বিশ্বজনীন সম্ভাব্যতার সীমা ১০১৫০ কে ছাড়িয়ে যায় (অর্থাৎ, অসম্ভব)। অথচ, পুরোপুরি কপি করতে পারে এরকম একটি রাইবোজাইমে নিউক্লিওটাইড সংখ্যা লাগবে আরও বেশী।  অন্যদিকে, অর্গেল ও জয়েস দেখিয়েছেন যে, এরকম দুটি আরএনএ খুজে পাওয়ার জন্য ১০৪৮ টি অণু খুঁজতে হবে যা পৃথিবীর মোট ভরকে অতিক্রম করে যায়। [৪] অর্থাৎ, আমরা দেখতে পেলাম আরএনএ এবায়োজেনেসিসকে উদ্ধার করতে কোন অবস্থাতেই সক্ষম নয়।

উপরের দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা তথ্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারলাম। ভাষার ব্যবহারে ইন্টেলিজেন্স-এর গুরুত্ব সম্পর্কে অভহিত হলাম। জীবজগতের ভাষার সৌষ্ঠব, বৈচিত্র ও সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হলাম। পরিশেষে, এ সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হলাম যে, কোন প্রকার অন্ধ, র‍্যাণ্ডম, অনিয়ন্ত্রিত, বস্তুগত ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় জীবজগতের ভাষার আগমন অসম্ভব এবং  জীবজগতের ভাষার আগমন ঘটাতে দরকার একজন বুদ্ধিমান স্বত্তার কার্যক্রম।

রেফারেন্স:
১. Meyer SC. Signature in the Cell. HarperCollins Publisher Inc. 2009; Page: 172

২. Dembsky WA. The Design Inference. Cambridge University Press. 1998; Page: 209

৩. Rana F. The Cell’s Design. Baker Books. 2009; Page: 175

৪. Stephen C. Meyer. Signature in the Cell. HaperCollins Publisher Inc. 2009; Page: 250



ব্রেইন ক্যানসার


নিপুণ একদম জানে বেঁচে ফিরলো,একটু আগে ডাক্তার জানালেন সে বেঁচে গেছে। ব্যাপার হচ্ছে গত তিন চারদিন তার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা। তার ভাষ্যমতে মাথা ছিড়ে যাচ্ছে,ব্রেনে কে যেন হাঁটাহাঁটি করছে। তার অভিব্যক্তি শুনে আমরা মিটিং ডেকে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিলাম নিপুণের ব্রেইন ক্যান্সার!!
কিন্তু পরদিনই মাথা ব্যাথার সাথে ঘাড় ব্যাথা পিঠ ব্যাথা শুরু হলো। নিপুণকে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দেয়া হলো "বেশী করে সিগারেট খাও,সুস্থ হয়ে যাবে"
পরদিন সকালেই নিপুণের চিৎকার "ভাই আমি সুস্থ হয়ে গেছি"
বুকটা কেঁপে উঠলো, খুব দুঃখ পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম "ক্যামনে বুঝলা? সে বলল "ভাই পুরা সিগারেট খাইতে পারতেছি"
নাহ সে সুস্থ হয়নি। বিকালে ডাক্তার জানালেন তার প্রেসার লো। বেশী করে দুধ ডিম কলা যা খুশী তাই খেতে বললেন। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। পেটভরে তিনপ্লেট তেহারী খাবার চারুকলাতে গিয়ে ৮টা চিকেন,তারপর আইসক্রিম,তারপর দুই গ্লাস কোক। ফেরার পথে আড়ং দুধ দুই প্যাকেট খেয়ে ফেলল।
তার পাশাপাশি আমরাও খাচ্ছি,খাওয়া দাওয়া একা করতে নেই। অসুস্থকে সঙ্গ দেয়া মানবতার কাছাকাছি ব্যাপার। অতএব নিপুণ একটা ডিম খাইলে আমরাও খাই,নিপুণের শখ হলো জাম খাবে,আমাদের শখ হলো লটকন খাবো। অতএব দুটাই কিনে আনা হলো। টানা তিন দিন পার হবার পর যখন ব্যাথা কিছুতেই সারছে না। আমরা সবাই মিলে প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম নাহ! নিপুণের ব্রেইন ক্যান্সারই হয়েছে,সে আর আমাদের সাথে থাকছে না। সে না থাকলে কি হবে তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির? তার ল্যাপটপটা ভালো,হার্ডডিস্ক ৫০০,আমার ল্যাপটপটা প্রায় নষ্ট। কি আর করবো ল্যাপটপটা আমার ভাগে পড়লো!
এছাড়া মোবাইল পড়লো আরেক ছোট ভাইয়ের কপালে,তার আবার দুইটা মোবাইল নষ্ট। কিচ্ছু করার নাই। গরীবের মধ্যে ভাগ করে দিলে যদি নিপুণ বেহেশতে যায় আরকি! ঝামেলা বাঁধলো নিপুণের বান্ধবীদের নম্বর নিয়ে! সবার বড় হিসাবে যদিও আমি অগ্রাধিকার পাবার কথা। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে আমাকে সবাই বঞ্চিত করলো। যাকগে ওসব নিয়ে ভাবলে চলবে না। সময়টা খারাপ। অবশ্য নিপুণকে আমি কথা দিয়েছি ও মারা যাবার পর টানা এক সপ্তাহ ওর ছবি প্রোপিক লাগাবো,কাভার কালো করে দিবো! ও মনে মনে যে মেয়েটাকে পছন্দ করতো তাকে বলে দিবো "নিপুণ তোমাকে পছন্দ করতো,কখনও মুখ ফুটে বলে নাই। মরবার আগে বলে গেছে আমার মাঝে ওকে খুঁজে নিতে"
চোখে পানি চলে আসতেছে,ছেলেটাকে কথা দিয়েছিলাম ঈদে একটা শার্ট কিনে দিবো। বিকালে বিছানায় কাতরাচ্ছিলো জ্বরে,আমি ওর ল্যাপটপটা নিয়ে ইউজ করার চেষ্টা করছি। আর যাই হোক মরে গেলেতো আমাকেই এটা ইউজ করতে হবে!
কাতরানোর পরিমাণ বাড়ছে,ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বুক মেপে মানে বুকের স্পন্দন দেখে,জ্বর মেপে,প্রেসার মেপে মুখ কালো করে বসে আছেন। আমাকে বললেন "ওর অভিভাবক কি আপনি?
-জ্বি আপাতত আমি!
ওর দিকে তাকিয়ে বললেন "টেনশন করার কোন কারন নাই,একটুও চিন্তা করবেন না। সুস্থ হয়ে যাবেন"
আমার দিকে ফিরে বললেন "ওর টাইফয়েড হয়েছে,নার্সিং দরকার"
আমার মাথায় সব হারানোর বাজ পড়লো,
নিপুণ দেখি হাসছে। জিজ্ঞেস করলাম "হাসছো কেন?
"ভাই এই প্রথম আমার একটা বড় রোগ হইছে,চলেন পার্টি দিই"
অতঃপর বাসার সবাইর জন্য গ্রীল চিকেন পরোটা, কোক নিয়ে রওনা হলাম!